Category: প্রিয় সমাজ

চলছে বাণিজ্যিক শোষণ! রিভিউ লেখুন, মুনাফাখোরদের আগ্রাসন থেকে অসহায় ভোক্তাকে মুক্তি দিন…


রাতের নির্জনতায় অথবা অফিসের ব্যস্ততায় হুট করে একটি বার্তা এসে হাজির। আপনি হয়তো ভাবলেন বুঝি আপনার আপন কেউ আপনার খবর নিচ্ছে। কিন্তু না। ‘দারুণ অফার’ নামক নতুন আরেকটি অনাকাঙ্ক্ষিত মেসেজ। ছুটির দিন দুপুরের আহারশেষে আয়েশ করে একটি বৈকালিক ঘুম দিলেন, কিন্তু তা আর হয়ে ওঠলো কই? ‘দারুণ অফার’ এসে হাজির! একটি প্রতিষ্ঠিত ও স্বনামধন্য মোবাইল ফোন অপারেটর তাদের প্রোমোশনাল আইটেমগুলো নিয়ে এমন জ্বালা-যন্ত্রণা শুরু করেছে যে, সেটি স্বাভাবিক জীবনকে অস্বস্তিতে ফেলছে। আগে তারা শুধু বার্তাতেই সীমাবদ্ধ থাকতো, কিন্তু এবার কল করতে শুরু করেছে। অসহায় গ্রাহক তখন কী করবেন?

দেশের সুপারশপগুলো শুরু করেছে সুপার বাটপারি। মনে করুন, ৫৪৪ টাকার বিল হয়েছে। সেক্ষেত্রে আপনাকে ৫৪৫ টাকা দিতে হবে, কারণ তাদের কাছে ১টাকা চেইন্জ নেই! কিছুদিন তারা ক্রেতাকে ১টাকা দামের চকলেট খেতে বাধ্য করেছে, এবার সেটিও আর করছে না। ৫৫০ টাকা দিলে বিনাবাক্যে ৫টাকা দিয়ে তারা পরবর্তি ক্রেতার দিকে মনযোগ দেয়। এটি তো গেলো দৃশ্যমান প্রতারণা। ধরুণ আপনার বিল হয়েছে ৫৪৭.২৫ টাকা। তবে কি তারা আপনাকে পৌনে তিন টাকা ফেরত দেবে? বড়জোড় ২টাকা পেতে পারেন। এভাবে তারা ক্রেতাকে ঠকিয়ে হাজার হাজার টাকা অতিরিক্ত আদায় করছে। কেউ কি হিসাব করেছে? তাছাড়া, পণ্যের কোয়ালিটির কথা বাদই দিলাম। তো এসব ক্ষেত্রে ভোক্তার কত সময় আছে, পঁচাত্তর পয়সার জন্য বিশাল বড় সুপারশপগুলোর সাথে বাদানুবাদে যাবার?

ফাস্টফুড রেস্তোরাঁগুলোতেও একই দশা। চারশ’ টাকা দিয়ে একটি বার্গার অর্ডার করে দেখবেন, সেখানে চিজ (পনির) নেই। কেন নেই? কারণ আপনি তা দিতে বলেন নি। পনির দেবার জন্য এক্সট্রা আরও হয়তো ৪০/৫০ টাকা যোগ করতে হবে। খাবারের মান নিয়ে কথা বলবেন? তাদের চাকচিক্য দেখে কি কখনও সন্দেহ হবে যে, তারা মৃত মুরগির মাংসকে হার্বাল স্পাইস মিশিয়ে ফ্রাই করে আপনাকে খাইয়েছে? নিশ্চিত হলেও তা বলার পরিবেশ আপনি পাবেন না, কারণ আপনি একা।

এ প্রসঙ্গে দেশের শিক্ষা বা চিকিৎসা সেবা নিয়ে কিছু বলার প্রয়োজন আছে কি? চিকিৎসার সেবার অব্যবস্থা নিয়ে কথা বললে আরব্যরজনীর মতো শেষ হবার নয়। এখানেও স্বল্পবিত্তরা নিতান্তই একা আর অসহায়। উচ্চবিত্তদের জন্য দেশীয় চিকিৎসার দরকারই নেই!

ফলে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি মৌলিক অধিকারগুলোর জন্য টাকা খরচ করেও ভোক্তা বঞ্চিত হচ্ছে। এভাবে ভোক্তাবাজারের বিভিন্ন সেবাখাত থেকে শোষণ, বঞ্চণা ও প্রতারণা চলছে হরিলুট কায়দায়। শোষকেরা এখানে ঐক্যবদ্ধ, শোষিতরা নানা ধারায় বিভক্ত।

পুঁজিবাদি সমাজে একটি মুনাফাখোর শোষক শ্রেণী গড়ে ওঠে এবং ওঠেছে। তারা দৈত্যের ন্যায় শক্তিশালী কারণ শাসকশ্রেণীও একই স্বার্থে তাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ। মাঝে মাঝে শাসকেরা খুবই সূক্ষভাবে আইওয়াশ করেন অবশ্য। কিন্তু সকলেরই উদ্দেশ্য যেকোনভাবে লাভবান হওয়া। বিজনেস এথিক্স এখানে অনুপস্থিত। কোথাও কোন নিয়ন্ত্রণ নেই, নেই কোন আইনের প্রয়োগ। বিখ্যাত এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোও এই লাগামহীন বাজারের সুবিধা নিচ্ছে, কারণ এখানে তাদের ভালো থাকার বাধ্যবাদকতা নেই। অন্যদিকে শোষিতরা নিরব! কী করবে তারা? নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত ভোক্তাশ্রেণীর তো কোনই ক্ষমতা নেই। মাঝেমাঝে ভোক্তার অধিকার বলে শুধুই চিৎকার করি, যা কোন কাজে আসে না।

মোদ্দাকথা হলো, ভোক্তারা নিজেদের মতামতকে কার্যকরভাবে প্রকাশ না করলে, তাদের অসহায়ত্ব সম্পর্কে কোন ধারণা সৃষ্টি হয় না। ভোক্তার আহাজারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কানে পৌঁছায় না, পরিস্থিতিরও উন্নয়ন হয় না।

.
২)
গত বছর কোরিয়া বেড়াতে গিয়েছিলাম। সপ্তাহ দুই বেড়ানোর পর ফেরার পথে সঙ্গত কারণেই লাগেজটা মোটা হয়ে গেলো! উপায় না দেখে আরেকটি লাগেজ কিনতে বাধ্য হলাম। কিন্তু বিমানে ওঠার পূর্বের রাতে দেখা গেলো যে, লাগেজটির একপাশের সেলাই ঢোলা হয়ে গেছে। মহাফ্যাসাদে পড়লাম! এখন তো আর কেনার সময় নেই, বদলাবারও সুযোগ নেই! কিন্তু আমার সফরসঙ্গীকে ততটা চিন্তিত হতে দেখলাম না। কিছুক্ষণ পর আমাকে জানানো হলো যে, লাগেজের দোকান থেকে নতুন একটি লাগেজ ২০মিনিটের মধ্যেই বাসায় পৌঁছাবে। সত্যিই তাই হলো! তারা বাতিলকৃত লাগেজটি নিতে চাইলেন না, দেখতেও চাইলেন না, বরং দুঃখ প্রকাশ করলেন। আমি তো বিস্ময়ে হতবাক!

আমাদের দেশে হলে তো এই সমস্যার দায়িত্বই দোকানদার মাথায় নিতো না। অবিলম্বে আমি এই যাদুর মাজেজা জানার জন্য ওঠেপড়ে লাগলাম। আমার সফরসঙ্গী জানালেন যে, এখানে ইন্টারনেট কমিউনিটি খুবই প্রভাবশালী। প্রসঙ্গত, ইন্টারনেট ব্যবহারে (internet penetration) কোরিয়ানরা পৃথিবীর শীর্ষে। কোন কোম্পানি/পণ্য সম্পর্কে কোন ভোক্তা যদি নেতিবাচক কোন অভিমত প্রকাশ করে, তবে কয়েক মিনিটের মধ্যে তা হাজার হাজার ভোক্তার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন সকাল হতে হতেই কোম্পানিতে লালবাত্তি!

আমরা তো দিনভর ফেইসবুক দিয়ে ইন্টারনেট চালাই আর পণ্যের নিম্নমান নিয়ে মুখেমুখেই চিল্লাবিল্লা করি। ছবিসহ দু’টি লাইন লেখে দিলেই কিন্তু সংশ্লিষ্ট কোম্পানির টনক নড়বে। সেটা করি না – ব্যস্ত থাকি সেল্ফি আর কাউফিতে। আইন বলুন আর সরকার বলুন, না কাঁদলে আপন মাতাই দুগ্ধ দেয় না!

একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল সম্প্রতি ‘রিভিউ’ নামে একটি বিভাগ খুলেছে। সেখানে মূলত বিভিন্ন ব্র্যান্ড নিয়ে ইতিবাচক গুণকীর্তন করা হয়। তবু কোন ভোক্তা সেখানে তার নিজের অভিমতটি প্রকাশ করতে পারেন। তাছাড়া, ব্লগে, ফেইসবুকে অথবা টুইটারে প্রকাশ করতে পারেন নির্দিষ্ট সেবা/পণ্য সম্পর্কে ভোক্তার অভিজ্ঞতা। তাতে প্রতারিত/সংক্ষুব্ধ ভোক্তাদের মধ্যে একতা বৃদ্ধি পাবে, সে সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানও সচেতন হতে বাধ্য হবে।

 

.

পণ্য বা সেবার বাস্তব ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক রিভিউ লেখে আমরা সমাজের অসামান্য উপকার সাধন করতে পারি:

• প্রফেশনাল রিভিউ: পেশাদার মূল্যায়ন। আমরা নির্দিষ্ট কোন ব্র্যান্ডের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারি। সঙ্গে থাকবে ইতিবাচক ও নেতিবাচক বিষয়ের সুসমন্বয়। দামের সাথে উপযোগিতার তুলনা। এটি সংশ্লিষ্ট কোম্পানির জন্য মহামূল্যবান নির্দেশনা হতে পারে। নিজের পরিচিত পণ্য দিয়েই শুরু করা যায় রিভিউ। উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্র্যান্ডগুলো এসব মূল্যায়নকে খুবই গুরুত্ব দেয়। একসময় উচ্চমূল্যে বিক্রি হতে পারে একটি রিভিউ।

• কনজিউমার রিভিউ: ভোক্তার অভিমত। এর আরেক নাম হতে পারে, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। এটি পেশাদার অথবা ভারসাম্যপূর্ণ হবার বাধ্যবাদকতা নেই। ভোক্তা যখন-তখন একটি রিভিউ লেখে তা নিজের ফেইসবুকে/ব্লগে/টুইটারে প্রকাশ করতে পারেন। তাতে কিছু কাজও হবে, ক্ষোভও প্রশমিত হবে। একপেশে বা আবেগাক্রান্ত না হলে সেটি বেশি ফলদায়ক হবে। যুক্তি এবং প্রমাণনির্ভর হলে সেটি কাঙ্ক্ষিত সুফল নিয়ে আসবে। ছবি থাকলে তো কথাই নেই!

ব্লগিং-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো, নাগরিক সাংবাদিকতা, যা আউট-অভ্-ফোকাস ও অবহেলিত মানুষের অধিকারের কথা বলে। আমি মনে করি, ব্লগারদের নৈতিক দায়িত্ব আছে দেশের অসহায় ভোক্তাদের পক্ষে কথা বলার। তারা নিজেরাও তো একেকজন ভোক্তা। বাস বলুন আর রিক্শা বলুন, কাঁচাবাজার বলুন আর শেয়ার বাজার বলুন – ভোক্তার চেয়ে অসহায় আর কে আছে!

.

.

*পাবলিক ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া: ১৯ অক্টোবর ২০১৫

নারী অধিকার: মার্সিয়া বার্নিকাটের নাট্যাভিনয়, কিছু অভিমত…

Mukhtar Mai

 

মার্চের ৬ তারিখ। স্থান – ধানমণ্ডির ছায়ানট নাট্যমঞ্চ। আমেরিকার রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাটের রুদ্ধকণ্ঠ। তিনি অভিনয় করছেন মুখতার মাইয়ের ভূমিকায়। মুখতারন মাই। গণধর্ষণের শিকার পাকিস্তানের নির্যাতিতা নারী মুখতার মাই হয়ে বার্নিকাট বলে চলেছেন তার নির্যাতন আর বিচারহীনতার মর্মন্তুত কাহিনি। গ্রামের মোড়ল, স্থানীয় শালিস এমন কি সংবাদমাধ্যমও যাকে চুপ থাকতে বলেছিল, সেই মুখতার মাই দেখিয়েছেন কীভাবে সুবিচার আদায় করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। বার্নিকাট যেন অভিনয় করছিলেন না, নিজেই মুখতার মাই হয়ে ওঠেছিলেন সেদিন সন্ধায়।…

ফিরে যাচ্ছি ২০০২ সালের ২২ জুনের দুপুর ২ঘটিকায়। স্থান মীরওয়ালা গ্রাম, মোজাফ্ফরগড় জেলা।মুখতার মাই ধর্ষিত হলেন চার নরপশু কর্তৃক। প্রতিহিংসার বশে ধর্ষণ। ধর্ষকেরা প্রভাবশালী। স্থানীয় থানা মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। ধর্ষকেরা একই গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছে বীরদর্পে। তারা নিরক্ষর মুখতার মাইকে বিভিন্নভাবে চাপ দিতে থাকে। বিভিন্ন রকমের সমঝোতার দলিল তৈরি করতে তারা মুখতার মাইকে টিপসই দিতে প্ররোচিত করে। মুখতার মাই বুঝতে পারেন তার নিরক্ষর থাকার পরিণতি। কিন্তু তিনি নিজ অবস্থানে অনড় থাকেন।…

পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে জুম্মাবারের মসজিতে খুদবার পর। ইমাম সাহেব আক্ষেপ করে ধর্ষণের ঘটনাটির উল্লেখ করেছিলেন। তাতেই খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে সবপর্যায়ের সাংবাদিকদের সামনে চলে আসে। পাকিস্তানে তখন গণমাধ্যম একটু একটু করে শাসকের রক্তচক্ষু থেকে অবমুক্ত হতে শুরু করেছে কেবল। খবরটি দাবানলের মতো দেশে এবং দেশের বাইরে ছড়িয়ে যায়।

এরই মধ্যে আদালতে শুরু হয় সাক্ষি এবং প্রমাণের লুকোচুরি। আদালত ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও যথাশীঘ্র কোন উপসংহারে আসতে পারছেনা।

ওদিকে মানুষ ক্রমেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠছে। পত্রিকার প্রথম পাতায় সম্পাদকীয় শেষপাতায় প্রকাশ পেতে থাকে মুখতার মাইয়ের পক্ষে মানুষের সমর্থন। সুবিচার যদি পেতে হয়, তবে মুখতার মাই হবেন প্রথম প্রার্থী। এরই মধ্যে একজন সরকারী কর্মকর্তা মুখতার মাইয়ের সংগ্রামী চেতনায় তাড়িত হয়ে তার প্রেমে পড়ে যান।… সে কথা থাক।

আদালত মুখতার মাইয়ের পক্ষে রায় দেয়। পুলিশ সন্দেহভাজন ধর্ষক ও তার সহচরদেরকে গ্রেফতার করে। অতঃপর ধর্ষকেরা পায় মৃত্যুদণ্ড।

পাকিস্তান সরকার মুখতার মাইকে ৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেয়। সেটি তিনি খরচ করেন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায়। মীরওয়ালা গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় মুখতার মাইয়ের বিদ্যালয়!

মুখতার মাই আজ একজন অধিকার কর্মী। বিশ্বব্যাপী অধিকারকেন্দ্রিক নাট্যআন্দোলনের প্রতীক। তার দৃষ্টান্ত পাকিস্তানের রক্ষণশীল সমাজে নারীজাগরণের প্রতিচিত্র।

বার্নিকাটকে মনে হয়নি যে তিনি কোন ভণিতা করছেন। যেন তিনিই মুখতার মাই!… দর্শক মুগ্ধ হয়ে স্মার্টফোনের ফ্লাশ জ্বালিয়ে যাচ্ছে।

নাটক শেষ হবার পর সঞ্চালক দর্শকদের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন এবার। ইংরেজি পর্বের দর্শক হয়ে এসেছেন যারা তাদের আশি শতাংশ বিদেশি কূটনীতিক, উন্নয়ন অংশিদার ও বহুজাতিক সংস্থার কর্ণধার। বলতে হয়, সকলেই অধিকার সচেতন।…

 

অভিমত পর্ব:

মন্তব্য দেবার আহ্ববান পেয়ে দর্শকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা লেগে গেলো। কে কার আগে হাত তুলবে, তার কাছেই চলে আসবে মাইক্রোফোন! এটি কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতা – দর্শকদের অভিমতের কোন মূল্য আছে বলে আমার মনে হয়নি। আমি প্রতিযোগিতায় যোগ দেবার মতো কোন তাগিদ পেলাম না। তবে দেখার আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে চাই নি।

প্রশ্ন ছিল অনেক দীর্ঘ এবং বহু-অর্থক। তবে প্রশ্নের মূলবক্তব্য ছিল অনেক এরকম: ‘নারী অধিকার রক্ষায় আমাদের করণীয় কী?’ সঞ্চালক মনে করিয়ে দিলেন, অন্যকে পরামর্শ না দিয়ে যেন নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়।

কে শুনে নিয়মের কথা! নানা জনের নানান কথা। এক ম্যাডাম বলে বসলেন, যারা মঞ্চে বসে আছেন, অর্থাৎ উন্নত দেশের রাষ্ট্রদূতেরা, তারাই এদেশের সরকারকে পরামর্শ দিন, চাপ দিন, যেন সরকার নারী অধিকারের প্রতি আরও সহযোগী হয়। সম্প্রতি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ বিষয়ক আইনে ‘বিশেষ ব্যবস্থায় বাল্যবিবাহ গ্রহণযোগ্য’ রাখার বিষয়টিকে তিনি ইশারা করছিলেন।

আরেকজন সংস্থাপ্রধান সোজা বলেদিলেন, নারীকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সিদ্ধান্তগ্রহণের সুযোগ করে দিলে নারী অধিকারের উন্নয়ন হবে। সাফ কথা। তার উত্তরে মনে হলো, তিনি একদম প্রস্তুত হয়েছিলেন এই প্রশ্নের জন্য।

শিক্ষার কথা শুনে আরেকজন ইস্মার্ট আপু প্রায় ক্ষেপে গেলেন। শিক্ষা? এটি কি শুধু নারীর একারই প্রয়োজন? পুরুষ তার শিক্ষার অভাবেই নারীকে মানুষ মনে করেনা। পুরুষ যদি প্রকৃত শিক্ষা পায়, তবে নারীকে তার যোগ্য মর্যাদা দেবে। তার মতে শিক্ষার প্রয়োজন নারী পুরুষ উভয়েরই। দর্শকের কর্তালি।

একজন বিদেশি ভাই বেশ মজা করে বললেন, সমস্যাটি নারীর নয়। নারীকে অবদমিত রাখা, তার অধিকারকে অবহেলা করা, একান্তই পুরুষের সমস্যা। এতে নারী কেন কেঁদেকেটে মরবে? যাদের সমস্যা তাদেরকেই সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। সবাই তাতে কর্তালি দিয়ে সমর্থন জানালো।

 

প্রেক্ষিত: নারী অধিকার

বাংলাদেশে যুক্তরাষ্টের রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাট একটি বিশেষ নাটকে অভিনয় করলেন সোয়া একঘণ্টা ধরে। সঙ্গে আরও ছ’জন। সবাই কোন-না-কোনদেশের রাষ্ট্রদূত! নাটকের নাম ‘সেভেন’। এর পূর্বের দিন হয়ে গেলো এর বাংলারূপ ‘সাত’এর মঞ্চায়ন। সেখানেও ছিলেন সুলতানা কামালসহ সাতজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব।

মুখতার মাই (পাকিস্তান), ফরিদা আজিজি (আফগানিস্তান), ইনেজ ম্যাকরম্যাক (উত্তর আয়ারল্যান্ড), ম্যারিনা পিসলাকোভা পার্কার (রাশিয়া), আনাবেলা ডি লায়ন (গুয়াতেমালা), মুসো চুয়া (কম্বোডিয়া) এবং হাফসা আবিওয়ালা (নাইজেরিয়া) – এই সাত নারীর প্রত্যেকেই একজন নাট্যকার। প্রতেক্যেই একটি করে সংগ্রাম করে এসেছেন।

’সেভেন’ নামের প্রামাণ্য নাটকটি আয়োজিত হয়েছে বিশ্বের সাত নারীর অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেবার জন্য। আফগানিস্তান, উত্তর আয়ারল্যান্ড, রাশিয়া, গোয়াতেমালা, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া এবং নাইজেরিয়ার সেই সাত নারী নিজেই লেখেছেন নাটকের সংলাপগুলো। নিজেরাই এর নাট্যকার। নিজেদের জীবনের।

এটি কোন সাধারণ নাটক নয়। এর অভিনেতাও মঞ্চ কিংবা চলচ্চিত্র থেকে আসেন নি। খেলা, অভিনয়, সাংবাদিকতা, কূটনীতি, রাজনীতি, ব্যবসায় ইত্যাদি ক্ষেত্রে যারা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, যাদের কথা মানুষ শুনবে, যাদেরকে দেখতে মানুষ হুমড়ি খেয়ে জমায়েত হবে – তাদেরকে নিয়ে মঞ্চায়িত হয় ‘সেভেন’। বাংলাদেশে বেশ কয়েকবার হয়েছে। চিত্রনায়িকা ববিতাকেও একটিতে দেখা গেছে।

এবছরের নারী দিবসকে কেন্দ্র করে এই আয়োজন। আয়োজক সুইডিশ এম্বেসি, এম্বাসেডরস ফর চেইন্জ এবং জাতিসঙ্ঘের নারী বিষয়ক সংগঠনসহ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা। সাংগঠিকভাবে আমন্ত্রিত হয়ে এই সুযোগ পেয়েছিলাম।

এই অসাধারণ অভিজ্ঞতাটি পাবার জন্য দিনভর গাধার খাটুনি খেটেও সাতটার শো ধরেছিলাম।

 

আমাদের দেশের নারীকে কীভাবে আরও সক্ষমতা দিয়ে দেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়?

শিক্ষার অভাব, ক্ষমতার অভাব, শিক্ষা দাও, ক্ষমতা দাও, ক্ষমতায়ন করো – এসব বিষয়গুলো আমার কাছে খুবই দায়সাড়া গোছের মনে হয়। লোক দেখানো। এগুলোতে মূল সমস্যাকে ঢেকে রাখা হয়েছে। দেশের অর্ধেক জনতাকে ‘অবলা’ রেখে একটি সমাজ এগুতে পারেনা। নারী দিবসের বাণী হোক, সুযোগ সৃষ্টি।

আমাদের সমাজে নারীর প্রয়োজন ‘সুযোগ’। সুযোগের অভাবে এখনও নারী অবলা (শক্তিহীন অর্থে) হয়ে আছে।আপনঘর থেকেই এটি শুরু হওয়া প্রয়োজন। তার পরিবার, এমনকি তার বাবাও তাকে সুযোগ দিচ্ছেন না। তার জন্মদাত্রী মাও দিতে ভয় পান। তার ভাই তাকে সুযোগ দিচ্ছে না, কারণ ‘মেয়ে মানুষের বিপদের শেষ নেই’।

নারীর প্রয়োজন শুধুই একটি সুযোগের। অংশগ্রহণের সুযোগ। নিজেকে গড়ে তোলার সুযোগ। কাজের সুযোগ। সুস্থ থাকার সুযোগ।যাতায়াতের সুযোগ। কথা বলা বা মতপ্রকাশের সুযোগ। কর্মসংস্থান, ব্যবসায়, রাস্তাঘাট, বাজার, সংবাদমাধ্যম সবজায়গায় নারীর জন্য জন্য একটু জায়গা।

স্বীকৃতিরও দরকার নেই, যত দরকার সুযোগের। সুযোগ পেলে স্বীকৃতি না পেলেও নারীর অর্জনকে দেখতে পাওয়া যাবে।

অনেক ক্ষেত্রে নারী নিজেও নিজেকে সুযোগ দিচ্ছেন না, নিজেকে তুলে ধরছেন না। নিজেকে দুর্বল দেখিয়ে তিনি সুবিধা নিতে চান। দুর্বলতাকে নারীত্বের প্রতীক হিসেবে দেখিয়ে তাতে সৌন্দর্য্য খুঁজছেন।

তো… কে দেবে এই সুযোগ? প্রথমত ‘আমি’নিজে। পিতা ‘আমি’, ভাই ‘আমি’, সহযাত্রী ‘আমি’, সহকর্মী ‘আমি’। তারপর পরিবার। তারপর সমাজ। তার পররাষ্ট্র। এবং অবশ্যই নারী নিজে!

 

 

———————–
*নোট: ভয়েসেস প্রজেক্ট নামে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন অধিকারকেন্দ্রিক নাটকগুলোকে জনপ্রিয়তা দিয়েছে। সঙ্গে আছে ইউএনউইমেন

জন আব্রাহামকে কেন আমাদের অনুসরণ করা উচিত?

johnabraham_fitness

 

জন আব্রাহামকে কেন আমাদের অনুসরণ করা উচিত?


 

ভারতীয় সিনেমা স্টার জন অব্রাহামের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ আগে আমার ছিলো না। চলচ্চিত্রাভিনেতা হিসেবে এখনও নেই। জন ছাড়া ভারতীয় চলচ্চিত্রে আরও অনেকেই আছেন যাদেরকে চলচ্চিত্রাভিনেতা হিসেবে আমার পছন্দ। জন অনেকেরই হয়তো প্রিয় অভিনেতা নন। কিন্তু প্রেরণাদায়ক ফিটনেস কোচ এবং সুস্বাস্থ্যের প্রতীক হিসেবে জন অব্রাহাম অন্যদের চেয়ে আলাদা।

 

 

কথাগুলো একটু পড়ুন:

ফিট থাকুন, ফিট অবস্থায় মৃত্যুবরণ করুন। পরিশ্রম অস্থায়ি, গৌরব চিরস্থায়ি। ব্যায়াম আমার নেশা!

প্রতি রাতে আমি পার্টি করি না, অপচয় করি না, আমি বোতলের কর্ক খুলি না। আমি ব্যায়াম করি: দেহের ভারসাম্য ঠিক রেখে আমি নিজেকে সামনে ঠেলি, তারপর আরও কঠিনভাবে ধাক্কা দেই এই দেহকে, মিউজিক ছেড়ে দেই, ঘাম ঝড়াই, দেহকে কষ্ট দেই; ব্যথা আমার পছন্দ কিন্তু শুকনো দেহ অপছন্দ।

আমি বিরক্তির কারণ হই না, আমার সমালোচনা করবেন না: আপনারা ক্লাবে যেতে পারেন, জীবনকে চকচকে করে তুলতে পারেন; জিমের অন্ধকারই আমার ভালো লাগে, সারাদিন, প্রতিদিন।

 শুধু সুস্থরাই (ফিট) বেশিদিন বেঁচে থাকবে।

 

যখন জানলাম কথাগুলো ভারতীয় চলচ্চিত্রাভিনেতা জন অব্রাহামের, তখনই অবহেলায় আমার মন ভরে গেলো। ‘ও আচ্ছা’ ভুতের মুখে রাম নাম!  আমার দৃষ্টি চলে গেলো তার অভিনীত সিনেমাগুলোতে। বিভিন্ন মুভিতে তার সৌষ্ঠব দেহ এবং স্থিরচিত্রে তার উজ্জ্বল সুস্থতার চিত্র আমার কল্পনায় ভেসে ওঠলো।

সুস্থ দেহ কে না প্রত্যাশা করে? একটি নিরোগ দেহ কে না চায়? সুস্থতার ওপরে আর কী সুখের বিষয় থাকতে পারে?

 

 

আরও কিছু কথা:

“আমি অনেকটাই অজ্ঞেয়বাদী, দেহই আমার ধর্ম। দেহের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে কিছুই নেই, তাই আমি ব্যায়াম করি। আমার উদ্দেশ্যে হলো সিক্স-প্যাক নিয়ে বাঁচা এবং সিক্স-প্যাক নিয়েই মৃত্যুবরণ করা।”

“আমার ফিটনেস মন্ত্রটি তিনমুখী: ভালো খাবার, ভালো ঘুম এবং পরিমিত ব্যায়াম।”

ফিট দেহ আর সুস্থ মনই তার দিবারাতের উপাসনা- ফিটনেসই জন অব্রাহামের ধর্ম। ব্যাপারটি পুরোপুরি অনুকরণীয় না হলেও তার কিছু বিষয়কে এড়িয়ে যাবার সুযোগ নেই!

 

ভালো কথা, আমি (এই পোস্টের লেখক) কোন ফিটনেস এক্সপার্ট  নই! তবে ‘আনফিটনেস অাবাটার’ বলতে পারেন! তবে একটি সুস্থ দেহ খুবই চাই।

 

 

যারা আরও জানতে যান:

ফিটনেস টিপস এবং জন অব্রাহামের আত্মসাক্ষ্য।

জন অব্রাহামের ফিটনেস/ ডায়েট চার্ট

‘আমি একজন মাছ-খাওয়া সব্জিভোজী’!

 

সূত্র: বিভিন্ন সংবাদ ও গুজবের মাধ্যম। ছটি গ্র্যাবহাউজ ডট কম থেকে নেওয়া।

 

 


The ideology that John Abraham tries to promote:

  1. Live fit… die fit
  2. Pain is temporary… pride is forever
  3. WORKING OUT IS MY DRUG
  4. I don’t party every night, I don’t get wasted, I don’t pop bottles 
  5. I WORK OUT… I push my body to its limit, then I push harder, 
  6. I blast my music, I sweat, I ache, I love pain and I hate skinny.
  7. I don’t bother you, DON’T JUDGET ME, you can have the clubs and and the flashy life
  8. I’ll take the darkness of the gym, all day, everyday… 
  9. Only the fit survive 

 

হুন্ডি কেন অবৈধ?

jiggasha

 

 

হুন্ডি কি?  হুন্ডি প্রথার উৎপত্তি কোথা থেকে? এটি কেন অবৈধ?


 

সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা:

হুন্ডি একটি  নীতিবহির্ভূত এবং দেশের আইন দ্বারা নিষিদ্ধ অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থ হস্তান্তর/স্থানান্তর ব্যবস্থা। Bill of Exchange বা বিনিময় বিল নামেও পরিচিত। বাণিজ্যিক লেনদেন এবং ঋন আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো। এখনও হয়। তবে তা অবৈধভাবে এবং অবৈধ উদ্দেশ্যে।

 

বিস্তারিত সংজ্ঞা:

বাণিজ্যিক আদান বা ঋণ সশ্লিষ্ট লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত লিখিত  এবং শর্তহীন দলিল, যার মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে নির্দেশিত পরিমাণ টাকা লেনদেন হয়। এই ব্যবস্থা মুগল আমলে পরিচিত লাভ করে, কিন্তু ব্রিটিশ আমলে জনপ্রিয়তা পায়। এখনও প্রবাসী চাকুরিজীবীরা একে আড়ালে ব্যবহার করছেন।

বর্তমান বিশ্বের ব্যাংকিং পদ্ধতি অনুসরণ করে হয় না বলে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়। তাই হুন্ডি ব্যবস্থাকে অবৈধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

 

ইতিহাস সূত্র:

মুগল আমলে প্রতিষ্ঠিত অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থ লেনদেন ব্যবস্থাটি ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। তারা একে দেশীয় ব্যবস্থা বলে মেনে নেয়। তবে বৈধতা দেবার জন্য রানীর সিলসহ স্ট্যাম্প ব্যবহারের প্রচলন করে।

Hundi Stamp (British India)

“হুন্ডি অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অংশ হওয়ার কারণে এর আইনগত অবস্থান নেই এবং সরকারের আওতাধীন আলোচনার কোন বিধিও নেই। হুন্ডি সাধারণত বিনিময় বিল হিসেবে বিবেচিত হলেও তা প্রায়শ দেশজ ব্যাংকার্স দ্বারা ইস্যুকৃত পে-অর্ডার চেকের সমমান হিসেবে ব্যবহূত হয়। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলিতে শাখা অফিস অথবা প্রধান ব্যাংকিং হাউসগুলিতে কুঠির মাধ্যমে হুন্ডি ব্যবসা চলত। বলা হয়, বাণিজ্যিক ভারতের সকল অংশে জগৎ শেঠের ব্যাংকের শাখা অফিস ছিল। কিন্তু বাংলায় উপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার প্রভাবে তাঁদের আর্থিক শক্তির পতন শুরু হয় এবং আঠারো শতকের শেষে দেউলিয়া হয়ে পড়ে।” [বাংলাপিডিয়া]

 

সংবাদপত্রে দৃষ্টান্ত:

“গুলশান ও শোলাকিয়ার হামলার অর্থ এসেছিল হুন্ডির মাধ্যমে”। দৈনিক প্রথম আলো, ১৯ সেপটেম্বর

 


সূত্র: বাংলাপিডিয়া, বেশতো এবং হেল্পফুলহাব ডট কম। ব্রিটিশ সময়ের হুন্ডির ছবিটি ইন্ডিয়াস্ট্যাম্প ডট ব্লগস্পট ডকম থেকে।

যেসব কারণে ব্রিটেন ইইউ ছেড়ে বিশাল ভুল করেছে…

[courtesy: henry4school.fr]

 

তেতাল্লিশ বছরের উত্তেজনার পর ব্রিটেন এবার আত্মহত্যা করলো! ডেবিড ক্যামেরোনকে সন্তানহারা পিতার মতো বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। প্রতি বছর অক্সফোর্ড ডিকশনারি নতুন আবিষ্কৃত শব্দ তালিকা দেখিয়ে অহংকার করে, কিন্তু আমার দৃষ্টিতে Brexit হবে নিকৃষ্টতম ইংরেজি শব্দ। অবশেষে ব্রেক্সিটকে শব্দ হিসেবে অক্সফোর্ড গ্রহণ করে কিনা, জানি না। এখন তো তাদের প্রিন্টেড অভিধানও নেই!  ব’ হলো সকল ‘বদ’ এর শুরু, বি’তে ব্যাড এবং বি’তে ব্রেক্সিট, যার আরেক অর্থ আত্মহত্যা। কোনটি বেশি খারাপ, বাংলা বদ, নাকি ইংরেজি ব্যাড? আচ্ছা বদ থেকে ব্যাড এসেছে, নাকি ব্যাড থেকে বদের উৎপত্তি? তার আগে একটি গল্প বলে নেই।

 

ধনী বাবার আদুরে ছেলে। বসে বসে খায় আর খেলে খেলে পেটের ভাত হজম করে। বড় ভাই কাবুল কঠোর পরিশ্রম করে বাবার সম্পদকে বৃদ্ধি করে চলেছে। কিন্তু ছোট ভাই আবুল ‍শুধুই দিবাস্বপ্ন দেখে আর মাসে মাসে বান্ধবী বদলায়। দিবাস্বপ্নটি হলো, একদিন সে তার বাবার সম্পত্তির মালিক হবে। অন্তত অর্ধেক সম্পত্তির মালিক তো সে হবেই, কারণ মাত্রই দু’ভাই।  অতএব তার আর কাজ করার কী দরকার!

সে কোন কাজ করে না, করার প্রয়োজনও পড়ে না। ছোট সন্তান হিসেবে সকলেই তাকে স্নেহের দৃষ্টিতে দেখে। তাকে পরিবারের সদস্য হিসেবে মনে করলেও তার শ্রম বা কাজ নিয়ে কেউ ভাবে না। বড় ভাই, প্রতিবেশি, মা, আত্মিয়স্বজন সকলেই এটি মেনে নিয়েছে।  ফলে পারিবারিক আয়বৃদ্ধিতে ছোট ছেলের অবদান নিয়ে কেউ ভাবে না। অথচ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সে-ই সকলের আগে। কেনই বা হবে না, সে তো ছোট সন্তান! তার একটু বাড়তি অধিকার তো থাকতেই পারে! তাছাড়া এত সম্পত্তি কে ভোগ করবে?  তার কি সেখানে ভাগ নেই?  অন্তত অর্ধেক?

কিন্তু তার আর তর সইছে না। হইহুল্লা আড্ডাবাজি করার জন্য দরকার যখনতখন যেকোন পরিমাণ টাকাপয়সা। বান্ধবির সাথে সময় কাটাতেওতো টাকার দরকার। ওদিকে বাবা তো চাইলেই টাকা দিচ্ছে না! এই বুড়োটা কবে মরবে? এই সম্পদ কি তারই নয়? অন্তত অর্ধেক?

বাবা তো তাড়াতাড়ি মরবে বলে মনে হচ্ছে না। বরং কামকাজ করে ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠছে! তবে কী করা? সবাই তাকে পছন্দ করে, বাবা কেন তাকে পছন্দ করে না? কেন শুধু নিজের পায়ে দাঁড়াতে বলে?  বাবা তার বড় সন্তানের সাথে সবসময় হাসিমুখে কথা বলে, অথচ তাকে দেখলেই সব হাসি থেমে যায়। সমাজের সবাই তার বড়ভাইয়ের প্রশংসা করে। বাবাকে সকলে ডাকে ‘কাবুলের বাবা’। কিন্তু বাবা তো আবুলেরও বাবা! এভাবে  বড়ভাইয়ের গুণের কাছে আবুল যেন দিন দিন ছোট হতে হতে মিশে যাচ্ছে। এরকম অস্তিত্বহীনতায় সে আর থাকতে চায় না।

এনিয়ে দীর্ঘ ২৩ বছর সে ভেবেছে এবং অপেক্ষা করেছে।  এখন সে প্রাপ্ত বয়স্ক। আর কত? এবার বাবার সাথে একটা এসপার-ওসপার করা দরকার। অনেক চিন্তা করে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক্সিট! সে পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যাবে। নাহ্ আর নয়!  বাড়ি থেকে বের হয়ে সে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। স্বাধীন হয়ে গেলে সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। জীবনকে সে উপভোগ করতে চায়। তার কিসের এতো চিন্তা?  বাবার সম্পদ আছে না? অন্তত অর্ধেক?

ছোট ছেলে আবুলের ‘এক্সিট’ প্রস্তাবে বাবা স্তম্ভিত এবং ব্যথিত! প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করার মতো উপযুক্ত কোন কথা বাবা খুঁজে পেলেন না। সন্তানদের নিয়ে তার সব স্বপ্ন ভেঙ্গে চুড়মার! তিনি শুধু বললেন, আগামি এক সপ্তাহ সময় দিলাম তোমাকে। এক সপ্তাহ পর রাতের খাবারে যখন সকলে উপস্থিত থাকে, তখন তোমার মনের কথা সকলের সামনে প্রকাশ করবে।

একটি সপ্তাহ আবুলের জন্য দীর্ঘ সময়। তবু সে খুশি মনেই মেনে নিলো। কারণ সে ভেবেছিলো, তার বাবা সাথে সাথে প্রত্যাখ্যান করবে অথবা খালি হাতেই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে।

এক সপ্তাহ পর আবুল রাতের খাবারের জন্য অপেক্ষা করলো।  সকলের উপস্থিতিতে সে জানিয়ে দিলো যে, সে আর পরিবারের সাথে থাকতে চায় না। প্রাপ্ত বয়স্ক হয়েছে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার তার আছে। বাবা একদিন পরিবারের সকলের উপস্থিতিতে ছোট সন্তানকে তার সম্পদের ভাগ বুঝিয়ে দিলেন। ছোট সন্তান সব বিক্রি করে দিয়ে বাড়িছাড়া হয়ে গেলো।

দূরদেশে চলে গেলো আবুল, যেখানে পরিবার বা আত্মীনস্বজনদের কেউ তাকে পাবে না। বাবার সম্পদের টাকা পেয়ে আবুল ধনী হলেও, তার স্বভাবের পরিবর্তন হলো না। ফলে কিছুদিন হিসেব করে চলার পর পূর্বের উড়নচণ্ডে জীবনে ফিরে গেলো এবং কয়েক মাসের মধ্যে সব টাকা খরচ করে ফেললো। তৃতীয় মাসের এক ভোর সকালে আবুল তার বাবাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে ক্ষমা চেয়ে বললো, সন্তান হিসেবে নয়, বাড়ির চাকর হিসেবে বাবা যেন তাকে একটি কাজ দেয়। সন্তানহারা বাবা সন্তান পেয়ে এবারও স্তম্ভিত এবং বাক্যহারা। আবুল ক্ষমা পেলো, কাজও পেলো। কিন্তু আর সেই সন্তানের সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে পারলো না।

 


ইউরোজোনে থেকে কিছুই লাভ হয় নি আমাদের।  সব লাভ নিয়ে গেছে উত্তর আর পূর্ব ইউরোপিয়ানরা। উত্তর ইউরোপিয়ানরা দলে দলে এসে আমাদের দেশ ময়লা করে ফেলেছে। দেশটারে শেষ ‘করি দিছে’!

ব্রিটেন হলো ইউরোপের মুকুট। আছে এর শতবছরের গৌরব আর প্রতিপত্তি। ইউরোপের গড়পরতা দেশগুলোর মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ব্রিটেন হারিয়ে যেতে বসেছিলো। ব্লা..ব্লা..

এই হলো ব্রেক্সিটপন্থীদের (৫১.৯/৪৮.১) মনোভাবের একটি সামারি পিকচার। অথচ বাস্তব পরিস্থিতি অন্যরকম। একান্তই একলা চলার মনোভাব থেকে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার ফল হিসেবে ৫১.৯% জনগণ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে থাকার বিপক্ষে মত দিয়েছে। এ মনোভাব বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং অগ্রগতির পরিপন্থী। ব্রিটেন একটি স্বার্থবাদী মনোভাব দেখিয়েছে। এতে তাদের কতটুকু লাভ হবে, সেটি দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এমুহূর্তে যতটুকু বলা যায়, তাতে তাদের ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল দেখা যাচ্ছে না।

 

ইউরোপের দরজা হিসেবে লন্ডন বা ইংল্যান্ডকে আর কেউ ব্যবহার করবে না।

ইউরোপের দরজা হিসেবে লন্ডন বা ইংল্যান্ডকে আর কেউ ব্যবহার করবে না। অন্তত পরিস্থিতি আর বিগত ৪৩ বছরের মতো এতো উদার হবে না। আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, পর্যটক, গবেষক সকলের জন্য লন্ডন ছিল সমগ্র ইউরোপের জন্য গেইটওয়ে। এই সুযোগকে বেশি কাজে লাগিয়েছে ব্রিটিশ ব্যবসায়িরা। তারা অন্যান্য ইউরোপিয় দেশে অবাধে রপ্তানি করেছে। ইংল্যান্ডও পেয়েছে বিশাল রাজস্ব আয়। উপকৃত হয়েছে ব্রিটিশ জনগণ।

 

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে থাকার সমস্ত সুবিধাগুলো হারালো।

ব্রিটেনবাসীরা সিদ্ধান্ত ফেললেও পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হতে কিছু সময় লেগে যাবে। তখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে থাকার সুবিধাগুলো হারাবে।

ব্রিটিশদের সূর্য একসময় ডুবতো না (সূর্য তো কখনও ডুবতো না আজও ডুবে না!)। এরকম বলা হতো, কারণ পৃথিবীটাকে ব্যান্ডেজ করে রেখেছিল ব্রিটিশ কলোনী। সে দিন আর নেই, চীন ভারত ইত্যাদি জনসংখ্যা বহুল দেশগুলোতে পুঞ্জিভূত হচ্ছে বিশ্ববাজারের মুনাফা।  এখন ব্রিটেনের একা থাকা মানে হলো বোকা থাকা।  জোটবদ্ধ থাকার সকল বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক ফায়দা হারাতে বসেছে আজকের ব্রিটেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন না হয় ছেড়েই দিলো, কিন্তু পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে ভৌগলিকভাবে কি বিচ্ছিন্ন থাকতে পারবে ব্রিটেন? বলতে কি পারবে, যাও তোমরা আর প্রতিবেশি নও? ফলে দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সম্পর্ক, কূটনৈতিক সুবিধাদি, জোটবদ্ধ হয়ে কোন সুবিধা আদায়, ইত্যাদি ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে যাবে সকল বিশেষ অধিকার।

ইইউ’র সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে বিছিন্ন হবার পর ইউরোপের দেশগুলোর সাথে স্বার্থের সম্পর্ক সৃষ্টির জন্য ব্রিটেনকে নতুনভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করতে হবে।একই ভাবে ইইউ’র সাথেও সম্পর্কের শর্তগুলো নতুনভাবে নির্ধারণ করে নিতে হবে।

 

বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাব খাটাবার শেষ অস্ত্রটুকু শেষ হলো।

কূটনীতি শুরু করতে হবে একদম ‘অ্যালফাবেট এ’ থেকে। বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাব খাটাবার শেষ অস্ত্রটুকু শেষ হলো। কমনওয়েলথ আর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তৈরি ও রক্ষার ক্ষেত্রে ব্রিটেন এখন আর ‘নেগোশিয়েটিং লেভারেজ’ পাবে না। উদ্যোগ নিতে হবে তাদেরকেই, কিন্তু অন্যরা পাবে এর সুবিধা।

কমনওয়েলথ বা সাবেক কলোনিগুলো তো আর বর্তমান কলোনি নয়। তারা স্বাধীন দেশ। অতএব কমনওলেথভুক্ত দেশগুলোর সাথেও নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

 

ব্যবসায়িক অংশীদার এবং শ্রম ও মূলধনের উৎস খুঁজতেও ব্রিটিশদেরকে এখন মরিয়া হয়ে দৌড়াতে হবে।

রাজনীতি না হয় বাদ দিলাম, ব্যবসায়িক অংশীদার এবং শ্রম ও মূলধনের উৎস খুঁজতেও ব্রিটিশদেরকে এখন মরিয়া হয়ে দৌড়াতে হবে। ভারত বা চীনের সাথে এককভাবে সম্পর্ক জোরদার করতে হবে নিজেদের তাগিদেই। বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেবার নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।

 

ভাই ডেভিড ক্যামেরোন, আপনার শেষের হলো শুরু! 

প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরোনকে এবার দিন গুণতে হবে। রাজ্য শাসন আর আগের মতো কুসুমাস্তির্ণ হবে না, হবার নয়। মূলত তিনি এই গণভোট চান নি, বরং ইইউতে থাকার পক্ষে জোর তৎপরতা চালিয়েছেন। কিন্তু  নিজদলের ভিন্নপন্থীদেরকে থামিয়ে রাখা, নতুন কোন রক্ষণশীল মতের উত্থান ইত্যাদি বহুমুখি চাপে পড়ে সরকার প্রধান হিসেবে তাকে এই ‘বিষের পেয়ালা’ পান করতে হয়েছে। কিন্তু এবার নিজ দলেও তার প্রভাব কমে আসবে। দলের এক্সিটপন্থীরা তার বিপক্ষে অনাস্থা প্রস্তাব এনে তাকে নামিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাকেও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

 

ব্রিটেনের আর্থিক ক্ষতি।

পাউন্ড এবং স্টকমার্কেটে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এটি তাৎক্ষণিক না হলেও পর্যায়ক্রমে।  এরকম পরিস্থিতিতে ক্যামেরোনের হাত শক্ত না থাকা মানে হলো, ইইউ’র সাথে উপযুক্ত দর কষাকষিতে ব্যর্থতা।  ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও ছেড়ে দেবার পাত্র নয়।  আরও কোন অর্থনৈতিক শক্তি সম্বলিত সদস্য যাতে ইইউ ছাড়তে না পারে, এজন্য তারা একটু নিষ্ঠুরভাবেই ব্রিটেনকে ছাড়পত্র দেবে। তাতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্রিটেন এবং ব্রিটেনবাসী।

ইউরোপ ছিলো ব্রিটিশ পণ্যের বিস্তৃত এবং নির্ভরযোগ্য বাজার। ব্রিটিশ পণ্যগুলো আর আগের মতো বিশেষ অধিকার বা নামে মাত্র শুল্কে রপ্তানি করতে পারবে না কোন ইউরোপিয়ান দেশে। ফলে রপ্তানি পড়বে অনি্শ্চয়তার মুখে।

 

অভিবাসন, আসা-যাওয়া আর আগের মতো নয়।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রায় ১২ লাখ ব্রিটিশ।  তারা নিজ দেশে পাঠাচ্ছে তাদের দৈনিক ও মাসিক আয়। সমৃদ্ধ হচ্ছে  ইংল্যান্ড।  অবশ্য অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশ থেকেও ব্রিটেনে গিয়ে কাজ করছে এরকম দৃষ্টান্তও কম নয়। তবে ইইউ ছাড়ার পর ব্রিটেনের ক্ষতি হবে বেশি, কারণ বাণিজ্যিক স্বার্থ তাদেরই যে বেশি।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের শর্ত অনুযায়ি, ব্রিটেন ইউরোজোন ছাড়া অন্য কোন দেশে থেকে অভিবাসী দিতে নেওয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ফলে বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে থেকে শ্রমিক রপ্তানি কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতি বছরই ব্রিটেন তাদের ভিজা দেবার শর্ত কঠোর করে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় গরিব দেশগুলো। ইংল্যান্ড যেহেতু ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এখন এসব দেশ থেকে মানুষ নেবার সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে। লন্ডনে বাংলাদেশি বংশদ্ভূত রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীরা অন্তত এরকমই আশা করছেন।

 

ইউনাইটেড কিংডম এর ‘ইউনাইটেড’ থাকা অনিশ্চিত হয়ে গেলো।

ইংল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড নিয়ে ইউনাইডেট কিংডম বা যুক্তরাজ্য, যাকে এপর্যন্ত ব্রিটেন বলে এসেছি। স্কটিশরা ইইউতে থাকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। আয়ারল্যান্ডও।  তারা যে ব্রিটিশ শাসনকে খুব একটা মেনে নিয়েছে তা কিন্তু নয় (২০১৪ সালে ৪৪ শতাংশ স্কটিশ স্বাধীন রাষ্ট্রের পক্ষে ভোট দিয়েছিল)। ইইউকে তারা ব্রিটিশদের ওপরে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পেয়েছিলো। এবার ব্রিটিশ-বিরোধী অংশটি আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠতে পারে।

ইইউ ছাড়ার সিদ্ধান্তে হয়তো এককভাবে ব্রিটেনের উন্নতি হবে, হয়তো হবে না। সর্বশেষ পরিস্থিতি হয়তো খুব তাড়াতাড়ি জানতে পারবো না। কিন্তু যা জানতে পারলাম তা হলো, ব্রিটিশরা আধুনিকতা, পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়গুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছে।  (২৪/জুন/২০১৬)

 

 

 

brexit-800x500

পরবর্তি ঘটনা প্রবাহ:  ভোটাররা আবার সুযোগ পেতে চান

ভোটার ১: যদিও আমি (ইইউ) ছাড়ার জন্যই ভোট দিয়েছি, ভোটের ফলাফলে সত্যিই আমি হতাশ। আজ সকালে ঘুম থেকে ওঠে যা দেখলাম তাতে আঘাত পেয়েছি। কিন্তু আমি যদি আবার সুযোগ পাই, তবে থেকে যাবার জন্যই ভোট দেবো।
ভোটার ২: মিথ্যাকে বিশ্বাস করে আমি ভোট দিয়েছিলাম এখন আমার খুব আফসোস হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমার ভোট সত্যিই ছিনতাই হয়েছে।
ভোটার ৩: আমি একটু আফসোসই করছি। আমি যা করলাম, এর পেছনে বিশেষ কোন যুক্তি ছিলো না।
ভোটার ৪: আমার ভোটটির জন্য আফসোস হচ্ছে।
ভোটার ৫: আমার ভোটটি যে এত বিশাল পরিণতিতে যাবে আমি বুঝতে পারি নি। ভেবেছিলাম অবশেষে আমরা (ইইউতে) থেকেই যাচ্ছি।

ব্রেক্সিটের প্রভাব ব্রিটেন এবং ব্রিটেনের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। শঙ্কার বিষয় হলো: গণভোট-ভিত্তিক মেরুকরণ শুরু হয়েছে। এবার শুরু হবে গণভোটের যথেচ্ছা ব্যবহার। ট্রাম্প-স্টাইলের উগ্রজাতীয়তাবাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধকে করে তুলছে যুক্তিসঙ্গত পরিণতি। কিছু ঘটনা খুব দ্রুত ঘটে গেলো:

✦ব্রেক্সিট বর্ণবাদকে আধুনিক স্টাইলে প্রতিষ্ঠিত করলো আবার। অন্যদেশ থেকে আগত কিন্তু ব্রিটেনের নাগরিকেরা বর্ণবাদের স্বীকার হচ্ছে যেখানে সেখানে। স্কুলের বাচ্চারা ব্রিটিশ অরিজিন বাচ্চাদের বুলি’র স্বীকার হচ্ছে। এসব নোংরামির একনম্বর স্বীকার হচ্ছেন নারী।
✦ব্রেক্সিট বাস্তবায়িত হলে স্কটল্যান্ড খুব শিঘ্রই যুক্তরাজ্য থেকে বের হবার আয়োজন করবে।
✦ইইউ থেকে ইটালি, ফ্রান্সের মতো ধনী দেশগুলোর উগ্র-জাতিয়বাদী দলগুলোও নিজ নিজ দেশে গণভোটের জন্য চাপ দেবে।

✦ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস-ক্যালিফোর্নিয়ার লোকেরা গণভোটের চিন্তা করছে। তারাও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হয়ে যাবে।

✦অনেকেই না বুঝে বা মিথ্যা প্রচারণায় প্রলুব্ধ হয়ে ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করেছে, তার ভোটে কিছু যাবে আসবে না। দিনশেষে ব্রিটেন ইইউতেই থেকে যাচ্ছে। সকালবেলা ঘুম থেকে জেগে তো চক্ষু চরক গাছ!
✦এরকম ১৯ লাখ ব্রিটিশ আবারও গণভোটের ব্যবস্থা করার জন্য চাপ দিয়েছে। কিন্তু ক্যামেরুন সাফ জানিয়ে দিলো, ’আর নয়। এত করে কইলাম শুনলা না। এবার প্রতিফল ভোগ করো। আমিও বিদায় নিচ্ছি।’ অজনপ্রিয় ক্যামেরুন আগেই বেশি কথা বলে বিষয়টাকে টক বানিয়ে ফেলেছিলেন। যা হোক।

✦ওদিকে যেসব গরীব দেশ শ্রমিক অথবা সস্তা শ্রমজাত পণ্য রপ্তানি করে একটু এগিয়ে যাবার ধান্ধা করছিলো, তারা পড়লো বিপাকে। বাংলাদেশ তার মধ্যে এক নম্বর।

 

ব্যক্তিগত পর্যালোচনা: ব্রিটেন কার স্বার্থে এ সিদ্ধান্তে গেলো?

দেশের জনগণ তো নিজেদের স্বার্থের কথাই ভাববে, এটিই স্বাভাবিক। দেশের যারা নেতা, তাদের দায়িত্ব আছে জনগণের মনোভাবকে আত্মকেন্দ্রীকতা থেকে পারস্পরিক সহযোগিতার দিকে পরিচালিত করা। আমার মনে হয়, যারা ব্রেক্সিটের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে, তারা সার্বিক বিষয়গুলো নিয়ে বেশি ভেবেছে। হয়তো ব্রিটেনের উন্নতি হবে, হয়তো হবে না। সর্বশেষ পরিস্থিতি হয়তো খুব তাড়াতাড়ি জানতে পারবো না। কিন্তু যা জানতে পারলাম তা হলো, ব্রিটিশরা আধুনিকতা, পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়গুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইইউ বর্তমানে দুর্বল আছে বলেই ব্রিটেনের প্রস্থান সহজ হলো। তবে মনে রাখতে হবে যে, ব্রিটেন একটি রাষ্ট্র, কিন্তু ইইউ একটি রাষ্ট্রপুঞ্জ। তাদের সংগঠিত হবার শক্তি এবং প্রয়োজনীয়তা উভয়ই বেশি। পরিণতি যেকোন দিকে মোড় নিতে পারে। কিন্তু আমার ইনটুইশন বলছে যে, ব্রিটেন রাষ্ট্র হিসেবে শক্তিশালী হলেও সেটি কখনও ইইউ’র দুর্বল হবার কারণ হবে না।

ইউ’র ক্ষতি হবে এবং বেশ কিছু চ্যালেন্জের মুখে পড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। কিছু দেশের ইইউ-বিরোধীরা (ফ্রান্স, ইটালি) ইতোমধ্যেই নিজ নিজ দেশে গণভোটের জন্য আওয়াজ তুলতে শুরু করেছে।

ইইউ ভেঙ্গে যেতে পারে, এর মানে এই নয় যে, ব্রিটেন সঠিক কাজটিই করেছে। ব্রিটেন একবিংশ শতাব্দিতে এসে একটি বিশ্বায়নবিরোধী এবং সামন্তবাদি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজন্য ব্রিটেন তার নিজেদের ক্ষতি এবং ইইউ’র সংশ্লিষ্ট ক্ষতির জন্য দায়ি থাকবে। ইতিহাস কাউকে ছাড়বে না।

 

ব্রিটেন ঐতিহাসিক ভাবেই স্বার্থপর জাতি। এদেশকে শোষণ করা শেষ হবার পর, যখন নিচে গরম লাগা শুরু করেছে, তখন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নাম দিয়ে বিদায় নিয়েছে। ওরা দু’শ বছর নাগাদ না থাকলে ভারত উপমহাদেশে আরও আগেই গণতন্ত্র জন্ম নিতো এবং আজ আমরা আরও পরিপক্ক গণতন্ত্র নিয়ে আরও সমৃদ্ধ দেশে থাকতে পারতাম।

 

 

প্রথম প্রকাশ এবং পাঠক প্রতিক্রিয়া

 

 


ইইউ-বিযুক্ত যুক্তরাজ্য এবং বাংলাদেশ: প্রকাশিত খবর অনুসারে হাসিনা ব্যক্তিগতভাবেও প্রভাব খাটিয়েছেন, ব্রিটেনকে ইইউ’র পক্ষে ভোট দিতে। এর প্রধান কারণ হলো, দেশের রপ্তানি-জাত পণ্যের জন্য ইইউ’র বিস্তৃত বাজার ও জিএসপি সুবিধা।  ইইউ ছাড়ার কারণে বাংলাদেশকে ব্রিটেনের সাথে আলাদাভাবে চুক্তি করতে হবে। তাতে পূর্বের সুবিধা কতটুকু থাকবে সেটা সময়ই বলে দেবে।

ইন্টারনেট অফ থিংস: ‘বস্তুর সাথে ইন্টারনেটের সংযোগ’ কী এবং কেন?

উৎস: থ্রিজি ডট কো ডট ইউকে

উৎস: থ্রিজি ডট কো ডট ইউকে

 

ইন্টারনেটে আজ পর্যন্ত যত তথ্য মজুদ আছে তার অধিকাংশই মানুষের স্পর্শের মাধ্যমে হয়েছে। মানুষ হয় টাইপ করেছে, অথবা রেকর্ড বাটনে চাপ দিয়েছে, অথবা ক্যামেরায় চাপ দিয়ে ‍ছবি তোলার মাধ্যমে ইন্টারনেটের বিশাল তথ্যভাণ্ডার সৃষ্টি করেছে। অর্থাৎ ইন্টারনেট বা কম্পিউটারের কার্যকারিতা পুরোমাত্রায় মানুষের ওপর নির্ভরশীল।

 

মানুষ মাত্রই ভুল। মানুষের অসীম চাহিদা, কিন্তু তার একক ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত, ত্রুটিপূর্ণ এবং নীতিভ্রষ্ট। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণে মানুষের চাহিদার প্রকার ও প্রকৃতি বেড়েছে। ফলে মানুষের স্পর্শের ওপর নির্ভরশীল থেকে বর্তমান বিশ্বের প্রযুক্তির চাহিদার যোগান দিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

 

ইন্টারনেটের সুবিধাকে মানুষের হাতের স্পর্শ থেকে স্বাধীন করার কাজটি কয়েক দশক ধরেই চলে এসেছে। এই প্রচেষ্টার তাত্ত্বিক নামই হলো ‘ইন্টারনেট অভ্ থিংস’ বা বস্তুর সাথে ইন্টারনেট বা ‘বস্তুগত ইন্টারনেট’।  সংক্ষেপে আইওটি।

 

ব্রিটিশ উদ্যোক্তা কেভিন অ্যাশটন তার একটি উপস্থাপনায় সর্বপ্রথম ‘ইন্টারনেট অভ্ থিংস’ কথাটির ব্যবহার করেন (১৯৯৯)। যদিও ইন্টারঅ্যাকটিভ এবং ইন্টারনেট-যুক্ত যন্ত্রের ধারণাটি আরও আগেই আলোচনায় এসেছে। ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কার্নেগি মিলান বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী কোক সরবরাহকারী মেশিন আবিষ্কার করে বিশ্বের সর্বপ্রথম ইন্টারনেট-কানেকটেড যন্ত্রের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

 

 

▶ ইন্টারনেট অভ্ থিংস কী

 

ইন্টারনেট অভ্ থিংস-এর প্রধান দিকটি হলো এই যে, প্রতিটি বস্তুরই সংযোগ করার ক্ষমতা থাকবে যেন সেটি তথ্য আদান-প্রদান করার মাধ্যমে ব্যবহারকারীকে কোন সিদ্ধান্ত নেবার সুযোগ দিতে পারে। যেমন: ফ্রিজে রাখা কোন অবশ্য প্রয়োজনীয় খাবার জিনিস শেষ হয়ে গেলে, ফ্রিজ তার নিজস্ব বিল্টইন সেন্সরের মাধ্যমে বুঝতে পারবে এবং মালিককে মনে করিয়ে দিতে পারবে।

 

‘থিংস’ বা বস্তু হতে পারে মানুষের ভেতরেরই একটি হৃদকম্পন পরিমাপক যন্ত্র যার মাধ্যমে সেই মানুষটি চিকিৎসকের সাহায্য ছাড়াই নিজের হার্টের অবস্থা বুঝতে পারবে।

‘থিংস’ হতে পারে গাড়ির চাকায় যুক্ত একটি সেন্সর, যার মাধ্যমে ড্রাইভার গাড়ির চাকায় গ্যাসের চাপ বুঝতে পারবে।

একটি স্মার্ট মিটার কেমন হতে পারে?  এটি নিজে থেকেই গাড়ির জ্বালানির পরিমাণ বুঝে আরেকটি জ্বালানি সরবরাহকারী যন্ত্রের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে।

শুধু সেন্সর নয় যোগাযোগ সক্ষমতা থাকতে হবে। প্রতিটি যন্ত্রেরই একটি আইপি অ্যাড্রেস থাকবে।  তাতে এটি আরেকটি যন্ত্র অথবা মানুষের সাথে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারবে।

 

 

▶ ইন্টারনেট অভ্ থিংস-এর ব্যবহার

 

সুন্দরবনের গাছ কাটা ও স্থানান্তর করা নিষিদ্ধ। হরিণ শিকার তো আরও নিষিদ্ধ। কিন্তু দুর্গম এবং হিংস্র প্রাণীর অভয়ারণ্য সুন্দরবনে চোর হয়তো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেখানে যাবেই।  কিন্তু আমাদের বনরক্ষকরা কি ততটুকু ঝুঁকি নেবেন?  তাদের তো কিছুই পাবার নেই!  জিপিএস-এর মাধ্যমে একাজটি সহজ করে দেবে ইন্টারনেট অভ্ থিংস।  এটি একই ক্ষীপ্রতায় সরকারের সংশ্লিষ্ট সকল পর্যায়ের কর্মকর্তার কম্পিউটারে ও স্মার্টফোনে প্রমাণসহ বার্তা পৌঁছে দেবে।  নিকটস্থ পুলিশ তৎক্ষণাৎ নিজের করণীয় ঠিক করতে পারবে।

 

রেলক্রসিংয়ে প্রায়ই মানুষ মারা যাচ্ছে এবং যানবাহনের ক্ষতি হচ্ছে।  রাস্তার মোড় মানেই যানজট, কারণ পুলিশ সময়মতো সিগনাল দিতে পারে না, অথবা ভিআইপিদেরকে রাস্তা দেবার জন্য উল্টোদিকে গাড়ি চলতে দিচ্ছে। সিগন্যাল দিলেও চালকেরা সেটি মানতে চায় না, অথবা না মানলেও রক্ষা পায়।  এমনও হয়েছে, পুলিশ বা যাত্রীর ওপর গাড়ি তুলে দিয়েছে।  মানুষ মানুষকে মানতে চায় না, ভয়ও পায় না। ফলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় যন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এখানে আইওটি’র কোন বিকল্প নেই, কারণ এখানে মানুষ মাত্রই ভুল এবং বিলম্ব।

 

সার্বিকভাবে কৃষি উন্নয়ন, ভবন ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবহন ব্যবস্থাপনাসহ স্মার্ট সিটি বিনির্মাণে ইন্টারনেট অভ্ থিংস-এর ব্যবহার দেখা যাবে।

 

উৎস: পোস্টস্কেইপ ডট কম

উৎস: পোস্টস্কেইপ ডট কম

 

 

▶ ইন্টারনেট অভ্ থিংস-এর আরও কিছু ব্যবহার:

 

১) পরিবারের বৃদ্ধ সদস্যটির দেখাশোনা।  তারা আমাদের বৃদ্ধ মা অথবা বাবা, যাদেরকে রেখে এসেছি গ্রামের বাড়িতে অথবা শহরেরই বাড়িতে। তার শরীরে কোন আকষ্মিক পরিবর্তনের কারণে তার চলাফেরায় পরিবর্তন আসলে অফিস থেকেই সেটি আঁচ করতে পারা যাবে।  পরিচর্যাকারী হয়তো সময়মতো ওষুধটুকু খাওয়াতে পারে নি অথবা দুপুর খাবারটুকু সময়মতো খেতে দিতে পারে নি।  মানুষের ভুল হতেই পারে!

২) আপনার ওয়ালেট অথবা মোবাইল ফোনটি হারিয়ে গেছে।  অথবা গাড়ির চাবিটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।  সকলের ব্যস্ততম মুহূর্তে মাথায়ও কাজ করছে না।  কীভাবে সেগুলোকে ট্র্যাক করবেন?  সমাধান আইওটি!

৩) নিজের বাসগৃহকে দুর্ঘটনার কবল থেকে মুক্ত রাখতে কে না চায়!  গ্যাসলাইন অথবা বিদ্যুৎলাইনের ত্রুটির কারণে, অথবা রান্নার চুলাটি সময়মতো বন্ধ না করার কারণে হঠাৎ অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকতে খবর দেবে আইওটি।  আপনি যেখানেই থাকুন না কেন!

৪)  ট্রাফিক ব্যবস্থপনার মতো, শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং লাইটিং সিস্টেমের ব্যবস্থা এমন কিছু কাজ যা নিয়মিত না করলে একজনের জন্য অনেকের সমস্য হয়।  লাইটিং সিস্টেমের ব্যবস্থাপনা শুধু সূর্যাস্তের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়, আবহাওয়ার কারণে অনেক সময় বিকালেই রাতের অন্ধকার নেমে আসে।  অন্যদিকে ভূমিকম্প বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগে রাতের আধারেও লাইটিং সিস্টেম বন্ধ করতে হয়। এসবের জন্য চাই আইওটি, অর্থাৎ যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্রের সংযোগ

 

 

▶ লেখককের কথা

 

আইওটি কোন নতুন বিষয় নয়।  তবে এর ব্যবহার ও কার্যকারীতা সম্পর্কে ক্রমেই নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সৃষ্টি হচ্ছে।  উন্নয়নকামী দেশগুলোর জন্য আইওটি এখনও অনেকটাই অধরা।  বাংলাদেশের বর্তমান সরকার আইওটি’র সাথে নগর ব্যবস্থাপনাকে সংযুক্ত করার চেষ্টা করছে।

আইওটি’র প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো,  সময়নিষ্ঠতা, ত্রুটিহীনতা এবং গুণগতমানের ধারাবাহিকতা।  আপাত দৃষ্টিতে এর কার্যকারিতা অসীম। তবে অনুভূতিপ্রবণ মানুষের চাহিদা ও গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে এটি কতটুকু যত্মশীল, সেটি সময়ই বলে দেবে।

 

বর্তমান প্রবন্ধটিতে ইন্টারনেট অভ্ থিংস সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণাগুলো উপস্থাপন করা হলো।  উদ্দেশ্য, সকল পর্যায়ের পাঠককে ‘ইন্টারনেটের সঙ্গে বস্তুর সংযোগ’ সম্পর্কে মৌলিক ধারণা দেওয়া। তাত্ত্বিক আলোচনা যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।  পরিবর্তি কোন লেখায় আরও বিস্তারিত তুলে ধরার পরিকল্পনা আছে।  হাইপারলিংক দিয়ে প্রাসঙ্গিক সূত্র উল্লেখ করা হয়েছে।

 

উৎস: ক্রসবার-ইন্ক ডট কম

উৎস: ক্রসবার-ইন্ক ডট কম

 

*আইওটি নিয়ে বাংলা ভাষায় প্রথম প্রবন্ধ: বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর

 

 

 


নতুন বিষয় নিয়ে লেখা আরও কয়েকটি প্রবন্ধ:

ব্লু চিপ কী: ব্লু চিপ কোম্পানিগুলো কেন এত নির্ভরযোগ্য?

◀ নীলসমুদ্র/ লালসমুদ্র কী? কীভাবে প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিতে লাভবান হওয়া যায়?

অনলাইন জীবন কি প্রাত্যাহিক জীবনকে বাধাগ্রস্ত করছে? চলুন খুঁজে দেখি!

work_home_play_sleep_cartoon_this_modern_life_

 

আমার ব্লগার বন্ধুটি তার কাজ বদলানোর পর আর ব্লগিং করেন না। ফেইসবুকেও খুব একটা দেখা যায় না। অনেক সহপাঠি তাকে খুঁজেন অনলাইনে। বেশ ভালোই লেখতেন। আমি একটু বিস্মিতই হলাম, কারণ তার একটি পাঠকবলয় গড়ে ওঠেছিল, যা হয়তো অনেকে ঈর্ষা করবে।

একদিন মুখোমুখি আড্ডায় অনেক কারণ জানালেন তিনি। তার বর্তমান কাজটি এরকম যে, কম্পুতে বসে অন্যকিছু করার সুযোগ হয় না; ব্লগিংয়ের প্রশ্নই আসে না। কম্পুতে বসলেও নির্দিষ্ট কিছু কাজ থাকে তার সামনে। তাছাড়া অফিসের নৈমিত্তিক ব্যস্ততায়, ব্যক্তিগতভাবে কম্পুতে কিছু করা অস্বস্তিকর। তবে তিনি আত্মস্বীকার করে জানালেন যে, শারীরিকভাবে তিনি অনেক সুস্থ এবং হালকা অনুভব করেন আজকাল। তার পূর্বের কাজে বেশি বসে থাকার কারণে ‘মোটিয়ে’ গিয়েছিলেন এবং বেশকিছু রোগ-ব্যামারও বাধিয়ে ফেলেছিলেন। এসব নিয়ে তার স্ত্রীর সাথে বচসা লেগেই থাকতো। এবার তার সাংসারিক জীবনও আগের চেয়ে ভালো। সম্প্রতি তিনি জানালেন যে, ব্লগিং ভুলে যান নি, ভোলার নয়। বরং প্রাত্যাহিক জীবনে ব্লগিংয়ের সামাজিকতাকে প্রয়োগ করছেন এবং অনিয়মিতভাবে লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছেন, যা হয়তো বই আকারে বের হতে পারে।

এবার একজন প্রাক্তন সহকর্মীকে নিয়ে একটি বেদনাদায়ক ঘটনা বলছি। আমরা একসাথে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে গেলে, তিনি একটি সংবাদ মাধ্যমে গিয়ে যোগদান করেন। তার মুখেই বলা এই কাহিনি। আমি ছাড়া হয়তো আর কেউ জানে না। তাদের অফিসে এক সময় সকলেই ফেইসবুক টুইটার ইত্যাদি ব্যবহার করতো এবং ‘লাইক-শেয়ারিং’ ইত্যাদি নিয়ে অনেক মজাও হতো চা’য়ের আড্ডায়। তাদের সিনিয়র কর্মকর্তাও এসবের বাইরে ছিলেন না। একটি সংবাদ মাধ্যম হিসেবে কাজের ফাঁকে একটু আড্ডার প্রয়োজন থাকতেই পারে। কিন্তু অবাধে ফেইসবুক ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের বিষয়টি অধিকতর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে আসে। তারা দেখলেন অথবা ধারণা করলেন যে, এতে অফিসের স্বাভাবিক পরিবেশ এবং গতিশীলতা ভিন্নদিকে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে তাদের সিনিয়র ব্যবস্থাপক ঘোষণা দিয়েই অফিসে ফেইসবুক বা এরকম মাধ্যমগুলোর ব্যবহার নিষেধ করে দেন। নিষেধাজ্ঞা জারির কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে সতর্ক করতে হলো, কারণ পুরোনো অভ্যাস অনেকেই হঠাৎ ছাড়তে পারে নি! মাসখানেক পর শাস্তিসহ পুনঃসতর্কবার্তা জারি হলো! এরই মধ্যে সেই সিনিয়রের একটি পোস্টে ‘লাইক’ দিয়ে আমার সহকর্মী বন্ধুটি অফিস কর্তৃপক্ষকে বিশাল অস্বস্তিতে ফেলে দেন। ‘লাইক’ দেবার সময়টি ছিল অফিস টাইমের মধ্যে! যা হোক, ঘোষিত শাস্তি মোতাবেক, তাকে শোকজসহ বরখাস্ত করতে হয়। কিন্তু তার মতো একজন কর্মীকে তারা হারাতেও চাচ্ছেন না। কর্তৃপক্ষ একটি ফ্রেন্ডলি মিটিংয়ে তাকে প্রশ্ন করে, তিনি এখন কী করতে চান। হয়তো তারা চেয়েছিলেন ক্ষমা করে দিতে! আমার সহকর্মী বন্ধুটি একটু নাকউঁচু টাইপের: ভাঙবে কিন্তু মচকাবে না! তিনি পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। বিষয়টি আক্ষেপজনক হলেও ওখানেই শেষ হয়। কিন্তু চরম একটি শিক্ষা হলো সংশ্লিষ্টদের। ব্যাপারটি এরকম দাঁড়ালো যে, ফেইসবুক ব্যবহার করার কারণে তার চাকরিটিই থাকলো না।

আরেকজন সেলিব্রেটি ফেইসবুকারের গল্প বলছি, যার অগণিত বন্ধু এবং চার হাজারের ওপরে অনুসারি আছে ফেইসবুকে। তিনি মূলত ব্লগ থেকেই ‘সেলিব্রেটি নবুয়ত’ পেয়েছেন, যদিও তখনও তিনি এইচএসসিও পাশ করেন নি। সিরিয়াস লেখক বা কবি বা গল্পকার নন। ফান পোস্ট আর চলমান বিষয় নিয়ে রসাত্মক লেখায় পাঠককে জমিয়ে রাখতেন। এসবের পাঠক বেশি! ক্রমান্বয়ে বিশাল একটি ভক্ত সম্প্রদায় গড়ে ওঠে তার। টিনেজ পেরোনো ছেলেমেয়েদের জন্য এটি কিন্তু বিশাল প্রাপ্তি! স্বপ্নের মতো বিশাল! বলা যায়, তিনি রীতিমতো খ্যাতির মগডালে ওঠেছিলেন। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে যে, এটি শুধুই ভার্চুয়াল স্পেইস। একে বাস্তব জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির সাথে না মেশাতে পারলে অর্থহীন সময় ক্ষেপন মাত্র। বাস্তবিক সমাজে টিকে থাকার মতো যদি কিছু না থাকে, তবে শুধুই আকাশে বসত করে একে টিকিয়ে রাখা কঠিন। বাস্তব জীবনের বন্ধুরাই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়, অন্যদিকে ভার্চুয়াল বন্ধুরা শুধু মাত্র ‘রেস্ট ইন পিস’ অথবা একটি ‘লাইক’ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করে। অসম্ভব রকমের প্রচার ও সুখ্যাতি থাকলে এবং বাস্তবের সাথে তার যোগসূত্র থাকলে, এক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম আসতে পারে।

পরবর্তি ঘটনা যা হোক, সেই সেলিব্রেটিকে আর দেখা যাচ্ছে না! এই প্রস্থান হঠাৎ হয় নি। গত ৩/৪ বছরকে তার ‘উইথড্রয়াল পিরিয়ড’ বলা যায়। মানে হলো, পরিবারের চাপে আর পরীক্ষার নৈকট্যে, যেভাবেই হোক তার চেতনা হয় এবং ভার্চুয়াল জগৎ থেকে বাস্তবিক জগতে ফিরে যান। হয়তো উচ্চতর পড়াশোনা করছেন, নয়তো চাকরিতে প্রবেশ করেছেন। আমার বন্ধু তালিকা থেকেও উধাও; বোধ হয় ফেইসবুক পরিচয়টিকেও নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছেন! অথবা, কে জানে, হয়তো ভিন্ন নামে আছেন!

আড্ডাবাজিতে আমার একটু দুর্বলতা থাকায়, এর কুফলটুকু আমি বুঝার চেষ্টা করছি। ব্লগিং যখন ‘আড্ডাফায়িং’ পর্যায়ে চলে যায়, তখন কীভাবে যে সময় চলে যায় বুঝা যায় না। সেটি নিজের এবং প্রতিষ্ঠানের উভয়ের ক্ষতি। প্রতিটি চাকরিজীবি মানুষের দিবাকালীন আটটি ঘণ্টা আর্থিক মানদণ্ডে সুনির্দিষ্ট করা আছে। এর প্রতিটি ঘণ্টার আছে আর্থিক মূল্য। কাজ থাকুক অথবা না থাকুক, সময়টি প্রতিষ্ঠানের। প্রতিষ্ঠানের পক্ষে-বলা মানুষ খুবই কম, তাই গায়েপড়ে কেউ সতর্ক নাও করতে পারে। এখানে বিবেকই একমাত্র নির্দেশিকা। তাই অফিসে বসে সামাজিক যোগাযোগে কতটা সময় দেওয়া যায়, কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, এবং কতটুকু দিলে সেটি উপেক্ষা করার মতো, সেটি নিজের বিবেক দ্বারাই বিচার করা যায়।

ব্যক্তিগত সময়কেও (যেমন ছুটির দিন অথবা দিনের বাকি সময়) উদারভাবে ভার্চুয়াল সমাজে না দিয়ে কিছু সময় পরিবার, বন্ধু ও নিকাটাত্মীয়কে দেওয়া উচিত। এখন সময় এসেছে হাল টেনে ধরার। বিষয়টি নেশার পর্যায়ে চলে গেছে এবং কিছু কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ইতিমধ্যেই সংবাদমাধ্যমে আসতে শুরু করেছে।

ব্লগার/ফেইসবুকারদেরকে আলোচনার স্বার্থে কয়েকটি ভাগে যদি ভাগ করি, তবে নিজেদের অবস্থান বুঝতে পারবো।

▲ভার্চুয়াল মানব ১:

ব্লগ, ফেইসবুক, টুইটার, স্কাইপ, ফ্লিকার… প্রায় সব জায়গায় তার বিচরণ। একটি থেকে আরেকটি মাধ্যমে তিনি প্রায় ১৮ ঘণ্টা এপার-ওপার করেন। তাদের মধ্যে কারও কারও প্রাসঙ্গিক প্রযুক্তিবিদ্যা থাকার কারণে, ইন্টারনেটে থাকাটা মোটামুটি ‘ছোয়াবের বিষয়’ বলে ধরে নিয়েছেন। কারও আছে নিজস্ব ব্লগ, ওয়েবপোর্টাল বা সংবাদমাধ্যম। কেউ আবার অনলাইন সংবাদমাধ্যমে চাকরি করেন। তাদের মধ্যে একদল আছেন যারা চাকুরিসূত্রে অনলাইনে লটকে থাকেন, আরেকদল নেশা ও অপরিণামদর্শীতার কারণে।

▲ভার্চুয়াল মানব ২:

এদের অধিকাংশই একটি উদ্দেশ্য নিয়ে অনলাইনে সময় দেন। ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুম আসা পর্যন্ত তারা অনলাইনেই থাকতে চান, তবে কাজের চাপে সেটি পারেন না। ফলে সেটি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি এবং প্রাত্যাহিক জীবন ও সুস্বাস্থ্যের পরিপন্থী।

▲ভার্চুয়াল মানব ৩:

এই দলটি পেশাজীবী। সময় পেলে সর্বান্তকরণে অনলাইনে থাকেন। ব্লগে অথবা সামাজিক মাধ্যমে। সহপাঠিদের সাথে আড্ডা দেন, নিজেদের জীবনের ঘটনাগুলোকে শেয়ার করেন। স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি নয়। কারণ তাছাড়াও তাদের অনেক আগ্রহের বিষয় আছে, যা ভার্চুয়াল সমাজ দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়।

▲ভার্চুয়াল মানব ৪:

সকল বয়সেই একটি কাজহীন দল আছে। কেউ কাজ পাচ্ছে না, কেউ অবসরপ্রাপ্ত, কারওবা কাজের বয়সই হয় নি। তারা বিনোদন করতে অথবা স্মৃতি জমা করার জন্য অনলাইনে আসেন। কিন্তু নিজেরা কোন আর্থিক পেশায় যুক্ত না থাকায়, ততটা সময় অনলাইনে থাকতে পারেন না। এদের মধ্যে যারা বয়স্ক বা অবসরপ্রাপ্ত, তাদের অনেক সামাজিক কাজও থাকে।

যা হোক, এভাবে হয়তো ভার্চুয়াল মানব ৫… ১০, ১৫ অথবা ২০ পর্যন্ত যাওয়া যায়। কিন্তু শ্রেণীভেদের একটি সীমা থাকা উচিত। আমাদের অনলাইন জীবনেরও একটি সীমা থাকা উচিত, কারণ বাস্তবতাকে কিছু সময়ের জন্য ভুলে গেলেও এটি আমাদের পেছন ছাড়বে না। ভার্চুয়াল বিষয়গুলো খুব বেশি হলে অনুঘটক হতে পারে, অথচ বাস্তবতা দিয়েই জীবন গড়ে ওঠে।

বাসা হোক কিংবা কর্মস্থল, আমরা যেন আশেপাশের মানুষগুলোকে খেয়াল করি! কম্পিউটার বা স্মার্টফোনটি খোলা থাকতেই পারে, কিন্তু সে সাথে আমরাও খোলা থাকি বাস্তবতার দিকে!

 

 

প্রথম প্রকাশ: সামহোয়্যারইন ব্লগ। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

———————–

Image courtesy: baroneenglish.blogspot.com

এসডিজি কেন? কী বিশেষত্ব এতে আছে? এমডিজি’র সাথে এর কী সম্পর্ক/পার্থক্য?

sdg photo

এমডিজি ছিলো বিশ্বনেতাদের প্রণীত সার্বজনীন উন্নয়ন পরিকল্পনা। এমডিজি’র মাধ্যমে বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানরা উন্নয়নের ৮টি বিষয়ে একমত হয়ে স্ব স্ব দেশের উন্নয়নের চেষ্টা করেছেন বিগত ১৫ বছরে। কিছু লক্ষ্য পূরণ হয়েছে, কিছু বাকি থেকেছে। এমডিজি’র মাধ্যমে উন্নয়ন সম্পর্কে বিশ্বনেতাদের মধ্যে ঐকমত্য সৃষ্টি হলেও, এতে দারিদ্রের মূল কারণে (root cause) দৃষ্টিপাত করা যায় নি। জেন্ডার বৈষম্যে গুরুত্ব দেওয়া যায় নি এবং সার্বিক উন্নয়নের বিষয়গুলো থেকেছে অবহেলিত। এমডিজি’র মেয়াদ শেষ হলেও ১০০ কোটি মানুষ এখনও দরিদ্র সীমার নিচে, অর্থাৎ তাদের দৈনিক আয় ১.২৫ ডলারের নিচে।

এমডিজিতে মানবাধিকার বিষয়ে কোন উল্লেখ ছিল না এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টিও ছিল অস্পষ্ট। তাত্ত্বিকভাবে সকল দেশে প্রযোজ্য হলেও শুধুমাত্র দরিদ্র দেশগুলোতে এটি প্রয়োগ করা হয়েছে। অর্থ দিয়েছে তথাকথিত ধনী দেশগুলো।

এভাবেই ২০১৫ সালে এমডিজি’র নির্ধারিত ১৫ বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এসডিজি হলো গত ১৫ বছরে প্রচলিত এমডিজি’র সম্প্রসারিত ও হালনাগাদ রূপ। এতে টেকসই উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ধনী এবং গরীব সকল দেশকেই যথাযথভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সংক্ষেপে এসডিজি: ১. দারিদ্র্য বিমোচন; ২. ক্ষুধামুক্তি; ৩. সুস্বাস্থ্য; ৪. মানসম্মত শিক্ষা; ৫. জেন্ডার সমতা; ৬. বিশুদ্ধ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন; ৭. ব্যয়সাধ্য ও টেকসই জ্বালানি; ৮. সবার জন্য ভালো কর্মসংস্থান; ৯. উদ্ভাবন ও উন্নত অবকাঠামো; ১০. বৈষম্য হ্রাসকরণ; ১১. টেকসই শহর ও সম্প্রদায়; ১২. (সম্পদের) দায়িত্বশীল ব্যবহার; ১৩. জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধ; ১৪. সমুদ্রের সুরক্ষা; ১৫. ভূমির সুরক্ষা; ১৬. শান্তি ও ন্যায়বিচার; ১৭. লক্ষ্য অর্জনের জন্য অংশিদারিত্ব। ১৭টি লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করার জন্য বিশ্বের প্রায় সকল দেশ একমত হয়েছে জাতিসক্সেঘর অতিসাম্প্রতিক এক সাধারণ সভায়। আমাদের সরকার প্রধানও সেখানে ছিলেন।

এসডিজি’র বিশেষ দিকগুলো:

১) সম্পূর্ণতা/ Zero – Total Achievement: ২০১৫ সাল পর্যন্ত এমডিজি’র উদ্দেশ্য ছিল ক্ষুধা ও অভাবমুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে অন্তত ‘অর্ধেক পথ’ আগানো। এসডিজি’র লক্ষ্য হলো কাজটি সম্পূর্ণ শেষ করা, অর্থাৎ ২০৩০ নাগাদ কোন ক্ষুধা বা খাদ্যাভাব থাকবে না – জেরো হাংগার ও zero poverty। সম্পূর্ণ অর্জনের জন্য শতভাগ মনযোগ, শতভাগ অংশগ্রহণ এবং শতভাগ ক্ষমতায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

২) সার্বজনীনতা/ Universal: ধনী দেশগুলো গরীব দেশগুলোকে সাহায্য করবে, এই ছিল এমডিজি’র বাস্তবতা। এরপর অনেক পরিবর্তন এসেছে বিশ্ব সমাজে। ODA-র পরিমাণ নামতে নামতে শূন্যে চলে এসেছে। সমস্যাটি দেশ বা জাতিভিত্তিক নয়। সমস্যা হলো, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং ধনী গরীবের পার্থক্য, যা সকল দেশেই আছে। ইউরোপের মতো ধনী মহাদেশে তিনকোটি বস্তিবাসী আছে। তাই এসডিজিতে সকল দেশকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

৩) সর্বব্যাপী/ Comprehensive: এমডিজিতে ৮টি লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এসডিজি’র জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি প্রথমে ১২টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু দারিদ্রতার মূলোৎপাটন, মানবাধিকার, বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতা, এবং সুশাসনকে বিবেচনায় এনে ওপেন ওয়ার্কিং গ্রæপ মোট ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরে। এটিই চূড়ান্ত। টেকসই উন্নয়নের জটিল বিষয়গুলো এমডিজিতে সেভাবে স্থান পায় নি, যা এসডিজিতে গুরুত্ব পেয়েছে।

৪) ক্ষুধামুক্তির শর্তাবলী/ Hunger Issues: ‘ক্ষুধামুক্তির তিনটি স্তম্ভকে’ (নারীর ক্ষমতায়ন, সকলকে সম্পৃক্তকরণ এবং স্থানীয় সরকারের সাথে অংশিদারিত্ব) এমডিজিতে তেমন গুরুত্ব দেওয়া যায় নি। জেন্ডার, ক্ষমতায়ন, এবং সকল পর্যায়ে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ইত্যাদি জটিল বিষয়গুলোকে এসডিজিতে আরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

৫) অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা/ Inclusive Goal-setting: এমডিজি নির্ধারিত হয়েছিল টপ-ডাউন প্রক্রিয়ায়, অর্থাৎ উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ ও বিশ্বনেতাদের অংশগ্রহণে। কিন্তু এসডিজি নির্ধারণে সকল পর্যায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে, যা বিশ্বে এর আগে কখনও হয় নি। প্রায় ১০০ দেশের সাথে মুখোমুখি সভা হয়েছে এবং কোটি মানুষের মতামত সংগ্রহ করা হয়েছে বিভিন্ন জরিপের মাধ্যমে।

৬) দারিদ্রতা থেকে ক্ষুধাকে আলাদাকরণ/ Distinguishing Hunger and Poverty: এমডিজিতে ক্ষুধা ও দারিদ্রকে একসাথে MDG1-এ রাখা হয়েছিল। মনে করা হয়েছিল একটি সমাধান হলেই আরেকটির সুরাহা হয়ে যাবে। কিন্তু এসডিজিতে খাদ্য এবং পুষ্টি নিরাপত্তাকে ‘দারিদ্রতা’ থেকে আলাদাভাবে দেখা হয়েছে।

৭) অর্থায়ন/ Funding: এমডিজিতে মনে করা হয়েছিল যে, ধনী দেশগুলো থেকে সহায়তা নিয়ে দারিদ্রতা দূর করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে সেটি সফলতা পায় নি। এসডিজিতে টেকসই এবং সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রধান কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাতে সংশ্লিষ্ট দেশের রাজস্ব বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

৮) শান্তি প্রতিষ্ঠা/ Peace Building: বিগত ১৫ বছরে দেখা গেছে যে শান্তিপূর্ণ এবং সুশাসনভুক্ত দেশগুলো অগ্রগতি লাভ করেছে। ১৫ বছর পর এখন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধুমাত্র বিরোধপূর্ণ দেশগুলোতেই ‘তীব্র দারিদ্রতা’ থেকে যাবে। ক্ষুধা ও দারিদ্রতাকে দূর করার জন্য তাই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। কিন্তু এটি এমডিজিতে গুরুত্ব পায় নি, এসডিজিতে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

৯) মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতা/ M&E and Accountability: পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতা সম্পর্কে এমডিজিতে কিছুই বলা নেই। এসডিজিতে ২০২০ সালের মধ্যে তথ্য বিপ্লব ঘটানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। তাতে জাতীয় পর্যায়ে মানুষের আয়, বয়স, জেন্ডার, নৃতাত্বিক তথ্য, অভিবাসন পরিস্থিতি, ভৌগলিক অবস্থান এবং অন্যান্য তথ্য সম্পর্কে মানসম্মত, সময়নিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য বিবরণ তৈরি করা হবে।

১০) মানসম্মত শিক্ষা/ Quality Education: এমডিজিতে কেবল সংখ্যার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেমন: ভর্তির সর্বোচ্চ হার, পাশের হার ইত্যাদি। তাতে সংখ্যা বাড়লেও গুণগত মান গিয়ে তলায় ঠেকেছে। কিন্তু এসডিজিতে মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে একটি ‘মানবিক বিশ্ব’ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

একনজরে এসডিজি বা বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা

১. দারিদ্র্য বিমোচন [No Poverty]: সর্বত্র এবং সবধরণের দারিদ্র্যতা দূর করা;
২. ক্ষুধামুক্তি [Zero Hunger]: ক্ষুধা দূর করা, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টি অর্জন, এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থা চালু করা;
৩. সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ [Good Health & Well being]: স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন নিশ্চিত করা এবং সব বয়সের সকলের জন্য কল্যাণ বৃদ্ধি;
৪. মানসম্মত শিক্ষা [Quality Education]: অন্তর্ভূক্তিমূলক, সমতাপূর্ণ ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষা সুযোগ সৃষ্টি;
৫. জেন্ডার সমতা [Gender Equality]: জেন্ডার সমতা অর্জন করা এবং সব নারী ও তরুণীর ক্ষমতায়ন;
৬. বিশুদ্ধ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন [Clean Water & Sanitation]: সবার জন্য পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের সুযোগ এবং এর টেকসই ব্যবস্থাপনা;
৭. ব্যয়সাধ্য ও টেকসই জ্বালানি [Affordable & Sustainable Energy]: সবার জন্য ব্যয়সাধ্য, নির্ভরযোগ্য, টেকসই এবং আধুনিক জ্বালানির সুযোগ নিশ্চিতকরণ;
৮. সবার জন্য ভালো কাজ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি [Decent Work & Economic Growth]: সবার জন্য টেকসই, অন্তর্ভূক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পূর্ণকালীন ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং ভালো কাজ নিশ্চিতকরণ;
৯. শিল্প, উদ্ভাবন ও উন্নত অবকাঠামো [Industry, Innovation & Infrastructure]: দীর্ঘস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা, অন্তর্ভূক্তিমূলক এবং টেকসই শিল্পায়ন এবং উদ্ভাবনকে প্রেরণা দেওয়া;
১০. বৈষম্য হ্রাসকরণ [Reduced Inequalities]: দেশের ভেতরে এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যকার বৈষম্য দূর করা;
১১. টেকসই শহর ও সম্প্রদায় [Sustainable Cities and Communities]: শহর এবং মানুষের বাসস্থানকে অন্তর্ভূক্তিমূলক, নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী এবং টেকসই করে তোলা;
১২. (সম্পদের) দায়িত্বশীল ব্যবহার [Responsible Consumption & Production]: টেকসই ভোগ ও উৎপাদন রীতি নিশ্চিত করা;
১৩. জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধ [Climate Action]: জলবায়ূর পরিবর্তন ও প্রভাব মোকাবেলায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ;
১৪. সমুদ্রের সুরক্ষা [Life below Water]: টেকসই উন্নয়নের জন্য মহাসাগর, সাগর এবং সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার;
১৫. ভূমির সুরক্ষা [Life on Land]: ভূমির উপরিস্থ পরিবেশ-ব্যবস্থার সুরক্ষা, পুনঃস্থাপন এবং টেকসই ব্যবহার; টেকসই বন ব্যবস্থাপনা; মরুকরণ রোধ ও বন্ধ করা; ভূমিক্ষয় রোধ করা এবং জীববৈচিত্রের ক্ষতি বন্ধ করা;
১৬. শান্তি ও ন্যায়বিচার [Peace, Justice & Strong Institutions]: টেকসই উন্নয়নের জন্য শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভূক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা; সকলের জন্য ন্যায়বিচারের সুযোগ সৃষ্টি; এবং সর্বস্তরে কার্যকর, জবাবদিহি এবং অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা;
১৭. লক্ষ্য অর্জনের জন্য অংশিদারিত্ব [Partnerships for the Goals]: বাস্তবায়নের উপায়গুলো শক্তিশালী করা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক অংশিদারিত্ব পুনর্জীবিত করা।


যেভাবে নির্ধারণ করা হয় এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা:

এমডিজি’র মতো জাতিসঙ্ঘের চারদেয়ালের ভেতরে বসে এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় নি। ২০১৫ সাল পরবর্তি সময়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় ২০১২ সালের রিয়ো প্লাস টুয়েন্টি (রিয়ো ডি জেনিরো, ব্রাজিল) শীর্ষ সম্মেলনে। সম্মেলনের ফলশ্রুতিতে ‘দ্য ফিউচার উই ওঅন্ট’ শীর্ষক ঐতিহাসিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যাকে বলা যায় এসডিজি’র রূপরেখা। তারা (১৯৩ সদস্য রাষ্ট্র) একটি ওপেন ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করে খসড়া লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করার জন্য তাদেরকে ক্ষমতায়ন করেন।

ওপেন ওয়ার্কিং গ্রুপ ৭০টি দেশের প্রতিনিধি নিয়ে এবং ১০০ দেশের সাথে মুখোমুখি সভার মধ্য দিয়ে (ওপরে বলা হয়েছে) চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা প্রণয়ন করে (২০১৫/অগাস্ট)। তাছাড়াও জাতিসঙ্ঘ ‘বৈশ্বিক কথোপকথন’, পরিবার জরিপ এবং ‘মাই ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক জরিপের আয়োজন করে। সব তথ্য ও উপাত্ত ওপেন ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রতিবেদনে যুক্ত হয়।

১৭টি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান:

সংখ্যাগরিষ্ট রাষ্ট্র এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রাগুলো নিয়ে সন্তুষ্ট (এমডিজি’র ক্ষেত্রে এটি ছিল না)। তবে ইংল্যান্ড ও জাপানসহ হাতেগুণা কয়েকটি রাষ্ট্র মৃদু দ্বিমত প্রদর্শন করেছে। কোন কোন দেশ ১৭টি লক্ষ্যমাত্রাকে খুব বেশি এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না বলে মত দিয়েছে। ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জনসমক্ষেই বলেছেন যে, তিনি ১২টিতে একমত, ১০টি হলে ভালো। তবে কোন্ লক্ষ্যমাত্রাগুলোতে তারা ‘একমত’ তা তিনি স্পষ্ট করেন নি।

জাতিসঙ্ঘের বিশেষ উপদেষ্টা (আমিনা মোহাম্মেদ) বলেছেন যে, লক্ষ্যমাত্রাগুলোকে ১৭ পর্যন্ত নামিয়ে আনতে তাদের অনেক কষ্ট হয়েছে। আরও কমানো হলে তা প্রবল বিরোধীতার মুখে পড়বে এবং নারীর ক্ষমতায়ন, সুশাসন, শান্তি ও নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়গুলো বাদ পড়তে পারে।

MDG-2015-infographic-Latif_0
[২০১২ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রোগ্রেস]
শেষকথা: আরেক ফর্দ লক্ষ্যমাত্রার কী দরকার ছিল?এমডিজি’র লক্ষ্য ও অর্জন নিয়ে যত সমালোচনাই হোক না কেন, এর মধ্য দিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে উন্নয়ন বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উন্নয়ন ইস্যুতে একতাবদ্ধ থাকার কারণে স্নায়ুযুদ্ধ (রাশা বনাম যুক্তরাষ্ট্র) স্নায়ুতেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। অর্থাৎ ২০০০ সালে এমডিজি’র পাশাপাশি শুরু হয়েছে উন্নয়নের বিশ্ব রাজনীতি। আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা। তাতে যতই রাজনীতি থাকুক না কেন দরিদ্র দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি, বরং নানাভাবে উপকৃত হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি, দ্বিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক সংস্থা গড়ে ওঠেছে যেন এমডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অপেক্ষাকৃত পিছিয়েপড়া দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়া যায়। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা এবং পুষ্টির মতো মৌলিক ইস্যুতে বিগত দেড় দশকে গরিব দেশগুলো পেয়েছে প্রচুর সহযোগিতা। এর অধিকাংশই সম্ভব হয়েছে এমডিজি নামক একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উন্নয়ন এজেন্ডা থাকার কারণে।

২০১৫ সালে শেষ হয়ে গেলো এমডিজি’র যুগ। এবার কেমন হবে? কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন, আর্থিক মন্দা, কর্মসংস্থান, মুক্তবাজার বাণিজ্য, খাদ্যাভাব, মারাত্মক রোগ ইত্যাদি ইস্যুতে বিশ্ববাসীকে আবার এক করা যায়? কীভাবে চালিয়ে যাওয়া যায় উন্নয়নের রাজনীতি? এ নিয়ে গত তিন বছর ধরে (২০১২ থেকে) হয়েছে নানা পর্যায়ের গবেষণা। বলা যায়, এমডিজি বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নিয়েছে এর সর্বাধুনিক ও সময়োপযোগী রূপ, এসডিজি। ‘এস’ মানে সাসটেইনেবল, টেকসই, স্বয়ংসম্পূর্ণ। এসডিজিকে বলা যায় বিশ্বের সার্বিক উন্নয়নে বিশ্বনেতাদের প্রতিশ্রুতিমালা, যা প্রণীত হয়েছে সকলের অংশগ্রহণে। বিগত কয়েক দশকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন কিছু হয়েছে – এবার দরকার উন্নয়নকে স্থায়ীকরণ, প্রবৃদ্ধিতে ধরে রাখা। সর্বোপরি, উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব থেকে বিশ্ববাসীকে মুক্তি দেওয়া এবং বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যাকে (নারী) অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা। দেখা যাক আগামি ১৫ বছর (২০১৬-২০৩০) কেমন যায়!

ক. পরিশিষ্ট:

*ODA: Official Development Assistance উন্নত দেশগুলো থেকে ‘সরকারি সাহায্য’, যা DACএর মাধ্যমে বিতরণ হয়। DAC/ Development Assistance Committee হলো জাতিসঙ্ঘের OECD-এর অধীন একটি সংস্থা (OECD= Organization for Economic Cooperation and Development)। ODA সহায়তা বিতরণের নির্দেশক হিসেবে বহুল ব্যবহৃত।

*MDG/এমডিজি: Millennium Development Goal বা সহস্রাব্দি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (২০০০-২০১৫)। চরম দারিদ্র্য দূরীকরণ; সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা; জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণ ও নারীর ক্ষমতায়ন; শিশুমৃত্যুর হার কমানো; মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন; এইডস ও ম্যালেরিয়াসহ মারাত্মক রোগগুলোর প্রতিরোধ; পরিবেশের ভারসাম্যতা নিশ্চিতকরণ এবং উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক অংশিদারিত্ব – এই ৮টি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এমডিজি প্রণীত হয়েছিল।

*উন্নয়নকর্মী হিসেবে এমডিজি/এসডিজি নিয়ে কিছু-না-কিছু নাড়াচাড়া করতে হয় প্রতিনিয়তই। সেখান থেকে কিছু ‘মৌলিক বিশ্লেষণ’ সহব্লগারদের পাঠের উপযোগী করে এবং পারিভাষিক শব্দ যথাসম্ভব পরিহার করে উপস্থাপন করা হলো। বাকি বিষয় খবরের কাগজে পাওয়া যাবে।

*প্রথম প্রকাশ: ০৭ ই অক্টোবর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:৩৫। সামহোয়্যারইন ব্লগ

————————————————————————–

খ. তথ্যসূত্র:

a. sustainabledevelopment.un.org [accessed on 3/Oct/2015]
b. theguardian.com/global-development [accessed on 28/Sep/2015]
c. United Nations, The Future We Want, 2012

যেসব কারণে সেলিব্রেটিদেরকে হিংসা করতে ইচ্ছে হয় না

file (3)-crop

খ্যাতিমানদের জীবন নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই।  তারা কীভাবে তাদের প্রাত্যাহিক জীবনকে উপভোগ করছে, এসব নিয়ে নানা জল্পনাকল্পনা থাকে মানুষের মনে।  সামান্য অনুসন্ধান করে উচ্ছ্বসিত হবো নাকি হতাশ হবো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।  গসিপ বা ট্যাবলয়েড পত্রিকাগুলো কেন এত উল্টাসিধা সংবাদ ছাপে, এর কিছু কারণ খুঁজে পেয়েছি।  বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনে সামান্য দৃষ্টিপাত করে যা জেনেছি, তাতে তাদের প্রতি অনুকম্পা জাগে।

এঁরা কীভাবে বেঁচে আছেন, এটি একটি বিস্ময়ের বিষয় বটে। এদের না আছে বন্ধু, না আছে আত্মীয়। একটি পর্যায়ে নিজ পরিবারও হাতছাড়া! না আছে স্বাধীন চলাফেরা করার পথ, না আছে মৌলিক চাহিদা পূরণের সুযোগ। দায় বেশি আয় কম! আয় আছে তো দশগুণ দায়ও আছে। আছে আয়কর-ওয়ালা; আর আছে দাতাসংস্থার মিষ্ট চাপ। এঁরা না কইতে পারেন, না সইতে পারেন অবস্থা। একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরলাম। দৃষ্টান্তে বেশি গেলাম না, পাছে লেখা বড় হয়ে যায়!

খ্যাতিমান মানুষদের সামাজিক দায় বেশি। গায়ক, নায়ক, আঁকিয়ে, নাচিয়ে যে-ই হোক না কেন, বিখ্যাতদের সামাজিক দায়িত্ব বেড়ে যায় অনেক গুণে। তারা পান থেকে চুন কষলেই পত্রিকার শিরোনাম, সঙ্গে আসে মানুষের বদনাম। দু’দিনেই বিখ্যাত হয়ে যান কুখ্যাত। বউয়ের গায়ে হাত পড়লে পৃথিবীতে কোন স্বামী নেই, তার মাথা ঠাণ্ডা থাকবে। স্ত্রীকে অত্যুক্ত করতে দেখে যেকোন স্বামী অভিভাবকত্ব প্রমাণ করার জন্য হলেও ন্যূনতম প্রতিক্রিয়া দেখাবে। দেশের একজন খ্যাতিমান ক্রিড়াবিদ তার স্ত্রীর সম্মান রক্ষায় একটু চেষ্টা করায় গণমাধ্যমে তোলপাড় লেগে গেলো। শেষ পর্যন্ত বহিষ্কার! সামাজিক মাধ্যমে তাকে তুলোধুনা করা হলো। খ্যাতিমান মানুষদের ভালো থাকার দায়ও বেশি।

 

খ্যাতিমান মানুষদের ভুল করার সুযোগ সীমিত। কারণ মানুষ তাদেরকে দেবতা জ্ঞান করে। তারা রিক্সাওয়ারার খারাপ ব্যবহারে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেন না। তারা তরকারি ওয়ালার সাথে তর্কাতর্কিতে জড়িয়ে পড়তে পারেন না, টাকা যত বেশিই দাবি করুক।

খ্যাতিমান মানুষদের চুপ থাকার দায় বেশি। সব কথা, সব শব্দ তারা ব্যবহার করতে পারেন না – ট্যাগ লেগে যাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে! পরের দিনের সফর বাতিল! অন্যেরা যে কথা অহরহ বলে বেড়াচ্ছে, সেলিব্রেটিরা সেটি বললেন, তো মরলেন। খ্যাতিমান, আপনি কোন মডেলের সাথে প্রেমে জড়ালেন। সঙ্গে কিলকিল করবে টিকটিকির দল (প্রেস)। আপনার জান কয়লা বানিয়ে ফেলবে প্রশ্নের পর প্রশ্ন দিয়ে। বললেন, “ওটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়।” উত্তরে তারা বলবে, সেলিব্রেটিদের সমস্ত তথ্য জনগণের সম্পদ। এবার আপানি যাবেন কই? ওই সাম্বাদিককে মারপিট করবেন? এটা আমপাবলিকের কাজ, আপনার নয়। যদি করেই ফেলেন, তবে নিশ্চিত থাকুন, দেশের গণমাধ্যম আপনাকে আত্মহত্যার পর্যায়ে নিয়ে যাবে। খ্যাতিমান মানুষদের সহনশীলতার দায়ও বেশি।

খ্যাতিমান মানুষদের চলার জায়গা সীমিত। তারা সব জায়গায় সব বাহনে চলতে পারেন না। তাতে তাদের সামাজিক স্ট্যাটাসে যা-ই হোক, নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। নিরাপত্তা কর্মীরা এসে সোজা পাজকোলা করে বাড়িতে পৌঁছে দেবে। সঙ্গে একটি বকাও দেবে, “আপনার মতো সম্মানী ব্যক্তি এভাবে চলাফেরা করছেন, আমাদেরকে আগে জানাবেন না?” খ্যাতিমান মানুষদের জনসমক্ষে থাকার সুযোগ সীমিত। খ্যাতিমান মানুষদের সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রটুকুও ছোট। বাথরুম থেকে বেডরুম পর্যন্ত সীমিত – অবশ্য যদি গোপনীয় সিসি ক্যামেরা না থাকে।

খ্যাতিমান মানুষদের মৌলিক চাহিদা পূরণের স্বাধীনতা কম। শুধু মৌলিক চাহিদা কেন, কোন চাহিদাই এরা নিজ চেষ্টায় পূরণ করতে পারবেন না। সেলুন থেকে শুরু করে হাসপাতাল পর্যন্ত কোত্থাও তাদের চলাফেরা করার সুযোগ নেই। বিখ্যাত হয়ে কর্মহীন হয়েছেন? তো গেছেন! এর চেয়ে ‘সুইসাইড খাইয়া হালান’! হরিণের নিজের মাংসই তার পয়লা শত্রু। আপনার খ্যাতি তখন আপনার বিপক্ষে কাজ করবে। শুধুমাত্র কৌতুকাভিনেতা হিসেবে পরিচিতির কারণে চাকরি হারাতে হয়েছে একজন পরিচিত খ্যাতিমানের। আর কোত্থাও তার কাজ জুটলো না। খ্যাতিমানদের গরিব হতে নেই, কেউ ভাত দেবে না – সুযোগ পেলে আপনাকে নিয়ে একটা সেলফি তুলতে পারে। ভুলেও টাকা বা কাজ অফার করবে না, পাছে আপনি অপমানিত হন!
এতসব দায়দায়িত্বের পরও মানুষের ইচ্ছে জাগে খ্যাতিমান হবার। হুমায়ূন আজাদের একটি প্রবচন অনেকটা এরকম: মানুষ যখন বিখ্যাত হতে চায়, তখন শুধুই চায় অন্যেরা তাকে দেখুক। কিন্তু কিছুদিন পরই সে কালোচশমা লাগিয়ে ঘুরে, যেন কেউ তাকে দেখতে না পায়। সেলিব্রেটি হওয়া অনেকটা দিল্লিকা লাড্ডুর মতো। না হলে আফসুস, হবার পরও আফসুসের অন্ত নেই।

তবে খ্যাতিমান মানুষদের মহৎ কাজ করার সুযোগ বেশি। তারা চাইলেই কয়েকশ’ লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন নিমিষে। একটি ফোনকলে গ্রামের ভাঙ্গাসেতুটি মুহূর্তে মেরামত সম্পন্ন! নিজের খরচ ছাড়াই প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গকে একটি জনমুখী কাজে সংযুক্ত করতে পারেন। খ্যাতিমান মানুষদের অন্যকে সহায়তা করার সুযোগ বেশি।

 

অর্জিত খ্যাতি আর আরোপিত খ্যাতি বলে দু’টি বিষয় আছে। যারা নিজেদের শ্রম ও মেধা দিয়ে খ্যাতি অর্জন করেন, তারা উপরোক্ত দায়সকল পূরণ করতে মজাই পান। কিন্তু খ্যাতি যাদের ওপর ইচ্ছা-অনিচ্ছায় এসে পড়েছে, তারা এর মূল্য বুঝতে পারেন না। তারা হঠাৎ সৌভাগ্য বা লটারির মতো খ্যাতিকে পেয়ে শুধু ‘পাবার বিষয়গুলোতে’ মনযোগ দেন। তারা ‘সামাজিক দায়ের’ মতো ব্যাপারগুলো বুঝতে পারেন না। কিন্তু বিখ্যাত হবার পর নেবার চেয়ে দেবার দায় বেশি, যদিও অনেকেই উল্টোটা করেন। উল্টোদিকে গেলেই পত্রিকার শিরোনাম – বিখ্যাত থেকে কুখ্যাত। তবে যারা খ্যাতির দায় পূরণ করতে পারেন, তারা অবশেষে সত্যিকারভাবে দেবতায় পরিণত হন। মৃত্যু তাদের বিদায় ঘটাতে পারে না। তারা অমর। (২৫ডিসে২০১৪)
.
.

.
—————————————–—————————————–
ফিচার ফটো: ফটো সার্চ ডট কম।

গীতিকার গোবিন্দ হালদার: A Tribute

180115.pptx-crop

মুক্তিযুদ্ধের একটি সময়ে এরকম নিয়ম হলো যে, বিদেশী লেখক বা শিল্পীর গান স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রে পরিবেশন করা হবে না। ঠিক এভাবেই নিভৃতাচারি গোবিন্দ হালদারের নামটি আরও নিভৃতে হারিয়ে যায়। তার পূর্বে বেশ কিছুদিন তার রক্ত-গরম-করা গানগুলো স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রে পরিবেশিত হয়েছিল। ওই নীতিমালা গ্রহণের পর তার নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। এমনকি বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরও মুক্তিযুদ্ধে অবদানকারীদের তালিকায় তার নামটি থাকে নি। গোবিন্দ হালদারকে বাঙালী কেন তেমনভাবে জানে না, এই হলো দ্য ডেইলি স্টার থেকে প্রাপ্ত তথ্য।

এরপরের সরকারগুলো আর গোবিন্দ হালদারকে তেমনভাবে স্মরণ না করলেও, স্বাধীন বাংলাদেশের বেতার তার সাথে পরবর্তিতে একটি চুক্তি করে। কিন্তু চুক্তিমতো তিনি নিয়মিত গীতিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তার গানগুলো গাওয়া হলেও এর রয়্যালটি তিনি পুরোপুরি পান নি। “তারা আমাকে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত খরচের ভাউচার পাঠিয়েছে, আমি সইও করেছি।  তথাপি আমার ন্যায্য পাওনা থেকে আমি বঞ্চিত হয়েছি।” ১৯৮৫ সালের তারকালোকে প্রকাশিত তার নিবন্ধ থেকে উদ্ধৃত।

তিনি সেই গোবিন্দ হালদার, যিনি লেখেছিলেন- ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলো যারা’ ‘পূর্বদিগন্তে সূর্য ওঠেছে রক্ত লাল রক্ত লাল’ ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’ ইত্যাদি জনপ্রিয় দেশের গানগুলো, যা শক্তি দিয়েছিল দেশপ্রেমিক বাঙালিকে, সাহস দিয়েছিল মুক্তিকামী যোদ্ধাদেরকে। দেশ স্বাধীন হবার পরপরই তার লেখা ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ গানটি যেন বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের আত্মার ধ্বনি হয়ে ওঠে। বীর শহীদদেরকে আপাময় বাঙালি শ্রদ্ধা জানাবার ভাষা খুঁজে পায় তার এই গানে। একাত্তর সালের যুদ্ধাবস্থায়ও গোবিন্দ হালদার তার নতুন প্রেরণদায়ক গানগুলো নিয়ে বিশেষ ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, যুদ্ধরত ও যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। মুক্তিকামী বাঙালির কাছে।

হালদার ১৯৩০ সালে ভারতের বনগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। বনগাঁওয়ে স্কুলজীবন শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তিতে তিনি ভারতের আয়কর বিভাগে চাকরি নেন এবং ১৯৮৮ সালে সেখান থেকে অবসর গ্রহণ করেন। প্রায় ৩,৫০০ সেমি-ক্লাসিক, বাউল, গণসঙ্গীত, আধুনিক গান এবং কীর্তন তিনি লেখেছেন। মেয়ে গোপা হালদারের মতে, প্রায় ৩,০০০ গান তার আজও অপ্রকাশিত। অনেক কবিতাও তার অপ্রকাশিত। অল ইন্ডিয়া রেডিও এবং দূরদর্শন তার কিছু গান প্রচার করেছে। ‘দূর দিগন্তে’ (১৯৮৯) নামে তার একটি কাব্য সংকলন বের হয়ে ছিল এবং ৫০০ কপির প্রায় সবগুলোই বিক্রি হয়েছিল। জানা যায়, অর্থাভাবে আর পুনর্মুদ্রণ করতে পারেন নি।

কিডনি সমস্যা নিয়ে গত ১৩ ডিসেম্বরে  কলকাতার জিতেন্দ্র নারায়ণ রয় পলিক্লিনিকে ভর্তি হন ৮৪ বছরের স্বদেশপ্রেমী গীতিকার গোবিন্দ হালদার। একমাসেরও বেশি সময় সেখানে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত ১৭ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন বাংলাদেশের এই অকৃত্রিম বন্ধু।

গত ডিসেম্বরে ভারত সফরের সময় আমাদের রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। আমাদের রাষ্ট্রপতি তাকে এই বলে সম্মান প্রদর্শন করেন: “তিনি আমাদেরই একজন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন সাহসী যোদ্ধা ছিলেন।” অসুস্থতার খবর শুনে আমাদের প্রধানমন্ত্রীও তাকে ফোন করেছিলেন এবং তার চিকিৎসার যাবতিয় দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন মতাদর্শের সরকারগুলো তাকে যথাযথ মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হলেও, ২০১২ সালে স্ট্যান্ডিং ওভেশন সহকারে তাকে স্বাধীনতা-উত্তর সনদ প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার। ফ্রেন্ডস অভ লিবারেশন ওয়্যার এওয়ার্ড নিতে অবশ্য তিনি আসতে পারেন নি, শারীরিক কারণে। তার কন্যা গোপা হালদার এসেছিলেন।

অনেক সাধারণ জীবনযাপন ছিল গোবিন্দ হালদারের। অসাধারণেরা আমজনতার কাছে এমনই ‘সাধারণ’ ছিলেন চিরকাল। এজন্যই হয়তো তার নামটি তত বিস্তৃতি পায়নি এই স্বাধীন বাংলাদেশে। কিন্তু তার অমর গানগুলো যতবার উচ্চারিত হবে দিগন্তে, ততবার মনে পড়বে সুরকার ও গীতিকার গোবিন্দ হালদারের কথা। শ্রদ্ধাঞ্জলি!

————————–

তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্টারসহ বিভিন্ন বাংলা পত্রিকা।

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html