কাব্যকণা/ চিন্তাকণা

ছবি আঁকার ক্যানভাসটি হাঁটুজলে তিনপায়া স্ট্যান্ডের ওপর আটকে আছে। আর আমি আটকে আছি তোমাতে…! অথচ কী দুর্ভাগ্য তুমি কিনা আটকে আছো আকাশের তারা গণনায়। তুমি কি আজও বিশ্বাস করো না যে, বিশ্বের সবগুলো সৌরজগতের গ্রহ-নক্ষত্রের কক্ষপথ আটকে আছে শুধু একটি জায়গায়!

.

২)
একদিন প্রজাপতি হবো…
ভুলে যাবো এপর্বের সব বেদনা
সৃষ্ট হবে নূতন আমি’র;
তোমাকে নিয়ে হবে নূতন সূচনা।

.

৩)
তোমাকে ভালোবাসা বদঅভ্যাসে রূপ নিয়েছে…
ছেড়ে দিতে চাই তবু কেন যে পারি না!

.

৪)
বেড-ল্যাম্পের ঢাকনার মতো মস্ত আকারের উজিরটুপি পড়ে একদল মধ্যযুগী এসে আমাকে বললো, “জাহাপনা! আপনার বয়স বাইরা যাইতেছে … কথাবার্তা খিয়াল কইরা কইবাইন। কইবাইন অনেক কম। লেখবাইন আরও কম। শোনা তো একদমই নিষেধ! …একদম খাইয়ালবাম!” ঘুম ভেঙ্গে দেখি বেড-ল্যাম্পটি নেভানো হয় নি! [মার্চ ২০১৭]

.
৫)
প্রতিটি ফাগুন যেন জীবনের বার্ষিক নবায়ন… একবছর বেঁচে থাকার পুরস্কার। ফুল ফল প্রাণী আর মানুষকে একযোগে আন্দোলিত করে এই ফাগুন, যার বর্ধিত রূপ হলো চৈত্র আর বৈশাখ। অতএব ফাল্গুনকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে ঘোষণা দেবার দাবিতে যেকোন মুহূর্তে আন্দোলনের ডাক দিয়ে বসতে পারি!
(ফেইসবুক স্ট্যাটাস ২০/২/২০১৭))

.

৬)
বহুরূপী মানুষের ভিড়ে মুখোশ একটি চিরস্থায়ী অবয়ব। মনের বা মানের পরিবর্তনে এর কোন পরিবর্তন হয় না। মুখোশের নির্মোহ সৌন্দর্য্যে আমি মুগ্ধ হচ্ছি দিনকে দিন। এরচেয়ে স্বচ্ছ বা নির্দোষ আর কী হতে পারে! এমন একটি রূপ ধারণ করতে খুবই ইচ্ছে হয়, যা পরিবর্তন বিবর্তন বা রূপান্তরের ঝুঁকি থেকে মুক্ত। এমন কিছু হতে ইচ্ছে হয়, যার পর আর কিছু হবার প্রয়োজন থাকবে না।
(ফেইসবুক স্ট্যাটাস ১৫/২/২০১৭)

.

৭)
Keep silent and never try to promote others… be selfish and never try to work for the bigger majority… never try to improve quality in works… never try to talk in favor of morality, honesty, transparency etc… never try to promote high standards… but accept whatever is available and say ‘yes yes’ to seniors in all situations. My friend…your life will be a lot easier and full of friends. However, only one thing you’ll have to sacrifice… that is ‘a clean soul’ within you.
Already following those rules? Excellent! You are the smartest guy in the present day world! Cheers!!!
(Remember “Dr Faustus” of Marlowe?)
৩১/১/২০১৭

.

৮)
অন্তত আর একদিন আমরা সবাই একসাথে মিলিত হবো। একই বন্ধুদের একই সেই ব্যাচ। ঠিক আগের জায়গায়, আগের বিষয়গুলো নিয়ে আমরা আলোচনায় মেতে ওঠবো। হাসাহাসি হইহুল্লা করবো। আশেপাশে অথবা টেবিলের সামনে সেই আগের খাদ্যদ্রব্যগুলো থাকবে। আগের মতোই ঘড়ির কাটাকে স্বাধীনতা দিয়ে আড্ডায় হারিয়ে যাবো। আগের সেই গানগুলো ক্যাসেটপ্লেয়ারে বাজতে থাকবে। ঠিক আগের মতোই বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় সবকিছু অন্ধকার হয়ে যাবে, বন্ধ হয়ে যাবে গান। আর চাঁদের আলোয় সিলিং ফ্যানটি তখনও ঘুরতে দেখা যাবে। ঠিক তখনই জাগতিকতায় ফিরে আসবো। তখন আগের মতোই বলবো, বিদ্যুৎ চলে গেছে ভালোই হলো, এবার চলো ঘুমাতে যাই।
(ফেইসবুক স্ট্যাটাস ২২/১/২০১৭)

.

৯)
শিকাগোতে প্রেজিডেন্ট হিসেবে ওবামার শেষ বক্তব্যের শুরুতে দর্শক যেভাবে তাকে ১০মিনিট পর্যন্ত অভ্যর্থনা দিলো, তাতে আমি কেবল হাহাকার শুনতে পেলাম। এই হাহাকার আসন্ন ট্রাম্প প্রশাসনের আশঙ্কাকে মূর্ত করে দিয়েছে। ইসরায়েলি বসতির পক্ষে ভোট না দিয়ে ওবামা তার শান্তি পুরস্কারের জন্য একটু সুবিচার করে গেলেন শেষবেলায়। বিদায়… আমেরিকার সর্বশেষ প্রগতিশীল শাসক! আর কোন কালো মানুষকে কি মার্কিন শাসক হিসেবে দেখা যাবে?
(১১/১/২০১৭)

.

১০)
ফেইসবুক কবিদেরকে চেনার উপায় কী? (কয়েকটি ধারণা)
.
বিড়িমুখে মহাসুখে
উড়াই ধূম্রবৃত্ত [প্রোফাইল ফটো]
বিশ্বাস ধর্ম রাষ্ট্রের কথায় 
টলে না মোর চিত্ত। [সারবস্তুহীন আবেগী স্ট্যাটাস]
.
এদেশ এসমাজ, বলে রাখছি এই
আমার ছিল না, আমার নেই [এই মর্মে স্বদেশত্যাগী কাব্য]
.
দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা
দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু
ডিএসএলআর-নিসৃত
ফটোকাব্যে রেখে দিলাম বিন্দু। [ডিএসএলআর কবি]
.
[ঢাকা সংস্করণ: ২৮১২১৬]
[সমালোচনা নয়, একটি পর্যবেক্ষণ মাত্র]

.

১১)
পানসুপারিতে রঙিন করিয়া মুখ, গাড়োয়ান কহিলো, হুজুর ঘুমাইবার খায়েস থাকিলে আমার নিকটে বসা যাইবে না। আমিও ছাড়িবার পাত্তর নই, আসন ধরিয়া রাখিলাম। রাত্তির দ্বিপ্রহরে পহুচিলাম এমন এক গন্তব্যে, যেখানে রাত্তিরের ঘুম নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু প্রভাত হইতেই দেখি সবকিছু ছিল স্বপ্নমাত্র! আবারও রাত্তিরের প্রতীক্ষায় শুরু হইল দিবস। (ঘাটাইল ভ্রমণ/ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৬)

.

১২)
বিনোদন মানুষের সহজাত চাহিদা, কিন্তু বাঙালির বিনোদনের বড়ই অভাব। কিছু মানুষের প্রিয় বিনোদন হলো অন্যের দোষত্রুটি নিয়ে দুর্বার অনুসন্ধানে ব্যস্ত থাকা। পরস্পরের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে সেখানে নিজেকে শান্তি-প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে তারা প্রাকৃতিকভাবেই সুদক্ষ। তাদের চোখে-মুখে-অন্তরে কেবলই সমস্যা আর দলাদলির কথা। আপনি তাদের কাছে অতি দ্রুত আপন হয়ে যাবেন, যদি আপনার সংগ্রহে থাকে অন্যের দুর্বলতার কিছু নমুনা। সত্য হোক মিথ্যা হোক, স্মিতহাস্যে তারা আপনাকে সুযোগ করে দেবে আরও কিছু বলার জন্য। তারা সমস্যাবিলাসী, বিবাদপ্রত্যাশী। অগ্রগতিতে নয়, দুর্গতিতে তাদেরকে মনে হয় অধিক মেধাবী। সম্পর্ক সৃষ্টি নয়, সম্পর্ক ভাঙনে তারা কৃতীত্ব নেয়। এদেরকে চেনা যায় না, হয়তো প্রমাণও করা যায় না, কেবল বুঝা যায়। এরা সমাজ ও সংগঠনের নিরব ঘাতক।
(ফেইসবুক স্ট্যাটাস ২৩/১১/২০১৬)

Advertisements

আমার প্রিয় রসাত্মক ধনাত্মক উক্তিগুলো। পর্ব ৪।

 

প্রতিষ্ঠানকে আপনার শিক্ষার ওপর হস্তক্ষেপ করতে দেবেন না।  (মার্ক টোয়েইন)

কিছু মানুষ পঁচিশেই মারা যায় এবং দাফন করতে পঁচাত্তর বছর লেগে যায়।  (বেন্জামিন ফ্রাঙ্কলিন)

তাড়াতাড়ি আমাকে কিছু মদ ঢেলে দাও, যেন মনকে সিক্ত করে মহৎ কিছু বলতে পারি। (এরিস্টোফিনিস)

বিজয়ীরা মদ যোগ্যতায় লাভ করলেও, ব্যর্থদের জন্য সেটি অত্যাবশ্যক! (নেপোলিয়ান)

হয় আরেকটু মদ ঢালো, নয়তো সামনে থেকে সরো! (রুমি)

ডায়েটের প্রথম দিন:  সব চর্বিযুক্ত খাবার বাসা থেকে খালি করে দিলাম। অনেক মজা লেগেছিল! (বেনামী)

ছুটির দিনগুলোতে আমার একটাই লক্ষ্য থাকে। তা হলো, মাঝে মাঝে নড়াচড়া করা, যেন কেউ মনে না করে যে আমি মারা গেছি। (বেনামী)

জীবনে সবসময় দ্বিতীয় একটি সুযোগ থাকে, যার নাম হলো, আগামিকাল। (নিকোলাস স্পার্কস)

আমার মানিব্যাগটি পেঁয়াজের মতো – খুলতে খুলতে চোখে পানি চলে আসে। (বেনামি)

মনে রাখবেন ‘আজই’ হলো সেই ‘আগামিকাল’, যাকে নিয়ে ‘গতকাল’ আপনি চিন্তিত ছিলেন। (ডেল কার্নেগি)

 

এবারের পর্বটির অধিকাংশ ‍উদ্ধৃতির জন্য রিডার্স ডাইজেস্ট-এর কাছে ঋণী। অনুবাদ লেখকের।


রসাত্মক ধনাত্মক উক্তির তৃতীয় পর্ব।

ঢাকা ‘পৃথিবীর সেই বিরল শহরে’ রূপ নিচ্ছে যেখানে গাড়ির প্রয়োজন থাকবে না!

ঢাকা ‘পৃথিবীর সেই বিরল শহরে’ রূপ নিচ্ছে যেখানে মানুষ গাড়ির চেয়েও বেশি গতিতে চলতে পারে। ট্রাফিক জ্যাম, জলাবদ্ধতা, বারোমাসি খোঁড়াখুঁড়ি, ত্রুটিপূর্ণ/সরু রাস্তা, আগের আমলের ট্রাফিক সিস্টেম, বাইপাস বিহীন সড়ক, মাঝ রাস্তায় পার্কিং ইত্যাদি ‘সুবিধা’ ধরে রাখার কারণে ঢাকা পৃথিবীর একমাত্র আদিম শহরে ‘উন্নীত’ হতে যাচ্ছে।

গতির শহর ঢাকা/ দুর্গতির শহর ঢাকায় প্রতি ঘণ্টায় গাড়ির গতি:
৭ কিলোমিটার (২০১৭/ বর্তমানে)
২৪ কিলোমিটার (২০০৪)
৪ কিলোমিটার (২০২৫/ বিশেষজ্ঞদের ধারণা)
৫ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায় মানুষের হাঁটার গতি!
 [তথ্য প্রথম আলো – অগাস্ট/২০১৭]

 

সবাই বলে, ঢাকা শহরের কোন পরিকল্পনা নেই। উন্নয়নের বাজেট নেই। সরকারের উদ্যোগ নেই। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন এবং আরও বেশি খারাপ! আরও ‘অনেক কিছু’ নেই!

ঢাকা শহর পরিকল্পনাহীনভাবে গড়ে ওঠছে তা নয় – বরং এখানে আছে অগণিত পরিকল্পনা। রাজউক, সিটি কর্পোরেশন, পূর্ত মন্ত্রণালয়, হাউজিং কোম্পানি… এদের প্রত্যেকের রযেছে ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনা। কৌশলগত সড়ক পরিকল্পনা, পানি পয়নিষ্কাশনের ব্যবস্থাপনা, গৃহায়ন পরিকল্পনা, ডিটেইল এরিয়া প্লান আরও কত কী! সবাই নিজ নিজ পরিকল্পনা এশহরের মানুষগুলোর ওপর দেদারছে ঢালছে।

পরিকল্পনার আধিক্য আর সমন্বয়হীনতাই ঢাকা একটি ব্যর্থ শহরে পরিণত হয়েছে। শুধু যানজটেই বছরে ২০,০০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে এদেশের মানুষ। [ডেইলি স্টার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬]

 

উদ্যোগেরও অভাব নেই। উদ্যোক্তাদের কেউ নদী ভরাট করে বাড়ি বানায়, আবার কেউ বাড়ি কেটে খাল বানায়। নদী শেষ তাকে নিয়ে কারও ভ্রুক্ষেপ নেই, নতুন খাল খননে লেগেছে একটি কর্তৃপক্ষ। কেউ উচ্ছেদ করছে, কেউবা পুনর্বাসন করছে; কেউ সংস্কারের কর্মসূচি নিচ্ছে, কেউবা তার বিপক্ষে ধর্মঘট দিচ্ছে। একই সরকারের অধীনে। আরেকটি পক্ষ আছে যারা বর্ষা এলেই লেগে যায় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িতে। বলে ‘উন্নয়নের কাজ চলিতেছে’। ‘সাময়িক সমস্যার জন্য দুঃখিত – কর্তৃপক্ষ’। বারোমাসের কাজকে বলা হয় ‘সাময়িক’। তাছাড়া ওই কর্তৃপক্ষটা যে আসলে কে বা কারা, সেটিও বিরাট প্রশ্ন।

বাজেটের কথা বলছেন? বাংলাদেশে সেক্ষেত্রে পৃথিবীর ধনী দেশের একটি, কারণ এখানে প্রতি কিলোমিটারে নির্মাণ খরচ সর্বোচ্চ। এবং মাত্র ছ’মাস পর সেই একই রাস্তার সংস্কারের জন্য আরেকটি টেন্ডার আসে।

বাংলাদেশ প্রতি কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের খরচ
৫৬ কোটি টাকা: উদাহরণ – ঢাকা সিলেট মহাসড়ক
৯৫ কোটি টাকা: উদাহরণ – ঢাকা মাওয়া সড়ক

ভারত: ১০ কোটি
চিন: ১২ কোটি
জমি অধিগ্রহণের খরচসহ। [খরচের তথ্য বিডিনিউস২৪ ডটকম – জুন/২০১৭]

 

কুড়িল বিশ্বরোড থেকে পূর্বাচলের রাস্তা দিয়ে ২/৩ কিলোমিটার এগুলেই একটি সুন্দর ব্রিজ চোখে পড়বে। নাম তার বোয়ালিয়া ব্রিজ। নদীর নাম বোয়ালিয়া। নদীতে পানি নেই – বোয়াল তো দূরের কথা! সেই নদীকে সীলগালা করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাস্তার পাশের দোকানপাট, বাড়িঘর সব ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। সেখানে খাল হবে! ঢাকার প্রাকৃতিক খালগুলোর একটিরও অস্তিত্ব নেই – এখানে ভিটে উচ্ছেদ করে নতুন খাল হবে!

এভাবে এগিয়ে চলছে উল্টো রথে প্রাচীন পথে ঢাকার ‘অগ্রযাত্রা’। নাকি পশ্চাৎযাত্রা! অগত্যা আমরাও আছি এর অংশ হয়ে। আপনিও আছেন সহযাত্রী হয়ে! গাড়িতে চলার খরচ বেঁচে যাবে আপনার। ক্রেডিট গউস টু হু?

 

 

*পাবলিক ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া: ২৫ অগাস্ট ২০১৭

—–
ফেইসবুক স্ট্যাটাসটি শেষে এত দীর্ঘ হলো যে, ব্লগে পোস্ট করতে হলো!

পাঠপরিকল্পনা বা লেসন প্লানিং করা শিক্ষকদের জন্য কতটুকু আবশ্যক?

পাঠ্যবই বা সমাধান দেখে পড়িয়েছেন এমন শিক্ষক যেমন দেখেছি, তেমনই দেখেছি আত্মনির্ভরশীল তুখোড় শিক্ষক। ক্লাসের প্রতিটি মিনিটকে তারা প্রয়োগ করেছেন পরিকল্পিত উপায়ে। তাদেরকে আমি কর্মজীবনেও ভুলতে পারি না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পর্যন্ত আমি পাঠপরিকল্পনার প্রচলন দেখেছি। আমার চোখে যারা সফল শিক্ষক ছিলেন, তাদেরকে প্রত্যেককেই পরিকল্পনামাফিক ক্লাস নিতে দেখেছি। কিন্তু হালে অনেকেই আমাকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং করতে পেরেছেনও। তারা বলছেন, এটি অহেতুক কালক্ষেপন – শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করার পর শিক্ষক আর পাঠ্যপুস্তক এ দু’য়ে মিলে সৃষ্টি হয় জীবন্ত পাঠপরিকল্পনা। সেখানে আরেকটি লিখিত পরিকল্পনা মানে কী! এসব বিতর্ক নিয়েই বর্তমান লেখাটি।

কার্যকর পাঠদান মানেই হলো পরিকল্পনাভিত্তিক পাঠদান। পৃথিবীর সফল ক্লাসরুম টিচিংগুলো সম্পন্ন হয়েছে পরিকল্পনামাফিক পাঠদানের ফল হিসেবে। কিন্তু আমাদের দেশে ‘প্রদর্শনী বা ডেমোনস্ট্রেশন ক্লাস’ ছাড়া পরিকল্পনাভিত্তিক পাঠদানের প্রচলন খুবই কম। শিক্ষকতাকে পেশাদারী মনোভাব নিয়ে গ্রহণ না করার কারণে অনেকে পাঠপরিকল্পনাকে অভ্যাসে পরিণত করতে পারেন না। বিএড অথবা এমএড পর্যায়ে পাঠপরিকল্পনার ছবক পেলেও নিজ নিজ শ্রেণীকক্ষে সেটি প্রয়োগ করার অভ্যাস অনেক শিক্ষকের নেই।

ইতিবাচক কারণেই অনেকে পাঠপরিকল্পনা করতে চান না। একটি কারণ হলো, অতি আত্মবিশ্বাস। কেউ কেউ আবার দু’এক বছর শিক্ষকতা করে মনে করেন, পাঠপরিকল্পনা করার মতো নিম্নস্তরে তারা আর নেই।

পাঠপরিকল্পনা মূল বিষয়গুলো হলো:

  • কী পড়াবেন
  • কীভাবে পড়াবেন এবং
  • কীভাবে মূল্যায়ন করবেন

এসব দ্বিধা্দ্বন্দ্বের সঠিক উত্তর না নিয়ে শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করার মানেই হলো আত্মপ্রবঞ্চনা। শিক্ষার্থীর প্রতিও প্রতারণা।

কিন্তু এই পাঠপরিকল্পনা বা লেসনপ্লান নিয়ে পেশাদার শিক্ষকদের মনে আছে প্রচণ্ড দ্বিধা আর সিদ্ধান্তহীনতা। কেউ কেউ মনে করেন সুদক্ষ শিক্ষকদেরকে পাঠপরিকল্পনা করতে হয় না। কিন্তু অন্যরা বলেন, দক্ষতার শুরুই হয় পরিকল্পনাভিত্তিক পাঠদানের ফলে। পেশাদারিত্বের কোন্ স্তরে গেলে পাঠপরিকল্পনা ছাড়া পাঠদান করা যায়, এবিষয়ে আছে অনেক মতভেদ।

 

লেভেল ১/ অনেক গুরুত্বপূর্ণ:

আপনি যদি নতুন শিক্ষক হন, তবে পরিকল্পনাহীন শ্রেণীকক্ষকে মনে হবে একটি নরক অথবা অপরিচিত জঙ্গল। কীভাবে পথ অতিক্রম করবেন আগে থেকে ছক কাটা না থাকলে নির্ঘাৎ বাঘের মুখে। মিশ্র সামর্থ্যের একটি শ্রেণীকক্ষে পরিকল্পনাহীন শিক্ষাদান আপনার জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে। শিক্ষার্থীর ধারণ ক্ষমতা, পূর্বজ্ঞান ইত্যাদি সম্পর্কে কোনই ধারণা রাখলেন না, অকষ্মাৎ শুরু করলেন আপনার বক্তৃতা। এটি শিক্ষার্থীর মনে বিভ্রান্তি, প্রশ্ন, অযাচিত কৌতূহল এবং বিব্রতকর প্রশ্নের সৃষ্টি করতে পারে।

শ্রেণীকক্ষে প্রবেশের পূর্বে কী পড়াবেন, কীভাবে পড়াবেন এবং কীভাবে শিক্ষার্থীদের অর্জন যাচাই করবেন – এ সম্পর্কে পুরোপুরি একটি ধারণা নিতে হবেই। পাঠপরিকল্পনায় বা লেসনপ্লানে ঠিক ওই বিষয়গুলোই একটি কাঠামো আকারে পরিকল্পনা করতে হয়। পরিকল্পনা থাকলে নিশ্চিন্তে আপনি পথ অতিক্রম করতে পারবেন এবং শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাব দিতে অথবা অযাচিত প্রশ্নকারীকে থামিয়ে দিতে আপনাকে কালক্ষেপণ করতে হবে না।

পরিকল্পনা মতোই পাঠদান চলবে, সেটি নয়। পাঠদানের সময় আংশিক অথবা পুরোপুরিই পরিবর্তন হতে পারে। সেটিও করতে আপনাকে সাহায্য করবে একটি পূর্বপ্রস্তুত পাঠপরিকল্পনা।

আপনি একজন পুরাতন এবং অভিজ্ঞ শিক্ষক হলেও পাঠপরিকল্পনা আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এর একটি কারণ হলো, পাঠদান পর্যবেক্ষণ। আপনার পাঠদানকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে অথবা অন্যদের জন্য সেটিকে আদর্শ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে – সে রকম পাঠদানের জন্য একটি পূর্বপরিকল্পনা অত্যাবশ্যক। পাঠপরিকল্পনা দেখে আপনি একজন শিক্ষকের অনেককিছু বলে দিতে পারবেন। তার শিক্ষাদানের কৌশল, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সামর্থ্য, শিক্ষার্থীর প্রতি তার মনোভাব – অনেক কিছু।

পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট পাঠ্যবইটিও শিক্ষার্থীর সার্বিক সামর্থ্য বা চাহিদা চিন্তা করে প্রণীত হয় না। সেখানে শিক্ষককে কিছু-না-কিছু করতেই হয়। শিক্ষককে সহজীকরণ করতে হয়, দৃষ্টান্ত প্রস্তুত করতে হয়, মূল্যায়নের জন্য পর্যায়ক্রমিক প্রশ্নপত্র তৈরি করতে হয়। এগুলোর কোনটাই হয়তো পাঠ্যবইয়ে নেই। এসব ক্ষেত্রে নতুন-পুরাতন, অভিজ্ঞ-অনভিজ্ঞ সবার জন্যই পাঠপরিকল্পনা আবশ্যক।

 

লেভেল ২/ তত গুরুত্বপূর্ণ নয়

দীর্ঘ সময় ধরে প্রকাশ, পুনঃপ্রকাশ, পুনঃসংস্করণ, পরিবর্ধন ইত্যাদি কারণে কিছু কিছু পাঠ্যবই নিজে থেকেই শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী-বান্ধব হয়ে থাকে। সেখানে শিক্ষকের কাজ শুধুই অনুসরণ করে যাওয়া।

কিছু পাঠ্যবইয়ের সাথে ‘শিক্ষক সহায়িকা’ থাকে। শিক্ষক যদি আন্তরিকভাবে সেই শিক্ষক সহায়িকা পড়েন এবং প্রাসঙ্গিকভাবে শ্রেণীকক্ষে প্রয়োগ করতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে পাঠপরিকল্পনার প্রয়োজন কমে আসে।

অভিজ্ঞতার এই পর্যায়ে শিক্ষক পার্বিক বা টার্মিনাল লেসনপ্লান করতে পারেন। তাতে একটি সেশনে/টার্মে যাবতিয় পাঠ ও পার্বিক পরীক্ষার পরিকল্পনা অন্তর্ভূক্ত থাকে। এই দৈনিক পাঠপরিকল্পনার সমন্বিত রূপ। টার্মিনাল লেসন প্লানে গৃহীত সিলেবাস মোতাবেক পাঠ্যবিষয় সংক্রান্ত যাবতিয় পরিকল্পনা সংক্ষেপে তুলে রাখেন। এসব ক্ষেত্রে দৈনিক পাঠপরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে যায়।

অল্প সময়ের নোটিসে আপনাকে একটি ক্লাস নিতে হলো, অথবা অন্য কোন শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে তার ক্লাসটি আপনি নিচ্ছেন, সেক্ষেত্রে পাঠপরিকল্পনা করা কঠিন। এরকম পাঠদান থেকে আপনার কাছ থেকে প্রত্যাশাও হয়তো কম থাকে।

একই বিষয়ে পাঠদান করে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকলে লিখিত পরিকল্পনা না থাকলেও পাঠদান বাধাগ্রস্ত হয় না। শুরুতে ৯০% সময় ব্যয় করতেন আর ১০% সময় ব্যয় করতেন শ্রেণীকক্ষ ব্যবস্থাপনায়। অভিজ্ঞতার সাথে এখন সময় বদলেছে। আপনি ৯০% সময় ব্যয় করেন ব্যবস্থাপনায় এবং মাত্র ১০% সময় নিয়ে আপনি পরিকল্পনা করতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে শিক্ষকের মস্তিষ্কে একটি পাঠপরিকল্পনা তৈরি হয়ে যায়।

 

লেভেল ৩/ একদম গুরুত্বপূর্ণ নয়

একই বিষয়ে একই পাঠ্যবই নিয়ে পাঠদান করে আসছেন বহুদিন। হয়তো শুরুর দিনগুলোতে পাঠপরিকল্পনাও করেছিলেন। এখন আপনি জানেন, কোন্ অধ্যায়ে শিক্ষার্থীদের সমস্যা হয় এবং কোন্ অধ্যায়গুলোতে তত সময় দিতে হয় না। আপনি জানেন, পাঠ্যবই এবং শিক্ষার্থীদের সামাজিক এবং ধারণাগত পার্থক্য; জানেন তাদের উপলব্ধি করার সামর্থ্য। এসব ক্ষেত্রে লিখিত পাঠপরিকল্পনায় সময় নষ্ট না করে সরাসরি পাঠদানের প্রতি মনোনিবেশ করা জরুরি।

এমন একটি পর্যায়ে শিক্ষকদের আসতে পারাটাও একটি শ্রমসাধ্য ব্যাপার। এটি অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ স্তর। শিক্ষকতার প্রাথমিক পর্যায়ে যারা প্রচুর পাঠপরিকল্পনা করেছেন, তারাই এক সময় পাঠপরিকল্পনাকে অগ্রাহ্য করতে পারেন।

লেসনপ্লান ‘একদম গুরুত্বপূর্ণ নয়’ এরকম স্তর নিয়ে একাডেমিশিয়ানদের মধ্যেও মতভেদ আছে। সবাই পাঠপরিকল্পনার পক্ষে – সেটি লিখিত হোক কিংবা অলিখিত, দৈনিক হোক কিংবা মাসিক বা পার্বিক। লেসনপ্লান ছাড়া লেসন দেওয়ার চিন্তা করা যায় না।

 

বর্তমান পোস্টের চিত্ররূপ

 

লেসনপ্লান কি শিক্ষকের পেশাদারিত্ব অর্জনের প্রতিবন্ধতা?

দিনে অনেকগুলো ক্লাস নিয়ে অথবা একাধিক বিষয়ে পাঠদান করলে প্রতিটির জন্য আলাদা আলাদা পাঠপরিকল্পনা করা কঠিন। প্রতিটি বিষয়ের পাঠদান নিয়ে আলাদাভাবে মনোনিবেশ করা অত্যন্ত পীড়াদায়ক হয়ে পড়ে ব্যস্ততম শিক্ষকদের জন্য। যেসব শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব, উপস্থিত জ্ঞান, পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারার ক্ষমতা আছে, তারা প্রাথমিকভাবে লেসনপ্লানের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারেন না। অল্প সময়ে বেশি শিক্ষার্থীকে মনোযোগ দেবার জন্য তারা মানসিক শক্তির ওপর নির্ভর করেন। তারা ভুলক্রমে একে পেশাদারিত্ব অর্জনের অন্তরায় হিসেবেই দেখেন।

কিন্তু লেসনপ্লান পেশাদারিত্ব অর্জনের সোপান। এটি ৫টি সুস্পষ্ট উপায়ে শিক্ষককে উন্নততর পর্যায়ের নিয়ে যায় – ১) বিষয়ভিত্তিক পাঠদানের সামর্থ্য বৃদ্ধিতে এটি সাহায্য করে; ২) প্রয়োগ, অংশগ্রহণমূলক এবং মূল্যায়ন-ভিত্তিক পাঠদানে শিক্ষককে প্রস্তুত করে; ৩) পাঠ্যবিষয় এবং শিক্ষার্থীর ব্যাকগ্রাউন্ড ও ধারণ ক্ষমতার মধ্যে যথোপযুক্ত সেতুবন্ধন করা যায়; ৪) শিক্ষক পূর্ব থেকেই পাঠ্যবিষয় সম্পর্কে নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে উদ্দিষ্ট শিক্ষার্থীর জন্য নিজেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করতে পারেন; ৫) নিয়মিত পরিকল্পনা করার এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষক এক পর্যায়ে লেসনপ্লানের ঊর্ধ্বে ওঠে যেতে পারেন। তিনি প্রতিটি বিষয়ের মানসিক লেসনপ্লান সৃষ্টি করতে পারেন।

 

তথ্যসূত্র: বিভিন্ন উৎস; ব্যক্তিগত অনুসন্ধান এবং শিক্ষক হিসেবে অভিজ্ঞতা।

 

▶প্রাসঙ্গিক কয়েকটি পোস্ট:

যেসব কাজ করে আমাদের শিক্ষকেরা শিশুদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করছেন

শ্রেণীকক্ষ ব্যবস্থাপনার ১২টি উপায়

 

বিদেশী সাংবাদিকের ঢাকা ভ্রমণ ও যানজট বৃত্তান্ত: তৃতীয় নয়নে প্রাণের শহর ঢাকা!

বিদেশীদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের পরিস্থিতি জানার কৌতূহল সবারই থাকে। তাদের অভিমতকে একটু অন্যদৃষ্টিতে দেখতে হয়, কারণ তাদের কোন রক্তচক্ষুর ভয় নেই এবং তাই নিরপেক্ষ থাকতেও বাধা নেই। তৃতীয় নয়নে বাংলাদেশকে দেখতে তাই বরাবরই আমাদেরকে বিদেশীদের মতামতকে বিবেচনায় নিতে হয়। ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম নিয়ে লেখার জন্য নিউইয়র্ক টাইমস এর এক সাংবাদিক ঢাকায় এসেছেন, থেকেছেন এবং ঢাকার যানবাহনে ভ্রমণ করেছেন। একটি উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। ঢাকার যানজট কী মাত্রায় পৌঁছুলে সেটি বিদেশীদের গবেষণার বিষয় হয়, সেটি বুঝার জন্যই আমি আর্টিকেলটি আদ্যোপান্ত পড়ি। এমন পড়েছি অনেক, কিন্তু এবারই লেখার ইচ্ছে হলো। কেন হলো পাঠক পড়লেই বুঝতে পারবেন। শুরু।

 

সৌজন্যে: নিউ ইয়র্ক টাইমস

সেসব অব্যবস্থাপনা বিশ্বের বৃহৎ শহরগুলোতে বিপর্যয় ঘটায়, হয়তো এর মধ্যে কোনটিই ট্রাফিক জ্যামের মতো ক্ষতিকর না। এখনও ঢাকায় বসে আছি যেখানে অপর্যাপ্ত পরিকল্পনা মহাকাব্যিক পরিণতিতে পৌঁছেছে।

আমি ঢাকায় ছিলাম, বলা যায়, ঢাকার ট্রাফিক জ্যামে আটকে ছিলাম। কথাটি হয়তো অন্যভাবে বললে আরও সঠিক হবে: আমি যানজটে আটকে ছিলাম, তাই ঢাকায় ছিলাম। আপনি যদি বাংলাদেশের রাজধানীতে কিছু সময় কাটান, তবে ‘যান চলাচল’ ধারণাটিকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করবেন, এবং আপনার সংজ্ঞাটি উল্টে যাবে। অন্যান্য শহরের রাস্তাগুলোতে যানবাহন এবং পথচারি থাকে; মাঝেমাঝে রাস্তাগুলো ব্যস্ত হয়ে যায় এবং যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হয়। ঢাকার পরিস্থিতি আলাদা। ঢাকার যানজট হলো যান চলাচলের চরম পর্যায়; বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতি এত ব্যাপক এবং দীর্ঘস্থায়ী যে, এটি শহরের সাংগঠনিক নীতিতে রূপ নিয়েছে। এটি যেন শহরের আবহাওয়া, এমন এক ঝড় যা কখনও থামে না।

ঢাকার লোকেরা আপনাকে বলবে, পৃথিবীর বাকি মানুষগুলো যান চলাচল বুঝে না, কারণ মুম্বাই অথবা কায়রো অথবা লসএন্জেলেসের যানজট ঢাকার ড্রাইভারের কাছে সৌভাগ্যের মতো। বিশেষজ্ঞরা তাতে একমত। ২০১৬ সালের বিশ্বের বাসযোগ্যতা জরিপে, অর্থাৎ ইকোনোমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিট কর্তৃক প্রকাশিত জীবনের মান বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে ১৪০ শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৭, শুধু নাইজেরিয়ার লাগোস, লিবিয়ার ত্রিপলি এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার দামেস্ক শহরের ওপরে অবস্থান করছে। জরিপে ঢাকার অবকাঠামোর মান যেকোন শহরের চেয়ে নিম্ন স্তরে দেখানো হয়েছে। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মেগাসিটির মতো ঢাকা একটি ব্যস্ত শহর এবং সমাধিস্থান, যেখানে আছে বলিষ্ঠ আবাসন বাজার, ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণী এবং প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ। অভাব, দূষণ, রোগ, রাজনৈতিক দুর্নীতি, চরমপন্থীদের নাশকতা ্এবং সন্ত্রাসী হামলার কারণে জীবন এখানে নিয়ন্ত্রণহীন দুষ্পাপ্যতায় বাধাগ্রস্ত।  কিন্তু পণ্ডিত এবং উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের কাছে যানজটই ঢাকার খ্যাতিকে চিহ্নিত করেছে একবিংশ শতাব্দির পৌর অব্যবস্থানার ভয়ংকর প্রতীক, বিশ্বের সবচেয়ে বিধ্বস্ত শহর হিসেবে। এটি ঢাকাকে এক পরাবাস্তব শহরে পরিণত করেছে যা একই সাথে কর্মচঞ্চল এবং অচল; এবং এটি এক কোটি পঁচাত্তর লাখের অধিক বসবাসকারীর জীবনের ছন্দকে বদলে দিয়েছে। বেশিদিন আগে নয়, ঢাকার ডেইলিস্টার ‘যানজটে পড়লে ৫টি করণীয়’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। তাতে যেসব সুপারিশ এসেছে তা হলো “বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ”, পড়া এবং ডায়েরি লেখা।

 

যেভাবে ঢাকায় প্রবেশ এবং প্রথম অভিজ্ঞতা

আমার ঢাকার রোজনামচার প্রথম পর্বটি শুরু হয় গতবছরের মার্চে একটি রাজপথে, যা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শহরের মধ্যস্থলে গিয়ে পৌঁছেছে। আপনি যদি এই রাস্তাটি নিয়ে ইন্টারনেটে অনুসন্ধান চালান, তাহলে একটি ফেইসবুক পেইজ ওঠে আসবে যার শিরোনাম “রাজপথ থেকে নরকে, এয়ারপোর্ট রোড”। অনলাইনে দেওয়া ফটোগুলো থেকে নরকের চিত্র ফুটে ওঠে: ওপর থেকে তোলা রাস্তার আটটি লেইন জুড়ে বিপুল সংখ্যক মটরযানের এলোপাথাড়ি চলাফেরার ছবি। মনে হয়, সদ্য হাঁটতে শিখেছে এরকম কোন ক্ষুব্ধ শিশু একটি দিয়াশলাইয়ের বাক্সকে ছড়িয়ে দিয়েছে: সকালের অফিসযাত্রা শুরু হয় মহাজাগতিক এক ক্রুদ্ধ মেজাজ নিয়ে।

ছবিগুলো আমাকে চরম খারাপের জন্য মানসিক প্রস্তুতি দেয়। তারপরও ঢাকা যাবার সময় আমাকে জানানো হলো যে, শহরের যানচলাচল হবে অস্বাভাবিকভাবে হালকা। কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ বন্দি ছিল হরতালে, দেশব্যাপী সাধারণ হরতাল এবং “পরিবহন অবরোধ”। এই হরতাল আহ্বান করা হয়েছিল বিরোধীদল বিএনপি’র পক্ষ থেকে। তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নতুন নির্বাচনের জন্য চাপ দিতে চেষ্টা করছে। হরতাল, রাস্তার মিছিল এবং বিচ্ছিন্ন সহিংসতা রাজধানীর দৈনন্দিন জীবনকে স্তব্ধ করে দিয়েছে এবং শহরের লোকদের স্বাভাবিক জীবনকে সংক্ষিপ্ত করে দিয়েছে। এতে দৃশ্যত অসাধ্য সাধন হয়েছে, ঢাকার রাস্তাগুলো থেকে দীর্ঘ গাড়ির লাইন বিচ্ছিন্ন। আমার বিমান পথে একজন বাংলাদেশি এই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছিলেন “ঢাকায় হয়তো আপনি ভয়ানক যানজট পাবেন, নয়তো সত্যিই ভয়ানক যানজট পাবেন। কিন্তু হরতাল থাকলে সেখানে প্রায় কোন যানজট থাকবে না। যান চলাচল থাকবে স্বাভাবিক।”

ভয়ানক যানজট, সত্যিই ভয়ানক যানজট, কোন যানজট থাকবে না, যান চলাচল স্বাভাবিক – ঢাকায় থাকলে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই বুঝতে পারা যায় যে, ওগুলো কোন তাত্ত্বিক পরিভাষা নয়। বিমান থেকে অবতরণের পর আমি একটি ট্যাক্সি নিলাম। ট্যাক্সিটি বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই একটি গোলচক্করে পড়লো; তারপর কুখ্যাত সেই রাজপথে। সেখানে নির্ভুলভাবে যানজট ছিল: যতদূর চোখ যায় গাড়ি আর ট্রাক, এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে, রাস্তার কালোরঙের ওপর লেইন মার্কিঙয়ের কোন সম্পর্কই উদ্ধার করা গেলো না। আমার গাড়িটি সারিবদ্ধ গাড়ির ফাঁকে নাক ঢুকিয়ে রাখলো। শুরু হলো হামাগুড়ি।

বিশ সেকেন্ডের মতো গাড়িগুলো দক্ষিণ দিকে চললো। তারপর থেমে গেলো। আমার গাড়ি কয়েক মিনিট একদম নড়াচড়া করলো না। তারপর অজানা কারণে গাড়িটি আবার সামনের দিকে হামাগুড়ি দিলো। মাঝেমাঝে গাড়িগুলো বাধাহীনভাবে কয়েকমিনিট চলে, ঘণ্টায় সম্ভবত ১৫ মাইল গতিতে। কিন্তু শিঘ্রই আমরা আবার থেমে গেলাম। আমেরিকার ইন্টারস্টেইট ভ্রমণের ‘থামো-এবং-চলো’র অভিজ্ঞতা পাচ্ছিলাম, রেডিওতে ট্রাফিক প্রতিবেদকরা যেমন হেলিকপ্টারের পাখার আওয়াজের সাথে দীর্ঘ ট্রাক্টর ট্রলির কথা চিৎকার করে ‘বাম্পার-থেকে-বাম্পার’ পরিস্থিতির কথা বলে, অনেকটা সেরকম।  কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিটি কোন দুর্ঘটনার কারণে নয়। কারণ হলো, এটি ঢাকা শহর।

অনেক গরম পড়েছিল আর আমি ছিলাম জেটল্যাগগস্ত। ঘুমিয়ে পড়লাম। যখন হঠাৎ ওঠলাম, প্রায় এক ঘণ্টা হয়ে গেলো। গাড়ির গাদাগাদি আরও ঘণিভূত হলো এবং এক প্রকার উন্মাদনায় রূপ নিলো। ততক্ষণে আমরা শহরের কেন্দ্রস্থলে। প্রশস্ত রাস্তাটিতে পথচারি আর শত শত গাড়ি নিজেদের জায়গার জন্য প্রতিযোগিতা করছে। রাস্তার নাম কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ।  বাসগুলো এমন আঁটসাটভাবে যাত্রী দিয়ে ঠাসা যে, অনেক যাত্রী বাইরের দিকে ঝুলে আছে। কেউ কেউ বাসের ছাদের সিঁড়িতে ঝুলে আছে। সেখানে ছিল মালবাহী ত্রিচক্রযান, স্থানীয়ভাবে ভ্যান নামে পরিচিত। বাঁশ, তরমুজ, ধাতব পাইপ, ডিম, জীবন্ত পশুপাখি নিয়ে সেগুলো বাজারের দিকে যাচ্ছে। এবং অবশ্যই সেখানে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী যাত্রীবাহী পরিবহন রিকশা-সাইকেল ছিল। কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউর মতো বড় রাস্তায় রিকশা চলাচল আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ হলেও, নিজ নিজ উদ্দেশ্য নিয়ে রিকশাগুলো সেখানে ছিল।  রিকশার বেল ট্রাফিকজ্যামের গর্জনকে বাড়িয়ে দিলো।

ঘটনাক্রমে আরেকটি গোলচক্করে পৌঁছালাম আমরা। এবার বাঁ দিকে মোড় নিয়ে পেলাম আরেকটি সংযোগ সড়ক, পান্থপথ তেজগাঁও লিংকরোড। এখানে আমার ট্যাক্সিচালক ইউটার্ন নিলেন এবং কিছু কৌশলী হস্তচালনার মাধ্যমে আমার নির্ধারিত হোটেলের প্রবেশপথে ঢুকার সুযোগ নিলেন। একশ’ গজের প্রবেশপথটি খালি এবং প্রথমবারের মতো একটু উন্মুক্ত স্থান দেখতে পেলাম। বিমানবন্দর থেকে হোটেলের দূরত্ব সাড়ে আট কিলোমিটার। আড়াই ঘণ্টা লাগলো এটি অতিক্রম করতে। হোটেলের প্রবেশপথটি শেষ করে আমার টাক্সিচালক তার অনুভূতি প্রকাশ করলেন। “সামান্য একটু যানজট ছিল” তিনি বললেন, “ততটা খারাপ ছিল না।”

“বাংলাদেশের পরিস্থিতি দুর্যোগে আক্রান্ত জাতির মতো নয়” ২০০০ সালে লেখেছিলেন সাংবাদিক উইলিয়াম ল্যাংগউইশে। কথাটি অতিরঞ্জিত মনে হয়, কিন্তু পরিবহনে-ঠাসা ঢাকার রাস্তাকে দেখার মানে হলো দুর্যোগকে সচল অবস্থায় দেখা, অথবা বলা যায় অচল।  রাজধানী শহরের আটকে-পড়া পরিবহনগুলো এই জাতির জন্য মহাদুর্যোগের প্রতীক হয়ে আছে। বিশেষ করে বলা যায়, জনসংখ্যার বৃদ্ধি। উন্নয়নশীল দেশের মাপকাঠিতে এটি মানানসই, কিন্তু বাংলাদেশের আয়তনের তুলনায় এটি বিপর্যয়কর।

 

সৌজন্যে: নিউইয়র্ক টাইমস

ঢাকার যানজট অন্যান্য শহরের চেয়েও খারাপ হবার কারণ কী?

মূলত যানজট একটি ঘনবসতির বিষয়।  এমনটা হয়, যখন অতিরিক্ত সংখ্যক মানুষ অতি সংকীর্ণ কোন স্থানে জায়গা নিতে চায়। বাংলাদেশ হলো পৃথিবীর চরম ঘনবসতিপূর্ণ জাতির মধ্যে দ্বাদশ। কিন্তু ষোল কোটি জনসংখ্যার কারণে সেটি সবচেয়ে জনাকীর্ণ এবং তালিকার মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র দেশ। বিষয়টি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করছি: বাংলাদেশের স্থলভূমি রাশিয়ার ১১৮ ভাগের এক ভাগ, কিন্তু এর জনসংখ্যা রাশিয়া থেকে আড়াই কোটি বেশি।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা সমস্যাটি ঢাকা শহরেই প্রতিফলিত হয়েছে, কারণ বলতে গেলে ঢাকাই বাংলাদেশ। দেশের প্রায় সকল সরকারি, ব্যবসায়িক, স্বাস্থ্য বিষয়ক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এবং শ্রমবাজারের বিরাট একটি অংশ ঢাকায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে।  প্রতি বছর ৪ লাখ নতুন অধিবাসী রাজধানীতে যুক্ত হয়। এই গণ অভিবাসন ঢাকাকে করেছে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ মেগাসিটি এবং সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীলও।

যেসব মৌলিক অবকাঠামো এবং আইনের শাসন বড় শহরগুলোকে বাসযোগ্য করে, এই শহরের কোটি অধিবাসী সেসব একদমই পাচ্ছে না। ঢাকায় মাত্র ৬০টি ট্রাফিক লাইট আছে, যা কেবলই আলংকারিক; খুব কম গাড়িচালক সেগুলোকে গুরুত্ব দেয়। ঢাকার রাস্তায় অরাজকতার বড় কারণ হলো, রাস্তার অপর্যাপ্ততা।  ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন মতে, ঢাকা শহরের মাত্র ৭ শতাংশের জন্য রাস্তা আছে। (উনিশ শতাব্দির পৌর পরিকল্পনায় নির্মিত প্যারিস এবং বার্সেলোনা শহরে এই অনুপাত ৩০ শতাংশ।)  ফুটপাথগুলোতেও সমস্যা। কিছু রাস্তায় ফুটপাথ আছে এবং যা আছে তা প্রায় চলাচলে অযোগ্য  – দোকানদার এবং গৃহহীন মানুষের আবাস।

ঢাকার মতো শহরগুলোর যানজটের জন্য সাধারণ সমাধান হলো, রাস্তার ওপরে চলাচলের পরিবর্তে রাস্তার নিচে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা।  কিন্তু ঢাকায় কোন ভূগর্ভস্থ রাস্তা নেই এবং নির্মাণেরও কোন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেই।  এ সমস্যাটি আরও তীব্র হয়েছে মর্যাদার প্রতীক হিসেবে প্রদর্শিত ব্যক্তিগত গাড়িগুলোর কারণে, যা শহরের মধ্যবিত্তদের প্রচলিত মাধ্যম। এতে প্রতি বছর হাজার হাজার গাড়ি ঢাকার রাস্তায় যুক্ত হচ্ছে।

সরকারের নিজস্ব হিসেব মতে, ঢাকার যানজটের কারণে প্রতি দিন ৩২ লাখ শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং এটি দেশের অর্থনৈতিক আয় থেকে কোটি কোটি টাকা লোকসান যাচ্ছে। এই যানজট আরেক প্রকার ক্ষতি নিয়ে আসছে ঢাকাবাসীর জীবনে ও মননে।  বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নগর এবং অঞ্চল পরিকল্পনা’ বিষয়ক অধ্যাপক সারওয়ার জাহান বলেন, “শহরটি জটিল হয়ে যাচ্ছে। যাতায়াতের সমস্যার কারণে মানুষ কারও সাথে সাক্ষাৎ করতে পারে না। শুধু প্রয়োজন হলেই বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া হয়। তাতে অনেক সময় চলে যায়।”

ঢাকার যানজটকে ‘অসুবিধা’ বলা এক প্রকার ভুল; এমনকি ‘দুর্যোগ’ বললেও সহজ হয়ে যায়।  যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্থাপত্য ও পরিকল্পনা’ বিষয়ক অধ্যাপক আদনান মোরশেদের মতে, ঢাকার যানজট হলো ‘একটি বিশাল পৌর ব্যাধি’ যা ‘মৃত্যু ঘটিয়েই চলেছে’।  বাংলাদেশের পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির জন্য বিরাট প্রাপ্তি। কিন্তু বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন  এই বলে যে, রাজধানী যানজট এবং অবকাঠামো সমস্যার সমাধান না হলে ওসব অর্জন হারিয়ে যাবে – সেই অগ্রগতি নিজে থেকেই স্তবির হয়ে যাবে। যানবাহনে ঠাসা রাস্তাগুলো ঢাকা শহরের দুঃখের এক অমানবিক চিত্র। বলা যায়, দুঃখের একমাত্র কারণ।

 

যে কারণে ঢাকার গাড়িচালকদেরকে শ্রেষ্ঠ ড্রাইভার বলতে হয়…

ঢাকার অত্যধিক পরিবহণ সর্বগ্রাসী অনুভূতি। আপনি এর গন্ধ পাবেন, স্বাদ পাবেন।  গাড়ির ধোঁয়া আপনার নাসারন্ধ্রে আপনার জামায় আপনার মুখে আঘাত করবে।  আপনার জিহ্বায় তীব্র স্বাদ রেখে যাবে। পাশের গাড়ি অথবা পথচারিদের মধ্যে নিজের হাতকে নিরাপত্তার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে  আপনি হয়তো, হয়তো নয় অবশ্যই, যানজটকে ধরতে পারবেন, ছুঁতেও পারবেন।

কিন্তু যানজট আপনার শ্রবনেন্দ্রিয়কে সবচে’ বেশি আক্রান্ত করে। ইতিহাসবিদদের মতো, শহরের নামকরণ হয়েছে ঢাক থেকে, অর্থাৎ ঠনঠন-শব্দ-করা এক বড় ঢোল। ঐতিহাসিক সত্য যা-ই হোক, শহরের ভয়ানক শোরগোল আপনার শ্রবনেন্দ্রিয়কে যে আচ্ছন্ন করে, তাতে কোন ভুল নেই। ঢাকার গাড়ির বধির-করা একক সঙ্গিত, চালকদের চিৎকার, এন্জিনের গর্জন, অন্তহীন হুইসেল থেকে আসা কণ্ঠ, তাল এবং তালহীন করতাল এবং সবমিলে এক বেসুরো থিম সং।

সেই একটানা উচ্চশব্দ চরম আগ্রাসী। ঢাকার চালকেরা হয়তো ‍পৃথিবীর সবচেয়ে পাশবিক আর নির্দয়। আপনি যদি ঢাকার মতো শহরে আইন লঙ্ঘন এবং দুঃসাহসকে চালকের দক্ষতা বলে মনে করেন, তবে তাদেরকে শ্রেষ্ঠ চালক বলতে হয়।

 

সৌজন্যে: চ্যানেল আই অনলাইন

সিএনজি: “তিন চাকার ওপর চলা ছোট টিনের বক্সটি দু’টি কক্ষে বিভক্ত”

এক বিকালে শের-এ-বাংলা ক্রিকেট স্ট্যাডিয়াম থেকে একটি অটোরিকশা নিয়ে ঢাকার সবচেয়ে যানজট প্রবণ রাস্তা দিয়ে দীর্ঘ ভ্রমণের ব্যবস্থা করলাম।  ঢাকার লোকেরা অটোরিকশাকে ‘সিএনজি’ বলে, কারণ সেটি সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাসে চলে।  তিন চাকার ওপর চলা ছোট টিনের বক্সটি দু’টি কক্ষে বিভক্ত, একটি চালকের জন্য, অন্যটি যাত্রীর জন্য। যাত্রীর কক্ষটি একটু বড় হলেও বেশ চিপা। এটি আপনি এশিয়ান শহরগুলোতে দেখতে পাবেন। ঢাকায় এগুলো সবুজ রঙে আচ্ছাদিত এবং প্রায় সবগুলোই নোংরা এবং জির্ণশির্ণ। এগুলো অনেক শব্দ করে অসহ্য ধ্বনিতে রাস্তাকে মাতিয়ে রাখে। যত্নহীন নিম্নমানের ছোট্ট যন্ত্রটিকে গোল্ফকার্টের দস্যু চাচাতো ভাই বলা যায়।

আমার সিএনজির পাইলট হলেন একজন হাসিহীন মানুষ যার বয়স হয়তো ত্রিশের নিচে। রাস্তায় তিনি বেধড়ক। রাস্তার ভিড় ঠেলে প্রতিটি সেন্টিমিটারের জন্য তিনি যুদ্ধ করেছেন এবং একটু ফাঁক পেলেই সর্বোচ্চ গতিতে গাড়ি চালিয়েছেন। এবার আমরা নগরের ব্যস্ততম রাস্তায়, বীরউত্তম রফিকুল ইসলাম এভিনিউ। রাস্তার দু’পাশে বড় বড় শপিং মল এবং ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর।  একটি শপিং মল প্রায় রাস্তার ওপরেই গজিয়ে ওঠেছে। ঢাকার রাস্তায় যানজট অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক: গাড়ির চারপাশ ঘিরে পানির বোতল, খোসা ছাড়ানো শশা, বই বিক্রি করছে ফেরিওয়ালারা। অবশ্য অপরাধেরও সম্ভাবনা আছে। একসময় সিএনজিতে দরজা ছিল না, কিন্তু এখন গ্রিল দিয়ে ঢাকা। দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে ওঁত পেতে থাকা ছিনতাইকারীদের হাত থেকে এটি সুরক্ষা দেয়। কথিত আছে যে, দুঃসাহসী চোরেরা সিএনজির ছাদ কেটে যাত্রীর ওপর চড়াও হয়। তাদের পছন্দের অস্ত্র হলো ‘টাইগার বাম’, ঝাঁঝালো এক প্রকার মলম, যা তারা নিরস্ত্র করার জন্য শিকারের চোখে মেখে দেয়।

আমার চালকের একটিমাত্র কৌশল হলো, সব অবস্থায় গাড়ির গতি ধরে রাখা, পরিস্থিতি যা-ই হোক, এমনকি চিপা গলিতেও। সোজা যেতে না পারলে ডানেবামে, গাড়ির নাক দিয়ে অন্যের লেইন অতিক্রম করে, গাড়ির ফাঁক দিয়ে, অন্য চালকদেরকে রাস্তা ছাড়তে বাধ্য করে, এমন কি দু’এক ইঞ্চি সংঘর্ষকে এড়িয়ে। একটি কথা দিয়ে তিনি অন্য গাড়ি গুলোকে হুংকার দিয়ে যাচ্ছিলেন। ‘আস্তে’। চিৎকারে করে বলে যাচ্ছিলেন, ‘আস্তে! আস্তে! আস্তে!’। পরে আমার এক ইংরেজি-জানা বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম ‘আস্তে’ মানে কি। জানা গেলো, ‘আস্তে’ মানে হলো ‘ধিরে, সাবধানে’।

 

রিকশা পেইন্টিং: গুগল সার্চ

রিকশা:  চলন্ত যাদুঘর

ঢাকার একটি যানবাহনকে নিরীহ মনে করা যেতে পারে, অন্তত শহরের নিম্নতম মানদণ্ডে। সেটি হলো, সাইকেল রিকশা। ঢাকার রাস্তার প্রাচীন এবং সর্বত্র বিরাজমান যানবাহন। রিকশার সঠিক সংখ্যা কেউ জানে না। (এগুলোর মধ্যে মাত্র একটি অংশ আনু্ষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত।)  অনেকে মনে করেন, ঢাকার রিকশার সংখ্যা ২ লাখ হবে; অন্যরা ধারণা করছেন এই সংখ্যা কমপক্ষে কয়েক গুণ বেশি।

ঢাকার রাস্তায় রিকশা ভাড়া নিয়ে দরদাম করা গাড়িতে চড়ার মতোই এক সেরা বিনোদন। এসব ত্রিচক্রযানকে নিষিদ্ধ করার জন্য অনেক প্রস্তাব এসেছে, কিন্তু প্রতিবারই সেগুলো ব্যর্থ হয়েছে।  কেউ কেউ মনে করেন, ঢাকার যানজটে রিকশাই উপযুক্ত বাহন এবং সবচেয়ে পরিবেশ-বান্ধব। কিন্তু অন্যরা বলেন, ওগুলো কোন কাজের না কারণ মাত্র আটজন যাত্রী নিয়ে চারটি রিকশা একসাথে চললে একটি বাসের জায়গা দখল করে ফেলে।

একটি বিষয়ে সবাই একমত যে, ঢাকার রিকশা দেখতে বেশ সুন্দর।  এদেরকে বলা হয় ‘চলন্ত যাদুঘর’।  এগুলো রঙ-বেরঙের উপাদানে সজ্জিত; ফ্রেমগুলোতে আঁকা থাকে ফুল; পেছনে সিনেমার তারকা এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বের ছবি অথবা গ্রামের বা শহরের দৃশ্য আঁকা থাকে।  রিকশার পেছনে শহরের পেইন্টিংগুলো পর্যালোচনা করলে পরিস্থিতির নিগূঢ় তত্ব খুঁজে পাবেন। কোন বৈচিত্র ছাড়া সেসব ছবিতে এক শান্ত শহরের স্বপ্ন আঁকা থাকে, যেখানে আছে উড়ন্ত পাখি এবং উচু মিনারের পেছনে অস্তায়মান সূর্য।  পেইন্টিংগুলোতে রাস্তাকে দেখতে পাবেন পরিচ্ছন্ন, শান্ত এবং সুস্থির যানজটমুক্ত।

 

ঢাকার নগর বিশেষজ্ঞরা কি সমস্যাকে আরও জট পাকাচ্ছে?

ঢাকার ভেতরে আমরা যে রিকশা পেইন্টিংগুলো দেখতে পাই, সেগুলো সুশৃঙ্খল রাস্তার চিত্র যা অনুমানযোগ্য ভবিষ্যতকে তুলে ধরে। শহরের সমস্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত চাওয়া হলে তারা কিছু পরিচিত ছড়া আবৃত্তি করেন।  ট্রাফিক লাইট, সুনির্দিষ্ট রিকশা লেইন, বাধাহীন রাস্তা, সড়ক রেল ইত্যাদির সুপারিশ করেন তারা। তারা বলেন বিকেন্দ্রীকরণের কথা; চট্টগ্রাম এবং খুলনাকে দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেন। এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে একটি ১২মাইল দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে, যা ২০১৫ সালের অগাস্টে শুরু হয়েছে। কিন্তু ঢাকায় এধরণের প্রকল্প সম্পর্কে গভীর অবিশ্বাস রয়েছে, কারণ সরকারের অদক্ষতা এবং দুর্নীতির কারণে নির্মাণের অগ্রগতি প্রায়ই বাধাগ্রস্ত হয়।

ইতোমধ্যে রাজধানীর রাস্তাগুলোতে ভিড় উপচে পড়ছে। ঢাকার জলবায়ুর সাথে অভ্যস্ত হতে এবং এর দুর্ভেদ্য রাস্তাগুলোর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করতে মাত্র কিছুদিন লাগে। একজন নবীনের কাছে বিদেশি শহরের যানবাহন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। জমাটবাধা যানবাহনগুলো যেভাবে সবদিক থেকে দৃষ্টিসীমানাকে বদলে দিয়েছিল; শূন্যতা এবং দৃষ্টিকোণকে বিধ্বস্ত করে দিয়ে ঢাকার দৃশ্যকে রঙের ছটায় কিউবিস্ট মৃৎশিল্পে পরিণত করেছে, তা দেখে আমি মুগ্ধ হতে শুরু করেছিলাম। দেয়ালে রঙের ছটা; ট্রাকের রিয়ারভিউতে দাড়িওয়ালা চালকের ক্ষণিক প্রতিবিম্ব; ঢেউটিনের বেড়া অতিপ্রাকৃতিকভাবে কয়েক ফিট ওপরে হাওয়ায় ওড়েছিল; আর দেখেছিলাম একটি অদেখা মালবাহী রিকশাভ্যানকে।

অবশ্য আমি উপলব্ধি করেছি যে, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী শহর থেকে যাওয়া একজন অতিথির পক্ষে দরিদ্রতম একটি দেশের অব্যবস্থাপনা আর ‍বিশৃঙ্খলা নিয়ে সৌন্দর্য আলোচনা করা মানানসই না।  ঢাকার যানজটকে বিড়ম্বনা বললে ভুল হবে।  একে বলতে হয় দারিদ্রতা, বলতে হয় এটি অবিচার, এটি দুর্ভোগ।

 

“এই শহর আপনার মনকে দার্শনিক বানিয়ে দেয়”

আমি যাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের প্রায় সবাই যানজটকে অগ্নি পরীক্ষা, সাহসের পরীক্ষা এবং ভয়ের বিষয় হিসেবে দেখে। সেটি আবার বিকৃত অহংকারেরও উৎস।  একজন ভদ্র মহিলা যিনি সারাজীবন ধরে ঢাকায় বাস করছেন, তিনি আমাকে বললেন যে, বিদেশে থাকার সময় তিনি নাকি ঢাকার যানজটকে মিস করেছেন।  ইউরোপ এবং আমেরিকার শহরগুলোতে যানজটের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হওয়াতে সেটি তার উৎসাহকে কমিয়ে দিয়েছে। দিনের বেলায় ঢাকায় বের হয়ে যদি জটপাকানো রাস্তার মোড়গুলোকে আপনি অতিক্রম করতে পারেন, তখন বলা যায় সমস্ত প্রতিবন্ধকতা আপনি জয় করেছেন এবং জয় করেছেন দেবতার মন। এই শহর আপনার মনকে দার্শনিক বানিয়ে দেয়।  ঢাকা আপনাকে জানিয়ে দেবে যে, ভ্রমণ মানে নরক, কিন্তু এটি ভ্রমণের প্রাচীন বিস্ময়কেও মনে করিয়ে দেয়।  দৈনন্দিন যাতায়াত, সেটি যত নৈমিত্তিকই হোক না কেন, সময়কে নিয়ন্ত্রণ করে মিরপুর রোডের মতো ভয়ানক যানজটকে অতিক্রম করার মানে হলো মহাশূন্য জয় করা।

 

ঢাকার রাস্তায় চলতে হলে যে নিয়মটি মনে রাখতে হবে

নিউইয়র্কে ফেরার সময় হলো। ঢাকায় থেকে আমি যাতায়াতের গোল্ডেন রুলটি শিখে নিয়েছি, তা হলো: আগে বের হও।  তাই হোটেলকে আমি ভোর ৪:৪৫টায় ডেকে দিতে বললাম। বিমানে ওঠার পাঁচ ঘণ্টারও বেশি আগে আমার জন্য অপেক্ষমান ট্যাক্সিটিতে নিজেকে গলিয়ে দিলাম।  ট্যাক্সিচালক আমাকে অভয় দিয়ে বললেন যে, এ সময়ে রাস্তার অবস্থা তত খারাপ হবে না।

দেখলাম যে, চালকের কথা ঠিক।  সূর্য তখনও ওঠে নি। আমাদের ট্যাক্সি ঢাকা শহরের মাঝে কালো রাস্তা বেধ করে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল।  কোন যানজট ছিল না – একদমই না। আমরা এয়ারপোর্ট রোডের দখল পেলাম এবং একই গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। গতিপরিমাপক যন্ত্রের দিকে আমি তাকাচ্ছিলাম আর গাড়ির জানালা নামাচ্ছিলাম। ট্যাক্সি ঘণ্টায় ৫০ মাইল বেগে চলছিল – মনে হচ্ছিল যেন আমরা ওড়ছি।

তারপর, আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাবার আনুমানিক এক মাইল আগে কিছু গাড়ি, ট্রাক এবং সিএনজি’র সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিপক্ষ আমাদের পথ আগলে ধরলো। আমাদের ট্যাক্সির গতি থেমে গেলো এবং হঠাৎ আবার ঢাকা বাংলাদেশের যানজটপূর্ণ রাস্তায় আমরা আটকে গেলাম। আমরা থেমে গেলাম, আবার স্টার্ট দিলাম, আবারও থেমে গেলাম। এই ভিড়ের কারণ অস্পষ্ট, কিন্তু এটি স্পষ্ট যে, বিমান ধরতে আর তত সমস্যা হবে না।  অতএব, আমি স্বস্তিতে থাকলাম: শেষবারের মতো ঢাকার উন্মাদনাকে উপভোগ করছিলাম। একসময় আমাদের গতিপরিমাপকে ঘণ্টায় পাঁচ মাইল দেখাচ্ছিল এবং আমরা আবারও সামনের দিকে হামাগুড়ি শুরু করলাম। একটি চিন্তা আমার মাথায় আসলো: ঢাকা শেষ পর্যন্ত আমার কাছে তার পরিচয় ধরে রেখেছে।  এটাকে আপনারা যানজট বলবেন? থামুন। এটি যানজট নয়।

 

 


নিউইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনের নিবন্ধ অবলম্বনে। মূল লেখা “ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম, যা কখনও শেষ হয় না” জডি রোসেন/ ২৩ সেপটেম্বর ২০১৬।

বাঙালি হৃদয়ের উষ্ণতা

গল্পটি বাঙালি হৃদয়কে শীতের বিকালে একটু উষ্ণতা দিতে পারে। বিদেশি বা শ্বেতবর্ণের হলেই যে ধনী নয়, আমাদের এক অবাঙালি বন্ধু বাংলাদেশিদেরকে প্রতিদিন প্রমাণ করে চলেছেন। পেশাগত বন্ধুরা হয়তো তার এ রূপটি জানেন না। তবে দারোয়ান, রিক্সাওয়ালা আর খাবারের দোকানদার তাকে চিনে নিয়েছেন। জীবিকার জন্য শিক্ষকতা এবং দেশেবিদেশে ঘুরে বেড়িয়ে চিত্র প্রদর্শনী তার কাজের অংশ।

ঘটনাক্রমে তিনি আমাদের পারিবারিক বন্ধুও। এশিয়ারই একটি শি্ল্পোন্নত দেশে তার আদি নিবাস। স্বভাবে চলনে মননে তিনি একজন শিল্পী। এদেশে একটি আন্তর্জাতিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে কোনমতে জীবিকা নির্বাহ করেন। আচরণে ভনিতা নেই, পোশাকে নেই বিলাসিতা। উপায়ও নেই। অর্থ আর খাদ্যের অভাব তার নিত্যসঙ্গী। কিন্তু আনন্দের শেষ নেই! আমি দেখেছি, শিল্পী সাহিত্যিকদের জীবনে অভাব অনেকটা অবিচ্ছেদ্য বিষয়। (কবি কী বলেন?)

তার প্রতিটি দিন নিয়েই একটি গল্প লেখা যায়। সম্প্রতি শীতের ছুটি এবং চিত্রপ্রদর্শনীকে একযোগ করে তিনি ইতালিতে গিয়েছিলেন। মাধ্যম বাংলাদেশ বিমান। তার গল্পটি আজ আমার কাছে এসেছে ব্রেইকিং নিউজ হিসেবে।

বাংলাদেশে ফেরার পথে আবিষ্কার হলো যে, ডলার শেষ! ভাগ্য ভালো যে বিমানবন্দরে আসার পর এটি জানা গেছে। কিন্তু ঢাকা পর্যন্ত ফিরতে পারবে এটি নিশ্চিত হলেও বিমান ছাড়তে আরও পুরো একবেলা বাকি। এ একবেলা কে তাকে খাওয়াবে? সঙ্গে আছে কিছু টাকা, যা বিনিময়যোগ্য নয়! বোকার মতো চেষ্টা করলেন একে ডলারে রূপান্তর করতে।

ঘুরতে ঘুরতে কিছু বাঙালি-মতো মানুষের দেখা পেলেন তিনি। প্রায় দু’বছর বাংলাদেশে থাকার অভিজ্ঞতায় তিনি বুঝতে পারলেন, তারা বাঙালি। আধা বাংলায় তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তার হাতের টাকাগুলোকে ডলারে পরিণত করার কোন বুদ্ধি তাদের জানা আছে কি না। স্বাভাবিকভাবেই তারা কোন সমাধান দিতে পারলেন না। কিন্তু আধা-বাংলা আধা-ইংরেজিতে তাদের কথোপকথন চলতে থাকলো। একপর্যায়ে, তারা বুঝতে পারলেন যে, এই অবাঙালি চিত্রশিল্পীর প্রধান প্রয়োজন হলো একবেলা খাওয়া। তারপর ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে বাসা পর্যন্ত যেতে তার আর অর্থের অভাব হবে না। কিন্তু খাবারের প্রয়োজনটি এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজনে রূপ নিয়েছে।

বিষয়টি বুঝতে পারার পর বাঙালি বন্ধুরা আর তাকে ছাড়লেন না। তাদের সাথেই ম্যাকডোনান্ডস-এ তাকে খাওয়ালেন এবং তার প্রিয় পানীয় কফিও তা থেকে বাদ গেলো না। বাঙালিরাও হয়তো মজা পেলেন, কারণ এরকম বদান্যতা গ্রহণে তার কোন অস্বস্তি নেই, বরং নিয়মিত ঘটনা।

এর পরের ঘটনাটি একটু ভিন্ন রকমের। আশেপাশের কয়েকজন ভারতীয় যাত্রী বিষয়টি ভালো চোখে দেখলো না। তাদের কোন অভিজ্ঞতার আলোকে তারা এতে প্রতারণার সম্ভাবনা দেখতে পেলো। কীভাবে একজন নিরীহ নারীকে প্রতারণার হাত থেকে বাঁচানো যায়, তারা উপায় খুঁজতে লাগলো। একটি সময়ে যখন বাঙালি বন্ধুরা তাকে ছেড়ে ওয়াশরুম অথবা স্মোকিংরুমে গেলেন, তখন ওই ভারতীয় ‘স্বেচ্ছাসেবীরা’ তাকে বাঁচাতে এলো। কিন্তু আমাদের অবাঙালি বন্ধুটি এতে মনে মনে বিরক্ত হলেন, কারণ তাদেরকেও তিনি প্রথমে বাঙালি মনে করে সাহায্য চেয়েছিলেন, যাতে তারা অপারগতা প্রকাশ করেছিল। বিরক্তি প্রকাশ না করে তিনি ভারতীয় সহযাত্রীদেরকে জানালেন যে, তারা তার পূর্ব পরিচিত। অতএব এবিষয়ে আর কথা নয়।

যা হোক বাঙালিরা ঢাকা বিমানবন্দর পর্যন্ত তার সঙ্গে ছিলেন এবং ঢাকায় এসে সিএনজিতে তোলে দিয়ে তারা বিদায় নিয়েছিলেন। বলা যায়, বাসা পর্যন্ত তারা তার সঙ্গেই ছিলেন, কারণ সিএনজি ড্রাইভারের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে তারা তার বাসায় পৌঁছানো নিশ্চিত করেছিলেন।▲

————
ফেইসবুক স্ট্যাটাস: ৬ জানুয়ারি ২০১৭

চলছে বাণিজ্যিক শোষণ! রিভিউ লেখুন, মুনাফাখোরদের আগ্রাসন থেকে অসহায় ভোক্তাকে মুক্তি দিন…


রাতের নির্জনতায় অথবা অফিসের ব্যস্ততায় হুট করে একটি বার্তা এসে হাজির। আপনি হয়তো ভাবলেন বুঝি আপনার আপন কেউ আপনার খবর নিচ্ছে। কিন্তু না। ‘দারুণ অফার’ নামক নতুন আরেকটি অনাকাঙ্ক্ষিত মেসেজ। ছুটির দিন দুপুরের আহারশেষে আয়েশ করে একটি বৈকালিক ঘুম দিলেন, কিন্তু তা আর হয়ে ওঠলো কই? ‘দারুণ অফার’ এসে হাজির! একটি প্রতিষ্ঠিত ও স্বনামধন্য মোবাইল ফোন অপারেটর তাদের প্রোমোশনাল আইটেমগুলো নিয়ে এমন জ্বালা-যন্ত্রণা শুরু করেছে যে, সেটি স্বাভাবিক জীবনকে অস্বস্তিতে ফেলছে। আগে তারা শুধু বার্তাতেই সীমাবদ্ধ থাকতো, কিন্তু এবার কল করতে শুরু করেছে। অসহায় গ্রাহক তখন কী করবেন?

দেশের সুপারশপগুলো শুরু করেছে সুপার বাটপারি। মনে করুন, ৫৪৪ টাকার বিল হয়েছে। সেক্ষেত্রে আপনাকে ৫৪৫ টাকা দিতে হবে, কারণ তাদের কাছে ১টাকা চেইন্জ নেই! কিছুদিন তারা ক্রেতাকে ১টাকা দামের চকলেট খেতে বাধ্য করেছে, এবার সেটিও আর করছে না। ৫৫০ টাকা দিলে বিনাবাক্যে ৫টাকা দিয়ে তারা পরবর্তি ক্রেতার দিকে মনযোগ দেয়। এটি তো গেলো দৃশ্যমান প্রতারণা। ধরুণ আপনার বিল হয়েছে ৫৪৭.২৫ টাকা। তবে কি তারা আপনাকে পৌনে তিন টাকা ফেরত দেবে? বড়জোড় ২টাকা পেতে পারেন। এভাবে তারা ক্রেতাকে ঠকিয়ে হাজার হাজার টাকা অতিরিক্ত আদায় করছে। কেউ কি হিসাব করেছে? তাছাড়া, পণ্যের কোয়ালিটির কথা বাদই দিলাম। তো এসব ক্ষেত্রে ভোক্তার কত সময় আছে, পঁচাত্তর পয়সার জন্য বিশাল বড় সুপারশপগুলোর সাথে বাদানুবাদে যাবার?

ফাস্টফুড রেস্তোরাঁগুলোতেও একই দশা। চারশ’ টাকা দিয়ে একটি বার্গার অর্ডার করে দেখবেন, সেখানে চিজ (পনির) নেই। কেন নেই? কারণ আপনি তা দিতে বলেন নি। পনির দেবার জন্য এক্সট্রা আরও হয়তো ৪০/৫০ টাকা যোগ করতে হবে। খাবারের মান নিয়ে কথা বলবেন? তাদের চাকচিক্য দেখে কি কখনও সন্দেহ হবে যে, তারা মৃত মুরগির মাংসকে হার্বাল স্পাইস মিশিয়ে ফ্রাই করে আপনাকে খাইয়েছে? নিশ্চিত হলেও তা বলার পরিবেশ আপনি পাবেন না, কারণ আপনি একা।

এ প্রসঙ্গে দেশের শিক্ষা বা চিকিৎসা সেবা নিয়ে কিছু বলার প্রয়োজন আছে কি? চিকিৎসার সেবার অব্যবস্থা নিয়ে কথা বললে আরব্যরজনীর মতো শেষ হবার নয়। এখানেও স্বল্পবিত্তরা নিতান্তই একা আর অসহায়। উচ্চবিত্তদের জন্য দেশীয় চিকিৎসার দরকারই নেই!

ফলে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি মৌলিক অধিকারগুলোর জন্য টাকা খরচ করেও ভোক্তা বঞ্চিত হচ্ছে। এভাবে ভোক্তাবাজারের বিভিন্ন সেবাখাত থেকে শোষণ, বঞ্চণা ও প্রতারণা চলছে হরিলুট কায়দায়। শোষকেরা এখানে ঐক্যবদ্ধ, শোষিতরা নানা ধারায় বিভক্ত।

পুঁজিবাদি সমাজে একটি মুনাফাখোর শোষক শ্রেণী গড়ে ওঠে এবং ওঠেছে। তারা দৈত্যের ন্যায় শক্তিশালী কারণ শাসকশ্রেণীও একই স্বার্থে তাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ। মাঝে মাঝে শাসকেরা খুবই সূক্ষভাবে আইওয়াশ করেন অবশ্য। কিন্তু সকলেরই উদ্দেশ্য যেকোনভাবে লাভবান হওয়া। বিজনেস এথিক্স এখানে অনুপস্থিত। কোথাও কোন নিয়ন্ত্রণ নেই, নেই কোন আইনের প্রয়োগ। বিখ্যাত এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোও এই লাগামহীন বাজারের সুবিধা নিচ্ছে, কারণ এখানে তাদের ভালো থাকার বাধ্যবাদকতা নেই। অন্যদিকে শোষিতরা নিরব! কী করবে তারা? নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত ভোক্তাশ্রেণীর তো কোনই ক্ষমতা নেই। মাঝেমাঝে ভোক্তার অধিকার বলে শুধুই চিৎকার করি, যা কোন কাজে আসে না।

মোদ্দাকথা হলো, ভোক্তারা নিজেদের মতামতকে কার্যকরভাবে প্রকাশ না করলে, তাদের অসহায়ত্ব সম্পর্কে কোন ধারণা সৃষ্টি হয় না। ভোক্তার আহাজারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কানে পৌঁছায় না, পরিস্থিতিরও উন্নয়ন হয় না।

.
২)
গত বছর কোরিয়া বেড়াতে গিয়েছিলাম। সপ্তাহ দুই বেড়ানোর পর ফেরার পথে সঙ্গত কারণেই লাগেজটা মোটা হয়ে গেলো! উপায় না দেখে আরেকটি লাগেজ কিনতে বাধ্য হলাম। কিন্তু বিমানে ওঠার পূর্বের রাতে দেখা গেলো যে, লাগেজটির একপাশের সেলাই ঢোলা হয়ে গেছে। মহাফ্যাসাদে পড়লাম! এখন তো আর কেনার সময় নেই, বদলাবারও সুযোগ নেই! কিন্তু আমার সফরসঙ্গীকে ততটা চিন্তিত হতে দেখলাম না। কিছুক্ষণ পর আমাকে জানানো হলো যে, লাগেজের দোকান থেকে নতুন একটি লাগেজ ২০মিনিটের মধ্যেই বাসায় পৌঁছাবে। সত্যিই তাই হলো! তারা বাতিলকৃত লাগেজটি নিতে চাইলেন না, দেখতেও চাইলেন না, বরং দুঃখ প্রকাশ করলেন। আমি তো বিস্ময়ে হতবাক!

আমাদের দেশে হলে তো এই সমস্যার দায়িত্বই দোকানদার মাথায় নিতো না। অবিলম্বে আমি এই যাদুর মাজেজা জানার জন্য ওঠেপড়ে লাগলাম। আমার সফরসঙ্গী জানালেন যে, এখানে ইন্টারনেট কমিউনিটি খুবই প্রভাবশালী। প্রসঙ্গত, ইন্টারনেট ব্যবহারে (internet penetration) কোরিয়ানরা পৃথিবীর শীর্ষে। কোন কোম্পানি/পণ্য সম্পর্কে কোন ভোক্তা যদি নেতিবাচক কোন অভিমত প্রকাশ করে, তবে কয়েক মিনিটের মধ্যে তা হাজার হাজার ভোক্তার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন সকাল হতে হতেই কোম্পানিতে লালবাত্তি!

আমরা তো দিনভর ফেইসবুক দিয়ে ইন্টারনেট চালাই আর পণ্যের নিম্নমান নিয়ে মুখেমুখেই চিল্লাবিল্লা করি। ছবিসহ দু’টি লাইন লেখে দিলেই কিন্তু সংশ্লিষ্ট কোম্পানির টনক নড়বে। সেটা করি না – ব্যস্ত থাকি সেল্ফি আর কাউফিতে। আইন বলুন আর সরকার বলুন, না কাঁদলে আপন মাতাই দুগ্ধ দেয় না!

একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল সম্প্রতি ‘রিভিউ’ নামে একটি বিভাগ খুলেছে। সেখানে মূলত বিভিন্ন ব্র্যান্ড নিয়ে ইতিবাচক গুণকীর্তন করা হয়। তবু কোন ভোক্তা সেখানে তার নিজের অভিমতটি প্রকাশ করতে পারেন। তাছাড়া, ব্লগে, ফেইসবুকে অথবা টুইটারে প্রকাশ করতে পারেন নির্দিষ্ট সেবা/পণ্য সম্পর্কে ভোক্তার অভিজ্ঞতা। তাতে প্রতারিত/সংক্ষুব্ধ ভোক্তাদের মধ্যে একতা বৃদ্ধি পাবে, সে সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানও সচেতন হতে বাধ্য হবে।

 

.

পণ্য বা সেবার বাস্তব ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক রিভিউ লেখে আমরা সমাজের অসামান্য উপকার সাধন করতে পারি:

• প্রফেশনাল রিভিউ: পেশাদার মূল্যায়ন। আমরা নির্দিষ্ট কোন ব্র্যান্ডের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারি। সঙ্গে থাকবে ইতিবাচক ও নেতিবাচক বিষয়ের সুসমন্বয়। দামের সাথে উপযোগিতার তুলনা। এটি সংশ্লিষ্ট কোম্পানির জন্য মহামূল্যবান নির্দেশনা হতে পারে। নিজের পরিচিত পণ্য দিয়েই শুরু করা যায় রিভিউ। উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্র্যান্ডগুলো এসব মূল্যায়নকে খুবই গুরুত্ব দেয়। একসময় উচ্চমূল্যে বিক্রি হতে পারে একটি রিভিউ।

• কনজিউমার রিভিউ: ভোক্তার অভিমত। এর আরেক নাম হতে পারে, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। এটি পেশাদার অথবা ভারসাম্যপূর্ণ হবার বাধ্যবাদকতা নেই। ভোক্তা যখন-তখন একটি রিভিউ লেখে তা নিজের ফেইসবুকে/ব্লগে/টুইটারে প্রকাশ করতে পারেন। তাতে কিছু কাজও হবে, ক্ষোভও প্রশমিত হবে। একপেশে বা আবেগাক্রান্ত না হলে সেটি বেশি ফলদায়ক হবে। যুক্তি এবং প্রমাণনির্ভর হলে সেটি কাঙ্ক্ষিত সুফল নিয়ে আসবে। ছবি থাকলে তো কথাই নেই!

ব্লগিং-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো, নাগরিক সাংবাদিকতা, যা আউট-অভ্-ফোকাস ও অবহেলিত মানুষের অধিকারের কথা বলে। আমি মনে করি, ব্লগারদের নৈতিক দায়িত্ব আছে দেশের অসহায় ভোক্তাদের পক্ষে কথা বলার। তারা নিজেরাও তো একেকজন ভোক্তা। বাস বলুন আর রিক্শা বলুন, কাঁচাবাজার বলুন আর শেয়ার বাজার বলুন – ভোক্তার চেয়ে অসহায় আর কে আছে!

.

.

*পাবলিক ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া: ১৯ অক্টোবর ২০১৫

মার্গারেট থ্যাচারকে কেন লৌহমানবী বলা হতো?

jiggasha

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় যে, মার্গারেট থ্যাচারের ‘লৌহ মানবী’ খেতাবটুকু তার কর্মের জন্য নয়, তার কঠোর বাগ্মীতার জন্যই দেওয়া হয়েছিল। সেটি ইতিবাচক অর্থে নয় নেতিবাচকভাবেই দেওয়া হয়েছিল। যা হোক, তাকে কখন কীভাবে কেন এবং কে এই খেতাব দিয়েছিল সেটি আজ আর অজানা থাকার বিষয় নয়। মোট কথা হলো, সোভিয়েত রাশিয়ার গণমাধ্যম থেকে তিনি এই খেতাব পেয়েছিলেন, যার কারণে পরবর্তিতে তিনি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছিলেন।

তো দেখি এবার, তিনি কী কথা বলতেন, যার কারণে লৌহ মানবী বা আইরন লেডি’র শব্দযুগল তার নামের সাথে যুক্ত হয়।

 

————-

আমি ভাগ্যবান ছিলাম না, ভাগ্যকে অর্জন করেছি।

আমি অস্বাভাবিক ধৈর্য্যশীল, এই শর্তে যে শেষ মুহূর্তে আমি নিজের সুযোগটি পাই।

জনতাকে অনুসরণ করবেন না, জনতাকে বরং আপনাকে অনুসরণ করতে দিন।

রাজনীতিতে যদি কাউকে দিয়ে কিছু বলাতে চান, তবে একজন পুরুষকে বলুন। যদি কিছু করাতে চান, তবে একজন নারীকে বলুন।

রাজনীতিতে একটি সপ্তাহ বিশাল সময়।

সাধারণত দশ সেকেন্ডের মধ্যেই আমি একজন মানুষ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেই এবং খুব কমই সেটি বদলাই।

অবশ্যই এটি পুরান কাহিনি। সত্য তো একই পুরান কাহিনি।

একটি যুদ্ধকে জয় করার জন্য আপনাকে একাধিকবার যুদ্ধ করতে হতে পারে।

কঠোর পরিশ্রম ছাড়া কেউ শীর্ষস্থানে পৌঁছেছে এমন কাউকে আমি জানি না। এটিই উপায়। পরিশ্রম আপনাকে সবসময় শীর্ষস্থানে না নিলেও অন্তত নিকটে গিয়ে পৌঁছাতে পারবেন।

আপনার কাজের পরিকল্পনা করুন, আজকের এবং প্রতিদিনের। তারপর পরিকল্পনাকে কাজে রূপ দিন।

প্রত্যেক নেতার মধ্যে কিছু পরিমান লোহা থাকা উচিত। তাই আমাকে যে ‘লৌহ মানবী’ বলা হয়, সেটি আলাদা কিছু নয়।

————-

 

‘আমি ভাগ্যবান ছিলাম না, ভাগ্যকে অর্জন করেছি।’ এই কথাটি যে কতটা সত্য ছিল, সেটি থ্যাচারের জীবন (১৩ অক্টোবর ১৯৩৫ – ৮ এপ্রিল ২০১৩) থেকে বুঝা যায়। তিনি ১১ বছরেরও বেশি সময় ব্রিটেনের শাসক ছিলেন। ছিলেন নন্দিত এবং নিন্দিতও। অনেকের প্রশ্ন, এত নিন্দিত থাকার পরও কীভাবে এত বছর তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থাকলেন। যোগাযোগ প্রযুক্তির এই যুগে, তার জীবন কাহিনি আজ সবার জন্য উন্মুক্ত। আমাদের জীবন থেকেও একই সত্যকে বুঝতে পারি। সত্য সবসময়ই পুরান এবং পরিবর্তনহীন। এটিও থ্যাচারের কথা। এটি সবারই কথা। তিনি সত্যই এক লৌহ মানবী ছিলেন।

 

 


উক্তিগুলো বিভিন্ন থেকে সংগৃহীত এবং লেখক কর্তৃক বাংলায় অনূদিত।

আমার প্রিয় রসাত্মক ধনাত্মক উক্তিগুলো। পর্ব ৩।

মানুষের কথায় তাকে চেনা যায়। তার প্রতিটি সচেতন উক্তিতে আছে দর্শন। রয়েছে ভাবনার বিষয়, চিন্তাকণা। এবারের পর্বটি একটু অম্লমধুর হবে। রস আছে। সে রসে আছে তীক্ষ্ণতা। সবগুলো কথাই চিন্তা খাবার যোগাবে, তাতে আমি নিশ্চিত। বলে রাখছি, এগুলো প্রথমত লেখকের নিজেরই জন্য। কিন্তু পাঠক মজা পেলে লেখক ধন্য।

 

————

কাউকে বিয়ে করার পূর্বে তাকে একটি ধীরগতির কম্পিউটার ব্যবহার করতে দিন। এবার দেখুন সে আসলে কেমন।  (উইল ফেরেল)

আমি যা কিছু করতে পছন্দ করি, সেগুলো হয় অনৈতিক, না হয় অবৈধ অথবা শরীর মোটা হয়ে যায় এমন কাজ। (আলেকজান্ডার উলকট)

আমি এমন একজনকে চিনি যে ধূমপান, মদ্যপান, নারীসঙ্গ এবং উচ্চমানের খাবার খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল। আত্মহত্যার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সে সুস্থ ছিল। (জনি কারসন)

সে নিজেই শুধু একঘেয়ে নয়, সে অন্যদের মধ্যেও একঘেয়েমির কারণ। (স্যামুয়েল জনসন, ১৮ শতকের লেখক)

ঈশ্বর যে আমাদের ভালোবাসেন তার একটি অকাট্য প্রমাণ হলো মদ। তিনি আমাদেরকে আনন্দে রাখতে পছন্দ করেন। (বেন্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম স্থপতি)

স্বাস্থ্য বিষয়ক বই পড়ার সময় সাবধান থাকবেন। ছাপার ভুলের কারণে আপনার মৃত্যু হতে পারে। (মার্ক টোয়েন)

ভালো মেয়েরা স্বর্গে যায়, খারাপ মেয়েরা সবখানে যায়।  (হেলেন গার্লি ব্রাউন)

রাগ নিয়ে ঘুমাতে যাবেন না। জেগে থাকুন, ঝগড়ায় লেগে থাকুন। (ফিলাস ডিলার)

রাজনীতিতে যদি কাউকে দিয়ে কিছু বলাতে চান, তবে একজন পুরুষকে বলুন। যদি কিছু করাতে চান, তবে একজন নারীকে বলুন। (মার্গারেট থ্যাচার, দ্য আইরন লেডি)

———–

 

এবারের পর্বটির জন্য রিডার্স ডাইজেস্ট-এর কাছে ঋণী। অনুবাদ লেখকের।


রসাত্মক ধনাত্মক উক্তির দ্বিতীয় পর্ব।

কর্মসংস্থান: পৃথিবী ভিতুদের জন্য নয়…নিয়ম ভাঙ্গুন, চাকরি ধরুন!

কর্মসংস্থান নিয়ে অনেক দিন কিছু লেখা হচ্ছে না। এদিকে অনেক কথা জমে আছে পেটে! চাকুরির বাজারটা ক্রমেই ‘ট্রিকি’ হয়ে আসছে। চাকুরি প্রত্যাশী এবং চাকুরি দাতা উভয়েই এখন মহাসংকটে! আস্থার সংকট তো আছেই, চিরাচরিত সংকট হিসেবে আছে একে অপরকে না বুঝার সংকট। এটি যেন আকারে-প্রকারে শুধুই বড় থেকে বিকটতর হচ্ছে। এরকম একটি কঠিন সময়ে আমি প্রশাসন থেকে বিযুক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠানের মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগে এসে ল্যান্ড করলাম। এ বিষয়টি এর আগে প্রশাসনেরই অংশ ছিল। নতুন বোতলে পুরাতন জুস আর কী! সবই কর্তার ইচ্ছা!

আস্থার সংকটটি বুঝতে পারা যায় যখন বিধি মোতাবেক সমস্ত শর্ত মেনে আবেদন করার পরও ইন্টারভিউ কলটি আসে না। অথবা ইন্টারভিউ পর্যন্ত মোটামুটি ভালো করেও যখন, পরবর্তিতে কোন খবর আসে না, তখনই বুঝা যায় উভয়ের মধ্যে আস্থার অভাব আছে। এসময়ের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হলো, রেফারেন্স ছাড়া চাকরি না হওয়া। অথবা প্রথম ব্যক্তিটিকে ডিঙ্গিয়ে দ্বিতীয় তৃতীয় বা চতুর্থ এমনকি দশম ব্যক্তিটিকে চাকরি দেওয়া।

একে অন্যকে না বুঝার ব্যাপারটি আরও স্বাভাবিক – তবে দুঃসহনীয়। দু’টি পক্ষ অত্যন্ত আনুষ্ঠানিক পরিবেশে প্রার্থী নির্বাচন বা ‘চাকরিটি পাইতেই হবে’ – এরকম চাপ নিয়ে রোবটিক আলোচনায় লিপ্ত হলে, এখানে ‌’আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ না হবারই কথা। প্রথাগতভাবে ‘না বুঝার পরিস্থিতিটি’ সৃষ্টি করেন নিয়োগকর্তা এবং এর কুফল ভোগ করেন উভয়ই। এরকম পরিস্থিতিতে চাকরি প্রার্থী আত্মবিশ্বাসী হলে, পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে নিয়ে আসতে পারেন।

 

একটি কেইস স্টোরি শেয়ার করছি। রাইসুল হাসান স্বভাবত উগ্র না। কিন্তু একটি সিনিয়র পদে চাকরির ইন্টারভিউতে সে বুঝতে পারে নিয়োগকর্তাদের কথায় কোন ফাঁক আছে। ইন্টারভিউয়ারদের সামনে বসেই সে রাগে ফুঁসতে থাকে। সে সমস্ত নির্দেশ অনুসরণ করেছে এবং প্রত্যাশিত যোগ্যতার প্রায় সবগুলোই তার শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার সাথে মিলে গেছে। টেস্টেও সে ভালো করেছে। তবু ইন্টারভিউয়ারদের একজন তাকে যা বললেন, তা হাসান মেনে নিতে পারছে না। ‘মি. হাসান, ফ্রাংকলি স্পিকিং… আপনার এভরিথিং ওকে। কিন্তু কিছু বিষয় আমাদেরকে প্রসিড করতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’ কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে হাসান করণীয় নির্ধারণ করে। হাসান জানে, চাকরিটা তার এমনিতেই হচ্ছে না। তাই রাগের মাথায় রাইসুল হাসান বেশকিছু প্রশ্ন করে বসলেন নিয়োগকর্তাদের নাক বরাবর! প্রশ্নগুলোর অধিকাংশই প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি, কাজের ধরণ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কিত প্রশ্নগুলো স্বভাবতই কিছুটা আক্রমণাত্মক এবং স্পর্শকাতর হয়ে যায়। আর তাতে ‘ডিফেন্স’ করতে এগিয়ে আসেন বোর্ডের নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকা ভদ্রলোকটি। হাসান ধারণা করেছে, তিনিই হবেন প্রতিষ্ঠানের সিইও, কারণ উত্তরগুলো খুবই জুতসই এবং দায়িত্বশীল হচ্ছে। আইসব্রেকিং পর্ব শেষ! আস্তে আস্তে ইন্টারভিউর গোমট পরিবেশ হালকা হয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থায় চলে আসে। অন্যান্য ইন্টারভিউয়াররা ক্রমে কক্ষ ছাড়তে থাকেন। সিইও তার দুপুরের খাবার পিছিয়ে দেন। প্রায় দু’ঘণ্টার আলাপচারিতার বিস্তারিত সকল তথ্য এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। প্রাসঙ্গিক হলো, নিয়মভঙ্গ করে হাসান সেদিন রোবটিক আলোচনাকে ‘মানবিক সমঝোতায়’ রূপ দেয়। প্রশ্ন-উত্তর আর প্রতিপক্ষ-মুখী জিজ্ঞাসাবাদকে সমঝোতামুখী সংলাপে পরিণত করে। হাসানকে সাহায্য করেন প্রতিষ্ঠানের সিইও নিজে। রাইসুল হাসানের সরল কিন্তু তীক্ষ্ণ ও প্রত্যক্ষ প্রশ্নগুলোকে কর্তৃপক্ষ সততা ও পেশাদারিত্বের চিহ্ন হিসেবে দেখেছে। সঙ্গতকারণেই এর ফলাফল হাসানের পক্ষে চলে যায়।

রাইসুল হাসানের ঘটনায় অনেক প্রতিষ্ঠিত কিছু প্রথার ব্যতিক্রম হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যে নিয়মটি হাসান লঙ্ঘন করেছে, তা হলো ইন্টারভিউ বোর্ডে বিতর্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা। চাকরির ইন্টারভিউতে একটি প্রতিষ্ঠিত নিয়ম হলো, নিয়োগকর্তাদের সাথে বিতর্ক সৃষ্ট হয় এমন কথা বলা বা এমন প্রশ্ন করা যাবে না। তাতে সব ভেস্তে যাবে। কিন্তু হাসানের ব্যক্তিত্বে এবং কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিলো, যার কারণে প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেও নিজের পক্ষে তা কাজে লাগাতে পেরেছে।

অফিস এবং আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেও নিজের স্বকীয়তা তুলে ধরার বিষয়টি অনেক প্রার্থী মনে রাখতে পারে না। নিজস্বতা তো নেই-ই, নিজের সর্বনিম্নটুকু তুলে ধরতে ব্যর্থ হয় অনেকে। এই সমস্যার গোড়া অনেক গভীরে। যেতে হবে আমাদের স্কুলজীবনে, যেখানে নিজস্ব কিছু করা মানেই শিক্ষকের বেত আর মায়ের বকুনি। ইংরেজি অথবা গণিতকে ছোটকাল থেকেই ‘কঠিন বিষয়’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষকের কাছে জিম্মি থেকে আমাদের শিক্ষা জীবন শেষ হয়। তাই ব্যতিক্রম আমরা প্রায় জানি না।

 

এরকম সমাজ ব্যবস্থায় টিকে থাকা এবং নিজেকে অতিক্রম করা খুবই কঠিন। তবু কয়েকটি নিয়ম লঙ্ঘনের দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি। পৃথিবীর যাবতীয় বিধান, নীতিমালা আর চুক্তিনামা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে – চাকরি প্রার্থীর পক্ষে কেবল একজনই থাকে। তাই চাকরি প্রার্থীর পক্ষ থেকে কয়েকটি ব্যতিক্রম তুলে ধরা চেষ্টা করলাম। এগুলোই সব নয় – কেবলই দৃষ্টান্ত:

১) প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ছকে আবেদনপত্র ব্যতিত আর কিছুই গ্রহণযোগ্য হবে না -এনিয়মটি মানতেই হবে এমন নয়। ঘোষিত পদ এবং দায়িত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট ট্রেনিং বা অভিজ্ঞতার সনদ থাকলে তা যুক্ত করা যায়। প্রথম দর্শনই সেরা দর্শন।

২) সিভিতে ‌’আমি’ শব্দটি একদমই ব্যবহার করা যাবে না, এটিও খোঁড়া যুক্তি। চাকরির আবেদন মানেই হলো নিজেকে নিয়ে মার্কেটিং করা। যেখানে ব্যক্তিগত যোগ্যতাই প্রধান নিয়ামক, সেখানে অন্তত ৪/৫বার ‌’আমি’ ব্যবহারে মহাভারত অশুদ্ধ হয় না। আমি ব্যবহার করলে আবেদনপত্রটিকে বরং একটু ‘মানবিক’ দেখাবে। মানবিক হওয়াটা জরুরি। মানুষ যা পছন্দ করে, তার সবই প্রকাশ করতে পারে না! নিয়োগকর্তারা সকলে জানেন না, তারা কিসে সন্তুষ্ট হবেন।

৩) ‘আপনার সমস্ত কাজের/চাকুরির বিবরণ দিন।’ কী দরকার আছে এত কিছু বলার? সমস্ত কর্মজীবনের ইতিহাস তাদেরকে জানিয়ে কী লাভ! তার পরিবর্তে এই কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা/ কর্মসংস্থানের বিবরণ তুলে ধরা যায়।

৪) ‘আগ্রহীদেরকে নিম্নের ঠিকানায় আবেদনপত্র পাঠাতে অনুরোধ করা হলো।’ এভাবে নিয়ম পালন করে অনেকেই তার সিভিখানি প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যক্তির হাতে পৌঁছাতে পারে নি। দোষ দিয়েছে ডাকবিভাগের অথবা নিজ কপালের। পরামর্শ হলো, তাদের নির্দেশিত ঠিকানা ছাড়া আরও কোন সরাসরি পথ আছে কিনা, তা খুঁজে বের করতে হবে। অনেকে নিয়োগকর্তার নামটি সংগ্রহ করে একদম তার নাম উল্লেখ করে আবেদনপত্র পাঠায়। ইন্টানেটের যুগে নাম বেরা করা খুব কঠিন নয়। নিয়োগকর্তা যদি সত্যিই উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে বের করতে চান, তবে বিশেষ মাধ্যমে পাঠানোর কারণে আপনার আবেদনপত্রটি বাতিল হবে না। বরং আলাদা গুরুত্ব পেতে পারে।

৫) ‘অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ প্রার্থীর অযোগ্যতা বলে বিবেচিত হবে।’ হতেই পারে। তবে পরিস্থিতি বুঝে এখানেও কিছু কৌশল খাটানো যায়। কোন রেফারেন্স না দিয়ে নিজের যোগ্যতার বিবরণ দিয়ে এবং কোন পদের উল্লেখ না করে – নিয়োগকর্তাকে একটি ইনফরমাল চিঠি পাঠানো যায়। গৃহীত হলেও চমৎকার, না হলেও প্রার্থীর ফাঁসী হবে না!

৬) ‘আপনার বেতনের ইতিহাস তুলে ধরুন।’ বললেই হলো? সংশ্লিষ্ট পদে তারা কী পরিমাণ বেতন দিয়েছেন, তা কি তারা কখনও জানাবেন? কখনও না। তবে কেন নিজের ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে নেগোশিয়েটিং স্ট্রেংথ কমানো? এসব ক্ষেত্রে মিথ্যা বিবরণ দিলে কিন্তু বুমেরাং হতে পারে। তবে সত্যটি গোপন করা যায়।

৭) ‘আমরা প্রশ্ন করবো, আর আপনি শুধু উত্তর দেবেন’ এরকম একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু নিয়োগকর্তাদেরকে এতো সুযোগ দিয়ে নিজেকে ‘ভেড়া’ বানাবেন না। একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে পরবর্তি প্রশ্নটির জন্য বোকা হয়ে বসে থাকবেন, সেটি না করলেও চলবে। উত্তর দিন, তবে সুযোগমতো প্রশ্নও করুন। অনেক সময় প্রশ্নকর্তাদের মধ্যেও বিরতি থাকে। বিনয়কে অস্ত্র হিসেবে ধারণ করে সেসব বিরতিতে নিজেকে প্রবেশ করাতে হবে। সাধারণত, প্রশ্ন যে করে, চালকের আসনে সে-ই থাকে।

 

ইন্টারভিউ বোর্ডে ‘সবই ঠিক আছে’ বা ‘আমি রাজি’ গায়ে পড়ে এমন মনোভাব দেখানোর চেয়ে নিজের সামর্থ্যটুকু দেখানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে মনে করেন, ইন্টারভিউ বোর্ডে প্রশ্ন বা কোন প্রকার জিজ্ঞাসা করলে তাতে কাজটির প্রতি প্রার্থীর অনীহা প্রকাশ পাবে। অথবা, নিয়োগকারী নাখোশ হতে পারেন। নিয়োগকারীকে খুশি করার চেষ্টা না করে, সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতে হবে। তারা আনন্দ পেতে বসেন নি, উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে পাবার জন্য বসেছেন।

কাজটি পেলেই করবো। নির্বাচিত হলেই ওই বিষয়ে পড়াশুনা শুরু করে দেবো। এরকম শর্তে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে, পছন্দের প্রতিষ্ঠান/কাজটিকে লক্ষ্য করে আগে থেকেই কিছু জেনে রাখাটা বুদ্ধিমানের কাজ। ‘আপনার কোন জিজ্ঞাসা আছে?’ এরকম সুযোগে তখন কার্যকর কিছু জিজ্ঞেস করা যাবে। তাতে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রার্থীর ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পায়। নিয়োগকর্তাদের মনে আস্থার সৃষ্টি হয়। প্রশ্নে ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। উত্তরের মধ্য নয়, প্রশ্নের মধ্য দিয়ে মানুষকে চেনা যায়।

একটি সফলতা পরেরটিকে এগিয়ে নিয়ে আসে। ইন্টারভিউ বোর্ডে বেয়াদবি করার দরকার নেই, সেটি যোগ্যতার অংশ নয়। নিয়োগকারীর প্রশ্ন আক্রমণাত্মক হলেও মনে করতে হবে, এর অন্য কোন অর্থ আছে। রেগে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ সৃষ্টি করলে, সেটি ভালো ফল নিয়ে আসবে না। বরং নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক অনুভূতির সৃষ্টি হবে, যা পরবর্তি প্রচেষ্টায় প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রশ্নের উত্তরে যথাযথ আচরণ করাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর জানতে হবে এমন কোন কথা নেই, সেক্ষেত্রেও নিজেকে ধরে রাখতে হবে। এখানে লজ্জার কিছু নেই। আবার অতি বিনয়কে তারা লাজুক বা অন্তর্মুখী স্বভাব হিসেবে ধরে নিতে পারেন। তাই বিনয়ের অবতার হয়ে জানা বিষয়টিকেও এড়িয়ে গেলে কোন ফল হবে না। একেকটি প্রশ্ন একেটি সুযোগ।

যেকোন প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে আত্মবিশ্বাস একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বায়বীয় বিষয়। মনস্তাত্ত্বিকদের কাছে আত্মবিশ্বাস হলো বিশ্বাসের মধ্যে। আপনি ততটুকুই আত্মবিশ্বাসী যতটুকু আপনি মনে করেন। আরেকটি নিয়ম হলো, আত্মবিশ্বাস কেউ দিয়ে দেয় না, নিজে থেকেই অর্জন করতে হয়।

সমাজে প্রকৃত নেতার খুবই অভাব। কিন্তু আত্মবিশ্বাস নেতৃত্বদানের জন্য প্রধান নিয়ামক। চাকরি প্রার্থীকে মনে রাখতে হবে যে, ইন্টারভিউ বোর্ডে আত্মবিশ্বাস তার যোগ্যতারই অংশ। ওটি না দেখাতে পারলে, উত্তর সঠিক হলেও তা পালে বাতাস পাবে না।

চাকুরির বাজার যেন একটি গ্ল্যাডিয়েটরস থিয়েটার! যোগ্যতা দেখিয়ে চাকরি পাওয়া একটি নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া, তাতে সন্দেহ নেই। বর্তমান চাকরির বাজারটি আরও অমানবিক হয়ে যাচ্ছে। প্রার্থীর প্রচেষ্টা থাকবে মানবিক হবার এবং যতটুকু সম্ভব ঘরোয়া পরিবেশ ফিরিয়ে আনার।

এসব ক্ষেত্রে যেসব বিধি-বিধান বা নিয়ম-নীতি আছে, তার প্রায় সবই নিয়োগকারীর অনুকূলে। বুদ্ধিমান প্রার্থীরা দু’টি কাজ করেন: ১) নিজের মতো করে সেগুলো অনুসরণ করেন অথবা/এবং ২) সুযোগমতো এড়িয়ে চলেন। ভুলে গেছি, ব্যস্ততার কারণে সার্কুলারটি ভালোভাবে পড়ার সুযোগ হয়ি নি অথবা আমি তো কেবল আজই জানলাম – সাথে সাথে আবেদন করলাম। এসব বলেও কিছু বিধান এড়িয়ে যেতে সক্ষম হন অনেক প্রার্থী। প্রার্থীকে শুধু মানবিক হবার চেষ্টা করলেই, অনেক নিয়মকে তিনি এড়িয়ে যেতে পারেন।

 

শেষ কথা: বিষয়টিতে আরও আলোচনার প্রয়োজন আছে। কর্মসংস্থানের মৌলিক সমস্যাগুলো এই পোস্টে পর্যাপ্ত আলোচিত হয় নি। কর্মসংস্থান বা চাকুরি পাবার সাথে জড়িত প্রধান বিষয়গুলো হলো: দক্ষতা, যোগ্যতা এবং ব্যক্তিত্ব। সম্পূর্ণ বেকারত্বের চাপ নিয়ে ভালো চাকুরির জন্য নেগোশিয়েশন করা যায় না। তাই নতুনদের কাছে পরামর্শ হলো, প্রারম্ভিক কোন কাজে যুক্ত হয়ে প্রাথমিক কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা। আত্মবিশ্বাস এবং সংশ্লিষ্ট চাকরিটি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা থাকলে প্রার্থী যেকোন ব্যতিক্রম করতে পারেন। ব্যতিক্রমের লক্ষ্য হতে হবে: মানবিক এবং নৈকট্য সৃষ্টি করা। নিয়মের ব্যতিক্রম করাই যেন একমাত্র লক্ষ্য না হয়।

 

৩ সেপটেম্বর ২০১৪। পাবলিক ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া