Tagged: Women rights

নারী অধিকার: মার্সিয়া বার্নিকাটের নাট্যাভিনয়, কিছু অভিমত…

Mukhtar Mai

 

মার্চের ৬ তারিখ। স্থান – ধানমণ্ডির ছায়ানট নাট্যমঞ্চ। আমেরিকার রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাটের রুদ্ধকণ্ঠ। তিনি অভিনয় করছেন মুখতার মাইয়ের ভূমিকায়। মুখতারন মাই। গণধর্ষণের শিকার পাকিস্তানের নির্যাতিতা নারী মুখতার মাই হয়ে বার্নিকাট বলে চলেছেন তার নির্যাতন আর বিচারহীনতার মর্মন্তুত কাহিনি। গ্রামের মোড়ল, স্থানীয় শালিস এমন কি সংবাদমাধ্যমও যাকে চুপ থাকতে বলেছিল, সেই মুখতার মাই দেখিয়েছেন কীভাবে সুবিচার আদায় করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। বার্নিকাট যেন অভিনয় করছিলেন না, নিজেই মুখতার মাই হয়ে ওঠেছিলেন সেদিন সন্ধায়।…

ফিরে যাচ্ছি ২০০২ সালের ২২ জুনের দুপুর ২ঘটিকায়। স্থান মীরওয়ালা গ্রাম, মোজাফ্ফরগড় জেলা।মুখতার মাই ধর্ষিত হলেন চার নরপশু কর্তৃক। প্রতিহিংসার বশে ধর্ষণ। ধর্ষকেরা প্রভাবশালী। স্থানীয় থানা মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। ধর্ষকেরা একই গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছে বীরদর্পে। তারা নিরক্ষর মুখতার মাইকে বিভিন্নভাবে চাপ দিতে থাকে। বিভিন্ন রকমের সমঝোতার দলিল তৈরি করতে তারা মুখতার মাইকে টিপসই দিতে প্ররোচিত করে। মুখতার মাই বুঝতে পারেন তার নিরক্ষর থাকার পরিণতি। কিন্তু তিনি নিজ অবস্থানে অনড় থাকেন।…

পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে জুম্মাবারের মসজিতে খুদবার পর। ইমাম সাহেব আক্ষেপ করে ধর্ষণের ঘটনাটির উল্লেখ করেছিলেন। তাতেই খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে সবপর্যায়ের সাংবাদিকদের সামনে চলে আসে। পাকিস্তানে তখন গণমাধ্যম একটু একটু করে শাসকের রক্তচক্ষু থেকে অবমুক্ত হতে শুরু করেছে কেবল। খবরটি দাবানলের মতো দেশে এবং দেশের বাইরে ছড়িয়ে যায়।

এরই মধ্যে আদালতে শুরু হয় সাক্ষি এবং প্রমাণের লুকোচুরি। আদালত ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও যথাশীঘ্র কোন উপসংহারে আসতে পারছেনা।

ওদিকে মানুষ ক্রমেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠছে। পত্রিকার প্রথম পাতায় সম্পাদকীয় শেষপাতায় প্রকাশ পেতে থাকে মুখতার মাইয়ের পক্ষে মানুষের সমর্থন। সুবিচার যদি পেতে হয়, তবে মুখতার মাই হবেন প্রথম প্রার্থী। এরই মধ্যে একজন সরকারী কর্মকর্তা মুখতার মাইয়ের সংগ্রামী চেতনায় তাড়িত হয়ে তার প্রেমে পড়ে যান।… সে কথা থাক।

আদালত মুখতার মাইয়ের পক্ষে রায় দেয়। পুলিশ সন্দেহভাজন ধর্ষক ও তার সহচরদেরকে গ্রেফতার করে। অতঃপর ধর্ষকেরা পায় মৃত্যুদণ্ড।

পাকিস্তান সরকার মুখতার মাইকে ৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেয়। সেটি তিনি খরচ করেন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায়। মীরওয়ালা গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় মুখতার মাইয়ের বিদ্যালয়!

মুখতার মাই আজ একজন অধিকার কর্মী। বিশ্বব্যাপী অধিকারকেন্দ্রিক নাট্যআন্দোলনের প্রতীক। তার দৃষ্টান্ত পাকিস্তানের রক্ষণশীল সমাজে নারীজাগরণের প্রতিচিত্র।

বার্নিকাটকে মনে হয়নি যে তিনি কোন ভণিতা করছেন। যেন তিনিই মুখতার মাই!… দর্শক মুগ্ধ হয়ে স্মার্টফোনের ফ্লাশ জ্বালিয়ে যাচ্ছে।

নাটক শেষ হবার পর সঞ্চালক দর্শকদের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন এবার। ইংরেজি পর্বের দর্শক হয়ে এসেছেন যারা তাদের আশি শতাংশ বিদেশি কূটনীতিক, উন্নয়ন অংশিদার ও বহুজাতিক সংস্থার কর্ণধার। বলতে হয়, সকলেই অধিকার সচেতন।…

 

অভিমত পর্ব:

মন্তব্য দেবার আহ্ববান পেয়ে দর্শকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা লেগে গেলো। কে কার আগে হাত তুলবে, তার কাছেই চলে আসবে মাইক্রোফোন! এটি কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতা – দর্শকদের অভিমতের কোন মূল্য আছে বলে আমার মনে হয়নি। আমি প্রতিযোগিতায় যোগ দেবার মতো কোন তাগিদ পেলাম না। তবে দেখার আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে চাই নি।

প্রশ্ন ছিল অনেক দীর্ঘ এবং বহু-অর্থক। তবে প্রশ্নের মূলবক্তব্য ছিল অনেক এরকম: ‘নারী অধিকার রক্ষায় আমাদের করণীয় কী?’ সঞ্চালক মনে করিয়ে দিলেন, অন্যকে পরামর্শ না দিয়ে যেন নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়।

কে শুনে নিয়মের কথা! নানা জনের নানান কথা। এক ম্যাডাম বলে বসলেন, যারা মঞ্চে বসে আছেন, অর্থাৎ উন্নত দেশের রাষ্ট্রদূতেরা, তারাই এদেশের সরকারকে পরামর্শ দিন, চাপ দিন, যেন সরকার নারী অধিকারের প্রতি আরও সহযোগী হয়। সম্প্রতি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ বিষয়ক আইনে ‘বিশেষ ব্যবস্থায় বাল্যবিবাহ গ্রহণযোগ্য’ রাখার বিষয়টিকে তিনি ইশারা করছিলেন।

আরেকজন সংস্থাপ্রধান সোজা বলেদিলেন, নারীকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সিদ্ধান্তগ্রহণের সুযোগ করে দিলে নারী অধিকারের উন্নয়ন হবে। সাফ কথা। তার উত্তরে মনে হলো, তিনি একদম প্রস্তুত হয়েছিলেন এই প্রশ্নের জন্য।

শিক্ষার কথা শুনে আরেকজন ইস্মার্ট আপু প্রায় ক্ষেপে গেলেন। শিক্ষা? এটি কি শুধু নারীর একারই প্রয়োজন? পুরুষ তার শিক্ষার অভাবেই নারীকে মানুষ মনে করেনা। পুরুষ যদি প্রকৃত শিক্ষা পায়, তবে নারীকে তার যোগ্য মর্যাদা দেবে। তার মতে শিক্ষার প্রয়োজন নারী পুরুষ উভয়েরই। দর্শকের কর্তালি।

একজন বিদেশি ভাই বেশ মজা করে বললেন, সমস্যাটি নারীর নয়। নারীকে অবদমিত রাখা, তার অধিকারকে অবহেলা করা, একান্তই পুরুষের সমস্যা। এতে নারী কেন কেঁদেকেটে মরবে? যাদের সমস্যা তাদেরকেই সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। সবাই তাতে কর্তালি দিয়ে সমর্থন জানালো।

 

প্রেক্ষিত: নারী অধিকার

বাংলাদেশে যুক্তরাষ্টের রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাট একটি বিশেষ নাটকে অভিনয় করলেন সোয়া একঘণ্টা ধরে। সঙ্গে আরও ছ’জন। সবাই কোন-না-কোনদেশের রাষ্ট্রদূত! নাটকের নাম ‘সেভেন’। এর পূর্বের দিন হয়ে গেলো এর বাংলারূপ ‘সাত’এর মঞ্চায়ন। সেখানেও ছিলেন সুলতানা কামালসহ সাতজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব।

মুখতার মাই (পাকিস্তান), ফরিদা আজিজি (আফগানিস্তান), ইনেজ ম্যাকরম্যাক (উত্তর আয়ারল্যান্ড), ম্যারিনা পিসলাকোভা পার্কার (রাশিয়া), আনাবেলা ডি লায়ন (গুয়াতেমালা), মুসো চুয়া (কম্বোডিয়া) এবং হাফসা আবিওয়ালা (নাইজেরিয়া) – এই সাত নারীর প্রত্যেকেই একজন নাট্যকার। প্রতেক্যেই একটি করে সংগ্রাম করে এসেছেন।

’সেভেন’ নামের প্রামাণ্য নাটকটি আয়োজিত হয়েছে বিশ্বের সাত নারীর অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেবার জন্য। আফগানিস্তান, উত্তর আয়ারল্যান্ড, রাশিয়া, গোয়াতেমালা, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া এবং নাইজেরিয়ার সেই সাত নারী নিজেই লেখেছেন নাটকের সংলাপগুলো। নিজেরাই এর নাট্যকার। নিজেদের জীবনের।

এটি কোন সাধারণ নাটক নয়। এর অভিনেতাও মঞ্চ কিংবা চলচ্চিত্র থেকে আসেন নি। খেলা, অভিনয়, সাংবাদিকতা, কূটনীতি, রাজনীতি, ব্যবসায় ইত্যাদি ক্ষেত্রে যারা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, যাদের কথা মানুষ শুনবে, যাদেরকে দেখতে মানুষ হুমড়ি খেয়ে জমায়েত হবে – তাদেরকে নিয়ে মঞ্চায়িত হয় ‘সেভেন’। বাংলাদেশে বেশ কয়েকবার হয়েছে। চিত্রনায়িকা ববিতাকেও একটিতে দেখা গেছে।

এবছরের নারী দিবসকে কেন্দ্র করে এই আয়োজন। আয়োজক সুইডিশ এম্বেসি, এম্বাসেডরস ফর চেইন্জ এবং জাতিসঙ্ঘের নারী বিষয়ক সংগঠনসহ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা। সাংগঠিকভাবে আমন্ত্রিত হয়ে এই সুযোগ পেয়েছিলাম।

এই অসাধারণ অভিজ্ঞতাটি পাবার জন্য দিনভর গাধার খাটুনি খেটেও সাতটার শো ধরেছিলাম।

 

আমাদের দেশের নারীকে কীভাবে আরও সক্ষমতা দিয়ে দেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়?

শিক্ষার অভাব, ক্ষমতার অভাব, শিক্ষা দাও, ক্ষমতা দাও, ক্ষমতায়ন করো – এসব বিষয়গুলো আমার কাছে খুবই দায়সাড়া গোছের মনে হয়। লোক দেখানো। এগুলোতে মূল সমস্যাকে ঢেকে রাখা হয়েছে। দেশের অর্ধেক জনতাকে ‘অবলা’ রেখে একটি সমাজ এগুতে পারেনা। নারী দিবসের বাণী হোক, সুযোগ সৃষ্টি।

আমাদের সমাজে নারীর প্রয়োজন ‘সুযোগ’। সুযোগের অভাবে এখনও নারী অবলা (শক্তিহীন অর্থে) হয়ে আছে।আপনঘর থেকেই এটি শুরু হওয়া প্রয়োজন। তার পরিবার, এমনকি তার বাবাও তাকে সুযোগ দিচ্ছেন না। তার জন্মদাত্রী মাও দিতে ভয় পান। তার ভাই তাকে সুযোগ দিচ্ছে না, কারণ ‘মেয়ে মানুষের বিপদের শেষ নেই’।

নারীর প্রয়োজন শুধুই একটি সুযোগের। অংশগ্রহণের সুযোগ। নিজেকে গড়ে তোলার সুযোগ। কাজের সুযোগ। সুস্থ থাকার সুযোগ।যাতায়াতের সুযোগ। কথা বলা বা মতপ্রকাশের সুযোগ। কর্মসংস্থান, ব্যবসায়, রাস্তাঘাট, বাজার, সংবাদমাধ্যম সবজায়গায় নারীর জন্য জন্য একটু জায়গা।

স্বীকৃতিরও দরকার নেই, যত দরকার সুযোগের। সুযোগ পেলে স্বীকৃতি না পেলেও নারীর অর্জনকে দেখতে পাওয়া যাবে।

অনেক ক্ষেত্রে নারী নিজেও নিজেকে সুযোগ দিচ্ছেন না, নিজেকে তুলে ধরছেন না। নিজেকে দুর্বল দেখিয়ে তিনি সুবিধা নিতে চান। দুর্বলতাকে নারীত্বের প্রতীক হিসেবে দেখিয়ে তাতে সৌন্দর্য্য খুঁজছেন।

তো… কে দেবে এই সুযোগ? প্রথমত ‘আমি’নিজে। পিতা ‘আমি’, ভাই ‘আমি’, সহযাত্রী ‘আমি’, সহকর্মী ‘আমি’। তারপর পরিবার। তারপর সমাজ। তার পররাষ্ট্র। এবং অবশ্যই নারী নিজে!

 

 

———————–
*নোট: ভয়েসেস প্রজেক্ট নামে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন অধিকারকেন্দ্রিক নাটকগুলোকে জনপ্রিয়তা দিয়েছে। সঙ্গে আছে ইউএনউইমেন

Advertisements

তানিয়াদের সকাল: নারীর জন্য কি কাজ আছে?

স্বামীকে বিদায় জানিয়ে দরজাটি বন্ধ করার পর মুহূর্তেই অভিমান আর বিষণ্নতায় পেয়ে বসলো তানিয়াকে। তানিয়া আহমেদ। সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট। স্বামী পারভেজ আহমেদ। ব্যাংকার। একমাত্র সন্তানকে নিয়ে নিউক্লিয়াস পরিবার – সঙ্গে ভাইবোন মাবাবা কেউ নেই। সকলেই গ্রামে বা অন্য শহরে।

পৌরফোনে তানিয়ার চাকরির দশ বছর পূর্ণ হলো আজ। সহকর্মীরা আজ তাকে নিয়ে কী কী করতো, কে কী ভাষায় অভিনন্দন জানাতো তা-ই ভাবছেন তানিয়া, আর বাসন মাঝছেন। জানালায় আকাশ দেখছেন আনমনে। কতকিছুই না মনে পড়ছে তার আজ! পৌরফোনে চাকরিটা হবে যখন বুঝতে পারলেন, তখন থেকেই তিনি বুঝতে পারলেন যে চাকরিটা তার করা হবে না। চাকুরির ইন্টারভিউতে নিয়োগকারীই সাধারণত প্রশ্ন করে, শর্ত দেয় – তানিয়ার বেলায় ছিলো তার উল্টো। ছুটি হবে কি না, মা হতে পারবেন কিনা, যাতায়াতের জন্য ট্রান্সপোর্ট হবে কি না ইত্যাদি। প্রশ্নকারীরা বিস্মিত হলেও উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলেন, কারণ তানিয়ার স্পষ্টবাদিতা তাদের পছন্দ হয়েছিলো। তারা মজাই পাচ্ছিলেন। বেতন ভাতা ইনক্রিমেন্ট প্রমোশন ইত্যাদি বিষয়ে কোন আগ্রহই নেই তানিয়ার। তার আগ্রহ ছিলো কাজটি কেমন হবে, সেটা করতে পারবেন কিনা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিলো অফিস তার যাতায়াতের ব্যবস্থা করবে কি না। খুশিতে কাঁদতেছিলেন তানিয়া ইন্টারভিউ রুমেই। কারণ চাকরিটা তার হয়েই গেলো এবং তা তখনকার বাজারে বেশ মোটা-বেতনের চাকরিই বলা যায়। স্বামী তো খুশি এবং বিস্মিতও; যেন এই প্রথম পারভেজ বুঝতে পারলেন যে স্ত্রীরা স্বামীর চেয়ে বেশি বেতন পেলে সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। চাকরি করার আনন্দ আর না করতে পারার আশংকায় হাবুডুবু তানিয়া বেতনের পরিমাণ নিয়ে কখনও ভাবেন নি।

আজ দশম বছরে তানিয়াকে জানালায় তাকিয়ে কাঁদতে হচ্ছে। চাকরিটা আছে বলেই হয়তো তানিয়াকে কাঁদতে হচ্ছে। অথচ প্রতিবারই তানিয়া অফিস থেকে একটি লাল চিঠির আশংকা করেন। এভাবে কতদিন সে অফিসকে ঠকাবে? এভাবে কতদিন শুনতে হবে মেয়েরা ফাঁকিবাজ, যখনতখন অফিসে অনুপস্থিত থাকে? সিনিয়র সহকর্মীরা তাকে বড্ড ভালোবাসে, তাকে বুঝার চেষ্টা করে এবং সহমর্মীতা দেখায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সমপর্যায়ের সহকর্মীদের নিয়ে, যাদের নিয়োগ হয়েছে তারই সময়ে, তারা টিজিং করেই যাচ্ছে।

অমিতের জন্মের পর নির্ধারিত মাতৃ-ছুটির পরও তানিয়াকে একমাস বেশি ছুটি নিতে হয়েছিলো। এক সহকর্মী তো বলেই ফেললো, “বাব্বা! এতদিন পরও চাকরি থাকে! পরজনমে যেন নারী হয়ে জন্ম নেই, খোদার কাছে আমার এই প্রার্থনা!”

আরেক সহকর্মী তার চিরাচরিত শার্লকহোমস-টাইপের প্রশ্ন নিয়ে সেদিন চায়ের আড্ডাটিকে মাটি করে দিয়েছিলো। “আচ্ছা, এত অনুপস্থিত থাকার পরও আপনি এবার প্রমোশন পেলেন কী করে? বসও তো আপনাকে নিয়ে কোন কটুকথা বলতে শুনি নি!” তানিয়া এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে চান না। ছেলেরা ভালো করলে কোন প্রশ্ন নেই, সেটা স্বাভাবিকভাবে সকলে মেনে নেয়, কিন্তু মেয়েরা কর্মস্থলে সুনাম অর্জন করলে সকলেই সন্দেহের চোখে তাকায়। প্রতিষ্ঠানের জন্য এতো পরিশ্রম করেও তাকে নিরন্তর এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।

হঠাৎ অমিতের ‘আম্মু’ ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেলেন তানিয়া। অমিত ঘুম থেকে ওঠেছে। বাবার ভক্ত হলেও অমিত আজ মাকে বাসায় পেয়ে বেজায় খুশি। “জাহানারা খালা আসে নি কেন, আম্মু?” তানিয়া তার কী উত্তর দেবে? জাহানারা আসে বেড়িবাঁধের বস্তি থেকে। বিধবা জাহানারা গত দু’তিন মাস ধরে তানিয়াদেরকে সাহায্য করছে। তার প্রধান কাজ অমিতকে দেখাশুনা করা। ঠিক গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলো যে কীভাবে জাহানারা টের পেয়ে যায় সেটা তানিয়া আজও বুঝতে পারেন নি। যেদিন তানিয়ার অফিসে থাকার খুবই দরকার, ঠিক সেদিন জাহানারা আসে না! “আম্মু আম্মু, আবার যদি খালা না আসে তাহলে আব্বুকে বলো আমার সাথে থাকতে।” তা কী করে হয়! জাহানারা না আসলে তো তানিয়াকেই বাসায় থাকতে হবে। এই তো স্বাভাবিক। অমিতকে বুকে জড়িয়ে তানিয়া আরেকটি দিন অফিসের কথা ভুলে যাবার চেষ্টা করেন।

নারীর কথা: কেনো আমি একটি কর্মজীবন পাবো না?

আমি অনেকবার ভেবেছি জবটি করবো কি করবো না। অগণিত চাকরির প্রস্তাব আমি ফিরিয়ে দিয়েছি বিভিন্ন সামাজিক পারিবারিক ও যোগাযোগ সমস্যার কারণে। বর্তমান প্রস্তাবটি সব দিক দিয়ে উপযুক্ত মনে হচ্ছে। এটি আমার যোগ্যতা ও ব্যক্তিগত জীবন-দর্শনের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। সকল বিবেচনায় একটি উপযুক্ত চাকরি হওয়া সত্ত্বেও চাকরিটি আমি করবো কিনা, সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।

চাকরি করার পথে অনেকগুলো বাধার মধ্যে বড় দুটি বাধা হলো আমার মা হওয়া এবং আমার স্ত্রী হওয়া। আমি মা হতে চলেছি আগামি আট-ন’মাসের মধ্যে। প্রথমটি নিয়ে চিন্তিত নই, কারণ যে প্রতিষ্ঠানে যোগ দিবো, সেখানে মাতৃত্বকালীন ছুটি পাওয়া যাবে। তারপর একটি কাজের মানুষ যোগাড় করে নেবো। দ্বিতীয় বিষয়, আমার স্ত্রী হওয়ার বিষয়টিতে যে কেউ আঁতকে ওঠতে পারেন। তবে কি স্ত্রী হওয়া নারীর জন্য অস্বাভাবিক কিছু? না, তা মোটেই নয়। আমি মূলত আমার স্বামীর বিষয়টি মনে নিয়েই এ কথা বলেছি।

আমার স্বামীর কথা বলি। আমরা ভালোবেসে বিয়ে করেছি। তার যে বিষয়টিতে আমি বেশি দুর্বল ছিলাম, তা হলো নারীর প্রতি তার অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভক্তি। আমার স্বামী খুব মাতৃভক্ত মানুষ, এখনও বাড়িতে গেলে মায়ের হাতে ভাত খায়। নারী ঘর থেকে বের হয়ে কাজ করুক এবং দেশের কর্মশক্তিতে যোগ দিক এরকম মনোভাব সে সবসময়ই প্রকাশ করতো। রাস্তা-ঘাটে নারীর চলাচলে সামাজিক বাধা, পাবলিক বাহনে তাদের যাতায়াতের সমস্যা ইত্যাদি বিষয়ে আমার স্বামী সবসময়ই সোচ্চার।

এখনও তার মনোভাবের কোন পরিবর্তন দেখি না। কিন্তু আমার চাকরি করার বিষয়টি ওঠে আসাতে তাকে একদম নিশ্চুপ এবং নিরাবেগ দেখছি। এখন পর্যন্ত হ্যাঁ বা না কিছু পরিষ্কার করে বলছে না। “চাকরিটি কি করবো” এরকম প্রশ্নের জবাবে তার “হ্যাঁ, করো না!” জবাবে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না তার মনের কথাটি আসলে কী? এমনও নয় যে আমি তার বিশ্বাস ভঙ্গ করবো, কারণ নিজের সততায় আমার আত্মবিশ্বাস আছে। আমার স্বামীরও ওরকম আশঙ্কা আছে বলে মনে করি না।

সবমিলিয়ে এক কঠিন সময় অতিক্রম করছি আমি এখন। শুধুই চাকরি করবো বলে পড়াশুনা করি নি, কিন্তু শুধুই গৃহিনী হয়ে কিচেন মাস্টার হয়ে জীবন শেষ করবো – এরকম চিন্তাও করি নি। অন্যদিকে আমার স্বামীকেও আমি ভালোবাসি এবং আমি চাই সে ভালো থাকুক এবং তার কর্মজীবন গড়ে ওঠুক। এপর্যন্ত তার ক্যারিয়ারে বাধা সৃষ্টি করে এরকম কিছুই করি নি,বরং তাকে দিনের কাজের জন্য প্রস্তুত করতে যা-কিছু করণীয় সবই করে যাচ্ছি, যার বিবরণ এখানে শেষ করা যাবে না। আমি একজন সফল গৃহিনী থাকতে চাই, তাই বলে কি আমি একটি কর্মজীবন পাবো না?