কর্মস্থলে অপ্রত্যাশিত প্রতিবন্ধকতা ও গঠনমূলক সমালোচনা

 

কয়েক বছর আগে আমার এক বন্ধু তার কোম্পানির কিছু সিনিয়র কর্মকর্তার ব্যাপারে আমার কাছে অভিযোগ করছিলেন।  কোম্পানীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার পর তাদের পদগুলোতে নতুন লোক নেওয়া হয়েছে। “সবগুলো ছিল একেকটি অপদার্থ” আমার বন্ধুটি বলতে লাগলেন।  “এরা কেউই আমার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে নি।”

আমি জানতাম আমার এই বন্ধুটি একজন পারফেক্শনিস্ট, অর্থাৎ খুঁতখুঁতে – সবকিছুই নিখুঁতভাবে করার জন্য তিনি সবসময়ই চেষ্টা করেন। তার পদচ্যুত কর্মকর্তাদের অযোগ্যতার বিবরণ শুনার পর আমার মনে হলো, সেই কর্মকর্তাদের মধ্যে খুব সমস্যা নেই, বরং তাদেরকে যিনি নিয়োগ দিয়েছেন তার মধ্যেই সমস্যা।

আমার বন্ধুটি যখন তার সাবেক কর্মীদের সম্পর্কে তার নেতিবাচক মূল্যায়ন শেষ করলেন, আমি যথাসম্ভব বিচারকের ভূমিকায় না যাবার চেষ্টা করলাম। সরাসরি সমালোচনা না করে আমি বললাম, “কর্মীদের ব্যর্থতার পেছনে আমি শুধু একটি কারণই প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখতে পাচ্ছি।” আমি যে তাকেই ইশারা করছি, আমার বন্ধুটি তৎক্ষণাৎ তা বুঝে নিলেন। তিনি আমার মন্তব্যটি ইতিবাচকভাবেই নিলেন এবং কর্মীর প্রতি তার ব্যক্তিগত চাহিদাগুলো পুনর্বিবেচনা করলেন।  আমার এই মৃদু ভর্ৎসনার জন্য আমার এই বন্ধুটি একদিন আমাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন।

হয়ত সেদিন আমি চুপ করে থাকতে পারতাম। কোন কথা না বলে তার অভিযোগগুলো আমি শুধু শুনেই যেতে পারতাম।  কিন্তু আমি মনে করলাম সমস্যাটি একটি নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করার জন্য তাকে সাহায্য করা উচিত। যদিও কাউকে দুঃখ না দিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করা কঠিন, কিন্তু বন্ধু বন্ধুর কাছ থেকে আন্তরিক সমালোচনা পেতে পারে।

জ্ঞান সাধকেরা বলে থাকেন: যে লোক খোসামুদে কথা বলে তার চেয়ে যে সংশোধনের কথা বলে, সে শেষে বেশি সম্মান পায়।

এধরণের পরিস্থিতির আরেকটি দিক হলো, অন্য ব্যক্তিটি কীভাবে পরামর্শটি গ্রহণ করলো এবং কীভাবে তা কাজে প্রয়োগ করলো।  কর্মীদের অযোগ্যতাকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে আমার বন্ধুটি হয়ত মনে মনে আমার মতামতটি প্রত্যাখ্যান করতে পারতেন। হয়তো তিনি বিনয়ের সাথে আমার মন্তব্যটি গ্রহণ করে গোপনে সংশোধন হতে পারতেন। এবিষয়ে নিচে আরও কিছু দিক তুলে ধরা হলো।

সংশোধনের কথা গ্রহণের মনোভাব সফলতা নিয়ে আসে। একটি আন্তরিক সমালোচনা শৃঙ্খলার পূর্বশর্ত। কারণ সমালোচক তার সংশোধনমূলক কথা দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে সহায়তা দিতে পারেন। তাতে সংশ্লিষ্ট সকলেই উপকৃত হন।  প্রবাদে বলা হয়েছে: যে শাসন মানে সে জীবনের পথে চলে, কিন্তু যে সংশোধনের কথা অগ্রাহ্য করে সে বিপথে যায়। প্রবাদে আরও আছে: যে লোক শাসন অগ্রাহ্য করে সে অভাবে পড়ে ও লজ্জা পায়, কিন্তু যে লোক সংশোধনের কথায় কান দেয় সে সম্মানিত হয়।

ইতিবাচক সমালোচনা গ্রহণ না করা বোকামী।  কর্মক্ষেত্রে প্রায়ই আমরা সমস্যার এত নিকটে অবস্থান করি যে সঠিক সমাধান খুঁজে পাই না। আস্থাভাজন বন্ধু বা সহকর্মীর চিন্তা থেকে এমন তথ্য বের হয়ে আসে যা সরাসরি উপেক্ষা বা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। “যে লোক শাসন ভালবাসে যে জ্ঞান ভালবাসে, কিন্তু যে লোক সংশোধনের কথা ঘৃণা করে সে পশুর সমান।” (প্রবাদ)।

একটি সময়োচিত বিরোধিতা ধ্বংসাত্মক পরিণতি থেকে রক্ষা করে। আপনি যদি অপরিচিত রাস্তায় চলে কোন বিপদের মুখে পড়েন, তখন আপনি এমন ব্যক্তির সহযোগিতা চাইবেন যিনি ওই রাস্তায় হেঁটেছেন। একই কাজ করবেন আপনি কোন বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নেবার পূর্বেও। “জ্ঞানী লোকের দেওয়া শিক্ষা জীবনের ঝর্ণার মত; তা মানুষকে মৃত্যুর ফাঁদ থেকে দূরে রাখে।” (প্রবাদ)।

 

আলোচনা এবং আত্মমূল্যায়নের জন্য কিছু বিষয়:

১)      সংশোধন বা সমালোচনার কথায় আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া করেন? আপনি কি আত্মরক্ষামূলক আচরণ করেন? আপনি প্রত্যাখ্যানমূলক আচরণ করেন, নাকি গ্রহণমূলক মনোভাব দেখান? আপনার উত্তরের পক্ষে ব্যাখ্যা দিন।

২)       অন্য দিক দিয়ে বিবেচনা করলে, আপনি যখন দেখেন কেউ কোন ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেক্ষেত্রে তার বিরোধিতা করা কতটুকু সহজ বা কঠিন বলে আপনার মনে হয়? সম্ভব হলে দৃষ্টান্ত দিন।

৩)      প্রবাদের কথামতো তোষামোদকারী নয় অবশেষে সমালোচনাকারীই পুরস্কৃত হন। এবিষয়ে আপনার মতামত কী? আপনার মতামতের পক্ষে যুক্তি দিন।

৪)      প্রবাদের কোন্ কথাগুলো আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য বলে মনে হয়?

 

(ফটো সংগৃহীত)

 

 


[মূল ধারণা: রিক বক্স – বিশ্বব্যাপী পেশাজীবীদের পথপ্রদর্শক।  লেখাটি পাঠক প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রকাশিত। ১০ সেপটেম্বর ২০১৪]

স্বশিক্ষিত ক্ষণজীবীরা: বলছিলাম সাউথ পোলারদের কথা…

স্বশিক্ষিত প্রতিভাবানরা

স্বশিক্ষিত প্রতিভাবানরা

 

“প্রিয় হ্যাকার, দয়া করে একটু কি বলবেন, কীভাবে কাজটি করলেন?” কোন হ্যাকার কি খুব সহজেই এ প্রশ্নের উত্তর দেবে? অথচ এরকম প্রশ্নের উত্তর জানতে চায় এমন ব্যক্তি বা সংস্থার সংখ্যা এখন আর গোনা যায় না। কিন্তু কেমন হয় যদি হ্যাকারসহ ‘সমাধানটিকে’ কব্জা করা যায়? চাকুরির বাজারে পেশাদার হ্যাকারদের চাহিদাটি এমনই ‘বিশেষ’ যে, একে সাধারণ বলা যায় না। অথচ দেখা যাবে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডিও পেরোতে পারে নি অনেকে। বিল গেটসের কথাই মনে করে দেখুন: “গণিতে আমি খুবই কাঁচা ছিলাম কিন্তু বন্ধুটি ছিলো খুবই দক্ষ। বর্তমানে সে একটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী আর আমি সেই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান।”

শুধু পাশ্চত্যে নয়, প্রাচ্যেও ‘অশিক্ষিত’ প্রকৌশলীদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। ‘অশিক্ষিত’ শব্দটি ব্যবহার করায় আমার আপত্তি আছে। শুধু সনাক্ত করার জন্য বললাম – আদতে তারা স্বশিক্ষিত বা শৌখিন প্রকৌশলী।

“ধীরে ধীরে প্রচলিত শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় বা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়া গুগলকর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। গুগলের কিছু কিছু টিমে ১৪ শতাংশ কর্মীর প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ডিগ্রি নেই।” এটি একটি পত্রিকার খবর । অবশ্য গুগল জানিয়েছে যে, প্রাতিষ্ঠানিক সনদপ্রাপ্ত কোন প্রার্থীর যদি কোডিং এবং গাণিতিক বিষয়ে দক্ষতা থাকে, তবে তারাও অগ্রাধিকার পাবে।

.

আরও কিছু দৃষ্টান্ত

ছোটবেলায় ভিডিও গেম খেলতে খেলতে যে ছেলে/মেয়েটি সময় এবং অর্থ অপচয় করে মা-বাবার যন্ত্রণার কারণ হয়েছে, সে ছেলে/মেয়েটি চৌদ্দ বছর না পেরোতেই চাকরি পেয়ে গেলো একটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে। উচ্চ বেতনে এবং ভিআইপি মর্যাদায়। ভিআইপি মর্যাদার একটি চিহ্ন হলো, যে কোন সময় যে কোন জায়গায় অফিস করতে পারবেন। বাসায় থাকলেও চলবে। শুধু অন্য কোন সমগোত্রীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ রাখা যাবে না। বিশ্বাস করা কঠিন হলেও একটি ‘প্রতিযোগিতা-প্রবণ’ ভিডিও গেম তৈরির প্রতিষ্ঠানে বিষয়টি অসম্ভব নয়।

প্রতিভা এবং অধ্যাবসায়ের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গুরুত্বহীন। বিখ্যাত অ্যাপেল কম্পিউটারের জনক স্টিভ জবসও ছোটবেলায় তেমনই এক শিশু ছিলেন। মার্ক জাকারবার্গ বা বিল গেট্স-এর বেলায়ও কথাটি ঠিক, কারণ তারা প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা অর্জনের পূর্বেই নিজ নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠা পান।

.

স্বশিক্ষিত প্রতিভাবানরা, যারা কিছু দেশে সাউথপোলার হিসেবে সমাদৃত

কারিগরি বিষয়ে সাউথ পোলারদের আধিপত্য বেশি হলেও সৃজনশীল সকল পেশায়ই তাদের আধিক্য আছে। লেখক উপন্যাসিক গল্পকার বা ব্লগার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, এমন অনেক ব্যক্তিই আমাদের সামনে আছেন, যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ভালোমত শুরু বা শেষ করতে পারেন নি।

‘যা পছন্দ তাতেই লেগে থাকার’ বিষয়টি আমাদের দেশের শিক্ষা পদ্ধতি বা সমাজ ব্যবস্থায় ততটা স্বীকৃতি পায় না। ক্রিকেটের অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান যখন খেলতে শুরু করেন, তখন তিনি মা-বাবার আনুকূল্য পান নি। দাদাজান বিনাচিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করার কারণে পিতার অখণ্ডনীয় নির্দেশ হলো ছেলে/মেয়েকে ডাক্তারই হতে হবে। খোঁজ নিয়ে দেখা যাবে, সে হয়তো সঙ্গীত বা ছবি আঁকাআঁকিতে ইতোমধ্যেই নিজ প্রতিষ্ঠানে খ্যাত অর্জন করেছে। ভারতীয় ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবিটির কাহিনী এরকম সমাজের কথাই বলে।

.

সাউথপোলারদের স্বভাব ও জীবনে সাধারণত যা থাকে:

*আগ্রহ: মাত্র দু’একটি বিষয়ে তাদের আগ্রহ থাকে কেন্দ্রীভূত;
*কৌতূহলী: বিষয়টিতে কৌতূহল নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করে মরিয়া হয়ে;
*বেদনাহত/ বিষাদাক্রান্ত: জীবনে থাকে এক বা একাধিক না-পাওয়ার বেদনা;
*প্রচলিত অর্থে অক্ষম: শারীরিক/মানসিক অক্ষমতা থাকতে পারে;
*বঞ্চিত: থাকতে পারে সামাজিক উপেক্ষা/বঞ্চনার বেদনা;

*মেইভারিক: সাধারণত প্রচলিত দৃষ্টান্তের বিপক্ষে তাদের অবস্থান, একটু বাউণ্ডুলে – একটু বিপ্লবী;
*একমুখী/একগুঁয়ে: অন্য কোন বিষয়, তা যতই কামনার বিষয় হোক, তারা সেগুলো উপেক্ষা করতে পারে;
*প্রেরণায় চালিত: তারা প্রেরণার কাঙ্গাল এবং কারও চোখে স্বার্থপরও;
*দৃষ্টান্ত:  কাজী নজরুল ইসলাম, ম্যাক্সিম গোর্কি, বেন্জামিন ফ্রাংকলিন, লিওনার্দো দ্য ভিন্চি, আরনেস্ট হেমিংওয়ে
*ক্ষণজন্মা: প্রেরণার খাবার দিতে গিয়ে শরীরের চাহিদাকে উপেক্ষা করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বীকৃতি পাবার পূর্বেই মৃত্যু!

.

অতএব, সাউথপোলার কারা?

যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেয়েও নিজের প্রতিভা এবং মজ্জাগত মেধার সফল প্রয়োগ করে কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করেছে, পশ্চিমা বিশ্বের ‘অলিখিত ভাষায়’ তারা ‘সাউথ পোলার’ হিসেবে পরিচিত। আমাদের দেশে ‘স্বশিক্ষিত’ অভিধায় আংশিতভাবে তারা পরিচিত। ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে তাদের সরব উপস্থিতি আমরাও টের পাবো। কর্মক্ষেত্রে সফলতার মূল মন্ত্র হলো: ‘যা ভালোবাসো তা-ই করো এবং যা করো তা-ই ভালোবাসো।’ প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার বিষয়টি এক সময় এসে ফাইলবন্দি হয়ে যায়। শুধু দক্ষতা আর যোগ্যতার বিষয়টিই তখন মুখ্য হয়ে ওঠে। আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে চাইলে ‘ভেতরের শক্তিকে’ কাজে লাগাতে হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রাকৃতিকভাবে অর্জিত নিজের অমূল্য শক্তির প্রয়োগ ঘটাতে হবে।

.

কেন এই নামকরণ?  সাউথ পোল বা দক্ষিণ মেরু এমন একটি জায়গা যেখানে ক্যামেরার দৃষ্টি যায় না।  খুব বেশি আলোচনা নেই দক্ষিণ মেরু নিয়ে। সকলেই উত্তর মেরু নিয়ে মুখর হয়ে থাকে, কারণ এটি অনুসন্ধানীদের জন্য সহজ এবং প্রচলিত উপায়ে ভ্রমণ করা যায়।  কিন্তু দক্ষিণ মেরু একটি অনাবিষ্কৃত অঞ্চল। দক্ষিণ মেরুকে বুঝার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়।আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা দিয়েই তথাকথিত মেধাবীদেরকে বের করে আনা যায়।  পরীক্ষার ফলাফল দিয়েই তাদেরকে নির্ধারণ করা হয়।  কিন্তু স্বশিক্ষিতদেরকে আবিষ্কার করতে হয় এবং তাতে চেষ্টা লাগে।  সমাজের প্রচলিত মাণদণ্ডে তারা অনেকাংশেই অনাবিষ্কৃত।
.

.

সাউথপোলারদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত?

পরিবার: পরিবারই মানুষের গড়ে ওঠার সূতিকাগার।  এখান থেকেই শিশু তার অভ্যাসগুলোকে বেছে নেয় এবং নিজেকে আবিষ্কার করে। মা-বাবার দায়িত্ব হবে, প্রথমত তাদের সন্তানের স্বাভাবিক প্রবণতাটি বুঝা।  যেহেতু সকলেই শিশুবিশেষজ্ঞ নন, তাদের উচিত হবে সন্তানের পছন্দ মতো তাদেরকে খেলতে এবং কিছু করতে দেওয়া।  গান, ছবি আঁকা, কিছু বানানো অথবা কিছু ভাঙ্গা… এসব বিষয় আপাত দৃষ্টিতে ক্ষতিকর হলেও সন্তানের ভবিষ্যতের এজন্য এসবের সুযোগ করে দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠান:  প্রতিষ্ঠান অবশ্য এককভাবে কিছু করতে পারে না, যদি না দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সমর্থন না থাকে। তবু অনেক শিক্ষক প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র হয়ে অনেক শিশুকে জীবনের পথ দেখিয়েছে।  তারা শুধুমাত্র একটি কাজ করেছেন, তা হলো শিক্ষার্থীদের যেকোন সৃষ্টিকে স্বীকৃতি বা প্রেরণা দেওয়া।  শিক্ষকের প্রশংসা মানেই হলো সামনে যাবার পাথেয়।  কবি নজরুলকে তার শিক্ষকরাই আবিষ্কার করেছিলেন। তাই শিক্ষকদের উচিত হবে, শিক্ষার্থীদের নিজস্বতাকে সম্মান করা এবং একইভাবে সকলকে পড়ালেখার জন্য চাপ না দেওয়া।

সমাজ:  ইতিহাস বলে যে, সমাজ সবসময়ই প্রতিভাবানদেরকে দেরিতে চিনেছে। সমাজ একটি বৃহত্তর পরিসর।  একে নির্দেশ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। মা-বাবাই সমাজের নিকটতম প্রতিনিধি।  তারা যদি নিজেদেরর সন্তানকে চিনতে না পারেন, তবে সমাজের কাছে শিশুরা আরও বেশি অচেনা হয়ে যায়।  প্রথম দায়িত্ব হলো, মা-বাবার।  বন্ধু এবং প্রতিবেশীর সামনে সন্তানদেরকে তিরষ্কার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।  তাহলেই বন্ধুবান্ধব এবং প্রতিবেশীরা সেই শিশুকে ভালোমতো মূল্যায়ন করতে পারবে।

.

.

[একটি ফেইসবুক স্ট্যাটাস বিস্তৃত হয়ে এই লেখার উদ্ভব।  প্রথম প্রকাশ প্রথম আলো ব্লগ; তারপর সামহোয়্যারইন ব্লগ/ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ ]

.

.


টীকা: প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিতদের মধ্যেও ‘সাউথপোলার সিনড্রোম’ থাকা অসম্ভব নয়।

উৎসর্গ: পৃথিবীর তাবৎ সাউথপোলারদেরকে।
উৎস: পর্যবেক্ষণ এবং ব্যক্তিগত প্রেরণা।

ছড়া এবং আরও দু’টি অপচেষ্টা

UzU-UzU-UzU2

 

 

 

 

.

.

.

.

 

 

 

 

 

//কবি হলেই ভালো হতো//

(কবিদের প্রতি: শুধু ব্লগে এবং এর বাইরে যারা লেখেন!)

কবি হলেই ভালো হতো
বলা যেতো সব
করা যেতো ইচ্ছে মতো
শব্দের কলরব।

কবির আছে চলার সুযোগ
আছে বলার ঝোঁক
কবির আছে সব যোগাযোগ
ক্ষমতাবান লোক।

কবি নামেই সম্মান যতো
তিনি জাতির বিবেক
কবির কথা ওহির মতো
তিনি সত্য নিরেট।

দুখের মাঝে সুখ পেতে চাই
কবির অনুভব
কবি হলেই ভালো হতো
ভাবা যেতো সব।

.

.

//অগোচরে গুহায় একদিন//

সবার অগোচরে
মাতাল স্বামীর মতো
আনমনে ঢুকে পড়লাম
সেই গুহায়,
উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত!

চাঁদের আলোর মতো
স্নিগ্ধ কন্ঠে সেই নারী
অভিবাদন জানায় আমাকে।

জল পান করতে দেয়
একান্ত ভালোবেসে
আর সঞ্জীবনী শক্তি পেয়ে
নবায়িত আমাকে
খুঁজে পাই সকালের সূর্যের মতো।

ধূসর চুলগুলো আবার
কৃষ্ণবর্ণে আচ্ছাদিত করে
অশীতিপর মস্তিষ্ককে।
দেহের সকল অস্থি
এক ঝাঁকুনিতে
যুবার শক্তি ফিরে পায়।

খুঁজো দেহ ঋজু হয়:
ঘুষখোর দারোগাটাকে
এক থাপ্পড়ে থানা থেকে
বেড় করে দিতে এখনই
গুহাত্যাগ করার খায়েশ হয়।

নতুন করে বাঁচার ইচ্ছে জাগে।
দেউলে হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটিকে
আবারও জাগিয়ে তোলার
পথ খুঁজে পাই।
অবিশ্বস্ত দুর্নীতিবাজ
কর্মীগুলোকে আবারও ক্ষমা
করে দিয়ে ফের কাজে লাগাবার
ইচ্ছে হয়।

নতুন আমি নতুন দেহকে
জিজ্ঞেস করে বলি:
কেন আগে আসি নি গুহায়?
বাহিরে তো শুধুই ধ্বংস
আর নিজেকে পীড়ন,
আত্মহনন! নিরন্তর আত্মহনন
এতো ভালো লাগে?

ফেরার পথে রহস্যময়ী
সুধায়: “কেন এসো না?
কেন থাকো না?”
আনমনেই বের হয়ে যাই
নতুন জীবনকে
উদযাপন করার সিদ্ধান্তে।

.

.

//বিকারগ্রস্ত মর্ত্যবাসীদের প্রলাপ সঙ্কলন// (১

কোন কিছু বোতলে আটকে রাখা ভালো নয়
শান্ত থাকো আর ঢালতে থাকো…
সালাদ খেয়ে কেউ মহৎ কিছু লিখেছে এমন নজির নেই
অতএব … ঢালো
এক বোতলে যা আছে পৃথিবীর সমগ্র বইয়েও তা পাওয়া যায় না…
কারণ টুট-টুট-টুট হলো বোতলবদ্ধ কবিতা 
পেনিসিলিন মানুষকে সুস্থ করে, কিন্তু টুট-টুট-টুট মানুষকে সুখি করে

ঈশ্বর যে মানুষকে সুখি দেখতে চান,
তার অকাট্য প্রমাণ হলো টুট-টুট-টুট (২
টুট-টুট-টুট খাবার সময় মানুষ পাবেই…
যে খাবারের শেষে টুট-টুট-টুট নেই, তাকে বলা হয় নাস্তা
(তোমরা একে ডিনার বলো কেন?)
আমার এতে নেশা নেই, কসম, শুধুই মাথা ঝিরঝির করলে একটু ঢালি

সন্দেহে পড়লেই আমি টুট-টুট-টুট ঢেলে পান করি
তোমাকে সহ্য করার জন্য আমি যথেষ্ট পান করেছি, এবার বলো!
ভুল করা মানবিক, কিন্তু ক্ষমা করার জন্য টুট-টুট-টুট খেতে হয়
ঢেলে খান, ভালো লাগবে…
ভাষা যখন হারিয়ে যায়, টুট-টুট-টুট তখন কথা বলে

মাঝে মাঝে আমি গোসল করার পরে পান করি
কারণ গোসলের সময় পান করা কষ্টকর।
শুধু দু’টি কারণে আমি পান করি:
যখন আমার মন ভালো থাকে আর যখন মন খারাপ থাকে

শুধু রান্নায় আমি টুট-টুট-টুট ব্যবহার করি; মাঝে মাঝে খাবারের সাথেও মেশাই
আমার কার্যতালিকায় ‘ঢেলে খাওয়ার’ কাজটি লিখে রাখি
তাতে অন্তত একটি কাজ করার গ্যারান্টি থাকে!
টুট-টুট-টুট পান করুন, পানি নষ্ট করবেন না!

টুট-টুট-টুট হলো পানিতে ধরে রাখা সূর্যোলোক (৩
তাড়াতাড়ি আমাকে কিছু ঢেলে দাও,
যেন মনকে সিক্ত করে মহৎ কিছু বলতে পারি (৪
হয় আরেকটু ঢালো, নয়তো সামনে থেকে সরো! (৫
বিজয়ীরা যা যোগ্যতায় লাভ করে, ব্যর্থদের জন্য তা অত্যাবশ্যক! (৬

শান্ত থাকুন এবং এক গ্লাস সাথে রাখুন
জীবনে আসে তাল, যখন আপনি টাল
কোন কিছুই কাজে না দিলে একটু ঘুমিয়ে নিন…
ডাক্তার বলেছেন, আমার এলকোহলে নাকি ব্লাড পাওয়া গেছে!

[ টুট-টুট-টুট= একটি শক্তিশালী তরল পানীয়র কল্পিত নাম ]

.

.

————————– শেষ লেখাটির জন্য কিছু টীকা:
১. লেখাটি শুধু সুবিবেচক পাঠকের জন্য, যিনি নিজের ভালো মন্দ বুঝতে পারেন।
২. সৌজন্যে: বেন্জামিন ফ্রাঙ্কলিন: (১৭০৬-১৭৯০) যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম স্থপতি
৩. সৌজন্যে: গ্যালিলিও গ্যালিলি: (১৫৬৪-১৫৪২) ইটালিয়ান বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ
৪. সৌজন্যে: এরিস্টোফিনিস: (খ্রি/পূ ৪৪৬-৩৮৬) প্রাচীন গ্রিসের রম্য-নাট্যকার
৫. সৌজন্যে: রুমি: (১২০৭-১২৭৩) সুফিবাদি আফগান কবি
৬. সৌজন্যে: নেপোলিয়ান: (১৭৬৯-১৮২১) প্রখ্যাত ফরাসি সেনানায়ক

 

 

সামহোয়্যারইন ব্লগে প্রথম প্রকাশ: ৪ এপ্রিল ২০১৬।

৬৬তম জাতিসঙ্ঘ এনজিও সম্মেলন: অংশগ্রহণকারীর অভিজ্ঞতা

জাতিসঙ্ঘের ডিপার্টমেন্ট অভ্ পাবলিক ইনফরমেশন (UN DPI/NGO Conference) এর এনজিও বিষয়ক সম্মেলনটি প্রথমবারের মতো কোন এশিয়ান দেশে হলো। মূলত ৬৬টি সম্মেলনের ৬০টিই হয়েছে নিউইয়র্কে, ৫টি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে এবং ১টি সম্প্রতি হয়ে গেলো দক্ষিণ কোরিয়ার পর্যটন নগরি গিয়ংজুতে। গিয়ংজু সউল থেকে ৪/৫ ঘণ্টার দূরত্বে, দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে। কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন নিদর্শনে পূর্ণ। সম্মেলনের উদ্দেশ্য এবং আয়োজন সম্পর্কে ধারণা দেবার জন্য এই লেখা।

অফিসের বিগ বস যখন সেদিন আচমকা ডেকে নিয়ে বললেন, ‘আপনাকেই যেতে হবে, সব কাজ গুছিয়ে ফেলুন’ তখন আমি একই সাথে খুশি এবং চিন্তিত। চিন্তিত ছিলাম কারণ ডিপার্টমেন্টে নিয়মিত ব্যস্ততাটুকু কীভাবে কাটিয়ে ওঠবো ভাবছিলাম। অন্যদিকে খুশি ছিলাম, কারণ এটি কোন প্রাতিষ্ঠানিক সেমিনার নয়, জাতিসঙ্ঘের এনজিও বিষয়ক সম্মেলন। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, এনজিও প্রতিনিধি, সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধি এবং শিক্ষাবিদরা একত্রিত হয় এই সম্মেলনে। জাতিসঙ্ঘের কোন সম্মেলনে যোগ দিতে পারা আমার জন্য বিশাল প্রাপ্তি। ফলে আমি হ্যাঁ অথবা না, কিছুই বলতে পারলাম না। বলার সুযোগও ছিল না।

 

‘মানসম্মত শিক্ষা’, সম্মেলনের মূল আলোচ্য বিষয়। বিশ্ব নাগরিকের জন্য মানসম্মত শিক্ষা। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিক্ষার বিস্তার ও পৃষ্ঠপোষকতায় বেসরকারি সংস্থার অবদান সুবিদিত। তাই জাতিসঙ্ঘ চায়, এমডিজি পর্যায়ে যেমনভাবে এনজিওগুলো সহায়তা দিয়েছে, সেটি এসডিজিতেও অব্যাহত থাকুক।

জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব বান কি মুন বললেন, কোন বড় কর্মসূচি এনজিও’র সহযোগিতা ছাড়া অকল্পনীয়। একই সাথে যুবসমাজকে তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। ‘আমি কোরিয়ার মানুষ। কোরিয়া আজকের মতো ছিল না। অনেক কষ্ট করতে হয়েছে আমাদের। এক সময়ে খোলা আকাশের নিচে বিদ্যা লাভ করেছে যে ছেলেটি, সে আজ জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব হয়ে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।’ উদ্বোধনী পর্বের এ মুহূর্তটি ছিল আবেগপূর্ণ। হাজার প্রতিনিধির বিশাল সম্মেলন কক্ষটিতে পিনপতন নিরবতা।

আবেগ (প্যাশন) থাকতে হবে নিজেদের কাজে। সেই সাথে থাকতে হবে মমত্ববোধও (কমপ্যাশন)। বান কি মুনের এই কথাগুলো আমাকে স্পর্শ করলো।

তারপর বক্তৃতায় এলেন মি. ইল হা ই, গুড নেইবারস ইন্টারন্যাশলের প্রতিষ্ঠাতা প্রেজিডেন্ট। তিনি সম্মলেনের সহ-সভাপতি। শিশুর অধিকার ও মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে গুড নেইবারস-এর দু’টি কর্মশালা ছিল। ছিল প্রদর্শনী স্টল। প্রদর্শনীতে সেইভ দি চিলড্রেন ও ওয়ার্ল্ড ভিশনসহ সকল বড় এনজিওদের মাঝে বাংলাদেশের কোন সংস্থাকে দেখা গেলো না। জানি না কেন।

যা হোক, ব্ক্তৃতায় এলেন, রাশেদা কে চৌধুরি। তিনি গণশিক্ষার বিশ্ব ফোরামের ভাইস-প্রেজিডেন্ট। একই সাথে বাংলাদেশের গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রধান। শাড়ি-পড়া রাশেদা আপাকে দেখে গর্বিত বোধ করলাম। শেষ দিকে তার সাথে ছবি তোলার প্রতিযোগিতায় আমি যেতে চাই নি। অন্যদেশকে সুযোগ দিলাম। তবে দেখা করেছি, কথা বলেছি।

তিন দিনের সম্মেলনে মোট পাঁচটি রাউন্ড টেবিল আলোচনা ছিল। সবগুলোতেই অংশ নিয়েছি। একটিতে প্যানেলিস্ট হিসেবে আবার রাশেদা কে চৌধুরীকে পেলাম। মানসম্মত শিক্ষার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিমতটি তিনিই রাখলেন। তিনি বললেন, সবার আগে রাষ্ট্রগুলো তাদের জাতীয় নীতিতে শিক্ষাকে সেভাবে গ্রহণ করতে হবে। মুহুরমুহু করতালির মাঝে আমার হাতগুলোও ছিলো। শিক্ষার মান ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিয়ে অনেক আলোচনাই হলো, যা এই লেখায় তুলে ধরা সম্ভব নয়।

ইউথ ককাস। যুব সম্মেলন। প্রতিদিন সকালে আয়োজিত হয়েছে তরুণ-তরুণীদের নিয়ে যুব সম্মেলন। প্রথমটিতে স্বয়ং জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব উপস্থিত ছিলেন।

দেখা হলো ঢাকা আহসানীয়া মিশন এবং আহসানীয়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেজিডেন্ট জনাব কাজী রফিকুল আলমের সাথে। বয়স্ক ভদ্রলোক একাই সম্মেলনের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। আমাকে দেখে বিস্মিত। কীভাবে এলাম! যা হোক, তার সাথে দ্বিতীয়বার দেখা হলো সম্মেলন কক্ষে।

অধিকার নিয়ে, রাষ্ট্রীয় অপব্যবস্থা নিয়ে, সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা নিয়ে এবং মুক্তমতের জন্য মানুষের জীবন দেওয়া… ইত্যাদি বিষয়ে এতো সাহসী এবং শানিত বক্তব্য আমি কখনও শুনি নি, দেখি নি। দর্শক সকলে স্তব্ধ, তারপর বজ্রপাতের মতো করতালি। অবশেষে বক্তার সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, তার বক্তৃতা অগণিত মানুষকে শক্তি দেয়, এটি তিনি জানেন কি না। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। ছবি তোললাম এবং পরিচয় বিনিময় করলাম। তিনি জাতিসঙ্ঘের এনজিও বিষয়ক এসোসিয়েশনের চেয়ারপার্সন, ব্রুস নট।

সম্মেলনে ছিল নজিরবিহীন নিরাপত্তা। পুরো গিয়ংজুতে গিয়ংজুর মানুষ ক’জন জানতে পারলাম না, কারণ রাস্তাঘাট সব ফাঁকা। হয়তো মানুষ আসলেই কম। শুধুই সম্মেলনের অংশগ্রহণকারী। অংশগ্রহণকারীদেরকে সম্মেলনের অনেক পূর্বেই প্রাথমিক নিরাপত্তার পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়েছে। নিরাপত্তা সনদ নিজ দেশ থেকেই পাওয়া গেছে, ইমেলে। তারপর সেই সনদ নিয়ে যেতে হয়েছে নিবন্ধন বিভাগে। সেখানে পাসপোর্ট তথ্য যাচাই করে, একই সাথে ফটো তুলে তৈরি করা হয় পরিচয়পত্র। পরিচয়পত্র নিয়ে নিরাপত্তার সর্বশেষ আনুষ্ঠানিকতা শেষে সম্মেলন কেন্দ্রে প্রবেশ।

সুপরিকল্পিত আয়োজন। দৈনিক খাবারের জন্য আলাদাভাবে ত্রিপল টানিয়ে ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইংরেজিতে নির্দেশ, লোকেশন ম্যাপ, ইংরেজিভাষী পুলিশ। আবর্জনা ব্যবস্থাপনা। সবকিছু গুছানো। সবশেষে সীমাহীন খাবারের আয়োজন নিয়ে গণ বুফে। আন্তর্জাতিক খাবারের বিশাল মেলা। সবার জন্য। কয়েকটি কক্ষ নিয়ে আয়োজিত হয় এই খাবারের মেলা। খেলাম এবং ঘুরে ঘুরে তদন্ত করলাম, কোথাও কোন ঘাটতি আছে কিনা। পেলাম না। হাজার মানুষ একসাথে খেলেন, কোনকিছুর অভাব ছিল না। আমার মতে এটি ছিলো সম্মলনের বড় আকর্ষণ। কোরিয়ান আয়োজকরা দেখিয়ে দিলো যে, তারা যতই হিসেবি হোক না কেন খাবারের বেলায় ততটা হিসেব করে না।

 

মোবাইল ফোনে তোলা কিছু ছবি:

 

001 002 003

3-Rasheda Chowdhury 2-Ilha Yi President 1-Ban Ki Moon

013 012 011

008 007 005 004


7-Exhibition Stall
4-Group PHoto

শেষ ছবিটি শুধুই গুড নেইবার্স প্রতিনিধিদের।

 

 

তাৎক্ষণিক প্রকাশ: ৪ঠা জুন ২০১৬/ সামহোয়্যারইন ব্লগ/ পাঠকপ্রতিক্রিয়া

যেসব কারণে ব্রিটেন ইইউ ছেড়ে বিশাল ভুল করেছে…

[courtesy: henry4school.fr]

 

তেতাল্লিশ বছরের উত্তেজনার পর ব্রিটেন এবার আত্মহত্যা করলো! ডেবিড ক্যামেরোনকে সন্তানহারা পিতার মতো বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। প্রতি বছর অক্সফোর্ড ডিকশনারি নতুন আবিষ্কৃত শব্দ তালিকা দেখিয়ে অহংকার করে, কিন্তু আমার দৃষ্টিতে Brexit হবে নিকৃষ্টতম ইংরেজি শব্দ। অবশেষে ব্রেক্সিটকে শব্দ হিসেবে অক্সফোর্ড গ্রহণ করে কিনা, জানি না। এখন তো তাদের প্রিন্টেড অভিধানও নেই!  ব’ হলো সকল ‘বদ’ এর শুরু, বি’তে ব্যাড এবং বি’তে ব্রেক্সিট, যার আরেক অর্থ আত্মহত্যা। কোনটি বেশি খারাপ, বাংলা বদ, নাকি ইংরেজি ব্যাড? আচ্ছা বদ থেকে ব্যাড এসেছে, নাকি ব্যাড থেকে বদের উৎপত্তি? তার আগে একটি গল্প বলে নেই।

 

ধনী বাবার আদুরে ছেলে। বসে বসে খায় আর খেলে খেলে পেটের ভাত হজম করে। বড় ভাই কাবুল কঠোর পরিশ্রম করে বাবার সম্পদকে বৃদ্ধি করে চলেছে। কিন্তু ছোট ভাই আবুল ‍শুধুই দিবাস্বপ্ন দেখে আর মাসে মাসে বান্ধবী বদলায়। দিবাস্বপ্নটি হলো, একদিন সে তার বাবার সম্পত্তির মালিক হবে। অন্তত অর্ধেক সম্পত্তির মালিক তো সে হবেই, কারণ মাত্রই দু’ভাই।  অতএব তার আর কাজ করার কী দরকার!

সে কোন কাজ করে না, করার প্রয়োজনও পড়ে না। ছোট সন্তান হিসেবে সকলেই তাকে স্নেহের দৃষ্টিতে দেখে। তাকে পরিবারের সদস্য হিসেবে মনে করলেও তার শ্রম বা কাজ নিয়ে কেউ ভাবে না। বড় ভাই, প্রতিবেশি, মা, আত্মিয়স্বজন সকলেই এটি মেনে নিয়েছে।  ফলে পারিবারিক আয়বৃদ্ধিতে ছোট ছেলের অবদান নিয়ে কেউ ভাবে না। অথচ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সে-ই সকলের আগে। কেনই বা হবে না, সে তো ছোট সন্তান! তার একটু বাড়তি অধিকার তো থাকতেই পারে! তাছাড়া এত সম্পত্তি কে ভোগ করবে?  তার কি সেখানে ভাগ নেই?  অন্তত অর্ধেক?

কিন্তু তার আর তর সইছে না। হইহুল্লা আড্ডাবাজি করার জন্য দরকার যখনতখন যেকোন পরিমাণ টাকাপয়সা। বান্ধবির সাথে সময় কাটাতেওতো টাকার দরকার। ওদিকে বাবা তো চাইলেই টাকা দিচ্ছে না! এই বুড়োটা কবে মরবে? এই সম্পদ কি তারই নয়? অন্তত অর্ধেক?

বাবা তো তাড়াতাড়ি মরবে বলে মনে হচ্ছে না। বরং কামকাজ করে ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠছে! তবে কী করা? সবাই তাকে পছন্দ করে, বাবা কেন তাকে পছন্দ করে না? কেন শুধু নিজের পায়ে দাঁড়াতে বলে?  বাবা তার বড় সন্তানের সাথে সবসময় হাসিমুখে কথা বলে, অথচ তাকে দেখলেই সব হাসি থেমে যায়। সমাজের সবাই তার বড়ভাইয়ের প্রশংসা করে। বাবাকে সকলে ডাকে ‘কাবুলের বাবা’। কিন্তু বাবা তো আবুলেরও বাবা! এভাবে  বড়ভাইয়ের গুণের কাছে আবুল যেন দিন দিন ছোট হতে হতে মিশে যাচ্ছে। এরকম অস্তিত্বহীনতায় সে আর থাকতে চায় না।

এনিয়ে দীর্ঘ ২৩ বছর সে ভেবেছে এবং অপেক্ষা করেছে।  এখন সে প্রাপ্ত বয়স্ক। আর কত? এবার বাবার সাথে একটা এসপার-ওসপার করা দরকার। অনেক চিন্তা করে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক্সিট! সে পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যাবে। নাহ্ আর নয়!  বাড়ি থেকে বের হয়ে সে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। স্বাধীন হয়ে গেলে সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। জীবনকে সে উপভোগ করতে চায়। তার কিসের এতো চিন্তা?  বাবার সম্পদ আছে না? অন্তত অর্ধেক?

ছোট ছেলে আবুলের ‘এক্সিট’ প্রস্তাবে বাবা স্তম্ভিত এবং ব্যথিত! প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করার মতো উপযুক্ত কোন কথা বাবা খুঁজে পেলেন না। সন্তানদের নিয়ে তার সব স্বপ্ন ভেঙ্গে চুড়মার! তিনি শুধু বললেন, আগামি এক সপ্তাহ সময় দিলাম তোমাকে। এক সপ্তাহ পর রাতের খাবারে যখন সকলে উপস্থিত থাকে, তখন তোমার মনের কথা সকলের সামনে প্রকাশ করবে।

একটি সপ্তাহ আবুলের জন্য দীর্ঘ সময়। তবু সে খুশি মনেই মেনে নিলো। কারণ সে ভেবেছিলো, তার বাবা সাথে সাথে প্রত্যাখ্যান করবে অথবা খালি হাতেই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে।

এক সপ্তাহ পর আবুল রাতের খাবারের জন্য অপেক্ষা করলো।  সকলের উপস্থিতিতে সে জানিয়ে দিলো যে, সে আর পরিবারের সাথে থাকতে চায় না। প্রাপ্ত বয়স্ক হয়েছে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার তার আছে। বাবা একদিন পরিবারের সকলের উপস্থিতিতে ছোট সন্তানকে তার সম্পদের ভাগ বুঝিয়ে দিলেন। ছোট সন্তান সব বিক্রি করে দিয়ে বাড়িছাড়া হয়ে গেলো।

দূরদেশে চলে গেলো আবুল, যেখানে পরিবার বা আত্মীনস্বজনদের কেউ তাকে পাবে না। বাবার সম্পদের টাকা পেয়ে আবুল ধনী হলেও, তার স্বভাবের পরিবর্তন হলো না। ফলে কিছুদিন হিসেব করে চলার পর পূর্বের উড়নচণ্ডে জীবনে ফিরে গেলো এবং কয়েক মাসের মধ্যে সব টাকা খরচ করে ফেললো। তৃতীয় মাসের এক ভোর সকালে আবুল তার বাবাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে ক্ষমা চেয়ে বললো, সন্তান হিসেবে নয়, বাড়ির চাকর হিসেবে বাবা যেন তাকে একটি কাজ দেয়। সন্তানহারা বাবা সন্তান পেয়ে এবারও স্তম্ভিত এবং বাক্যহারা। আবুল ক্ষমা পেলো, কাজও পেলো। কিন্তু আর সেই সন্তানের সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে পারলো না।

 


ইউরোজোনে থেকে কিছুই লাভ হয় নি আমাদের।  সব লাভ নিয়ে গেছে উত্তর আর পূর্ব ইউরোপিয়ানরা। উত্তর ইউরোপিয়ানরা দলে দলে এসে আমাদের দেশ ময়লা করে ফেলেছে। দেশটারে শেষ ‘করি দিছে’!

ব্রিটেন হলো ইউরোপের মুকুট। আছে এর শতবছরের গৌরব আর প্রতিপত্তি। ইউরোপের গড়পরতা দেশগুলোর মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ব্রিটেন হারিয়ে যেতে বসেছিলো। ব্লা..ব্লা..

এই হলো ব্রেক্সিটপন্থীদের (৫১.৯/৪৮.১) মনোভাবের একটি সামারি পিকচার। অথচ বাস্তব পরিস্থিতি অন্যরকম। একান্তই একলা চলার মনোভাব থেকে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার ফল হিসেবে ৫১.৯% জনগণ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে থাকার বিপক্ষে মত দিয়েছে। এ মনোভাব বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং অগ্রগতির পরিপন্থী। ব্রিটেন একটি স্বার্থবাদী মনোভাব দেখিয়েছে। এতে তাদের কতটুকু লাভ হবে, সেটি দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এমুহূর্তে যতটুকু বলা যায়, তাতে তাদের ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল দেখা যাচ্ছে না।

 

ইউরোপের দরজা হিসেবে লন্ডন বা ইংল্যান্ডকে আর কেউ ব্যবহার করবে না।

ইউরোপের দরজা হিসেবে লন্ডন বা ইংল্যান্ডকে আর কেউ ব্যবহার করবে না। অন্তত পরিস্থিতি আর বিগত ৪৩ বছরের মতো এতো উদার হবে না। আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, পর্যটক, গবেষক সকলের জন্য লন্ডন ছিল সমগ্র ইউরোপের জন্য গেইটওয়ে। এই সুযোগকে বেশি কাজে লাগিয়েছে ব্রিটিশ ব্যবসায়িরা। তারা অন্যান্য ইউরোপিয় দেশে অবাধে রপ্তানি করেছে। ইংল্যান্ডও পেয়েছে বিশাল রাজস্ব আয়। উপকৃত হয়েছে ব্রিটিশ জনগণ।

 

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে থাকার সমস্ত সুবিধাগুলো হারালো।

ব্রিটেনবাসীরা সিদ্ধান্ত ফেললেও পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হতে কিছু সময় লেগে যাবে। তখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে থাকার সুবিধাগুলো হারাবে।

ব্রিটিশদের সূর্য একসময় ডুবতো না (সূর্য তো কখনও ডুবতো না আজও ডুবে না!)। এরকম বলা হতো, কারণ পৃথিবীটাকে ব্যান্ডেজ করে রেখেছিল ব্রিটিশ কলোনী। সে দিন আর নেই, চীন ভারত ইত্যাদি জনসংখ্যা বহুল দেশগুলোতে পুঞ্জিভূত হচ্ছে বিশ্ববাজারের মুনাফা।  এখন ব্রিটেনের একা থাকা মানে হলো বোকা থাকা।  জোটবদ্ধ থাকার সকল বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক ফায়দা হারাতে বসেছে আজকের ব্রিটেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন না হয় ছেড়েই দিলো, কিন্তু পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে ভৌগলিকভাবে কি বিচ্ছিন্ন থাকতে পারবে ব্রিটেন? বলতে কি পারবে, যাও তোমরা আর প্রতিবেশি নও? ফলে দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সম্পর্ক, কূটনৈতিক সুবিধাদি, জোটবদ্ধ হয়ে কোন সুবিধা আদায়, ইত্যাদি ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে যাবে সকল বিশেষ অধিকার।

ইইউ’র সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে বিছিন্ন হবার পর ইউরোপের দেশগুলোর সাথে স্বার্থের সম্পর্ক সৃষ্টির জন্য ব্রিটেনকে নতুনভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করতে হবে।একই ভাবে ইইউ’র সাথেও সম্পর্কের শর্তগুলো নতুনভাবে নির্ধারণ করে নিতে হবে।

 

বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাব খাটাবার শেষ অস্ত্রটুকু শেষ হলো।

কূটনীতি শুরু করতে হবে একদম ‘অ্যালফাবেট এ’ থেকে। বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাব খাটাবার শেষ অস্ত্রটুকু শেষ হলো। কমনওয়েলথ আর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তৈরি ও রক্ষার ক্ষেত্রে ব্রিটেন এখন আর ‘নেগোশিয়েটিং লেভারেজ’ পাবে না। উদ্যোগ নিতে হবে তাদেরকেই, কিন্তু অন্যরা পাবে এর সুবিধা।

কমনওয়েলথ বা সাবেক কলোনিগুলো তো আর বর্তমান কলোনি নয়। তারা স্বাধীন দেশ। অতএব কমনওলেথভুক্ত দেশগুলোর সাথেও নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

 

ব্যবসায়িক অংশীদার এবং শ্রম ও মূলধনের উৎস খুঁজতেও ব্রিটিশদেরকে এখন মরিয়া হয়ে দৌড়াতে হবে।

রাজনীতি না হয় বাদ দিলাম, ব্যবসায়িক অংশীদার এবং শ্রম ও মূলধনের উৎস খুঁজতেও ব্রিটিশদেরকে এখন মরিয়া হয়ে দৌড়াতে হবে। ভারত বা চীনের সাথে এককভাবে সম্পর্ক জোরদার করতে হবে নিজেদের তাগিদেই। বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেবার নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।

 

ভাই ডেভিড ক্যামেরোন, আপনার শেষের হলো শুরু! 

প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরোনকে এবার দিন গুণতে হবে। রাজ্য শাসন আর আগের মতো কুসুমাস্তির্ণ হবে না, হবার নয়। মূলত তিনি এই গণভোট চান নি, বরং ইইউতে থাকার পক্ষে জোর তৎপরতা চালিয়েছেন। কিন্তু  নিজদলের ভিন্নপন্থীদেরকে থামিয়ে রাখা, নতুন কোন রক্ষণশীল মতের উত্থান ইত্যাদি বহুমুখি চাপে পড়ে সরকার প্রধান হিসেবে তাকে এই ‘বিষের পেয়ালা’ পান করতে হয়েছে। কিন্তু এবার নিজ দলেও তার প্রভাব কমে আসবে। দলের এক্সিটপন্থীরা তার বিপক্ষে অনাস্থা প্রস্তাব এনে তাকে নামিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাকেও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

 

ব্রিটেনের আর্থিক ক্ষতি।

পাউন্ড এবং স্টকমার্কেটে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এটি তাৎক্ষণিক না হলেও পর্যায়ক্রমে।  এরকম পরিস্থিতিতে ক্যামেরোনের হাত শক্ত না থাকা মানে হলো, ইইউ’র সাথে উপযুক্ত দর কষাকষিতে ব্যর্থতা।  ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও ছেড়ে দেবার পাত্র নয়।  আরও কোন অর্থনৈতিক শক্তি সম্বলিত সদস্য যাতে ইইউ ছাড়তে না পারে, এজন্য তারা একটু নিষ্ঠুরভাবেই ব্রিটেনকে ছাড়পত্র দেবে। তাতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্রিটেন এবং ব্রিটেনবাসী।

ইউরোপ ছিলো ব্রিটিশ পণ্যের বিস্তৃত এবং নির্ভরযোগ্য বাজার। ব্রিটিশ পণ্যগুলো আর আগের মতো বিশেষ অধিকার বা নামে মাত্র শুল্কে রপ্তানি করতে পারবে না কোন ইউরোপিয়ান দেশে। ফলে রপ্তানি পড়বে অনি্শ্চয়তার মুখে।

 

অভিবাসন, আসা-যাওয়া আর আগের মতো নয়।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রায় ১২ লাখ ব্রিটিশ।  তারা নিজ দেশে পাঠাচ্ছে তাদের দৈনিক ও মাসিক আয়। সমৃদ্ধ হচ্ছে  ইংল্যান্ড।  অবশ্য অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশ থেকেও ব্রিটেনে গিয়ে কাজ করছে এরকম দৃষ্টান্তও কম নয়। তবে ইইউ ছাড়ার পর ব্রিটেনের ক্ষতি হবে বেশি, কারণ বাণিজ্যিক স্বার্থ তাদেরই যে বেশি।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের শর্ত অনুযায়ি, ব্রিটেন ইউরোজোন ছাড়া অন্য কোন দেশে থেকে অভিবাসী দিতে নেওয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ফলে বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে থেকে শ্রমিক রপ্তানি কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতি বছরই ব্রিটেন তাদের ভিজা দেবার শর্ত কঠোর করে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় গরিব দেশগুলো। ইংল্যান্ড যেহেতু ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এখন এসব দেশ থেকে মানুষ নেবার সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে। লন্ডনে বাংলাদেশি বংশদ্ভূত রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীরা অন্তত এরকমই আশা করছেন।

 

ইউনাইটেড কিংডম এর ‘ইউনাইটেড’ থাকা অনিশ্চিত হয়ে গেলো।

ইংল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড নিয়ে ইউনাইডেট কিংডম বা যুক্তরাজ্য, যাকে এপর্যন্ত ব্রিটেন বলে এসেছি। স্কটিশরা ইইউতে থাকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। আয়ারল্যান্ডও।  তারা যে ব্রিটিশ শাসনকে খুব একটা মেনে নিয়েছে তা কিন্তু নয় (২০১৪ সালে ৪৪ শতাংশ স্কটিশ স্বাধীন রাষ্ট্রের পক্ষে ভোট দিয়েছিল)। ইইউকে তারা ব্রিটিশদের ওপরে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পেয়েছিলো। এবার ব্রিটিশ-বিরোধী অংশটি আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠতে পারে।

ইইউ ছাড়ার সিদ্ধান্তে হয়তো এককভাবে ব্রিটেনের উন্নতি হবে, হয়তো হবে না। সর্বশেষ পরিস্থিতি হয়তো খুব তাড়াতাড়ি জানতে পারবো না। কিন্তু যা জানতে পারলাম তা হলো, ব্রিটিশরা আধুনিকতা, পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়গুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছে।  (২৪/জুন/২০১৬)

 

 

 

brexit-800x500

পরবর্তি ঘটনা প্রবাহ:  ভোটাররা আবার সুযোগ পেতে চান

ভোটার ১: যদিও আমি (ইইউ) ছাড়ার জন্যই ভোট দিয়েছি, ভোটের ফলাফলে সত্যিই আমি হতাশ। আজ সকালে ঘুম থেকে ওঠে যা দেখলাম তাতে আঘাত পেয়েছি। কিন্তু আমি যদি আবার সুযোগ পাই, তবে থেকে যাবার জন্যই ভোট দেবো।
ভোটার ২: মিথ্যাকে বিশ্বাস করে আমি ভোট দিয়েছিলাম এখন আমার খুব আফসোস হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমার ভোট সত্যিই ছিনতাই হয়েছে।
ভোটার ৩: আমি একটু আফসোসই করছি। আমি যা করলাম, এর পেছনে বিশেষ কোন যুক্তি ছিলো না।
ভোটার ৪: আমার ভোটটির জন্য আফসোস হচ্ছে।
ভোটার ৫: আমার ভোটটি যে এত বিশাল পরিণতিতে যাবে আমি বুঝতে পারি নি। ভেবেছিলাম অবশেষে আমরা (ইইউতে) থেকেই যাচ্ছি।

ব্রেক্সিটের প্রভাব ব্রিটেন এবং ব্রিটেনের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। শঙ্কার বিষয় হলো: গণভোট-ভিত্তিক মেরুকরণ শুরু হয়েছে। এবার শুরু হবে গণভোটের যথেচ্ছা ব্যবহার। ট্রাম্প-স্টাইলের উগ্রজাতীয়তাবাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধকে করে তুলছে যুক্তিসঙ্গত পরিণতি। কিছু ঘটনা খুব দ্রুত ঘটে গেলো:

✦ব্রেক্সিট বর্ণবাদকে আধুনিক স্টাইলে প্রতিষ্ঠিত করলো আবার। অন্যদেশ থেকে আগত কিন্তু ব্রিটেনের নাগরিকেরা বর্ণবাদের স্বীকার হচ্ছে যেখানে সেখানে। স্কুলের বাচ্চারা ব্রিটিশ অরিজিন বাচ্চাদের বুলি’র স্বীকার হচ্ছে। এসব নোংরামির একনম্বর স্বীকার হচ্ছেন নারী।
✦ব্রেক্সিট বাস্তবায়িত হলে স্কটল্যান্ড খুব শিঘ্রই যুক্তরাজ্য থেকে বের হবার আয়োজন করবে।
✦ইইউ থেকে ইটালি, ফ্রান্সের মতো ধনী দেশগুলোর উগ্র-জাতিয়বাদী দলগুলোও নিজ নিজ দেশে গণভোটের জন্য চাপ দেবে।

✦ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস-ক্যালিফোর্নিয়ার লোকেরা গণভোটের চিন্তা করছে। তারাও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হয়ে যাবে।

✦অনেকেই না বুঝে বা মিথ্যা প্রচারণায় প্রলুব্ধ হয়ে ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করেছে, তার ভোটে কিছু যাবে আসবে না। দিনশেষে ব্রিটেন ইইউতেই থেকে যাচ্ছে। সকালবেলা ঘুম থেকে জেগে তো চক্ষু চরক গাছ!
✦এরকম ১৯ লাখ ব্রিটিশ আবারও গণভোটের ব্যবস্থা করার জন্য চাপ দিয়েছে। কিন্তু ক্যামেরুন সাফ জানিয়ে দিলো, ’আর নয়। এত করে কইলাম শুনলা না। এবার প্রতিফল ভোগ করো। আমিও বিদায় নিচ্ছি।’ অজনপ্রিয় ক্যামেরুন আগেই বেশি কথা বলে বিষয়টাকে টক বানিয়ে ফেলেছিলেন। যা হোক।

✦ওদিকে যেসব গরীব দেশ শ্রমিক অথবা সস্তা শ্রমজাত পণ্য রপ্তানি করে একটু এগিয়ে যাবার ধান্ধা করছিলো, তারা পড়লো বিপাকে। বাংলাদেশ তার মধ্যে এক নম্বর।

 

ব্যক্তিগত পর্যালোচনা: ব্রিটেন কার স্বার্থে এ সিদ্ধান্তে গেলো?

দেশের জনগণ তো নিজেদের স্বার্থের কথাই ভাববে, এটিই স্বাভাবিক। দেশের যারা নেতা, তাদের দায়িত্ব আছে জনগণের মনোভাবকে আত্মকেন্দ্রীকতা থেকে পারস্পরিক সহযোগিতার দিকে পরিচালিত করা। আমার মনে হয়, যারা ব্রেক্সিটের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে, তারা সার্বিক বিষয়গুলো নিয়ে বেশি ভেবেছে। হয়তো ব্রিটেনের উন্নতি হবে, হয়তো হবে না। সর্বশেষ পরিস্থিতি হয়তো খুব তাড়াতাড়ি জানতে পারবো না। কিন্তু যা জানতে পারলাম তা হলো, ব্রিটিশরা আধুনিকতা, পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়গুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইইউ বর্তমানে দুর্বল আছে বলেই ব্রিটেনের প্রস্থান সহজ হলো। তবে মনে রাখতে হবে যে, ব্রিটেন একটি রাষ্ট্র, কিন্তু ইইউ একটি রাষ্ট্রপুঞ্জ। তাদের সংগঠিত হবার শক্তি এবং প্রয়োজনীয়তা উভয়ই বেশি। পরিণতি যেকোন দিকে মোড় নিতে পারে। কিন্তু আমার ইনটুইশন বলছে যে, ব্রিটেন রাষ্ট্র হিসেবে শক্তিশালী হলেও সেটি কখনও ইইউ’র দুর্বল হবার কারণ হবে না।

ইউ’র ক্ষতি হবে এবং বেশ কিছু চ্যালেন্জের মুখে পড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। কিছু দেশের ইইউ-বিরোধীরা (ফ্রান্স, ইটালি) ইতোমধ্যেই নিজ নিজ দেশে গণভোটের জন্য আওয়াজ তুলতে শুরু করেছে।

ইইউ ভেঙ্গে যেতে পারে, এর মানে এই নয় যে, ব্রিটেন সঠিক কাজটিই করেছে। ব্রিটেন একবিংশ শতাব্দিতে এসে একটি বিশ্বায়নবিরোধী এবং সামন্তবাদি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজন্য ব্রিটেন তার নিজেদের ক্ষতি এবং ইইউ’র সংশ্লিষ্ট ক্ষতির জন্য দায়ি থাকবে। ইতিহাস কাউকে ছাড়বে না।

 

ব্রিটেন ঐতিহাসিক ভাবেই স্বার্থপর জাতি। এদেশকে শোষণ করা শেষ হবার পর, যখন নিচে গরম লাগা শুরু করেছে, তখন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নাম দিয়ে বিদায় নিয়েছে। ওরা দু’শ বছর নাগাদ না থাকলে ভারত উপমহাদেশে আরও আগেই গণতন্ত্র জন্ম নিতো এবং আজ আমরা আরও পরিপক্ক গণতন্ত্র নিয়ে আরও সমৃদ্ধ দেশে থাকতে পারতাম।

 

 

প্রথম প্রকাশ এবং পাঠক প্রতিক্রিয়া

 

 


ইইউ-বিযুক্ত যুক্তরাজ্য এবং বাংলাদেশ: প্রকাশিত খবর অনুসারে হাসিনা ব্যক্তিগতভাবেও প্রভাব খাটিয়েছেন, ব্রিটেনকে ইইউ’র পক্ষে ভোট দিতে। এর প্রধান কারণ হলো, দেশের রপ্তানি-জাত পণ্যের জন্য ইইউ’র বিস্তৃত বাজার ও জিএসপি সুবিধা।  ইইউ ছাড়ার কারণে বাংলাদেশকে ব্রিটেনের সাথে আলাদাভাবে চুক্তি করতে হবে। তাতে পূর্বের সুবিধা কতটুকু থাকবে সেটা সময়ই বলে দেবে।

প্রশংসা যেভাবে সম্পর্কের জাল বিস্তার করে

 

11061602

সম্প্রতি একটি কর্মশালায় এমন একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে ফেসিলিটেটর হিসেবে পেলাম, যার অভিনব উপস্থাপনা নতুন একটি বিষয়ে আমাকে আগ্রহী করে তোলেছে।  বিষয়টি হলো: ‘গণ স্বাস্থ্য’, পাবলিক হেলথ।  দেশের সরকার গ্রাম পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক দিয়েও দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছে না।  প্রথমত চিকিৎসকরা গ্রামে থাকতে রাজি নন; দ্বিতীয়ত প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার কারণে।  দেশের মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত সকলেই বিদেশমুখী। মধ্যবিত্তরা যাচ্ছে ভারতে, উচ্চবিত্তরা সিঙ্গাপুর থাইল্যান্ড অথবা অস্ট্রেলিয়ায়। প্রফেসর ডক্টর কিমের প্রশ্নোত্তর-ভিত্তিক প্রশিক্ষণের সময় বারবারই আমি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার দিকে দৃষ্টি দিচ্ছিলাম।  তার বর্ণনায় নিজ দেশের পরিস্থিতি আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠলো, অথচ তিনি বাংলাদেশ নিয়ে কিছুই বলেন নি।  ভেবে দেখলাম যে, গরীব দেশের জন্য পাবলিক হেলথই একমাত্র ভরসা, কারণ সকলেই তো ভারতে বা সিংগাপুরে যেতে পারে না।

মনে মনে প্রফেসর কিমের প্রতি কৃতজ্ঞ হলাম।  সুযোগ পেয়ে তাকে বললাম, আপনি গণস্বাস্থ্যের প্রফেসর নন, এটি আপনার জন্য খুবই ছোট একটি নাম।  আপনি গণস্বাস্থ্যের প্রফেট (প্রবক্তা) এবং আমি দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছি।  খুশিতে তিনি উজ্জ্বল হয়ে ওঠলেন। এসুযোগে আমি গণস্বাস্থ্য সম্পর্কে বেশ কিছু প্রাসঙ্গিক সমস্যা তার সামনে তুলে ধরলাম এবং তার সহায়তা প্রার্থনা করলাম। এবং পেলামও। বাকি সময়ে বিভিন্ন সুযোগে তিনি আমাকে গণস্বাস্থ্য সম্পর্কে এমন পরামর্শ দিলেন, যাকে আমি অতিরিক্ত প্রাপ্তি বলে মনে করি।  কর্মশালার অন্য কোন প্রশিক্ষণার্থী এত সুযোগ পায় নি।

তারপর আমাদের মধ্যে পরিচয় বিনিময় হলো। সম্প্রতি আমার কর্মস্থলে গণস্বাস্থ্য নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু করার জন্য আমার ওপর দায়িত্ব পড়েছে।  বিষয়টি নিয়ে আমি খুবই চিন্তিত।  কিন্তু প্রফেসরের সাথে কথা বলার পর আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, ভবিষ্যতে যে কোন সময়ে তার কাছ থেকে সবরকমের সহযোগিতা পাবো অথবা তার মাধ্যমে উপায় বের করতে পারবো।

অন্যের কাছে সহায়তার অনুরোধ সম্পর্ক সৃষ্টির উত্তম পন্থা হিসেবে কাজ করে।  সেখানে প্রাসঙ্গিক প্রশংসা থাকলে, সেটি বিশেষ গ্লু হিসেবে কাজে আসে। একটি প্রাসঙ্গিক মূল্যায়ন এবং একটি প্রশংসা এভাবেই একটি মূল্যবান সম্পর্ক সৃষ্টিতে সাহায্য করে।

 

জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের জন্য কত কিছুই না আমরা করি। কিন্তু  কিছু পথ অনেকের কাছে অধরাই থেকে যায়। কারণ, অত্যন্ত আত্মকেন্দ্রিকভাবে নিজেদেরকে সজ্জিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। মানবিক উপায়গুলো নিয়ে ভাবার সময় পাই না। দক্ষতা আর অভিজ্ঞতার জন্য অনেক শ্রম ও সময় দিচ্ছি আমরা।  স্বাভাবিকভাবেই সেটি আমাদেরকে সম্মানিত এবং গর্বিত করে।  হয়তো প্রথমত এভাবেই চেষ্টা করতে হয়।  কিন্তু কখনও কি মনে হয় নি যে, সেগুলো অপর্যাপ্ত?

মাঝেমাঝে কি এমন মনে হয় না যে, আমাদের ‘সামর্থ্যের দম্ভ’ সম্পর্ক সৃষ্টিতে বাধা তৈরি করে? অজান্তেই অন্যের কাছে অহংকারী করে তোলে?  অথচ দেখুন,  অফিসের নতুন কর্মীটি খুব সহজেই বড়কর্তার আপন হয়ে যায়।  সে কিছুই শিখেনি, মাত্রই সেদিন যোগ দিয়েছে! আমরা কিন্তু বিস্মিত হই! মাঝেমাঝে মনে হয় না যে, ব্যক্তিগত দুর্বলতাই মানুষকে অন্যের কাছে আপন করে তোলে?

কর্মস্থলে যারা দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন, তাদেরই উদ্দেশ্যে মনস্তাত্ত্বিকরা বলেন, প্রথমে চাই আন্তরিকতা, তারপর দক্ষতা।  প্রথমে আন্তরিকতা দেখিয়ে মানুষকে আপন করতে হয়, তারপর আসে দক্ষতা বা সামর্থ্য প্রদর্শনের বিষয়।  এই পরম্পরাটি সম্পর্ক সৃষ্টি ক্ষেত্রে অবশ্য পালনীয়।

মানুষ মাত্রই ভুল।  মানুষ মাত্রই অসম্পূর্ণতা। অসম্পূর্ণতা স্বাভাবিক এবং মানবিক। আমরা অতিমানব দেখে খুব একটা অভ্যস্ত নই।  হঠাৎ কাউকে এমন পেলে, তাদেরকে শ্রদ্ধা জানাই এবং অনুপ্রাণিত হই। কিন্তু সম্পর্ক সৃষ্টির জন্য চাই কিছু অসম্পূর্ণতা।

আমাদের দুর্বলতা এবং ছোট ছোট ভুল অন্যের কাছে নিজেদেরকে পরিচিত করে তোলে।  তারা আপন ভাবতে শুরু করে তখনই, যখন তাদের দুর্বলতাগুলো অামাদের মধ্যেও দেখতে পায়।  বিষয়টি এতই গভীর এবং বিশ্লেষণসাপেক্ষ যে, এক লেখায় শেষ করা যায় না। তবে গভীরভাবে ভাবলে সহজ হয়ে আসে।

নিজের দুর্বলতায় অন্যের সাহায্য চাওয়া এবং অন্যের মধ্যে ইতিবাচক বিষয় দেখতে পাওয়া দু’টি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক গুণ।  সুন্দর মন অন্যের মধ্যে সুন্দরকে দেখতে পায়।  ইতিবাচক মনোভাবই ইতিবাচক অভিজ্ঞতা পেতে সাহায্য করে।

 

110616

“যে ব্যক্তি প্রশংসা পায়, সে সবসময়ই প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কিছু করে।”

 

একটি আন্তরিক এবং সত্যিকার প্রশংসা যেভাবে সম্পর্ক সৃষ্টি করে:

  • ইতিবাচকতা বৃদ্ধি পায়, নেতিবাচকতা (থাকলেও) দৃষ্টির বাইরে চলে যায়
  • ইতিবাচক বিষয়ে অন্য ব্যক্তিটি অনুপ্রাণিত হয়
  • মন্তব্যকারী গভীর চিন্তাশীল ও বিচক্ষণ ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়
  • অন্য ব্যক্তিটি ভিন্নভাবে নিজেকে আবিষ্কার করতে পারে এবং মন্তব্যকারীর কথা মনে রাখে
  • অন্য ব্যক্তিটির ইতিবাচকতা বৃদ্ধি পায় এবং এজন্য সে মন্তব্যকারীর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে…ইত্যাদি

 

প্রসংশা করতে পারা মানে হলো, একটি কঠিন মানবিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। মানুষের ইতিবাচক দিকগুলো দেখতে পাওয়া এবং স্বীকৃতি দেওয়ার কাজটি একটু কঠিন, কারণ আত্ম অহমিকা। আত্ম অহমিকা আমাদেরকে আত্মপ্রকাশে বাধা সৃষ্টি করে। অন্যের ভালো দিক দেখা এবং স্বীকৃতি দেবার মধ্য দিয়ে সে গুণগুলো নিজের মধ্যেও গ্রহণ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

নিজের মূল্যায়ন করলে দেখতে পাই যে, খুব বেশি প্রশংসা আমি করি না। বরং মানুষের অসম্পূর্ণতাই বেশি চোখে পড়ে। কারও মধ্যে ইতিবাচক কিছু দেখতে পাই না।  শুরুতেই তার নেতিবাচক এবং দুর্বলতার প্রতি দৃষ্টি আটকে যায়। সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হলো, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং স্বার্থপরতার কারণে অন্যের বিষয় নিয়ে বেশি ভাবি না। ফলে, তার ভালো দিকটি আড়ালে পড়ে যায় এবং তার সঙ্গে সম্পর্ক আগায় না। এভাবে তো কর্মজীবন চলতে পারে না!

 

 

 

 


টীকা: লেখাটি প্রশংসা, সম্পর্ক সৃষ্টি এবং কর্মস্থলে নেটওয়ার্কিং বিষয়ক। অন্যের ভালো দিকের প্রতি মনযোগী হওয়া সম্পর্কে উৎসাহ দেবার জন্য লেখাটি প্রস্তুত করা হয়েছে। তোষামোদি বা অসৎ স্তুতিবাদের সাথে একে মেশানো যায় না।

যেসব কাজ করে আমাদের শিক্ষকেরা শিশুদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করছেন!

8

তুমি আছো তবু তুমি নেই!  পরিস্থিতি ঠিক এরকমই।  শিক্ষক উপস্থিত, প্রতিদিন পড়াচ্ছেন, পরীক্ষা নিচ্ছেন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন করছেন -তবুও যেন তিনি নেই।  ঘাটতি কাটছে না।  এই ঘাটতি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে।  শিশুদের বিকাশকে করছে বাধাগ্রস্ত।  এমন কয়েকটি বিষয় নিয়ে বর্তমান লেখাটি।

 

আমাদের দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের হার মাত্র ৫৭.৭৩ শতাংশ।  অর্থাৎ ৪২ শতাংশ শিক্ষক কোন প্রায়োগিক ধারণা ছাড়াই আমাদের শিশুদের মুখোমুখি হচ্ছেন।  এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা চাকরির আগেই প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, নাকি পরে নিয়েছেন, সেটি অবশ্য স্পষ্ট নয়।

তবে বাস্তব চিত্রটি আরও বিপদজনক, কারণ ব্যক্তিগতভাবে বেড়ে ওঠা বিদ্যালয়গুলো এই প্রতিবেদনে নেই। পৌর এলাকায় ছত্রাকের মতো বেড়ে ওঠা ইংরেজি মাধ্যম এবং কেজি স্কুলগুলোও এখানে নেই।  কিছু সুপরিচিত বিদ্যালয় বিষয়ভিত্তিক পাঠদানের ওপর তাদের শিক্ষকদেরকে প্রশিক্ষণ দিলেও, শিশু মনস্তত্ত্ব বা শিশুর অন্যন্য চাহিদাকে কেন্দ্র করে কোন প্রশিক্ষণ প্রায় নেই।  এটি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক (বিএড অথবা এমএড পর্যায়ে) শিক্ষায়ই থাকে।

শিশুর বয়স অনুপাতে পাঠদান এবং পাঠ মূল্যায়ন করতে পারা একটি বিশেষায়িত জ্ঞান।  প্রশিক্ষণ অথবা বাস্তব অভিজ্ঞতা কোন কিছুই নেই, এমন শিক্ষকই বেশি থাকায় শিশুর চাহিদার বিষয়টি উপেক্ষিত থাকছে।

শিশুর মনমানসিকতা এবং তাদের বৈচিত্রময় চাহিদাকে না বুঝে আমাদের অধিকাংশ শিক্ষক প্রায় জোর করেই পাঠ্যপুস্তককে গলাধকরণ করাচ্ছেন। ফলে শিশুরা তাদের উপযুক্ত পাঠ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং বিদ্যালয় হয়ে যাচ্ছে পরীক্ষা পাশ করানোর এজেন্সি।

 

এমন একটি পরিস্থিতি যে, এসব ভয়ংকর পরিস্থিতি নিয়ে তাত্ত্বিকভাবে অনেক কিছুই বলার সুযোগ আছে।  অনেক প্রায়োগিক ত্রুটি হচ্ছে, যা স্থায়ি প্রভাব ফেলছে শিশুদের প্রতিভা বিকাশে।  এবিষয়ে বিস্তারিত বললে পাঠকের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটবে।

কিন্তু কিছু মৌলিক বিষয়ে আমাদের মতো আমজনতার সচেতনতার প্রয়োজন।  তা না হলে পারস্পরিক জবাবদিহিতা গড়ে ওঠবে না।  তাতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠতে পারে।  তাই শুধু মৌলিক কিছু বিষয় নিয়ে বর্তমান লেখাটি।

 

শিশু মনস্তত্ত্ব বিষয়ে প্রায়োগিক জ্ঞান না থাকায় অনেক শিক্ষক ‘ঠিক এভাবে’ শিশুদের প্রতিভার বিনাশ করছেন:

 

1

১) অপ্রয়োজনীয় শব্দ/বিষয়/পরিভাষাকে পাঠের মূল বিষয় হিসেবে পরিচিত করিয়ে

বাঁশে তেল মাখার পর এটি কেন অথবা কীভাবে পিচ্ছিল হয় শিশুকে এসব বুঝার আগেই, তৈলাক্ত বাঁশ দিয়ে বানরের ওঠানামাকে পাটিগণিতের মূল বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

নীলনদ মিশরের আশির্বাদ, পক্ষান্তরে হুয়াংহু চিনের দুঃখ; অথবা হাওয়াই রাজ্যের রাজধানী হনুলুলু এসব বিষয় মুখস্থ করানোর জন্য এদেশে শিশুদের ওপর শারীরিক নির্যাতন হয়েছে।  অথচ নিজের দেশের তিনটি প্রধান নদীর অবস্থানকে সেভাবে শেখানো হয় নি।  নিজের গ্রামের পাশের শাখা নদীটি কোথা থেকে  এলো, অথবা এটি আদৌ নদী নাকি নদ, সেটিও সেভাবে বুঝানো হয় নি।

‘ডাক্তার আসিবার আগেই রোগী মারা গেলো’ এর ইংরেজি অনুবাদ করতে পারাকে ইংরেজির জ্ঞান বলে তুলে ধরা হয়েছে।  কথা বলা নয়, অনুবাদ আর শব্দার্থ শিখতে পারাকেই ভাষাজ্ঞান বলে বিশ্বাস করানো হয়েছে।  ফলে তারা অনুবাদ শিখলেও ভাষাগত জ্ঞান থেকেছে অধরা।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটিই এমন।  যখন যা প্রয়োজন, তখন সেটি  শেখানো হয় নি। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় পরিভাষা, বয়সের অনুপযুক্ত ইতিহাস ও ভূগোল শেখানোর জন্য শিশুর মনস্তত্ত্বে স্থায়িভাবে আঘাত হানা হয়েছে।

 

2

২) অনুপযুক্ত বিষয় চাপিয়ে দিয়ে

পাঠদানকে সহজ করা অথবা ‘বোধগম্য অংশে’ ভাগ করা শিক্ষকের প্রাথমিক দায়িত্ব।  প্রশিক্ষণের অভাবে হোক, অথবা প্রতিশ্রুতিশীলতার অভাবে, অধিকাংশ শিক্ষক সেটি করেন না।

উপরন্তু, শিশুদের জন্য যা উপযুক্ত নয়, সেসব বিষয় চাপিয়ে দেন: যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন, সেটি দেওয়া হয় মুখস্ত করার জন্য।  যে বিষয় দেওয়া হয় শুধুই প্রাথমিক ধারণা দেবার জন্য, সেটি প্রয়োগ করতে বাধ্য করা হয়।

লেখা থেকে শোনা, তারপর পড়া, তারপর শেখা।  তারপর প্রয়োগ।  শব্দ রচনা থেকে বাক্য রচনা।  বাক্য থেকে অনুচ্ছেদ। তারপর রচনা বা চিঠি।  এসব পারম্পরিক প্রক্রিয়া আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে অনুপস্থিত।

রচনা, চিঠি, ভাবসম্প্রসারণ, অনুচ্ছেদ – এসব বিষয় শিশুদের স্বাভাবিক চিন্তা থেকে আসা উচিত।  এখানে শুদ্ধতা নয়, চর্চাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।  কিন্তু একটি শুদ্ধ রচনা পরীক্ষার খাতায় লেখার জন্য শিশুদেরকে মুখস্ত করতে বাধ্য করা হয়।

রোট লানিং বা বোধহীন মুখস্ত করার প্রবণতা শিশুদের স্বাভাবিক বিচার শক্তিকে নষ্ট করে দেয়।

আমাদের শিশুরা সৃজনশীল কোনকিছু লেখতে পারে না।  ইংরেজি কী লেখবে, বাংলাই তো লেখতে শিখে নি!

 

 

3

৩) নিজেই সবকিছু করে দিয়ে

পাঠ্যবইয়ে লেখাই থাকে ‘নিজে করো’।  কিন্তু দয়ার্দ্র্য শিক্ষক সেটি শিশুকে দিয়ে করাতে চান না!

পাঠ্যবইয়ের অনেক বিষয়ই শিশুরা হয় ‘একা অথবা দল’ হিসেবে করে ফেলতে পারে।  তাতে শিক্ষকেরও শ্রম কমে যায়।  কিন্তু শিক্ষক সেটি না বুঝার কারণে, অথবা নিজের প্রয়োজনীয়তা অটুট রাখার জন্য, শিক্ষার্থীদেরকে নিজে থেকে কিছু করাতে চান না।

শিশুরা চ্যালেন্জ নিতে এবং নিজেই কিছু করে দেখাতে পছন্দ করে।  কিন্তু অনেক শিক্ষক শিশুদের এই স্বাভাবিক প্রবণতাকে শিক্ষাদানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

ফলে শিশুরা পরনির্ভশীলতা থেকে ওঠে আসতে পারে না। পাঠ্যবইয়ের বাইরে তারা কিছুই করতে বা লেখতে বা সৃষ্টি করতে পারে না।

বড় ক্ষতি হলো, তারা নিজে থেকে কিছুই করার সাহস পায় না, কারণ শিক্ষাজীবনে এই অভ্যাসটি তাদের গঠিত হয় নি।

 

 

4

৪) নিজের দায়িত্ব পালন না করে

পাঠপরিকল্পনা না করা।  এই অভ্যাসটি প্রায় নেই বললেই চলে।  আমাদের শিক্ষকেরা ক্লাসের আগে পাঠপরিকল্পনা (লেসন প্লান) তৈরি করাকে অতিরিক্ত কাজ বলে মনে করেন। অথচ এটি তাদেরই পেশাগত দক্ষতাকে শানিত করে।  পরিকল্পনা ছাড়া কার্যকর এবং অংশগ্রহণমূলক পাঠদান অসম্ভব।

পরীক্ষা এবং শ্রেণীকক্ষ ভিত্তিক পাঠদানের জন্য উপযুক্ত প্রস্ততি না নেওয়া।  যেহেতু দৈনন্দিন পাঠদানের জন্য কোন পূর্বপ্রস্তুতি নেই, একই কারণে পরীক্ষা বা গুরুত্বপূর্ণ কোন মূল্যায়নের জন্য শিশুরা কার্যকর দিকনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হয়।

কোন্ বিষয়টি শিশুদের বৈচিত্রময় সামর্থ্যের সাথে সাংঘর্ষিক, শিক্ষক এসব বিষয়ে ধারণা রাখেন না।  ফলে কঠিন বিষটি তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে আরও কঠিন হয়ে আবির্ভূত হয় শিশুদের মাঝে।

নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সাথে না থাকা।  কিছু বিশেষ সময় শিশুদের দরকার হয় শিক্ষকের সঙ্গ – মাবাবার কার্যকারিতা কম। শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে থেকেও শিশুদের থেকে অনেক দূরে থাকেন।  সেটি মনস্তাত্ত্বিক অথবা ভৌগলিক উভয়ই হতে পারে।

একটি কঠিন বিষয়ের সমাধানের সময়, শিক্ষকের সাহচর্য্য প্রয়োজন।  শিক্ষক তার ব্যক্তিত্ব ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ দিয়ে নিজেকে শিশুদের মধ্যে ‘এভেইলেবল’ রাখবেন, এটিই প্রত্যাশিত।  এই প্রত্যাশিত আচরণটি শিক্ষকদের মধ্যে পাওয়া যায় না।

অভিভাবকদেরকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত না করা। শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন বিদ্যালয় এবং অভিভাবকের সমন্বিত প্রচেষ্টা।  অভিভাবককে যথাসময়ে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, যা অনেক শিক্ষক পালন করেন না, অথবা এর গুরুত্ব মূল্যায়ন করেন না।

 

 

5

৫) শুধুই পাঠ্যপুস্তকের অনুশীলনী মোতাবেক পাঠদান করে

পাঠ্যপুস্তকে দেওয়া অনুশীলনী মোতাবেক পাঠদান করা সহজ, তার প্রধান কারণ সেটি বাজারের নোটে সমাধান করা আছে। দ্বিতীয় কারণ হলো, এতটুকুতেই শিক্ষক অভ্যস্ত।

পাঠ্যপুস্তকের বাইরে যাওয়া কঠিন, কারণ তাতে শিক্ষকের অতিরিক্ত চিন্তা করতে হয়। ভালোমতো ভাবতে না পারলে শিক্ষার্থীদের কাছে বিব্রত হবার সম্ভাবনা।  বিব্রত হবার ভয় আছে, কারণ আমাদের শিক্ষকেরা ‘সবজান্তা’ হিসেবেই নিজেকে প্রদর্শন করতে চান।

কিছু বিষয়ে ঘাটতি থাকতে পারে, কিছু বিষয় শিক্ষার্থীদের সমবেত চেষ্টা থেকে বের হয়ে আসতে পারে।  এটি আমাদের অধিকাংশ শিক্ষক বিশ্বাস করতে নারাজ।

পাঠ্যবইয়ের বিষয় নিয়েই অতিরিক্ত প্রশ্নপত্র সৃষ্টি করা যায় এবং তাতে শিশুদের মধ্যে আগ্রহ ও কৌতূহল বৃদ্ধি পায়।  নতুন বিষয়কে সমাধান করে তারা আনন্দ পায়।  বড় সুফল হলো, তাদের দক্ষতার বিস্তৃতি ঘটে।

পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ থাকার এই প্রবণতার ভয়ংকর দিকটি হলো, শিশুরা পাঠ্যবিষয়কে জীবনের সাথে মেলাতে পারে না।  পাঠ্যবইয়ে গুরুজনকে সালাম জানাবার বিষয়টি শিখে পরীক্ষার খাতায় লেখে আসলেও, সামনে কোন বয়স্ক ব্যক্তিকে পেলে তারা সম্মান জানাতে ভুলে যায়।

জীবন আটকে যায় পাঠ্যপুস্তকের পাতায়।

 

 

6

৬) পরীক্ষা/গাইডবুকমুখী পাঠদান করে

প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিটি আবশ্যিক বিষয়ে ‘শিক্ষক সহায়িকা’ আছে।  প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষক সেটি অনুসরণ করেন না।

অপ্রত্যাশিত হলেও, এটি প্রচলিত সত্য যে, পরীক্ষার লক্ষ্যেই তারা পাঠদান করেন।  আমাদের সমাজে শিক্ষক  এবং অভিভাবকের যৌথ প্রয়াসটি হলো: বিদ্যাদান নয়, পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি প্রদান করা।

যেহেতু পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতেই হবে, সেহেতু গাইড বই পড়ো।  গাইড পরীক্ষায় পাশ করালেও, এটি সবসময়ই জীবনের দিকনির্দেশনায় ‘মিসগাইড’ করে।

ফলে শিশুরা বিদ্যার জন্য পড়ার সুযোগ বা স্বাধীনতা কিছুই পায় না। এমনকি নিজের চেষ্টায় ‘স্বাভাবিক সামর্থ্য  দিয়ে পাশ করার’ সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত।  কৃত্রিম উপায়ে জিপিএ ফাইভ পাওয়াতে পারলেই আমাদের শিক্ষকগণ খুশি।

অধিকাংশ শিশুদের তাদের ঐকান্তিক চাওয়া ও স্বপ্নের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে যুক্ত করতে পারে না।

 

 

7

৭) পাঠ্যপুস্তকই জীবনের সবকিছু, বাকি সব অপাঠ্য -এমন ধারণা দিয়ে

“আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, স্বশিক্ষাই একমাত্র শিক্ষা।” বলেছেন আইজাক আসিমভ।  প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হয়তো পরীক্ষায় পাশ করায়, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত সত্য হলো,  কর্মসংস্থানের পরীক্ষায় এসে সকলেই একবার করে হাবুডুবু খেতে হয়।

পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের শিক্ষক (এবং অভিভাবকেরা) পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞানকেই বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় মনে করেন।  তাদের এই অপবিশ্বাস তারা শিশু এবং সন্তানদের মধ্যেও ইনজেক্ট করেন।  অবুঝ শিশুরা তখন কিছুই বুঝতে পারে না, যে পর্যন্ত না জীবনের প্রধান পরীক্ষা অর্থাৎ কর্মসংস্থানের মুখোমুখি হচ্ছে।

পরিণতি হলো ঘরকুনো হয়ে শুধুই পাঠ্যপুস্তকের বিষয় গলাধকরণ করা।  পরীক্ষা, শিক্ষক আর অভিভাবকের  সমবেত চাপের কারণে নিজেদের পছন্দের বইটিও তারা পড়তে পারে না।  বরং ‘আউট বই’ পড়াকে তারা অপরাধ হিসেবেই বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছে।

নজরুলের মতো উড়নচণ্ডেরাই প্রতিভাবান হয়। মাটির সাথে যুক্ত না থাকলে যেমন তরু বাঁচে না, প্রকৃতি থেকে বিযুক্ত শিক্ষা কখনও ফলদায়ক হতে পারে না।

এরকম একমুখী চাপের কারণে শিশুরা তাদের স্বাভাবিক জ্ঞানার্জন ও প্রাকৃতিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়।

 

 

আমাদের শিক্ষানীতিতে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু শ্রেণীকক্ষের পাঠদানকে উন্নয়ন করার জন্য বিশেষ কোন ব্যবস্থা আজও নেওয়া হয় নি। পাঠদান সম্পর্কে মৌলিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই এদেশে চাকরি পাওয়া যায়।

আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঘিরে বিস্তর গবেষণা হচ্ছে।  অনেক উন্নয়নও হচ্ছে।  কিন্তু উন্নয়নের নামে যখন শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করা হয়, তখন ধরেই নেওয়া যায় যে, প্রাথমিক শিক্ষার কোন ভবিষ্যত নেই।

 

[প্রথম প্রকাশে লেখাটি ৬২০০ বার শেয়ার হয়েছে:  সামহোয়্যারইন ব্লগ/ ১০ এপ্রিল ২০১৬]

 

বিদ্যালয় আমারে শিক্ষিত হতে দিলো না

▶সাউথপোলার অথবা স্বশিক্ষিত ক্ষণজীবীরা [৬ অগাস্ট ২০১৬]

 


 

টীকা:

১) ব্যতিক্রম কি নেই: ইচ্ছাকৃতভাবেই কিছু বিষয়কে সরলিকরণ করা হয়েছে, যেন প্রচলিত শিক্ষাদান পদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা যায়।  আমার জানামতেই অনেক শিক্ষক এবং অভিভাবক আছেন, যারা শিশুদের সৃজনশীলতাকে প্রেরণা দেবার জন্য নিজেদের ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াকে বিসর্জন দিয়েছেন। এমন রত্নগর্ভা মাতা আমাদের মধ্যে আছে।  দুঃখের বিষয় হলো, তাদের সংখ্যাটি খুবই নগণ্য।

২)  শিক্ষানীতিও কি দায়ি নয়:  প্রজাতন্ত্র হোক কিংবা রাজতন্ত্র, রাষ্ট্রই সবকিছু নির্ধারণ করে দেয়। যার ক্ষমতা, তারই দায় থাকে।  শিক্ষানীতিই সবকিছুর জন্য দায়ি। এবিষয়ে আলাদাভাবে লেখার খায়েশ আছে।

৩) দৃষ্টান্তগুলো কি পর্যাপ্ত: দৃষ্টান্তগুলো কেবলই একেকটি প্রতীক।  এগুলোর যথার্থতার চেয়ে প্রাসঙ্গিকতাকে বেশি বিবেচনা করা হয়েছে।

৪) সৃষ্টিহীন শিক্ষা কি স্রষ্টাহীন দেশের জন্য দায়ি:  পশ্চিমারা শিক্ষায় আবিষ্কারে অভিযানে এগিয়ে থাকে, এটিই যেন স্বাভাবিক। গুটি কয়েক জগদীশ, রবীন্দ্রনাথ আর ফজলুর রহমান ছাড়া এদেশে আর কোন প্রতিভাবান নেই বা ছিল না। কেন নেই, কেন ছিল না সেটি নিয়ে মাঝে মাঝে ভাবিত হই।  দেশের সৃষ্টিহীন শিক্ষা ব্যবস্থা কি এর জন্য দায়ি?

 

 

 

ইদানিং রাখাল বালক


 

 

১) গন্তব্যহীন সন্তরণ আর কত ভালো লাগে!

.

ইদানিং জীবন সাগরে সন্তরণে

সনাতন আলসেমি আঁকড়ে ধরে…

মনোযোগ মনোসংযোগ ইদানিং

প্রতিনিয়ত প্রতিরোধ করে।

.

ইদানিং সুহৃদ-সঙ্গ রসরঙ্গ

আটকে আর রাখে না…

নিজের সাথে নিজের সঙ্গ

প্রতিবাদী বোধের অঙ্গ

ঝগড়া হলেও রাগে না।

.

ইদানিং গোপন কিছু অনুভবে

বুকের ছাতি থাকে ধোঁয়াচ্ছন্ন…

ছলনার ডাক আর ছদ্ম রোগে!

নিঃসঙ্গতা নীলাকাশে একাকার…

পাখির ডাকে চকিত হৃদয়

ইদানিং ধুকধুক করে বুকে।

.

.

২) সূর্যের পরশ পেলেই বোধগুলো নিশাতুর প্রাণীর মতো সজাগ হয়ে ওঠে। সজীব হয়ে ওঠে; না হয় পালিয়ে যায়। বলা যায় সাবধান হয়ে যায়। পক্ষান্তরে অবাঞ্ছিত বোধগুলো কিছু সময়ের জন্য প্রস্থান করে। এমনকি দিনের বেলাতেও একটু অন্ধকার পেলেই বুকের গহীনের নিষিদ্ধ স্পর্শভুক অনুপ্রাণীগুলো যেন আসকারা পেয়ে যায়। অন্ধকার যদি নাও থাকে, একটু একাকীত্বেই ওদের পোয়াবারো! ঘিরে ধরে একাকী রাখালকে। আর রাখালের কথা তো বলাই বাহুল্য। মাত্র একবার কি দু’বার সে প্রত্যাখ্যান করবে। তৃতীয়বারের আবেদন সে ফিরিয়ে দেয় কীভাবে! কখনও দেয়নিও।

.

তাই রাখাল বালকের জন্য সূর্যালোক শুধু আলো আর তাপের উৎস নয়। এটি তার পাহারাদার। স্পর্শভুক থেকে নিরাপত্তা। কিন্তু কতকাল সূর্যের আলো তাকে পাহারা দিয়ে রাখবে? স্পর্শভুক প্রাণীগুলোর কি মরণ নেই? অতএব এটি এখন শৈশবের ঐকিক অংকের মতো সোজা। অর্থাৎ রাখাল বাবুর বিপদ অবশ্যম্ভাবী। এ যেন নিয়তির নিয়মে নির্ধারিত! আহা, করুণা করারও সময় গেলো বলে!

.

.

[বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রথম আলো ব্লগ থেকে স্থানান্তরিত:  ১৪ মে ২০১৪]

১১টি দক্ষতা, যা শেখা কঠিন কিন্তু জীবনের জন্য দরকারি

বাজারে অনেক রকমের দক্ষতার সদাই হয়।  মানুষ আজ কত দক্ষ হয়ে ওঠছে, সেটি বিশ-ত্রিশ বছর আগের মানুষের সাথে তুলনা করলেই বুঝা যায়।  কিন্তু পরিতাপের বিষয়টি হলো, মানুষ একদিক দিয়ে দক্ষ হচ্ছে, অন্যদিক দিয়ে সম্পর্কগুলো নষ্ট হচ্ছে।  বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, পরিবার ভেঙ্গে যাচ্ছে, ডিভোর্সের হার বেড়ে যাচ্ছে।  উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষের বড় ক্ষতিটি হলো, নিজের ক্যারিয়ার ধ্বংসের মুখে পড়ে যাচ্ছে। তাই তথাকথিত দক্ষতাগুলো থেকে নিজেকে একটু ভিন্ন অবস্থানে রাখা উচিত।

পুনরাবৃত্তি হলেই দক্ষতা চলে আসে।  অথবা বাস্তব জীবনে চর্চার মাধ্যমে আসে।  কিন্তু কিছু দক্ষতা আছে, যা কর্মজীবীদের প্রশিক্ষণ ম্যানুয়ালে তেমন নেই।  কিছু বিষয় আছে, যা প্রচলিত অর্থে দক্ষতা নয়, কিন্তু দক্ষতার চেয়েও বেশি সুফল এনে দেয়।  সেগুলো একটু কঠিন, কারণ শুধু পুনরাবৃত্তি দিয়ে হয় না, উপলব্ধি আর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে আসে।  কঠিন হলেও এসবের অনেক উপকারিতা আছে।

 

-চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা-

-অপ্রয়োজনীয় আলাপ বা অন্যের সম্পর্কে গালগপ্পো নিয়ন্ত্রণ করতে পারা-

-নিজের কাজে মনসংযোগ রাখতে পারা-

-অন্যকে শোনা-

-কোন সময় চুপ থাকতে হয় সেটি বুঝতে পারা-

-নিজের সাথে ইতিবাচক কথোপকথন-

-অভ্যাসের ধারাবাহিকতা-

-অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়া-

-সময় ব্যবস্থাপনা-

-অন্যের প্রতি সহানুভূতি থাকা-

-ঘুমের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা-

✿✿✿✿✿✿✿

 

 

1313-crop

১১)  চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা

আমরা আমাদের চিন্তারই ফসল। আমরা যা ভাবি যেভাবে ভাবি, আমাদের আচরণ তা-ই প্রকাশ করে। প্রথমত চিন্তাকে যাচাই করতে হয়, যেন সেখানে ক্ষতিকারক কিছু না থাকে।  চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে, আমরা যা করতে চাই তা করতে পারি।

কিন্তু সকলেই যা করতে চায় তা করতে পারে না। এজন্য বলা হয়, সবাই ভালোভাবে ভাবতে পারে না।  অথবা, সবাই ভালোভাবে তাদের চিন্তাকে প্রকাশও করতে পারে না। চিন্তাকে সুষ্টুভাবে প্রকাশ করতে পারলেই একে নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতা চলে আসে।

এর সাথে আরেকটি দক্ষতা জড়িয়ে আছে: সকল অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকার দক্ষতা।  এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দক্ষতা।  মিথ্যা আত্মসন্তুষ্টি নয়, কিন্তু পরিস্থিতিকে ঠাণ্ডা মাথায় মূল্যায়ন করে করণীয় নির্ধারণ করতে পারা।

অতীত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে শুদ্ধ করাই হলো ভালো চিন্তার ফল।

 

১০)  অপ্রয়োজনীয় আলাপ বা অন্যের সম্পর্কে গালগপ্পো নিয়ন্ত্রণ করতে পারা

মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সম্পর্ক।  টাকাকড়ি সবই হারালে পাওয়া যায়, কিন্তু সম্পর্ক হারালে তা কখনও পূর্বের অবস্থায় পাওয়া যায় না। তাই সম্পর্ক গড়া এবং রক্ষা করা জীবনের জন্য খুবই দরকারি।

সম্পর্ক রক্ষার জন্য প্রথম শর্ত হলো আস্থা। অনেকের মতে, এই আস্থাকে নষ্ট করে ফেলার জন্য প্রথমে দায়ি হলো, পেছনে কথা বলার অভ্যাস।  কারও অনুপস্থিতিতে তার বিষয়ে নেতিবাচক আলোচনা করলে তাতে আস্থা নষ্ট হয়ে যায়।

কিন্তু মজার বিষয় হলো, অন্যের পেছনে কথা বলা খুবই মজার এবং তাতে দ্রুত কারও বন্ধু হয়ে যাওয়া যায়। প্রবাদে আছে, দু’জনের শত্রু একই ব্যক্তি হলে সেই দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব অনিবার্য। কিন্তু সম্পর্ক ও আস্থার দিক থেকে এটি খারাপ একটি অভ্যাস। একজনের সাথে শত্রুতা অনেকের সাথে আস্থার সংকট সৃষ্টি করতে পারে।  তাই অন্যের পেছনে আলাপ নিয়ন্ত্রণ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।

এসব পরিস্থিতিতে যা করতে হয়, তা হলো নিশ্চুপ থাকা।  কৌশলে অন্য বিষয়ে আলোচনাকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়। অথবা বলা যায়, “আমরা কি বিষয়টি বদলাতে পারি?”  ক্রিড়া বা রাজনীতির মতো জনপ্রিয় অথবা গরম ইস্যু ছেড়ে দেওয়া যায় আলোচনার টেবিলে।

 

৯)  নিজের কাজে মনসংযোগ রাখতে পারা

মনসংযোগ ধরে রাখা কঠিন কাজ। এ দক্ষতা অর্জন করতে কারও কারও জীবন শেষ হয়ে যায়।

নিজের কাজে লেগে থাকা কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি দক্ষতা।  কারণ বর্তমান যোগাযোগ প্রচুক্তির এদিনে বাড়তি বিপত্তির শেষ নেই।  মোবাইল ফোন, মেসেজ এলার্ট, সোস্যাল নেটওয়ার্কিং, ইমেইল, ইন্টারকমে সহকর্মী, বসের কল ইত্যাদি লেগেই আছে।  যারা নিজের অবস্থানকে উন্নত করতে চান, তারা এসবকে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে রাখেন।

মনযোগ নষ্ট করার আরেকটি সহজাত প্রবণতা হলো অন্যের কাজে নাক গলানো। অন্যের দুর্বলতা নিয়ে মেতে থাকা। নিজের কাজে মনোযোগ দিলে অন্যদিকে মনোযোগ দেওয়া অসম্ভব।

অন্যের ভুলত্রুটি থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিজের দুর্বল দিকগুলোতে মনোযোগ দিলেই কেবল উন্নয়ন সম্ভব।  মনসংযোগ ধরে রাখতে পারা একটি মূলবান দক্ষতা।

 

৮)  অন্যকে শোনা

কিছু মানুষ আছে যারা শুনে অর্ধেক, বুঝে চারভাগের একভাগ এবং চিন্তা করে শূন্য পরিমাণ, কিন্তু প্রতিক্রিয়া করে দ্বিগুন।  তারা কথা না বলে শুনতে পারে না। কিন্তু শোনা মানে হলো ‘চুপ থাকা’।

মানুষের সাথে সম্পর্কের শুরু হয় তাকে শোনার মধ্য দিয়ে।

শোনার মধ্য দিয়ে অনেক পেশাগত ও সামাজিক সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যায়।

একটি ব্যস্ততম কল সেন্টারের ব্যবস্থাপককে জিজ্ঞেস করা হলো, কীভাবে তিনি অগণিত অভিযোগের নিষ্পত্তি করেন। ব্যবস্থাপক শুধু সংক্ষেপে জানালেন যে, ৮০% অভিযোগ শুধু শুনে এবং লিখে রাখাতেই সমাধান হয়। বাকি ১০% অভিযোগ শেষ হয় অপেক্ষায়। অর্থাৎ কিছুদিন পর্যবেক্ষণে রাখলেই ১০% অভিযোগের সমাধান হয়। মাত্র ১০% অভিযোগ নিয়ে বাস্তবিকভাবে তাদেরকে কাজ করতে হয়। এক্ষেত্রে মূল চাবিকাঠি হলো, গ্রাহকের অভিযোগগুলো পূর্ণ মনযোগ এবং সহানুভূতির সাথে শুনে যাওয়া।

শোনা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দক্ষতা যেটি নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে আয়ত্ত করা যায়।  এর নিজস্ব কিছু কৌশল আছে যা ব্যক্তিগত আগ্রহের মাধ্যমে নিজের আচরণে অন্তর্ভুক্ত করা যায়

 

 

 

1212

৭)  কোন্ সময় চুপ থাকতে হয় সেটি বুঝতে পারা

কোন বিষয়ে রাগ অথবা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয় না।  আমাদের চারপাশে অনেক সমস্যা আছে, যা একার পক্ষে সমাধান করা যায় না।  আমাদের দরকার শুধু চুপ থাকা।  অথবা উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করা।

অনেক সময় কথা বলার চেয়ে নিশ্চুপ থাকাই সঠিক অবস্থান। তা না হলে পরে পস্তাতে হতে পারে। নিরবতাই উপযুক্ত উত্তর, এমন পরিস্থিতিতে আমরা সকলেই পড়ি।  শুধু দরকার সেটি বুঝতে পারার।

চুপ থাকা মানেই দায়িত্ব এড়িয়ে চলা নয়, অন্যকে করার সুযোগ করে দেওয়া।

চুপ করা মানে অন্যকে কথা শেষ হতে দেওয়া।

চুপ করা মানে নিজের সঠিক মেজাজটুকু ফিরে পাবার জন্য সময় নেওয়া।

অনেক বিষয় আছে যা নিজের মধ্যে রাখাই উত্তম।  আমরা যখন রাগ করি, অথবা যখন হতাশ হই, বা যখন বিরক্ত হই, তখন কিছু না বলাই ভালো। তাতে অপ্রয়োজনীয় বা অনাকাঙ্ক্ষিত মুখ থেকে বের হয়ে আসতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত না নিয়ে চুপ করে চিন্তা করাই উত্তম। মেজাজ স্বাভাবিক হলে সঠিক পদক্ষেপটি গ্রহণ করা যায়।

যখন আমরা উত্তেজিত হয়ে পড়ি, সেটা চরম দুঃখে অথবা চরম আনন্দের কারণে হতে পারে, তখন নিজের মুখকে বন্ধ রাখলে ভবিষ্যত আক্ষেপ থেকে নিজেকে বাঁচানো যেতে পারে।

কাজটি খুবই কঠিন, কিন্তু যারা এটি আয়ত্ত করতে পেরেছেন তারাই শুধু জানেন এর কত উপকার।

 

৬)  নিজের সাথে ইতিবাচক কথোপকথন

অন্যেরা আমাদের সম্পর্কে কী ভাবে, অবশেষে সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় না।  গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা নিজেরা নিজের সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করি।

নিজের সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে সময় লাগে।  কিছু অমূল্য গুণ আছে যা অনেকেরই থাকে না।  অথচ সেটি আমাদের দরকার। এজন্য নিজেদের সাথে ইতিবাচক থাকা খুবই প্রয়োজন।

ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে আত্মসমালোচনা করলে অভাবনীয় ফল আসে।  এটি মূলত নিজের সাথে ‘নেতিবাচক কথা’ বলা। চর্চা করলে আস্তে আস্তে সেটি ইতিবাচক এবং প্রেরণামূলক আত্মকথনে রূপ নিতে পারে।

 

৫)  অভ্যাসের ধারাবাহিকতা

কোন একটি  বিষয়ে ধারণা নিতে চাইলে প্রয়োজন নিয়মিত চর্চা।

তাই প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিষয়টি সময় দেবার মতো কি না।  তাতে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে কি না।

যদি উত্তর হ্যাঁ-সূচক হয়, তবে শেষ না হওয়া পর্যন্ত লেগে থাকতে হবে।  একেবারে বাদ দেবার চেয়ে বরং অনিয়মিতভাবে করাও উত্তম।

অনেকে নিজের অবস্থান ভালো করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে, কিন্তু সেখানে পৌঁছে অথবা কাছাকাছি গিয়ে আন্তসন্তুষ্টিতে ভোগে। অথবা অলসতায় পড়ে যায়। এসবকে অতিক্রম করার জন্য যা কিছু করা হয়, সেটিই অভ্যাসের ধারাবাহিকতা।

 

 

৪)  অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়া

একটি চাকরির সাক্ষাৎকারে নিয়োগকর্তারা সাফ জানিয়ে দিলেন যে, “আপনি একাজটি করতে পারবেন না যদি অন্যের সাহায্য নেবার ইচ্ছা বা দক্ষতা না থাকে।” নিজের কাজে অন্যকে সম্পৃক্ত করতে পারা একটি দারুণ দক্ষতা।

চাকরিতে যোগদানের পর দেখা গেলো পূর্বে ব্যক্তি তার চাকরিটি হারিয়েছিলেন শুধু এজন্য যে, তিনি সমস্যাকে গোপন করতেন এবং কারও অংশগ্রহণের সুযোগ রাখতেন না।

অন্যের সাহায্য নেওয়ার মধ্যে অতিরিক্ত যে জিনিসটি পাওয়া যায় তা হলো, কাজের মধ্যে অংশীদারিত্ব বেড়ে যায়। এর সফলতা ও ব্যর্থতায় সকলেই ভাগ পায়। কাজটি হয়ে যায় সকলের। কিন্তু কৃতীত্ব একজনেরই, যিনি সকলকে সম্পৃক্ত করতে পারলেন।

এখানে আরেকটি বিষয় হলো, ঠিক ‘কখন অন্যের সাহায্য নেবার প্রয়োজন’ সেটি বুঝতে পারা। অন্যের অংশগ্রহণ কখন দরকার, সেটি পরিমাপ করতে পারা আরেকটি বিশেষ গুণ।

অন্যের সাহায্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে আমরা অন্যের সামর্থ্যকে যেমন মাপতে পারি, তেমনি পারি নিজের নেতৃত্বদানের যোগ্যতাকে যাচাই করতে।

বিষয়টি একই সাথে অন্যের আস্থা অর্জনেরও সুযোগ করে দেয়। তাতে ক্রমেই আমাদের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায়। এটি একটি দক্ষতা বটে!

 

৩)  সময় ব্যবস্থাপনা

সময় ব্যবস্থাপনার কোন  সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি বা পথনির্দেশ আজও আবিষ্কৃত হয় নি। বিষয়টি পুরোপুরি ব্যক্তির একক সৃজনশীলতার ওপর নির্ভরশীল।

অন্যদিকে একটি প্রতিষ্ঠানের জুনিয়র থেকে সিনিয়র পদের ব্যক্তি সবারই সময় সীমাবদ্ধতাকে মেনে চলতে হয়।

ফলে সময় ব্যবস্থাপনা যারা ভালোমতো করতে পারেন, তারা সকলের মনযোগ আকর্ষণ করেন সহজেই। চাকরিদাতারাও এ গুণটিকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেন এবং এটি কর্মী মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

একজন জৈষ্ঠ্য কর্মকর্তা বলেছিলেন, কাজটি করা নয়, কাজটির ‘পরিকল্পনা করাই’ আমার কাছে সবচেয়ে বেশি কঠিন লাগে। এর একটিই কারণ, কাজ অনুযায়ি সময়কে উপযুক্তভাবে ভাগ করতে পারা।

সময় ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটি দক্ষতা হলো, অগ্রাধিকার বুঝতে পারা। কোন্ কাজটি আগে, এবং কোন্ কাজটি পরে করতে হবে।

একটি ‘টু-ডু লিস্ট’ এখানে সহজ উপায়।  তাহলে নিজের কাজগুলো ‘দৃশ্যমান পরিকল্পনায়’ রূপ নেয় এবং সময় ব্যবস্থাপনা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।

 

 

২)  অন্যের প্রতি সহানুভূতি থাকা

আমরা যত দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং চৌকস কর্মকর্তা হই না কেন, অন্যের অনুভূতির প্রতি যত্নশীল না হলে ওসব যোগ্যতা কোন কাজেই আসে না।  ওগুলি বরং আত্মঅহংকারে ফুলিয়ে তোলে আমাদেরকে।

অন্যের অনুভূতির প্রতি গুরুত্ব না থাকলে ‘নিজেদের যোগ্যতা ও দক্ষতা’ কেবলই প্রতিপক্ষ তৈরি করে।

নিজেদের যুক্তি ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আমরা মানুষকে মুগ্ধ করতে পারি, কিন্তু তারা আমাদের আচরণ দ্বারাই কেবল প্রভাবিত হয়।  মানুষ আমাদের কথা শুনে, কিন্তু আচরণকে অনুভব করে।  এই অনুভবই তাদের বেশি মনে থাকে।

অন্যের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব থাকলে, জীবনের অনেক কিছু সহজ হয়ে যায়।  সবচেয়ে বেশি সহজ হয় যেটি, তা হলো সম্পর্ক।

অন্যকে আপন করতে পারা একটি বিরল মানবিক গুণ, যা মুহূর্তে আমাদেরকে অন্যের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে।

অন্যের প্রতি সহানুভূতি একটি বিশেষ গুণ।  কর্মক্ষেত্রে একে দক্ষতা বলা হয়, কারণ নিজের চেষ্টা দিয়েই কেবল একে অর্জন করা যায়।

 

১)  ঘুমের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা

যোগ ব্যায়াম মানুষের দেহ ও মনকে সতেজ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।  কিন্তু দালাই লামা বলেছেন, ঘুমই সর্বোত্তম যোগ ব্যায়াম।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় যে, যারা ঘুমের রুটিন মেনে চলতে সমর্থ হয়েছেন তারা শোয়া মাত্রই ঘুমিয়ে পড়তে পারেন।  এবং সময়মতো ঘুম থেকেও ওঠতে পারেন।  কর্মজীবীরা জানেন, এই অভ্যাস কত মূল্যবান।

যারা দিনের সময়টিতে সতেজ এবং ক্লান্তিহীন থাকতে চান, কেবল তারাই জানেন পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারা কত ভালো একটি গুণ।

পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার বিষয়টি অনেকটাই ব্যক্তির অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে।  যারা রাতে ভালো ঘুমাতে চান, সাধারণত তারা বিকালের পর ক্যাফেইনযুক্ত কিছু পান করেন না। বিভিন্নভাবে শারীরিক খসরত বাড়িয়ে দেন। তাদের ধূমপানের অভ্যাস তাদের কম, অথবা নেই।  তারা ঘুমের বেশ আগেই টিভি অথবা কম্পিউটারটি বন্ধ করে দেন।

কেউ কেউ বিছানার পাশে বই রাখেন।  ঘুমের আগে প্রিয় বইটি পড়লে ঘুম আসতে পারে।

কিছু কারণ আছে প্রাকৃতিক।  যেমন: কাজের চাপ থাকা, কোন ডেডলাইন সামনে থাকা, ব্যবসায়িক লোকসান। ইত্যাদি নানাবিধ দুশ্চিন্তা।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, কম ঘুমের কারণেই মানুষের দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। আবার দুশ্চিন্তা বেড়ে যাবার কারণেই কম ঘুম হয়।

যারা ঘুমকে দৈনন্দিন সকল কাজের মধ্যে মিলিয়ে নিতে পেরেছেন, তারাই কাজ এবং বিশ্রামকে আলাদা করতে পারেন। তাই আধুনিক কর্মজীবীরা ঘুমকে একটি দক্ষতা হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

 

 

 

 


বিজনেস ইনসাইডার এবং লেখকের আরেকটি পোস্ট অবলম্বনে।

ছবিগুলো গুগল অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত।

 

দালাই লামার সুখতত্ত্ব: Philosophy of Happiness

কর্মজীবীদের মধ্যে যারা ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও পড়তে পারে না, আমি হলাম তাদের মধ্যে একজন।  সিলেক্টিভ রিডিং এবং স্পিড রিটিং আমার পাথেয়।  এটিও সবসময় করতে পারি না।  অথবা বলা যায় করি না, কারণ স্বার্থপর কাজের পর আর কোন নিঃস্বার্থ বিষয়ে মনযোগ দেবার সময় থাকে না।  এই অপরাধবোধে সবসময় আমি ভাসি।  কিন্তু কিছু বিষয় আছে, যা আপনাআপনি এসে দৃষ্টিসীমানায় পড়ে এবং পড়ার জন্য  স্বার্থপর পাঠককে আকৃষ্ট করে।  দালাই লামা এমনই একটি বিষয়, যাতে দৃষ্টি পড়ার পর একটি সীমা পর্যন্ত আমি পড়েই চলেছিলাম। যতই পড়েছি, ততই গভীরে গিয়েছি। এভাবে বেশ কিছু দিন দালাই লামার দর্শনবৃত্তে, বলা যায়, আটক ছিলাম।  ছাড়া পেয়ে কিছু অভিজ্ঞতা কলমবন্দি করে রাখলাম, যেন স্মৃতি রোমন্থন করতে পারি।

 

দালাই লামার ‘আত্মসুখ দর্শন’ যেকোন দর্শক বা পাঠককে মুগ্ধ করবে।  মানুষ সাধারণত সুখ প্রত্যাশী। তাই স্বার্থপরের মতো শুধু তার ‘সুখ দর্শনকেই’ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি। নিজের জন্য কিছু না থাকলে দর্শন দিয়ে মানুষ কী করবে!  দালাই লামার দর্শনে স্বার্থপরের মতো সুখের সন্ধান করতেই বলা হয়েছে। ব্লগের পাতায় লেখাটি যত দীর্ঘ দেখাক না কেন, বিস্তারিত বলতে পারি নি!

 

শুরুতেই একটুখানি কামিনী রায় চেখে নেই:

পরের কারণে স্বার্থে দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মত সুখ কোথাও কি আছে?
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
পরের কারণে মরণের সুখ ;
“সুখ” “সুখ” করি কেঁদো না আর,
যতই কাঁদিবে ততই ভাবিবে,
ততই বাড়িবে হৃদয়-ভার।

 

১) সুখ কী/ মানুষ কী চায়

মানুষ বাঁচে আশায় এবং আশাকে সংজ্ঞায়িত করলে এর অর্থ দাঁড়ায়, ভালো কিছু ঘটার প্রত্যাশা।  আমি মনে করি, ভবিষ্যৎ সুখের ওপরই আমাদের অস্তিত্ব নির্ভর করে আছে। -এই হলো দালাই লামার সুখ তত্ত্ব। তিনি মনে করেন, জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো সুখের সন্ধান করা। কিন্তু, সুখ শুধু সন্ধানেই আসে না।  অনেক সময় সুখের প্রত্যাশা যখন সর্বনিম্ন তখনই সেটি আসে।

 

এটি আসে একটি উষ্ণ হৃদয় থেকে। তিনি বলেন, সুখের চূড়ান্ত উৎস টাকাপয়সা এবং ক্ষমতা নয়, ঊষ্ণ হৃদয়। উষ্ণ হৃদয়ের পরিচয় হলো, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ এবং ইতিবাচক মনোভাব।

তার মতে, আমরা যে শান্তি ও সুখের (tranquility and happiness) সন্ধান করছি, সেটি লাভ করা যায় অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং অনুকূল মনোভাবের মধ্য দিয়ে।

দালাই লামা বলেন, অন্যের প্রতি আমাদের দয়া এবং ভালোবাসা থাকলে সেটি শুধু অন্যকেই উপকৃত করে না, কিন্তু আমাদের অন্তরে সৃষ্টি করে সুখ ও শান্তি। এরজন্য প্রয়োজন একটি উদার মন এবং উন্মুক্ত হৃদয়।

কিন্তু উদার মনের জন্য চাই উন্মুক্ত হৃদয়। মন হলো প্যারাশুটের মতো।  উন্মুক্ত থাকলেই সেটি বেশি কাজ করে। এটি দালাই লামার কথা।

অন্যকে সুখে রাখার প্রচেষ্টাতেই প্রকৃত সুখ।  এই অভিজ্ঞতা সকলেরই আছে।  কাউকে কিছু দিতে পারলে, কাউকে ক্ষমা করতে পারলে, অসম্ভব সুখানুভূতি হয় নিজের মাঝে। দালাই লামা বলেন, যদি অন্যকে সুখে রাখতে চান তবে দয়ার চর্চা করুন, যদি নিজে সুখি হতে চান তবু দয়ার  চর্চা করুন।

 

সুখ হলো, নিজের অনেক শুভাকাঙক্ষী থাকা। কিন্তু নিজেকে আগে রাখলে শুভাকাঙ্ক্ষী আসে না। দালাই লামা বলেন,  মনে রাখবেন, যখন পারস্পরিক ‘সম্পর্ক’  পারস্পরিক ‘চাহিদার’ চেয়েও ঊর্ধ্বে চলে যায়, সেটিই হলো উত্তম সম্পর্ক।

 

সুখ হলো, দয়ালু হতে পারা।  তিনি বলেন, দয়ালু হোন যখনই সম্ভব হয়।  এটি সবসময়ই সম্ভব। কিন্তু তিনি মনে করিয়ে দেন যে,  শুধু দয়ার্দ্র হলেই চলবে না, সেটি কাজে প্রকাশ করতে হবে।

 

সুখ হলো, ভালোবাসতে পারা।  তিনি বলেছেন, যাকে আপনি ভালোবাসুন তাকে ওড়ার মতো ডানা দিন; ফিরে আসার মতো আশ্রয় দিন; এবং সাথে থাকার মতো কারণ দিন।

 

 

২) সুখের সাথে মনের শান্তি এবং রাগ দমনের সম্পর্ক

মনে শান্তি না থাকলে, একে সুখ বলা যায় না।  কিন্তু দালাই লামা বলেন, আমাদের মনের শান্তির চরম শত্রু হলো রাগ।

এই রাগ খুবই কঠিন এক মানবিক বিচ্যুতি।  একে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই মনোভাবের পরিবর্তন।  এখানেই সহানুভূতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের প্রতি সত্যিকার মমত্ববোধ থাকলে অন্যদের প্রতিকূল আচরণ বা দুঃখ পেলেও সেটি পরিবর্তন হয় না।

রাগের সাথে অহংকারের একটি আজন্ম সম্পর্ক আছে। এর আরেকটি উপসর্গ হলো, ঘৃণা।

রাগ এবং ঘৃণা মাছশিকারীর বড়শির মতো ওৎ পেতে থাকে। আমাদের চেষ্টা থাকতে হবে যেন ওটাতে আটকে না পড়ি। এটি দালাই লামার পরামর্শ।  তিনি বলেন, যারা আপনার প্রতি ভুল করে এবং ক্ষতি করে, তাদেরকে ঘৃণা করা উচিত নয়। কিন্তু অনুকম্পার মাধ্যমেই আপনি তাদেরকে থামাতে পারেন, কারণ অন্যের ক্ষতি করে তারা নিজেদেরই ক্ষতি করছে।

রাগ করা মানেই হলো, অন্যের আচরণ দ্বারা আমি প্রভাবিত হচ্ছি।  এটি এক প্রকার পরাজয়।  দালাই লামা বলেন, অন্যের আচরণ দ্বারা আপনার প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত হতে দেবেন না।

 

নেতিবাচক বিষয়কে ভুলে যাবার ক্ষেত্রে তিনি শিশুদের দৃষ্টান্ত নিয়ে এসেছেন। শিশুদের কথা ভাবুন।  অবশ্যই এরা ঝগড়া করে। কিন্তু সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের মতো বেশি সময় তারা রাগ পুষে রাখে না। প্রাপ্তবয়স্কদের অনেকেই শিশুদের চেয়ে বেশি শিক্ষিত, কিন্তু বিশাল হাসির মধ্যে যদি ঘৃণা লুকিয়ে থাকে তবে শিক্ষার কী মানে আছে? শিশুদের মধ্যে এরকম ভনিতা নেই। কারও প্রতি রাগ থাকলে তারা সরাসরি প্রকাশ করে এবং ওখানেই তার সমাপ্তি হয়। পরেরদিনই সেই বন্ধুকে নিয়ে খেলতে পারে।

প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শান্ত থাকতে পারলে এবং বর্তমানকে মূল্যায়ন করতে পারলে আমরা মনের শান্তি রক্ষা করতে পারি।  এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে পরের অংশে।

 

 

৩) সুখ ও শান্ত মনোভাব: শান্ত থেকে বর্তমান সময়কে গুরুত্ব দেওয়া

শান্ত এবং নিজের কাজে মনসংযোগের জন্য অনেকে ব্যায়ামের কথা বলেন।  কেউ কেউ যোগ ব্যায়াম চর্চা করেন;  বিভিন্ন মেথডে ধ্যান করেন।  কিন্তু সবকিছুর জন্মস্থান হলো, মন এবং মনোভাব। দালাই লামা বলেন, আশাবাদী মনোভাবকে বেছে নিন, অপেক্ষাকৃত ভালো অনুভব হবে।

আমাদের মনোভাবকে দূষিত করে দেয় প্রতিপক্ষের আচরণ।  তিনি বলেন, আপনি সঠিক মনোভাব পোষণ করলে দেখবেন যে,  প্রতিপক্ষই আপনার সবচেয়ে ভালো শিক্ষক।  কারণ তাদের উপস্থিতি আপনাকে সহনশীল, ধৈর্য্যশীল এবং বোধ সম্পন্ন হবার সুযোগ করে দেয়।

সামর্থ্য থাকলে অন্যকে সাহায্য করুন। না পারলে করবেন না।  কমপক্ষে কারও ক্ষতির কারণ হবেন না। এটি দালাই লামার কথা।

আমরা সবসময় আগে থাকতে চাই, আগে সুযোগ পেতে চাই। রাস্তায় নামলে এটি বেশি দেখা যায়।  নিজেকে স্বার্থের সংকীর্ণতা থেকে বাইরে নিয়ে আসতে পারলে আমরা জীবনের তাৎপর্য, উদ্দেশ্য এবং সন্তুষ্টি লাভ করতে পারি।

কৃতজ্ঞতাবোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক গুণ।  অনেক সময় অন্যদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার কারণটি আমরা বের করতে পারি না, অথবা মনে রাখতে পারি না।  দালাই লামার মতে, কৃতজ্ঞতাবোধ থাকলে স্বাভাবিকভাবেই অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের সৃষ্টি হয়।

আরেকটি গুণ হলো, আত্মসন্তুষ্টি। তিনি বলেন,  অসন্তুষ্ট থাকলে আপনি শুধুই আরও চাইবেন।  আপনার চাওয়ার কোন শেষ থাকবে না।  কিন্তু যখন আপনি আত্মসন্তুষ্টির চর্চা করবেন, তখন উপলব্ধি করবেন যে, ইতোমধ্যেই আপনার প্রয়োজনীয় সব আছে।

মনে রাখবেন যে, প্রত্যাশামতো কিছু না পাওয়ার মানে হতে পারে সৌভাগ্যের বিস্ময়কর পরশ।  এটি দালাই লামার কথা।

নিজেকে ক্ষমা করা। বিষয়টির ব্যাখ্যা প্রয়োজন।  দালাই লামা বলেন, নিজেকে ভালো না বাসলে অন্যকে ভালো বাসা যায় না। অন্যকে ভালোবাসার সামর্থ্য থাকে না।  নিজের জন্য মমতা না থাকলে অন্যের প্রতি মমতা সৃষ্টি হয় না।

নিজের সাথে নিজের শান্তি না থাকলে আমরা কখনও বাইরের সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারি না।

 

শান্ত কীভাবে থাকবো, যদি প্রতিনিয়ত ভুল হয়?  নিজের সাথে নিজের শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রয়োজন ভুলকে সঠিকভাবে দেখতে পারা। দালাই লামা বলেন, ভুল যখন বুঝতে পারেন তখনই সংশোধনের ব্যবস্থা নিন। কোন সমস্যার সমাধান না করতে পারলে অহেতুক দুশ্চিন্তার মধ্যে কোন ফল নেই।

 

সময় নির্বিঘ্নে বয়ে চলে। আমরা যখন কোন ভুল করি, তখন সময়কে আটকে দিয়ে চেষ্টা করতে পারি না। আমরা যা করতে পারি তা হলো, বর্তমান সময়কে ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারি।

এটি মনে রাখা প্রয়োজন যে, মহৎ প্রেম এবং মহৎ অর্জনের সাথে বৃহৎ ঝুঁকি জড়িত।  ঝুঁকি আর বিপদ, জীবনের অংশ।

প্রতিটি দিনকে মূল্যায়ন করলে, ঝুঁকি আর বিপদগুলো তরল হয়ে যায়। দালাই লামা বলেন, চলুন আমরা প্রতিটি দিনের গুরুত্বকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করি।

 

 

৪)  ‘সুখের সাথে মুখের কথার’ সম্পর্ক

সুখের সাথে কথা বা আলাপচারিতার সম্পর্কটি নিবিড়।  কথা বলে আমরা সম্পর্ক তৈরি করতে পারি, আবার কথা বলেই অনেক দিনের গড়া সম্পর্ককে চিরতরে ছিন্ন করে দিতে পারি।  কথা বলে প্রেরণা দিতে পারি, কথা বলেই স্থায়িভাবে কাউকে থামিয়ে ‍দিতে পারি।

অনেক সময় উচিত কথাটি/ সমুচিত জবাবটি না দেওয়া পর্যন্ত আমরা স্বস্তি পাই না। বলার পরে তৃপ্তি পাই।  কিন্তু ওই তৃপ্তি খুবই সাময়িক।  উচিত কথাটি বলে দেবার একটু পরই অস্বস্তি শুরু হবে – অপরাধবোধ সৃষ্টি হবে। মনে হবে, না বললেই ভালো ছিল।  থুথু যেমন ফেরত নেওয়া যায় না, তেমনই বলা কথা ফিরিয়ে আনা যায় না।

কথা বলার একটি কর্মশালায় প্রধান স্লোগানটি এসেছিল প্রশ্নের আকারে:  আপনার কথা কি গড়ে তোলে, নাকি ধ্বংস করে?

উপযুক্ত সময়ে কথা বলা যেমন জরুরি, তেমনি উপযুক্ত সময়ে চুপ থাকা বা কথা না বলাটাও দরকারি। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘অনেক কথা যাও যে বলে, কোন কথা না বলি।’  না বললে অনেককিছু বুঝানো যায়, বললে শুধুই বলাটুকু।

দালাই লামা বলেন, মানুষ অনেক সময় কথা বলেই মুগ্ধতা সৃ্ষ্টি করে; অনেক সময় নিরব থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ মুগ্ধতা সৃষ্টি করা যায়। নীরবতা অনেক সময় সর্বোত্তম উত্তর হিসেবে গণ্য হয়।

কথা বলেই অন্যকে গড়ে তুলতে পারি।  এখানে ইতিবাচক মনোভাবের প্রয়োজন। অন্যের ইতিবাচক দিকটি উপলব্ধি করতে পারা একটি মূল্যাবান গুণ।  দালাই লামা বলেন, প্রশংসার ভূমিতে উৎপন্ন হয় সকল উত্তমের বীজ।

 

 

৫)  সুখ ও বৈষম্যহীনতা: সকল মানুষই সমান, সকলেরই চাহিদা এক

সব বর্ণের মানুষের মধ্যে সংহতি সৃষ্টি করার জন্য দালাই লামা চমৎকার যুক্তি দিয়েছেন।  একে খণ্ডন করা প্রায় অসম্ভব।  যা খণ্ডন করা যায় যা, তাকে এড়িয়েও যাওয়া যায় না।

মানুষে মানুষে প্রভেদ সৃষ্টির মধ্যেই রয়েছে যত হিংসার কারণ।  প্রাকৃতিক, ভৌগলিক, বৈজ্ঞানিক সকল দিকেই মানুষ এক। মানুষ যে এক তার প্রমাণ কী? তাদের সবার শারীরিক ও আবেগিক চাহিদা এক। তাদের লক্ষ্য এবং প্রত্যাশাও এক।

দালােই লামা বলেন: ধনী কিংবা দরিদ্র, শিক্ষিত বা নিরক্ষর, ধার্মিক অথবা অবিশ্বাসী, নারী অথবা পুরুষ, সাদা কালো অথবা তামাটে, আমরা সবাই এক। শারীরিক, আবেগিক এবং মানসিকভাবে আমরা সবাই সমান। খাদ্য, আশ্রয়, নিরাপত্তা এবং আবেগের মতো মৌলিক চাহিদাগুলো আমাদের সবারই এক। আমরা সবাই চাই সুখ এবং কষ্টকে এড়িয়ে চলি। আমাদের প্রত্যেকেরই আশা, উদ্বেগ, ভয় এবং স্বপ্ন আছে। প্রত্যেকেই চাই নিজের পরিবার এবং আপনজন ভালো থাকুক। কোনকিছু হারালে আমরা দুঃখ পাই এবং কোনকিছু অর্জন করতে পারলে আনন্দিত হই। এ জায়গাটাতে ধর্ম, নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, সংস্কৃতি এবং ভাষা আমাদের মধ্যে কোন পার্থক্য সৃষ্টি করে না।

সামাজিক বৈষম্যের কারণে আমাদের আচরণগুলো সবার জন্য একরকম হয় না। বয়স্ক রিক্শাওয়ালাকেও আপনি বলতে আমাদের বাধে, কিন্তু পরিশীলিত পোশাকের অল্পবয়সী যুবকটির প্রতি এমনিতেই ‘আপনি’ সম্বোধন চলে আসে। আমাদের ভালো আচরণ ওকথার সুমিষ্টতা যেন জমিয়ে রাখি বিশেষ দিনের বিশেষ ব্যক্তিদের জন্য। অতএব, সব মানুষকে সমানভাবে দেখতে পারার মধ্যে সুখের কারণ আছেই তো!

 

 

৬)  সুখ ও ধর্ম: ধর্মের সাথে নৈতিকতার সম্পর্ক

দালাই লামার মতে ধর্ম অথবা প্রতিষ্ঠান মানুষকে আলাদা করতে পারে না। এখানেও মানুষ এক।  সব মানুষই সুখ চায়।  তাই সবাইকেই সহানুভূতি এবং দয়ার চর্চা করতে হয়।  দয়াই ধর্ম।

তিনি বলেন, আমার ধর্ম খুবই সরল। এর জন্য ধর্মগৃহের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নেই জটিল কোন দর্শনের । আপনার মন এবং আপনার অন্তকরণই হলো ধর্মগৃহ। আপনার দর্শন হলো দয়া।

তার মতে, ধর্মীয় ঐতিহ্যগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য পথের পাশে ধর্মগৃহ প্রতিষ্ঠা করা নয়, কিন্তু আমাদের অন্তরের মধ্যে ভালো গুণ এবং ভালোবাসার (goodness and compassion) প্রতিষ্ঠা করা।

ধর্মের সামগ্রিক উদ্দেশ্যটি হলো ভালোবাসা ও অনুকম্পা, ধৈর্য, সহনশীলতা, নম্রতা এবং ক্ষমাশীলতাকে প্রতিষ্ঠিত করা।

তিনি বলেন, ধর্ম আর ধ্যান ছাড়া মানুষ বাঁচে, কিন্তু মানবিক গুণাবলী ছাড়া আমরা টিকতে পারি না।

অতএব, দয়া বা অনুকম্পা কোন ধর্মীয় বিষয় নয়, এটি মানবিক বৈশিষ্ট্য।  এটি কোন বিলাসিতা নয়, বরং আমাদের নিজের শান্তি ও মানসিক স্থিতিশীলতার জন্য আবশ্যক। এটি মানুষের অস্তিত্বের জন্য দরকারি।  এটি দালাই লামার কথা।

 

ধর্ম দিয়ে মানুষকে হেয় অথবা ভিন্ন ভাবা কতটুকু যুক্তিযুক্ত?  দালাই লামা বলেন, সুখ আর সফলতার উদ্দেশ্যে মানুষ বিভিন্ন পথে হাঁটে।  কেউ আপনার পথ দিয়ে হাঁটছে না মানেই এই নয় যে, সে ধ্বংস হয়ে গেছে।

তার মতে, ধর্ম আলাদা থাকতেই পারে।  অথবা ধর্ম নাও থাকতে পারে।  কিন্তু নৈতিকতা শুধুই ধর্মীয় গুণ নয়।  দালাই লামা বলেন, বর্তমান সমাজে আমি মনে করি যে, নৈতিকতা, অন্তর্নিহিত মূল্যবোধ, ব্যক্তিগত সততা অর্জনের জন্য একটি সার্বজনীন এবং টেকসই পথ বের করার প্রয়োজন। কারণ এসব গুণাবলী ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং নৃতাত্ত্বিক পার্থক্যের উর্ধ্বে।  আমি একে বলি ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিকতা।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, নৈতিকতার জন্য ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। বরং আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে,  মানবিকতা এবং মানুষের পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাভাবিক এবং যুক্তিসঙ্গতভাবেই নৈতিকতার বিষয়টি আসে।

 

 

৭)  সুখ ও শিক্ষা:  শিক্ষা থেকে যে প্রত্যাশা থাকা উচিত

আমাদের বর্তমান সমাজের সমস্যাটি হলো শিক্ষা সম্পর্কে তাদের প্রত্যাশা।  তারা মনে করে, শিক্ষা গ্রহণ করলেই তারা চতুর এবং বুদ্ধিমান হয়ে যাবে।  শিক্ষাকে আমাদের সমাজ সেভাবে না দেখলেও, শিক্ষা এবং জ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূ্র্ণ উদ্দেশ্য হলো, অধিকতর ভালো কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করা এবং মনের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের জ্ঞান ও বৃদ্ধির সঠিক প্রয়োগ হলো, উত্তম অন্তকরণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিজের অভ্যন্তরে পরিবর্তন।

আমি মনে করি, অজ্ঞতাই মানুষের কষ্টের কারণ।  স্বার্থপরের মতো নিজের সুখ এবং সন্তুষ্টির খুঁজেই মানুষ অন্যকে কষ্ট দেয়। অথচ প্রকৃত সুখ আসে অন্তরের সুখ এবং সন্তুষ্টিবোধ থেকে। এই সুখ আসে পরোপকার, ভালোবাসা এবং দয়া  থেকে। এটি আসে অজ্ঞতা, স্বার্থপরতা এবং লোভকে পরিত্যাগ করার ফল হিসেবে।

অজ্ঞতা কী? সুখের উৎস সম্পর্কে সঠিক নির্দেশনার অভাব। সুখের উৎস কী?  পরোপকতার, ভালোবাসা এবং দয়া।  পরোপকার, ভালোবাসা এবং দয়া কীভাবে সম্ভব?  জ্ঞানার্জন, নিঃস্বার্থ মন এবং নির্লোভ অন্তকরণের মাধ্যমে।

 

শিক্ষার ফল কী?  ভালো কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারা এবং উত্তম অন্তকরণ প্রতিষ্ঠা করতে পারার সামর্থ্য।

চামচ কখনও তার বহনকৃত খাদ্যের স্বাদ নিতে পারে না।  ঠিক সেভাবে সাধুর সঙ্গ পেলেও নির্বোধ সেটি বুঝতে পারে না। বলেছেন দালাই লামা।

 

 

 

 

▶ দালাই লামা: প্রাসঙ্গিক পরিচয়

সমস্ত আলোচনা চতুর্দশ দালাই লামা তেনজিন গেয়াতসুকে (১৯৩৫-) নিয়ে। পূর্বসুরী সকলের চেয়ে জনপ্রিয়তা এবং সার্বজনীনতা অর্জন করেছেন তেনজিন গেয়াতসু।  তার জীবন ও দর্শন থেকে শিক্ষা নেবার জন্য মানুষ লাইন ধরে টিকেট কাটে।  মহাত্মা, ম্যান্ডেলা এবং সর্বোপরি বুদ্ধের দর্শনকে একত্রিত করে একটি সর্বজনবোধ্য ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন, যার জন্য সারাবিশ্বে তিনি একজন জনপ্রিয় বক্তা। তার দর্শন এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠের বিষয়।

এর প্রথম কারণটি হলো, তিনি মানুষকে একটি অভিন্ন স্তরে নিয়ে আসতে পেরেছেন এবং নৈতিকতার সার্বজনীনতাকে তুলে ধরেছেন।  তার দর্শনের মূল কথা হলো, মানুষ এবং তার অভিন্ন মানবিক চাহিদা। ফলে মানুষ দালাই লামার শিক্ষায় নিজেকে আবিষ্কার করতে পেরেছে।

অন্য কারণটি হলো, বিভিন্ন ধর্মকে স্বীকৃতি দিয়ে এর মূল উদ্দেশ্যেকে তুলে ধরতে পারা, সেটি হলো: মানুষের সুখের সন্ধান।

 

বর্তমান লেখায় ধর্মীয় বা রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, সেক্যুলার দার্শনিক হিসেবে দালাই লামাকে দেখা হয়েছে। তার সুখদর্শন একটি শক্তিশালী যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠা পেয়েছে যাতে আছে আধ্যাত্মিক এবং জাগতিক চেতনার মিশ্রণ।  নিজের ধর্মীয় পরিচয় থাকলেও তিনি তার চিন্তাচেতনাকে এমন একটি নিরপেক্ষ অবস্থানে দাঁড় করিয়েছেন, যেখানে ধর্মীয় পার্থক্য অপ্রাসঙ্গিক।  দালাই লামার সুখতত্ত্ব বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী সবাইকেই মানুষ হিসেবে এক করে দিয়েছে।

চতুর্দশ দালাই লামা ব্যতিক্রম।  তিব্বতের শতবছরের ধর্মীয় ঐতিহ্য মোতাবেক দালাই লামা তাদের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক নেতা হয়ে আসলেও, চতুর্দশ দালাই লামা তিব্বতে গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করার পথ সুগম করে দেন (২০১১)।  নিজেকে শুধু আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে বিবেচনা করলেও তিনি অহিংস উপায়ে তিব্বতের মানুষের স্বাধীকারের জন্য লড়ে যাচ্ছেন।  সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন যে, আর কোন দালাই লামার প্রয়োজন নেই

 

 

 

▶প্রাসঙ্গিক প্রবন্ধগুলো:

১. Inner Peace অন্তরের শান্তি

২. সুখি মানুষের গল্প

৩.  আত্মউন্নয়ন: এই সময়টি আপনার

 

 


পরিশিষ্ট:

১.  Lama, 14th Dalai, Cutler, H.C. and His Holiness the Dalai Lama (1998) The art of happiness: A handbook for living. New York, NY: Riverhead Books.

২.  Lama, 14th Dalai, XIV, D.L. and His Holiness the Dalai Lama (2001) An open heart: Practising compassion in everyday life. United Kingdom: Hodder & Stoughton.

৩.  Lama, 14th Dalai and XIV, D.L. (2012) Beyond religion: Ethics for a whole world. United Kingdom: Rider, Ebury Publishing.

৪.   (no date) Available at: http://www.biography.com/people/dalai-lama-9264833 (Accessed: 27 March 2016).

৫.  The office of his Holiness the Dalai Lama (2016) Available at: http://www.dalailama.com/ (Accessed: 26 March 2016).

৬.   রাজুমইনুল (2012) অনেকের ভীড়ে একজন (পর্ব ৬: দালাই লামা). Available at: https://blog.mukto-mona.com/2011/08/15/18108/ (Accessed: 18 December 2015).