নার্সিসাস কাহিনির বাকি অংশ…

 নার্সিসাসের আত্মপ্রেমের পৌরানিক কাহিনিটি প্রায় সবারই জানা। নার্সিসাস প্রতিদিন একটি হ্রদের কিনারে বসে একদৃষ্টিতে পানির দিকে তাকিয়ে থাকতো। পানিকে দেখতে নয়, নিজেকে দেখতে। নিজের সৌন্দর্য্যে এতই মগ্ন থাকতো যে, নিজের অস্তিত্বের কথা ভুলে যেতো। ভুলে যেতো সকাল বিকাল দুপুরের কথা। আত্মমগ্ন এই যুবক একদিন সেই হ্রদের স্বচ্ছ পানিতে ঝাপিয়ে পড়লো! সাঁতরাতে নয়, অন্যমনস্কতার কারণে! গভীর পানিতে খেই হারিয়ে বেচারা ডুবেই মরলো। তারপর নার্সিসাসের পড়ে যাবার স্থানটিতে জন্ম নিলো একটি ফুলগাছ। নাম দেওয়া হলো, নার্সিসাস। আহা! নার্সিসাস যেন একটি দীর্ঘশ্বাসের নাম।
.
.
এবার চলে যাই গল্পের বাকি অংশে।
.
নার্সিসাসের মৃত্যুর পর বনদেবী এসে উপস্থিত হলেন সেই হ্রদের পাড়ে। এসে যা দেখলেন, তা দেবী নিজেও ধারণা করতে পারেন নি। তিনি দেখলেন হ্রদের পানি অশ্রুবিন্দুতে রূপান্তরিত হয়েছে। অথচ এটি ছিল স্বচ্ছ পানিতে পরিপূর্ণ ঝিকমিকে হ্রদ।
.
“তুমি কেন কান্না করছো?” বনদেবী বিস্ময় সংবরণ করে হ্রদকে জিজ্ঞেস করলেন।
“আমি নার্সিসাসের জন্য শোকাহত।” হ্রদের উত্তর।
.
দেবী ভাবলেন, তা হতেই পারে। নার্সিসাস তো সারাক্ষণ এই হ্রদের পাড়েই বসে থাকতো। এমন একজন সঙ্গী হারালে যে কেউ হতাশ হয়। দেবী বললেন,
“ওহ, বুঝেছি। সুদর্শন নার্সিসাসের জন্য তো তুমিই কান্না করবে।”
“নার্সিসাস বুঝি সুদর্শন ছিল?” হ্রদের নির্বিকার প্রশ্ন।
.
বনদেবী এবার আর নিজের বিস্ময় সংবরণ করতে পারলেন না। দেবী হলেও তো তার অনুভূতি আছে! এই বোকা হ্রদ এখন এসব কী বলছে?! নার্সিসাস দিনভর তো তার দিকেই তাকিয়ে তাকতো।
.
“নার্সিসাস সুদর্শন ছিল কিনা এটি তোমার চেয়ে কে আর বেশি জানে?” বনদেবীর সবিস্ময় জবাব।
.
প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন পেয়ে শোকাতুর হ্রদ নিরব হয়ে হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ কিছুই বললো না। বনদেবীও দৃষ্টি নামালেন না হ্রদের দিক থেকে।
.
কান্নারত হ্রদ এবার নিরবতা ভেঙ্গে উত্তর দেবার চেষ্টা করলো-
“আমি নার্সিসাসের মৃত্যুতে কান্না করছি, কিন্তু আমি কখনও নার্সিসাসের সৌন্দর্য্য লক্ষ্য করে দেখি নি। আমি কান্না করছি, কারণ যতবার নার্সিসাস আমার পাশে আসতো, ততবার আমি নিজেকে দেখতে পেতাম। নার্সিসাসের গভীর চোখের দৃষ্টিতে আমার সৌন্দর্য্য ভেসে ওঠতো। তাই প্রতিদিন আমি নার্সিসাসের অপেক্ষায় থাকতাম।”
.
.
গল্পের মর্মার্থ।
.
সমাজে আমরা একে অন্যের পরিপূরক। একজনের পরিপূর্ণতার জন্য প্রয়োজন অন্যের অংশগ্রহণ। কেউ একা একা পূর্ণতা পেতে পারে না। নিজেকে দেখার মানে অন্যকেও দেখার সুযোগ দেওয়া। কৃষক আত্মমগ্ন হয়ে ফসল না ফলালে সেটির উদ্বৃত্ত তিনি শহুরে মানুষগুলোকে দিতে পারতেন না।
.
আমরা সবাই আত্মমগ্ন হলেই সেটি স্বার্থপরতা, তা সবসময় ঠিক নয়। বরং নিজেদের আত্মমগ্নতায় আমরা অন্যকে প্রকাশ করি। সক্রেটিস বলেছেন, নিজেকে জানুন। আমাদের শিক্ষাগুরুরাও বলেন, নিজের জন্য একটি লক্ষ্য স্থির করতে। আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনে চিকিৎসক বলেন, নিজের যত্ন নিন। আত্মমগ্নতাই সৃষ্টির রহস্য বের করে দেয়। আত্মমগ্নতা আমাদেরকে আত্মবিকাশ, আত্মমূল্যায়ন ও আত্মপ্রকাশে সাহায্য করে।
.
আত্মউন্নয়ের সকল প্রশিক্ষণে আমরা আত্মমগ্নতার নির্দেশনাই পাই। শিক্ষা, জ্ঞানার্জন, ধ্যান, যোগব্যায়াম সবকিছুতে পাই আত্মমগ্নতার প্রেরণা। অথচ পৃথিবীর প্রায় সবকিছু আমাদেরকে আত্মমগ্ন হতে বাধা দেয়। এসব থেকে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে থেকে অথবা বিচ্ছিন্ন রেখে আত্মমগ্ন হওয়া একটি কঠিন কাজ। এটিই আমাদের জীবনে পূর্ণতা প্রাপ্তির উপায়।
.
.
.

[পাওলো কোয়েলো’র “দি আলকেমিস্ট”-এর একটি অংশ অবলম্বনে]
Advertisements

নেতা বনাম নিরাপত্তা ও এরকম ৭টি প্রলোভন


নিরাপত্তা, জনপ্রিয়তা এবং সহকর্মীদের আনুগত্য একজন নেতার জন্য খুবই দরকার। দীর্ঘদিনের নিবেদিতপ্রাণ নেতৃত্বের জন্য এগুলোকে নেতার অর্জন বলেই বিবেচনা করা উচিত। অথচ শুরুতে এগুলো প্রলোভন হয়েই আসে। প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের জন্য এগুলো ফাঁদ হিসেবে কাজ করে। নিরাপত্তাকর্মীই নিরাপত্তার জন্য একনম্বর হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। সবচেয়ে অনুগত কর্মীটি কর্তৃপক্ষের আস্থার সুযোগে হয়ে ওঠে সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ। নিজের নিরাপত্তার জন্য নিযুক্ত ‘আত্মীয় সহকর্মীটি’ অন্যান্য পেশাদার কর্মীদের জন্য ফ্রাংকেনস্টাইন হয়ে পুরো প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের মুখে ফেলে। অতিরিক্ত নিরাপত্তাবোধ, তথা জনপ্রিয়তা লাভের আকাঙক্ষা, তথা নিজেকে সকলের মনযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার ইচ্ছা দায়িত্বশীল মানুষদেরকে নিষ্ক্রীয় করে তোলে। এগুলো দায়িত্ব পালন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ অথবা পক্ষপাতহীনভাবে কাজ করার প্রধান প্রতিবন্ধকতা। এসবই নেতার জন্য প্রলোভন। এরকম সাতটি প্রলোভন নিয়ে আজকের লেখাটি।
.
.
প্রলোভন ১/ নিজের নিরাপত্তা কমফোর্ট জোন
নিরাপত্তা একটি ফাঁদের নাম। আরাম একটি ভণ্ড প্রেমিকার (প্রেমিকের) নাম। নিরাপত্তাবোধ একটি কারপুরুষোচিত অনুভবের নাম। কথাগুলো গড়পরতা কোন মানুষের জন্য নয়। বলছি, নেতার কথা। নেতা যতক্ষণ নিজের নিরাপত্তা আর আরামের বিষয়ে ব্যস্ত থাকেন, ঠিক ততক্ষণ সময় তার দল বা প্রতিষ্ঠান থাকে অবহেলিত। কমফোর্ট জোন একটি দল বা প্রতিষ্ঠানের জন্য মঙ্গলজনক, কিন্তু নেতার জন্য বিপদজনক। নেতার জন্য প্রথম প্রলোভন হলো, নিজের নিরাপত্তায় মগ্ন থাকা। এই বাক্স থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত নেতা কোন ‘আউট-অভ-দ্য-বক্স’ চিন্তা করতে পারেন না, কিন্তু দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, কোন সাহসী গন্তব্যের দিকে দলকে পরিচালনা দিতে পারেন না। ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন, বিপদের মুখোমুখি না হয়ে মহৎ কিছু অর্জিত হয় নি।
.
প্রলোভন ২/ প্রাপ্তির প্রয়োজনীয়তাসবকিছুতে বিশেষ হবার আকাঙ্ক্ষা
অতিরিক্ত প্রাপ্তির লোভ নেতাকে দিকভ্রষ্ট করে। অতিরিক্ত শ্রদ্ধাবোধ, দলের সদস্যদের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত মনযোগ, অতিরিক্ত সেবা ও অতিরিক্ত অর্থের আকাঙ্ক্ষা – এসবই নেতার জন্য প্রলোভন। অর্থ ও বস্তুগত প্রয়োজনীয়তার কোন অন্ত নেই। মাসলো’র চাহিদা বিধি অনুসারে, মানুষের প্রয়োজনীয়তা ক্রমবর্ধমান। একটি পাবার সাথে সাথে এরচেয়ে উচ্চতর আরেকটি পাবার ইচ্ছা হয়। মোটরবাইকের মালিক হবার পর, গাড়ির মালিক হবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। গাড়ির মালিক হবার পর দেখা যায়, সেটি অন্যান্য গাড়ির মতো আকর্ষণীয় নয়। তখন গাড়ির ব্রান্ড পরিবর্তন করার ইচ্ছে হয়। ইত্যাদি। এটি হতেই পারে। অভাব অনুভব করা, আর যেকোনভাবে সে অভাবকে পূরণ করার জন্য বেপরোয়া হলেই সেটি অপরাধের দিকে নিয়ে যায়।
.
প্রলোভন ৩/ সম্পর্কের সুবিধাএকই সাথে ফাঁদ এবং সুযোগ
অনৈতিক সুবিধা। পদ ও সুখ্যাতির কারণে অনেক লোভনীয় সম্পর্কের সুযোগ হয়। বিপরীত লিঙ্গের এমন কাওকে পেয়ে যাবেন, যাকে দেখেই মনে হবে তাকে কাছে টানি; তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ি। হয়তো চাইলেই পেয়ে যাবেন। নেতাকে মনে রাখতে হবে, এটি শুধু ক্ষমতার অপব্যবহার নয়, এটি শুধু অনৈতিকতা নয়, এটি শুধু আপনার জনপ্রিয়তাকে কমিয়েই ছাড়বে না – এটি আপনার অতীত ও বর্তমানকে ধূলিস্যাৎ করে ছাড়বে। তিলে তিলে গড়া ব্যক্তি ইমেজকে, আপনার প্রতিষ্ঠানকে, আপনার কর্মীদলকে পরিচালনা দেবার আত্মবিশ্বাসকে, আপনার হুকুম দেবার শক্তিকে নিমিষে শেষ করে দেবে। পরদিন সকালে আপনি বের হবার শক্তিটুকু পাবেন না। এটি নেতৃত্বের প্রধান এবং প্রাচীণতম প্রলোভন, ইতিহাসে এবিষয়ে দৃষ্টান্তের অভাব নেই। কিন্তু অতিক্রম করতে পারলে এখান থেকে অপরিমেয় সম্ভাবনার দরজা খুলে যায়।
.
প্রলোভন ৪/ জনপ্রিয়তা… এর মিষ্টতাকে উপেক্ষা করাটা একটু কঠিনই
জনপ্রিয়তার প্রয়োজন আছে। এটি সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করে, যোগাযোগকে সহজ করে। প্রতিষ্ঠান ও বৃহৎ স্বার্থকে অক্ষুণ্ন রেখেও জনপ্রিয়তা পাওয়া গেলে, সেটি সোনায় সোহাগা। কিন্তু সেটি যদি না হয়, তবে জনপ্রিয়তা নেতার জন্য একটি বিষের পেয়ালা মাত্র। এতে আসক্ত হবার মানে হলো নেতার অপমৃত্যু। ভক্ত ও সাগরেদ প্রাপ্তির লোভ এবং তাদের প্রতি আপনার বাড়তি দায়বদ্ধতা আপনার অগ্রগতিকে আটকে দেয়। নেতার প্রধান কাজ হলো সংশ্লিষ্টদের আস্থা অর্জন, জনপ্রিয়তা এর স্বাভাবিক পরিণতি। জনপ্রিয়তাকে উপযুক্ত মাত্রায় প্রয়োগ এবং প্রয়োজনে জনপ্রিয়তাকে এড়িয়ে যাবার মধ্যেই নেতার সফলতা। জনপ্রিয়তা লাভের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নেতার কাজ নয়। নীতিতে অটল থাকতে চাইলে জনপ্রিয়তাকে বিসর্জন দিয়েই নেতাকে এগুতে হয়। যারা ভবিষ্যতকে দেখতে পায় না, তাদের সাথে নেতার ঐক্যমত সম্ভব নয়
.
প্রলোভন ৫/ পরিবার ও আত্মীয়… নেতার প্রধান প্রতিপক্ষ তার নিজের লোক
নেতার নিরাপত্তার জন্য এমন সময় আসে, যখন নিজের লোককে পদ বা সুযোগ দেবার প্রয়োজন হয়। নিজের মানুষদের জন্য বা আত্মীয়ের জন্য তার একটি দায় থাকেই। কাছের মানুষকে সুবিধা দেবার দায় সবারই থাকে। এমন সময় আসে যে, নেতা ইচ্ছে করলেই সেটি পারেন। এটি তখনই প্রলোভন হয়ে যায়, যখন নিজের পদের ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করতে হয়। পরিবার, আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধবকে নিয়মবহির্ভুত সুযোগ পাইয়ে দেবার আকাঙ্ক্ষা নেতার জন্য বড় একটি প্রলোভন। এই প্রলোভনে পড়ে অনেকেই আস্থা হারিয়েছে এবং পদচ্যুত হয়েছে। সিদ্ধান্তগ্রহণ থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত সকল পর্যায়ে প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি করবে আপনার নিকটজনেরা। তাদের উপস্থিতি অন্যান্য সহকর্মীদের মধ্যে আপনার পক্ষপাতহীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। আপনার নেতৃত্বকে করবে বিপদসংকুল।
.
প্রলোভন ৬/ অযাচিত আনুগত্য বস নাকি প্রতিষ্ঠান?
কর্মীর আচরণে অতিরিক্ত আনুগত্য দেখা গেলে প্রথমেই সন্দেহ করা উচিত – কোন অতিরিক্ত বা অনৈতিক প্রাপ্তির পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে সেটি করে থাকতে পারে। আদর্শ নেতা ব্যক্তিগত আনুগত্যের অপেক্ষায় থাকতে পারেন না, কারণ সেটি তার নিরপেক্ষতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তিনি হয়তো অতিরিক্ত অনুগতদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করে বসতে পারেন। আদর্শ নেতা চান কর্মী প্রথমত দল বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনুগত হোক। সেটিই নেতার প্রতি প্রকৃত আনুগত্য।
.
প্রলোভন ৭/ কথা বলার আকুলতা… কথা কাজের প্রতিবন্ধকতা
শ্রোতা পেলে কথা বলার আকুলতায় আসবেই। পদবির খাতিরে কিছু দর্শকশ্রোতা জুটবেই। তারা শুনতেই চাইবে আপনার কথা, কারণ এই কথা থেকে তারা কিছু সিদ্ধান্ত পাবে; দিকনির্দেশনা পাবে। ঠিক একারণেই কথায় নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত, যেন অতিরিক্ত কিছু না বলা হয়। সবাই আগ্রহভরে আপনার কথা শুনবে, অন্তত দেখতে সেরকম দেখাবে। দেখবেন, তারা শুনেই যাচ্ছে। তাতে আপনি হয়তো আরও আগ্রহ পাবেন কথা বলার। কথা থেকে কথার শাখা প্রশাখা বের হয়ে বাক্য থেকে অনুচ্ছেদ, অনুচ্ছেদ থেকে গল্পে পরিণত হবে। তাতে অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুল, কিছু অসর্তক অসত্য, অসময়ের অযাচিত কথা, কিছু মানবিক দুর্বলতার বিষয় বের হয়ে আসবে। এটি আপনাকে সবার সামনে বিপদাপন্ন করবে। শুধু তা-ই নয়, ভবিষ্যৎ কর্মপ্রক্রিয়াকেও করে তুলবে বাধাগ্রস্ত। কাজ করতে চাইলে বক্তৃতা বন্ধ করতে হবে। বক্তৃতা করতে চাইলে কাজ বন্ধ করতে হবে।
.
.

এলোমেলো লেখাটি ছুটির দিনের অলস চিন্তার ফসল। ক্রমান্বয়ে পরিমার্জিত হতে থাকবে। পরবর্তি পর্ব: নেতার শক্তির উৎস।

বাংলা ব্লগ ব্লগার ব্লগসাইট এবং সঞ্চালনা

ব্লগিং নিয়ে আমার কিছু প্যাচাল

 

নানাবিধ কারণে ব্লগে নিয়মিত লেখা হচ্ছে না। কিন্তু সময় পেলেই ব্লগ পড়ি এবং পড়লে মন্তব্য দিই। এটি করতে এখনও ভালো লাগে। এদিকে অনেক নতুন ব্লগারের আগমন হয়েছে। তার চেয়েও বেশি সংখ্যক পুরাতন ব্লগার আজ এখানে নেই। তবে কেউ কেউ পাসওয়ার্ড সমস্যার কারণে নতুন আইডি নিয়ে নতুনভাবে ফিরে এসেছেন। কেউবা ইমেইলে যোগাযোগ করে পাসওয়ার্ড পুনরুদ্ধার করে আগের নামেই ফিরে এসেছেন। ফেবুতে নিজেদের ফিরে আসার সংবাদ জানাচ্ছেন, বেশ ঘটা করে। ব্লগে ফিরে আসার চলমান প্রবণতাটি বেশ ভালো লাগছে।

কিন্তু তাতে কি ব্লগের স্থায়ি কোন সমাধান হবে? একসময় অসংখ্য বাংলা ব্লগসাইট ছিল, এখন তো নেই! তবু কেন এখানে আগের মতো পাঠক/ব্লগার নেই? এভাবেই কি শেষ হবে বাংলা ব্লগের ইতিহাস?

সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বজ্ঞান এবং জবাবদিহিতা না থাকলে বাংলা ব্লগের গৌরব ও অহংকার একসময় ইতিহাস হয়ে যাবে।

ব্লগের লেখা প্রসঙ্গে:

আমার অনেক প্রতিভাবান বন্ধুবান্ধব আছেন যারা ভালো লেখেন, ভালো চিন্তা করেন এবং ভালো বিশ্লেষণ করতে পারেন। তাদের লেখা পড়ে এবং বুদ্ধিদীপ্ত পোস্টগুলো দেখে অনেক সময় মজা পাই, উচ্ছ্বসিত হই।

সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে তাদের চিন্তাচেতনার বিস্তৃতি দরকার। কিন্তু আমরা যখন ব্যক্তি বা দল বা একটি নির্দিষ্ট মতবাদকে কেন্দ্র করে কথা বলি, তখন ‘বিষয়’ গুরুত্ব পায় না – ব্যক্তি বা মতবাদই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন নির্দিষ্ট মতবাদে সংশ্লিষ্ট মানুষ ছাড়া অন্যরা তাতে মনোযোগ দেয় না। অতিমাত্রায় সাবজেক্টিভ না হয়ে তারা যদি আরেকটু অবজেক্টিভ হতেন, ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক না হয়ে তারা যদি আরেকটু বিষয়কেন্দ্রিক হতেন, তবে আরও বেশি মানুষকে তারা নিজের কথা শুনাতে পারতেন।

আমাদের সমাজে এত বিচ্ছিন্নতা এত মেরুকরণ আগে কখনও দেখি নি। সবাই তাদের মতো করে ঘটনাকে ব্যাখ্যা করে। কেউ বক্তার অবস্থান থেকে বিষয়কে উপলব্ধি করতে চায় না। এমন মানুষ খুব কমই আছেন, যাদেরকে বিনাবাক্যে বিনাশর্তে সবাই সম্মান জানায়। অবিসংবাদিত কিংবদন্তির অস্তিত্ব এসমাজে বিরল হয়ে গেছে।

ব্লগের সঞ্চালনা প্রসঙ্গে

সরকার আজকাল সঞ্চয়কে চরমভাবে নিরুৎসাহিত করছে। সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক সেভিংস বা এফডিআর ইত্যাদিতে সুদ কমিয়ে দিচ্ছে। ফিক্সট ডিপোজিটে সুদের হার মাত্র ৩ শতাংশ – ভাবা যায়? সঞ্চয়কে নিয়ন্ত্রণ করার কারণটি খুব সহজে অনুমান করা যায়। সরকার অর্থের সঞ্চালন চায়। উন্নত অর্থনীতির ভিত্তি ‘অর্থের সঞ্চয়’ নয় – অর্থের সঞ্চালন। তরল অর্থের নিয়মিত চলাচল।

মানুষের স্বাভাবিক সুস্থতার রাসায়নিক পরিমাপক হলো, তার রক্ত সঞ্চালনা বা ব্লাড সার্কুলেশন। এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেকোন কারণে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে। নিস্তেজ হয়ে মৃত্যুর দিকে নুইয়ে পড়ে। রক্ত সঞ্চালনা স্বাভাবিক রাখার জন্য মানুষ কতকিছু করে, কতকিছুই খায়! একই স্থানে একই পোস্চারে বসে থাকলে শরীরের নির্দিষ্ট অংশটি অবশ হয়ে আসে। এর কারণ হলো, রক্ত সঞ্চালনা বন্ধ হয়ে আসা।

একই কথা বলা যায় ব্লগের সঞ্চালনা নিয়ে। নিয়মিত সঞ্চালনা না থাকলে, শুধু পোস্টদাতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় এর পাঠক – যারা সবাই ব্লগার না। দৈনিক এবং মাসিক হিট কমে যাবার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্লগ। মানসম্মত লেখাকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে নিয়ে আসা এবং অনাকাঙিক্ষত ঘটনা থেকে ব্লগকে নিরাপদে রাখাই ব্লগের সঞ্চালকের প্রধান কাজ। ব্লগ কার সহায়তায় চলে, ব্লগাররা টাকা পায় কিনা – ওসব শর্তে বাংলা ব্লগ শুরু হয় নি। ব্লগাররা টাকা পাবে এআশায় কেউ এখানে আসে নি।

সঞ্চালনা সম্পর্কে কিছু প্রস্তাব

সঞ্চালক নামটির সাথেই ‘গতিশীলতার বিষয়টি’ জড়িয়ে আছে। একটি পাবলিক ব্লগসাইটের স্বাভাবিক তৎপরতা ধরে রাখে এর নিয়মিত পরিবর্তন অর্থাৎ নিয়মিত সঞ্চালনা।

•সঞ্চালনা হতে পারে যান্ত্রিক
•সঞ্চালনা হতে পারে মানুষ পরিচালিত

অটোমেটেড মডারেশন দ্বারা ব্লগারদের পোস্টগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে, অনেক সময় আপত্তিকর লেখা প্রকাশ হয়ে যেতে পারে। বেশি বিপদজনক কিছু হয়ে গেলে, দিনের/সপ্তাহের একটি সময় হিউম্যান মডারেটর এসে শুধু চেক করে যেতে পারেন। সাধারণত, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে আপত্তিকর পোস্ট বন্ধ রাখার জন্য কিছু ‘প্রতীকী শব্দ’ বা বাক্যাংশ তালিকাভুক্ত করে রাখা যায়। একইভাবে তালিকাভুক্ত করে রাখা যায় ইতিবাচক ও গ্রহণযোগ্য শব্দ বা বাক্যাংশকে। যেসব পোস্টে শব্দগুলো থাকবে, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে আটকে থাকবে অথবা শর্তানুযায়ী নির্বাচিত কলামে যাবে। এক্ষেত্রেও যদি কোন ভালো পোস্ট আটকে থাকে অথবা খারাপ পোস্ট প্রকাশিত হয়ে যায়, নির্দিষ্ট সময়ের হিউম্যান মডারেটর এসে সেগুলোকে সুধরে দিতে পারেন। নিয়মিত আপগ্রেড করতে থাকলে সিস্টেম বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে: ভুলগুলো এক সময় কমে আসে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে স্বয়ংক্রিয় সঞ্চালনাকে গ্রহণ করা যায়, যদিও এতে এককালীণ কিছু খরচ জড়িত আছে।

হিউম্যান মডারেশন কঠিন, অনিয়মিত, ধারাবাহিকতাহীন এবং ত্রুটিযুক্ত। মানুষ দ্বারা পরিচালিত কোন কিছুই ত্রুটিমুক্ত এবং নিয়মিত হতে পারে না। ‘মানুষ মাত্রই ভুল’ কথাটি দিয়েই বুঝা যায় মানুষের ক্ষমতা কত সীমিত। তার পক্ষে একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর পোস্ট প্রকাশ/নির্বাচন করা অসম্ভব না হলেও কঠিন (এখানে সঞ্চালক বেতনভুক্ত বা অবৈতনিক সেটি বিবেচ্য নয়)। লেখার মান অনুযায়ি নির্বাচিত কলামে দেওয়া অথবা স্টিকি করার কাজটি হিউম্যান মডারেটরের মাধ্যমে হতে পারে। শুধুমাত্র বিশেষ লেখাকে নির্বাচন/স্টিকি করার জন্য একজন মানুষ এসে সঞ্চালনার কাজটি করে যেতে পারেন। তবে একাজটিও অটোমেটেড মডারেশন দ্বারা করা যায় এবং করতে দেখা যায়।

তারপরও হিউম্যান মডারেটর দ্বারা নিয়মিত সঞ্চালনার কাজটি করতে হলে সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় বিবেচনায় রাখতে হয়। আমার দৃষ্টিতে মাত্র ৪টি বিষয় নিয়মিত তদারকি করলে যে কোন পরিস্থিতিতে একটি ব্লগসাইট অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে। তা হলো…..

১. নিয়মিতভাবে ব্লগ পোস্টগুলো প্রকাশিত হবে
২. গুরুত্বপূর্ণ পোস্টগুলো নির্বাচিত কলামে যাবে
২. দিনের/সপ্তাহের বিশেষ কোন পোস্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষণে যাবে/স্টিকি হবে
৪. অবাঞ্চিত/ অনাকাঙ্ক্ষিত/ নিয়মবহির্ভূত পোস্ট বাতিল হবে

একাজগুলো নিয়মিত না হলেই ব্লগের গতি কমে আসে। ঝিমিয়ে পড়ে। গতিহীন হয়ে পড়ে। ব্লগার/প্রদায়করা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন। অভিজ্ঞ ব্লগাররা লেখা অন্যত্র প্রকাশ করেন। নবীন লেখকরা প্রেষণা হারিয়ে ফেলেন: অন্য কিছুতে মনযোগ দেন। অথবা আর মন্তব্যও করতে চান না। ব্লগে সচল ব্লগারের সংখ্যা দিন দিন কমতে থাকে। ব্লগার দ্বারাই ব্লগ সাইটের উন্নয়ন। ব্লগারই পাঠক, ব্লগারই হিটদাতা। ব্লগারই ব্লগসাইটের অত্যাবশ্যক অংশ।

সঞ্চালনা নিয়মিত থাকলে ব্লগার বা প্রদায়করা স্বাভাবিক মাত্রায় লেখতে থাকেন এবং পোস্ট প্রকাশ করতে থাকেন। অন্যের লেখায় মন্তব্য দেবার বিষয়টিও এর ওপরেই নির্ভরশীল। সেরা মন্তব্যকারীকে স্বীকৃতি দেবারও প্রয়োজন নেই, অথবা সৃজনশীল লেখা প্রতিযোগিতারও প্রয়োজন নেই।

সঞ্চালক মাত্র চারটি দায়িত্ব নিয়মিতভাবে করে যেতে পারলে, ব্লগে তৎপরতা বাড়বে এবং ব্লগে হিট বাড়বে। এমন ব্লগসাইটকে বিজ্ঞাপনদাতার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয় না। সময় উপযোগী নেতৃত্ব এবং নিয়মিত সঞ্চালনা থাকলে ব্লগ কারও বোঝা হবার কথা নয়, ব্লগ নিজেই নিজের খরচ যোগাড় করতে পারার কথা।

শেষ কথা

ব্লগ শুরু হয়েছিল বাংলা ভাষায় বাধহীন আত্মপ্রকাশকে প্রমোট করার জন্য। নিঃস্বার্থে। ব্লগাররাও এসেছেন নিঃস্বার্থে। লেখেছেন হৃদয় উজাড় করে। ব্লগে একটি লেখা দেবার জন্য অনেকে বিদ্যাসাগর বনেছেন। ঘটিয়েছেন একটির পর একটি বিপ্লব। ব্লগের লেখাকে কপি করে প্রকাশ করছে বিখ্যাত প্রিন্টমিডিয়াগুলো। কারণ, সামু আজ বাংলা ভাষায় সবচেয়ে বড় তথ্যভাণ্ডার – এটি কোন উইকিপিডিয়ার কাজ নয়।

সামুর জন্য কেউ কীভাবে SEO করেছিল জানা নেই, কিন্তু পেইজ ভিউ বলুন, ওয়েভ ট্রাফিক বলুন, এক সময় বাংলাদেশে সামুকে প্রথম কয়েকটির মধ্যে দেখা যেতো। কিন্তু সামু কি পাঠক/ব্লগারদের পরিবর্তিত প্রয়োজন এবং চলমান ট্রেন্ডকে ধারণ করতে পেরেছে? ভোক্তার চলমান প্রয়োজনকে বুঝতে না পারার জন্য মোবাইল ফোন জায়ান্ট নোকিয়ার পতন হয়েছিল – এখন পুনর্জনম নিয়েও টিকতে পারছে না।

আজ সামু কোথায়? অথচ আজও বাংলায় কোন বিষয়ে ‘গুগল সার্চ’ দিলে সামহোয়্যারইন ভেসে ওঠে। প্রশ্ন হলো, এটি কি ‘অকাল কিংবদন্তী’ অর্জন করবে? নাকি সময়ের সাথে নিজেকে সুধরে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবে? প্রশ্ন থাকলো ব্লগারসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি।

পাবলিক ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া: ১৫ অগাস্ট ২০১৭

———————————————
*ব্লগে লেখা ও ব্লগের সঞ্চালনা সম্পর্কে নতুন/পুরাতন চিন্তার সমন্বয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে এই পোস্ট।

সামু’র প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে ‘আমার’ সাক্ষাৎকার

 

১। আমাকে আমার প্রশ্ন: কী খবর… ব্লগ নিয়ে এত গবেষণা করলেন, অথচ এখন ব্লগে দেখাই যাচ্ছে না কেন?
আমার উত্তর: গবেষণা করি নি – পড়াশোনা করেছিলাম। তারপর যা উপলব্ধি হয়েছে, তা-ই তাৎক্ষণিকভাবে লেখে দিয়েছি।

২। আআপ্র: তার মানে হলো, আপনি আজকাল আর পড়ছেন না! তাই লেখছেন না? কী লজ্জার বিষয়!
আউ: আংশিক সত্য। আজকাল কাজের পড়া ছাড়া ‘পড়ার জন্য পড়া’ তেমন হচ্ছে না। কাজের পড়ায় বেশি আনন্দ পাচ্ছি মনে হচ্ছে। কাজকর্ম বিষয়ক লেখাগুলো ব্যক্তিগত ব্লগে তুলে রাখছি।

৩। আআপ্র: এখানে নয় কেন? যা ব্যক্তিগত ব্লগে দিতে পারেন, সেটি তো এখানেও প্রকাশ করতে পারেন। ব্লগের মায়া কি কমে গেলো?
আউ: এখানে প্রকাশ না করার অনেক কারণের মধ্যে একটি হলো, পাঠকের মন্তব্যের উত্তর দিতে পারবো না বলে। ব্লগের জন্য আগের মতোই মায়া আছে এ কথা বললে মিথ্যা হবে। তবে ব্লগকে মন থেকে মুছে ফেলি নি। এটা অনেক ব্লগারের জন্য সহজ কাজ নয়। তবু মায়া একটু কমে গেছে। মায়া-মহব্বত-ভালোবাসা প্রেমিকার প্রতিও এক থাকে না সবসময়।

৪। আআপ্র: তো বলছেন, মায়া কিছু কমেছে। সবকিছুর পেছনে কারণ থাকে। ব্লগের প্রতি মায়া কমে যাওয়ার কারণটা কি সহব্লগারদের জন্য শেয়ার করা যায়?
আউ: কাজের ব্যস্ততা আছে, এটি আগেও ছিল। তবু একে বাতিল করা যায় না। এটি একটি কারণ। অন্যদিকে, নানাভাবে ব্লগও তার আকর্ষণ হারিয়েছে। কর্তৃপক্ষ বা প্রতিষ্ঠাতাদেরও ব্লগের প্রতি মায়া কমেছে। এটিও প্রকৃতির নিয়ম। অথবা বলা যায়, তাদের কর্মপন্থায় পরিবর্তন এসেছে।

৫। আআপ্র: এসব কারণ দেখিয়ে যদি ব্লগে না আসেন, তবে কি বিষয়টি একটু আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেলো না? ব্লগের প্রতি ব্লগারের দায় বলে তো একটা বিষয় আছে। সেটি কি আপনি করছেন?
আউ: অভিযোগ মেনে নিচ্ছি। আত্মকেন্দ্রিক সমাজের প্রভাব আমার ওপরও পড়েছে। কিন্তু আমার অধিকাংশ পোস্টই ব্লগ এবং ব্লগের উন্নয়ন বিষয়ক। ব্লগের প্রতি ব্যক্তিগত দায় থেকে ব্লগার এবং কর্তৃপক্ষ সবারই জন্য লেখেছি। এই ব্লগেই আছে। মুছে ফেলিনি। সময় বদলেছে, ব্লগারদেরও রকম বদলেছে। পড়ার অভ্যাস বদলেছে। মাঝেমাঝে মনে হয়, আমার লেখার প্রাসঙ্গিকতা এসময়ের ব্লগে নেই। এর দায়ও হয়তো আমারই।

৬। আআপ্র: এসব যুক্তি ব্লগে না আসার কারণ হিসেবে যথেষ্ট নয়। যা হোক, এবার একটি ‘সার্বজনীন প্রশ্ন’ করি – ব্লগারের সাক্ষাৎকার নিলে এটি জিজ্ঞেস করতে হয়। ‘ব্লগ আর আগের মতো নেই’ এবিষয়ে আপনার অভিমত কী? 
আউ: সহমত। ব্লগ আর আগের মতো নেই, এটি সার্বজনীন সত্য কথা। ব্লগ হলো সময়ের সাক্ষী। সময় ও নদী এক জায়গায় থাকে না। অতএব ব্লগও আর আগের মতো নেই। তবে আক্ষেপের বিষয় হলো, ব্লগ খারাপ আর শূন্যতার দিকে মোড় নিয়েছে। এটি হতে দেওয়া উচিত ছিল না। কিছু মানুষ বা প্রতিষ্ঠান থাকা উচিত, যারা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবে। তারা আজ তেমনভাবে নেই। মান্না দে’র কফিহাউস (কলকাতার কলেজ স্ট্রিট) যেমন স্নিগ্ধতা হারিয়ে শুধুই প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ব্লগের অবস্থা আজ ঠিক তেমন।

৭। আআপ্র: এর কারণ কী? কী উপায় আছে এ থেকে বের হবার? 
আউ: এ থেকে বের হবার কোন উপায় দেখছি না, কারণ এমন পরিস্থিতি একদিনে একজনের মাধ্যমে হয় নি। এটি অনিবার্য পরিণতির দিকে যাচ্ছে। ভেতরে হয়তো অনেক কারণই আছে, কিন্তু বাইরের (সামাজিক ও রাজনৈতিক) কারণগুলো বড়ই খতরনাক। এখানে প্রতিরোধ সৃষ্টি করা কঠিন। তবু সামু কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ যে, অন্যান্য ব্লগের মতো একে তারা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় নি। যেকোন ভাবে চালিয়ে রেখেছে। দু’একজন অন্তপ্রাণ ব্লগার আছেন, যারা এখনও আগের মতোই লেখে যাচ্ছেন, মন্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। দু’এক বছর যাবত লেখছেন, এমন কিছু দায়িত্বশীল ব্লগার আছেন। আর নতুনেরা তো বরাবরই সুপার একটিভ। হয়তো তাদের জন্যই ব্লগটি টিকে আছে।

৮। আআপ্র: ব্লগের অব্স্থা এর চেয়ে কি ভালো হতে পারতো না? অন্তত সামু তো সব থেকে আলাদা! 
আউ: হয়তো হতে পারতো, কারণ সব বাংলা ব্লগের অবস্থা ম্রিয়মান। বন্ধ অথবা সংকোচিত। এর কিছু সুবিধা এ ব্লগ পেতে পারতো। বাংলা ব্লগের পাইয়োনিয়ার হিসেবে এব্লগের অবস্থা আরও ভালো হতে পারতো। এবং আমি বলছি, ভালোই তো। অন্য যেকোন বাংলা ব্লগের চেয়ে সামু’র অবস্থা নিঃসন্দেহে ভালো। তবে এখানে যারা ৪/৫/৭ বছর আগে ব্লগিং করেছেন/করছেন তাদের স্বপ্ন আর আকাঙ্ক্ষা ছিল হয়তো আরও ওপরে। তারা হয়তো একটু বেশিই প্রত্যাশা করে ফেলেছিল!

৯। আআপ্র: সামু কি কালজয়ী প্লাটফর্ম হতে পারে না? ব্লগার সহযোগে সামু কি সময়ের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করতে পারে না?
আউ: অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষকে এভাবে চাপ দেওয়া যায় না। অনেকে শুরু করতে পারে, চালিয়ে যেতে পারে না। শুরু করার জন্য যে ধরণের মেধা প্রতিভা প্রতিশ্রুতিশীলতা দরকার, চালিয়ে যাবার জন্য হয়তো একটু ভিন্ন ধরণের চালিকা শক্তি বা এড্যাপ্টাবিলিটি প্রয়োজন হয়। ব্লগাররা তো অধিকাংশই ঘরকুনো, তা না হলে তারা ব্লগ লেখবে কীভাবে। ব্লগ টিকিয়ে রাখতে মাঝেমাঝে বাইরের শক্তিরও দরকার হয়।

১০। আআপ্র: এত বড় উত্তর দিলে তো পাঠক পড়বে না। যাহোক, সংক্ষেপে সামু’র প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী মূলক একটি বক্তৃতা দিন! 
আউ: সামু আজও যেভাবে দাঁড়িয়ে আছে, সেটি বাংলা ভাষার জন্য এবং বাংলাভাষী লেখক-পাঠকের জন্য সৌভাগ্য ও গৌরবের বিষয়। একাদশ প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে সামহোয়্যারইন ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা, কর্মী এবং ব্লগার-পাঠককে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা! সে সাথে মহান বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা!!

*পাবলিক ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৬

কাব্যকণা/ চিন্তাকণা

ছবি আঁকার ক্যানভাসটি হাঁটুজলে তিনপায়া স্ট্যান্ডের ওপর আটকে আছে। আর আমি আটকে আছি তোমাতে…! অথচ কী দুর্ভাগ্য তুমি কিনা আটকে আছো আকাশের তারা গণনায়। তুমি কি আজও বিশ্বাস করো না যে, বিশ্বের সবগুলো সৌরজগতের গ্রহ-নক্ষত্রের কক্ষপথ আটকে আছে শুধু একটি জায়গায়!

.

২)
একদিন প্রজাপতি হবো…
ভুলে যাবো এপর্বের সব বেদনা
সৃষ্ট হবে নূতন আমি’র;
তোমাকে নিয়ে হবে নূতন সূচনা।

.

৩)
তোমাকে ভালোবাসা বদঅভ্যাসে রূপ নিয়েছে…
ছেড়ে দিতে চাই তবু কেন যে পারি না!

.

৪)
বেড-ল্যাম্পের ঢাকনার মতো মস্ত আকারের উজিরটুপি পড়ে একদল মধ্যযুগী এসে আমাকে বললো, “জাহাপনা! আপনার বয়স বাইরা যাইতেছে … কথাবার্তা খিয়াল কইরা কইবাইন। কইবাইন অনেক কম। লেখবাইন আরও কম। শোনা তো একদমই নিষেধ! …একদম খাইয়ালবাম!” ঘুম ভেঙ্গে দেখি বেড-ল্যাম্পটি নেভানো হয় নি! [মার্চ ২০১৭]

.
৫)
প্রতিটি ফাগুন যেন জীবনের বার্ষিক নবায়ন… একবছর বেঁচে থাকার পুরস্কার। ফুল ফল প্রাণী আর মানুষকে একযোগে আন্দোলিত করে এই ফাগুন, যার বর্ধিত রূপ হলো চৈত্র আর বৈশাখ। অতএব ফাল্গুনকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে ঘোষণা দেবার দাবিতে যেকোন মুহূর্তে আন্দোলনের ডাক দিয়ে বসতে পারি!
(ফেইসবুক স্ট্যাটাস ২০/২/২০১৭))

.

৬)
বহুরূপী মানুষের ভিড়ে মুখোশ একটি চিরস্থায়ী অবয়ব। মনের বা মানের পরিবর্তনে এর কোন পরিবর্তন হয় না। মুখোশের নির্মোহ সৌন্দর্য্যে আমি মুগ্ধ হচ্ছি দিনকে দিন। এরচেয়ে স্বচ্ছ বা নির্দোষ আর কী হতে পারে! এমন একটি রূপ ধারণ করতে খুবই ইচ্ছে হয়, যা পরিবর্তন বিবর্তন বা রূপান্তরের ঝুঁকি থেকে মুক্ত। এমন কিছু হতে ইচ্ছে হয়, যার পর আর কিছু হবার প্রয়োজন থাকবে না।
(ফেইসবুক স্ট্যাটাস ১৫/২/২০১৭)

.

৭)
Keep silent and never try to promote others… be selfish and never try to work for the bigger majority… never try to improve quality in works… never try to talk in favor of morality, honesty, transparency etc… never try to promote high standards… but accept whatever is available and say ‘yes yes’ to seniors in all situations. My friend…your life will be a lot easier and full of friends. However, only one thing you’ll have to sacrifice… that is ‘a clean soul’ within you.
Already following those rules? Excellent! You are the smartest guy in the present day world! Cheers!!!
(Remember “Dr Faustus” of Marlowe?)
৩১/১/২০১৭

.

৮)
অন্তত আর একদিন আমরা সবাই একসাথে মিলিত হবো। একই বন্ধুদের একই সেই ব্যাচ। ঠিক আগের জায়গায়, আগের বিষয়গুলো নিয়ে আমরা আলোচনায় মেতে ওঠবো। হাসাহাসি হইহুল্লা করবো। আশেপাশে অথবা টেবিলের সামনে সেই আগের খাদ্যদ্রব্যগুলো থাকবে। আগের মতোই ঘড়ির কাটাকে স্বাধীনতা দিয়ে আড্ডায় হারিয়ে যাবো। আগের সেই গানগুলো ক্যাসেটপ্লেয়ারে বাজতে থাকবে। ঠিক আগের মতোই বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় সবকিছু অন্ধকার হয়ে যাবে, বন্ধ হয়ে যাবে গান। আর চাঁদের আলোয় সিলিং ফ্যানটি তখনও ঘুরতে দেখা যাবে। ঠিক তখনই জাগতিকতায় ফিরে আসবো। তখন আগের মতোই বলবো, বিদ্যুৎ চলে গেছে ভালোই হলো, এবার চলো ঘুমাতে যাই।
(ফেইসবুক স্ট্যাটাস ২২/১/২০১৭)

.

৯)
শিকাগোতে প্রেজিডেন্ট হিসেবে ওবামার শেষ বক্তব্যের শুরুতে দর্শক যেভাবে তাকে ১০মিনিট পর্যন্ত অভ্যর্থনা দিলো, তাতে আমি কেবল হাহাকার শুনতে পেলাম। এই হাহাকার আসন্ন ট্রাম্প প্রশাসনের আশঙ্কাকে মূর্ত করে দিয়েছে। ইসরায়েলি বসতির পক্ষে ভোট না দিয়ে ওবামা তার শান্তি পুরস্কারের জন্য একটু সুবিচার করে গেলেন শেষবেলায়। বিদায়… আমেরিকার সর্বশেষ প্রগতিশীল শাসক! আর কোন কালো মানুষকে কি মার্কিন শাসক হিসেবে দেখা যাবে?
(১১/১/২০১৭)

.

১০)
ফেইসবুক কবিদেরকে চেনার উপায় কী? (কয়েকটি ধারণা)
.
বিড়িমুখে মহাসুখে
উড়াই ধূম্রবৃত্ত [প্রোফাইল ফটো]
বিশ্বাস ধর্ম রাষ্ট্রের কথায় 
টলে না মোর চিত্ত। [সারবস্তুহীন আবেগী স্ট্যাটাস]
.
এদেশ এসমাজ, বলে রাখছি এই
আমার ছিল না, আমার নেই [এই মর্মে স্বদেশত্যাগী কাব্য]
.
দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা
দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু
ডিএসএলআর-নিসৃত
ফটোকাব্যে রেখে দিলাম বিন্দু। [ডিএসএলআর কবি]
.
[ঢাকা সংস্করণ: ২৮১২১৬]
[সমালোচনা নয়, একটি পর্যবেক্ষণ মাত্র]

.

১১)
পানসুপারিতে রঙিন করিয়া মুখ, গাড়োয়ান কহিলো, হুজুর ঘুমাইবার খায়েস থাকিলে আমার নিকটে বসা যাইবে না। আমিও ছাড়িবার পাত্তর নই, আসন ধরিয়া রাখিলাম। রাত্তির দ্বিপ্রহরে পহুচিলাম এমন এক গন্তব্যে, যেখানে রাত্তিরের ঘুম নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু প্রভাত হইতেই দেখি সবকিছু ছিল স্বপ্নমাত্র! আবারও রাত্তিরের প্রতীক্ষায় শুরু হইল দিবস। (ঘাটাইল ভ্রমণ/ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৬)

.

১২)
বিনোদন মানুষের সহজাত চাহিদা, কিন্তু বাঙালির বিনোদনের বড়ই অভাব। কিছু মানুষের প্রিয় বিনোদন হলো অন্যের দোষত্রুটি নিয়ে দুর্বার অনুসন্ধানে ব্যস্ত থাকা। পরস্পরের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে সেখানে নিজেকে শান্তি-প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে তারা প্রাকৃতিকভাবেই সুদক্ষ। তাদের চোখে-মুখে-অন্তরে কেবলই সমস্যা আর দলাদলির কথা। আপনি তাদের কাছে অতি দ্রুত আপন হয়ে যাবেন, যদি আপনার সংগ্রহে থাকে অন্যের দুর্বলতার কিছু নমুনা। সত্য হোক মিথ্যা হোক, স্মিতহাস্যে তারা আপনাকে সুযোগ করে দেবে আরও কিছু বলার জন্য। তারা সমস্যাবিলাসী, বিবাদপ্রত্যাশী। অগ্রগতিতে নয়, দুর্গতিতে তাদেরকে মনে হয় অধিক মেধাবী। সম্পর্ক সৃষ্টি নয়, সম্পর্ক ভাঙনে তারা কৃতীত্ব নেয়। এদেরকে চেনা যায় না, হয়তো প্রমাণও করা যায় না, কেবল বুঝা যায়। এরা সমাজ ও সংগঠনের নিরব ঘাতক।
(ফেইসবুক স্ট্যাটাস ২৩/১১/২০১৬)

আমার প্রিয় রসাত্মক ধনাত্মক উক্তিগুলো। পর্ব ৪।

 

প্রতিষ্ঠানকে আপনার শিক্ষার ওপর হস্তক্ষেপ করতে দেবেন না।  (মার্ক টোয়েইন)

কিছু মানুষ পঁচিশেই মারা যায় এবং দাফন করতে পঁচাত্তর বছর লেগে যায়।  (বেন্জামিন ফ্রাঙ্কলিন)

তাড়াতাড়ি আমাকে কিছু মদ ঢেলে দাও, যেন মনকে সিক্ত করে মহৎ কিছু বলতে পারি। (এরিস্টোফিনিস)

বিজয়ীরা মদ যোগ্যতায় লাভ করলেও, ব্যর্থদের জন্য সেটি অত্যাবশ্যক! (নেপোলিয়ান)

হয় আরেকটু মদ ঢালো, নয়তো সামনে থেকে সরো! (রুমি)

ডায়েটের প্রথম দিন:  সব চর্বিযুক্ত খাবার বাসা থেকে খালি করে দিলাম। অনেক মজা লেগেছিল! (বেনামী)

ছুটির দিনগুলোতে আমার একটাই লক্ষ্য থাকে। তা হলো, মাঝে মাঝে নড়াচড়া করা, যেন কেউ মনে না করে যে আমি মারা গেছি। (বেনামী)

জীবনে সবসময় দ্বিতীয় একটি সুযোগ থাকে, যার নাম হলো, আগামিকাল। (নিকোলাস স্পার্কস)

আমার মানিব্যাগটি পেঁয়াজের মতো – খুলতে খুলতে চোখে পানি চলে আসে। (বেনামি)

মনে রাখবেন ‘আজই’ হলো সেই ‘আগামিকাল’, যাকে নিয়ে ‘গতকাল’ আপনি চিন্তিত ছিলেন। (ডেল কার্নেগি)

 

এবারের পর্বটির অধিকাংশ ‍উদ্ধৃতির জন্য রিডার্স ডাইজেস্ট-এর কাছে ঋণী। অনুবাদ লেখকের।


রসাত্মক ধনাত্মক উক্তির তৃতীয় পর্ব।

ঢাকা ‘পৃথিবীর সেই বিরল শহরে’ রূপ নিচ্ছে যেখানে গাড়ির প্রয়োজন থাকবে না!

ঢাকা ‘পৃথিবীর সেই বিরল শহরে’ রূপ নিচ্ছে যেখানে মানুষ গাড়ির চেয়েও বেশি গতিতে চলতে পারে। ট্রাফিক জ্যাম, জলাবদ্ধতা, বারোমাসি খোঁড়াখুঁড়ি, ত্রুটিপূর্ণ/সরু রাস্তা, আগের আমলের ট্রাফিক সিস্টেম, বাইপাস বিহীন সড়ক, মাঝ রাস্তায় পার্কিং ইত্যাদি ‘সুবিধা’ ধরে রাখার কারণে ঢাকা পৃথিবীর একমাত্র আদিম শহরে ‘উন্নীত’ হতে যাচ্ছে।

গতির শহর ঢাকা/ দুর্গতির শহর ঢাকায় প্রতি ঘণ্টায় গাড়ির গতি:
৭ কিলোমিটার (২০১৭/ বর্তমানে)
২৪ কিলোমিটার (২০০৪)
৪ কিলোমিটার (২০২৫/ বিশেষজ্ঞদের ধারণা)
৫ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায় মানুষের হাঁটার গতি!
 [তথ্য প্রথম আলো – অগাস্ট/২০১৭]

 

সবাই বলে, ঢাকা শহরের কোন পরিকল্পনা নেই। উন্নয়নের বাজেট নেই। সরকারের উদ্যোগ নেই। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন এবং আরও বেশি খারাপ! আরও ‘অনেক কিছু’ নেই!

ঢাকা শহর পরিকল্পনাহীনভাবে গড়ে ওঠছে তা নয় – বরং এখানে আছে অগণিত পরিকল্পনা। রাজউক, সিটি কর্পোরেশন, পূর্ত মন্ত্রণালয়, হাউজিং কোম্পানি… এদের প্রত্যেকের রযেছে ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনা। কৌশলগত সড়ক পরিকল্পনা, পানি পয়নিষ্কাশনের ব্যবস্থাপনা, গৃহায়ন পরিকল্পনা, ডিটেইল এরিয়া প্লান আরও কত কী! সবাই নিজ নিজ পরিকল্পনা এশহরের মানুষগুলোর ওপর দেদারছে ঢালছে।

পরিকল্পনার আধিক্য আর সমন্বয়হীনতাই ঢাকা একটি ব্যর্থ শহরে পরিণত হয়েছে। শুধু যানজটেই বছরে ২০,০০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে এদেশের মানুষ। [ডেইলি স্টার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬]

 

উদ্যোগেরও অভাব নেই। উদ্যোক্তাদের কেউ নদী ভরাট করে বাড়ি বানায়, আবার কেউ বাড়ি কেটে খাল বানায়। নদী শেষ তাকে নিয়ে কারও ভ্রুক্ষেপ নেই, নতুন খাল খননে লেগেছে একটি কর্তৃপক্ষ। কেউ উচ্ছেদ করছে, কেউবা পুনর্বাসন করছে; কেউ সংস্কারের কর্মসূচি নিচ্ছে, কেউবা তার বিপক্ষে ধর্মঘট দিচ্ছে। একই সরকারের অধীনে। আরেকটি পক্ষ আছে যারা বর্ষা এলেই লেগে যায় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িতে। বলে ‘উন্নয়নের কাজ চলিতেছে’। ‘সাময়িক সমস্যার জন্য দুঃখিত – কর্তৃপক্ষ’। বারোমাসের কাজকে বলা হয় ‘সাময়িক’। তাছাড়া ওই কর্তৃপক্ষটা যে আসলে কে বা কারা, সেটিও বিরাট প্রশ্ন।

বাজেটের কথা বলছেন? বাংলাদেশে সেক্ষেত্রে পৃথিবীর ধনী দেশের একটি, কারণ এখানে প্রতি কিলোমিটারে নির্মাণ খরচ সর্বোচ্চ। এবং মাত্র ছ’মাস পর সেই একই রাস্তার সংস্কারের জন্য আরেকটি টেন্ডার আসে।

বাংলাদেশ প্রতি কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের খরচ
৫৬ কোটি টাকা: উদাহরণ – ঢাকা সিলেট মহাসড়ক
৯৫ কোটি টাকা: উদাহরণ – ঢাকা মাওয়া সড়ক

ভারত: ১০ কোটি
চিন: ১২ কোটি
জমি অধিগ্রহণের খরচসহ। [খরচের তথ্য বিডিনিউস২৪ ডটকম – জুন/২০১৭]

 

কুড়িল বিশ্বরোড থেকে পূর্বাচলের রাস্তা দিয়ে ২/৩ কিলোমিটার এগুলেই একটি সুন্দর ব্রিজ চোখে পড়বে। নাম তার বোয়ালিয়া ব্রিজ। নদীর নাম বোয়ালিয়া। নদীতে পানি নেই – বোয়াল তো দূরের কথা! সেই নদীকে সীলগালা করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাস্তার পাশের দোকানপাট, বাড়িঘর সব ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। সেখানে খাল হবে! ঢাকার প্রাকৃতিক খালগুলোর একটিরও অস্তিত্ব নেই – এখানে ভিটে উচ্ছেদ করে নতুন খাল হবে!

এভাবে এগিয়ে চলছে উল্টো রথে প্রাচীন পথে ঢাকার ‘অগ্রযাত্রা’। নাকি পশ্চাৎযাত্রা! অগত্যা আমরাও আছি এর অংশ হয়ে। আপনিও আছেন সহযাত্রী হয়ে! গাড়িতে চলার খরচ বেঁচে যাবে আপনার। ক্রেডিট গউস টু হু?

 

 

*পাবলিক ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া: ২৫ অগাস্ট ২০১৭

—–
ফেইসবুক স্ট্যাটাসটি শেষে এত দীর্ঘ হলো যে, ব্লগে পোস্ট করতে হলো!

পাঠপরিকল্পনা বা লেসন প্লানিং করা শিক্ষকদের জন্য কতটুকু আবশ্যক?

পাঠ্যবই বা সমাধান দেখে পড়িয়েছেন এমন শিক্ষক যেমন দেখেছি, তেমনই দেখেছি আত্মনির্ভরশীল তুখোড় শিক্ষক। ক্লাসের প্রতিটি মিনিটকে তারা প্রয়োগ করেছেন পরিকল্পিত উপায়ে। তাদেরকে আমি কর্মজীবনেও ভুলতে পারি না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পর্যন্ত আমি পাঠপরিকল্পনার প্রচলন দেখেছি। আমার চোখে যারা সফল শিক্ষক ছিলেন, তাদেরকে প্রত্যেককেই পরিকল্পনামাফিক ক্লাস নিতে দেখেছি। কিন্তু হালে অনেকেই আমাকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং করতে পেরেছেনও। তারা বলছেন, এটি অহেতুক কালক্ষেপন – শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করার পর শিক্ষক আর পাঠ্যপুস্তক এ দু’য়ে মিলে সৃষ্টি হয় জীবন্ত পাঠপরিকল্পনা। সেখানে আরেকটি লিখিত পরিকল্পনা মানে কী! এসব বিতর্ক নিয়েই বর্তমান লেখাটি।

কার্যকর পাঠদান মানেই হলো পরিকল্পনাভিত্তিক পাঠদান। পৃথিবীর সফল ক্লাসরুম টিচিংগুলো সম্পন্ন হয়েছে পরিকল্পনামাফিক পাঠদানের ফল হিসেবে। কিন্তু আমাদের দেশে ‘প্রদর্শনী বা ডেমোনস্ট্রেশন ক্লাস’ ছাড়া পরিকল্পনাভিত্তিক পাঠদানের প্রচলন খুবই কম। শিক্ষকতাকে পেশাদারী মনোভাব নিয়ে গ্রহণ না করার কারণে অনেকে পাঠপরিকল্পনাকে অভ্যাসে পরিণত করতে পারেন না। বিএড অথবা এমএড পর্যায়ে পাঠপরিকল্পনার ছবক পেলেও নিজ নিজ শ্রেণীকক্ষে সেটি প্রয়োগ করার অভ্যাস অনেক শিক্ষকের নেই।

ইতিবাচক কারণেই অনেকে পাঠপরিকল্পনা করতে চান না। একটি কারণ হলো, অতি আত্মবিশ্বাস। কেউ কেউ আবার দু’এক বছর শিক্ষকতা করে মনে করেন, পাঠপরিকল্পনা করার মতো নিম্নস্তরে তারা আর নেই।

পাঠপরিকল্পনা মূল বিষয়গুলো হলো:

  • কী পড়াবেন
  • কীভাবে পড়াবেন এবং
  • কীভাবে মূল্যায়ন করবেন

এসব দ্বিধা্দ্বন্দ্বের সঠিক উত্তর না নিয়ে শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করার মানেই হলো আত্মপ্রবঞ্চনা। শিক্ষার্থীর প্রতিও প্রতারণা।

কিন্তু এই পাঠপরিকল্পনা বা লেসনপ্লান নিয়ে পেশাদার শিক্ষকদের মনে আছে প্রচণ্ড দ্বিধা আর সিদ্ধান্তহীনতা। কেউ কেউ মনে করেন সুদক্ষ শিক্ষকদেরকে পাঠপরিকল্পনা করতে হয় না। কিন্তু অন্যরা বলেন, দক্ষতার শুরুই হয় পরিকল্পনাভিত্তিক পাঠদানের ফলে। পেশাদারিত্বের কোন্ স্তরে গেলে পাঠপরিকল্পনা ছাড়া পাঠদান করা যায়, এবিষয়ে আছে অনেক মতভেদ।

 

লেভেল ১/ অনেক গুরুত্বপূর্ণ:

আপনি যদি নতুন শিক্ষক হন, তবে পরিকল্পনাহীন শ্রেণীকক্ষকে মনে হবে একটি নরক অথবা অপরিচিত জঙ্গল। কীভাবে পথ অতিক্রম করবেন আগে থেকে ছক কাটা না থাকলে নির্ঘাৎ বাঘের মুখে। মিশ্র সামর্থ্যের একটি শ্রেণীকক্ষে পরিকল্পনাহীন শিক্ষাদান আপনার জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে। শিক্ষার্থীর ধারণ ক্ষমতা, পূর্বজ্ঞান ইত্যাদি সম্পর্কে কোনই ধারণা রাখলেন না, অকষ্মাৎ শুরু করলেন আপনার বক্তৃতা। এটি শিক্ষার্থীর মনে বিভ্রান্তি, প্রশ্ন, অযাচিত কৌতূহল এবং বিব্রতকর প্রশ্নের সৃষ্টি করতে পারে।

শ্রেণীকক্ষে প্রবেশের পূর্বে কী পড়াবেন, কীভাবে পড়াবেন এবং কীভাবে শিক্ষার্থীদের অর্জন যাচাই করবেন – এ সম্পর্কে পুরোপুরি একটি ধারণা নিতে হবেই। পাঠপরিকল্পনায় বা লেসনপ্লানে ঠিক ওই বিষয়গুলোই একটি কাঠামো আকারে পরিকল্পনা করতে হয়। পরিকল্পনা থাকলে নিশ্চিন্তে আপনি পথ অতিক্রম করতে পারবেন এবং শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাব দিতে অথবা অযাচিত প্রশ্নকারীকে থামিয়ে দিতে আপনাকে কালক্ষেপণ করতে হবে না।

পরিকল্পনা মতোই পাঠদান চলবে, সেটি নয়। পাঠদানের সময় আংশিক অথবা পুরোপুরিই পরিবর্তন হতে পারে। সেটিও করতে আপনাকে সাহায্য করবে একটি পূর্বপ্রস্তুত পাঠপরিকল্পনা।

আপনি একজন পুরাতন এবং অভিজ্ঞ শিক্ষক হলেও পাঠপরিকল্পনা আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এর একটি কারণ হলো, পাঠদান পর্যবেক্ষণ। আপনার পাঠদানকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে অথবা অন্যদের জন্য সেটিকে আদর্শ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে – সে রকম পাঠদানের জন্য একটি পূর্বপরিকল্পনা অত্যাবশ্যক। পাঠপরিকল্পনা দেখে আপনি একজন শিক্ষকের অনেককিছু বলে দিতে পারবেন। তার শিক্ষাদানের কৌশল, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সামর্থ্য, শিক্ষার্থীর প্রতি তার মনোভাব – অনেক কিছু।

পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট পাঠ্যবইটিও শিক্ষার্থীর সার্বিক সামর্থ্য বা চাহিদা চিন্তা করে প্রণীত হয় না। সেখানে শিক্ষককে কিছু-না-কিছু করতেই হয়। শিক্ষককে সহজীকরণ করতে হয়, দৃষ্টান্ত প্রস্তুত করতে হয়, মূল্যায়নের জন্য পর্যায়ক্রমিক প্রশ্নপত্র তৈরি করতে হয়। এগুলোর কোনটাই হয়তো পাঠ্যবইয়ে নেই। এসব ক্ষেত্রে নতুন-পুরাতন, অভিজ্ঞ-অনভিজ্ঞ সবার জন্যই পাঠপরিকল্পনা আবশ্যক।

 

লেভেল ২/ তত গুরুত্বপূর্ণ নয়

দীর্ঘ সময় ধরে প্রকাশ, পুনঃপ্রকাশ, পুনঃসংস্করণ, পরিবর্ধন ইত্যাদি কারণে কিছু কিছু পাঠ্যবই নিজে থেকেই শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী-বান্ধব হয়ে থাকে। সেখানে শিক্ষকের কাজ শুধুই অনুসরণ করে যাওয়া।

কিছু পাঠ্যবইয়ের সাথে ‘শিক্ষক সহায়িকা’ থাকে। শিক্ষক যদি আন্তরিকভাবে সেই শিক্ষক সহায়িকা পড়েন এবং প্রাসঙ্গিকভাবে শ্রেণীকক্ষে প্রয়োগ করতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে পাঠপরিকল্পনার প্রয়োজন কমে আসে।

অভিজ্ঞতার এই পর্যায়ে শিক্ষক পার্বিক বা টার্মিনাল লেসনপ্লান করতে পারেন। তাতে একটি সেশনে/টার্মে যাবতিয় পাঠ ও পার্বিক পরীক্ষার পরিকল্পনা অন্তর্ভূক্ত থাকে। এই দৈনিক পাঠপরিকল্পনার সমন্বিত রূপ। টার্মিনাল লেসন প্লানে গৃহীত সিলেবাস মোতাবেক পাঠ্যবিষয় সংক্রান্ত যাবতিয় পরিকল্পনা সংক্ষেপে তুলে রাখেন। এসব ক্ষেত্রে দৈনিক পাঠপরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে যায়।

অল্প সময়ের নোটিসে আপনাকে একটি ক্লাস নিতে হলো, অথবা অন্য কোন শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে তার ক্লাসটি আপনি নিচ্ছেন, সেক্ষেত্রে পাঠপরিকল্পনা করা কঠিন। এরকম পাঠদান থেকে আপনার কাছ থেকে প্রত্যাশাও হয়তো কম থাকে।

একই বিষয়ে পাঠদান করে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকলে লিখিত পরিকল্পনা না থাকলেও পাঠদান বাধাগ্রস্ত হয় না। শুরুতে ৯০% সময় ব্যয় করতেন আর ১০% সময় ব্যয় করতেন শ্রেণীকক্ষ ব্যবস্থাপনায়। অভিজ্ঞতার সাথে এখন সময় বদলেছে। আপনি ৯০% সময় ব্যয় করেন ব্যবস্থাপনায় এবং মাত্র ১০% সময় নিয়ে আপনি পরিকল্পনা করতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে শিক্ষকের মস্তিষ্কে একটি পাঠপরিকল্পনা তৈরি হয়ে যায়।

 

লেভেল ৩/ একদম গুরুত্বপূর্ণ নয়

একই বিষয়ে একই পাঠ্যবই নিয়ে পাঠদান করে আসছেন বহুদিন। হয়তো শুরুর দিনগুলোতে পাঠপরিকল্পনাও করেছিলেন। এখন আপনি জানেন, কোন্ অধ্যায়ে শিক্ষার্থীদের সমস্যা হয় এবং কোন্ অধ্যায়গুলোতে তত সময় দিতে হয় না। আপনি জানেন, পাঠ্যবই এবং শিক্ষার্থীদের সামাজিক এবং ধারণাগত পার্থক্য; জানেন তাদের উপলব্ধি করার সামর্থ্য। এসব ক্ষেত্রে লিখিত পাঠপরিকল্পনায় সময় নষ্ট না করে সরাসরি পাঠদানের প্রতি মনোনিবেশ করা জরুরি।

এমন একটি পর্যায়ে শিক্ষকদের আসতে পারাটাও একটি শ্রমসাধ্য ব্যাপার। এটি অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ স্তর। শিক্ষকতার প্রাথমিক পর্যায়ে যারা প্রচুর পাঠপরিকল্পনা করেছেন, তারাই এক সময় পাঠপরিকল্পনাকে অগ্রাহ্য করতে পারেন।

লেসনপ্লান ‘একদম গুরুত্বপূর্ণ নয়’ এরকম স্তর নিয়ে একাডেমিশিয়ানদের মধ্যেও মতভেদ আছে। সবাই পাঠপরিকল্পনার পক্ষে – সেটি লিখিত হোক কিংবা অলিখিত, দৈনিক হোক কিংবা মাসিক বা পার্বিক। লেসনপ্লান ছাড়া লেসন দেওয়ার চিন্তা করা যায় না।

 

বর্তমান পোস্টের চিত্ররূপ

 

লেসনপ্লান কি শিক্ষকের পেশাদারিত্ব অর্জনের প্রতিবন্ধতা?

দিনে অনেকগুলো ক্লাস নিয়ে অথবা একাধিক বিষয়ে পাঠদান করলে প্রতিটির জন্য আলাদা আলাদা পাঠপরিকল্পনা করা কঠিন। প্রতিটি বিষয়ের পাঠদান নিয়ে আলাদাভাবে মনোনিবেশ করা অত্যন্ত পীড়াদায়ক হয়ে পড়ে ব্যস্ততম শিক্ষকদের জন্য। যেসব শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব, উপস্থিত জ্ঞান, পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারার ক্ষমতা আছে, তারা প্রাথমিকভাবে লেসনপ্লানের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারেন না। অল্প সময়ে বেশি শিক্ষার্থীকে মনোযোগ দেবার জন্য তারা মানসিক শক্তির ওপর নির্ভর করেন। তারা ভুলক্রমে একে পেশাদারিত্ব অর্জনের অন্তরায় হিসেবেই দেখেন।

কিন্তু লেসনপ্লান পেশাদারিত্ব অর্জনের সোপান। এটি ৫টি সুস্পষ্ট উপায়ে শিক্ষককে উন্নততর পর্যায়ের নিয়ে যায় – ১) বিষয়ভিত্তিক পাঠদানের সামর্থ্য বৃদ্ধিতে এটি সাহায্য করে; ২) প্রয়োগ, অংশগ্রহণমূলক এবং মূল্যায়ন-ভিত্তিক পাঠদানে শিক্ষককে প্রস্তুত করে; ৩) পাঠ্যবিষয় এবং শিক্ষার্থীর ব্যাকগ্রাউন্ড ও ধারণ ক্ষমতার মধ্যে যথোপযুক্ত সেতুবন্ধন করা যায়; ৪) শিক্ষক পূর্ব থেকেই পাঠ্যবিষয় সম্পর্কে নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে উদ্দিষ্ট শিক্ষার্থীর জন্য নিজেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করতে পারেন; ৫) নিয়মিত পরিকল্পনা করার এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষক এক পর্যায়ে লেসনপ্লানের ঊর্ধ্বে ওঠে যেতে পারেন। তিনি প্রতিটি বিষয়ের মানসিক লেসনপ্লান সৃষ্টি করতে পারেন।

 

তথ্যসূত্র: বিভিন্ন উৎস; ব্যক্তিগত অনুসন্ধান এবং শিক্ষক হিসেবে অভিজ্ঞতা।

 

▶প্রাসঙ্গিক কয়েকটি পোস্ট:

যেসব কাজ করে আমাদের শিক্ষকেরা শিশুদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করছেন

শ্রেণীকক্ষ ব্যবস্থাপনার ১২টি উপায়

 

বিদেশী সাংবাদিকের ঢাকা ভ্রমণ ও যানজট বৃত্তান্ত: তৃতীয় নয়নে প্রাণের শহর ঢাকা!

বিদেশীদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের পরিস্থিতি জানার কৌতূহল সবারই থাকে। তাদের অভিমতকে একটু অন্যদৃষ্টিতে দেখতে হয়, কারণ তাদের কোন রক্তচক্ষুর ভয় নেই এবং তাই নিরপেক্ষ থাকতেও বাধা নেই। তৃতীয় নয়নে বাংলাদেশকে দেখতে তাই বরাবরই আমাদেরকে বিদেশীদের মতামতকে বিবেচনায় নিতে হয়। ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম নিয়ে লেখার জন্য নিউইয়র্ক টাইমস এর এক সাংবাদিক ঢাকায় এসেছেন, থেকেছেন এবং ঢাকার যানবাহনে ভ্রমণ করেছেন। একটি উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। ঢাকার যানজট কী মাত্রায় পৌঁছুলে সেটি বিদেশীদের গবেষণার বিষয় হয়, সেটি বুঝার জন্যই আমি আর্টিকেলটি আদ্যোপান্ত পড়ি। এমন পড়েছি অনেক, কিন্তু এবারই লেখার ইচ্ছে হলো। কেন হলো পাঠক পড়লেই বুঝতে পারবেন। শুরু।

 

সৌজন্যে: নিউ ইয়র্ক টাইমস

সেসব অব্যবস্থাপনা বিশ্বের বৃহৎ শহরগুলোতে বিপর্যয় ঘটায়, হয়তো এর মধ্যে কোনটিই ট্রাফিক জ্যামের মতো ক্ষতিকর না। এখনও ঢাকায় বসে আছি যেখানে অপর্যাপ্ত পরিকল্পনা মহাকাব্যিক পরিণতিতে পৌঁছেছে।

আমি ঢাকায় ছিলাম, বলা যায়, ঢাকার ট্রাফিক জ্যামে আটকে ছিলাম। কথাটি হয়তো অন্যভাবে বললে আরও সঠিক হবে: আমি যানজটে আটকে ছিলাম, তাই ঢাকায় ছিলাম। আপনি যদি বাংলাদেশের রাজধানীতে কিছু সময় কাটান, তবে ‘যান চলাচল’ ধারণাটিকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করবেন, এবং আপনার সংজ্ঞাটি উল্টে যাবে। অন্যান্য শহরের রাস্তাগুলোতে যানবাহন এবং পথচারি থাকে; মাঝেমাঝে রাস্তাগুলো ব্যস্ত হয়ে যায় এবং যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হয়। ঢাকার পরিস্থিতি আলাদা। ঢাকার যানজট হলো যান চলাচলের চরম পর্যায়; বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতি এত ব্যাপক এবং দীর্ঘস্থায়ী যে, এটি শহরের সাংগঠনিক নীতিতে রূপ নিয়েছে। এটি যেন শহরের আবহাওয়া, এমন এক ঝড় যা কখনও থামে না।

ঢাকার লোকেরা আপনাকে বলবে, পৃথিবীর বাকি মানুষগুলো যান চলাচল বুঝে না, কারণ মুম্বাই অথবা কায়রো অথবা লসএন্জেলেসের যানজট ঢাকার ড্রাইভারের কাছে সৌভাগ্যের মতো। বিশেষজ্ঞরা তাতে একমত। ২০১৬ সালের বিশ্বের বাসযোগ্যতা জরিপে, অর্থাৎ ইকোনোমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিট কর্তৃক প্রকাশিত জীবনের মান বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে ১৪০ শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৭, শুধু নাইজেরিয়ার লাগোস, লিবিয়ার ত্রিপলি এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার দামেস্ক শহরের ওপরে অবস্থান করছে। জরিপে ঢাকার অবকাঠামোর মান যেকোন শহরের চেয়ে নিম্ন স্তরে দেখানো হয়েছে। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মেগাসিটির মতো ঢাকা একটি ব্যস্ত শহর এবং সমাধিস্থান, যেখানে আছে বলিষ্ঠ আবাসন বাজার, ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণী এবং প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ। অভাব, দূষণ, রোগ, রাজনৈতিক দুর্নীতি, চরমপন্থীদের নাশকতা ্এবং সন্ত্রাসী হামলার কারণে জীবন এখানে নিয়ন্ত্রণহীন দুষ্পাপ্যতায় বাধাগ্রস্ত।  কিন্তু পণ্ডিত এবং উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের কাছে যানজটই ঢাকার খ্যাতিকে চিহ্নিত করেছে একবিংশ শতাব্দির পৌর অব্যবস্থানার ভয়ংকর প্রতীক, বিশ্বের সবচেয়ে বিধ্বস্ত শহর হিসেবে। এটি ঢাকাকে এক পরাবাস্তব শহরে পরিণত করেছে যা একই সাথে কর্মচঞ্চল এবং অচল; এবং এটি এক কোটি পঁচাত্তর লাখের অধিক বসবাসকারীর জীবনের ছন্দকে বদলে দিয়েছে। বেশিদিন আগে নয়, ঢাকার ডেইলিস্টার ‘যানজটে পড়লে ৫টি করণীয়’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। তাতে যেসব সুপারিশ এসেছে তা হলো “বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ”, পড়া এবং ডায়েরি লেখা।

 

যেভাবে ঢাকায় প্রবেশ এবং প্রথম অভিজ্ঞতা

আমার ঢাকার রোজনামচার প্রথম পর্বটি শুরু হয় গতবছরের মার্চে একটি রাজপথে, যা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শহরের মধ্যস্থলে গিয়ে পৌঁছেছে। আপনি যদি এই রাস্তাটি নিয়ে ইন্টারনেটে অনুসন্ধান চালান, তাহলে একটি ফেইসবুক পেইজ ওঠে আসবে যার শিরোনাম “রাজপথ থেকে নরকে, এয়ারপোর্ট রোড”। অনলাইনে দেওয়া ফটোগুলো থেকে নরকের চিত্র ফুটে ওঠে: ওপর থেকে তোলা রাস্তার আটটি লেইন জুড়ে বিপুল সংখ্যক মটরযানের এলোপাথাড়ি চলাফেরার ছবি। মনে হয়, সদ্য হাঁটতে শিখেছে এরকম কোন ক্ষুব্ধ শিশু একটি দিয়াশলাইয়ের বাক্সকে ছড়িয়ে দিয়েছে: সকালের অফিসযাত্রা শুরু হয় মহাজাগতিক এক ক্রুদ্ধ মেজাজ নিয়ে।

ছবিগুলো আমাকে চরম খারাপের জন্য মানসিক প্রস্তুতি দেয়। তারপরও ঢাকা যাবার সময় আমাকে জানানো হলো যে, শহরের যানচলাচল হবে অস্বাভাবিকভাবে হালকা। কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ বন্দি ছিল হরতালে, দেশব্যাপী সাধারণ হরতাল এবং “পরিবহন অবরোধ”। এই হরতাল আহ্বান করা হয়েছিল বিরোধীদল বিএনপি’র পক্ষ থেকে। তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নতুন নির্বাচনের জন্য চাপ দিতে চেষ্টা করছে। হরতাল, রাস্তার মিছিল এবং বিচ্ছিন্ন সহিংসতা রাজধানীর দৈনন্দিন জীবনকে স্তব্ধ করে দিয়েছে এবং শহরের লোকদের স্বাভাবিক জীবনকে সংক্ষিপ্ত করে দিয়েছে। এতে দৃশ্যত অসাধ্য সাধন হয়েছে, ঢাকার রাস্তাগুলো থেকে দীর্ঘ গাড়ির লাইন বিচ্ছিন্ন। আমার বিমান পথে একজন বাংলাদেশি এই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছিলেন “ঢাকায় হয়তো আপনি ভয়ানক যানজট পাবেন, নয়তো সত্যিই ভয়ানক যানজট পাবেন। কিন্তু হরতাল থাকলে সেখানে প্রায় কোন যানজট থাকবে না। যান চলাচল থাকবে স্বাভাবিক।”

ভয়ানক যানজট, সত্যিই ভয়ানক যানজট, কোন যানজট থাকবে না, যান চলাচল স্বাভাবিক – ঢাকায় থাকলে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই বুঝতে পারা যায় যে, ওগুলো কোন তাত্ত্বিক পরিভাষা নয়। বিমান থেকে অবতরণের পর আমি একটি ট্যাক্সি নিলাম। ট্যাক্সিটি বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই একটি গোলচক্করে পড়লো; তারপর কুখ্যাত সেই রাজপথে। সেখানে নির্ভুলভাবে যানজট ছিল: যতদূর চোখ যায় গাড়ি আর ট্রাক, এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে, রাস্তার কালোরঙের ওপর লেইন মার্কিঙয়ের কোন সম্পর্কই উদ্ধার করা গেলো না। আমার গাড়িটি সারিবদ্ধ গাড়ির ফাঁকে নাক ঢুকিয়ে রাখলো। শুরু হলো হামাগুড়ি।

বিশ সেকেন্ডের মতো গাড়িগুলো দক্ষিণ দিকে চললো। তারপর থেমে গেলো। আমার গাড়ি কয়েক মিনিট একদম নড়াচড়া করলো না। তারপর অজানা কারণে গাড়িটি আবার সামনের দিকে হামাগুড়ি দিলো। মাঝেমাঝে গাড়িগুলো বাধাহীনভাবে কয়েকমিনিট চলে, ঘণ্টায় সম্ভবত ১৫ মাইল গতিতে। কিন্তু শিঘ্রই আমরা আবার থেমে গেলাম। আমেরিকার ইন্টারস্টেইট ভ্রমণের ‘থামো-এবং-চলো’র অভিজ্ঞতা পাচ্ছিলাম, রেডিওতে ট্রাফিক প্রতিবেদকরা যেমন হেলিকপ্টারের পাখার আওয়াজের সাথে দীর্ঘ ট্রাক্টর ট্রলির কথা চিৎকার করে ‘বাম্পার-থেকে-বাম্পার’ পরিস্থিতির কথা বলে, অনেকটা সেরকম।  কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিটি কোন দুর্ঘটনার কারণে নয়। কারণ হলো, এটি ঢাকা শহর।

অনেক গরম পড়েছিল আর আমি ছিলাম জেটল্যাগগস্ত। ঘুমিয়ে পড়লাম। যখন হঠাৎ ওঠলাম, প্রায় এক ঘণ্টা হয়ে গেলো। গাড়ির গাদাগাদি আরও ঘণিভূত হলো এবং এক প্রকার উন্মাদনায় রূপ নিলো। ততক্ষণে আমরা শহরের কেন্দ্রস্থলে। প্রশস্ত রাস্তাটিতে পথচারি আর শত শত গাড়ি নিজেদের জায়গার জন্য প্রতিযোগিতা করছে। রাস্তার নাম কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ।  বাসগুলো এমন আঁটসাটভাবে যাত্রী দিয়ে ঠাসা যে, অনেক যাত্রী বাইরের দিকে ঝুলে আছে। কেউ কেউ বাসের ছাদের সিঁড়িতে ঝুলে আছে। সেখানে ছিল মালবাহী ত্রিচক্রযান, স্থানীয়ভাবে ভ্যান নামে পরিচিত। বাঁশ, তরমুজ, ধাতব পাইপ, ডিম, জীবন্ত পশুপাখি নিয়ে সেগুলো বাজারের দিকে যাচ্ছে। এবং অবশ্যই সেখানে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী যাত্রীবাহী পরিবহন রিকশা-সাইকেল ছিল। কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউর মতো বড় রাস্তায় রিকশা চলাচল আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ হলেও, নিজ নিজ উদ্দেশ্য নিয়ে রিকশাগুলো সেখানে ছিল।  রিকশার বেল ট্রাফিকজ্যামের গর্জনকে বাড়িয়ে দিলো।

ঘটনাক্রমে আরেকটি গোলচক্করে পৌঁছালাম আমরা। এবার বাঁ দিকে মোড় নিয়ে পেলাম আরেকটি সংযোগ সড়ক, পান্থপথ তেজগাঁও লিংকরোড। এখানে আমার ট্যাক্সিচালক ইউটার্ন নিলেন এবং কিছু কৌশলী হস্তচালনার মাধ্যমে আমার নির্ধারিত হোটেলের প্রবেশপথে ঢুকার সুযোগ নিলেন। একশ’ গজের প্রবেশপথটি খালি এবং প্রথমবারের মতো একটু উন্মুক্ত স্থান দেখতে পেলাম। বিমানবন্দর থেকে হোটেলের দূরত্ব সাড়ে আট কিলোমিটার। আড়াই ঘণ্টা লাগলো এটি অতিক্রম করতে। হোটেলের প্রবেশপথটি শেষ করে আমার টাক্সিচালক তার অনুভূতি প্রকাশ করলেন। “সামান্য একটু যানজট ছিল” তিনি বললেন, “ততটা খারাপ ছিল না।”

“বাংলাদেশের পরিস্থিতি দুর্যোগে আক্রান্ত জাতির মতো নয়” ২০০০ সালে লেখেছিলেন সাংবাদিক উইলিয়াম ল্যাংগউইশে। কথাটি অতিরঞ্জিত মনে হয়, কিন্তু পরিবহনে-ঠাসা ঢাকার রাস্তাকে দেখার মানে হলো দুর্যোগকে সচল অবস্থায় দেখা, অথবা বলা যায় অচল।  রাজধানী শহরের আটকে-পড়া পরিবহনগুলো এই জাতির জন্য মহাদুর্যোগের প্রতীক হয়ে আছে। বিশেষ করে বলা যায়, জনসংখ্যার বৃদ্ধি। উন্নয়নশীল দেশের মাপকাঠিতে এটি মানানসই, কিন্তু বাংলাদেশের আয়তনের তুলনায় এটি বিপর্যয়কর।

 

সৌজন্যে: নিউইয়র্ক টাইমস

ঢাকার যানজট অন্যান্য শহরের চেয়েও খারাপ হবার কারণ কী?

মূলত যানজট একটি ঘনবসতির বিষয়।  এমনটা হয়, যখন অতিরিক্ত সংখ্যক মানুষ অতি সংকীর্ণ কোন স্থানে জায়গা নিতে চায়। বাংলাদেশ হলো পৃথিবীর চরম ঘনবসতিপূর্ণ জাতির মধ্যে দ্বাদশ। কিন্তু ষোল কোটি জনসংখ্যার কারণে সেটি সবচেয়ে জনাকীর্ণ এবং তালিকার মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র দেশ। বিষয়টি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করছি: বাংলাদেশের স্থলভূমি রাশিয়ার ১১৮ ভাগের এক ভাগ, কিন্তু এর জনসংখ্যা রাশিয়া থেকে আড়াই কোটি বেশি।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা সমস্যাটি ঢাকা শহরেই প্রতিফলিত হয়েছে, কারণ বলতে গেলে ঢাকাই বাংলাদেশ। দেশের প্রায় সকল সরকারি, ব্যবসায়িক, স্বাস্থ্য বিষয়ক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এবং শ্রমবাজারের বিরাট একটি অংশ ঢাকায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে।  প্রতি বছর ৪ লাখ নতুন অধিবাসী রাজধানীতে যুক্ত হয়। এই গণ অভিবাসন ঢাকাকে করেছে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ মেগাসিটি এবং সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীলও।

যেসব মৌলিক অবকাঠামো এবং আইনের শাসন বড় শহরগুলোকে বাসযোগ্য করে, এই শহরের কোটি অধিবাসী সেসব একদমই পাচ্ছে না। ঢাকায় মাত্র ৬০টি ট্রাফিক লাইট আছে, যা কেবলই আলংকারিক; খুব কম গাড়িচালক সেগুলোকে গুরুত্ব দেয়। ঢাকার রাস্তায় অরাজকতার বড় কারণ হলো, রাস্তার অপর্যাপ্ততা।  ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন মতে, ঢাকা শহরের মাত্র ৭ শতাংশের জন্য রাস্তা আছে। (উনিশ শতাব্দির পৌর পরিকল্পনায় নির্মিত প্যারিস এবং বার্সেলোনা শহরে এই অনুপাত ৩০ শতাংশ।)  ফুটপাথগুলোতেও সমস্যা। কিছু রাস্তায় ফুটপাথ আছে এবং যা আছে তা প্রায় চলাচলে অযোগ্য  – দোকানদার এবং গৃহহীন মানুষের আবাস।

ঢাকার মতো শহরগুলোর যানজটের জন্য সাধারণ সমাধান হলো, রাস্তার ওপরে চলাচলের পরিবর্তে রাস্তার নিচে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা।  কিন্তু ঢাকায় কোন ভূগর্ভস্থ রাস্তা নেই এবং নির্মাণেরও কোন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেই।  এ সমস্যাটি আরও তীব্র হয়েছে মর্যাদার প্রতীক হিসেবে প্রদর্শিত ব্যক্তিগত গাড়িগুলোর কারণে, যা শহরের মধ্যবিত্তদের প্রচলিত মাধ্যম। এতে প্রতি বছর হাজার হাজার গাড়ি ঢাকার রাস্তায় যুক্ত হচ্ছে।

সরকারের নিজস্ব হিসেব মতে, ঢাকার যানজটের কারণে প্রতি দিন ৩২ লাখ শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং এটি দেশের অর্থনৈতিক আয় থেকে কোটি কোটি টাকা লোকসান যাচ্ছে। এই যানজট আরেক প্রকার ক্ষতি নিয়ে আসছে ঢাকাবাসীর জীবনে ও মননে।  বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নগর এবং অঞ্চল পরিকল্পনা’ বিষয়ক অধ্যাপক সারওয়ার জাহান বলেন, “শহরটি জটিল হয়ে যাচ্ছে। যাতায়াতের সমস্যার কারণে মানুষ কারও সাথে সাক্ষাৎ করতে পারে না। শুধু প্রয়োজন হলেই বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া হয়। তাতে অনেক সময় চলে যায়।”

ঢাকার যানজটকে ‘অসুবিধা’ বলা এক প্রকার ভুল; এমনকি ‘দুর্যোগ’ বললেও সহজ হয়ে যায়।  যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্থাপত্য ও পরিকল্পনা’ বিষয়ক অধ্যাপক আদনান মোরশেদের মতে, ঢাকার যানজট হলো ‘একটি বিশাল পৌর ব্যাধি’ যা ‘মৃত্যু ঘটিয়েই চলেছে’।  বাংলাদেশের পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির জন্য বিরাট প্রাপ্তি। কিন্তু বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন  এই বলে যে, রাজধানী যানজট এবং অবকাঠামো সমস্যার সমাধান না হলে ওসব অর্জন হারিয়ে যাবে – সেই অগ্রগতি নিজে থেকেই স্তবির হয়ে যাবে। যানবাহনে ঠাসা রাস্তাগুলো ঢাকা শহরের দুঃখের এক অমানবিক চিত্র। বলা যায়, দুঃখের একমাত্র কারণ।

 

যে কারণে ঢাকার গাড়িচালকদেরকে শ্রেষ্ঠ ড্রাইভার বলতে হয়…

ঢাকার অত্যধিক পরিবহণ সর্বগ্রাসী অনুভূতি। আপনি এর গন্ধ পাবেন, স্বাদ পাবেন।  গাড়ির ধোঁয়া আপনার নাসারন্ধ্রে আপনার জামায় আপনার মুখে আঘাত করবে।  আপনার জিহ্বায় তীব্র স্বাদ রেখে যাবে। পাশের গাড়ি অথবা পথচারিদের মধ্যে নিজের হাতকে নিরাপত্তার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে  আপনি হয়তো, হয়তো নয় অবশ্যই, যানজটকে ধরতে পারবেন, ছুঁতেও পারবেন।

কিন্তু যানজট আপনার শ্রবনেন্দ্রিয়কে সবচে’ বেশি আক্রান্ত করে। ইতিহাসবিদদের মতো, শহরের নামকরণ হয়েছে ঢাক থেকে, অর্থাৎ ঠনঠন-শব্দ-করা এক বড় ঢোল। ঐতিহাসিক সত্য যা-ই হোক, শহরের ভয়ানক শোরগোল আপনার শ্রবনেন্দ্রিয়কে যে আচ্ছন্ন করে, তাতে কোন ভুল নেই। ঢাকার গাড়ির বধির-করা একক সঙ্গিত, চালকদের চিৎকার, এন্জিনের গর্জন, অন্তহীন হুইসেল থেকে আসা কণ্ঠ, তাল এবং তালহীন করতাল এবং সবমিলে এক বেসুরো থিম সং।

সেই একটানা উচ্চশব্দ চরম আগ্রাসী। ঢাকার চালকেরা হয়তো ‍পৃথিবীর সবচেয়ে পাশবিক আর নির্দয়। আপনি যদি ঢাকার মতো শহরে আইন লঙ্ঘন এবং দুঃসাহসকে চালকের দক্ষতা বলে মনে করেন, তবে তাদেরকে শ্রেষ্ঠ চালক বলতে হয়।

 

সৌজন্যে: চ্যানেল আই অনলাইন

সিএনজি: “তিন চাকার ওপর চলা ছোট টিনের বক্সটি দু’টি কক্ষে বিভক্ত”

এক বিকালে শের-এ-বাংলা ক্রিকেট স্ট্যাডিয়াম থেকে একটি অটোরিকশা নিয়ে ঢাকার সবচেয়ে যানজট প্রবণ রাস্তা দিয়ে দীর্ঘ ভ্রমণের ব্যবস্থা করলাম।  ঢাকার লোকেরা অটোরিকশাকে ‘সিএনজি’ বলে, কারণ সেটি সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাসে চলে।  তিন চাকার ওপর চলা ছোট টিনের বক্সটি দু’টি কক্ষে বিভক্ত, একটি চালকের জন্য, অন্যটি যাত্রীর জন্য। যাত্রীর কক্ষটি একটু বড় হলেও বেশ চিপা। এটি আপনি এশিয়ান শহরগুলোতে দেখতে পাবেন। ঢাকায় এগুলো সবুজ রঙে আচ্ছাদিত এবং প্রায় সবগুলোই নোংরা এবং জির্ণশির্ণ। এগুলো অনেক শব্দ করে অসহ্য ধ্বনিতে রাস্তাকে মাতিয়ে রাখে। যত্নহীন নিম্নমানের ছোট্ট যন্ত্রটিকে গোল্ফকার্টের দস্যু চাচাতো ভাই বলা যায়।

আমার সিএনজির পাইলট হলেন একজন হাসিহীন মানুষ যার বয়স হয়তো ত্রিশের নিচে। রাস্তায় তিনি বেধড়ক। রাস্তার ভিড় ঠেলে প্রতিটি সেন্টিমিটারের জন্য তিনি যুদ্ধ করেছেন এবং একটু ফাঁক পেলেই সর্বোচ্চ গতিতে গাড়ি চালিয়েছেন। এবার আমরা নগরের ব্যস্ততম রাস্তায়, বীরউত্তম রফিকুল ইসলাম এভিনিউ। রাস্তার দু’পাশে বড় বড় শপিং মল এবং ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর।  একটি শপিং মল প্রায় রাস্তার ওপরেই গজিয়ে ওঠেছে। ঢাকার রাস্তায় যানজট অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক: গাড়ির চারপাশ ঘিরে পানির বোতল, খোসা ছাড়ানো শশা, বই বিক্রি করছে ফেরিওয়ালারা। অবশ্য অপরাধেরও সম্ভাবনা আছে। একসময় সিএনজিতে দরজা ছিল না, কিন্তু এখন গ্রিল দিয়ে ঢাকা। দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে ওঁত পেতে থাকা ছিনতাইকারীদের হাত থেকে এটি সুরক্ষা দেয়। কথিত আছে যে, দুঃসাহসী চোরেরা সিএনজির ছাদ কেটে যাত্রীর ওপর চড়াও হয়। তাদের পছন্দের অস্ত্র হলো ‘টাইগার বাম’, ঝাঁঝালো এক প্রকার মলম, যা তারা নিরস্ত্র করার জন্য শিকারের চোখে মেখে দেয়।

আমার চালকের একটিমাত্র কৌশল হলো, সব অবস্থায় গাড়ির গতি ধরে রাখা, পরিস্থিতি যা-ই হোক, এমনকি চিপা গলিতেও। সোজা যেতে না পারলে ডানেবামে, গাড়ির নাক দিয়ে অন্যের লেইন অতিক্রম করে, গাড়ির ফাঁক দিয়ে, অন্য চালকদেরকে রাস্তা ছাড়তে বাধ্য করে, এমন কি দু’এক ইঞ্চি সংঘর্ষকে এড়িয়ে। একটি কথা দিয়ে তিনি অন্য গাড়ি গুলোকে হুংকার দিয়ে যাচ্ছিলেন। ‘আস্তে’। চিৎকারে করে বলে যাচ্ছিলেন, ‘আস্তে! আস্তে! আস্তে!’। পরে আমার এক ইংরেজি-জানা বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম ‘আস্তে’ মানে কি। জানা গেলো, ‘আস্তে’ মানে হলো ‘ধিরে, সাবধানে’।

 

রিকশা পেইন্টিং: গুগল সার্চ

রিকশা:  চলন্ত যাদুঘর

ঢাকার একটি যানবাহনকে নিরীহ মনে করা যেতে পারে, অন্তত শহরের নিম্নতম মানদণ্ডে। সেটি হলো, সাইকেল রিকশা। ঢাকার রাস্তার প্রাচীন এবং সর্বত্র বিরাজমান যানবাহন। রিকশার সঠিক সংখ্যা কেউ জানে না। (এগুলোর মধ্যে মাত্র একটি অংশ আনু্ষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত।)  অনেকে মনে করেন, ঢাকার রিকশার সংখ্যা ২ লাখ হবে; অন্যরা ধারণা করছেন এই সংখ্যা কমপক্ষে কয়েক গুণ বেশি।

ঢাকার রাস্তায় রিকশা ভাড়া নিয়ে দরদাম করা গাড়িতে চড়ার মতোই এক সেরা বিনোদন। এসব ত্রিচক্রযানকে নিষিদ্ধ করার জন্য অনেক প্রস্তাব এসেছে, কিন্তু প্রতিবারই সেগুলো ব্যর্থ হয়েছে।  কেউ কেউ মনে করেন, ঢাকার যানজটে রিকশাই উপযুক্ত বাহন এবং সবচেয়ে পরিবেশ-বান্ধব। কিন্তু অন্যরা বলেন, ওগুলো কোন কাজের না কারণ মাত্র আটজন যাত্রী নিয়ে চারটি রিকশা একসাথে চললে একটি বাসের জায়গা দখল করে ফেলে।

একটি বিষয়ে সবাই একমত যে, ঢাকার রিকশা দেখতে বেশ সুন্দর।  এদেরকে বলা হয় ‘চলন্ত যাদুঘর’।  এগুলো রঙ-বেরঙের উপাদানে সজ্জিত; ফ্রেমগুলোতে আঁকা থাকে ফুল; পেছনে সিনেমার তারকা এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বের ছবি অথবা গ্রামের বা শহরের দৃশ্য আঁকা থাকে।  রিকশার পেছনে শহরের পেইন্টিংগুলো পর্যালোচনা করলে পরিস্থিতির নিগূঢ় তত্ব খুঁজে পাবেন। কোন বৈচিত্র ছাড়া সেসব ছবিতে এক শান্ত শহরের স্বপ্ন আঁকা থাকে, যেখানে আছে উড়ন্ত পাখি এবং উচু মিনারের পেছনে অস্তায়মান সূর্য।  পেইন্টিংগুলোতে রাস্তাকে দেখতে পাবেন পরিচ্ছন্ন, শান্ত এবং সুস্থির যানজটমুক্ত।

 

ঢাকার নগর বিশেষজ্ঞরা কি সমস্যাকে আরও জট পাকাচ্ছে?

ঢাকার ভেতরে আমরা যে রিকশা পেইন্টিংগুলো দেখতে পাই, সেগুলো সুশৃঙ্খল রাস্তার চিত্র যা অনুমানযোগ্য ভবিষ্যতকে তুলে ধরে। শহরের সমস্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত চাওয়া হলে তারা কিছু পরিচিত ছড়া আবৃত্তি করেন।  ট্রাফিক লাইট, সুনির্দিষ্ট রিকশা লেইন, বাধাহীন রাস্তা, সড়ক রেল ইত্যাদির সুপারিশ করেন তারা। তারা বলেন বিকেন্দ্রীকরণের কথা; চট্টগ্রাম এবং খুলনাকে দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেন। এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে একটি ১২মাইল দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে, যা ২০১৫ সালের অগাস্টে শুরু হয়েছে। কিন্তু ঢাকায় এধরণের প্রকল্প সম্পর্কে গভীর অবিশ্বাস রয়েছে, কারণ সরকারের অদক্ষতা এবং দুর্নীতির কারণে নির্মাণের অগ্রগতি প্রায়ই বাধাগ্রস্ত হয়।

ইতোমধ্যে রাজধানীর রাস্তাগুলোতে ভিড় উপচে পড়ছে। ঢাকার জলবায়ুর সাথে অভ্যস্ত হতে এবং এর দুর্ভেদ্য রাস্তাগুলোর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করতে মাত্র কিছুদিন লাগে। একজন নবীনের কাছে বিদেশি শহরের যানবাহন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। জমাটবাধা যানবাহনগুলো যেভাবে সবদিক থেকে দৃষ্টিসীমানাকে বদলে দিয়েছিল; শূন্যতা এবং দৃষ্টিকোণকে বিধ্বস্ত করে দিয়ে ঢাকার দৃশ্যকে রঙের ছটায় কিউবিস্ট মৃৎশিল্পে পরিণত করেছে, তা দেখে আমি মুগ্ধ হতে শুরু করেছিলাম। দেয়ালে রঙের ছটা; ট্রাকের রিয়ারভিউতে দাড়িওয়ালা চালকের ক্ষণিক প্রতিবিম্ব; ঢেউটিনের বেড়া অতিপ্রাকৃতিকভাবে কয়েক ফিট ওপরে হাওয়ায় ওড়েছিল; আর দেখেছিলাম একটি অদেখা মালবাহী রিকশাভ্যানকে।

অবশ্য আমি উপলব্ধি করেছি যে, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী শহর থেকে যাওয়া একজন অতিথির পক্ষে দরিদ্রতম একটি দেশের অব্যবস্থাপনা আর ‍বিশৃঙ্খলা নিয়ে সৌন্দর্য আলোচনা করা মানানসই না।  ঢাকার যানজটকে বিড়ম্বনা বললে ভুল হবে।  একে বলতে হয় দারিদ্রতা, বলতে হয় এটি অবিচার, এটি দুর্ভোগ।

 

“এই শহর আপনার মনকে দার্শনিক বানিয়ে দেয়”

আমি যাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের প্রায় সবাই যানজটকে অগ্নি পরীক্ষা, সাহসের পরীক্ষা এবং ভয়ের বিষয় হিসেবে দেখে। সেটি আবার বিকৃত অহংকারেরও উৎস।  একজন ভদ্র মহিলা যিনি সারাজীবন ধরে ঢাকায় বাস করছেন, তিনি আমাকে বললেন যে, বিদেশে থাকার সময় তিনি নাকি ঢাকার যানজটকে মিস করেছেন।  ইউরোপ এবং আমেরিকার শহরগুলোতে যানজটের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হওয়াতে সেটি তার উৎসাহকে কমিয়ে দিয়েছে। দিনের বেলায় ঢাকায় বের হয়ে যদি জটপাকানো রাস্তার মোড়গুলোকে আপনি অতিক্রম করতে পারেন, তখন বলা যায় সমস্ত প্রতিবন্ধকতা আপনি জয় করেছেন এবং জয় করেছেন দেবতার মন। এই শহর আপনার মনকে দার্শনিক বানিয়ে দেয়।  ঢাকা আপনাকে জানিয়ে দেবে যে, ভ্রমণ মানে নরক, কিন্তু এটি ভ্রমণের প্রাচীন বিস্ময়কেও মনে করিয়ে দেয়।  দৈনন্দিন যাতায়াত, সেটি যত নৈমিত্তিকই হোক না কেন, সময়কে নিয়ন্ত্রণ করে মিরপুর রোডের মতো ভয়ানক যানজটকে অতিক্রম করার মানে হলো মহাশূন্য জয় করা।

 

ঢাকার রাস্তায় চলতে হলে যে নিয়মটি মনে রাখতে হবে

নিউইয়র্কে ফেরার সময় হলো। ঢাকায় থেকে আমি যাতায়াতের গোল্ডেন রুলটি শিখে নিয়েছি, তা হলো: আগে বের হও।  তাই হোটেলকে আমি ভোর ৪:৪৫টায় ডেকে দিতে বললাম। বিমানে ওঠার পাঁচ ঘণ্টারও বেশি আগে আমার জন্য অপেক্ষমান ট্যাক্সিটিতে নিজেকে গলিয়ে দিলাম।  ট্যাক্সিচালক আমাকে অভয় দিয়ে বললেন যে, এ সময়ে রাস্তার অবস্থা তত খারাপ হবে না।

দেখলাম যে, চালকের কথা ঠিক।  সূর্য তখনও ওঠে নি। আমাদের ট্যাক্সি ঢাকা শহরের মাঝে কালো রাস্তা বেধ করে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল।  কোন যানজট ছিল না – একদমই না। আমরা এয়ারপোর্ট রোডের দখল পেলাম এবং একই গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। গতিপরিমাপক যন্ত্রের দিকে আমি তাকাচ্ছিলাম আর গাড়ির জানালা নামাচ্ছিলাম। ট্যাক্সি ঘণ্টায় ৫০ মাইল বেগে চলছিল – মনে হচ্ছিল যেন আমরা ওড়ছি।

তারপর, আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাবার আনুমানিক এক মাইল আগে কিছু গাড়ি, ট্রাক এবং সিএনজি’র সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিপক্ষ আমাদের পথ আগলে ধরলো। আমাদের ট্যাক্সির গতি থেমে গেলো এবং হঠাৎ আবার ঢাকা বাংলাদেশের যানজটপূর্ণ রাস্তায় আমরা আটকে গেলাম। আমরা থেমে গেলাম, আবার স্টার্ট দিলাম, আবারও থেমে গেলাম। এই ভিড়ের কারণ অস্পষ্ট, কিন্তু এটি স্পষ্ট যে, বিমান ধরতে আর তত সমস্যা হবে না।  অতএব, আমি স্বস্তিতে থাকলাম: শেষবারের মতো ঢাকার উন্মাদনাকে উপভোগ করছিলাম। একসময় আমাদের গতিপরিমাপকে ঘণ্টায় পাঁচ মাইল দেখাচ্ছিল এবং আমরা আবারও সামনের দিকে হামাগুড়ি শুরু করলাম। একটি চিন্তা আমার মাথায় আসলো: ঢাকা শেষ পর্যন্ত আমার কাছে তার পরিচয় ধরে রেখেছে।  এটাকে আপনারা যানজট বলবেন? থামুন। এটি যানজট নয়।

 

 


নিউইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনের নিবন্ধ অবলম্বনে। মূল লেখা “ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম, যা কখনও শেষ হয় না” জডি রোসেন/ ২৩ সেপটেম্বর ২০১৬।

বাঙালি হৃদয়ের উষ্ণতা

গল্পটি বাঙালি হৃদয়কে শীতের বিকালে একটু উষ্ণতা দিতে পারে। বিদেশি বা শ্বেতবর্ণের হলেই যে ধনী নয়, আমাদের এক অবাঙালি বন্ধু বাংলাদেশিদেরকে প্রতিদিন প্রমাণ করে চলেছেন। পেশাগত বন্ধুরা হয়তো তার এ রূপটি জানেন না। তবে দারোয়ান, রিক্সাওয়ালা আর খাবারের দোকানদার তাকে চিনে নিয়েছেন। জীবিকার জন্য শিক্ষকতা এবং দেশেবিদেশে ঘুরে বেড়িয়ে চিত্র প্রদর্শনী তার কাজের অংশ।

ঘটনাক্রমে তিনি আমাদের পারিবারিক বন্ধুও। এশিয়ারই একটি শি্ল্পোন্নত দেশে তার আদি নিবাস। স্বভাবে চলনে মননে তিনি একজন শিল্পী। এদেশে একটি আন্তর্জাতিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে কোনমতে জীবিকা নির্বাহ করেন। আচরণে ভনিতা নেই, পোশাকে নেই বিলাসিতা। উপায়ও নেই। অর্থ আর খাদ্যের অভাব তার নিত্যসঙ্গী। কিন্তু আনন্দের শেষ নেই! আমি দেখেছি, শিল্পী সাহিত্যিকদের জীবনে অভাব অনেকটা অবিচ্ছেদ্য বিষয়। (কবি কী বলেন?)

তার প্রতিটি দিন নিয়েই একটি গল্প লেখা যায়। সম্প্রতি শীতের ছুটি এবং চিত্রপ্রদর্শনীকে একযোগ করে তিনি ইতালিতে গিয়েছিলেন। মাধ্যম বাংলাদেশ বিমান। তার গল্পটি আজ আমার কাছে এসেছে ব্রেইকিং নিউজ হিসেবে।

বাংলাদেশে ফেরার পথে আবিষ্কার হলো যে, ডলার শেষ! ভাগ্য ভালো যে বিমানবন্দরে আসার পর এটি জানা গেছে। কিন্তু ঢাকা পর্যন্ত ফিরতে পারবে এটি নিশ্চিত হলেও বিমান ছাড়তে আরও পুরো একবেলা বাকি। এ একবেলা কে তাকে খাওয়াবে? সঙ্গে আছে কিছু টাকা, যা বিনিময়যোগ্য নয়! বোকার মতো চেষ্টা করলেন একে ডলারে রূপান্তর করতে।

ঘুরতে ঘুরতে কিছু বাঙালি-মতো মানুষের দেখা পেলেন তিনি। প্রায় দু’বছর বাংলাদেশে থাকার অভিজ্ঞতায় তিনি বুঝতে পারলেন, তারা বাঙালি। আধা বাংলায় তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তার হাতের টাকাগুলোকে ডলারে পরিণত করার কোন বুদ্ধি তাদের জানা আছে কি না। স্বাভাবিকভাবেই তারা কোন সমাধান দিতে পারলেন না। কিন্তু আধা-বাংলা আধা-ইংরেজিতে তাদের কথোপকথন চলতে থাকলো। একপর্যায়ে, তারা বুঝতে পারলেন যে, এই অবাঙালি চিত্রশিল্পীর প্রধান প্রয়োজন হলো একবেলা খাওয়া। তারপর ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে বাসা পর্যন্ত যেতে তার আর অর্থের অভাব হবে না। কিন্তু খাবারের প্রয়োজনটি এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজনে রূপ নিয়েছে।

বিষয়টি বুঝতে পারার পর বাঙালি বন্ধুরা আর তাকে ছাড়লেন না। তাদের সাথেই ম্যাকডোনান্ডস-এ তাকে খাওয়ালেন এবং তার প্রিয় পানীয় কফিও তা থেকে বাদ গেলো না। বাঙালিরাও হয়তো মজা পেলেন, কারণ এরকম বদান্যতা গ্রহণে তার কোন অস্বস্তি নেই, বরং নিয়মিত ঘটনা।

এর পরের ঘটনাটি একটু ভিন্ন রকমের। আশেপাশের কয়েকজন ভারতীয় যাত্রী বিষয়টি ভালো চোখে দেখলো না। তাদের কোন অভিজ্ঞতার আলোকে তারা এতে প্রতারণার সম্ভাবনা দেখতে পেলো। কীভাবে একজন নিরীহ নারীকে প্রতারণার হাত থেকে বাঁচানো যায়, তারা উপায় খুঁজতে লাগলো। একটি সময়ে যখন বাঙালি বন্ধুরা তাকে ছেড়ে ওয়াশরুম অথবা স্মোকিংরুমে গেলেন, তখন ওই ভারতীয় ‘স্বেচ্ছাসেবীরা’ তাকে বাঁচাতে এলো। কিন্তু আমাদের অবাঙালি বন্ধুটি এতে মনে মনে বিরক্ত হলেন, কারণ তাদেরকেও তিনি প্রথমে বাঙালি মনে করে সাহায্য চেয়েছিলেন, যাতে তারা অপারগতা প্রকাশ করেছিল। বিরক্তি প্রকাশ না করে তিনি ভারতীয় সহযাত্রীদেরকে জানালেন যে, তারা তার পূর্ব পরিচিত। অতএব এবিষয়ে আর কথা নয়।

যা হোক বাঙালিরা ঢাকা বিমানবন্দর পর্যন্ত তার সঙ্গে ছিলেন এবং ঢাকায় এসে সিএনজিতে তোলে দিয়ে তারা বিদায় নিয়েছিলেন। বলা যায়, বাসা পর্যন্ত তারা তার সঙ্গেই ছিলেন, কারণ সিএনজি ড্রাইভারের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে তারা তার বাসায় পৌঁছানো নিশ্চিত করেছিলেন।▲

————
ফেইসবুক স্ট্যাটাস: ৬ জানুয়ারি ২০১৭