পাঠপরিকল্পনা বা লেসন প্লানিং করা শিক্ষকদের জন্য কতটুকু আবশ্যক?

পাঠ্যবই বা সমাধান দেখে পড়িয়েছেন এমন শিক্ষক যেমন দেখেছি, তেমনই দেখেছি আত্মনির্ভরশীল তুখোড় শিক্ষক। ক্লাসের প্রতিটি মিনিটকে তারা প্রয়োগ করেছেন পরিকল্পিত উপায়ে। তাদেরকে আমি কর্মজীবনেও ভুলতে পারি না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পর্যন্ত আমি পাঠপরিকল্পনার প্রচলন দেখেছি। আমার চোখে যারা সফল শিক্ষক ছিলেন, তাদেরকে প্রত্যেককেই পরিকল্পনামাফিক ক্লাস নিতে দেখেছি। কিন্তু হালে অনেকেই আমাকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং করতে পেরেছেনও। তারা বলছেন, এটি অহেতুক কালক্ষেপন – শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করার পর শিক্ষক আর পাঠ্যপুস্তক এ দু’য়ে মিলে সৃষ্টি হয় জীবন্ত পাঠপরিকল্পনা। সেখানে আরেকটি লিখিত পরিকল্পনা মানে কী! এসব বিতর্ক নিয়েই বর্তমান লেখাটি।

কার্যকর পাঠদান মানেই হলো পরিকল্পনাভিত্তিক পাঠদান। পৃথিবীর সফল ক্লাসরুম টিচিংগুলো সম্পন্ন হয়েছে পরিকল্পনামাফিক পাঠদানের ফল হিসেবে। কিন্তু আমাদের দেশে ‘প্রদর্শনী বা ডেমোনস্ট্রেশন ক্লাস’ ছাড়া পরিকল্পনাভিত্তিক পাঠদানের প্রচলন খুবই কম। শিক্ষকতাকে পেশাদারী মনোভাব নিয়ে গ্রহণ না করার কারণে অনেকে পাঠপরিকল্পনাকে অভ্যাসে পরিণত করতে পারেন না। বিএড অথবা এমএড পর্যায়ে পাঠপরিকল্পনার ছবক পেলেও নিজ নিজ শ্রেণীকক্ষে সেটি প্রয়োগ করার অভ্যাস অনেক শিক্ষকের নেই।

ইতিবাচক কারণেই অনেকে পাঠপরিকল্পনা করতে চান না। একটি কারণ হলো, অতি আত্মবিশ্বাস। কেউ কেউ আবার দু’এক বছর শিক্ষকতা করে মনে করেন, পাঠপরিকল্পনা করার মতো নিম্নস্তরে তারা আর নেই।

পাঠপরিকল্পনা মূল বিষয়গুলো হলো:

  • কী পড়াবেন
  • কীভাবে পড়াবেন এবং
  • কীভাবে মূল্যায়ন করবেন

এসব দ্বিধা্দ্বন্দ্বের সঠিক উত্তর না নিয়ে শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করার মানেই হলো আত্মপ্রবঞ্চনা। শিক্ষার্থীর প্রতিও প্রতারণা।

কিন্তু এই পাঠপরিকল্পনা বা লেসনপ্লান নিয়ে পেশাদার শিক্ষকদের মনে আছে প্রচণ্ড দ্বিধা আর সিদ্ধান্তহীনতা। কেউ কেউ মনে করেন সুদক্ষ শিক্ষকদেরকে পাঠপরিকল্পনা করতে হয় না। কিন্তু অন্যরা বলেন, দক্ষতার শুরুই হয় পরিকল্পনাভিত্তিক পাঠদানের ফলে। পেশাদারিত্বের কোন্ স্তরে গেলে পাঠপরিকল্পনা ছাড়া পাঠদান করা যায়, এবিষয়ে আছে অনেক মতভেদ।

 

লেভেল ১/ অনেক গুরুত্বপূর্ণ:

আপনি যদি নতুন শিক্ষক হন, তবে পরিকল্পনাহীন শ্রেণীকক্ষকে মনে হবে একটি নরক অথবা অপরিচিত জঙ্গল। কীভাবে পথ অতিক্রম করবেন আগে থেকে ছক কাটা না থাকলে নির্ঘাৎ বাঘের মুখে। মিশ্র সামর্থ্যের একটি শ্রেণীকক্ষে পরিকল্পনাহীন শিক্ষাদান আপনার জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে। শিক্ষার্থীর ধারণ ক্ষমতা, পূর্বজ্ঞান ইত্যাদি সম্পর্কে কোনই ধারণা রাখলেন না, অকষ্মাৎ শুরু করলেন আপনার বক্তৃতা। এটি শিক্ষার্থীর মনে বিভ্রান্তি, প্রশ্ন, অযাচিত কৌতূহল এবং বিব্রতকর প্রশ্নের সৃষ্টি করতে পারে।

শ্রেণীকক্ষে প্রবেশের পূর্বে কী পড়াবেন, কীভাবে পড়াবেন এবং কীভাবে শিক্ষার্থীদের অর্জন যাচাই করবেন – এ সম্পর্কে পুরোপুরি একটি ধারণা নিতে হবেই। পাঠপরিকল্পনায় বা লেসনপ্লানে ঠিক ওই বিষয়গুলোই একটি কাঠামো আকারে পরিকল্পনা করতে হয়। পরিকল্পনা থাকলে নিশ্চিন্তে আপনি পথ অতিক্রম করতে পারবেন এবং শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাব দিতে অথবা অযাচিত প্রশ্নকারীকে থামিয়ে দিতে আপনাকে কালক্ষেপণ করতে হবে না।

পরিকল্পনা মতোই পাঠদান চলবে, সেটি নয়। পাঠদানের সময় আংশিক অথবা পুরোপুরিই পরিবর্তন হতে পারে। সেটিও করতে আপনাকে সাহায্য করবে একটি পূর্বপ্রস্তুত পাঠপরিকল্পনা।

আপনি একজন পুরাতন এবং অভিজ্ঞ শিক্ষক হলেও পাঠপরিকল্পনা আপনার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এর একটি কারণ হলো, পাঠদান পর্যবেক্ষণ। আপনার পাঠদানকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে অথবা অন্যদের জন্য সেটিকে আদর্শ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে – সে রকম পাঠদানের জন্য একটি পূর্বপরিকল্পনা অত্যাবশ্যক। পাঠপরিকল্পনা দেখে আপনি একজন শিক্ষকের অনেককিছু বলে দিতে পারবেন। তার শিক্ষাদানের কৌশল, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সামর্থ্য, শিক্ষার্থীর প্রতি তার মনোভাব – অনেক কিছু।

পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট পাঠ্যবইটিও শিক্ষার্থীর আদ্যপাদ্যন্ত চিন্তা করে প্রণীত হয় না। সেখানে শিক্ষককে কিছু-না-কিছু করতেই হয়। শিক্ষককে সহজীকরণ করতে হয়, দৃষ্টান্ত প্রস্তুত করতে হয়, মূল্যায়নের জন্য পর্যায়ক্রমিক প্রশ্নপত্র তৈরি করতে হয়। এগুলোর কোনটাই হয়তো পাঠ্যবইয়ে নেই। এসব ক্ষেত্রে নতুন-পুরাতন, অভিজ্ঞ-অনভিজ্ঞ সবার জন্যই পাঠপরিকল্পনা আবশ্যক।

 

লেভেল ২/ তত গুরুত্বপূর্ণ নয়

দীর্ঘ সময় ধরে প্রকাশ, পুনঃপ্রকাশ, পুনঃসংস্করণ, পরিবর্ধন ইত্যাদি কারণে কিছু কিছু পাঠ্যবই নিজে থেকেই শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী-বান্ধব হয়ে থাকে। সেখানে শিক্ষকের কাজ শুধুই অনুসরণ করে যাওয়া।

কিছু পাঠ্যবইয়ের সাথে ‘শিক্ষক সহায়িকা’ থাকে। শিক্ষক যদি আন্তরিকভাবে সেই শিক্ষক সহায়িকা পড়েন এবং প্রাসঙ্গিকভাবে শ্রেণীকক্ষে প্রয়োগ করতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে পাঠপরিকল্পনার প্রয়োজন কমে আসে।

অভিজ্ঞতার এই পর্যায়ে শিক্ষক পার্বিক বা টার্মিনাল লেসনপ্লান করতে পারেন। তাতে একটি সেশনে/টার্মে যাবতিয় পাঠ ও পার্বিক পরীক্ষার পরিকল্পনা অন্তর্ভূক্ত থাকে। এই দৈনিক পাঠপরিকল্পনার সমন্বিত রূপ। টার্মিনাল লেসন প্লানে গৃহীত সিলেবাস মোতাবেক পাঠ্যবিষয় সংক্রান্ত যাবতিয় পরিকল্পনা সংক্ষেপে তুলে রাখেন। এসব ক্ষেত্রে দৈনিক পাঠপরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে যায়।

অল্প সময়ের নোটিসে আপনাকে একটি ক্লাস নিতে হলো, অথবা অন্য কোন শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে তার ক্লাসটি আপনি নিচ্ছেন, সেক্ষেত্রে পাঠপরিকল্পনা করা কঠিন। এরকম পাঠদান থেকে আপনার কাছ থেকে প্রত্যাশাও হয়তো কম থাকে।

একই বিষয়ে পাঠদান করে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকলে লিখিত পরিকল্পনা না থাকলেও পাঠদান বাধাগ্রস্ত হয় না। শুরুতে ৯০% সময় ব্যয় করতেন আর ১০% সময় ব্যয় করতেন শ্রেণীকক্ষ ব্যবস্থাপনায়। অভিজ্ঞতার সাথে এখন সময় বদলেছে। আপনি ৯০% সময় ব্যয় করেন ব্যবস্থাপনায় এবং মাত্র ১০% সময় নিয়ে আপনি পরিকল্পনা করতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে শিক্ষকের মস্তিষ্কে একটি পাঠপরিকল্পনা তৈরি হয়ে যায়।

 

লেভেল ৩/ একদম গুরুত্বপূর্ণ নয়

একই বিষয়ে একই পাঠ্যবই নিয়ে পাঠদান করে আসছেন বহুদিন। হয়তো শুরুর দিনগুলোতে পাঠপরিকল্পনাও করেছিলেন। এখন আপনি জানেন, কোন্ অধ্যায়ে শিক্ষার্থীদের সমস্যা হয় এবং কোন্ অধ্যায়গুলোতে তত সময় দিতে হয় না। আপনি জানেন, পাঠ্যবই এবং শিক্ষার্থীদের সামাজিক এবং ধারণাগত পার্থক্য; জানেন তাদের উপলব্ধি করার সামর্থ্য। এসব ক্ষেত্রে লিখিত পাঠপরিকল্পনায় সময় নষ্ট না করে সরাসরি পাঠদানের প্রতি মনোনিবেশ করা জরুরি।

এমন একটি পর্যায়ে শিক্ষকদের আসতে পারাটাও একটি শ্রমসাধ্য ব্যাপার। এটি অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ স্তর। শিক্ষকতার প্রাথমিক পর্যায়ে যারা প্রচুর পাঠপরিকল্পনা করেছেন, তারাই এক সময় পাঠপরিকল্পনাকে অগ্রাহ্য করতে পারেন।

লেসনপ্লান ‘একদম গুরুত্বপূর্ণ নয়’ এরকম স্তর নিয়ে একাডেমিশিয়ানদের মধ্যেও মতভেদ আছে। সবাই পাঠপরিকল্পনার পক্ষে – সেটি লিখিত হোক কিংবা অলিখিত, দৈনিক হোক কিংবা মাসিক বা পার্বিক। লেসনপ্লান ছাড়া লেসন দেওয়ার চিন্তা করা যায় না।

 

বর্তমান পোস্টের চিত্ররূপ

 

লেসনপ্লান কি শিক্ষকের পেশাদারিত্ব অর্জনের প্রতিবন্ধতা?

দিনে অনেকগুলো ক্লাস নিয়ে অথবা একাধিক বিষয়ে পাঠদান করলে প্রতিটির জন্য আলাদা আলাদা পাঠপরিকল্পনা করা কঠিন। প্রতিটি বিষয়ের পাঠদান নিয়ে আলাদাভাবে মনোনিবেশ করা অত্যন্ত পীড়াদায়ক হয়ে পড়ে ব্যস্ততম শিক্ষকদের জন্য। যেসব শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব, উপস্থিত জ্ঞান, পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারার ক্ষমতা আছে, তারা প্রাথমিকভাবে লেসনপ্লানের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারেন না। অল্প সময়ে বেশি শিক্ষার্থীকে মনোযোগ দেবার জন্য তারা মানসিক শক্তির ওপর নির্ভর করেন। তারা একে পেশাদারিত্ব অর্জনের অন্তরায় হিসেবেই দেখেন।

কিন্তু লেসনপ্লাস ৫টি সুস্পষ্ট উপায়ে শিক্ষককে উন্নততর পর্যায়ের নিয়ে যায় – ১) বিষয়ভিত্তিক পাঠদানের সামর্থ্য বৃদ্ধিতে এটি সাহায্য করে; ২) প্রয়োগ, অংশগ্রহণমূলক এবং মূল্যায়ন-ভিত্তিক পাঠদানে শিক্ষককে প্রস্তুত করে; ৩) পাঠ্যবিষয় এবং শিক্ষার্থীর ব্যাকগ্রাউন্ড ও ধারণ ক্ষমতার মধ্যে যথোপযুক্ত সেতুবন্ধন করা যায়; ৪) শিক্ষক পূর্ব থেকেই পাঠ্যবিষয় সম্পর্কে নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে উদ্দিষ্ট শিক্ষার্থীর জন্য নিজেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করতে পারেন; ৫) নিয়মিত পরিকল্পনা করার এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষক এক পর্যায়ে লেসনপ্লানের ঊর্ধ্বে ওঠে যেতে পারেন। তিনি প্রতিটি বিষয়ের মানসিক লেসনপ্লান সৃষ্টি করতে পারেন।

 

তথ্যসূত্র: বিভিন্ন উৎস; ব্যক্তিগত অনুসন্ধান এবং শিক্ষক হিসেবে অভিজ্ঞতা।

 

▶প্রাসঙ্গিক কয়েকটি পোস্ট:

যেসব কাজ করে আমাদের শিক্ষকেরা শিশুদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করছেন

শ্রেণীকক্ষ ব্যবস্থাপনার ১২টি উপায়

 

Advertisements

বিদেশী সাংবাদিকের ঢাকা ভ্রমণ ও যানজট বৃত্তান্ত: তৃতীয় নয়নে প্রাণের শহর ঢাকা!

বিদেশীদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের পরিস্থিতি জানার কৌতূহল সবারই থাকে। তাদের অভিমতকে একটু অন্যদৃষ্টিতে দেখতে হয়, কারণ তাদের কোন রক্তচক্ষুর ভয় নেই এবং তাই নিরপেক্ষ থাকতেও বাধা নেই। তৃতীয় নয়নে বাংলাদেশকে দেখতে তাই বরাবরই আমাদেরকে বিদেশীদের মতামতকে বিবেচনায় নিতে হয়। ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম নিয়ে লেখার জন্য নিউইয়র্ক টাইমস এর এক সাংবাদিক ঢাকায় এসেছেন, থেকেছেন এবং ঢাকার যানবাহনে ভ্রমণ করেছেন। একটি উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। ঢাকার যানজট কী মাত্রায় পৌঁছুলে সেটি বিদেশীদের গবেষণার বিষয় হয়, সেটি বুঝার জন্যই আমি আর্টিকেলটি আদ্যোপান্ত পড়ি। এমন পড়েছি অনেক, কিন্তু এবারই লেখার ইচ্ছে হলো। কেন হলো পাঠক পড়লেই বুঝতে পারবেন। শুরু।

 

সৌজন্যে: নিউ ইয়র্ক টাইমস

সেসব অব্যবস্থাপনা বিশ্বের বৃহৎ শহরগুলোতে বিপর্যয় ঘটায়, হয়তো এর মধ্যে কোনটিই ট্রাফিক জ্যামের মতো ক্ষতিকর না। এখনও ঢাকায় বসে আছি যেখানে অপর্যাপ্ত পরিকল্পনা মহাকাব্যিক পরিণতিতে পৌঁছেছে।

আমি ঢাকায় ছিলাম, বলা যায়, ঢাকার ট্রাফিক জ্যামে আটকে ছিলাম। কথাটি হয়তো অন্যভাবে বললে আরও সঠিক হবে: আমি যানজটে আটকে ছিলাম, তাই ঢাকায় ছিলাম। আপনি যদি বাংলাদেশের রাজধানীতে কিছু সময় কাটান, তবে ‘যান চলাচল’ ধারণাটিকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করবেন, এবং আপনার সংজ্ঞাটি উল্টে যাবে। অন্যান্য শহরের রাস্তাগুলোতে যানবাহন এবং পথচারি থাকে; মাঝেমাঝে রাস্তাগুলো ব্যস্ত হয়ে যায় এবং যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হয়। ঢাকার পরিস্থিতি আলাদা। ঢাকার যানজট হলো যান চলাচলের চরম পর্যায়; বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতি এত ব্যাপক এবং দীর্ঘস্থায়ী যে, এটি শহরের সাংগঠনিক নীতিতে রূপ নিয়েছে। এটি যেন শহরের আবহাওয়া, এমন এক ঝড় যা কখনও থামে না।

ঢাকার লোকেরা আপনাকে বলবে, পৃথিবীর বাকি মানুষগুলো যান চলাচল বুঝে না, কারণ মুম্বাই অথবা কায়রো অথবা লসএন্জেলেসের যানজট ঢাকার ড্রাইভারের কাছে সৌভাগ্যের মতো। বিশেষজ্ঞরা তাতে একমত। ২০১৬ সালের বিশ্বের বাসযোগ্যতা জরিপে, অর্থাৎ ইকোনোমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিট কর্তৃক প্রকাশিত জীবনের মান বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে ১৪০ শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৭, শুধু নাইজেরিয়ার লাগোস, লিবিয়ার ত্রিপলি এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার দামেস্ক শহরের ওপরে অবস্থান করছে। জরিপে ঢাকার অবকাঠামোর মান যেকোন শহরের চেয়ে নিম্ন স্তরে দেখানো হয়েছে। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মেগাসিটির মতো ঢাকা একটি ব্যস্ত শহর এবং সমাধিস্থান, যেখানে আছে বলিষ্ঠ আবাসন বাজার, ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণী এবং প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ। অভাব, দূষণ, রোগ, রাজনৈতিক দুর্নীতি, চরমপন্থীদের নাশকতা ্এবং সন্ত্রাসী হামলার কারণে জীবন এখানে নিয়ন্ত্রণহীন দুষ্পাপ্যতায় বাধাগ্রস্ত।  কিন্তু পণ্ডিত এবং উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের কাছে যানজটই ঢাকার খ্যাতিকে চিহ্নিত করেছে একবিংশ শতাব্দির পৌর অব্যবস্থানার ভয়ংকর প্রতীক, বিশ্বের সবচেয়ে বিধ্বস্ত শহর হিসেবে। এটি ঢাকাকে এক পরাবাস্তব শহরে পরিণত করেছে যা একই সাথে কর্মচঞ্চল এবং অচল; এবং এটি এক কোটি পঁচাত্তর লাখের অধিক বসবাসকারীর জীবনের ছন্দকে বদলে দিয়েছে। বেশিদিন আগে নয়, ঢাকার ডেইলিস্টার ‘যানজটে পড়লে ৫টি করণীয়’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। তাতে যেসব সুপারিশ এসেছে তা হলো “বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ”, পড়া এবং ডায়েরি লেখা।

 

যেভাবে ঢাকায় প্রবেশ এবং প্রথম অভিজ্ঞতা

আমার ঢাকার রোজনামচার প্রথম পর্বটি শুরু হয় গতবছরের মার্চে একটি রাজপথে, যা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শহরের মধ্যস্থলে গিয়ে পৌঁছেছে। আপনি যদি এই রাস্তাটি নিয়ে ইন্টারনেটে অনুসন্ধান চালান, তাহলে একটি ফেইসবুক পেইজ ওঠে আসবে যার শিরোনাম “রাজপথ থেকে নরকে, এয়ারপোর্ট রোড”। অনলাইনে দেওয়া ফটোগুলো থেকে নরকের চিত্র ফুটে ওঠে: ওপর থেকে তোলা রাস্তার আটটি লেইন জুড়ে বিপুল সংখ্যক মটরযানের এলোপাথাড়ি চলাফেরার ছবি। মনে হয়, সদ্য হাঁটতে শিখেছে এরকম কোন ক্ষুব্ধ শিশু একটি দিয়াশলাইয়ের বাক্সকে ছড়িয়ে দিয়েছে: সকালের অফিসযাত্রা শুরু হয় মহাজাগতিক এক ক্রুদ্ধ মেজাজ নিয়ে।

ছবিগুলো আমাকে চরম খারাপের জন্য মানসিক প্রস্তুতি দেয়। তারপরও ঢাকা যাবার সময় আমাকে জানানো হলো যে, শহরের যানচলাচল হবে অস্বাভাবিকভাবে হালকা। কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ বন্দি ছিল হরতালে, দেশব্যাপী সাধারণ হরতাল এবং “পরিবহন অবরোধ”। এই হরতাল আহ্বান করা হয়েছিল বিরোধীদল বিএনপি’র পক্ষ থেকে। তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নতুন নির্বাচনের জন্য চাপ দিতে চেষ্টা করছে। হরতাল, রাস্তার মিছিল এবং বিচ্ছিন্ন সহিংসতা রাজধানীর দৈনন্দিন জীবনকে স্তব্ধ করে দিয়েছে এবং শহরের লোকদের স্বাভাবিক জীবনকে সংক্ষিপ্ত করে দিয়েছে। এতে দৃশ্যত অসাধ্য সাধন হয়েছে, ঢাকার রাস্তাগুলো থেকে দীর্ঘ গাড়ির লাইন বিচ্ছিন্ন। আমার বিমান পথে একজন বাংলাদেশি এই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছিলেন “ঢাকায় হয়তো আপনি ভয়ানক যানজট পাবেন, নয়তো সত্যিই ভয়ানক যানজট পাবেন। কিন্তু হরতাল থাকলে সেখানে প্রায় কোন যানজট থাকবে না। যান চলাচল থাকবে স্বাভাবিক।”

ভয়ানক যানজট, সত্যিই ভয়ানক যানজট, কোন যানজট থাকবে না, যান চলাচল স্বাভাবিক – ঢাকায় থাকলে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই বুঝতে পারা যায় যে, ওগুলো কোন তাত্ত্বিক পরিভাষা নয়। বিমান থেকে অবতরণের পর আমি একটি ট্যাক্সি নিলাম। ট্যাক্সিটি বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই একটি গোলচক্করে পড়লো; তারপর কুখ্যাত সেই রাজপথে। সেখানে নির্ভুলভাবে যানজট ছিল: যতদূর চোখ যায় গাড়ি আর ট্রাক, এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে, রাস্তার কালোরঙের ওপর লেইন মার্কিঙয়ের কোন সম্পর্কই উদ্ধার করা গেলো না। আমার গাড়িটি সারিবদ্ধ গাড়ির ফাঁকে নাক ঢুকিয়ে রাখলো। শুরু হলো হামাগুড়ি।

বিশ সেকেন্ডের মতো গাড়িগুলো দক্ষিণ দিকে চললো। তারপর থেমে গেলো। আমার গাড়ি কয়েক মিনিট একদম নড়াচড়া করলো না। তারপর অজানা কারণে গাড়িটি আবার সামনের দিকে হামাগুড়ি দিলো। মাঝেমাঝে গাড়িগুলো বাধাহীনভাবে কয়েকমিনিট চলে, ঘণ্টায় সম্ভবত ১৫ মাইল গতিতে। কিন্তু শিঘ্রই আমরা আবার থেমে গেলাম। আমেরিকার ইন্টারস্টেইট ভ্রমণের ‘থামো-এবং-চলো’র অভিজ্ঞতা পাচ্ছিলাম, রেডিওতে ট্রাফিক প্রতিবেদকরা যেমন হেলিকপ্টারের পাখার আওয়াজের সাথে দীর্ঘ ট্রাক্টর ট্রলির কথা চিৎকার করে ‘বাম্পার-থেকে-বাম্পার’ পরিস্থিতির কথা বলে, অনেকটা সেরকম।  কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিটি কোন দুর্ঘটনার কারণে নয়। কারণ হলো, এটি ঢাকা শহর।

অনেক গরম পড়েছিল আর আমি ছিলাম জেটল্যাগগস্ত। ঘুমিয়ে পড়লাম। যখন হঠাৎ ওঠলাম, প্রায় এক ঘণ্টা হয়ে গেলো। গাড়ির গাদাগাদি আরও ঘণিভূত হলো এবং এক প্রকার উন্মাদনায় রূপ নিলো। ততক্ষণে আমরা শহরের কেন্দ্রস্থলে। প্রশস্ত রাস্তাটিতে পথচারি আর শত শত গাড়ি নিজেদের জায়গার জন্য প্রতিযোগিতা করছে। রাস্তার নাম কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ।  বাসগুলো এমন আঁটসাটভাবে যাত্রী দিয়ে ঠাসা যে, অনেক যাত্রী বাইরের দিকে ঝুলে আছে। কেউ কেউ বাসের ছাদের সিঁড়িতে ঝুলে আছে। সেখানে ছিল মালবাহী ত্রিচক্রযান, স্থানীয়ভাবে ভ্যান নামে পরিচিত। বাঁশ, তরমুজ, ধাতব পাইপ, ডিম, জীবন্ত পশুপাখি নিয়ে সেগুলো বাজারের দিকে যাচ্ছে। এবং অবশ্যই সেখানে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী যাত্রীবাহী পরিবহন রিকশা-সাইকেল ছিল। কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউর মতো বড় রাস্তায় রিকশা চলাচল আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ হলেও, নিজ নিজ উদ্দেশ্য নিয়ে রিকশাগুলো সেখানে ছিল।  রিকশার বেল ট্রাফিকজ্যামের গর্জনকে বাড়িয়ে দিলো।

ঘটনাক্রমে আরেকটি গোলচক্করে পৌঁছালাম আমরা। এবার বাঁ দিকে মোড় নিয়ে পেলাম আরেকটি সংযোগ সড়ক, পান্থপথ তেজগাঁও লিংকরোড। এখানে আমার ট্যাক্সিচালক ইউটার্ন নিলেন এবং কিছু কৌশলী হস্তচালনার মাধ্যমে আমার নির্ধারিত হোটেলের প্রবেশপথে ঢুকার সুযোগ নিলেন। একশ’ গজের প্রবেশপথটি খালি এবং প্রথমবারের মতো একটু উন্মুক্ত স্থান দেখতে পেলাম। বিমানবন্দর থেকে হোটেলের দূরত্ব সাড়ে আট কিলোমিটার। আড়াই ঘণ্টা লাগলো এটি অতিক্রম করতে। হোটেলের প্রবেশপথটি শেষ করে আমার টাক্সিচালক তার অনুভূতি প্রকাশ করলেন। “সামান্য একটু যানজট ছিল” তিনি বললেন, “ততটা খারাপ ছিল না।”

“বাংলাদেশের পরিস্থিতি দুর্যোগে আক্রান্ত জাতির মতো নয়” ২০০০ সালে লেখেছিলেন সাংবাদিক উইলিয়াম ল্যাংগউইশে। কথাটি অতিরঞ্জিত মনে হয়, কিন্তু পরিবহনে-ঠাসা ঢাকার রাস্তাকে দেখার মানে হলো দুর্যোগকে সচল অবস্থায় দেখা, অথবা বলা যায় অচল।  রাজধানী শহরের আটকে-পড়া পরিবহনগুলো এই জাতির জন্য মহাদুর্যোগের প্রতীক হয়ে আছে। বিশেষ করে বলা যায়, জনসংখ্যার বৃদ্ধি। উন্নয়নশীল দেশের মাপকাঠিতে এটি মানানসই, কিন্তু বাংলাদেশের আয়তনের তুলনায় এটি বিপর্যয়কর।

 

সৌজন্যে: নিউইয়র্ক টাইমস

ঢাকার যানজট অন্যান্য শহরের চেয়েও খারাপ হবার কারণ কী?

মূলত যানজট একটি ঘনবসতির বিষয়।  এমনটা হয়, যখন অতিরিক্ত সংখ্যক মানুষ অতি সংকীর্ণ কোন স্থানে জায়গা নিতে চায়। বাংলাদেশ হলো পৃথিবীর চরম ঘনবসতিপূর্ণ জাতির মধ্যে দ্বাদশ। কিন্তু ষোল কোটি জনসংখ্যার কারণে সেটি সবচেয়ে জনাকীর্ণ এবং তালিকার মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র দেশ। বিষয়টি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করছি: বাংলাদেশের স্থলভূমি রাশিয়ার ১১৮ ভাগের এক ভাগ, কিন্তু এর জনসংখ্যা রাশিয়া থেকে আড়াই কোটি বেশি।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা সমস্যাটি ঢাকা শহরেই প্রতিফলিত হয়েছে, কারণ বলতে গেলে ঢাকাই বাংলাদেশ। দেশের প্রায় সকল সরকারি, ব্যবসায়িক, স্বাস্থ্য বিষয়ক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এবং শ্রমবাজারের বিরাট একটি অংশ ঢাকায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে।  প্রতি বছর ৪ লাখ নতুন অধিবাসী রাজধানীতে যুক্ত হয়। এই গণ অভিবাসন ঢাকাকে করেছে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ মেগাসিটি এবং সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীলও।

যেসব মৌলিক অবকাঠামো এবং আইনের শাসন বড় শহরগুলোকে বাসযোগ্য করে, এই শহরের কোটি অধিবাসী সেসব একদমই পাচ্ছে না। ঢাকায় মাত্র ৬০টি ট্রাফিক লাইট আছে, যা কেবলই আলংকারিক; খুব কম গাড়িচালক সেগুলোকে গুরুত্ব দেয়। ঢাকার রাস্তায় অরাজকতার বড় কারণ হলো, রাস্তার অপর্যাপ্ততা।  ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন মতে, ঢাকা শহরের মাত্র ৭ শতাংশের জন্য রাস্তা আছে। (উনিশ শতাব্দির পৌর পরিকল্পনায় নির্মিত প্যারিস এবং বার্সেলোনা শহরে এই অনুপাত ৩০ শতাংশ।)  ফুটপাথগুলোতেও সমস্যা। কিছু রাস্তায় ফুটপাথ আছে এবং যা আছে তা প্রায় চলাচলে অযোগ্য  – দোকানদার এবং গৃহহীন মানুষের আবাস।

ঢাকার মতো শহরগুলোর যানজটের জন্য সাধারণ সমাধান হলো, রাস্তার ওপরে চলাচলের পরিবর্তে রাস্তার নিচে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা।  কিন্তু ঢাকায় কোন ভূগর্ভস্থ রাস্তা নেই এবং নির্মাণেরও কোন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেই।  এ সমস্যাটি আরও তীব্র হয়েছে মর্যাদার প্রতীক হিসেবে প্রদর্শিত ব্যক্তিগত গাড়িগুলোর কারণে, যা শহরের মধ্যবিত্তদের প্রচলিত মাধ্যম। এতে প্রতি বছর হাজার হাজার গাড়ি ঢাকার রাস্তায় যুক্ত হচ্ছে।

সরকারের নিজস্ব হিসেব মতে, ঢাকার যানজটের কারণে প্রতি দিন ৩২ লাখ শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং এটি দেশের অর্থনৈতিক আয় থেকে কোটি কোটি টাকা লোকসান যাচ্ছে। এই যানজট আরেক প্রকার ক্ষতি নিয়ে আসছে ঢাকাবাসীর জীবনে ও মননে।  বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নগর এবং অঞ্চল পরিকল্পনা’ বিষয়ক অধ্যাপক সারওয়ার জাহান বলেন, “শহরটি জটিল হয়ে যাচ্ছে। যাতায়াতের সমস্যার কারণে মানুষ কারও সাথে সাক্ষাৎ করতে পারে না। শুধু প্রয়োজন হলেই বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া হয়। তাতে অনেক সময় চলে যায়।”

ঢাকার যানজটকে ‘অসুবিধা’ বলা এক প্রকার ভুল; এমনকি ‘দুর্যোগ’ বললেও সহজ হয়ে যায়।  যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্থাপত্য ও পরিকল্পনা’ বিষয়ক অধ্যাপক আদনান মোরশেদের মতে, ঢাকার যানজট হলো ‘একটি বিশাল পৌর ব্যাধি’ যা ‘মৃত্যু ঘটিয়েই চলেছে’।  বাংলাদেশের পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির জন্য বিরাট প্রাপ্তি। কিন্তু বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন  এই বলে যে, রাজধানী যানজট এবং অবকাঠামো সমস্যার সমাধান না হলে ওসব অর্জন হারিয়ে যাবে – সেই অগ্রগতি নিজে থেকেই স্তবির হয়ে যাবে। যানবাহনে ঠাসা রাস্তাগুলো ঢাকা শহরের দুঃখের এক অমানবিক চিত্র। বলা যায়, দুঃখের একমাত্র কারণ।

 

যে কারণে ঢাকার গাড়িচালকদেরকে শ্রেষ্ঠ ড্রাইভার বলতে হয়…

ঢাকার অত্যধিক পরিবহণ সর্বগ্রাসী অনুভূতি। আপনি এর গন্ধ পাবেন, স্বাদ পাবেন।  গাড়ির ধোঁয়া আপনার নাসারন্ধ্রে আপনার জামায় আপনার মুখে আঘাত করবে।  আপনার জিহ্বায় তীব্র স্বাদ রেখে যাবে। পাশের গাড়ি অথবা পথচারিদের মধ্যে নিজের হাতকে নিরাপত্তার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে  আপনি হয়তো, হয়তো নয় অবশ্যই, যানজটকে ধরতে পারবেন, ছুঁতেও পারবেন।

কিন্তু যানজট আপনার শ্রবনেন্দ্রিয়কে সবচে’ বেশি আক্রান্ত করে। ইতিহাসবিদদের মতো, শহরের নামকরণ হয়েছে ঢাক থেকে, অর্থাৎ ঠনঠন-শব্দ-করা এক বড় ঢোল। ঐতিহাসিক সত্য যা-ই হোক, শহরের ভয়ানক শোরগোল আপনার শ্রবনেন্দ্রিয়কে যে আচ্ছন্ন করে, তাতে কোন ভুল নেই। ঢাকার গাড়ির বধির-করা একক সঙ্গিত, চালকদের চিৎকার, এন্জিনের গর্জন, অন্তহীন হুইসেল থেকে আসা কণ্ঠ, তাল এবং তালহীন করতাল এবং সবমিলে এক বেসুরো থিম সং।

সেই একটানা উচ্চশব্দ চরম আগ্রাসী। ঢাকার চালকেরা হয়তো ‍পৃথিবীর সবচেয়ে পাশবিক আর নির্দয়। আপনি যদি ঢাকার মতো শহরে আইন লঙ্ঘন এবং দুঃসাহসকে চালকের দক্ষতা বলে মনে করেন, তবে তাদেরকে শ্রেষ্ঠ চালক বলতে হয়।

 

সৌজন্যে: চ্যানেল আই অনলাইন

সিএনজি: “তিন চাকার ওপর চলা ছোট টিনের বক্সটি দু’টি কক্ষে বিভক্ত”

এক বিকালে শের-এ-বাংলা ক্রিকেট স্ট্যাডিয়াম থেকে একটি অটোরিকশা নিয়ে ঢাকার সবচেয়ে যানজট প্রবণ রাস্তা দিয়ে দীর্ঘ ভ্রমণের ব্যবস্থা করলাম।  ঢাকার লোকেরা অটোরিকশাকে ‘সিএনজি’ বলে, কারণ সেটি সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাসে চলে।  তিন চাকার ওপর চলা ছোট টিনের বক্সটি দু’টি কক্ষে বিভক্ত, একটি চালকের জন্য, অন্যটি যাত্রীর জন্য। যাত্রীর কক্ষটি একটু বড় হলেও বেশ চিপা। এটি আপনি এশিয়ান শহরগুলোতে দেখতে পাবেন। ঢাকায় এগুলো সবুজ রঙে আচ্ছাদিত এবং প্রায় সবগুলোই নোংরা এবং জির্ণশির্ণ। এগুলো অনেক শব্দ করে অসহ্য ধ্বনিতে রাস্তাকে মাতিয়ে রাখে। যত্নহীন নিম্নমানের ছোট্ট যন্ত্রটিকে গোল্ফকার্টের দস্যু চাচাতো ভাই বলা যায়।

আমার সিএনজির পাইলট হলেন একজন হাসিহীন মানুষ যার বয়স হয়তো ত্রিশের নিচে। রাস্তায় তিনি বেধড়ক। রাস্তার ভিড় ঠেলে প্রতিটি সেন্টিমিটারের জন্য তিনি যুদ্ধ করেছেন এবং একটু ফাঁক পেলেই সর্বোচ্চ গতিতে গাড়ি চালিয়েছেন। এবার আমরা নগরের ব্যস্ততম রাস্তায়, বীরউত্তম রফিকুল ইসলাম এভিনিউ। রাস্তার দু’পাশে বড় বড় শপিং মল এবং ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর।  একটি শপিং মল প্রায় রাস্তার ওপরেই গজিয়ে ওঠেছে। ঢাকার রাস্তায় যানজট অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক: গাড়ির চারপাশ ঘিরে পানির বোতল, খোসা ছাড়ানো শশা, বই বিক্রি করছে ফেরিওয়ালারা। অবশ্য অপরাধেরও সম্ভাবনা আছে। একসময় সিএনজিতে দরজা ছিল না, কিন্তু এখন গ্রিল দিয়ে ঢাকা। দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে ওঁত পেতে থাকা ছিনতাইকারীদের হাত থেকে এটি সুরক্ষা দেয়। কথিত আছে যে, দুঃসাহসী চোরেরা সিএনজির ছাদ কেটে যাত্রীর ওপর চড়াও হয়। তাদের পছন্দের অস্ত্র হলো ‘টাইগার বাম’, ঝাঁঝালো এক প্রকার মলম, যা তারা নিরস্ত্র করার জন্য শিকারের চোখে মেখে দেয়।

আমার চালকের একটিমাত্র কৌশল হলো, সব অবস্থায় গাড়ির গতি ধরে রাখা, পরিস্থিতি যা-ই হোক, এমনকি চিপা গলিতেও। সোজা যেতে না পারলে ডানেবামে, গাড়ির নাক দিয়ে অন্যের লেইন অতিক্রম করে, গাড়ির ফাঁক দিয়ে, অন্য চালকদেরকে রাস্তা ছাড়তে বাধ্য করে, এমন কি দু’এক ইঞ্চি সংঘর্ষকে এড়িয়ে। একটি কথা দিয়ে তিনি অন্য গাড়ি গুলোকে হুংকার দিয়ে যাচ্ছিলেন। ‘আস্তে’। চিৎকারে করে বলে যাচ্ছিলেন, ‘আস্তে! আস্তে! আস্তে!’। পরে আমার এক ইংরেজি-জানা বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম ‘আস্তে’ মানে কি। জানা গেলো, ‘আস্তে’ মানে হলো ‘ধিরে, সাবধানে’।

 

রিকশা পেইন্টিং: গুগল সার্চ

রিকশা:  চলন্ত যাদুঘর

ঢাকার একটি যানবাহনকে নিরীহ মনে করা যেতে পারে, অন্তত শহরের নিম্নতম মানদণ্ডে। সেটি হলো, সাইকেল রিকশা। ঢাকার রাস্তার প্রাচীন এবং সর্বত্র বিরাজমান যানবাহন। রিকশার সঠিক সংখ্যা কেউ জানে না। (এগুলোর মধ্যে মাত্র একটি অংশ আনু্ষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত।)  অনেকে মনে করেন, ঢাকার রিকশার সংখ্যা ২ লাখ হবে; অন্যরা ধারণা করছেন এই সংখ্যা কমপক্ষে কয়েক গুণ বেশি।

ঢাকার রাস্তায় রিকশা ভাড়া নিয়ে দরদাম করা গাড়িতে চড়ার মতোই এক সেরা বিনোদন। এসব ত্রিচক্রযানকে নিষিদ্ধ করার জন্য অনেক প্রস্তাব এসেছে, কিন্তু প্রতিবারই সেগুলো ব্যর্থ হয়েছে।  কেউ কেউ মনে করেন, ঢাকার যানজটে রিকশাই উপযুক্ত বাহন এবং সবচেয়ে পরিবেশ-বান্ধব। কিন্তু অন্যরা বলেন, ওগুলো কোন কাজের না কারণ মাত্র আটজন যাত্রী নিয়ে চারটি রিকশা একসাথে চললে একটি বাসের জায়গা দখল করে ফেলে।

একটি বিষয়ে সবাই একমত যে, ঢাকার রিকশা দেখতে বেশ সুন্দর।  এদেরকে বলা হয় ‘চলন্ত যাদুঘর’।  এগুলো রঙ-বেরঙের উপাদানে সজ্জিত; ফ্রেমগুলোতে আঁকা থাকে ফুল; পেছনে সিনেমার তারকা এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বের ছবি অথবা গ্রামের বা শহরের দৃশ্য আঁকা থাকে।  রিকশার পেছনে শহরের পেইন্টিংগুলো পর্যালোচনা করলে পরিস্থিতির নিগূঢ় তত্ব খুঁজে পাবেন। কোন বৈচিত্র ছাড়া সেসব ছবিতে এক শান্ত শহরের স্বপ্ন আঁকা থাকে, যেখানে আছে উড়ন্ত পাখি এবং উচু মিনারের পেছনে অস্তায়মান সূর্য।  পেইন্টিংগুলোতে রাস্তাকে দেখতে পাবেন পরিচ্ছন্ন, শান্ত এবং সুস্থির যানজটমুক্ত।

 

ঢাকার নগর বিশেষজ্ঞরা কি সমস্যাকে আরও জট পাকাচ্ছে?

ঢাকার ভেতরে আমরা যে রিকশা পেইন্টিংগুলো দেখতে পাই, সেগুলো সুশৃঙ্খল রাস্তার চিত্র যা অনুমানযোগ্য ভবিষ্যতকে তুলে ধরে। শহরের সমস্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত চাওয়া হলে তারা কিছু পরিচিত ছড়া আবৃত্তি করেন।  ট্রাফিক লাইট, সুনির্দিষ্ট রিকশা লেইন, বাধাহীন রাস্তা, সড়ক রেল ইত্যাদির সুপারিশ করেন তারা। তারা বলেন বিকেন্দ্রীকরণের কথা; চট্টগ্রাম এবং খুলনাকে দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেন। এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে একটি ১২মাইল দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে, যা ২০১৫ সালের অগাস্টে শুরু হয়েছে। কিন্তু ঢাকায় এধরণের প্রকল্প সম্পর্কে গভীর অবিশ্বাস রয়েছে, কারণ সরকারের অদক্ষতা এবং দুর্নীতির কারণে নির্মাণের অগ্রগতি প্রায়ই বাধাগ্রস্ত হয়।

ইতোমধ্যে রাজধানীর রাস্তাগুলোতে ভিড় উপচে পড়ছে। ঢাকার জলবায়ুর সাথে অভ্যস্ত হতে এবং এর দুর্ভেদ্য রাস্তাগুলোর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করতে মাত্র কিছুদিন লাগে। একজন নবীনের কাছে বিদেশি শহরের যানবাহন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। জমাটবাধা যানবাহনগুলো যেভাবে সবদিক থেকে দৃষ্টিসীমানাকে বদলে দিয়েছিল; শূন্যতা এবং দৃষ্টিকোণকে বিধ্বস্ত করে দিয়ে ঢাকার দৃশ্যকে রঙের ছটায় কিউবিস্ট মৃৎশিল্পে পরিণত করেছে, তা দেখে আমি মুগ্ধ হতে শুরু করেছিলাম। দেয়ালে রঙের ছটা; ট্রাকের রিয়ারভিউতে দাড়িওয়ালা চালকের ক্ষণিক প্রতিবিম্ব; ঢেউটিনের বেড়া অতিপ্রাকৃতিকভাবে কয়েক ফিট ওপরে হাওয়ায় ওড়েছিল; আর দেখেছিলাম একটি অদেখা মালবাহী রিকশাভ্যানকে।

অবশ্য আমি উপলব্ধি করেছি যে, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী শহর থেকে যাওয়া একজন অতিথির পক্ষে দরিদ্রতম একটি দেশের অব্যবস্থাপনা আর ‍বিশৃঙ্খলা নিয়ে সৌন্দর্য আলোচনা করা মানানসই না।  ঢাকার যানজটকে বিড়ম্বনা বললে ভুল হবে।  একে বলতে হয় দারিদ্রতা, বলতে হয় এটি অবিচার, এটি দুর্ভোগ।

 

“এই শহর আপনার মনকে দার্শনিক বানিয়ে দেয়”

আমি যাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের প্রায় সবাই যানজটকে অগ্নি পরীক্ষা, সাহসের পরীক্ষা এবং ভয়ের বিষয় হিসেবে দেখে। সেটি আবার বিকৃত অহংকারেরও উৎস।  একজন ভদ্র মহিলা যিনি সারাজীবন ধরে ঢাকায় বাস করছেন, তিনি আমাকে বললেন যে, বিদেশে থাকার সময় তিনি নাকি ঢাকার যানজটকে মিস করেছেন।  ইউরোপ এবং আমেরিকার শহরগুলোতে যানজটের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হওয়াতে সেটি তার উৎসাহকে কমিয়ে দিয়েছে। দিনের বেলায় ঢাকায় বের হয়ে যদি জটপাকানো রাস্তার মোড়গুলোকে আপনি অতিক্রম করতে পারেন, তখন বলা যায় সমস্ত প্রতিবন্ধকতা আপনি জয় করেছেন এবং জয় করেছেন দেবতার মন। এই শহর আপনার মনকে দার্শনিক বানিয়ে দেয়।  ঢাকা আপনাকে জানিয়ে দেবে যে, ভ্রমণ মানে নরক, কিন্তু এটি ভ্রমণের প্রাচীন বিস্ময়কেও মনে করিয়ে দেয়।  দৈনন্দিন যাতায়াত, সেটি যত নৈমিত্তিকই হোক না কেন, সময়কে নিয়ন্ত্রণ করে মিরপুর রোডের মতো ভয়ানক যানজটকে অতিক্রম করার মানে হলো মহাশূন্য জয় করা।

 

ঢাকার রাস্তায় চলতে হলে যে নিয়মটি মনে রাখতে হবে

নিউইয়র্কে ফেরার সময় হলো। ঢাকায় থেকে আমি যাতায়াতের গোল্ডেন রুলটি শিখে নিয়েছি, তা হলো: আগে বের হও।  তাই হোটেলকে আমি ভোর ৪:৪৫টায় ডেকে দিতে বললাম। বিমানে ওঠার পাঁচ ঘণ্টারও বেশি আগে আমার জন্য অপেক্ষমান ট্যাক্সিটিতে নিজেকে গলিয়ে দিলাম।  ট্যাক্সিচালক আমাকে অভয় দিয়ে বললেন যে, এ সময়ে রাস্তার অবস্থা তত খারাপ হবে না।

দেখলাম যে, চালকের কথা ঠিক।  সূর্য তখনও ওঠে নি। আমাদের ট্যাক্সি ঢাকা শহরের মাঝে কালো রাস্তা বেধ করে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল।  কোন যানজট ছিল না – একদমই না। আমরা এয়ারপোর্ট রোডের দখল পেলাম এবং একই গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। গতিপরিমাপক যন্ত্রের দিকে আমি তাকাচ্ছিলাম আর গাড়ির জানালা নামাচ্ছিলাম। ট্যাক্সি ঘণ্টায় ৫০ মাইল বেগে চলছিল – মনে হচ্ছিল যেন আমরা ওড়ছি।

তারপর, আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাবার আনুমানিক এক মাইল আগে কিছু গাড়ি, ট্রাক এবং সিএনজি’র সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিপক্ষ আমাদের পথ আগলে ধরলো। আমাদের ট্যাক্সির গতি থেমে গেলো এবং হঠাৎ আবার ঢাকা বাংলাদেশের যানজটপূর্ণ রাস্তায় আমরা আটকে গেলাম। আমরা থেমে গেলাম, আবার স্টার্ট দিলাম, আবারও থেমে গেলাম। এই ভিড়ের কারণ অস্পষ্ট, কিন্তু এটি স্পষ্ট যে, বিমান ধরতে আর তত সমস্যা হবে না।  অতএব, আমি স্বস্তিতে থাকলাম: শেষবারের মতো ঢাকার উন্মাদনাকে উপভোগ করছিলাম। একসময় আমাদের গতিপরিমাপকে ঘণ্টায় পাঁচ মাইল দেখাচ্ছিল এবং আমরা আবারও সামনের দিকে হামাগুড়ি শুরু করলাম। একটি চিন্তা আমার মাথায় আসলো: ঢাকা শেষ পর্যন্ত আমার কাছে তার পরিচয় ধরে রেখেছে।  এটাকে আপনারা যানজট বলবেন? থামুন। এটি যানজট নয়।

 

 


নিউইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনের নিবন্ধ অবলম্বনে। মূল লেখা “ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম, যা কখনও শেষ হয় না” জডি রোসেন/ ২৩ সেপটেম্বর ২০১৬।

বাঙালি হৃদয়ের উষ্ণতা

গল্পটি বাঙালি হৃদয়কে শীতের বিকালে একটু উষ্ণতা দিতে পারে। বিদেশি বা শ্বেতবর্ণের হলেই যে ধনী নয়, আমাদের এক অবাঙালি বন্ধু বাংলাদেশিদেরকে প্রতিদিন প্রমাণ করে চলেছেন। পেশাগত বন্ধুরা হয়তো তার এ রূপটি জানেন না। তবে দারোয়ান, রিক্সাওয়ালা আর খাবারের দোকানদার তাকে চিনে নিয়েছেন। জীবিকার জন্য শিক্ষকতা এবং দেশেবিদেশে ঘুরে বেড়িয়ে চিত্র প্রদর্শনী তার কাজের অংশ।

ঘটনাক্রমে তিনি আমাদের পারিবারিক বন্ধুও। এশিয়ারই একটি শি্ল্পোন্নত দেশে তার আদি নিবাস। স্বভাবে চলনে মননে তিনি একজন শিল্পী। এদেশে একটি আন্তর্জাতিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে কোনমতে জীবিকা নির্বাহ করেন। আচরণে ভনিতা নেই, পোশাকে নেই বিলাসিতা। উপায়ও নেই। অর্থ আর খাদ্যের অভাব তার নিত্যসঙ্গী। কিন্তু আনন্দের শেষ নেই! আমি দেখেছি, শিল্পী সাহিত্যিকদের জীবনে অভাব অনেকটা অবিচ্ছেদ্য বিষয়। (কবি কী বলেন?)

তার প্রতিটি দিন নিয়েই একটি গল্প লেখা যায়। সম্প্রতি শীতের ছুটি এবং চিত্রপ্রদর্শনীকে একযোগ করে তিনি ইতালিতে গিয়েছিলেন। মাধ্যম বাংলাদেশ বিমান। তার গল্পটি আজ আমার কাছে এসেছে ব্রেইকিং নিউজ হিসেবে।

বাংলাদেশে ফেরার পথে আবিষ্কার হলো যে, ডলার শেষ! ভাগ্য ভালো যে বিমানবন্দরে আসার পর এটি জানা গেছে। কিন্তু ঢাকা পর্যন্ত ফিরতে পারবে এটি নিশ্চিত হলেও বিমান ছাড়তে আরও পুরো একবেলা বাকি। এ একবেলা কে তাকে খাওয়াবে? সঙ্গে আছে কিছু টাকা, যা বিনিময়যোগ্য নয়! বোকার মতো চেষ্টা করলেন একে ডলারে রূপান্তর করতে।

ঘুরতে ঘুরতে কিছু বাঙালি-মতো মানুষের দেখা পেলেন তিনি। প্রায় দু’বছর বাংলাদেশে থাকার অভিজ্ঞতায় তিনি বুঝতে পারলেন, তারা বাঙালি। আধা বাংলায় তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তার হাতের টাকাগুলোকে ডলারে পরিণত করার কোন বুদ্ধি তাদের জানা আছে কি না। স্বাভাবিকভাবেই তারা কোন সমাধান দিতে পারলেন না। কিন্তু আধা-বাংলা আধা-ইংরেজিতে তাদের কথোপকথন চলতে থাকলো। একপর্যায়ে, তারা বুঝতে পারলেন যে, এই অবাঙালি চিত্রশিল্পীর প্রধান প্রয়োজন হলো একবেলা খাওয়া। তারপর ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে বাসা পর্যন্ত যেতে তার আর অর্থের অভাব হবে না। কিন্তু খাবারের প্রয়োজনটি এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজনে রূপ নিয়েছে।

বিষয়টি বুঝতে পারার পর বাঙালি বন্ধুরা আর তাকে ছাড়লেন না। তাদের সাথেই ম্যাকডোনান্ডস-এ তাকে খাওয়ালেন এবং তার প্রিয় পানীয় কফিও তা থেকে বাদ গেলো না। বাঙালিরাও হয়তো মজা পেলেন, কারণ এরকম বদান্যতা গ্রহণে তার কোন অস্বস্তি নেই, বরং নিয়মিত ঘটনা।

এর পরের ঘটনাটি একটু ভিন্ন রকমের। আশেপাশের কয়েকজন ভারতীয় যাত্রী বিষয়টি ভালো চোখে দেখলো না। তাদের কোন অভিজ্ঞতার আলোকে তারা এতে প্রতারণার সম্ভাবনা দেখতে পেলো। কীভাবে একজন নিরীহ নারীকে প্রতারণার হাত থেকে বাঁচানো যায়, তারা উপায় খুঁজতে লাগলো। একটি সময়ে যখন বাঙালি বন্ধুরা তাকে ছেড়ে ওয়াশরুম অথবা স্মোকিংরুমে গেলেন, তখন ওই ভারতীয় ‘স্বেচ্ছাসেবীরা’ তাকে বাঁচাতে এলো। কিন্তু আমাদের অবাঙালি বন্ধুটি এতে মনে মনে বিরক্ত হলেন, কারণ তাদেরকেও তিনি প্রথমে বাঙালি মনে করে সাহায্য চেয়েছিলেন, যাতে তারা অপারগতা প্রকাশ করেছিল। বিরক্তি প্রকাশ না করে তিনি ভারতীয় সহযাত্রীদেরকে জানালেন যে, তারা তার পূর্ব পরিচিত। অতএব এবিষয়ে আর কথা নয়।

যা হোক বাঙালিরা ঢাকা বিমানবন্দর পর্যন্ত তার সঙ্গে ছিলেন এবং ঢাকায় এসে সিএনজিতে তোলে দিয়ে তারা বিদায় নিয়েছিলেন। বলা যায়, বাসা পর্যন্ত তারা তার সঙ্গেই ছিলেন, কারণ সিএনজি ড্রাইভারের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে তারা তার বাসায় পৌঁছানো নিশ্চিত করেছিলেন।▲

————
ফেইসবুক স্ট্যাটাস: ৬ জানুয়ারি ২০১৭

চলছে বাণিজ্যিক শোষণ! রিভিউ লেখুন, মুনাফাখোরদের আগ্রাসন থেকে অসহায় ভোক্তাকে মুক্তি দিন…


রাতের নির্জনতায় অথবা অফিসের ব্যস্ততায় হুট করে একটি বার্তা এসে হাজির। আপনি হয়তো ভাবলেন বুঝি আপনার আপন কেউ আপনার খবর নিচ্ছে। কিন্তু না। ‘দারুণ অফার’ নামক নতুন আরেকটি অনাকাঙ্ক্ষিত মেসেজ। ছুটির দিন দুপুরের আহারশেষে আয়েশ করে একটি বৈকালিক ঘুম দিলেন, কিন্তু তা আর হয়ে ওঠলো কই? ‘দারুণ অফার’ এসে হাজির! একটি প্রতিষ্ঠিত ও স্বনামধন্য মোবাইল ফোন অপারেটর তাদের প্রোমোশনাল আইটেমগুলো নিয়ে এমন জ্বালা-যন্ত্রণা শুরু করেছে যে, সেটি স্বাভাবিক জীবনকে অস্বস্তিতে ফেলছে। আগে তারা শুধু বার্তাতেই সীমাবদ্ধ থাকতো, কিন্তু এবার কল করতে শুরু করেছে। অসহায় গ্রাহক তখন কী করবেন?

দেশের সুপারশপগুলো শুরু করেছে সুপার বাটপারি। মনে করুন, ৫৪৪ টাকার বিল হয়েছে। সেক্ষেত্রে আপনাকে ৫৪৫ টাকা দিতে হবে, কারণ তাদের কাছে ১টাকা চেইন্জ নেই! কিছুদিন তারা ক্রেতাকে ১টাকা দামের চকলেট খেতে বাধ্য করেছে, এবার সেটিও আর করছে না। ৫৫০ টাকা দিলে বিনাবাক্যে ৫টাকা দিয়ে তারা পরবর্তি ক্রেতার দিকে মনযোগ দেয়। এটি তো গেলো দৃশ্যমান প্রতারণা। ধরুণ আপনার বিল হয়েছে ৫৪৭.২৫ টাকা। তবে কি তারা আপনাকে পৌনে তিন টাকা ফেরত দেবে? বড়জোড় ২টাকা পেতে পারেন। এভাবে তারা ক্রেতাকে ঠকিয়ে হাজার হাজার টাকা অতিরিক্ত আদায় করছে। কেউ কি হিসাব করেছে? তাছাড়া, পণ্যের কোয়ালিটির কথা বাদই দিলাম। তো এসব ক্ষেত্রে ভোক্তার কত সময় আছে, পঁচাত্তর পয়সার জন্য বিশাল বড় সুপারশপগুলোর সাথে বাদানুবাদে যাবার?

ফাস্টফুড রেস্তোরাঁগুলোতেও একই দশা। চারশ’ টাকা দিয়ে একটি বার্গার অর্ডার করে দেখবেন, সেখানে চিজ (পনির) নেই। কেন নেই? কারণ আপনি তা দিতে বলেন নি। পনির দেবার জন্য এক্সট্রা আরও হয়তো ৪০/৫০ টাকা যোগ করতে হবে। খাবারের মান নিয়ে কথা বলবেন? তাদের চাকচিক্য দেখে কি কখনও সন্দেহ হবে যে, তারা মৃত মুরগির মাংসকে হার্বাল স্পাইস মিশিয়ে ফ্রাই করে আপনাকে খাইয়েছে? নিশ্চিত হলেও তা বলার পরিবেশ আপনি পাবেন না, কারণ আপনি একা।

এ প্রসঙ্গে দেশের শিক্ষা বা চিকিৎসা সেবা নিয়ে কিছু বলার প্রয়োজন আছে কি? চিকিৎসার সেবার অব্যবস্থা নিয়ে কথা বললে আরব্যরজনীর মতো শেষ হবার নয়। এখানেও স্বল্পবিত্তরা নিতান্তই একা আর অসহায়। উচ্চবিত্তদের জন্য দেশীয় চিকিৎসার দরকারই নেই!

ফলে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি মৌলিক অধিকারগুলোর জন্য টাকা খরচ করেও ভোক্তা বঞ্চিত হচ্ছে। এভাবে ভোক্তাবাজারের বিভিন্ন সেবাখাত থেকে শোষণ, বঞ্চণা ও প্রতারণা চলছে হরিলুট কায়দায়। শোষকেরা এখানে ঐক্যবদ্ধ, শোষিতরা নানা ধারায় বিভক্ত।

পুঁজিবাদি সমাজে একটি মুনাফাখোর শোষক শ্রেণী গড়ে ওঠে এবং ওঠেছে। তারা দৈত্যের ন্যায় শক্তিশালী কারণ শাসকশ্রেণীও একই স্বার্থে তাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ। মাঝে মাঝে শাসকেরা খুবই সূক্ষভাবে আইওয়াশ করেন অবশ্য। কিন্তু সকলেরই উদ্দেশ্য যেকোনভাবে লাভবান হওয়া। বিজনেস এথিক্স এখানে অনুপস্থিত। কোথাও কোন নিয়ন্ত্রণ নেই, নেই কোন আইনের প্রয়োগ। বিখ্যাত এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোও এই লাগামহীন বাজারের সুবিধা নিচ্ছে, কারণ এখানে তাদের ভালো থাকার বাধ্যবাদকতা নেই। অন্যদিকে শোষিতরা নিরব! কী করবে তারা? নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত ভোক্তাশ্রেণীর তো কোনই ক্ষমতা নেই। মাঝেমাঝে ভোক্তার অধিকার বলে শুধুই চিৎকার করি, যা কোন কাজে আসে না।

মোদ্দাকথা হলো, ভোক্তারা নিজেদের মতামতকে কার্যকরভাবে প্রকাশ না করলে, তাদের অসহায়ত্ব সম্পর্কে কোন ধারণা সৃষ্টি হয় না। ভোক্তার আহাজারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কানে পৌঁছায় না, পরিস্থিতিরও উন্নয়ন হয় না।

.
২)
গত বছর কোরিয়া বেড়াতে গিয়েছিলাম। সপ্তাহ দুই বেড়ানোর পর ফেরার পথে সঙ্গত কারণেই লাগেজটা মোটা হয়ে গেলো! উপায় না দেখে আরেকটি লাগেজ কিনতে বাধ্য হলাম। কিন্তু বিমানে ওঠার পূর্বের রাতে দেখা গেলো যে, লাগেজটির একপাশের সেলাই ঢোলা হয়ে গেছে। মহাফ্যাসাদে পড়লাম! এখন তো আর কেনার সময় নেই, বদলাবারও সুযোগ নেই! কিন্তু আমার সফরসঙ্গীকে ততটা চিন্তিত হতে দেখলাম না। কিছুক্ষণ পর আমাকে জানানো হলো যে, লাগেজের দোকান থেকে নতুন একটি লাগেজ ২০মিনিটের মধ্যেই বাসায় পৌঁছাবে। সত্যিই তাই হলো! তারা বাতিলকৃত লাগেজটি নিতে চাইলেন না, দেখতেও চাইলেন না, বরং দুঃখ প্রকাশ করলেন। আমি তো বিস্ময়ে হতবাক!

আমাদের দেশে হলে তো এই সমস্যার দায়িত্বই দোকানদার মাথায় নিতো না। অবিলম্বে আমি এই যাদুর মাজেজা জানার জন্য ওঠেপড়ে লাগলাম। আমার সফরসঙ্গী জানালেন যে, এখানে ইন্টারনেট কমিউনিটি খুবই প্রভাবশালী। প্রসঙ্গত, ইন্টারনেট ব্যবহারে (internet penetration) কোরিয়ানরা পৃথিবীর শীর্ষে। কোন কোম্পানি/পণ্য সম্পর্কে কোন ভোক্তা যদি নেতিবাচক কোন অভিমত প্রকাশ করে, তবে কয়েক মিনিটের মধ্যে তা হাজার হাজার ভোক্তার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন সকাল হতে হতেই কোম্পানিতে লালবাত্তি!

আমরা তো দিনভর ফেইসবুক দিয়ে ইন্টারনেট চালাই আর পণ্যের নিম্নমান নিয়ে মুখেমুখেই চিল্লাবিল্লা করি। ছবিসহ দু’টি লাইন লেখে দিলেই কিন্তু সংশ্লিষ্ট কোম্পানির টনক নড়বে। সেটা করি না – ব্যস্ত থাকি সেল্ফি আর কাউফিতে। আইন বলুন আর সরকার বলুন, না কাঁদলে আপন মাতাই দুগ্ধ দেয় না!

একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল সম্প্রতি ‘রিভিউ’ নামে একটি বিভাগ খুলেছে। সেখানে মূলত বিভিন্ন ব্র্যান্ড নিয়ে ইতিবাচক গুণকীর্তন করা হয়। তবু কোন ভোক্তা সেখানে তার নিজের অভিমতটি প্রকাশ করতে পারেন। তাছাড়া, ব্লগে, ফেইসবুকে অথবা টুইটারে প্রকাশ করতে পারেন নির্দিষ্ট সেবা/পণ্য সম্পর্কে ভোক্তার অভিজ্ঞতা। তাতে প্রতারিত/সংক্ষুব্ধ ভোক্তাদের মধ্যে একতা বৃদ্ধি পাবে, সে সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানও সচেতন হতে বাধ্য হবে।

 

.

পণ্য বা সেবার বাস্তব ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক রিভিউ লেখে আমরা সমাজের অসামান্য উপকার সাধন করতে পারি:

• প্রফেশনাল রিভিউ: পেশাদার মূল্যায়ন। আমরা নির্দিষ্ট কোন ব্র্যান্ডের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারি। সঙ্গে থাকবে ইতিবাচক ও নেতিবাচক বিষয়ের সুসমন্বয়। দামের সাথে উপযোগিতার তুলনা। এটি সংশ্লিষ্ট কোম্পানির জন্য মহামূল্যবান নির্দেশনা হতে পারে। নিজের পরিচিত পণ্য দিয়েই শুরু করা যায় রিভিউ। উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্র্যান্ডগুলো এসব মূল্যায়নকে খুবই গুরুত্ব দেয়। একসময় উচ্চমূল্যে বিক্রি হতে পারে একটি রিভিউ।

• কনজিউমার রিভিউ: ভোক্তার অভিমত। এর আরেক নাম হতে পারে, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। এটি পেশাদার অথবা ভারসাম্যপূর্ণ হবার বাধ্যবাদকতা নেই। ভোক্তা যখন-তখন একটি রিভিউ লেখে তা নিজের ফেইসবুকে/ব্লগে/টুইটারে প্রকাশ করতে পারেন। তাতে কিছু কাজও হবে, ক্ষোভও প্রশমিত হবে। একপেশে বা আবেগাক্রান্ত না হলে সেটি বেশি ফলদায়ক হবে। যুক্তি এবং প্রমাণনির্ভর হলে সেটি কাঙ্ক্ষিত সুফল নিয়ে আসবে। ছবি থাকলে তো কথাই নেই!

ব্লগিং-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো, নাগরিক সাংবাদিকতা, যা আউট-অভ্-ফোকাস ও অবহেলিত মানুষের অধিকারের কথা বলে। আমি মনে করি, ব্লগারদের নৈতিক দায়িত্ব আছে দেশের অসহায় ভোক্তাদের পক্ষে কথা বলার। তারা নিজেরাও তো একেকজন ভোক্তা। বাস বলুন আর রিক্শা বলুন, কাঁচাবাজার বলুন আর শেয়ার বাজার বলুন – ভোক্তার চেয়ে অসহায় আর কে আছে!

.

.

*পাবলিক ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া: ১৯ অক্টোবর ২০১৫

মার্গারেট থ্যাচারকে কেন লৌহমানবী বলা হতো?

jiggasha

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় যে, মার্গারেট থ্যাচারের ‘লৌহ মানবী’ খেতাবটুকু তার কর্মের জন্য নয়, তার কঠোর বাগ্মীতার জন্যই দেওয়া হয়েছিল। সেটি ইতিবাচক অর্থে নয় নেতিবাচকভাবেই দেওয়া হয়েছিল। যা হোক, তাকে কখন কীভাবে কেন এবং কে এই খেতাব দিয়েছিল সেটি আজ আর অজানা থাকার বিষয় নয়। মোট কথা হলো, সোভিয়েত রাশিয়ার গণমাধ্যম থেকে তিনি এই খেতাব পেয়েছিলেন, যার কারণে পরবর্তিতে তিনি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছিলেন।

তো দেখি এবার, তিনি কী কথা বলতেন, যার কারণে লৌহ মানবী বা আইরন লেডি’র শব্দযুগল তার নামের সাথে যুক্ত হয়।

 

————-

আমি ভাগ্যবান ছিলাম না, ভাগ্যকে অর্জন করেছি।

আমি অস্বাভাবিক ধৈর্য্যশীল, এই শর্তে যে শেষ মুহূর্তে আমি নিজের সুযোগটি পাই।

জনতাকে অনুসরণ করবেন না, জনতাকে বরং আপনাকে অনুসরণ করতে দিন।

রাজনীতিতে যদি কাউকে দিয়ে কিছু বলাতে চান, তবে একজন পুরুষকে বলুন। যদি কিছু করাতে চান, তবে একজন নারীকে বলুন।

রাজনীতিতে একটি সপ্তাহ বিশাল সময়।

সাধারণত দশ সেকেন্ডের মধ্যেই আমি একজন মানুষ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেই এবং খুব কমই সেটি বদলাই।

অবশ্যই এটি পুরান কাহিনি। সত্য তো একই পুরান কাহিনি।

একটি যুদ্ধকে জয় করার জন্য আপনাকে একাধিকবার যুদ্ধ করতে হতে পারে।

কঠোর পরিশ্রম ছাড়া কেউ শীর্ষস্থানে পৌঁছেছে এমন কাউকে আমি জানি না। এটিই উপায়। পরিশ্রম আপনাকে সবসময় শীর্ষস্থানে না নিলেও অন্তত নিকটে গিয়ে পৌঁছাতে পারবেন।

আপনার কাজের পরিকল্পনা করুন, আজকের এবং প্রতিদিনের। তারপর পরিকল্পনাকে কাজে রূপ দিন।

প্রত্যেক নেতার মধ্যে কিছু পরিমান লোহা থাকা উচিত। তাই আমাকে যে ‘লৌহ মানবী’ বলা হয়, সেটি আলাদা কিছু নয়।

————-

 

‘আমি ভাগ্যবান ছিলাম না, ভাগ্যকে অর্জন করেছি।’ এই কথাটি যে কতটা সত্য ছিল, সেটি থ্যাচারের জীবন (১৩ অক্টোবর ১৯৩৫ – ৮ এপ্রিল ২০১৩) থেকে বুঝা যায়। তিনি ১১ বছরেরও বেশি সময় ব্রিটেনের শাসক ছিলেন। ছিলেন নন্দিত এবং নিন্দিতও। অনেকের প্রশ্ন, এত নিন্দিত থাকার পরও কীভাবে এত বছর তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থাকলেন। যোগাযোগ প্রযুক্তির এই যুগে, তার জীবন কাহিনি আজ সবার জন্য উন্মুক্ত। আমাদের জীবন থেকেও একই সত্যকে বুঝতে পারি। সত্য সবসময়ই পুরান এবং পরিবর্তনহীন। এটিও থ্যাচারের কথা। এটি সবারই কথা। তিনি সত্যই এক লৌহ মানবী ছিলেন।

 

 


উক্তিগুলো বিভিন্ন থেকে সংগৃহীত এবং লেখক কর্তৃক বাংলায় অনূদিত।

আমার প্রিয় রসাত্মক ধনাত্মক উক্তিগুলো। পর্ব ৩।

মানুষের কথায় তাকে চেনা যায়। তার প্রতিটি সচেতন উক্তিতে আছে দর্শন। রয়েছে ভাবনার বিষয়, চিন্তাকণা। এবারের পর্বটি একটু অম্লমধুর হবে। রস আছে। সে রসে আছে তীক্ষ্ণতা। সবগুলো কথাই চিন্তা খাবার যোগাবে, তাতে আমি নিশ্চিত। বলে রাখছি, এগুলো প্রথমত লেখকের নিজেরই জন্য। কিন্তু পাঠক মজা পেলে লেখক ধন্য।

 

————

কাউকে বিয়ে করার পূর্বে তাকে একটি ধীরগতির কম্পিউটার ব্যবহার করতে দিন। এবার দেখুন সে আসলে কেমন।  (উইল ফেরেল)

আমি যা কিছু করতে পছন্দ করি, সেগুলো হয় অনৈতিক, না হয় অবৈধ অথবা শরীর মোটা হয়ে যায় এমন কাজ। (আলেকজান্ডার উলকট)

আমি এমন একজনকে চিনি যে ধূমপান, মদ্যপান, নারীসঙ্গ এবং উচ্চমানের খাবার খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল। আত্মহত্যার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সে সুস্থ ছিল। (জনি কারসন)

সে নিজেই শুধু একঘেয়ে নয়, সে অন্যদের মধ্যেও একঘেয়েমির কারণ। (স্যামুয়েল জনসন, ১৮ শতকের লেখক)

ঈশ্বর যে আমাদের ভালোবাসেন তার একটি অকাট্য প্রমাণ হলো মদ। তিনি আমাদেরকে আনন্দে রাখতে পছন্দ করেন। (বেন্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম স্থপতি)

স্বাস্থ্য বিষয়ক বই পড়ার সময় সাবধান থাকবেন। ছাপার ভুলের কারণে আপনার মৃত্যু হতে পারে। (মার্ক টোয়েন)

ভালো মেয়েরা স্বর্গে যায়, খারাপ মেয়েরা সবখানে যায়।  (হেলেন গার্লি ব্রাউন)

রাগ নিয়ে ঘুমাতে যাবেন না। জেগে থাকুন, ঝগড়ায় লেগে থাকুন। (ফিলাস ডিলার)

রাজনীতিতে যদি কাউকে দিয়ে কিছু বলাতে চান, তবে একজন পুরুষকে বলুন। যদি কিছু করাতে চান, তবে একজন নারীকে বলুন। (মার্গারেট থ্যাচার, দ্য আইরন লেডি)

———–

 

এবারের পর্বটির জন্য রিডার্স ডাইজেস্ট-এর কাছে ঋণী। অনুবাদ লেখকের।


রসাত্মক ধনাত্মক উক্তির দ্বিতীয় পর্ব।

কর্মসংস্থান: পৃথিবী ভিতুদের জন্য নয়…নিয়ম ভাঙ্গুন, চাকরি ধরুন!

কর্মসংস্থান নিয়ে অনেক দিন কিছু লেখা হচ্ছে না। এদিকে অনেক কথা জমে আছে পেটে! চাকুরির বাজারটা ক্রমেই ‘ট্রিকি’ হয়ে আসছে। চাকুরি প্রত্যাশী এবং চাকুরি দাতা উভয়েই এখন মহাসংকটে! আস্থার সংকট তো আছেই, চিরাচরিত সংকট হিসেবে আছে একে অপরকে না বুঝার সংকট। এটি যেন আকারে-প্রকারে শুধুই বড় থেকে বিকটতর হচ্ছে। এরকম একটি কঠিন সময়ে আমি প্রশাসন থেকে বিযুক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠানের মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগে এসে ল্যান্ড করলাম। এ বিষয়টি এর আগে প্রশাসনেরই অংশ ছিল। নতুন বোতলে পুরাতন জুস আর কী! সবই কর্তার ইচ্ছা!

আস্থার সংকটটি বুঝতে পারা যায় যখন বিধি মোতাবেক সমস্ত শর্ত মেনে আবেদন করার পরও ইন্টারভিউ কলটি আসে না। অথবা ইন্টারভিউ পর্যন্ত মোটামুটি ভালো করেও যখন, পরবর্তিতে কোন খবর আসে না, তখনই বুঝা যায় উভয়ের মধ্যে আস্থার অভাব আছে। এসময়ের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হলো, রেফারেন্স ছাড়া চাকরি না হওয়া। অথবা প্রথম ব্যক্তিটিকে ডিঙ্গিয়ে দ্বিতীয় তৃতীয় বা চতুর্থ এমনকি দশম ব্যক্তিটিকে চাকরি দেওয়া।

একে অন্যকে না বুঝার ব্যাপারটি আরও স্বাভাবিক – তবে দুঃসহনীয়। দু’টি পক্ষ অত্যন্ত আনুষ্ঠানিক পরিবেশে প্রার্থী নির্বাচন বা ‘চাকরিটি পাইতেই হবে’ – এরকম চাপ নিয়ে রোবটিক আলোচনায় লিপ্ত হলে, এখানে ‌’আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ না হবারই কথা। প্রথাগতভাবে ‘না বুঝার পরিস্থিতিটি’ সৃষ্টি করেন নিয়োগকর্তা এবং এর কুফল ভোগ করেন উভয়ই। এরকম পরিস্থিতিতে চাকরি প্রার্থী আত্মবিশ্বাসী হলে, পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে নিয়ে আসতে পারেন।

 

একটি কেইস স্টোরি শেয়ার করছি। রাইসুল হাসান স্বভাবত উগ্র না। কিন্তু একটি সিনিয়র পদে চাকরির ইন্টারভিউতে সে বুঝতে পারে নিয়োগকর্তাদের কথায় কোন ফাঁক আছে। ইন্টারভিউয়ারদের সামনে বসেই সে রাগে ফুঁসতে থাকে। সে সমস্ত নির্দেশ অনুসরণ করেছে এবং প্রত্যাশিত যোগ্যতার প্রায় সবগুলোই তার শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার সাথে মিলে গেছে। টেস্টেও সে ভালো করেছে। তবু ইন্টারভিউয়ারদের একজন তাকে যা বললেন, তা হাসান মেনে নিতে পারছে না। ‘মি. হাসান, ফ্রাংকলি স্পিকিং… আপনার এভরিথিং ওকে। কিন্তু কিছু বিষয় আমাদেরকে প্রসিড করতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’ কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে হাসান করণীয় নির্ধারণ করে। হাসান জানে, চাকরিটা তার এমনিতেই হচ্ছে না। তাই রাগের মাথায় রাইসুল হাসান বেশকিছু প্রশ্ন করে বসলেন নিয়োগকর্তাদের নাক বরাবর! প্রশ্নগুলোর অধিকাংশই প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি, কাজের ধরণ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কিত প্রশ্নগুলো স্বভাবতই কিছুটা আক্রমণাত্মক এবং স্পর্শকাতর হয়ে যায়। আর তাতে ‘ডিফেন্স’ করতে এগিয়ে আসেন বোর্ডের নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকা ভদ্রলোকটি। হাসান ধারণা করেছে, তিনিই হবেন প্রতিষ্ঠানের সিইও, কারণ উত্তরগুলো খুবই জুতসই এবং দায়িত্বশীল হচ্ছে। আইসব্রেকিং পর্ব শেষ! আস্তে আস্তে ইন্টারভিউর গোমট পরিবেশ হালকা হয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থায় চলে আসে। অন্যান্য ইন্টারভিউয়াররা ক্রমে কক্ষ ছাড়তে থাকেন। সিইও তার দুপুরের খাবার পিছিয়ে দেন। প্রায় দু’ঘণ্টার আলাপচারিতার বিস্তারিত সকল তথ্য এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। প্রাসঙ্গিক হলো, নিয়মভঙ্গ করে হাসান সেদিন রোবটিক আলোচনাকে ‘মানবিক সমঝোতায়’ রূপ দেয়। প্রশ্ন-উত্তর আর প্রতিপক্ষ-মুখী জিজ্ঞাসাবাদকে সমঝোতামুখী সংলাপে পরিণত করে। হাসানকে সাহায্য করেন প্রতিষ্ঠানের সিইও নিজে। রাইসুল হাসানের সরল কিন্তু তীক্ষ্ণ ও প্রত্যক্ষ প্রশ্নগুলোকে কর্তৃপক্ষ সততা ও পেশাদারিত্বের চিহ্ন হিসেবে দেখেছে। সঙ্গতকারণেই এর ফলাফল হাসানের পক্ষে চলে যায়।

রাইসুল হাসানের ঘটনায় অনেক প্রতিষ্ঠিত কিছু প্রথার ব্যতিক্রম হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যে নিয়মটি হাসান লঙ্ঘন করেছে, তা হলো ইন্টারভিউ বোর্ডে বিতর্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা। চাকরির ইন্টারভিউতে একটি প্রতিষ্ঠিত নিয়ম হলো, নিয়োগকর্তাদের সাথে বিতর্ক সৃষ্ট হয় এমন কথা বলা বা এমন প্রশ্ন করা যাবে না। তাতে সব ভেস্তে যাবে। কিন্তু হাসানের ব্যক্তিত্বে এবং কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিলো, যার কারণে প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেও নিজের পক্ষে তা কাজে লাগাতে পেরেছে।

অফিস এবং আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেও নিজের স্বকীয়তা তুলে ধরার বিষয়টি অনেক প্রার্থী মনে রাখতে পারে না। নিজস্বতা তো নেই-ই, নিজের সর্বনিম্নটুকু তুলে ধরতে ব্যর্থ হয় অনেকে। এই সমস্যার গোড়া অনেক গভীরে। যেতে হবে আমাদের স্কুলজীবনে, যেখানে নিজস্ব কিছু করা মানেই শিক্ষকের বেত আর মায়ের বকুনি। ইংরেজি অথবা গণিতকে ছোটকাল থেকেই ‘কঠিন বিষয়’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষকের কাছে জিম্মি থেকে আমাদের শিক্ষা জীবন শেষ হয়। তাই ব্যতিক্রম আমরা প্রায় জানি না।

 

এরকম সমাজ ব্যবস্থায় টিকে থাকা এবং নিজেকে অতিক্রম করা খুবই কঠিন। তবু কয়েকটি নিয়ম লঙ্ঘনের দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি। পৃথিবীর যাবতীয় বিধান, নীতিমালা আর চুক্তিনামা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে – চাকরি প্রার্থীর পক্ষে কেবল একজনই থাকে। তাই চাকরি প্রার্থীর পক্ষ থেকে কয়েকটি ব্যতিক্রম তুলে ধরা চেষ্টা করলাম। এগুলোই সব নয় – কেবলই দৃষ্টান্ত:

১) প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ছকে আবেদনপত্র ব্যতিত আর কিছুই গ্রহণযোগ্য হবে না -এনিয়মটি মানতেই হবে এমন নয়। ঘোষিত পদ এবং দায়িত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট ট্রেনিং বা অভিজ্ঞতার সনদ থাকলে তা যুক্ত করা যায়। প্রথম দর্শনই সেরা দর্শন।

২) সিভিতে ‌’আমি’ শব্দটি একদমই ব্যবহার করা যাবে না, এটিও খোঁড়া যুক্তি। চাকরির আবেদন মানেই হলো নিজেকে নিয়ে মার্কেটিং করা। যেখানে ব্যক্তিগত যোগ্যতাই প্রধান নিয়ামক, সেখানে অন্তত ৪/৫বার ‌’আমি’ ব্যবহারে মহাভারত অশুদ্ধ হয় না। আমি ব্যবহার করলে আবেদনপত্রটিকে বরং একটু ‘মানবিক’ দেখাবে। মানবিক হওয়াটা জরুরি। মানুষ যা পছন্দ করে, তার সবই প্রকাশ করতে পারে না! নিয়োগকর্তারা সকলে জানেন না, তারা কিসে সন্তুষ্ট হবেন।

৩) ‘আপনার সমস্ত কাজের/চাকুরির বিবরণ দিন।’ কী দরকার আছে এত কিছু বলার? সমস্ত কর্মজীবনের ইতিহাস তাদেরকে জানিয়ে কী লাভ! তার পরিবর্তে এই কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা/ কর্মসংস্থানের বিবরণ তুলে ধরা যায়।

৪) ‘আগ্রহীদেরকে নিম্নের ঠিকানায় আবেদনপত্র পাঠাতে অনুরোধ করা হলো।’ এভাবে নিয়ম পালন করে অনেকেই তার সিভিখানি প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যক্তির হাতে পৌঁছাতে পারে নি। দোষ দিয়েছে ডাকবিভাগের অথবা নিজ কপালের। পরামর্শ হলো, তাদের নির্দেশিত ঠিকানা ছাড়া আরও কোন সরাসরি পথ আছে কিনা, তা খুঁজে বের করতে হবে। অনেকে নিয়োগকর্তার নামটি সংগ্রহ করে একদম তার নাম উল্লেখ করে আবেদনপত্র পাঠায়। ইন্টানেটের যুগে নাম বেরা করা খুব কঠিন নয়। নিয়োগকর্তা যদি সত্যিই উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে বের করতে চান, তবে বিশেষ মাধ্যমে পাঠানোর কারণে আপনার আবেদনপত্রটি বাতিল হবে না। বরং আলাদা গুরুত্ব পেতে পারে।

৫) ‘অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ প্রার্থীর অযোগ্যতা বলে বিবেচিত হবে।’ হতেই পারে। তবে পরিস্থিতি বুঝে এখানেও কিছু কৌশল খাটানো যায়। কোন রেফারেন্স না দিয়ে নিজের যোগ্যতার বিবরণ দিয়ে এবং কোন পদের উল্লেখ না করে – নিয়োগকর্তাকে একটি ইনফরমাল চিঠি পাঠানো যায়। গৃহীত হলেও চমৎকার, না হলেও প্রার্থীর ফাঁসী হবে না!

৬) ‘আপনার বেতনের ইতিহাস তুলে ধরুন।’ বললেই হলো? সংশ্লিষ্ট পদে তারা কী পরিমাণ বেতন দিয়েছেন, তা কি তারা কখনও জানাবেন? কখনও না। তবে কেন নিজের ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে নেগোশিয়েটিং স্ট্রেংথ কমানো? এসব ক্ষেত্রে মিথ্যা বিবরণ দিলে কিন্তু বুমেরাং হতে পারে। তবে সত্যটি গোপন করা যায়।

৭) ‘আমরা প্রশ্ন করবো, আর আপনি শুধু উত্তর দেবেন’ এরকম একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু নিয়োগকর্তাদেরকে এতো সুযোগ দিয়ে নিজেকে ‘ভেড়া’ বানাবেন না। একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে পরবর্তি প্রশ্নটির জন্য বোকা হয়ে বসে থাকবেন, সেটি না করলেও চলবে। উত্তর দিন, তবে সুযোগমতো প্রশ্নও করুন। অনেক সময় প্রশ্নকর্তাদের মধ্যেও বিরতি থাকে। বিনয়কে অস্ত্র হিসেবে ধারণ করে সেসব বিরতিতে নিজেকে প্রবেশ করাতে হবে। সাধারণত, প্রশ্ন যে করে, চালকের আসনে সে-ই থাকে।

 

ইন্টারভিউ বোর্ডে ‘সবই ঠিক আছে’ বা ‘আমি রাজি’ গায়ে পড়ে এমন মনোভাব দেখানোর চেয়ে নিজের সামর্থ্যটুকু দেখানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে মনে করেন, ইন্টারভিউ বোর্ডে প্রশ্ন বা কোন প্রকার জিজ্ঞাসা করলে তাতে কাজটির প্রতি প্রার্থীর অনীহা প্রকাশ পাবে। অথবা, নিয়োগকারী নাখোশ হতে পারেন। নিয়োগকারীকে খুশি করার চেষ্টা না করে, সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতে হবে। তারা আনন্দ পেতে বসেন নি, উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে পাবার জন্য বসেছেন।

কাজটি পেলেই করবো। নির্বাচিত হলেই ওই বিষয়ে পড়াশুনা শুরু করে দেবো। এরকম শর্তে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে, পছন্দের প্রতিষ্ঠান/কাজটিকে লক্ষ্য করে আগে থেকেই কিছু জেনে রাখাটা বুদ্ধিমানের কাজ। ‘আপনার কোন জিজ্ঞাসা আছে?’ এরকম সুযোগে তখন কার্যকর কিছু জিজ্ঞেস করা যাবে। তাতে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রার্থীর ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পায়। নিয়োগকর্তাদের মনে আস্থার সৃষ্টি হয়। প্রশ্নে ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। উত্তরের মধ্য নয়, প্রশ্নের মধ্য দিয়ে মানুষকে চেনা যায়।

একটি সফলতা পরেরটিকে এগিয়ে নিয়ে আসে। ইন্টারভিউ বোর্ডে বেয়াদবি করার দরকার নেই, সেটি যোগ্যতার অংশ নয়। নিয়োগকারীর প্রশ্ন আক্রমণাত্মক হলেও মনে করতে হবে, এর অন্য কোন অর্থ আছে। রেগে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ সৃষ্টি করলে, সেটি ভালো ফল নিয়ে আসবে না। বরং নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক অনুভূতির সৃষ্টি হবে, যা পরবর্তি প্রচেষ্টায় প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রশ্নের উত্তরে যথাযথ আচরণ করাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর জানতে হবে এমন কোন কথা নেই, সেক্ষেত্রেও নিজেকে ধরে রাখতে হবে। এখানে লজ্জার কিছু নেই। আবার অতি বিনয়কে তারা লাজুক বা অন্তর্মুখী স্বভাব হিসেবে ধরে নিতে পারেন। তাই বিনয়ের অবতার হয়ে জানা বিষয়টিকেও এড়িয়ে গেলে কোন ফল হবে না। একেকটি প্রশ্ন একেটি সুযোগ।

যেকোন প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে আত্মবিশ্বাস একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বায়বীয় বিষয়। মনস্তাত্ত্বিকদের কাছে আত্মবিশ্বাস হলো বিশ্বাসের মধ্যে। আপনি ততটুকুই আত্মবিশ্বাসী যতটুকু আপনি মনে করেন। আরেকটি নিয়ম হলো, আত্মবিশ্বাস কেউ দিয়ে দেয় না, নিজে থেকেই অর্জন করতে হয়।

সমাজে প্রকৃত নেতার খুবই অভাব। কিন্তু আত্মবিশ্বাস নেতৃত্বদানের জন্য প্রধান নিয়ামক। চাকরি প্রার্থীকে মনে রাখতে হবে যে, ইন্টারভিউ বোর্ডে আত্মবিশ্বাস তার যোগ্যতারই অংশ। ওটি না দেখাতে পারলে, উত্তর সঠিক হলেও তা পালে বাতাস পাবে না।

চাকুরির বাজার যেন একটি গ্ল্যাডিয়েটরস থিয়েটার! যোগ্যতা দেখিয়ে চাকরি পাওয়া একটি নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া, তাতে সন্দেহ নেই। বর্তমান চাকরির বাজারটি আরও অমানবিক হয়ে যাচ্ছে। প্রার্থীর প্রচেষ্টা থাকবে মানবিক হবার এবং যতটুকু সম্ভব ঘরোয়া পরিবেশ ফিরিয়ে আনার।

এসব ক্ষেত্রে যেসব বিধি-বিধান বা নিয়ম-নীতি আছে, তার প্রায় সবই নিয়োগকারীর অনুকূলে। বুদ্ধিমান প্রার্থীরা দু’টি কাজ করেন: ১) নিজের মতো করে সেগুলো অনুসরণ করেন অথবা/এবং ২) সুযোগমতো এড়িয়ে চলেন। ভুলে গেছি, ব্যস্ততার কারণে সার্কুলারটি ভালোভাবে পড়ার সুযোগ হয়ি নি অথবা আমি তো কেবল আজই জানলাম – সাথে সাথে আবেদন করলাম। এসব বলেও কিছু বিধান এড়িয়ে যেতে সক্ষম হন অনেক প্রার্থী। প্রার্থীকে শুধু মানবিক হবার চেষ্টা করলেই, অনেক নিয়মকে তিনি এড়িয়ে যেতে পারেন।

 

শেষ কথা: বিষয়টিতে আরও আলোচনার প্রয়োজন আছে। কর্মসংস্থানের মৌলিক সমস্যাগুলো এই পোস্টে পর্যাপ্ত আলোচিত হয় নি। কর্মসংস্থান বা চাকুরি পাবার সাথে জড়িত প্রধান বিষয়গুলো হলো: দক্ষতা, যোগ্যতা এবং ব্যক্তিত্ব। সম্পূর্ণ বেকারত্বের চাপ নিয়ে ভালো চাকুরির জন্য নেগোশিয়েশন করা যায় না। তাই নতুনদের কাছে পরামর্শ হলো, প্রারম্ভিক কোন কাজে যুক্ত হয়ে প্রাথমিক কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা। আত্মবিশ্বাস এবং সংশ্লিষ্ট চাকরিটি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা থাকলে প্রার্থী যেকোন ব্যতিক্রম করতে পারেন। ব্যতিক্রমের লক্ষ্য হতে হবে: মানবিক এবং নৈকট্য সৃষ্টি করা। নিয়মের ব্যতিক্রম করাই যেন একমাত্র লক্ষ্য না হয়।

 

৩ সেপটেম্বর ২০১৪। পাবলিক ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া

কোডমিক্সিং এবং ভাষার দূষণ: বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ

-তুই কি সালমান খানের লাস্ট ফিল্মটা দেখেছিলি? সিমপ্লি অউসাম। মাই গ্যড, আই জাস্ট কাআন্ট বিলিভ মানুষ কীভাবে এতো শক্তিধর হতে পারে। টউটালি আনবিলিভেবল!
-রিয়েলি? ওহ্ আই মিসড দ্যাট ফিল্ম। এনি ওয়ে, তুই কখন এলি? লান্চ করেছিস?….ওকে, নো প্রব, লেট্স হেভ লান্চ টুগেদার।

 

টিচিং প্রফেশনটা আমি একদম ঘৃণা করি….আই জাস্ট কাআন্ট স্ট্যান্ড দিস। কেন রে বাবা পড়াশুনা করে অন্যের সন্তানকে মানুষ করতে হবে? আর কি কোন পেশা নেই প-িতি ছাড়া? তাছাড়া কতটুকু প-িত তুমি হয়েছো যে অন্যকে পথ দেখাবে?
-আমার কাছে কিন্তু এর চেয়ে উত্তম কোন প্রফেশন আছে বলে মনে হয় না। জীবিকা অর্জনের পাশাপাশি মানবসেবা। আই লাইক দিস প্রফেশন ভেরি মাচ এন্ড যারা এই পেশায় জড়িত তাদেরকেও আমি শ্রদ্ধা করি।

 

ভাষামিশ্রণ বা কোড মিক্সিং

‘আই এম একদম ফেডাপ’ আমাদের অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের এই বাণীটি ভাষামিশ্রণের উত্তম দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে অনেক দিন। একটি ভাষার ভেতরে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় বিদেশী ভাষার শব্দ জুড়ে দেওয়াকে ভাষামিশ্রণ বলা যায়। ভাষাবিজ্ঞানে একে বলে কোডমিক্সিং। বর্তমান প্রজন্মের ভাইবোনেরা অনেকটা অবচেতনেই এই ভাষামিশ্রণে জড়িয়ে গেছেন সগৌরবে! কোডমিক্সিংকে প্রতিষ্ঠিত রূপ দিয়েছে বলগাহীন বিজ্ঞাপন, আউলা-ঝাউলা টকশো এবং আমাদের এফএম রেডিও সম্প্রদায়। দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এরা প্রায় সকলেই ভাষামিশ্রণের পৃষ্ঠপোষক। ওহ্ আচ্ছা, আসে আসে দিন বলতে এদেশে একখান দৈনিক পত্রিকা আছে। তারা সাপ্তাহিক থাকাকালেও ইংরেজি ভাষার প্রতি তাদের অগাধ প্রেমের পরিচয় দিয়ে গেছে অকাতরে! ভাষার প্রতি এ দায়িত্বজ্ঞানহীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার কোন আইন এদেশে আছে কিনা, আমি জানি না। যদিও সকল আইনই সকলে মানে না, তবু অন্তত বলা যেতো যে ওটি বে-আইনী।
ভাষার বিষয়ে মৌলবাদিরা এ বিষয়টিকে চরম সীমালঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন। তারা একে নিজ ভাষার প্রতি চরম অবজ্ঞা হিসেবে দেখছেন। ভাব প্রকাশের জন্য যখন বিদেশী ভাষার সাহায্য নিতে হয়, তখন তাতে আমাদের রক্তে-অর্জিত মাতৃভাষার দৈন্যতাই প্রকাশ পায়। ভাষা সদা প্রবাহমান, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, ভাষাকে হাত-ধরে পাহাড়ের ওপর দিয়ে প্রবাহিত করতে হবে। মাতৃভাষার শব্দাবলীকে পাশ কাটিয়ে ভিনদেশী শব্দের আশ্রয় নিয়ে, নিজভাষা সহজাতভাবে প্রবাহিত হতে পারে না। ক্রমান্বয়ে তা পরভাষার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ল্যাংগুয়েজ শিফ্ট তখন অনিবার্য হয়ে যায় আর এভাবে একটি আগ্রাসী ভাষার কাছে আরেকটি ভাষার মৃত্যু হয়।
একটি ভাষায় কথা বলতে গিয়ে আচমকা অন্য ভাষা থেকে শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করলেন। এটি আপনার কাছে যতই স্বাভাবিক বা অভিজাত মনে হোক, আপনার শ্রোতার কাছে সে রকম না-ও হতে পারে। অনেক সময় সেটি চরম বিরক্তি এবং সীমালঙ্ঘনেরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বন্ধু তো সম্ভাবনাময় এক প্রার্থীকে সেদিন চাকুরিটাই দিলেন না, কথার মধ্যে ইংরেজি বাক্য ঢুকিয়ে দেওয়ার অপরাধে!

 

কোডমিক্সিং এবং ভাষার দূষণ
লেখার মধ্যে বিদেশি ভাষার প্রয়োগ করে যাঁরা বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন, সবার আগে তাঁদেরকে শ্রদ্ধা জানাই। কায়কোবাদ-নজরুলেরা বিদেশি ভাষাকে খাটিয়েছেন, বলা যায়। আশ্রয় নেন নি। এরকম মিশ্রণ সকল ভাষায়ই আছে, ইংরেজি ভাষার ৯০ শতাংশ শব্দ এসেছে জার্মান ফ্রেঞ্চ, ল্যাটিন, গ্রিক এবং ইটালিয়ান ভাষা থেকে। একে কখনও কোডমিক্সিং এর অজুহাত হিসেবে নেয়া যায় না।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

বাংলা ভাষায় ইংরেজি শব্দ বা বাক্যাংশ জুড়ে দেয়ার অভ্যাসটি এসেছে আমাদের ঔপনিবেশ আমলের সমাজ থেকে, যখন ইংরেজি লেখা ও বলা আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং পশ্চিমা দেশের সাহায্যের ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল এই উপমহাদেশের মানুষগুলো এখনও ইংরেজি বলাকে সমান আভিজাত্যের বিষয় বলে বিশ্বাস করে। এশিয়ার যেসব দেশ অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল, বিশেষত যারা ব্রিটিশদের উপনিবেশ ছিলো না, তারা নিজ ভাষায় ইংরেজি মিশ্রণকে রীতিমতো ঘৃণার চোখে দেখেন। এটি কোনভাবেই মর্যাদার বিষয় হতে পারে না: হয় নিজের ভাষায় কথা বলো নয়তো ইংরেজিতে, মাঝামাঝি কোন পথে তারা বিশ্বাস করেন না। এতে পশ্চিমা দেশের সাথে দূর-প্রাচ্যের ওই দেশগুলোর স্বার্থের কোন ক্ষতি হয়েছে বলে খবর আসে নি।
প্রতিবেশী হিন্দি চ্যানেলগুলোর কল্যাণে (?) নতুন প্রজন্মের অনেকে হিন্দি বাক্যও আজকাল ছুড়ে মারে। আমাদের মুরুব্বিরা আগের দিনে এভাবে ছুঁড়ে মারতেন উর্দু। আরেকটি ভাষা আছে যা অত্যন্ত ‘আরামছে’ আমাদের ভাষাকে দূষিত করে যাচ্ছে, আমরা তা পবিত্র বলেই মেনে নিয়েছি। সে বিষয়ে আপাতত মন্তব্য করছি না। নিজ ভাষা ছাড়া অন্য যে কোন ভাষা আমাদের কাছে যেন উপাদেয়। যেন বাংলা এই ভাষাটি আমরা বিনামূল্যেই পেয়েছিলাম পৃথিবীর অন্য দশটি ভাষাভাষীদের মতো। যেন বাংলা ভাষার কোন ঐতিহ্য নেই, ইতিহাস নেই, জন্ম নেই, দেশ নেই!
পাশ্চাত্য সংস্কৃতি নিয়ে আমরা যত চিল্লাচিল্লি করছি, পার্শ্ববর্তী দেশের অপসংস্কৃতি নিয়ে ততই আমরা চুপ মেরে আছি। প্রতিবেশী একটি দেশে দেদারসে ইংরেজি ব্যবহৃত হচ্ছে, এর প্রধান কারণ হলো তারা আমাদের মতো একভাষার দেশ নয়। তারা নিজ ভাষায় কথা বললে একই দেশের মানুষের সাথে তাদের সামাজিক যোগাযোগ ব্যাহত হবে। অথচ তাদের ওই অক্ষমতাকেই ক্ষমতা হিসেবে ধরে নিয়ে তাদেরকে অনুসরণ করে যাচ্ছি। তাদের প্লাস-মাইনাস চ্যানেলগুলোর তৃতীয় শ্রেণির নাটক অনুকরণ করে, গর্বের সাথে বাংলিশ বলে যাচ্ছি।

একটি অনানুষ্ঠানিক জরিপে দেখা গেছে যে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গের কথামালার প্রায় ৪০ শতাংশ শব্দ বিদেশি, প্রধানত ইংরেজি, ভাষা থেকে সংগৃহীত। বলাবাহুল্য এদের মধ্যে যুবসম্প্রদায়ের কথোপকথনের ৫০ শতাংশ শব্দ ইংরেজি। মজার বিষয় হলো, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পায় নি এমন জনগোষ্ঠীর কথায় বিদেশি শব্দের ব্যবহার প্রায় নেই। ‘বিদেশী শব্দ’ বলতে যেসব বিদেশী শব্দ এখনও বিদেশী হিসেবে গণ্য করা হয়। ভাষাবিজ্ঞানের স্বাভাবিকতায় বিদেশী শব্দ থাকবেই, তবে তা কালপরিক্রমায় একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূল ভাষায় আত্তিকৃত হয়ে যায়, যা প্রজন্মের ব্যবধানে আর বিদেশী মনে হয় না।

 

কোডমিক্সিং- এর দু’একটি দৃষ্টান্ত
*জাস্টিফাই/যাচাই করা *কনফিউজ/বিভ্রান্ত করা *একসিডেন্ট/দুর্ঘটনা করা *কমপেটিবল/যান্ত্রিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া *শিওর/নিশ্চিত হওয়া *এজাস্ট/যুক্ত করা *এটেন্ড করা/উপস্থিত হওয়া *কনশান্স/বিবেককে আক্রান্ত করা *মাইন্ড করা/মনে আঘাত পাওয়া *স্টপিজ দেওয়া/থামা *অউসাম/চমৎকার হওয়া
কিছু মজার কোডমিক্সিং (পাঠক এ তালিকাটি সমৃদ্ধ করতে এগিয়ে আসুন!)
*রহিম মিয়া এজ এ ম্যান হিসেবে মানুষ ভালো।
*গাড়িটা টার্ন নিয়ে ঘুরে চলে গেলো।
*নির্বাচনে দাঁড়িয়ে ইলেকশন করা!
*রাজনীতির ভেতরে পলিটিক্স ঢুকে যাওয়া! (ক্রেডিট: আসাদুজ্জামান নূর)
*রিটার্ন করে পুনরায় ফিরে আসা!
*ডাউনলোড হয় কিন্তু ইন্টারনেট থেকে নামানো যায় না!

 

কোডমিক্সিং-এর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
১) সঠিক বাংলার অনুপস্থিতি বা সঠিক বাংলাটি না জানাকে তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কোডমিক্সিং-এর প্রধান কারণ হিসেবে আমি দেখছি।
২) একটি ভাষা শেখার ক্ষেত্রে কোডমিক্সিং একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এখানে একে ক্ষতিকর হিসেবে দেখা যায় না।
৩) সাধারণ পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, মানুষ সামাজিক কারণেই তার ভাষা ও বসনে পরিবর্তন এনেছেন। বলা যায়, এখানে একটি মনো-সামাজিক ব্যাপার জড়িত।
৪) পেশাগত ক্ষেত্রে ইংরেজির ব্যবহার ব্যক্তির যোগ্যতা সম্পর্কে উচ্চ ধারনার সৃষ্টি করে। কিন্তু অনেকেই পুরোপুরি ইংরেজি বলতে অসমর্থ হয়ে কোডমিক্সিং-এর আশ্রয় নেন। তাতে তিনি যা পারেন তা-ই দেখাতে পারেন।
৫) নতুন প্রজন্ম, বিশেষত যারা ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশুনা করেছে, স্বতস্ফূর্তভাবেই ইংরেজিতে কোডমিক্সিং এবং পরে কোড-সুইচিং করছে। তারা জানে না, সামাজিক জীবনে কোডমিক্সিং করাতে বাংলা ভাষার কী সুদূরপ্রসারী ক্ষতি হচ্ছে।
৬) সমাজের উচ্চতর শ্রেণির মানুষজন বেশ স্বাভাবিকভাবেই ইংরেজিতে কোডমিক্সিং এবং ক্ষেত্রবিশেষে কোড-সুইচিং করছে। বিশেষত, সামরিক বাহিনীর কর্মকতাদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। আভিজাত্য আর ইংরেজি কথা বলা তাদের কাছে অবিচ্ছেদ্য বিষয়।
৭) অন্যকে মুগ্ধ করা বা দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ইংরেজি শব্দের জুড়ি নেই- সেটি চাকরি হোক কিংবা প্রেম। বিশেষ করে, বিপরীত লিঙ্গের কাউকে আকৃষ্ট করার কাজে ইংরেজির মিশ্রণ তো অনিবার্য।
৮) আপাত দৃষ্টিতে একটি নিম্নশ্রেণীর জনগোষ্ঠী থেকে নিজেকে আলাদা বা উচ্চমানের দেখানোর জন্য ইংরেজিতে কোডমিক্সিং করা হয়।
৯) অপ্রীতিকর অর্থ বা পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার জন্য আমাদের সমাজের অনেকেই ইংরেজি বা বিদেশি শব্দ ব্যবহার করেন। যথা: আমার স্ত্রী কনসীভ করেছেন; আপনাদের ওয়াশরুমটা কোন্ দিকে; ওর সাথে আমার এফেয়ার ছিলো; ডালমে কুচ কালা হ্যায়; কুচ কুচ হোতা হ্যায় ইত্যাদি।

 

কোনটি ভালো: ভাষামিশ্রণ নাকি ভাষাবদল?
আপনি পুরোপুরি বাংলা ভাষায়ই কথা বলছেন কিন্তু আপনার বিদেশি বন্ধুটি হয়তো ঠিকমতো অনুসরণ করতে পারছেন না। সেক্ষেত্রে আপনি কোন প্রকার ঘোষণা ছাড়াই বন্ধুর ভাষায় (ধরুন, ইংরেজিতে) কথা চালিয়ে গেলেন। অথবা ধরুন, আপনার স্বদেশি বন্ধুটি গোপনীয়তার স্বার্থে তার আলোচ্য বিষয়কে ইংরেজি বা ইটালিয়ানের পরিবর্তে হঠাৎ বাংলায় প্রকাশ করতে শুরু করলেন। ভাষাবিজ্ঞানে একে কোড-সুইচিং, বাংলায় ‘ভাষাবদল’ বলা যায়।
আপনার কথোপকথনকে যখন সম্পূর্ণভাবে অন্যভাষায় স্থানান্তর করলেন, তখন সেখানে দূষণ প্রায় থাকলো না। হয়তো বিদেশি ভাষায় আপনার সহজাত দুর্বলতা থাকতে পারে, তবু সেটা ভাষামিশ্রণের চেয়ে উত্তম বলা যায়। কেউ যদি আপনাকে ইংরেজিতে প্রশ্ন করেন, তবে স্বাভাবিকভাবেই তাকে ইংরেজিতে উত্তর দেওয়া উচিত। আবার ওই ব্যক্তিটি যদি বাংলায় ফিরে আসেন, তবে আপনারও উচিত হবে বাংলায় কথা বলতে শুরু করা। তাতে সৌজন্যতার লঙ্ঘন হয় না। শুধু খেয়াল রাখতে হবে আপনার শ্রোতা এর জন্য প্রস্তুত কি না। অতএব, অনেক ক্ষেত্রেই কোডমিক্সিং এর চেয়ে কোড-সুইচিং করা বরং উত্তম এবং বাঞ্ছনীয়।

 

কোডমিক্সিং এবং আমাদের প্রিয় বাংলার ভবিষ্যৎ

কোডমিক্সিং এর কথা বললে, আমাকেও পাওয়া যাবে এর সাথে জড়িত। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি যে, যারা এর সমালোচনা করেন, তারাও এ ভুলের উর্ধ্বে নন। এটি একটি সার্বজনীন অনিয়ম যা থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হবে। বিশেষত, পারিভাষিক শব্দ ছাড়া আমাদের উচিত যথাসম্ভব বাংলা শব্দ ব্যবহার করা। এজন্য দরকার প্রচুর সচেতনতা এবং নিজ ভাষায় আরও দক্ষতা ও নির্ভরশীলতা।
উপরোক্ত সামাজিক কারণে যদি আমাকে ইংরেজি বলতেই হয়, তবে পুরোপুরিভাবেই আমি ইংরেজি বলবো- বাংলার মধ্যে ইংরেজির মিশ্রণ করবো না, যতক্ষণ পর্যন্ত এর বাংলা রূপটি আমার জানা আছে। অনেক সময় ইংরেজি শব্দটি আমাদের কাছে সহজ হয়ে আসে: ইউনিভার্সিটি আর বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলায় যা হয়! এজন্য, কাউকে বুঝানোর জন্য যদি ইংরেজি শব্দটি ব্যবহার করতে হয়, সেটি আলাদা বিষয়।
যোগাযোগ প্রযুক্তির এ যুগের শুরুতে কমপিউটারের ভাষা এবং ইন্টারনেটের ভাষা ইংরেজি হবার কারণে ইংরেজির আগ্রাসনকে স্বীকার করতেই হয়। কিছু কিছু শব্দকে ভাষান্তর করা প্রায় অসম্ভব এবং করলেও তা হাস্যকর শুনায়। এগুলোকে ব্যতিক্রম হিসেবে ধরে নিয়ে নিজ ভাষায় মনোনিবেশ করা উচিত। দেশের জাতীয় পত্রিকাগুলো এবং বাংলাভাষার বিশেষজ্ঞরা নিরন্তর শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন প্রযুক্তি আইন এবং বিজ্ঞান বিষয়ক বিদেশি শব্দরাজিকে একটি পারিভাষিক রূপ দিতে। প্রাচ্যের অন্যান্য উন্নত দেশের মতো আমাদেরও উচিত সেসব পরিভাষাকে নিজেদের কথায় ও লেখায় স্থান করে দেওয়া। এছাড়া একটি ভাষা টিকবে কীভাবে?

 

[ডিসেম্বর ২০১২]  পাবলিক ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া।

 

 

*পরিভাষা:
পরিভাষাগত কারণে এবং সকলের বুঝার সুবিধার্থে, কোডমিক্সিং এবং কোড-সুইচিংকে ইংরেজিতেই ব্যবহার করতে হলো। এর বাংলা যথাক্রমে ‘ভাষামিশ্রণ’ এবং ‘ভাষাবদল’ লেখকেরই অনুমিত বাংলা নাম, যা হয়তো সঠিক নয় অথবা আত্তিকরণ হয় নি। ল্যাংজুয়েজ শিফ্টও এমনই একটি পরিভাষা।

 

**উৎস ও গ্রন্থপঞ্জি:
১) ২০১১, বিভিন্ন মাধ্যমে লেখকের ব্যক্তিগত অধ্যয়ন;
২) ১৯৮৫, জ্যাক-জন-হেইডি, লংম্যান ডিকশনারি অভ্ এপ্লাইড লিংগোয়িস্টিক্স;
৩) ২০০৬, “উইথ হুম কোডমিক্সিং অকারস” শিরোনামের স্ন্যাপশটটি নেওয়া হয়েছে সুরাইয়া আলমের গবেষণাপত্র থেকে, সিডিআরবি পাবলিকেশনস;
৪) ১৯৯২, জ্যানিট হোমস, ইন্ট্রোডাকশন টু সোশিও লিংগোয়িস্টিক্স।

 

***পুনশ্চ:

উপরোক্ত শিরোনামে লেখাটি একটি প্রাথমিক খসড়া। ভাষার বহমানতার মতো এ লেখাটিও ক্রমান্বয়ে সমৃদ্ধ হবে আরও দৃষ্টান্ত এবং তথ্য দিয়ে। পাঠকের গঠনমূলক মতামত এখানে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে।

আমার প্রিয় রসাত্মক ধনাত্মক উক্তিগুলো। পর্ব ২।

বিখ্যাত হোক, অথবা কুখ্যাত হোক, মানুষের কথায় অনেক কিছু শেখার বা ভাবার থাকে। মানুষের মনের মূল্যবান কথাগুলোকেই বানী বা উক্তির মর্যাদা দেওয়া হয়। সেটি মজারও হতে পারে, আবার চিন্তার খোরাকও হতে পারে। পছন্দের হতে পারে, আবার প্রত্যাখ্যানের অনুভূতি সৃষ্টি হতে পারে। সবকিছুর একটি উদ্দেশ্য থাকে। ঘৃণার সৃষ্টি হলেও সেখানে পাঠকের চিন্তা বা সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

 

১)  আমি নিজের সাথে কথা বলি, কারণ মাঝেমাঝে বিশেষজ্ঞের অভিমত নেবার দরকার হয়।

২)  চিপস-এর প্যাকেট কেনার আগে আমি ভাবতাম বাতাস বিনামূল্যে পাওয়া যায়।

৩) জীবন একটি বাঁশ বাগান। শুধু বাঁশ আর বাঁশ!

৪) হ্যাঁ ম্যাডাম আমি মাতাল।  কিন্তু সকালে যখন আমি শান্ত থাকবো, আপনি তখনও কুৎসিতই থাকবেন।  (চার্চিল)

৫) মানুষ বলে তুমি প্রেম ছাড়া বাঁচবে না। আমি মনে করি অক্সিজেন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৬) বেঁচে থাকার জন্য আমাদের কী করা উচিত? নিঃশ্বাস গ্রহণ এবং নিঃশ্বাস ছাড়া উচিত।

৭) জীবনে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, সে কাজটি করা যা মানুষ বলে আপনি করতে পারবেন না। (ওয়াল্টার বেইজহট)

৮)  চাকরিটাকে আমার তখনই ভালো লাগে, যখন আমি ছুটিতে থাকি।

৯)  কিছু মানুষ মেঘের মতো। তারা সরে পড়লেই স্পষ্ট নীলাকাশ।

১০) তোমার জন্য আমার পরামর্শ হলো, বিয়েটা করো। ভালো স্ত্রী পেলে তো সুখে থাকবে। কিন্তু যদি তা না হয়, তবে তুমি একজন দার্শনিক হবে। (সক্রেটিস)

 

কিছু কথার মালিক খুঁজে পেলাম না। কিন্তু তাই বলে তো ফেলে দিতে পারি না। তবে এটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি, কথাগুলো আমার নয়।


রসাত্বক ধনাত্মক উক্তির প্রথম পর্ব

 

নারী অধিকার: মার্সিয়া বার্নিকাটের নাট্যাভিনয়, কিছু অভিমত…

Mukhtar Mai

 

মার্চের ৬ তারিখ। স্থান – ধানমণ্ডির ছায়ানট নাট্যমঞ্চ। আমেরিকার রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাটের রুদ্ধকণ্ঠ। তিনি অভিনয় করছেন মুখতার মাইয়ের ভূমিকায়। মুখতারন মাই। গণধর্ষণের শিকার পাকিস্তানের নির্যাতিতা নারী মুখতার মাই হয়ে বার্নিকাট বলে চলেছেন তার নির্যাতন আর বিচারহীনতার মর্মন্তুত কাহিনি। গ্রামের মোড়ল, স্থানীয় শালিস এমন কি সংবাদমাধ্যমও যাকে চুপ থাকতে বলেছিল, সেই মুখতার মাই দেখিয়েছেন কীভাবে সুবিচার আদায় করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। বার্নিকাট যেন অভিনয় করছিলেন না, নিজেই মুখতার মাই হয়ে ওঠেছিলেন সেদিন সন্ধায়।…

ফিরে যাচ্ছি ২০০২ সালের ২২ জুনের দুপুর ২ঘটিকায়। স্থান মীরওয়ালা গ্রাম, মোজাফ্ফরগড় জেলা।মুখতার মাই ধর্ষিত হলেন চার নরপশু কর্তৃক। প্রতিহিংসার বশে ধর্ষণ। ধর্ষকেরা প্রভাবশালী। স্থানীয় থানা মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। ধর্ষকেরা একই গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছে বীরদর্পে। তারা নিরক্ষর মুখতার মাইকে বিভিন্নভাবে চাপ দিতে থাকে। বিভিন্ন রকমের সমঝোতার দলিল তৈরি করতে তারা মুখতার মাইকে টিপসই দিতে প্ররোচিত করে। মুখতার মাই বুঝতে পারেন তার নিরক্ষর থাকার পরিণতি। কিন্তু তিনি নিজ অবস্থানে অনড় থাকেন।…

পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে জুম্মাবারের মসজিতে খুদবার পর। ইমাম সাহেব আক্ষেপ করে ধর্ষণের ঘটনাটির উল্লেখ করেছিলেন। তাতেই খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে সবপর্যায়ের সাংবাদিকদের সামনে চলে আসে। পাকিস্তানে তখন গণমাধ্যম একটু একটু করে শাসকের রক্তচক্ষু থেকে অবমুক্ত হতে শুরু করেছে কেবল। খবরটি দাবানলের মতো দেশে এবং দেশের বাইরে ছড়িয়ে যায়।

এরই মধ্যে আদালতে শুরু হয় সাক্ষি এবং প্রমাণের লুকোচুরি। আদালত ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও যথাশীঘ্র কোন উপসংহারে আসতে পারছেনা।

ওদিকে মানুষ ক্রমেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠছে। পত্রিকার প্রথম পাতায় সম্পাদকীয় শেষপাতায় প্রকাশ পেতে থাকে মুখতার মাইয়ের পক্ষে মানুষের সমর্থন। সুবিচার যদি পেতে হয়, তবে মুখতার মাই হবেন প্রথম প্রার্থী। এরই মধ্যে একজন সরকারী কর্মকর্তা মুখতার মাইয়ের সংগ্রামী চেতনায় তাড়িত হয়ে তার প্রেমে পড়ে যান।… সে কথা থাক।

আদালত মুখতার মাইয়ের পক্ষে রায় দেয়। পুলিশ সন্দেহভাজন ধর্ষক ও তার সহচরদেরকে গ্রেফতার করে। অতঃপর ধর্ষকেরা পায় মৃত্যুদণ্ড।

পাকিস্তান সরকার মুখতার মাইকে ৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেয়। সেটি তিনি খরচ করেন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায়। মীরওয়ালা গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় মুখতার মাইয়ের বিদ্যালয়!

মুখতার মাই আজ একজন অধিকার কর্মী। বিশ্বব্যাপী অধিকারকেন্দ্রিক নাট্যআন্দোলনের প্রতীক। তার দৃষ্টান্ত পাকিস্তানের রক্ষণশীল সমাজে নারীজাগরণের প্রতিচিত্র।

বার্নিকাটকে মনে হয়নি যে তিনি কোন ভণিতা করছেন। যেন তিনিই মুখতার মাই!… দর্শক মুগ্ধ হয়ে স্মার্টফোনের ফ্লাশ জ্বালিয়ে যাচ্ছে।

নাটক শেষ হবার পর সঞ্চালক দর্শকদের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন এবার। ইংরেজি পর্বের দর্শক হয়ে এসেছেন যারা তাদের আশি শতাংশ বিদেশি কূটনীতিক, উন্নয়ন অংশিদার ও বহুজাতিক সংস্থার কর্ণধার। বলতে হয়, সকলেই অধিকার সচেতন।…

 

অভিমত পর্ব:

মন্তব্য দেবার আহ্ববান পেয়ে দর্শকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা লেগে গেলো। কে কার আগে হাত তুলবে, তার কাছেই চলে আসবে মাইক্রোফোন! এটি কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতা – দর্শকদের অভিমতের কোন মূল্য আছে বলে আমার মনে হয়নি। আমি প্রতিযোগিতায় যোগ দেবার মতো কোন তাগিদ পেলাম না। তবে দেখার আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে চাই নি।

প্রশ্ন ছিল অনেক দীর্ঘ এবং বহু-অর্থক। তবে প্রশ্নের মূলবক্তব্য ছিল অনেক এরকম: ‘নারী অধিকার রক্ষায় আমাদের করণীয় কী?’ সঞ্চালক মনে করিয়ে দিলেন, অন্যকে পরামর্শ না দিয়ে যেন নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়।

কে শুনে নিয়মের কথা! নানা জনের নানান কথা। এক ম্যাডাম বলে বসলেন, যারা মঞ্চে বসে আছেন, অর্থাৎ উন্নত দেশের রাষ্ট্রদূতেরা, তারাই এদেশের সরকারকে পরামর্শ দিন, চাপ দিন, যেন সরকার নারী অধিকারের প্রতি আরও সহযোগী হয়। সম্প্রতি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ বিষয়ক আইনে ‘বিশেষ ব্যবস্থায় বাল্যবিবাহ গ্রহণযোগ্য’ রাখার বিষয়টিকে তিনি ইশারা করছিলেন।

আরেকজন সংস্থাপ্রধান সোজা বলেদিলেন, নারীকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সিদ্ধান্তগ্রহণের সুযোগ করে দিলে নারী অধিকারের উন্নয়ন হবে। সাফ কথা। তার উত্তরে মনে হলো, তিনি একদম প্রস্তুত হয়েছিলেন এই প্রশ্নের জন্য।

শিক্ষার কথা শুনে আরেকজন ইস্মার্ট আপু প্রায় ক্ষেপে গেলেন। শিক্ষা? এটি কি শুধু নারীর একারই প্রয়োজন? পুরুষ তার শিক্ষার অভাবেই নারীকে মানুষ মনে করেনা। পুরুষ যদি প্রকৃত শিক্ষা পায়, তবে নারীকে তার যোগ্য মর্যাদা দেবে। তার মতে শিক্ষার প্রয়োজন নারী পুরুষ উভয়েরই। দর্শকের কর্তালি।

একজন বিদেশি ভাই বেশ মজা করে বললেন, সমস্যাটি নারীর নয়। নারীকে অবদমিত রাখা, তার অধিকারকে অবহেলা করা, একান্তই পুরুষের সমস্যা। এতে নারী কেন কেঁদেকেটে মরবে? যাদের সমস্যা তাদেরকেই সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। সবাই তাতে কর্তালি দিয়ে সমর্থন জানালো।

 

প্রেক্ষিত: নারী অধিকার

বাংলাদেশে যুক্তরাষ্টের রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাট একটি বিশেষ নাটকে অভিনয় করলেন সোয়া একঘণ্টা ধরে। সঙ্গে আরও ছ’জন। সবাই কোন-না-কোনদেশের রাষ্ট্রদূত! নাটকের নাম ‘সেভেন’। এর পূর্বের দিন হয়ে গেলো এর বাংলারূপ ‘সাত’এর মঞ্চায়ন। সেখানেও ছিলেন সুলতানা কামালসহ সাতজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব।

মুখতার মাই (পাকিস্তান), ফরিদা আজিজি (আফগানিস্তান), ইনেজ ম্যাকরম্যাক (উত্তর আয়ারল্যান্ড), ম্যারিনা পিসলাকোভা পার্কার (রাশিয়া), আনাবেলা ডি লায়ন (গুয়াতেমালা), মুসো চুয়া (কম্বোডিয়া) এবং হাফসা আবিওয়ালা (নাইজেরিয়া) – এই সাত নারীর প্রত্যেকেই একজন নাট্যকার। প্রতেক্যেই একটি করে সংগ্রাম করে এসেছেন।

’সেভেন’ নামের প্রামাণ্য নাটকটি আয়োজিত হয়েছে বিশ্বের সাত নারীর অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেবার জন্য। আফগানিস্তান, উত্তর আয়ারল্যান্ড, রাশিয়া, গোয়াতেমালা, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া এবং নাইজেরিয়ার সেই সাত নারী নিজেই লেখেছেন নাটকের সংলাপগুলো। নিজেরাই এর নাট্যকার। নিজেদের জীবনের।

এটি কোন সাধারণ নাটক নয়। এর অভিনেতাও মঞ্চ কিংবা চলচ্চিত্র থেকে আসেন নি। খেলা, অভিনয়, সাংবাদিকতা, কূটনীতি, রাজনীতি, ব্যবসায় ইত্যাদি ক্ষেত্রে যারা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, যাদের কথা মানুষ শুনবে, যাদেরকে দেখতে মানুষ হুমড়ি খেয়ে জমায়েত হবে – তাদেরকে নিয়ে মঞ্চায়িত হয় ‘সেভেন’। বাংলাদেশে বেশ কয়েকবার হয়েছে। চিত্রনায়িকা ববিতাকেও একটিতে দেখা গেছে।

এবছরের নারী দিবসকে কেন্দ্র করে এই আয়োজন। আয়োজক সুইডিশ এম্বেসি, এম্বাসেডরস ফর চেইন্জ এবং জাতিসঙ্ঘের নারী বিষয়ক সংগঠনসহ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা। সাংগঠিকভাবে আমন্ত্রিত হয়ে এই সুযোগ পেয়েছিলাম।

এই অসাধারণ অভিজ্ঞতাটি পাবার জন্য দিনভর গাধার খাটুনি খেটেও সাতটার শো ধরেছিলাম।

 

আমাদের দেশের নারীকে কীভাবে আরও সক্ষমতা দিয়ে দেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়?

শিক্ষার অভাব, ক্ষমতার অভাব, শিক্ষা দাও, ক্ষমতা দাও, ক্ষমতায়ন করো – এসব বিষয়গুলো আমার কাছে খুবই দায়সাড়া গোছের মনে হয়। লোক দেখানো। এগুলোতে মূল সমস্যাকে ঢেকে রাখা হয়েছে। দেশের অর্ধেক জনতাকে ‘অবলা’ রেখে একটি সমাজ এগুতে পারেনা। নারী দিবসের বাণী হোক, সুযোগ সৃষ্টি।

আমাদের সমাজে নারীর প্রয়োজন ‘সুযোগ’। সুযোগের অভাবে এখনও নারী অবলা (শক্তিহীন অর্থে) হয়ে আছে।আপনঘর থেকেই এটি শুরু হওয়া প্রয়োজন। তার পরিবার, এমনকি তার বাবাও তাকে সুযোগ দিচ্ছেন না। তার জন্মদাত্রী মাও দিতে ভয় পান। তার ভাই তাকে সুযোগ দিচ্ছে না, কারণ ‘মেয়ে মানুষের বিপদের শেষ নেই’।

নারীর প্রয়োজন শুধুই একটি সুযোগের। অংশগ্রহণের সুযোগ। নিজেকে গড়ে তোলার সুযোগ। কাজের সুযোগ। সুস্থ থাকার সুযোগ।যাতায়াতের সুযোগ। কথা বলা বা মতপ্রকাশের সুযোগ। কর্মসংস্থান, ব্যবসায়, রাস্তাঘাট, বাজার, সংবাদমাধ্যম সবজায়গায় নারীর জন্য জন্য একটু জায়গা।

স্বীকৃতিরও দরকার নেই, যত দরকার সুযোগের। সুযোগ পেলে স্বীকৃতি না পেলেও নারীর অর্জনকে দেখতে পাওয়া যাবে।

অনেক ক্ষেত্রে নারী নিজেও নিজেকে সুযোগ দিচ্ছেন না, নিজেকে তুলে ধরছেন না। নিজেকে দুর্বল দেখিয়ে তিনি সুবিধা নিতে চান। দুর্বলতাকে নারীত্বের প্রতীক হিসেবে দেখিয়ে তাতে সৌন্দর্য্য খুঁজছেন।

তো… কে দেবে এই সুযোগ? প্রথমত ‘আমি’নিজে। পিতা ‘আমি’, ভাই ‘আমি’, সহযাত্রী ‘আমি’, সহকর্মী ‘আমি’। তারপর পরিবার। তারপর সমাজ। তার পররাষ্ট্র। এবং অবশ্যই নারী নিজে!

 

 

———————–
*নোট: ভয়েসেস প্রজেক্ট নামে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন অধিকারকেন্দ্রিক নাটকগুলোকে জনপ্রিয়তা দিয়েছে। সঙ্গে আছে ইউএনউইমেন