Tagged: কর্মসংস্থান

কর্মসংস্থান: পৃথিবী ভিতুদের জন্য নয়…নিয়ম ভাঙ্গুন, চাকরি ধরুন!

কর্মসংস্থান নিয়ে অনেক দিন কিছু লেখা হচ্ছে না। এদিকে অনেক কথা জমে আছে পেটে! চাকুরির বাজারটা ক্রমেই ‘ট্রিকি’ হয়ে আসছে। চাকুরি প্রত্যাশী এবং চাকুরি দাতা উভয়েই এখন মহাসংকটে! আস্থার সংকট তো আছেই, চিরাচরিত সংকট হিসেবে আছে একে অপরকে না বুঝার সংকট। এটি যেন আকারে-প্রকারে শুধুই বড় থেকে বিকটতর হচ্ছে। এরকম একটি কঠিন সময়ে আমি প্রশাসন থেকে বিযুক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠানের মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগে এসে ল্যান্ড করলাম। এ বিষয়টি এর আগে প্রশাসনেরই অংশ ছিল। নতুন বোতলে পুরাতন জুস আর কী! সবই কর্তার ইচ্ছা!

আস্থার সংকটটি বুঝতে পারা যায় যখন বিধি মোতাবেক সমস্ত শর্ত মেনে আবেদন করার পরও ইন্টারভিউ কলটি আসে না। অথবা ইন্টারভিউ পর্যন্ত মোটামুটি ভালো করেও যখন, পরবর্তিতে কোন খবর আসে না, তখনই বুঝা যায় উভয়ের মধ্যে আস্থার অভাব আছে। এসময়ের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হলো, রেফারেন্স ছাড়া চাকরি না হওয়া। অথবা প্রথম ব্যক্তিটিকে ডিঙ্গিয়ে দ্বিতীয় তৃতীয় বা চতুর্থ এমনকি দশম ব্যক্তিটিকে চাকরি দেওয়া।

একে অন্যকে না বুঝার ব্যাপারটি আরও স্বাভাবিক – তবে দুঃসহনীয়। দু’টি পক্ষ অত্যন্ত আনুষ্ঠানিক পরিবেশে প্রার্থী নির্বাচন বা ‘চাকরিটি পাইতেই হবে’ – এরকম চাপ নিয়ে রোবটিক আলোচনায় লিপ্ত হলে, এখানে ‌’আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ না হবারই কথা। প্রথাগতভাবে ‘না বুঝার পরিস্থিতিটি’ সৃষ্টি করেন নিয়োগকর্তা এবং এর কুফল ভোগ করেন উভয়ই। এরকম পরিস্থিতিতে চাকরি প্রার্থী আত্মবিশ্বাসী হলে, পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে নিয়ে আসতে পারেন।

 

একটি কেইস স্টোরি শেয়ার করছি। রাইসুল হাসান স্বভাবত উগ্র না। কিন্তু একটি সিনিয়র পদে চাকরির ইন্টারভিউতে সে বুঝতে পারে নিয়োগকর্তাদের কথায় কোন ফাঁক আছে। ইন্টারভিউয়ারদের সামনে বসেই সে রাগে ফুঁসতে থাকে। সে সমস্ত নির্দেশ অনুসরণ করেছে এবং প্রত্যাশিত যোগ্যতার প্রায় সবগুলোই তার শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার সাথে মিলে গেছে। টেস্টেও সে ভালো করেছে। তবু ইন্টারভিউয়ারদের একজন তাকে যা বললেন, তা হাসান মেনে নিতে পারছে না। ‘মি. হাসান, ফ্রাংকলি স্পিকিং… আপনার এভরিথিং ওকে। কিন্তু কিছু বিষয় আমাদেরকে প্রসিড করতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’ কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে হাসান করণীয় নির্ধারণ করে। হাসান জানে, চাকরিটা তার এমনিতেই হচ্ছে না। তাই রাগের মাথায় রাইসুল হাসান বেশকিছু প্রশ্ন করে বসলেন নিয়োগকর্তাদের নাক বরাবর! প্রশ্নগুলোর অধিকাংশই প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি, কাজের ধরণ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কিত প্রশ্নগুলো স্বভাবতই কিছুটা আক্রমণাত্মক এবং স্পর্শকাতর হয়ে যায়। আর তাতে ‘ডিফেন্স’ করতে এগিয়ে আসেন বোর্ডের নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকা ভদ্রলোকটি। হাসান ধারণা করেছে, তিনিই হবেন প্রতিষ্ঠানের সিইও, কারণ উত্তরগুলো খুবই জুতসই এবং দায়িত্বশীল হচ্ছে। আইসব্রেকিং পর্ব শেষ! আস্তে আস্তে ইন্টারভিউর গোমট পরিবেশ হালকা হয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থায় চলে আসে। অন্যান্য ইন্টারভিউয়াররা ক্রমে কক্ষ ছাড়তে থাকেন। সিইও তার দুপুরের খাবার পিছিয়ে দেন। প্রায় দু’ঘণ্টার আলাপচারিতার বিস্তারিত সকল তথ্য এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। প্রাসঙ্গিক হলো, নিয়মভঙ্গ করে হাসান সেদিন রোবটিক আলোচনাকে ‘মানবিক সমঝোতায়’ রূপ দেয়। প্রশ্ন-উত্তর আর প্রতিপক্ষ-মুখী জিজ্ঞাসাবাদকে সমঝোতামুখী সংলাপে পরিণত করে। হাসানকে সাহায্য করেন প্রতিষ্ঠানের সিইও নিজে। রাইসুল হাসানের সরল কিন্তু তীক্ষ্ণ ও প্রত্যক্ষ প্রশ্নগুলোকে কর্তৃপক্ষ সততা ও পেশাদারিত্বের চিহ্ন হিসেবে দেখেছে। সঙ্গতকারণেই এর ফলাফল হাসানের পক্ষে চলে যায়।

রাইসুল হাসানের ঘটনায় অনেক প্রতিষ্ঠিত কিছু প্রথার ব্যতিক্রম হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যে নিয়মটি হাসান লঙ্ঘন করেছে, তা হলো ইন্টারভিউ বোর্ডে বিতর্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা। চাকরির ইন্টারভিউতে একটি প্রতিষ্ঠিত নিয়ম হলো, নিয়োগকর্তাদের সাথে বিতর্ক সৃষ্ট হয় এমন কথা বলা বা এমন প্রশ্ন করা যাবে না। তাতে সব ভেস্তে যাবে। কিন্তু হাসানের ব্যক্তিত্বে এবং কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিলো, যার কারণে প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেও নিজের পক্ষে তা কাজে লাগাতে পেরেছে।

অফিস এবং আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেও নিজের স্বকীয়তা তুলে ধরার বিষয়টি অনেক প্রার্থী মনে রাখতে পারে না। নিজস্বতা তো নেই-ই, নিজের সর্বনিম্নটুকু তুলে ধরতে ব্যর্থ হয় অনেকে। এই সমস্যার গোড়া অনেক গভীরে। যেতে হবে আমাদের স্কুলজীবনে, যেখানে নিজস্ব কিছু করা মানেই শিক্ষকের বেত আর মায়ের বকুনি। ইংরেজি অথবা গণিতকে ছোটকাল থেকেই ‘কঠিন বিষয়’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষকের কাছে জিম্মি থেকে আমাদের শিক্ষা জীবন শেষ হয়। তাই ব্যতিক্রম আমরা প্রায় জানি না।

 

এরকম সমাজ ব্যবস্থায় টিকে থাকা এবং নিজেকে অতিক্রম করা খুবই কঠিন। তবু কয়েকটি নিয়ম লঙ্ঘনের দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি। পৃথিবীর যাবতীয় বিধান, নীতিমালা আর চুক্তিনামা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে – চাকরি প্রার্থীর পক্ষে কেবল একজনই থাকে। তাই চাকরি প্রার্থীর পক্ষ থেকে কয়েকটি ব্যতিক্রম তুলে ধরা চেষ্টা করলাম। এগুলোই সব নয় – কেবলই দৃষ্টান্ত:

১) প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ছকে আবেদনপত্র ব্যতিত আর কিছুই গ্রহণযোগ্য হবে না -এনিয়মটি মানতেই হবে এমন নয়। ঘোষিত পদ এবং দায়িত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট ট্রেনিং বা অভিজ্ঞতার সনদ থাকলে তা যুক্ত করা যায়। প্রথম দর্শনই সেরা দর্শন।

২) সিভিতে ‌’আমি’ শব্দটি একদমই ব্যবহার করা যাবে না, এটিও খোঁড়া যুক্তি। চাকরির আবেদন মানেই হলো নিজেকে নিয়ে মার্কেটিং করা। যেখানে ব্যক্তিগত যোগ্যতাই প্রধান নিয়ামক, সেখানে অন্তত ৪/৫বার ‌’আমি’ ব্যবহারে মহাভারত অশুদ্ধ হয় না। আমি ব্যবহার করলে আবেদনপত্রটিকে বরং একটু ‘মানবিক’ দেখাবে। মানবিক হওয়াটা জরুরি। মানুষ যা পছন্দ করে, তার সবই প্রকাশ করতে পারে না! নিয়োগকর্তারা সকলে জানেন না, তারা কিসে সন্তুষ্ট হবেন।

৩) ‘আপনার সমস্ত কাজের/চাকুরির বিবরণ দিন।’ কী দরকার আছে এত কিছু বলার? সমস্ত কর্মজীবনের ইতিহাস তাদেরকে জানিয়ে কী লাভ! তার পরিবর্তে এই কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা/ কর্মসংস্থানের বিবরণ তুলে ধরা যায়।

৪) ‘আগ্রহীদেরকে নিম্নের ঠিকানায় আবেদনপত্র পাঠাতে অনুরোধ করা হলো।’ এভাবে নিয়ম পালন করে অনেকেই তার সিভিখানি প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যক্তির হাতে পৌঁছাতে পারে নি। দোষ দিয়েছে ডাকবিভাগের অথবা নিজ কপালের। পরামর্শ হলো, তাদের নির্দেশিত ঠিকানা ছাড়া আরও কোন সরাসরি পথ আছে কিনা, তা খুঁজে বের করতে হবে। অনেকে নিয়োগকর্তার নামটি সংগ্রহ করে একদম তার নাম উল্লেখ করে আবেদনপত্র পাঠায়। ইন্টানেটের যুগে নাম বেরা করা খুব কঠিন নয়। নিয়োগকর্তা যদি সত্যিই উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে বের করতে চান, তবে বিশেষ মাধ্যমে পাঠানোর কারণে আপনার আবেদনপত্রটি বাতিল হবে না। বরং আলাদা গুরুত্ব পেতে পারে।

৫) ‘অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ প্রার্থীর অযোগ্যতা বলে বিবেচিত হবে।’ হতেই পারে। তবে পরিস্থিতি বুঝে এখানেও কিছু কৌশল খাটানো যায়। কোন রেফারেন্স না দিয়ে নিজের যোগ্যতার বিবরণ দিয়ে এবং কোন পদের উল্লেখ না করে – নিয়োগকর্তাকে একটি ইনফরমাল চিঠি পাঠানো যায়। গৃহীত হলেও চমৎকার, না হলেও প্রার্থীর ফাঁসী হবে না!

৬) ‘আপনার বেতনের ইতিহাস তুলে ধরুন।’ বললেই হলো? সংশ্লিষ্ট পদে তারা কী পরিমাণ বেতন দিয়েছেন, তা কি তারা কখনও জানাবেন? কখনও না। তবে কেন নিজের ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে নেগোশিয়েটিং স্ট্রেংথ কমানো? এসব ক্ষেত্রে মিথ্যা বিবরণ দিলে কিন্তু বুমেরাং হতে পারে। তবে সত্যটি গোপন করা যায়।

৭) ‘আমরা প্রশ্ন করবো, আর আপনি শুধু উত্তর দেবেন’ এরকম একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু নিয়োগকর্তাদেরকে এতো সুযোগ দিয়ে নিজেকে ‘ভেড়া’ বানাবেন না। একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে পরবর্তি প্রশ্নটির জন্য বোকা হয়ে বসে থাকবেন, সেটি না করলেও চলবে। উত্তর দিন, তবে সুযোগমতো প্রশ্নও করুন। অনেক সময় প্রশ্নকর্তাদের মধ্যেও বিরতি থাকে। বিনয়কে অস্ত্র হিসেবে ধারণ করে সেসব বিরতিতে নিজেকে প্রবেশ করাতে হবে। সাধারণত, প্রশ্ন যে করে, চালকের আসনে সে-ই থাকে।

 

ইন্টারভিউ বোর্ডে ‘সবই ঠিক আছে’ বা ‘আমি রাজি’ গায়ে পড়ে এমন মনোভাব দেখানোর চেয়ে নিজের সামর্থ্যটুকু দেখানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে মনে করেন, ইন্টারভিউ বোর্ডে প্রশ্ন বা কোন প্রকার জিজ্ঞাসা করলে তাতে কাজটির প্রতি প্রার্থীর অনীহা প্রকাশ পাবে। অথবা, নিয়োগকারী নাখোশ হতে পারেন। নিয়োগকারীকে খুশি করার চেষ্টা না করে, সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতে হবে। তারা আনন্দ পেতে বসেন নি, উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে পাবার জন্য বসেছেন।

কাজটি পেলেই করবো। নির্বাচিত হলেই ওই বিষয়ে পড়াশুনা শুরু করে দেবো। এরকম শর্তে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে, পছন্দের প্রতিষ্ঠান/কাজটিকে লক্ষ্য করে আগে থেকেই কিছু জেনে রাখাটা বুদ্ধিমানের কাজ। ‘আপনার কোন জিজ্ঞাসা আছে?’ এরকম সুযোগে তখন কার্যকর কিছু জিজ্ঞেস করা যাবে। তাতে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রার্থীর ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পায়। নিয়োগকর্তাদের মনে আস্থার সৃষ্টি হয়। প্রশ্নে ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। উত্তরের মধ্য নয়, প্রশ্নের মধ্য দিয়ে মানুষকে চেনা যায়।

একটি সফলতা পরেরটিকে এগিয়ে নিয়ে আসে। ইন্টারভিউ বোর্ডে বেয়াদবি করার দরকার নেই, সেটি যোগ্যতার অংশ নয়। নিয়োগকারীর প্রশ্ন আক্রমণাত্মক হলেও মনে করতে হবে, এর অন্য কোন অর্থ আছে। রেগে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ সৃষ্টি করলে, সেটি ভালো ফল নিয়ে আসবে না। বরং নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক অনুভূতির সৃষ্টি হবে, যা পরবর্তি প্রচেষ্টায় প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রশ্নের উত্তরে যথাযথ আচরণ করাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর জানতে হবে এমন কোন কথা নেই, সেক্ষেত্রেও নিজেকে ধরে রাখতে হবে। এখানে লজ্জার কিছু নেই। আবার অতি বিনয়কে তারা লাজুক বা অন্তর্মুখী স্বভাব হিসেবে ধরে নিতে পারেন। তাই বিনয়ের অবতার হয়ে জানা বিষয়টিকেও এড়িয়ে গেলে কোন ফল হবে না। একেকটি প্রশ্ন একেটি সুযোগ।

যেকোন প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে আত্মবিশ্বাস একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বায়বীয় বিষয়। মনস্তাত্ত্বিকদের কাছে আত্মবিশ্বাস হলো বিশ্বাসের মধ্যে। আপনি ততটুকুই আত্মবিশ্বাসী যতটুকু আপনি মনে করেন। আরেকটি নিয়ম হলো, আত্মবিশ্বাস কেউ দিয়ে দেয় না, নিজে থেকেই অর্জন করতে হয়।

সমাজে প্রকৃত নেতার খুবই অভাব। কিন্তু আত্মবিশ্বাস নেতৃত্বদানের জন্য প্রধান নিয়ামক। চাকরি প্রার্থীকে মনে রাখতে হবে যে, ইন্টারভিউ বোর্ডে আত্মবিশ্বাস তার যোগ্যতারই অংশ। ওটি না দেখাতে পারলে, উত্তর সঠিক হলেও তা পালে বাতাস পাবে না।

চাকুরির বাজার যেন একটি গ্ল্যাডিয়েটরস থিয়েটার! যোগ্যতা দেখিয়ে চাকরি পাওয়া একটি নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া, তাতে সন্দেহ নেই। বর্তমান চাকরির বাজারটি আরও অমানবিক হয়ে যাচ্ছে। প্রার্থীর প্রচেষ্টা থাকবে মানবিক হবার এবং যতটুকু সম্ভব ঘরোয়া পরিবেশ ফিরিয়ে আনার।

এসব ক্ষেত্রে যেসব বিধি-বিধান বা নিয়ম-নীতি আছে, তার প্রায় সবই নিয়োগকারীর অনুকূলে। বুদ্ধিমান প্রার্থীরা দু’টি কাজ করেন: ১) নিজের মতো করে সেগুলো অনুসরণ করেন অথবা/এবং ২) সুযোগমতো এড়িয়ে চলেন। ভুলে গেছি, ব্যস্ততার কারণে সার্কুলারটি ভালোভাবে পড়ার সুযোগ হয়ি নি অথবা আমি তো কেবল আজই জানলাম – সাথে সাথে আবেদন করলাম। এসব বলেও কিছু বিধান এড়িয়ে যেতে সক্ষম হন অনেক প্রার্থী। প্রার্থীকে শুধু মানবিক হবার চেষ্টা করলেই, অনেক নিয়মকে তিনি এড়িয়ে যেতে পারেন।

 

শেষ কথা: বিষয়টিতে আরও আলোচনার প্রয়োজন আছে। কর্মসংস্থানের মৌলিক সমস্যাগুলো এই পোস্টে পর্যাপ্ত আলোচিত হয় নি। কর্মসংস্থান বা চাকুরি পাবার সাথে জড়িত প্রধান বিষয়গুলো হলো: দক্ষতা, যোগ্যতা এবং ব্যক্তিত্ব। সম্পূর্ণ বেকারত্বের চাপ নিয়ে ভালো চাকুরির জন্য নেগোশিয়েশন করা যায় না। তাই নতুনদের কাছে পরামর্শ হলো, প্রারম্ভিক কোন কাজে যুক্ত হয়ে প্রাথমিক কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা। আত্মবিশ্বাস এবং সংশ্লিষ্ট চাকরিটি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা থাকলে প্রার্থী যেকোন ব্যতিক্রম করতে পারেন। ব্যতিক্রমের লক্ষ্য হতে হবে: মানবিক এবং নৈকট্য সৃষ্টি করা। নিয়মের ব্যতিক্রম করাই যেন একমাত্র লক্ষ্য না হয়।

 

৩ সেপটেম্বর ২০১৪। পাবলিক ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া

Advertisements

নিজেই নিজের লেখার প্রকাশক: কেন হবেন, কেন হবেন না

নিজের অখাদ্য লেখাগুলো কেউ নিজ খরচে বই বানিয়ে প্রকাশ করে দেবেন এবং সেটি বাজারজাত করবেন, এটি ভাবতেই পুরাতন গল্পটি মনে পড়ে যায়। গল্পটি সবারই জানা। প্রকাশকের দৌরাত্ম্য এবং লেখকের সৃষ্টির প্রতি অবহেলার সেই মর্মন্তুদ কাহিনি। লেখা প্রকাশ তো দূরে থাক, লেখা পড়েই দেখেন না অহংকারী প্রকাশক। লেখক অপেক্ষার প্রহর গুণেন। কাজহীনতায় এক দুঃসহ জীবনে পতিত হন লেখক। অপেক্ষার জীবন কঠিন। প্রেমিকাও অবিশ্বাস করতে শুরু করে। অবশেষে হয়তো আসলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। লেখা প্রকাশ পেলো। সেই লেখা পাঠকপ্রিয়তাও পেলো।  শুধু পাঠকপ্রিয়তা নয়, বলা যায়, রাতারাতি প্রসিদ্ধ লেখকে পরিণত হলেন সেই নবীন কবি। কিন্তু হায়, এতদিন নিজের সৃষ্টির প্রতি অপমান আর অপ্রকাশিত থাকার বেদনা সইতে না পেরে হতভাগা লেখক কিছুদিন আগেই পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। আত্মহত্যা নাকি স্বাভাবিক মৃত্যু সেই বিতর্ক থাকুক। কী হলো সেই কবির জীবনে? মরণোত্তর পুরস্কার!

 

বর্তমান বাজারে লেখার ‘শতভাগ’ প্রকাশক পাওয়া প্রায় অসম্ভব একটি বিষয়। এজন্য অনেকেই প্রকাশক বা সম্পাদকের পথে পা মাড়াতে চান না। নিজেই নিজের লেখার মুগ্ধ পাঠক!  বই বানিয়ে মলাট দেখতে চান, গন্ধ নিতে চান নিজের বইয়ের, পেতে চান অটোগ্রাফ দেবার আনন্দ। লেখক হিসেবে একটি অতি স্বাভাবিক একটি চাওয়া। ভার্চুয়াল জগতের বন্ধুপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ হয়তোবা ছাপার খরচ যুগিয়ে নিয়েছেন। কেউ অপেক্ষা করছেন সময়ের। কিন্তু এটি কি সবার ক্ষেত্রে ভালো ফল দিয়েছে? প্রশ্ন থাকলো পাঠকের কাছে।

 

প্রকাশকেরা প্রথমেই যা দেখতে চান, তা হলো বিক্রয়যোগ্যতা বা বইটি বিক্রি হবার সম্ভাবনা। কোন কারণে বইয়ের লেখক আগে থেকেই বিখ্যাত হলে প্রকাশকদের সেই আশঙ্কা অনেকটাই কেটে যায়। এসব ছাড়াও বইয়ের প্রকাশক পাওয়া যায়, যদি লেখার মান থাকে প্রশ্নাতীতভাবে ভালো। ভালো একজন জামিনদার থাকলেও বইয়ের প্রকাশক পাওয়া যায়।  কোন বেস্টসেলার বইয়ের লেখক যদি একটি রিভিউ লেখে দেন অথবা একটি সুপারিশপত্র, সেটিও প্রকাশকের মনকে বিগলিত করে।

 

self_publishing

প্রশ্নটি হলো, নবীন লেখক কোন পথে যাবেন। নিজের লেখা নিজেই প্রকাশ করবেন, নাকি প্রকাশকের দ্বারস্থ হবেন?  দু’টি পথেরই ভালোমন্দ দিক আছে। প্রথার বিপরীতে যেতে হলে প্রথাটি প্রথমত জানতে হয়। অর্থাৎ যারা প্রকাশকের মাধ্যমে বই প্রকাশ করেছেন, তারা কেন করেছেন কীভাবে করেছেন, সেটি মূল্যায়ন করে দেখা উচিত।

 

প্রকাশকের মাধ্যমে বই প্রকাশ

প্রকাশকের মাধ্যমে বই প্রকাশ করা একটি প্রচলিত এবং স্বাভাবিক উপায়, কারণ একই সাথে কন্যা এবং বরের বাবা হওয়া যায় না। বিখ্যাত বইয়ের লেখক হওয়া আর বইয়ের বাজারজাত করা এক নয়। ভালো লেখক আর ভালো বিক্রেতা দু’টি ভিন্ন বিষয়। প্রকাশক পাওয়া মানে লেখার প্রথম স্বীকৃতি পাওয়া। তাই প্রসিদ্ধ প্রকাশকের দায়িত্বে বই প্রকাশ করতে পারা একটি সৌভাগ্যের বিষয়।

কিন্তু সৌভাগ্য তাদেরই, যারা পরিশ্রম করতে এবং ধৈর্য্য ধরতে পারেন। প্রত্যাখ্যাত হবার বেদনাকে মেনে নিতে হয়, হতাশাকে হজম করতে হয়। বিখ্যাত কিশোর সাহিত্যিক এবং হ্যারি পটার সিরিজের লেখক জেকে রলিং কমপক্ষে বারোটি প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। শেষে কোন এক প্রকাশকের কন্যার সাহায্যে তিনি সুদৃষ্টি পেয়েছিলেন। তার পরের সবই ইতিহাস। লর্ড অভ্ ফ্লাইস-এর লেখক উইলিয়াম গোল্ডিংও একুশ বার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। গোল্ডিং-এর দৃষ্টান্ত থেকে বুঝা যায় যে, সাহিত্যে নোবেল পাওয়া লেখকেরাও প্রকাশক কর্তৃক নিগৃহীত হতে পারেন। বাংলা ভাষার অনেক কবি-লেখক আছেন, যাদের প্রতিভা প্রথম দৃষ্টিতে প্রকাশকের আনুকূল্যতা পায় নি। কিন্তু প্রকাশকের অবহেলা প্রকৃত লেখককে থামাতে পারে না, বরং প্রেরণাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।

প্রত্যাখ্যান ‘লেখক চরিত্রকে’ গড়ে তোলে, কারণ এটি লেখককে নিজ লেখায় পুনরায় দৃষ্টি দিতে বাধ্য করে। প্রতিটি অস্বীকৃতি লেখককে সমালোচকের স্তরে নামিয়ে দেয়, যা লেখার উন্নয়নে সহায়তা করে।  কারাজীবন যেমন রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরীক্ষা, তেমনই প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে লেখকের ‘লেখক সত্ত্বার’ পরীক্ষা হয়। কিন্তু প্রত্যাখ্যাত বা উপেক্ষিত হবার ভয় লেখকের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। লেখককে প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হয়।

 

প্রকাশক পাবার পরও লেখকের পরীক্ষা শেষ হয় না। সকল পরীক্ষাকে অতিক্রম করার পর শুরু হয় নতুন পরীক্ষা । সেটি হলো, প্রকাশকের মতের সাথে এবং তার শেডিউলের সাথে তাল মেলাতে পারা।  লেখকের কাছে তার লেখা অমূল্য এবং প্রশ্নাতীত, কিন্তু প্রকাশকের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ পাঠকমুখী। এই দ্বন্দ্বকে মেনে নিয়ে ডেডলাইন মোতাবেক লেখাটি শেষ করতে পারাও লেখকের জন্য বড় পরীক্ষা।

প্রকাশকের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকক্ষেত্রেই লেখার পাঠকপ্রিয়তাকে বাড়িয়ে দেয়। তার অভিজ্ঞ সম্পাদনায় একটি কাঁচা লেখা পাঠকের চোখে পরিচ্ছন্ন এবং দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে।

ভাষাগত শুদ্ধতার বিষয়টি একজনের পক্ষে নিশ্চিত করা কঠিন। সম্পাদকের পক্ষপাতহীন কাটাছেঁড়ায় একটি লেখা পায় ভাষাগত শুদ্ধতা।  লেখক লেখেন আবেগ আর অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে, কিন্তু সম্পাদক পড়েন সহস্র পাঠকের দৃষ্টিতে।

এখানে বইয়ের দান্দনিক বিষয়টির জন্যও প্রকাশকের দরকার। প্রকাশক জানেন কীভাবে প্রচ্ছদ, ছবি, অক্ষরবিন্যাস এবং পৃষ্ঠাবিন্যাসের সমন্বয়ে একটি বই মানসম্মত ও পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আইনি মারপ্যাঁচ। লেখকের সব লেখাই যে সৃজনশীল, গঠনমূলক এবং সামাজিকভাবে অনুকূল হবে তা নয়। লেখকের চোখে বিষয়গুলো অধরা থেকে যেতে পারে। অভিজ্ঞ প্রকাশক নিশ্চিত করেন যে, লেখকের সৃষ্টি পাঠক-উপযোগী।

প্রকাশক নৈতিকভাবেই লেখকের গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক এবং তার গ্রন্থস্বত্ত্বের রক্ষক।  তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি আর্থিক দায়দায়িত্বের অংশীদার। বই বাজার না পেলে সাধারণত প্রকাশক দায় নেন।

 

বাস্তবতার সাথে যুদ্ধ করে এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা নিয়ে একেক প্রকাশনা সংস্থা একেকটি বিক্রয়যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। তাদের আছে পুস্তক ব্যবসায়ীদের সাথে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, পরীক্ষীত সম্পর্ক। আছে অভিজ্ঞ কর্মীবাহিনি। লেখক-সুলভ আত্মগরিমা তাদের নেই।  বিপরীতে আছে বই বিক্রি করে ব্যবসায় টিকে থাকার তাড়না।

আমরা দেখতে পাই যে, প্রকাশকের পৃষ্ঠপোষকতা লেখককে প্রেরণা দেয় আরও লেখার জন্য। ব্যবসায়িক লাভের কারণেই লেখার মান বৃদ্ধি পায়। অতএব বই লেখে বৃহত্তর পাঠক সমাজে পরিচিতি পেতে চাইলে প্রকাশকের বিকল্প নেই।

 

 

নিজেই নিজের লেখার প্রকাশক

এখানে বিবেচ্য বিষয়টি হলো লেখকের স্বাধীনতা। লেখক স্বভাবতই স্বাধীনচেতা এবং সমাজের পথপ্রদর্শক। পরাধীন আত্মা কখনও ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক হতে পারে না।  তাহলে সক্রেটিস আর গ্যালিলিওরা আজ অচেনাই থেকে যেতেন।  কোন কালজয়ী লেখক তার প্রকাশকের পছন্দমতো গড়ে ওঠেছে এরকম নজির আমরা পাই না।

লেখকই প্রকাশক নির্বাচন করেন, প্রকাশক লেখককে নয়। সুলেখক মানে হলো, নির্ধারকের ভূমিকায় তারাই থাকবেন। পথিকই পথের সৃষ্টি করেছে।

লেখক বৃহত্তর পরিসরে তার গ্রন্থের ভবিষ্যতকে দেখতে পান। প্রকাশকের মুনাফামুখী দৃষ্টি কেবল বর্তমানকেই দেখতে পায়। দূর ভবিষ্যত তাদের কাছে তত গুরুত্বপূর্ণ নয়। দেশের স্বশিক্ষিত দার্শনিক আরজআলী মাতুব্বরের লেখা জনসমক্ষে এসেছে তার মৃত্যুরও পর।  প্রকাশক কোথায় ছিলেন!

লেখকই উত্তম প্রকাশক হতে পারেন, কারণ প্রকাশকেরা একদেশদর্শী।  শুধুই পাঠকের পছন্দের কথা তারা ভাবেন।  পাঠকের মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়নের বিষয় তাদের কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। অপমান করে লেখককে তাড়িয়ে দেবার মুহূর্তকাল পরেই তারা একই লেখকের পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেছেন, এরকম দৃষ্টান্ত আছে।

তাই, যদি নিজের পছন্দের লেখা প্রকাশ করতে হয় এবং যদি তাতে প্রকাশকের সমর্থন পাবার সম্ভাবনা না থাকে, তবে নিজের লেখার প্রকাশক নিজে হওয়াই উত্তম।

 

অন্যদিকে, রয়্যালটি বা লেখকের আর্থিক প্রাপ্তিটুকুও আজকাল কমে গেছে। যেমন: শিক্ষকদের মানোন্নয়নের জন্য একটি বইয়ের রয়্যালটি দশ শতাংশের বেশি নয়! লেখক যখন নিজেই পাঠক, বিক্রয়ের টাকাও সবটুকুই তার। অবশ্য লোকসানের দায়ও লেখকেরই!

এক্ষেত্রে লেখকের সিদ্ধান্তে বাধা দেবার কেউ নেই। নিজের বইয়ের প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে এর মূল্য নির্ধারণ পর্যন্ত সবটুকু প্রক্রিয়ায় লেখকই সর্বেসর্বা। বইয়ের বিষয় নিয়েও মাতব্বরি করার মতো তার ওপরে কেউ নেই। অবশ্য লেখার বিষয় যদি বিতর্কিত হয়, তবে নিজে এর প্রকাশক হওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্পও নেই।

 

কিছু বিষয়ে নিজের প্রকাশক হওয়া ছাড়া তেমন কোন পথ থাকে না। নতুন কোন আবিষ্কার অথবা অনুসন্ধান/গবেষণার প্রেক্ষিতে কোন বই লেখলে, তাতে প্রকাশক ঝুঁকি নিতে চাইবেন না। এক্ষেত্রে লেখকের প্রকাশক হওয়া ছাড়া গত্যান্তর নেই।

যারা ‘টিউন/হাউ টু’ টাইপের লেখক (যথা: ঘরে বসে আয় করুন; নিজেই এসইও শিখুন; ই-মার্কেটিংয়ের ৭টি পদ্ধতি; ধনী হবার ১০টি সহজ উপায় ইত্যাদি) তারা নিশ্চিন্তে বই বের করতে পারেন। নিজেই।

 

 

উভয়দিকেই একটি মিল আছে।  তা হলো লেখার মান এবং পাঠকের গ্রহণযোগ্যতা।  লেখার বিষয় মৌলিক হলে, কনটেন্ট ভালো থাকলে এবং পুস্তক ব্যবসায়ীদের সাথে সামান্যতম যোগাযোগ থাকলে নিজেই প্রকাশক হওয়া যায়। আর্থিক সঙ্গতি থাকলে আর্থিক সাফল্যও লেখক একাই ভোগ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে ‘প্রকাশকের কর্তব্য’ সম্পর্কে লেখককে সজাগ থাকতে হবে।  তখন নিজেকে শুধু লেখক ভেবে ঘরে বসে থাকলে চলবে না। লেখকরা স্বাধারণত অন্তর্মুখী স্বভাবের হয়ে থাকেন; তারা কতটুকু প্রকাশক হয়ে ওঠতে পারবেন, নিজেরাই বুঝতে পারবেন।  অন্তর্মুখী লেখকদের জন্য প্রকাশকই উদ্ধারকর্তা।  লেখার মান ভালো থাকলে এবং পেশাদারী রীতিতে নিজেকে প্রকাশ করতে চাইলে, প্রকাশকের বিকল্প নেই। তবে জুতসই প্রকাশক পেতে হবে।  প্রসিদ্ধ প্রকাশকের আস্থা অর্জনের জন্য প্রয়োজনে এক যুগ অপেক্ষায় থাকা যায়।  আজকাল তো অপেক্ষায় থাকতে হয় না, অনলাইন এবং অগণিত দৈনিক বা সাপ্তাহিক পত্রিকায় অথবা লিটল ম্যাগাজিনে লেখা প্রকাশ চলতেই পারে।  পরে সেগুলোকে স্মারক হিসেবে নিয়ে প্রকাশকের আস্থা অর্জনে ব্যবহার করা যায়। (১ মে ২০১৬)

 

 

[সামহোয়্যারইন ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া: ৪ মে ২০১৬]


টীকা:
১) লেখক প্রকাশকের পার্থক্যটি আজকাল ঠিক আগের মতো আছে কিনা যাচাই করা যেতে পারে।  কিছু প্রকাশক আছেন, যারা নবীন লেখকদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা দেবার মহৎ উদ্দেশ্যে লেখকের খরচেই বই প্রকাশ করেন। এসব ঊন-প্রকাশকের নাম যথাস্থানে যথাগুরুত্বেই থাকে। বইয়ের লাভ হলেও সেখানে সিংহভাগ তারাই নেন, কারণ তারা নবীন লেখককে পরিচিত করিয়ে বিশাল মহৎ কার্য সাধন করেছেন।  কিছু লেখকও লেখক থাকেন না, বনে যান প্রকাশক।  এটি ভালো নাকি মন্দ, সেটি অবশ্য অন্য বিতর্ক।

২) শুরুতে দু’একবার প্রত্যাখ্যাত হওয়া যেন বিরহ প্রেমের স্মৃতি। এটি না হলে যেন প্রেম থাকে অপূর্ণ! প্রেমিক হওয়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়। অনেক লেখক একে উপভোগ করেছেন। সেসব দুঃসময় নিয়ে সৃষ্টি করেছেন নতুন লেখা।

৩)  কিছু সাইট আছে, যারা এসব বিরহকে গেঁথে তুলছে নতুন লেখকদের প্রেরণার জন্য। প্রত্যাখ্যাত লেখকদের অভিমতও তারা প্রকাশ করে। এরকম একটি সাইট: প্রত্যাখ্যাত সাহিত্য যা পরবর্তিতে বেস্টসেলার হয়।

 


twl-flow-chart-featured

নিজেই প্রকাশ করবেন, নাকি প্রকাশকের দ্বারস্ত হবেন, এবিষয়ে

সিদ্ধান্ত নেবার জন্য চমৎকার একটি মন-পরীক্ষা আছে।

পাঁচ মিনিটের আত্মপর্যালোচনা: এখনই দেখে নিন!

১১টি দক্ষতা, যা শেখা কঠিন কিন্তু জীবনের জন্য দরকারি

বাজারে অনেক রকমের দক্ষতার সদাই হয়।  মানুষ আজ কত দক্ষ হয়ে ওঠছে, সেটি বিশ-ত্রিশ বছর আগের মানুষের সাথে তুলনা করলেই বুঝা যায়।  কিন্তু পরিতাপের বিষয়টি হলো, মানুষ একদিক দিয়ে দক্ষ হচ্ছে, অন্যদিক দিয়ে সম্পর্কগুলো নষ্ট হচ্ছে।  বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, পরিবার ভেঙ্গে যাচ্ছে, ডিভোর্সের হার বেড়ে যাচ্ছে।  উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষের বড় ক্ষতিটি হলো, নিজের ক্যারিয়ার ধ্বংসের মুখে পড়ে যাচ্ছে। তাই তথাকথিত দক্ষতাগুলো থেকে নিজেকে একটু ভিন্ন অবস্থানে রাখা উচিত।

পুনরাবৃত্তি হলেই দক্ষতা চলে আসে।  অথবা বাস্তব জীবনে চর্চার মাধ্যমে আসে।  কিন্তু কিছু দক্ষতা আছে, যা কর্মজীবীদের প্রশিক্ষণ ম্যানুয়ালে তেমন নেই।  কিছু বিষয় আছে, যা প্রচলিত অর্থে দক্ষতা নয়, কিন্তু দক্ষতার চেয়েও বেশি সুফল এনে দেয়।  সেগুলো একটু কঠিন, কারণ শুধু পুনরাবৃত্তি দিয়ে হয় না, উপলব্ধি আর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে আসে।  কঠিন হলেও এসবের অনেক উপকারিতা আছে।

 

-চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা-

-অপ্রয়োজনীয় আলাপ বা অন্যের সম্পর্কে গালগপ্পো নিয়ন্ত্রণ করতে পারা-

-নিজের কাজে মনসংযোগ রাখতে পারা-

-অন্যকে শোনা-

-কোন সময় চুপ থাকতে হয় সেটি বুঝতে পারা-

-নিজের সাথে ইতিবাচক কথোপকথন-

-অভ্যাসের ধারাবাহিকতা-

-অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়া-

-সময় ব্যবস্থাপনা-

-অন্যের প্রতি সহানুভূতি থাকা-

-ঘুমের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা-

✿✿✿✿✿✿✿

 

 

1313-crop

১১)  চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা

আমরা আমাদের চিন্তারই ফসল। আমরা যা ভাবি যেভাবে ভাবি, আমাদের আচরণ তা-ই প্রকাশ করে। প্রথমত চিন্তাকে যাচাই করতে হয়, যেন সেখানে ক্ষতিকারক কিছু না থাকে।  চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে, আমরা যা করতে চাই তা করতে পারি।

কিন্তু সকলেই যা করতে চায় তা করতে পারে না। এজন্য বলা হয়, সবাই ভালোভাবে ভাবতে পারে না।  অথবা, সবাই ভালোভাবে তাদের চিন্তাকে প্রকাশও করতে পারে না। চিন্তাকে সুষ্টুভাবে প্রকাশ করতে পারলেই একে নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতা চলে আসে।

এর সাথে আরেকটি দক্ষতা জড়িয়ে আছে: সকল অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকার দক্ষতা।  এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দক্ষতা।  মিথ্যা আত্মসন্তুষ্টি নয়, কিন্তু পরিস্থিতিকে ঠাণ্ডা মাথায় মূল্যায়ন করে করণীয় নির্ধারণ করতে পারা।

অতীত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে শুদ্ধ করাই হলো ভালো চিন্তার ফল।

 

১০)  অপ্রয়োজনীয় আলাপ বা অন্যের সম্পর্কে গালগপ্পো নিয়ন্ত্রণ করতে পারা

মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সম্পর্ক।  টাকাকড়ি সবই হারালে পাওয়া যায়, কিন্তু সম্পর্ক হারালে তা কখনও পূর্বের অবস্থায় পাওয়া যায় না। তাই সম্পর্ক গড়া এবং রক্ষা করা জীবনের জন্য খুবই দরকারি।

সম্পর্ক রক্ষার জন্য প্রথম শর্ত হলো আস্থা। অনেকের মতে, এই আস্থাকে নষ্ট করে ফেলার জন্য প্রথমে দায়ি হলো, পেছনে কথা বলার অভ্যাস।  কারও অনুপস্থিতিতে তার বিষয়ে নেতিবাচক আলোচনা করলে তাতে আস্থা নষ্ট হয়ে যায়।

কিন্তু মজার বিষয় হলো, অন্যের পেছনে কথা বলা খুবই মজার এবং তাতে দ্রুত কারও বন্ধু হয়ে যাওয়া যায়। প্রবাদে আছে, দু’জনের শত্রু একই ব্যক্তি হলে সেই দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব অনিবার্য। কিন্তু সম্পর্ক ও আস্থার দিক থেকে এটি খারাপ একটি অভ্যাস। একজনের সাথে শত্রুতা অনেকের সাথে আস্থার সংকট সৃষ্টি করতে পারে।  তাই অন্যের পেছনে আলাপ নিয়ন্ত্রণ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।

এসব পরিস্থিতিতে যা করতে হয়, তা হলো নিশ্চুপ থাকা।  কৌশলে অন্য বিষয়ে আলোচনাকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়। অথবা বলা যায়, “আমরা কি বিষয়টি বদলাতে পারি?”  ক্রিড়া বা রাজনীতির মতো জনপ্রিয় অথবা গরম ইস্যু ছেড়ে দেওয়া যায় আলোচনার টেবিলে।

 

৯)  নিজের কাজে মনসংযোগ রাখতে পারা

মনসংযোগ ধরে রাখা কঠিন কাজ। এ দক্ষতা অর্জন করতে কারও কারও জীবন শেষ হয়ে যায়।

নিজের কাজে লেগে থাকা কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি দক্ষতা।  কারণ বর্তমান যোগাযোগ প্রচুক্তির এদিনে বাড়তি বিপত্তির শেষ নেই।  মোবাইল ফোন, মেসেজ এলার্ট, সোস্যাল নেটওয়ার্কিং, ইমেইল, ইন্টারকমে সহকর্মী, বসের কল ইত্যাদি লেগেই আছে।  যারা নিজের অবস্থানকে উন্নত করতে চান, তারা এসবকে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে রাখেন।

মনযোগ নষ্ট করার আরেকটি সহজাত প্রবণতা হলো অন্যের কাজে নাক গলানো। অন্যের দুর্বলতা নিয়ে মেতে থাকা। নিজের কাজে মনোযোগ দিলে অন্যদিকে মনোযোগ দেওয়া অসম্ভব।

অন্যের ভুলত্রুটি থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিজের দুর্বল দিকগুলোতে মনোযোগ দিলেই কেবল উন্নয়ন সম্ভব।  মনসংযোগ ধরে রাখতে পারা একটি মূলবান দক্ষতা।

 

৮)  অন্যকে শোনা

কিছু মানুষ আছে যারা শুনে অর্ধেক, বুঝে চারভাগের একভাগ এবং চিন্তা করে শূন্য পরিমাণ, কিন্তু প্রতিক্রিয়া করে দ্বিগুন।  তারা কথা না বলে শুনতে পারে না। কিন্তু শোনা মানে হলো ‘চুপ থাকা’।

মানুষের সাথে সম্পর্কের শুরু হয় তাকে শোনার মধ্য দিয়ে।

শোনার মধ্য দিয়ে অনেক পেশাগত ও সামাজিক সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যায়।

একটি ব্যস্ততম কল সেন্টারের ব্যবস্থাপককে জিজ্ঞেস করা হলো, কীভাবে তিনি অগণিত অভিযোগের নিষ্পত্তি করেন। ব্যবস্থাপক শুধু সংক্ষেপে জানালেন যে, ৮০% অভিযোগ শুধু শুনে এবং লিখে রাখাতেই সমাধান হয়। বাকি ১০% অভিযোগ শেষ হয় অপেক্ষায়। অর্থাৎ কিছুদিন পর্যবেক্ষণে রাখলেই ১০% অভিযোগের সমাধান হয়। মাত্র ১০% অভিযোগ নিয়ে বাস্তবিকভাবে তাদেরকে কাজ করতে হয়। এক্ষেত্রে মূল চাবিকাঠি হলো, গ্রাহকের অভিযোগগুলো পূর্ণ মনযোগ এবং সহানুভূতির সাথে শুনে যাওয়া।

শোনা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দক্ষতা যেটি নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে আয়ত্ত করা যায়।  এর নিজস্ব কিছু কৌশল আছে যা ব্যক্তিগত আগ্রহের মাধ্যমে নিজের আচরণে অন্তর্ভুক্ত করা যায়

 

 

 

1212

৭)  কোন্ সময় চুপ থাকতে হয় সেটি বুঝতে পারা

কোন বিষয়ে রাগ অথবা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয় না।  আমাদের চারপাশে অনেক সমস্যা আছে, যা একার পক্ষে সমাধান করা যায় না।  আমাদের দরকার শুধু চুপ থাকা।  অথবা উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করা।

অনেক সময় কথা বলার চেয়ে নিশ্চুপ থাকাই সঠিক অবস্থান। তা না হলে পরে পস্তাতে হতে পারে। নিরবতাই উপযুক্ত উত্তর, এমন পরিস্থিতিতে আমরা সকলেই পড়ি।  শুধু দরকার সেটি বুঝতে পারার।

চুপ থাকা মানেই দায়িত্ব এড়িয়ে চলা নয়, অন্যকে করার সুযোগ করে দেওয়া।

চুপ করা মানে অন্যকে কথা শেষ হতে দেওয়া।

চুপ করা মানে নিজের সঠিক মেজাজটুকু ফিরে পাবার জন্য সময় নেওয়া।

অনেক বিষয় আছে যা নিজের মধ্যে রাখাই উত্তম।  আমরা যখন রাগ করি, অথবা যখন হতাশ হই, বা যখন বিরক্ত হই, তখন কিছু না বলাই ভালো। তাতে অপ্রয়োজনীয় বা অনাকাঙ্ক্ষিত মুখ থেকে বের হয়ে আসতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত না নিয়ে চুপ করে চিন্তা করাই উত্তম। মেজাজ স্বাভাবিক হলে সঠিক পদক্ষেপটি গ্রহণ করা যায়।

যখন আমরা উত্তেজিত হয়ে পড়ি, সেটা চরম দুঃখে অথবা চরম আনন্দের কারণে হতে পারে, তখন নিজের মুখকে বন্ধ রাখলে ভবিষ্যত আক্ষেপ থেকে নিজেকে বাঁচানো যেতে পারে।

কাজটি খুবই কঠিন, কিন্তু যারা এটি আয়ত্ত করতে পেরেছেন তারাই শুধু জানেন এর কত উপকার।

 

৬)  নিজের সাথে ইতিবাচক কথোপকথন

অন্যেরা আমাদের সম্পর্কে কী ভাবে, অবশেষে সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় না।  গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা নিজেরা নিজের সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করি।

নিজের সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে সময় লাগে।  কিছু অমূল্য গুণ আছে যা অনেকেরই থাকে না।  অথচ সেটি আমাদের দরকার। এজন্য নিজেদের সাথে ইতিবাচক থাকা খুবই প্রয়োজন।

ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে আত্মসমালোচনা করলে অভাবনীয় ফল আসে।  এটি মূলত নিজের সাথে ‘নেতিবাচক কথা’ বলা। চর্চা করলে আস্তে আস্তে সেটি ইতিবাচক এবং প্রেরণামূলক আত্মকথনে রূপ নিতে পারে।

 

৫)  অভ্যাসের ধারাবাহিকতা

কোন একটি  বিষয়ে ধারণা নিতে চাইলে প্রয়োজন নিয়মিত চর্চা।

তাই প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিষয়টি সময় দেবার মতো কি না।  তাতে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে কি না।

যদি উত্তর হ্যাঁ-সূচক হয়, তবে শেষ না হওয়া পর্যন্ত লেগে থাকতে হবে।  একেবারে বাদ দেবার চেয়ে বরং অনিয়মিতভাবে করাও উত্তম।

অনেকে নিজের অবস্থান ভালো করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে, কিন্তু সেখানে পৌঁছে অথবা কাছাকাছি গিয়ে আন্তসন্তুষ্টিতে ভোগে। অথবা অলসতায় পড়ে যায়। এসবকে অতিক্রম করার জন্য যা কিছু করা হয়, সেটিই অভ্যাসের ধারাবাহিকতা।

 

 

৪)  অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়া

একটি চাকরির সাক্ষাৎকারে নিয়োগকর্তারা সাফ জানিয়ে দিলেন যে, “আপনি একাজটি করতে পারবেন না যদি অন্যের সাহায্য নেবার ইচ্ছা বা দক্ষতা না থাকে।” নিজের কাজে অন্যকে সম্পৃক্ত করতে পারা একটি দারুণ দক্ষতা।

চাকরিতে যোগদানের পর দেখা গেলো পূর্বে ব্যক্তি তার চাকরিটি হারিয়েছিলেন শুধু এজন্য যে, তিনি সমস্যাকে গোপন করতেন এবং কারও অংশগ্রহণের সুযোগ রাখতেন না।

অন্যের সাহায্য নেওয়ার মধ্যে অতিরিক্ত যে জিনিসটি পাওয়া যায় তা হলো, কাজের মধ্যে অংশীদারিত্ব বেড়ে যায়। এর সফলতা ও ব্যর্থতায় সকলেই ভাগ পায়। কাজটি হয়ে যায় সকলের। কিন্তু কৃতীত্ব একজনেরই, যিনি সকলকে সম্পৃক্ত করতে পারলেন।

এখানে আরেকটি বিষয় হলো, ঠিক ‘কখন অন্যের সাহায্য নেবার প্রয়োজন’ সেটি বুঝতে পারা। অন্যের অংশগ্রহণ কখন দরকার, সেটি পরিমাপ করতে পারা আরেকটি বিশেষ গুণ।

অন্যের সাহায্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে আমরা অন্যের সামর্থ্যকে যেমন মাপতে পারি, তেমনি পারি নিজের নেতৃত্বদানের যোগ্যতাকে যাচাই করতে।

বিষয়টি একই সাথে অন্যের আস্থা অর্জনেরও সুযোগ করে দেয়। তাতে ক্রমেই আমাদের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায়। এটি একটি দক্ষতা বটে!

 

৩)  সময় ব্যবস্থাপনা

সময় ব্যবস্থাপনার কোন  সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি বা পথনির্দেশ আজও আবিষ্কৃত হয় নি। বিষয়টি পুরোপুরি ব্যক্তির একক সৃজনশীলতার ওপর নির্ভরশীল।

অন্যদিকে একটি প্রতিষ্ঠানের জুনিয়র থেকে সিনিয়র পদের ব্যক্তি সবারই সময় সীমাবদ্ধতাকে মেনে চলতে হয়।

ফলে সময় ব্যবস্থাপনা যারা ভালোমতো করতে পারেন, তারা সকলের মনযোগ আকর্ষণ করেন সহজেই। চাকরিদাতারাও এ গুণটিকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেন এবং এটি কর্মী মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

একজন জৈষ্ঠ্য কর্মকর্তা বলেছিলেন, কাজটি করা নয়, কাজটির ‘পরিকল্পনা করাই’ আমার কাছে সবচেয়ে বেশি কঠিন লাগে। এর একটিই কারণ, কাজ অনুযায়ি সময়কে উপযুক্তভাবে ভাগ করতে পারা।

সময় ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটি দক্ষতা হলো, অগ্রাধিকার বুঝতে পারা। কোন্ কাজটি আগে, এবং কোন্ কাজটি পরে করতে হবে।

একটি ‘টু-ডু লিস্ট’ এখানে সহজ উপায়।  তাহলে নিজের কাজগুলো ‘দৃশ্যমান পরিকল্পনায়’ রূপ নেয় এবং সময় ব্যবস্থাপনা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।

 

 

২)  অন্যের প্রতি সহানুভূতি থাকা

আমরা যত দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং চৌকস কর্মকর্তা হই না কেন, অন্যের অনুভূতির প্রতি যত্নশীল না হলে ওসব যোগ্যতা কোন কাজেই আসে না।  ওগুলি বরং আত্মঅহংকারে ফুলিয়ে তোলে আমাদেরকে।

অন্যের অনুভূতির প্রতি গুরুত্ব না থাকলে ‘নিজেদের যোগ্যতা ও দক্ষতা’ কেবলই প্রতিপক্ষ তৈরি করে।

নিজেদের যুক্তি ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আমরা মানুষকে মুগ্ধ করতে পারি, কিন্তু তারা আমাদের আচরণ দ্বারাই কেবল প্রভাবিত হয়।  মানুষ আমাদের কথা শুনে, কিন্তু আচরণকে অনুভব করে।  এই অনুভবই তাদের বেশি মনে থাকে।

অন্যের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব থাকলে, জীবনের অনেক কিছু সহজ হয়ে যায়।  সবচেয়ে বেশি সহজ হয় যেটি, তা হলো সম্পর্ক।

অন্যকে আপন করতে পারা একটি বিরল মানবিক গুণ, যা মুহূর্তে আমাদেরকে অন্যের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে।

অন্যের প্রতি সহানুভূতি একটি বিশেষ গুণ।  কর্মক্ষেত্রে একে দক্ষতা বলা হয়, কারণ নিজের চেষ্টা দিয়েই কেবল একে অর্জন করা যায়।

 

১)  ঘুমের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা

যোগ ব্যায়াম মানুষের দেহ ও মনকে সতেজ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।  কিন্তু দালাই লামা বলেছেন, ঘুমই সর্বোত্তম যোগ ব্যায়াম।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় যে, যারা ঘুমের রুটিন মেনে চলতে সমর্থ হয়েছেন তারা শোয়া মাত্রই ঘুমিয়ে পড়তে পারেন।  এবং সময়মতো ঘুম থেকেও ওঠতে পারেন।  কর্মজীবীরা জানেন, এই অভ্যাস কত মূল্যবান।

যারা দিনের সময়টিতে সতেজ এবং ক্লান্তিহীন থাকতে চান, কেবল তারাই জানেন পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারা কত ভালো একটি গুণ।

পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার বিষয়টি অনেকটাই ব্যক্তির অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে।  যারা রাতে ভালো ঘুমাতে চান, সাধারণত তারা বিকালের পর ক্যাফেইনযুক্ত কিছু পান করেন না। বিভিন্নভাবে শারীরিক খসরত বাড়িয়ে দেন। তাদের ধূমপানের অভ্যাস তাদের কম, অথবা নেই।  তারা ঘুমের বেশ আগেই টিভি অথবা কম্পিউটারটি বন্ধ করে দেন।

কেউ কেউ বিছানার পাশে বই রাখেন।  ঘুমের আগে প্রিয় বইটি পড়লে ঘুম আসতে পারে।

কিছু কারণ আছে প্রাকৃতিক।  যেমন: কাজের চাপ থাকা, কোন ডেডলাইন সামনে থাকা, ব্যবসায়িক লোকসান। ইত্যাদি নানাবিধ দুশ্চিন্তা।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, কম ঘুমের কারণেই মানুষের দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। আবার দুশ্চিন্তা বেড়ে যাবার কারণেই কম ঘুম হয়।

যারা ঘুমকে দৈনন্দিন সকল কাজের মধ্যে মিলিয়ে নিতে পেরেছেন, তারাই কাজ এবং বিশ্রামকে আলাদা করতে পারেন। তাই আধুনিক কর্মজীবীরা ঘুমকে একটি দক্ষতা হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

 

 

 

 


বিজনেস ইনসাইডার এবং লেখকের আরেকটি পোস্ট অবলম্বনে।

ছবিগুলো গুগল অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত।

 

আত্মউন্নয়ন: এই সময়টি আপনার

১)  আপনার ধারণার চেয়েও নিকটে অবস্থান করছেন

কলোরেডোতে ছুটি কাটানোর সময়, একদিন ভোরে ওঠে গেলাম পাহাড়ে চড়ার জন্য। বিভার ক্রিক পর্বতের চূড়ায় যাওয়া পর্যন্ত তিনমাইলের খাড়া পথ। চূড়ায় পৌঁছুতে অন্তত তিনঘণ্টা লাগবে বলে সমতলে টানানো সাইনবোর্ডটিতে লেখা আছে।

গন্তব্যের কথা চিন্তা করে আমি ভরকে গেলাম। রাস্তাটি পুরোপুরি খাড়া। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সমতলের উচ্চতা আট হাজার ফুট। চূড়ার উচ্চতা হবে এগারো হাজারের বেশি।

প্রথম দিকের ধাপগুলোতে হেঁটেই আমি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় হাঁপাতে লাগলাম। আমার মনকে আগেই বুঝাতে হতো, যেন সহজভাবে বিষয়টিকে নেই।  হুস্টনে আমার নিজ এলাকায় প্রতি সপ্তাহে বেশকয়েক মাইল আমি হাঁটতাম এবং প্রচুর বাস্কেটবল খেলতাম। কিন্তু ওই এলাকাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র পঞ্চাশ ফুট উঁচুতে।  কলোরেডো পর্বতের চিনচিনে বাতাস পর্বতশিখরে যাওয়া সম্পর্কে আমার মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দিলো।

সঙ্গে একটি মোবাইল ফোন আর এক বোতল পানি নিয়ে আমি হাঁটতে শুরু করেছিলাম।  শক্ত মন নিয়ে মোটামুটি ভালো গতির সঞ্চার করলাম।  প্রথম পনেরো মিনিট সময় বেশ ভালোই লাগলো।  পরের পনেরো মিনিট কঠিন হয়ে আসলো।  মনে হচ্ছিল, আমি অতিরিক্ত ওজন বহন করে চলেছি। নিঃশ্বাস ছাড়ার জন্য আমি একটু পরপরই থামছিলাম।

আমার পর্বতারোহনের পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর রাস্তাটি ভয়ঙ্কর খাড়া হয়ে আসলো – একদম ওপরে ওঠছি বলে মনে হচ্ছিলো।  রাস্তাটি সাপের মতো এসপেন ও পন্ডেরোসা পাইনের ঘণ বনের ভেতর দিয়ে আকাশের দিকে ওঠছিলো।  দৃশ্যটি ছিলো একই সাথে সুন্দর এবং ভয়ঙ্কর। নিয়মিত দৌড়ানো এবং বাস্কেটবল খেলার পর আমার যে শারীরিক গড়ন হয়েছিল, তা নিয়েও আমার পাগুলো ব্যথায় জ্বলছিলো এবং বুকের ভেতর ধপধপ করছিলো।

একটি ঢাল অতিক্রম করার পর নিঃশ্বাস নেবার জন্য আমাকে থামতে হলো।  শরীর থেকে ঘাম ঝরছিল। মনে মনে ভাবলাম, আরও দু’ঘণ্টা হাঁটতে হলে আমি হয়তো সেখানে পৌঁছাতেই পারবো না।

ওই পর্যন্ত গিয়ে আমি আর কাউকে ঢালুপথে দেখতে পেলাম না।  হঠাৎ এক বৃদ্ধলোক বাঁকাপথ বেয়ে এসে  নামলেন। টি-শার্ট গায়ে পড়নে হাফপ্যান্ট এবং পায়ে পর্বতারোহনের জুতো। হাতে একটি ছড়ি। তাকে শান্ত এবং স্থির মনে হলো। আমার অবস্থা তিনি ভালোমতোই আঁচ করেছেন।

আমরা একে অন্যকে অতিক্রম করছিলাম। তখন তিনি এমন কিছু বললেন যা আমার দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দিলো। আমার দিকে স্নেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে শান্তস্বরে বললেন, “আপনার ধারণার চেয়েও কাছে চলে এসেছেন।”

কথাগুলো শুনে আমি পুনরায় শক্তি পেলাম। মনে হচ্ছিলো তিনি যেন আমার ফুসফুসে নতুন নিঃশ্বাস দিয়ে গেলেন। সেই শক্তি আমার সমস্ত দেহে সঞ্চারিত হলো।  পা গুলো যেন শক্তিশালী হয়ে ওঠলো। আমি দ্বিতীয়বার বায়ূ গ্রহণ করলাম।  ওই স্থান থেকে ওঠে আসার পর থেকে প্রতিটি প্রচেষ্টায় আমি কথাগুলো বলে নিজেকে অনুপ্রাণিত করেছিলাম। “আমি অবশ্যই যাবো। আমার ধারণার চেয়েও বেশি কাছে এসেছি।”

পাহাড়-চড়ার কাজটি কঠিন হলেও, এবং আমার পেশি ও ফুসফুসে যন্ত্রণা করলেও আমি বলতে থাকলাম: “আমি প্রায় চলে এসেছি। আমি জানি আমি পারবোই।” এবং সত্যিই, মাত্র দশ মিনিট পর দু’টি ধাপ অতিক্রম করে এক অভাবনীয় দৃশ্য সামনে পেলাম। আমি পর্বত শীর্ষে!

সমতলে দেখা সাইনবোর্ড মোতাবেক পর্বত চূড়ায় পৌঁছাতে আমার তিন ঘণ্টা লাগার কথা। কিন্তু আমি এক ঘণ্টা আগেই পৌঁছে গেছি!  যখন বৃদ্ধ ভদ্রলোকটিকে অতিক্রম করছিলাম, তখন সত্যিই আমি আমার ধারণার চেয়ে নিকটবর্তী ছিলাম। কিন্তু তবু তার প্রেরণাদায়ক কথাগুলো না পেলে ওখান থেকে হয়তো ফিরেই যেতাম। উচ্চে ওঠার পথ থেকে নিজেকে থামিয়ে দিতাম কারণ আমি ভেবেছিলাম আরও দু’ঘণ্টা লাগবে।

বৃদ্ধ পর্বতারোহীকে না পাওয়া পর্যন্ত আমার ধারণাটি ছিলো সীমিত। আমার ভাবনাও ছিলো আবদ্ধ। সাইনবোর্ডে কী পড়েছিলাম শুধু সেটিই আমার মনে থাকতো। বৃদ্ধলোক যখন জানালেন আমি নিকটেই আছি, তখন তিনি জানতেন যে, আমি মাত্র দশ মিনিট দূরে আছি। তিনি আমার লক্ষ্যমাত্রা সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য দিলেন। পর্বতে চড়ার রাস্তা সম্পর্কে তিনি আমার আগেই জানতেন। ঠিক সেভাবে ঈশ্বর জানেন, আপনার সামনে কতটুকু রাস্তা পড়ে আছে।

আমি জানি না আপনার লক্ষ্য কী; আপনার স্বপ্ন কী; অথবা কতটুকু বাধা আপনাকে অতিক্রম করতে হবে। কিন্তু আমি চাই, এই কথাগুলো আপনার আত্মার গভীরে গিয়ে পৌঁছাক। বিশ্বাস নিয়ে সেটি গ্রহণ করুন: “আপনার ধারণার চেয়েও কাছে চলে এসেছেন।”

২)  কঠিন লাগছে মানে হলো আমি সমাধানের কাছে চলে এসেছি

বিশ্বমন্দার পরিস্থিতি অনেকের স্বপ্ন ভেঙ্গে দিয়ে পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। আপনি হয়তো আপনার চাকরিটি হারিয়েছেন। হয়তো আপনার সঞ্চয়টুকু শেষ করে ফেলেছেন অথবা নিজের ভিটেটুকুও বিক্রি করেছেন। হতে পারে যে, শারীরিক বা সম্পর্কগত সমস্যায় আছেন। অথবা এমন হতে পারে যে, আপনার জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছতে খুব বেশি দেরি হয়ে যাচ্ছে। তবুও আপনার লক্ষ্য এবং আপনার স্বপ্ন থেকে সরে আসার সময় হয় নি। এখনই নিরুৎসাহিত হবার সময় আসে নি। আমার পর্বতে চড়ার কথা মনে করে আপনারা হয়তো বলবেন যে, আপনি তার অর্ধেকও পৌঁছাতে পারেন নি। মনে হতে পারে, আপনার অনেক পথ বাকি।  কিন্তু সত্য হলো, আপনি সেটি জানেন না। এমনও হতে পারে, আপনার স্বপ্নটি সেই কোনায় গেলেই পাওয়া যাবে। আপনার মনে হবে, সেটি আরও দু’বছর দূরে পড়ে আছে।  কিন্তু আপনি যদি নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারেন, তবে কে জানে, হয়তো দু’মাস পরই আপনার স্বপ্নটি বাস্তবায়ন হবে। আপনার ধারণার চেয়েও কাছে অবস্থান করছেন। আমি বিশ্বাস করি, সময়টি আপনার।

তিন ছেলেমেয়ের জননী এমবার করসন ছিলেন একজন গৃহিনী। আর্থিক মন্দার কারণে তার স্বামীর ফ্লোরিডার নির্মাণ কাজটি চলে যায়। তখন এমবারকে পরিবার চালানোর জন্য রাতের শিফটে কাজ নিতে হলো।

চার সপ্তাহ ধরে সে রাতের শিফটে কাজ করে আসছিলো।  একরাতে সে ক্লান্ত এবং উদ্বিগ্ন অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরছিলো। সন্তানদের সাথে বেশি দেখা হচ্ছে না। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমবার ভাবছিলো। তার পরিবারকে নিয়ে নিশ্চয়ই ঈশ্বরের বড় কোন পরিকল্পনা আছে বলে তার বিশ্বাস ছিল। সেদিন গাড়িতে সে প্রার্থনা করছিলো। “হে ঈশ্বর, দয়া করে তুমি আমাকে বলো এই পরিবার নিয়ে আমি কী করবো।”

যেন ‘নিঃশ্বাসের মতো’ সে একটি সাড়া পেলো। “আমি তোমাকে একটি উপহার দিচ্ছি। তুমি গিয়ে বাগান শুরু করো। তাতে সমস্ত অন্তর দিয়ে পরিশ্রম করো।”

উদ্যানতত্ত্বে এমবারের একটি ডিগ্রি ছিলো, যা সে কখনও কাজে লাগায়নি। সে এতই প্রতিভাবান ছিল যে, চৌকস গার্ডেনার হিসেবে একবার সনদও পেয়েছিলো। কোন কিছু থেকে ফল জন্মানো ছিলো তার প্রকৃতি-দত্ত গুণ। সেই রাতে তার অন্তরে যে উপলব্ধি পেয়েছিলো, সেটি তার স্বামীকে জানালো। এটি নিয়ে সে প্রার্থনা করলো। সে বলেছিল যে, পরবর্তি কয়েকটি সপ্তাহে ‘সবকিছু এমনভাবে ঘটে যাচ্ছিলো যে, মনে হয়েছিলো আগে থেকেই এসব ঠিক করা ছিলো।’

বাগান ও বাড়ির সৌন্দর্য ব্যবস্থানাকে লক্ষ্য করে সে একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে এমবার। প্রতিষ্ঠানটি বেড়ে ওঠে। এত তাড়াতাড়ি খ্যাতি পায় সেটি, যা ছিলো তার স্বপ্নেরও বাইরে। এটি ছিলো তার সময়!

আপনার স্বপ্নের মধ্য দিয়ে ঈশ্বর চান একটি নতুন জীবন দান করতে। আপনার অন্তরে তিনি নতুন আশা দিতে চান। আপনি হয়তো একটি বিয়ের সম্বন্ধ বা শিশুর অসুস্থতা বা জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে অল্পেই আশাহত হয়ে পড়ছেন। কিন্তু ঈশ্বর জান আপনি লেগে থাকুন। তিনি বলতে চান যে, যদি আপনি দ্বিতীয়বার সুযোগ নেন, যদি আপনি মনোভাবে পরিবর্তন আনেন এবং নিচে নেমে যাবার গতিতেই সামনে এগিয়ে যান, তবে তিনি আপনাকে বিস্ময়কর ফল দেখাতে পাবেন।

নেতিবাচক কথাগুলো মন থেকে ছেঁটে ফেলুন। “আমি আর কখনও নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবো না। এই নেশাটি আর ছাড়তে পারলাম না। আমার দ্বারা ভালো চাকরি করা হবে না।” এধরণের কথা বলা বন্ধ করুন।

বরং আপনার প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত এরকম: “আমার ধারণার চেয়েও বেশি কাছে এসেছি। এই শিশুকে আমি বড় করবোই। এই অসুস্থতা থেকে আমাকে সুস্থ হতে হবেই। এই ব্যবসায়কে আমি দাঁড় করাবার সামর্থ্য আমার আছে। আমার বিশ্বাস, আমি একটি নতুন কাজ বের করতে পারবোই। বিষয়টি ক্রমেই কঠিন হয়েছে; মানে হলো আমি সমাধানের নিকটে”

৩) আজই সেই দিন

ফ্লোরিডা দ্বীপাঞ্চলে একজন গুপ্তধন শিকারি ছিল, যার ব্যক্তিগত স্লোগানটি ছিল এরকম: “আজই সেই দিন”। নাম তার মেল ফিশার। ষোলটি বছর ধরে প্রতিদিন মেল ফিশার তার ডুবুরিদেরকে ওই কথাগুলো দিয়ে প্রেরণা দিয়ে এসেছে।  ১৬২২ সালে ডুবেছিল এরকম একটি স্প্যানিশ জাহাজ তারা খুঁজে চলেছে। সে তার পরিবারকে নিয়ে একটি লিক-হয়ে-যাওয়া হাউজবোটে বাস করতো আর ডুবুরিদেরকে দিতো প্রতিশ্রুতির জপমালা। জাহাজের ভেতরে সম্পদ খুঁজতে খুঁজতে তার এক ছেলে ও ছেলের বউ হারিয়েছে, তবু ফিশারের স্বপ্ন হারায় নি।

ফিশার আশা ছাড়ে নি।  সে তার স্বপ্নের পিছু ছাড়ে নি। সমালোচকদের ও সন্দেহবাদীদের কাছে হেরেও যায় নি। সে ঘোষণা দিয়ে বলতো, যেকোন দিন ‘সেই দিন’ হতে পারে। তারপর ১৯৮৫ সালের একদিন, স্পেনের এক ভাঙ্গা জাহাজের তলা থেকে ফিশারের ডুবুরিরা সোনা ও রুপার এক মাতৃভাণ্ডারের খোঁজ পায়। তিরিশ বছর পর আজও ডুবুরিরা সেখান সেখান থেকে সম্পদ উদ্ধার করছে।

আপনার লক্ষ্য পূরণের জন্য, একটি স্বপ্নের চাকুরির জন্য, আপনার জীবনসঙ্গীকে খুঁজে পাবার জন্য অথবা আপনার সুস্বাস্থ্য ফিরে পাবার জন্য আজই কি ‘সেই দিন’ হতে পারে না? উন্নততর জীবন, ভালো একটি সম্পর্ক অথবা সুস্বাস্থ্যের জন্য আপনি হয়তো নিজের ধারণার চেয়েও নিকটে অবস্থান করছেন।  নিজের ওপর বিশ্বাসে স্থির থাকলে, পুরস্কার আসবেই।

আপনার আশাবাদি মনকে সন্দেহবাদীদের কথায় নষ্ট করে দেবেন না। কেউ যদি বলে, “তোমার কী আছে? সবকিছু তুমিই করে ফেলবে, কেন তোমার এমন মনে হয়? তুমিই শুধু সফল হবে, তা কি তুমি সত্যিই বিশ্বাস করো?”

তাদেরকে উত্তরে শুধু এটুকু বলুন: “আমি মনে করি না তা হবে। বরং আমি বিশ্বাস করি তা হবে। আমি আশার কাছে বন্দি এবং ওটা থেকে বের হতে আসতে পারি না। নিজেকে নৈরাশ্যবাদি হতে দিতে পারি না। আমি অভিযোগ করতে পারি না।  আশা আমার বিশ্বাসকে ধরে রেখেছে আর প্রেরণাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।”

সন্দেহবাদীরা তখন হয়তো বলবে: “যা হোক, আমি জানি না কীভাবে তুমি এত আশা পাও। আমি তোমার মেডিকেল রিপোর্ট দেখলাম। তাতে তোমার স্বাস্থ্য সম্পর্কে ভালো খবর পাওয়া যায় না।”

তাদেরকে বলতে পারেন: “হ্যাঁ, তা ঠিক। কিন্তু আমার কাছে আরেকটি রিপোর্ট আছে।  তাতে বলা আছে যে, ঈশ্বর আমার স্বাস্থ্য পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেবেন।”

আপনি ভয় আর নৈরাশ্যের কাছে বন্দি? অথবা অন্তর্দ্বন্দ্বের কাছে? হীনমন্যতার কাছে? তাহলে শেকল ভাঙ্গুন। ফিরে আসুন আশার কাছে। বন্দি হোন আশার কাছে। উত্তম কিছুর প্রত্যাশা করুন। এখনই!

.

.

————————

নতুন প্রজন্মের প্রেরণাদায়ী মার্কিন লেখক জোয়েল অস্টিনের ‘ইটস ইয়োর টাইম’ (২০০৯) অবলম্বনে।

আলি আহমদ: কর্মজীবনে পাওয়া একজন মেনটর

ছাত্রজীবনের এক কঠিন বাঁকে এসে একটি খণ্ডকালীণ চাকরির যখন খুবই দরকার ছিলো, তখন এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক স্বর্গদূতের মতো এসে আমাকে উদ্ধার করলেন। ইন্টারভিউর আগের দিনও তিনি আমাকে চিনতেন না। আমাকে দেখেই কী ভেবে বোর্ডের অন্যান্য সদস্যদের বিব্রত মুখের সামনে বলে দিলেন, এই ছেলেটিকে নিন। সকলকে স্তম্ভিত করে দিয়ে আমার সামনেই তিনি রায় দিয়ে দিলেন। পরবর্তি দু’টি বছর ছিলো আমার জীবনের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তখনও আমার স্নানকোত্তর শেষ হয় নি। মজার ব্যাপারটি হলো এই চাকরিটি প্রথমে খণ্ডকালীণ ছিলো না। এই ভদ্রলোকের সহায়তায় তিনমাসের আমার চুক্তিটিকে পূর্ণকালীণ থেকে খণ্ডকালীণে পরিবর্তন করতে সমর্থ হই।

চাকরি জীবনের প্রাথমিক দিনগুলোতে এই জৈষ্ঠ সহকর্মীকে পেয়েছিলাম, যিনি কখনও তার জৈষ্ঠতার কথা মনে করাতেন না। সকলের সাথে মিশতেন এবং প্রায় সকল কথাই বলতেও দিতেন। ফলে অন্যরা যেমন বেশি আশকারা পেতো, তেমনি তিনিও তাদের সহযোগিতা পেতেন সবচেয়ে বেশি। এজন্য অন্যান্য জৈষ্ঠরা তাকে খুব হিংসা করতেন, কিন্তু বিপদের সময়ে তারই নম্বরে ইন্টারকমের কলটি যেতো। এর মূলে ছিলো, অনেক মানুষের সঙ্গে তার মিশার ক্ষমতা এবং দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য অলৌকিক কিছু কারিশমা।

বলছি আলি আহমদ সাহেবের কথা। এক দিলখোলা মানুষ। এর আগে এরকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করে অবসর জীবনে এসে বর্তমান কাজটি করছেন। তার নেতৃত্ব এবং প্রতিনিধিত্ব করার গুণাবলী দিয়ে সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠানটিকে তিনিই ধরে রেখেছেন বলা যায়। তিনি সহকর্মীদেরকে এতই উৎফুল্ল রাখতেন যে, তিনি কোন কারণে ছুটিতে থাকলে সেদিন অফিস থাকতো অন্ধকার। দেরিতে আসলেও অফিসের সকলে তার অনুপস্থিতি সবাই টের পেতো। বেশি টের পেতো সবুজ। অফিসের পিওন। সে একটু পরপর বলতে থাকতো, ‘আহমদ স্যারের আজ অইলো কী?’

আহমদ সাহেব ছিলেন অফুরন্ত প্রেরণার উৎস। দেখা গেলো, অফিসের কর্মীরা কোন বিশেষ ডেডলাইনের পেছনে কাজ করছে। কিন্তু রাতদিন কাজ করেও যখন ডেডলাইনের মধ্যে কাজ শেষ হচ্ছে না, তখন উদ্ধারকারী হিসেবে তিনিই পথ বাতলে দিতেন। তিনি বলতেন, ‘আসুন…এক কাপ চা খান। আরে ভাই… শুনুন ডেডলাইন হলো দু প্রকার: একটিকে বলে ডেডলাইন; আরেকটিকে বলে ‘আসল’ ডেডলাইন। ডেডলাইনেরও একটি ডেডলাইন আছে। অতএব, চা খেয়ে পূর্ণোদ্দমে আবার লেগে যান। যতক্ষণ কাজে থাকবেন, ততক্ষণ ডেডলাইন আপনার জন্য লাইফলাইন।’

সবসময় বলতেন, ‘কাজ করবেন আনন্দ নিয়ে, তাই বলে জীবন দিয়ে দেবেন না। জীবন একটাই।’ আড্ডা দিতেন সুযোগ পেলেই। পান খাবার কারণে মুখে বিষণ্নতা দেখা যেতো না, থাকলেও। পান খেয়ে ঠোঁট তো লাল করতেনই, হাতও লাল করে রাখতেন। অফিসের পিয়নের সাথে ছিলো তার আলাদা ভাব। ইশারা করলেই পান হাজির।

আড্ডার সুযোগে জুনিয়ররা মাঝে মাঝে দু’একটা অভিযোগের কথা শুনিয়ে দিতেন। অভিযোগগুলো অধিকাংশই বড় বসকে নিয়ে। অথবা অন্য কোন জৈষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে। তিনি শুধু হাসতেন, কিছুই বলতেন না। শেষে শুধু বলতেন, ‘শুনুন, বসকে নিয়ে এতো ঘ্যানর করবেন না। তাকে নিয়ে এতো ধ্যানের কী আছে? কাজ নিয়ে ধ্যান করুন। বস একদিন আপনাকে নিয়ে ধ্যান করবেন।’ অথবা বলতেন, ‘বসের কথা শুনবেন, কিন্তু শুনবেন না।’ সময় থাকলে তার রহস্যময় কথাগুলো ভাঙিয়ে বলতেন। বসের আদেশের বাইরেও নিজের কমন সেন্স ব্যবহার করতে হবে। খালি শুনলেই চলবে না, মাঝে মাঝে না শুনেও অফিসের উপকার করা যায়।

তার অনেক উক্তির মধ্যে মনে রাখার মতো উক্তিটি হলো, ‘অত বেশি চিন্তা করবেন না। চিন্তা করলে কার্যক্ষমতা কমে যায়।’

একবার হলো কী, তার প্রাণপ্রিয় অফিসের পিওন সবুজ মিয়ার মুখের হাসি বন্ধ হয়ে গেলো। সাধারণত সবুজ থাকতো হাসির আগে আর খাবারের পরে। অর্থাৎ হাসির কোন বিষয় হলে, সবুজের উচ্চস্বরে হাসি থেকেই তা বুঝা যেতো; কিন্তু অফিসের খাবারের আয়োজনে পদাধিকারের বলেই সবুজ থাকতো সবার পেছনে! তো, সবুজ হঠাৎ হাসি বন্ধ করে দিয়েছে। আমরাও চিন্তিত। কী ব্যাপার, সবুজ? কোন উত্তর নেই। আলি আহমদ সাহেব দু’দিন ধরেই বিষয়টি খেয়াল করলেও, তিনি সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করছেন না । কিন্তু তৃতীয় দিনে আমাদেরকে চমকে দিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করে বসলেন:

-তোর কী হয়েছে রে? অফিসের পরিবেশ গোমট করে রেখেছিস কেন?
-স্যার, আমার অনেক বড় সমস্যা।
-কী সমস্যা, বলবি তো? কী এমন হয়েছে যে তোর হাসি বন্ধ?
-স্যার, ঋণের কিস্তি দিতে ভুলে গেছি।
-তাতে কী হয়েছে? জরিমানাসহ পরের মাসে দিয়ে দিবি?
-স্যার, এর আগেও ভুলে গিয়েছিলাম। এখন আমার অনেক সমস্যা।
-আরে এতে তোর সমস্যা হবে কেন?
-(সবুজ হা করে দাঁড়িয়ে আছে।)
-তুই টাকা দিতে না পারলে তোর সমস্যা হতে যাবে কেন? ওটি তো ব্যাংকের সমস্যা।

আমরা যারা তাদের এই কথোপকথনের শ্রোতা ছিলাম, স্মিত হেসে কাজে মনযোগ দেই। কত সহজেই না তিনি পরিস্থিতিকে হালকা করতে পারেন। আমাদের হাসি থামলে পর তিনি এই বলে শেষ করলেন, ‘ওদের টাকা। ওরাই তোকে পথ বাতলে দেবে। এখন এক দৌড়ে গিয়ে একটি পান নিয়ে আয় তো!’

বাস্তব অভিজ্ঞতার জীবন্ত ভাণ্ডার ছিলেন, আলি আহমদ সাহেব। মাঝে মাঝে অফিসে যখন মন খারাপ হয় অথবা কোথাও কোন স্বস্তি খুঁজে পাই না, তখন তাকে খুবই মিস করি। আমি জানি না তিনি কোথায় আছেন, অথবা আদৌ বেঁচে আছেন কি না। শহর ছেড়েছিলাম আমরা ১২/১৩ বছর আগে। তারও ২/৩ বছর আগে ওই চাকরিটি ছেড়েছিলাম। মোবাইলের তত প্রচলন না থাকায় এক সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু তার সাথে চেতনার যোগাযোগটি কখনও আলাদা হতে পারে নি।

The First Impression: কর্মক্ষেত্রে শুরুর দিনগুলো কেমন হওয়া চাই

এবিষয়ে প্রচলিত ইংরেজি প্রবাদটির মানে করলে এরকম দাঁড়ায়: প্রথম চমক দেবার দ্বিতীয় সুযোগটি পাবেন না। ফার্স্ট ইম্প্রেশন কীভাবে ভালো করা যায় এবিষয়ে টিপস ও পরামর্শের অভাব নেই বাজারে। যে কেউ চাইলেই পাবেন আর উপদেশের সাগরে ভাসতে পারবেন; কূল খুঁজে পাবেন না। হঠাৎ একটি বিষয়ে নানামুখী নসিহত পেয়ে মানসিক চাপ বেড়ে যায়। শেষে নিজের যতটুকু ছিলো তা-ও হারাতে হয়। টিপস গ্রহণ করার ব্যাপারে প্রথম টিপস হলো: সবই গলাধকরণ না করা। সবকিছু সবার জন্য সবসময় প্রযোজ্য হয় না। তবে পড়ার জন্য পড়া যায় – রিডিং ফর প্লেজার! কোন ডেডলাইন সামনে নিয়ে পরামর্শ নেওয়া আর পরীক্ষার পূর্বে ভোর রাত পর্যন্ত পড়া একই কথা।

কর্মজীবনের শুরুর দিনগুলো ভালোভাবে অতিক্রম করতে পারলে, এবং প্রথম চাকরিতে সুনাম অর্জন করতে পারলে – তা পরবর্তিতে মজবুত ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। অনেকে ইনটার্ন বা শিক্ষানবীশ বা স্বেচ্ছাসেবকের কাজকে অবহেলায় শেষ করেন। সেটিও প্রথম চাকরি হিসেবে ধরলে, তা থেকে পরে অনেক সুফল পাওয়া যায়। বলছি শুরুর দিনগুলোর কথা:

• ভালো দিয়েই হোক শুরু:
অলৌকিক বা অস্বাভাবিক কিছু না ঘটলে, শুরুর দিনেই কোন প্রতিষ্ঠানে সুপারম্যান হিসেবে আবির্ভূত হওয়া কঠিন। নিজের মতো থাকাটাই বেশি দরকার! তবে কিছু বিষয়ে বিশেষ ফোকাস দিলে, অপেক্ষাকৃত অল্প সময়ে প্রারম্ভিক অস্বস্তিগুলো কাটিয়ে ওঠা যায়। প্রথম দিনের স্কুলের মতো প্রথম দিনের উত্তেজনা সবকিছুতেই থাকে – কর্মস্থলে একটু বেশি থাকে। তাই দেহ মন এবং আপনার আউটলুককে ভালো মতো প্রস্তুত করে নিন। রাতের বিশ্রাম, সকালের নাস্তা, পরিপাটি পোশাক – এসব হলো অতি ব্যক্তিগত প্রস্তুতি যা স্বাভাবিকভাবেই সকলে করে। পোশাকের ক্ষেত্রে শালীনতার পাশাপাশি আপনার আরাম ও স্বস্তির বিষয়টিকে উপেক্ষা করবেন না। পরিচয়ের সময়ে স্বাভাবিক থাকুন এবং পরিবেশ অনুকূল হলে নিজেই উদ্যোগী হয়ে ডেস্ক-টু-ডেস্ক গিয়ে করমর্দন করুন দৃঢ়তার সাথে। কণ্ঠে বিনয় থাকুক, তবে আত্মবিশ্বাসকে যেন হারিয়ে না ফেলেন।

• নোট নিন:
হয়তো শুধু রাশেদ নামেই অন্তত ৩জনের সাথে পরিচয় হবে। কেউবা হবেন আপনার ক্লাসমেটের বন্ধুর বড়ভাই বা বড় বোন। কেউ হতে পারেন আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই। প্রথম দিনের মিটিংয়ে চোখ ছাড়াবড়া হতে পারে। হাতে পাবেন একগাদা নিয়মাবলী আর পলিসিপত্র। একদিনের তুলনায় অনেক তথ্য আপনার ওপর ওইদিন ঝাঁপিয়ে পড়লেও সকল তথ্যেরই ভবিষ্যত মূল্য আছে। তাই নোট রাখুন, দেখবেন পরে নিজেকে এজন্য বাহ-বাহ দেবেন। এ অভ্যাসটি পরেও ধরে রাখতে পারেন।

• নম্র ভদ্র পরিপাটি ও সময়নিষ্ঠ:
নম্রতা-ভদ্রতা-নিয়মনিষ্ঠতাই কর্মজীবনের চাবিকাঠি নয়, তবু এসব যাদের থাকে, তারা একটু একস্ট্রা লিভারেজ পেয়ে থাকেন। অফিসে সময়মতো আসাকে অভ্যাসে পরিণত করুন কর্মজীবনের শুরুতেই। সম্ভব হলে পনের-বিশ মিনিট হাতে রাখুন, কিন্তু দেরিতে আসাকে শুরু থেকেই এড়িয়ে চলুন, তাতে সকালের অস্বস্তি থেকে অন্তত আপনি রক্ষা পাবেন। কাজে ভুল হলে বা দেরি হলে, এবং তাতে আপনার সিনিয়র বিরক্ত হলে, শুরুতেই কারণ দাখিল করবেন না। আগে তাকে বলতে দিন। কাজে ও আচরণে নিজেকে পছন্দনীয় করে তুলুন সিনিয়র-জুনিয়র-পিয়ার সকলের কাছে।

• বুঝে নিন বাতাস কোন্ দিকে বয়:
কল্পিত পূর্বধারণা নিয়ে বর্তমান কর্মস্থলকে বিচার করা যায় না। প্রথম দিনেই সহকর্মীদের আড্ডায় হট্টহাসিতে মেতে ওঠবেন না, আরও দেখুন। প্রতিষ্ঠানের স্বভাব এবং পলিসি জানতে সময় লাগে। তেমনি সময় লাগে সহকর্মীকে সঠিকভাবে বুঝার জন্য। এজন্য পর্যাপ্ত ধারণা না নিয়ে কোন বৃহৎ বিষয়ে মতামত বা প্রতিক্রিয়া প্রকাশ না করা হবে উত্তম। জেনে নিন প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও কাজের ধারা এবং অফিসে কাদের প্রভাব বেশি। শুরুতে অনেকেই একটু স্মার্টনেস দেখানোর সুযোগ নেবে, কিন্তু নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। গসিপিং বা সমালোচনামূলক আড্ডায় কোন কনট্রিবিউশন না করাই হবে বিচক্ষণ পেশাদারের কাজ। কৌশলে এড়িয়ে চলুন – সম্ভব না হলে বিষয় পরিবর্তন করুন।

• নিজেকে মেলে ধরুন:
শিক্ষা জীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি তো হয়ে গেলো, এবার সময় নিজেকে গড়ে তোলা। তাই শিক্ষা জীবনের উচ্ছ্বাস বা হতাশার বিষয়গুলো যেন আপনাকে আর পিছু না টানে। বেতন এবং পদবির ব্যাপারে যদি আর কিছুই করার না থাকে, তবে ওসব বিষয় যেন আপনার কর্মস্পৃহায় আর বাধা না সৃষ্টি করে। এবার সময় নিজেকে মেলে ধরার। কাজের মধ্য দিয়ে নিজেকে আবিষ্কার করতে চাইলে, কাজেই নিজেকে শতভাগ নিয়োজিত করুন। মিটিং বা প্রেজেন্টেশনে যথাযথ পূর্ব প্রস্তুতি নিন – স্টাডি করুন প্রতিষ্ঠানের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে। হিনমন্যতাকে জয় করে নিজের মতামত বিনয়ের সাথে তুলে ধরুন, যখনই সুযোগ আসে। আপনি যে প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে ভাবছেন, তা কর্তৃপক্ষকে বুঝতে দিন। আপনাকে তুলে ধরার দায়িত্ব আর কেউ নেবে না – এই ‘গিয়ানের কথাটি’ মনে রাখুন।

• সম্পর্ক গড়ুন, শতভাগ না মিললেও:
ব্যক্তিগতভাবে কাওকে পছন্দ না হতেই পারে। কিন্তু এসবকে ভিত্তি করে তাদের সাথে ‘কাজের সম্পর্ক’ যেন বিনষ্ট না হয় খেয়াল রাখতে হবে। যদিও কর্মস্থলে খুব বেশি ঘনিষ্ট হওয়াকে অনেকেই সমর্থন করেন না, কিন্তু পৃথিবীর সব আরাধ্য বিষয় তাদের কাছেই চলে আসে, যারা সম্পর্ক গড়তে এবং ধরে রাখতে পারেন। চাটুকারিতা এবং নেকামি এড়িয়ে সততা এবং আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলুন – ঘনিষ্ট না হলেও সেটি কাজে আসবে।

• শ্রম দিন, চ্যালেন্জ নিন: 
কর্মজীবির জন্য কাজই জীবন। কাজের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলুন। সবসময় প্রত্যাশার চেয়ে একটু বেশিকিছু করার প্রচেষ্টা আপনার কাজে উৎকর্ষতা এনে দেবে। অন্যকে সহযোগিতা দিতে পারা একটি মূল্যবান যোগ্যতা। যারা বেশি শ্রম দিতে জানে, তারা নিজের কাজ শেষে অন্যকে সাহায্য করারও সময় পায়। আপনি কাজ এবং চ্যালেন্জ নিতে পছন্দ করেন, এরকম ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে, আপনার কর্মস্থল হবে হাওয়াও ওড়ে বেড়ানোর মতো সহজ।

• কতৃপক্ষকে স্বস্তিতে রাখুন: 
পেশাদারিত্বের এযুগে বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। আপনার জৈষ্ঠ্য সহকর্মী অবশ্যই কিছু বিষয়ে আপনার চেয়ে বেশি জানেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তিনি আপনার বিষয়ে প্রতিবেদন করেন এবং কর্তৃপক্ষ আপনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে তার কথায় প্রথমে গুরুত্ব দেবে। তাছাড়া, তার কাজকে সহজতর করার জন্যই আপনার পদটি সৃষ্ট হয়ে থাকতে পারে। তাই চেষ্টা করতে হবে, কীভাবে নিজের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি সিনিয়র বসের কাজকে সহজতর এবং আরামপ্রদ করে দেওয়া যায়। তাতে আপনার সিনিয়র আপনার কাজের ধরণ সম্পর্কে অবগত থাকবেন। তাছাড়া, এর মধ্য দিয়ে আপনি হয়তো, তার কাজের পদ্ধতি এবং প্রকার জেনে নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে পারেন। তাই শুরুতেই এবিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দিলে নিঃসন্দেহে এতে উপকার আছে।

• দ্বিধা ছাড়ুন; নিজের উপলব্ধি প্রকাশ করুন, কিন্তু সমালোচনার দরজাও খুলে রাখুন: 
কিছু না বুঝলে প্রশ্ন করতে দ্বিধা করবেন না। তাছাড়া, প্রথম দিনগুলোতে অনেক অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করার ‘লেজিটিমেট’ সুযোগ আপনার থাকবেই! উপযুক্ত চ্যানেলের মাধ্যমে নিজের উপলব্ধিকে সততা ও আত্মবিশ্বাসের সাথে প্রকাশ করুন। হয়তো সবসময় সঠিক হবে না, কিন্তু অন্তত নিজেকে যাচাইয়ের সুযোগ পাবেন। কাজ করলে ভুল হবে, তাতে সমালোচনাও হবে। সমালোচনাটি সঠিক বা প্রাসঙ্গিক না হলেও সেটি ইতিবাচক আচরণ দিয়ে গ্রহণ করুন। সময় এবং স্থানটি উপযুক্ত না হলে ডিফেন্স করার প্রয়োজন নেই – সময়ের অপেক্ষায় থাকুন।

কর্মক্ষেত্রে ভালো পারফরমেন্স করতে চায় না, এরকম মানুষ খুব কমই আছে। শুধু শুরুর দিনে নয়, ক্যারিয়ার ডিভেলপমেন্ট-এর জন্য সমস্ত কর্মজীবন জুড়েই একরকম প্রচেষ্টা থাকতে হয়। তবে শুরু ভালো হলে নিশ্চিতভাবেই পরবর্তী কর্মজীবনে এর প্রভাব গিয়ে পড়ে। (সমাপ্ত)

সূত্র: ১) ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ২) ডেইলি স্টার সহ বিভিন্ন মাধ্যম।

[প্রাত্যাহিক জীবনের একটি বৃহৎ অংশ জুড়ে রয়েছে আমাদের অফিস লাইফ। তাই এ নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার প্রয়োজন আছে। কর্মক্ষেত্রে অযোগ্যতা বা অনিয়মকে দুর্নীতির জননী বলা হয়। এর সাথে সফল শিক্ষাজীবনের সরাসরি কোন যোগসূত্র নেই: চরম মেধাবী শিক্ষার্থীটিও কর্মস্থলে গিয়ে ভিমরি খেতে পারে। কর্মজীবন বা কর্মস্থলের উন্নয়ন তথা পেশাদারিত্ব নিয়ে বাংলায় পর্যাপ্ত লেখালেখি হচ্ছে না। আমি অনুরোধ করবো কর্মজীবি সহব্লগারদেরকে, তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার জন্য। সেটি মন্তব্য বা ‘আলাদা পোস্ট’ আকারেও আসতে পারে। তাতে নবাগত বা ভবিষ্যৎ পেশাদাররা উপকৃত হবেন আর উন্নত হবে আমাদের কর্মস্থল।]

============================================
**কর্মসংস্থান ও কর্মজীবন নিয়ে অন্যান্য পোস্টগুলো:

১)) বাজার বুঝে কর্মসংস্থান খোঁজা

২)) কর্মসংস্থানে আত্মশক্তির গুরুত্ব

৩)) কর্মজীবনে উন্নতির জন্য সোস্যাল নেকওয়ার্কিং

যে কারণে চাকুরি প্রার্থীদের জন্য সময়টি কঠিন

cccc

আমরা তো বিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায়ই ‘জীবনের লক্ষ্য’ নিয়ে রচনা লিখি। অবশ্য ডাক্তার, প্রকৌশলী, পাইলট বা ব্যারিস্টার ছাড়া আমাদের আর কোন লক্ষ্যও থাকে না। কিন্তু কতজনে তার লক্ষ্য মতো জীবনকে গড়তে পারে? তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যে বিষয়ে পড়া হয়, সেবিষয়ে কি সকলেরই চাকরি হয়? মাঝে মাঝে ভাবি আসলেই কি পেশা নির্বাচন করার ক্ষমতা আমাদের আছে? ডাক্তার, আইনজীবি আর প্রকৌশলী ছাড়া, আর কোন বিষয়ে কি ‘নিজের পছন্দমতো’ চাকরি হয়? এখন তো মনে হয় ডাক্তার-উকিল-প্রকৌশলীদেরও সে সুযোগ কমে যাচ্ছে। প্রতি বছর হাজার হাজার ডাক্তার বের হচ্ছে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে।

এমন পরিস্থিতিতে আমাদের জন্য মাত্র দু’টিই পথ: নিজের পছন্দের বিষয়ে সর্বোচ্চ দখল, না হয় যেকোন বিষয়ে কাজ করার মতো ‘অনুকূল’ মানসিকতা। হয় যেকোন চাকরিতে নিজেকে মানিয়ে চলতে হয়, না হয় নিজের বিষয়ে যথেষ্ট ধারণা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়। হয় চাকরি করো, না হয় চাকুরি সৃষ্টি করো। মাঝের জায়গাটি বড়ই ‘আরামহীন’: অনেকে একে ‘বেকার’ নামে চেনেন!

.

মানুষ দু’প্রকার: চাকুরি প্রার্থী েএবং চাকুরি দাতা

আগেই বলে রাখা ভালো ‘লেখক হওয়া’ কিন্তু একটি আত্মকর্মসংস্থানের নাম। তবে কর্মজগৎকে বিবেচনায় আনলে দু’রকমের কর্মজীবি আছে: নির্ধারক nominator এবং নির্ধারিত nominee । এক দল চাকরি দেয়, আরেক দল চাকরি করে। অথবা বলা যায়, এক দল পরিচালনা দেয়, আরেক দল ‘পরিচালিত হয়’।

যারা বিচক্ষণ, দূরদর্শী এবং নেতৃত্বদানে দক্ষ, তারা সাধারণত ‘নির্ধারকের’ ক্ষমতা ও সম্মান লাভ করেন। তারা অনেকটা প্রাকৃতিকভাবেই মেধাবী এবং স্বাধীনচেতা। চাকরি হোক অথবা ব্যবসায়, তারা হলেন নিজ বিষয়ের ওস্তাদ এবং চাকুরিদাতা।  এখানে প্রধান চ্যালেন্জ হলো মানুষকে পরিচালনা দেওয়া। তবে তারা সাধারণত চ্যালেন্জ-পিপাসু হয়। তারা নিয়তি বা ভাগ্যে খুব একটা বিশ্বাসী নয় – নিজেই নিজের ভাগ্যের নির্মাতা। নিজের পথের নির্দেশ নিজেই বের করে। গাড়ির ড্রাইভারের মতো।

পক্ষান্তরে ‘নির্ধারিতদের’ ভাগ্য লেখা থাকে ‘নির্ধারকদের’ হাতে। প্রতিশ্রুতিহীন এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন মনোভাব তাদের এপরিস্থিতির জন্য দায়ি। তারা কখনও সৃজনশীল হতে পারে না, যেমন পারে না দায়িত্বশীল হতে। নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে আর থাকে বসের দয়ার ওপর নির্ভরশীল। অনেকে একে নিজের নিয়তির সাথে মিলিয়ে নেয়। তারা যেমন জীবনের লক্ষ্য স্থির করতে পারেন না, তেমনি পারেন না পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে। এখানে চ্যালেন্জের সীমা নেই, মানিয়ে চলতে পারলে উত্তম কর্মী। যেভাবে চালানো যায়, সেভাবেই তারা চলে। গাড়ির যাত্রীর মতো।

.

bbbb

“Never depend on single income. Make investment to create a second source.”  

-Warren Buffet, the World’s Richest Man

কর্মজগৎ মূলত দু’টি জনগোষ্ঠির হাতে আটকে আছে: নির্ধারক এবং নির্ধারিত। অনেকেই আত্মসচেতনতা আর ‘ব্যক্তিগত জেদের’ শক্তিতে এগিয়ে আসে। Success is a matter of choice – সময় থাকতে যারা টের পেয়ে যায়, তারা মাইগ্রেট করতে পারেন দ্রুত।

.

.

*কর্মসংস্থান নিয়ে প্রাসঙ্গিক আরেকটি লেখা

________________________________________________________________________

পুনশ্চ: প্রায় ন’টি বছর প্রতিষ্ঠানের ‘অপারেশন’ বিভাগে থাকার পর এবছরের শুরুতে ‘এডমিনিস্ট্রেশন’ বিভাগে স্থানান্তরিত হই। অর্থ, সম্পদ ও কর্মী সম্পর্কে অর্জিত হয় বিরল অভিজ্ঞতা। মানুষের কর্মক্ষমতা সম্পর্কে অনেক সংকীর্ণ ধারণা বিস্তৃত করার সুযোগ পাই। মানুষ পারে না, এমন কাজ পৃথিবীতে কমই আছে। শুধু একটু অন্তর্মুখী রাগের প্রয়োজন!

কর্মসংস্থান ব্যবসায় : একটি অনাবিষ্কৃত শোষণ ব্যবস্থা

Eye Opener-crop

“শহিদুল সাহেবের সাথে এতগুলো বছর অতিক্রম করে আমি আমার ক্যারিয়ারটাকে শেষ করে দিয়েছি। সারাটি জীবন ম্যানেজারই থেকে গেলাম। অথচ বিএ পাশ করার পর একাজটি পেয়ে আমি কত খুশি হয়েছিলাম। তখন দয়া করেই তৎকালীন ম্যানেজিং ডিরেক্টর শহিদুল সাহেব আমাকে ম্যানেজারের কাজটি দিলেন। চিঠিলেখা, কারখানার সাথে প্রডাকশন ফলো-আপ করা, হিসাব করা, বিদেশি ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগ করা ইত্যাদি কাজে আমি দারুণ মজা পেতাম। এমএ’টা করারও আর প্রয়োজন বোধ করলাম না। ১৯৯৮ সালে আমার বেতন ছিলো ৬০০০ টাকা। বছর গড়ালেই কাজ বাড়তো, কিন্তু বেতন বাড়তো না। অনুযোগ করলেই বলা হতো, ‘তোমার তো কোন অভিজ্ঞতা ছিলো না। এখানে কাজ শিখার যে সুযোগ পেয়েছো, সেটারও তো একটু মূল্য আছে। কাজ শিখো, বেতন তুমি পাবে।’ সেই সেই সময় আর এলো না আজ ২০১৩ সালেও আমার বেতন মাত্র ২০,০০০ টাকা। এদিকে সংসারের সদস্য বেড়ে ৬জনে দাঁড়িয়েছে। মেয়ের স্কুলের বেতন ও প্রাইভেটের পড়ানোর খরচ।

“শহিদুল সাহেব এখন একই প্রতিষ্ঠানসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। অথচ আমি ম্যানেজারেই রয়ে গেলাম! আজ ভাবছি, কী ভুলই না করেছিলাম, তার আশ্বাসে আশ্বস্ত হয়ে! কত চাকরির প্রস্তাব দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে প্রত্যাখ্যান করলাম, তার হিসেব নেই। আজ আমিও প্রতারিত, সে সাথে আমার স্ত্রী-সন্তানকেও প্রতারনার ভুক্তভোগী বানালাম।”

.

.
গল্পটির সব বলা হয় নি। দরকারও নেই, কারণ এরকম গল্পের অভাব নেই আমাদের সমাজে। যা হোক, তরুণ ভাইবোনদেরকে আমি আগে বলতাম, যাচাই-বাছাই না করে প্রথমে যে কোন একটি কাজে ঢুকে পরতে। তাতে বেকারত্বও কাটবে, আবার অন্য একটি চাকরির জন্য যোগাযোগ করার খরচও জুটবে। বেকারকে কেউ চাকরি দিতে চায় না। এক সময় দেশের নতুন পাশ-করা গ্রাজুয়েটরা চাকরি বলতে শুধুই সরকারি চাকরিকেই মনে করতো। তাই, পাশ করেই একটি সরকারি চাকুরির জন্য আদা-জল খেয়ে লেগে যেতো আর পায়ের জুতা ক্ষয় করতো।

কিন্তু এখন ভিন্ন কথা। সময় পাল্টেছে, প্রতিযোগিতা বেড়েছে কর্মস্থলে। যোগ্যলোকের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে চাকরির সংস্থানও। করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে ব্যাংক-বীমা, আধা-সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য-পযুক্তির কল্যাণে নানাবিধ কাজের একটি বিশাল দরজা উন্মুক্ত হয়েছে। প্রাইভেটাইজেশনের কারনেও ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের সংখ্যা বেড়েছে সংখ্যাতীত ভাবে। ফলে চাকুরির খাতও বেড়েছে, সংখ্যাও বেড়েছে।

যোগ্য ব্যক্তিকে এখন আর বসে থাকতে হয় না। চাকুরির একটা ব্যবস্থা হয়েই যায়। চাকুরির রকম, স্থান, মান ইত্যাদি আপনার পছন্দ না হতে পারে, কিন্তু চাকুরি আছে বাজারে।

এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, দেখে-বেছে চাকুরি গ্রহণ করা এবং অধিকতর ভালো সুযোগ পেলে বর্তমান চাকুরির মায়া ত্যাগ করাই হলো উত্তম। কিছু প্রতিষ্ঠানে কাজ আছে, বেতনও ভালো, কিন্তু পদোন্নতি বা যোগ্যতা প্রদর্শনের সুযোগ নেই। চাকুরি করেই যদি খেতে হয়, তবে পেশাদারি আচরণ নিতেই হবে, এবং নিজের ক্যারিয়ার ডিভেলপমেন্ট-এর বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে।

কর্মসংস্থান আর ‘সুযোগ দেবার’ নামে নব-আবিষ্কৃত শোষণ ব্যবস্থাটি হলো, কম বেতনে এবং কম সুযোগে কোন প্রতিশ্রুতিশীল কর্মীকে ধরে রাখা। তাকে এমনভাবে সম্মোহন করা, যাতে সে অন্য চাকুরির সন্ধান না করে। পাঁচ-দশ বছর যাবার পর তার কর্মশক্তি যখন একটি কাজেই আটকে যায়, তখন প্রতিষ্ঠান তাকে আর আটকায় না। কিন্তু তখন তার আর কিছুই করার থাকে না।

তাই এখন সেই পরামর্শ আর আমি নতুন প্রজন্মকে দিই না। তাদেরকে একটিই কথা বলতে চাই: আপনি যে কাজ বা যে পেশা নিতে চান, সেই পেশার সাথে সম্পৃক্ত কাজেই যুক্ত হোন – বেতন না থাকলেও সেটি আপনাকে ক্যারিয়ান গঠনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। অগত্যা কোন অড জবে আটকে গেলে, যত দ্রুত সম্ভব ওখান থেকে বের হয়ে আসুন। অনুসন্ধান করুন নিজের যোগ্যতা-ভিত্তিক কাজের।

Do What You Love and
Love What You Do!