Category: প্রিয় স্বদেশ

প্রজেক্ট ম্যানেজার: পেশাদারিত্ব কোথা থেকে আসে? প্রকল্পের পক্ষ/বিপক্ষ কারা?

banner2-crop

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক, পর্ব ৫। প্রজেক্ট ম্যানেজারের পেশাদারিত্ব। এপর্বের শুরুতেই একটি বেরসিক প্রশ্ন করতে চাই আমাদের ‘পেশাদারিত্ব’ নিয়ে। আমাদের পেশাদারিত্ব কেন এবং কীভাবে গড়ে ওঠে? এটি কি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যের কারণে আসে, নাকি নিজের কাজের প্রতি একাগ্রতার ফল হিসেবে আসে?  কোন কোন সময় আমাদেরকে একটিকেই অগ্রাধিকার দিতে হয়। তাই বিষয়টি সম্পর্কে একচেটিয়া মনোভাব থাকা দরকার। পেশাদারিত্ব কি ব্যক্তির, নাকি প্রতিষ্ঠানের?  ব্যক্তি ছাড়া তো প্রতিষ্ঠান হতে পারে না, কারণ প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিরই সমষ্ঠি। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের সুনাম এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে কর্মীদের জন্য পেশাদারিত্ব অর্জনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অতএব নিরপেক্ষ উত্তর বলতে কিছু নেই। দিনশেষে প্রতিষ্ঠান অথবা ব্যক্তি, যেকোন একটিকে বেছে নিতে হবেই।

 

▶কীভাবে আসে পেশাদারিত্ব?

উপরোক্ত প্রশ্নে মোটাদাগে তিনটি পক্ষ আছে। প্রথম পক্ষটি বলবেন, আনুগত্য এবং ব্যক্তিগত উন্নয়ন বিষয়গুলো আপেক্ষিক। পরিস্থিতি মোতাবেক যেকোন একটি আগে বা পরে আসতে পারে। প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্যের ফলে কাজের সুযোগ আসে এবং কাজের সুযোগগুলোকে একাগ্রতার সাথে কাজে লাগালে পেশাদারিত্ব আসে। যাদের অভিজ্ঞতা আছে, তারা  নিজের কাজে স্বাধীনভাবে প্রচেষ্টা দিতে পারেন। কিন্তু যাদের দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা নেই, তাদেরকে আনুগত্য দেখিয়ে কাজটুকু বুঝে নিয়ে হয়। সেক্ষেত্রে কিছু অতিরিক্ত কাজ তো করতেই হবে! অতএব, সোজা উত্তর নেই।

দ্বিতীয় পক্ষটি হয়তো একটি সোজা উত্তরকে বেছে নেবে। তারা বলবেন, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য ছাড়া পেশাদারিত্ব আসে না, কারণ প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া ব্যক্তির দক্ষতার কোনই মূল্য নেই।

তৃতীয় পক্ষটি আরও সোজা। তারা বলবেন, ব্যক্তির অংশগ্রহণ ছাড়া প্রতিষ্ঠান অচল। অতএব ব্যক্তির উন্নয়নই প্রথম। প্রতিষ্ঠান চাকরি দিলেও কোন ব্যক্তি যদি নিজ দায়িত্ব ভালোভাবে পালন না করে, তবে তো চাকরিই থাকে না। পেশাদারিত্ব আসবে কোত্থেকে!  অতএব, পেশাদারিত্ব আসে নিজের কাজের প্রতি একাগ্রতার ফলে।

 

▶ বর্তমান কাজে একাগ্রতাই কি পেশাদারিত্ব অর্জনের প্রথম পথ?

চলুন আলোচনার স্বার্থে তৃতীয় পক্ষটিকে সামনে নিয়ে আসি।  মনে করি, প্রথমত ব্যক্তির ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলেই পেশাদারিত্ব আসে, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যের কারণে নয়। প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য বিষয়টিও আপেক্ষিক। প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ যদি চাটুকারিতায় অভ্যস্থ না হয়, তবে তারা হয়তো বলবে, ‘প্রকল্পের কাজে অগ্রগতি না হলে আনুগত্য দিয়ে আমরা কী করবো?’  অতএব সাধারণ দৃষ্টিতে, নিজের কাজের প্রতি মনোযোগী হওয়াটাই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য।

একজন প্রকল্প ব্যবস্থাপককে স্বার্থপরের মতো নিজের প্রকল্পের কাজেই মনসংযোগ করতে হয়। এটিই কর্তৃপক্ষের দেওয়া এসাইনমেন্ট।  এটিই তার পেশাদারিত্ব প্রদর্শন ও অর্জনের জায়গা।

এখানে বলে রাখি, উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবে শুধু ‘উন্নয়ন প্রকল্পতেই’ আলোকপাত করার চেষ্টা করছি। কীভাবে একজন সফল প্রকল্প ব্যবস্থাপক বিবর্তিত হয়ে ‘স্বপ্ন ব্যবস্থাপকে’ রূপ নিতে পারেন, সেটি তার বর্তমান প্রকল্পের অগ্রগতি থেকে বুঝতে পারা যায়।

 

▶প্রজেক্ট ম্যানেজারকে কি প্রতিষ্ঠানের অন্যসব বিষয় থেকে দূরে থাকা উচিত?

কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে ডিসট্রাকশন সৃষ্টি করতে পারে, সেটি স্বাভাবিক। তাদেরকে হয়তো একসাথে অনেকগুলো প্রকল্পের যোগান দিতে হয়। অনেক বিষয়ে মনোযোগ দিতে হয়। যেকোন সময় যেকোন প্রকল্প ব্যবস্থাপককে তারা বাড়তি কাজ দিতেই পারেন। প্রকল্প পরিচালকের নৈশভোজে যোগ দিতে হতেই পারে। এসব কাজের কোন্ গুলোতে প্রকল্প ব্যবস্থাপক যাবেন, কোন্ গুলোতে যাবেন না, সেটি বুঝার জন্য কেবল একটি প্রশ্ন নিজেকে করতে হয়। তা হলো, ‘তাতে কি আমার বর্তমান প্রকল্পটি উপকৃত হবে?’ উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে আরেকটি প্রশ্ন: কীভাবে কতটুকু/ কখন? উত্তর যদি ‘না’ হয়, তবে যেকোন ভাবে কর্তৃপক্ষের অযাচিত আহ্বান থেকে নিজেকে দূরে রাখা উচিত। তবে পরিস্থিতিই বলে দেবে, কোনটি করণীয়।

 

▶প্রকল্পের সাথে জড়িত ভেতর/বাইরের পক্ষগুলোর গুরুত্ব কতটুকু?

প্রকল্পের উন্নয়নের সাথে যাদের স্বার্থ জড়িয়ে আছে, তারা হলো একেকটি পক্ষ। আবার প্রকল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যাদের প্রভাব থাকতে পারে তারাও একটি পক্ষ। অন্যদিকে প্রকল্পকে সহায়তা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্যও একটি প্রভাবশালী পক্ষ আছে। এই ইতিবাচক ও নেতিবাচক সব পক্ষ নিয়েই একটি প্রকল্প এগিয়ে চলে। এদেরকে ছেড়ে প্রকল্পের অগ্রগতি ভাবা যায় না। তবে এসব পক্ষকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত বা বিচ্ছিন্ন করতে না পারলে প্রকল্পের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি হয়।

প্রকল্প ব্যবস্থাপককে তাই বুঝে নিতে হয়, কাদেরকে তিনি গুরুত্বের সাথে সম্পৃক্ত করবেন এবং কাদেরকে তিনি গুরুত্বের সাথে প্রকল্পের কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন রাখবেন। আরেকটি পক্ষ আছে, যাদেরকে সম্পৃক্ত বা বিচ্ছিন্ন উভয়ই বিপদজনক। তাদের জন্য একটি মাঝামাঝি অবস্থান আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখতে হয়।

একটি আদর্শ প্রজেক্ট প্রপোজালে এসব পক্ষ আগে থেকেই সনাক্ত করা থাকে। তাদের কার কী প্রভাব, নেতিবাচক নাকি ইতিবাচক এবং তাদেরকে কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে, সবকিছু প্রকল্প প্রস্তাবনায় বর্ণিত থাকে। কিন্তু প্রকল্প ব্যবস্থাপককে বাস্তব পরিবেশে কাজ করতে হয় বলে তিনি এসব নিয়ে আলাদাভাবে ভাবতে পারেন না, যদি না সেটি আগে থেকেই সুনির্দিষ্ট থাকে। ফলে, প্রকল্প পরিকল্পনার সময়ই এর পক্ষ-বিপক্ষ নির্ধারণ করতে হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কেবল, সংযোজন-বিয়োজন করা যায়।

 

▶ প্রাসঙ্গিক কয়েকটি টিপস:

১) আপনার প্রজেক্টের সাথে জড়িত ফেরারেন্স দলিলপত্র (প্রজেক্ট চার্টার, প্রজেক্ট প্রপোজাল, বেইসলাইন সার্ভে, সংশ্লিষ্ট ইমেল ইত্যাদি) সবসময় হাতের কাছে রাখুন। সংক্ষিপ্ত সংস্করণে টেবিলে কিছু রেখে দিন, যেন অল্প সময়ে আপনি বুঝে নিতে পারেন।

২) প্রকল্পের সাথে বিভিন্ন অংশীজন (স্টেইকহোল্ডার) কারা, তাদের কতটুকু প্রভাব এসম্পর্কে নিয়মিত বিশ্লেষণ করুন। যথাযথ উপায়ে তাদের সাথে যোগাযোগ ও সম্পর্ক জোরদার করুন।

৩) প্রকল্পের কর্মীদের সাথে নিয়মিত বসুন, আনুষ্ঠানিক অথবা অনানুষ্ঠানিক ভাবে। তাদের মনোভাব দেখুন, তাদের সামর্থ্য বুঝার চেষ্টা করুন। নিয়মিত মিটিংয়ে অনেক ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়।

৪) প্রকল্পের কর্মীদের নিয়ে ছোট ছোট কর্মশালার আয়োজন করুন, তাতে বিভিন্ন ইস্যুতে কর্মীদের ধারণা স্পষ্ট হবে। বাড়তি উপকারিতা হলো, তাতে আত্মবিশ্বাস এবং সম্পর্কের উন্নয়ন হয়।।

৫) সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারের সাথে প্রয়োজনীয় সম্পর্ক সৃষ্টি করুন। প্রয়োজনে তাদেরকে প্রকল্পের উদ্দেশ্য/অগ্রগতি সম্পর্কে হালনাগাদ করুন। গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে তাদেরকে প্রকল্পের ঘটনার সাথে যুক্ত করুন। তাতে কোন আনুষ্ঠানিকতা বা অফিশাল প্রক্রিয়া ছাড়াই আপনার প্রকল্পটির অনুসন্ধান/তদারকি হয়ে যাবে – ভবিষ্যতের লালফিতার দৌরাত্ম্য কমে আসবে।

৬) সমধর্মী অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করুন। এসোসিয়েশনের সভাগুলোতে নিয়মিত অংশ নিন। সুযোগমতো দায়িত্বও নিন। এটি শুধু আপনার প্রকল্পের জন্য নয়, আপনার পেশাগত নেটওয়ার্কিংয়ের জন্যও দরকার। তবে প্রকল্পের সরাসরি উপকৃত করবে।

৭) নিয়মিত জার্নাল (সম্পন্ন/পরিকল্পিত কাজের তালিকা) রাখুন। এটি ভবিষ্যতের যেকোন প্রতিবেদন, জরিপ বা তদন্তের সময় বিশেষভাবে আপনার (প্রজেক্ট ম্যানেজার) উপকারে আসবে। কর্মীদের বা একক কাজের তদারকি করতেও সহায়ক হবে।

৮) একই স্বভাবের প্রকল্প/কর্মসূচি যারা পরিচালনা দিচ্ছে, তাদের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করুন। তাতে নিজ প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ কাজে আসবে। প্রাক্তন ম্যানেজারদের অভিজ্ঞতা (লেসন লার্ন্ট)গুলোর ওপর সুযোগ পেলেই দৃষ্টি দিন।

৯) কর্মসূচি/প্রোগ্রাম ব্যবস্থাপকের সাথে সাথে যথাযথ যোগাযোগ রক্ষা করুন। শুধু সাহায্যের জন্য যোগাযোগ করবেন না, সেটি হবে স্বার্থপর সম্পর্ক। তার সহযোগিতার কারণে কোথায়/কীভাবে আপনার প্রকল্প উত্তরোত্তর এগিয়ে চলেছে, এসব সুখবর দিতে ভুলবেন না।

১০)  শুধু সাম্প্রতিক নয় এবং পরবর্তি কাজগুলোর দিকেও নিয়মিত দৃষ্টি রাখুন। তাতে নিকট ভবিষ্যতের সমস্যাগুলো আগে থেকেই আঁচ করতে পারবেন। প্রকল্পের কর্মীরা কাজের মানুষ – তারা নির্দেশ শুনে কাজ করতে অভ্যস্ত। তাদের ওপর পরিকল্পনার দায় চাপাবেন না (যদি না বিশেষভাবে অভিজ্ঞ হয়), তাতে কাজের অগ্রগতি ব্যহত হবে।

 

আলোচনাগুলো যথাসম্ভব সহজ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেন সংশ্লিষ্ট না হলেও বুঝতে পারা যায়। প্রজেক্ট ম্যানেজার-কেন্দ্রিক এই আলোচনা ক্রমেই ‘প্রজেক্ট প্লানিং’ এবং প্রজেক্ট বাস্তবায়নের দিকে ধাবিত হবে । (চলবে)

 

▶ পর্ব ৪:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া: পেশাদারিত্বের শুরু

▶ পর্ব ৩:  ৯টি তত্ত্বে প্রকল্পের সংজ্ঞা এবং সহজ কিছু দৃষ্টান্ত

▶ পর্ব ২:  যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনে প্রকল্প আমাদেরকে উপকৃত করে

▶ পর্ব ১:  প্রকল্প ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে

 


Sources consulted:

1. European Commission, EuropeAid Cooperation Office (2004) Aid Delivery Delivery Methods: Project Cycle Management Guidelines. Brussels, Belgium.

2. Institute, P.M. and Project, M.I. (2013) A guide to the project management body of knowledge (PMBOK guide). Fifth Edition. United States: Project Management Institute.

 

গীতিকার গোবিন্দ হালদার: A Tribute

180115.pptx-crop

 

মুক্তিযুদ্ধের একটি সময়ে এরকম নিয়ম হলো যে, বিদেশী লেখক বা শিল্পীর গান স্বাধীনবাংলা বেতরকেন্দ্রে পরিবেশন করা হবে না। ঠিক এভাবেই নিভৃতাচারি গোবিন্দ হালদারের নামটি আরও নিভৃতে হারিয়ে যায়। তার পূর্বে বেশ কিছুদিন তার রক্ত-গরম-করা গানগুলো স্বাধীনবাংলা বেতরকেন্দ্রে পরিবেশিত হয়েছেল। ওই নীতিমালা গ্রহণের পর তার নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। এমনকি বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরও মুক্তিযুদ্ধে অবদানকারীদের তালিকায় তার নামটি থাকে নি। গোবিন্দ হালদারকে বাঙালী কেন তেমনভাবে জানে না, এই হলো দ্য ডেইলি স্টার থেকে প্রাপ্ত তথ্য।

 

এরপরের সরকারগুলো আর গোবিন্দ হালদারকে তেমনভাবে স্মরণ না করলেও, স্বাধীন বাংলাদেশের বেতার তার সাথে পরবর্তিতে একটি চুক্তি করে। কিন্তু চুক্তিমতো তিনি নিয়মিত গীতিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তার গানগুলো গাওয়া হলেও এর রয়্যালটি তিনি পুরোপুরি পান নি। “তারা আমাকে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত খরচের ভাউচার পাঠিয়েছে, আমি সইও করেছি।  তথাপি আমার ন্যায্য পাওনা থেকে আমি বঞ্চিত হয়েছি।” ১৯৮৫ সালের তারকালোকে প্রকাশিত তার নিবন্ধ থেকে উদ্ধৃত।

 

তিনি সেই গোবিন্দ হালদার, যিনি লেখেছিলেন- ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলো যারা’ ‘পূর্বদিগন্তে সূর্য ওঠেছে রক্ত লাল রক্ত লাল’ ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’ ইত্যাদি জনপ্রিয় দেশের গানগুলো, যা শক্তি দিয়েছিল দেশপ্রেমিক বাঙালিকে, সাহস দিয়েছিল মুক্তিকামী যোদ্ধাদেরকে। দেশ স্বাধীন হবার পরপরই তার লেখা ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ গানটি যেন বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের আত্মার ধ্বনি হয়ে ওঠে। বীর শহীদদেরকে আপাময় বাঙালি শ্রদ্ধা জানাবার ভাষা খুঁজে পায় তার এই গানে। একাত্তর সালের যুদ্ধাবস্থায়ও গোবিন্দ হালদার তার নতুন প্রেরণদায়ক গানগুলো নিয়ে বিশেষ ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, যুদ্ধরত ও যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। মুক্তিকামী বাঙালির কাছে।

 

হালদার ১৯৩০ সালে ভারতের বনগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। বনগাঁওয়ে স্কুলজীবন শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তিতে তিনি ভারতের আয়কর বিভাগে চাকরি নেন এবং ১৯৮৮ সালে সেখান থেকে অবসর গ্রহণ করেন। প্রায় ৩,৫০০ সেমি-ক্লাসিক, বাউল, গণসঙ্গীত, আধুনিক গান এবং কীর্তন তিনি লেখেছেন। মেয়ে গোপা হালদারের মতে, প্রায় ৩,০০০ গান তার আজও অপ্রকাশিত। অনেক কবিতাও তার অপ্রকাশিত। অর ইন্ডিয়া রেডিও এবং দূরদর্শন তার কিছু গান প্রকাশ করেছে। ‘দূর দিগন্তে’ (১৯৮৯) নামে তার একটি কাব্য সংকলন বের হয়ে ছিল এবং ৫০০ কপির প্রায় সবগুলোই বিক্রি হয়েছিল। জানা যায়, অর্থাভাবে আর পুনর্মুদ্রন করতে পারেন নি।

 

কিডনি সমস্যা নিয়ে গত ২০১৫ সালের ১৩ ডিসেম্বরে  কলকাতার জিতেন্দ্র নারায়ণ রয় পলিক্লিনিকে ভর্তি হন ৮৪ বছরের স্বদেশপ্রেমী গীতিকার গোবিন্দ হালদার। একমাসেরও বেশি সময় সেখানে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত বছর (২০১৫ এর ১৭ জানুয়ারি) মৃত্যুবরণ করেন বাংলাদেশের এই অকৃত্রিম বন্ধু।

 

গত ডিসেম্বরে ভারত সফরের সময় আমাদের রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। আমাদের রাষ্ট্রপতি তাকে এই বলে সম্মান প্রদর্শন করেন: “তিনি আমাদেরই একজন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন সাহসী যোদ্ধা ছিলেন।” অসুস্থতার খবর শুনে আমাদের প্রধানমন্ত্রীও তাকে ফোন করেছিলেন এবং তার চিকিৎসার যাবতিয় দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন মতাদর্শের সরকারগুলো তাকে যথাযথ মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হলেও, ২০১২ সালে স্ট্যান্ডিং ওভেশন সহকারে তাকে স্বাধীনতা-উত্তর সনদ প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার। ফ্রেন্ডস অভ লিবারেশন ওয়্যার এওয়ার্ড নিতে অবশ্য তিনি আসতে পারেন নি, শারীরিক কারণে। তার কন্যা গোপা হালদার এসেছিলেন।

 

অনেক সাধারণ জীবনযাপন ছিল গোবিন্দ হালদারের। অসাধারণেরা আমজনতার কাছে এমনই ‘সাধারণ’ ছিলেন চিরকাল। এজন্যই হয়তো তার নামটি তত বিস্তৃতি পায়নি এই স্বাধীন বাংলাদেশে। কিন্তু তার অমর গানগুলো যতবার উচ্চারিত হবে দিগন্তে, ততবার মনে পড়বে সুরকার ও গীতিকার গোবিন্দ হালদারের কথা। শ্রদ্ধাঞ্জলি!

 

[“তিনি ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি কলকাতায় মারা যান।” দেখতে দেখতে একটি বছর হয়ে গেলো!]

————————–

তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্টারসহ বিভিন্ন বাংলা পত্রিকা।

অ্যামনেস্টি কী লেখেছে তা কি অ্যামনেষ্টি জানে!

একাত্তরের মার্চ থেকে সংঘটিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনির সুপরিকল্পিত হত্যাকে গণহত্যা বলতে রাজি ছিল না কিছু পশ্চিমা দেশের জনপ্রতিনিধি। যদিও তাদের দেশের মানুষগুলো ছিল বাঙালির পক্ষে, তারা নিজ দেশের জনগণের মনকে বুঝতে পারে নি। গণহত্যাকে সচেতনভাবেই অস্বীকার করা হয়েছে, কারণ গণহত্যাকে স্বীকার করার মানে হলো বাংলাদেশকে স্বীকার করা। কাজেই এটি ছিল তাদের রাজনৈতিক অবস্থান। অপরদিকে এটি ছিল বাঙালির অস্তিত্বের বিষয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে আজ চুয়াল্লিশ বছর। ‘কারও সাথে শত্রুতা নয় – সকলের সাথে বন্ধুত্ব’ নীতি প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ একটি শত্রুতামুক্ত বৈশ্বিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছে। একই প্রক্রিয়ায় যোদ্ধাপরাধের বিচার সম্পন্ন করে বাংলাদেশ যখন ভবিষ্যতমুখী হবার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই সেই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী একে প্রতিহত করার জন্য মাঠে নেমেছে। পরাজিত পক্ষ এবং তাদের বিদেশী মিত্ররা এমন কিছু বাদ নেই, যা তারা করছে না।

 

মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে অ্যামনেস্টির অবস্থান সকলের কাছেই বোধগম্য, যদিও সকলক্ষেত্রে তারা একইভাবে সরব হতে পারে নি। কিন্তু বাংলাদেশ সম্পর্কে অ্যামনেস্টির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নিজেদের বস্তুনিষ্ঠতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে মনে হয়েছে, এটি তাদের সচেতন বক্তব্য নয়। একাত্তরের গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে তারা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।  তারা ভুলে গেছে নুরেমবার্গ অথবা টোকিওতে সংঘটিত যোদ্ধাপরাধ বিষয়ক ট্রাইবুনালের কথা। যেমন তারা ভুলে যায় ফিলিস্তিন, ইরাক এবং আফগানিস্তানের গণহত্যার কথা। এভাবে তারা তাদের মানবাধিকারের স্লোগানকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেছে।

 

‘আন্তর্জাতিক মান’ নিয়ে একটি আপ্তবাক্য বারবার তুলে ধরা হচ্ছে, কোন ব্যাখ্যা বা যুক্তি ছাড়াই। ‘আন্তর্জাতিক মান কী’ তা আজও কেউ বলতে পারে নি। মজার ব্যাপার হলো অ্যামনেস্টিও একইভাবে কোন দিকনির্দেশনা ছাড়াই বিচারের ‘আন্তর্জাতিক মান’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দেখা গেছে যে, প্রতিবেদনটি তাদের হলেও এর ভাষা ও ভোকাবুলারি ছিল পরিচিত, যা পরাজিত শক্তিরা আগেই ব্যবহার করে গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক মানের কথা বললে, বিশ্বের অন্যান্য স্থানে সংঘটিত যোদ্ধাপরাধের বিচারের সাথে তুলনা করতে হবে।  সেক্ষেত্রে সামনে আসে নুরেমবার্গ এবং টোকিওর বিচার কার্য। সেই তুলনায় বাংলাদেশের যোদ্ধাপরাধের বিচারকার্যে পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়েছে আসামীপক্ষকে। তারা যেন প্রস্তুতি নিয়ে নিজেদের পক্ষে সাক্ষ্যপ্রমাণ ও যুক্তি দাঁড় করাতে পারে, এর সুযোগ তারা পেয়েছেন। শেষ মুহূর্তে এসে ভুয়া সার্টিফিকেটও দাখিল করার সুযোগ তারা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই যোদ্ধাপরাধের বিচার কাজকে অসহযোগিতা করে এসেছে। সেখানকার জনৈক রাষ্ট্রদূত স্টিফেন র‌্যাপ যোদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়াকে কাছে থেকে যাচাই করেছেন। তার মতে, উভয় পক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ পেয়েছে এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে তিনি পুরোপুরি সমর্থন করে গেছেন।

 

যোদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদেরকে ‘বিরোধী দলীয় নেতা’ হিসেবে পরিচিত করানোকে একটি অপকৌশল বলা যায়। এর উদ্দেশ্য হলো, বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতি সম্পর্কে অবগত নয়, এমন পাঠককে বিভ্রান্ত করা। অথবা, এটি নিতান্তই তাদের অজ্ঞতার পরিচয়। একটি দেশের অভ্যন্তরীন ইতিহাস, সংবিধান, আইন ইত্যাদি পর্যালোচনা না করেই তারা একটি নিবন্ধ লেখে ফেলে।

 

যোদ্ধাপরাধের বিচার একটি জুডিশিয়াল প্রক্রিয়ার বিষয়। এখানে আবশ্যিকভাবেই বাদী-বিবাদীর দ্বন্দ্ব আছে। এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ মতামত থাকবেই। একাধিক আন্তর্জাতিক সংগঠন বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক বিচার সম্পর্কে তাদের উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেছে। অধিকাংশই বস্তুনিষ্ঠতার দাবি রাখে। কিন্তু অ্যামনেস্টির মতো একপাক্ষিক প্রতিবেদন আগে কেউ লেখে নি।

 

স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিরও অপরাধ আছে, একথা বলে অ্যামনেস্টি বুঝাতে চাচ্ছে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শুধু নাৎসি বাহিনি নয়, প্রতিপক্ষ জোটেরও বিচার হওয়া চাই! এ কথা বলে তারা শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের মহান অবদানকেই ছোট করে নি, স্বাধীনতা সংগ্রামকেও অস্বীকার করেছে। প্রশ্ন হলো, এ অভিযোগটি কি তারা সচেতনভাবেই দিয়েছে?

 

এটি ভুলে গেলে চলবে না যে, যোদ্ধাপরাধীর বিচার হয় বিজয়ী শক্তির মাধ্যমে। এখানে যখন স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকেও বিচারের দাবী করা হয়, তখন বলতে হয় যে, অ্যামনেস্টি কী বলছে তারা তা বুঝতে পারছে না। মুক্তিযোদ্ধাদের বিপক্ষে সুস্পষ্টভাবে অভিযোগ দিয়ে অ্যামনেস্টি একটি রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছে, যা কোন মানবাধিকার সংগঠনের জন্য অনাঙ্ক্ষিত।

 

প্রশ্ন হলো, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কীভাবে এত আত্মবিশ্বাস পায়। কীভাবে তারা একটি সার্বভৌম দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারে? কীভাবে তারা একটি দেশের জনগণের অনুভূতিকে আঘাত করে প্রতিবেদন লেখতে পারে? কোথায় তাদের ভিত? তার আগে প্রশ্ন করতে হবে, দেশের মৌলিক ইস্যুতে আমাদের রাজনীতিবিদেরা কি কখনও ঐকবদ্ধ হতে পেরেছেন? এসব প্রশ্নের সদোত্তর মিলবে না, কারণ এদেশের রাজনীতিতে এমন পক্ষও আছে যারা যেকোন মূল্যে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চায়। জনগণের জন্য রাজনীতি যেন শুধুই বক্তৃতার বিষয়। যোদ্ধাপরাধের বিচারের আয়োজন যারা করছেন, তারাও কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য/উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাদের নেই? তা যদি না হতো, তবে অ্যামনেস্টির মতো ভিনদেশি এই প্রতিষ্ঠান আজ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন লেখতে পারতো না।

গীতিকার গোবিন্দ হালদার: A Tribute

180115.pptx-crop

মুক্তিযুদ্ধের একটি সময়ে এরকম নিয়ম হলো যে, বিদেশী লেখক বা শিল্পীর গান স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রে পরিবেশন করা হবে না। ঠিক এভাবেই নিভৃতাচারি গোবিন্দ হালদারের নামটি আরও নিভৃতে হারিয়ে যায়। তার পূর্বে বেশ কিছুদিন তার রক্ত-গরম-করা গানগুলো স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রে পরিবেশিত হয়েছিল। ওই নীতিমালা গ্রহণের পর তার নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। এমনকি বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরও মুক্তিযুদ্ধে অবদানকারীদের তালিকায় তার নামটি থাকে নি। গোবিন্দ হালদারকে বাঙালী কেন তেমনভাবে জানে না, এই হলো দ্য ডেইলি স্টার থেকে প্রাপ্ত তথ্য।

এরপরের সরকারগুলো আর গোবিন্দ হালদারকে তেমনভাবে স্মরণ না করলেও, স্বাধীন বাংলাদেশের বেতার তার সাথে পরবর্তিতে একটি চুক্তি করে। কিন্তু চুক্তিমতো তিনি নিয়মিত গীতিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তার গানগুলো গাওয়া হলেও এর রয়্যালটি তিনি পুরোপুরি পান নি। “তারা আমাকে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত খরচের ভাউচার পাঠিয়েছে, আমি সইও করেছি।  তথাপি আমার ন্যায্য পাওনা থেকে আমি বঞ্চিত হয়েছি।” ১৯৮৫ সালের তারকালোকে প্রকাশিত তার নিবন্ধ থেকে উদ্ধৃত।

তিনি সেই গোবিন্দ হালদার, যিনি লেখেছিলেন- ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলো যারা’ ‘পূর্বদিগন্তে সূর্য ওঠেছে রক্ত লাল রক্ত লাল’ ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’ ইত্যাদি জনপ্রিয় দেশের গানগুলো, যা শক্তি দিয়েছিল দেশপ্রেমিক বাঙালিকে, সাহস দিয়েছিল মুক্তিকামী যোদ্ধাদেরকে। দেশ স্বাধীন হবার পরপরই তার লেখা ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ গানটি যেন বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের আত্মার ধ্বনি হয়ে ওঠে। বীর শহীদদেরকে আপাময় বাঙালি শ্রদ্ধা জানাবার ভাষা খুঁজে পায় তার এই গানে। একাত্তর সালের যুদ্ধাবস্থায়ও গোবিন্দ হালদার তার নতুন প্রেরণদায়ক গানগুলো নিয়ে বিশেষ ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, যুদ্ধরত ও যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। মুক্তিকামী বাঙালির কাছে।

হালদার ১৯৩০ সালে ভারতের বনগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। বনগাঁওয়ে স্কুলজীবন শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তিতে তিনি ভারতের আয়কর বিভাগে চাকরি নেন এবং ১৯৮৮ সালে সেখান থেকে অবসর গ্রহণ করেন। প্রায় ৩,৫০০ সেমি-ক্লাসিক, বাউল, গণসঙ্গীত, আধুনিক গান এবং কীর্তন তিনি লেখেছেন। মেয়ে গোপা হালদারের মতে, প্রায় ৩,০০০ গান তার আজও অপ্রকাশিত। অনেক কবিতাও তার অপ্রকাশিত। অল ইন্ডিয়া রেডিও এবং দূরদর্শন তার কিছু গান প্রচার করেছে। ‘দূর দিগন্তে’ (১৯৮৯) নামে তার একটি কাব্য সংকলন বের হয়ে ছিল এবং ৫০০ কপির প্রায় সবগুলোই বিক্রি হয়েছিল। জানা যায়, অর্থাভাবে আর পুনর্মুদ্রণ করতে পারেন নি।

কিডনি সমস্যা নিয়ে গত ১৩ ডিসেম্বরে  কলকাতার জিতেন্দ্র নারায়ণ রয় পলিক্লিনিকে ভর্তি হন ৮৪ বছরের স্বদেশপ্রেমী গীতিকার গোবিন্দ হালদার। একমাসেরও বেশি সময় সেখানে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত ১৭ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন বাংলাদেশের এই অকৃত্রিম বন্ধু।

গত ডিসেম্বরে ভারত সফরের সময় আমাদের রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। আমাদের রাষ্ট্রপতি তাকে এই বলে সম্মান প্রদর্শন করেন: “তিনি আমাদেরই একজন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন সাহসী যোদ্ধা ছিলেন।” অসুস্থতার খবর শুনে আমাদের প্রধানমন্ত্রীও তাকে ফোন করেছিলেন এবং তার চিকিৎসার যাবতিয় দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন মতাদর্শের সরকারগুলো তাকে যথাযথ মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হলেও, ২০১২ সালে স্ট্যান্ডিং ওভেশন সহকারে তাকে স্বাধীনতা-উত্তর সনদ প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার। ফ্রেন্ডস অভ লিবারেশন ওয়্যার এওয়ার্ড নিতে অবশ্য তিনি আসতে পারেন নি, শারীরিক কারণে। তার কন্যা গোপা হালদার এসেছিলেন।

অনেক সাধারণ জীবনযাপন ছিল গোবিন্দ হালদারের। অসাধারণেরা আমজনতার কাছে এমনই ‘সাধারণ’ ছিলেন চিরকাল। এজন্যই হয়তো তার নামটি তত বিস্তৃতি পায়নি এই স্বাধীন বাংলাদেশে। কিন্তু তার অমর গানগুলো যতবার উচ্চারিত হবে দিগন্তে, ততবার মনে পড়বে সুরকার ও গীতিকার গোবিন্দ হালদারের কথা। শ্রদ্ধাঞ্জলি!

————————–

তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্টারসহ বিভিন্ন বাংলা পত্রিকা।

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

সংখ্যা লঘু সমাচার

সংখ্যা লঘু সংখ্যা লঘু
শুনবো কত আর
সংখ্যা গুরু আছেন যারা
করছেন কিছু তার?

ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে
সকলেরে ভালোবেসে
ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাতেই
শান্তি আসে দেশে।

ধর্মের নামে বিভাজনে
স্বার্থ আছে যাদের
চলুন সবাই সোচ্চার হই
থামিয়ে দিই তাদের।

 

 

শব্দনীড়ে পাঠক প্রতিক্রিয়া ================================

১৬ টি মন্তব্য (লেখকের ৮টি) | ৭ জন মন্তব্যকারী

  1. চারুমান্নান : ০৬-০৩-২০১৩ | ১৬:১৭ |

    দারুন ছড়া কবি ভাই,,,,,,,,,,,,,,,,
    সময়োপযোগী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

    • মাঈনউদ্দিন মইনুল : ১৬-০৩-২০১৩ | ৮:২৭ |

      হাহাহা! অনেক ধন্যবাদ প্রিয় কবি চারুমান্নান ভাই।

      এখানে একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে আমার — এটি ড্রাফ্ট হিসেবে সংরক্ষণ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরে দেখলাম প্রকাশ হয়ে গেছে। আরও শিখতে হবে শব্দতরীর নিয়মকানুনগুলো।

      তবু অনুপ্রেরণার জন্য কৃতজ্ঞতা!

  2. মোঃ খালিদ উমর : ০৬-০৩-২০১৩ | ১৬:৫৪ |

    দারুণ লিখেছেন দাদা!

  3. শাহেদ শফিক : ০৬-০৩-২০১৩ | ১৭:০৮ |

    ‘চলুন সবাই সোচ্চার হই
    থামিয়ে দিই তাদের।’
    খুব ভালো লাগলো।

    • মাঈনউদ্দিন মইনুল : ১৬-০৩-২০১৩ | ৮:২৮ |

      ভাই শাহেদ শফিককে অনেক ধন্যবাদ সুন্দর মন্তব্যের জন্য।

  4. তীর্যক নীল : ০৬-০৩-২০১৩ | ১৭:২০ |

    “ধর্মের নামে বিভাজনে
    স্বার্থ আছে যাদের
    চলুন সবাই সোচ্চার হই
    থামিয়ে দিই তাদের।”

    ভুলে যায় তারা ক্ষমতায় এসে
    আমরা কেন চোখের জলে ভাসি,
    ক্ষমতার মসনদে বসে
    তারা হাসেন তৃপ্তির হাসি।

    …………………………………
    তাদের থামাতে যদি হই সোচ্চার
    একটাই ট্যাগ আমরা রাজাকার।

    • মাঈনউদ্দিন মইনুল : ১৬-০৩-২০১৩ | ৮:৩১ |

      “ভুলে যায় তারা ক্ষমতায় এসে
      আমরা কেন চোখের জলে ভাসি,
      ক্ষমতার মসনদে বসে
      তারা হাসেন তৃপ্তির হাসি।”

      শতভাগ একমত। এদের কাছে রাজনীতি প্রথমে, জনগণ দ্বিতীয়।

  5. সাঈদ মোহাম্মদ ভাই : ০৬-০৩-২০১৩ | ১৮:৩৫ |

    এ যে নতুন মইনুল ভাইকে চিনলাম।

    ধর্মের নামে বিভাজনে
    স্বার্থ আছে যাদের
    চলুন সবাই সোচ্চার হই
    থামিয়ে দিই তাদের।

    এই থামিয়ে দেয়ার থিউরিটাই একেক জনের কাছে একেক রকম। মাঠের খেলা দেখে আমার কাছে তাই মনে হচ্ছে।

    • মাঈনউদ্দিন মইনুল : ১৬-০৩-২০১৩ | ৮:৩৩ |

      “এই থামিয়ে দেয়ার থিউরিটাই একেক জনের কাছে একেক রকম। মাঠের খেলা দেখে আমার কাছে তাই মনে হচ্ছে।”

      হাহাহা, কথা সইত্য। আমার মনে হয়, সকলেই থামিয়ে দিতে চায় না।

      ছড়াটি ড্রাফট হিসেবে রেখেছি বলে বিশ্বাস করেছিলাম — পরে দেখি প্রকাশ হয়ে গেছে।

      অনুপ্রেরণার জন্য কৃতজ্ঞতা, প্রিয় সাঈদ মোহাম্মদ ভাই!

  6. মুরুব্বী : ০৬-০৩-২০১৩ | ১৮:৫২ |

    পূর্ণ সহমত স্যার।

    • মাঈনউদ্দিন মইনুল : ১৬-০৩-২০১৩ | ৮:৩৪ |

      ‘পূর্ণ সহমতের’ জন্য ধন্যবাদ প্রিয় মুরুব্বী।
      শুভ কামনা রইলো আপনার জন্য!

  7. ইব্রাহীম রাসেল : ০৬-০৩-২০১৩ | ১৯:০১ |

    –একমত আপনার কবিতার সাথে। ভালো লেগেছে।–

  8. শাহেদ শফিক : ০৮-০৩-২০১৩ | ১৯:৩৮ |

    ‘ধর্মের নামে বিভাজনে
    স্বার্থ আছে যাদের
    চলুন সবাই সোচ্চার হই
    থামিয়ে দিই তাদের।’

    এ সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।

    • মাঈনউদ্দিন মইনুল : ১৬-০৩-২০১৩ | ৮:৩৬ |

      “এ সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।”

      দ্বিতীয় মন্তব্যটির জন্য আবারও ধন্যবাদ। এটি সময়ের দাবি।
      শুভেচ্ছা রইলো!

জেমস বার্ক এবং ১৯৫৪ সালের বাংলাদেশ

১৯৫৪ সালের এক ঈদের দিনে ঢাকার রাস্তা।

১৯৫৪ সালের এক ঈদের দিনে ঢাকার রাস্তা।

এক) কাল্পনিক টাইম মেশিনে দেড়’শো বছর পূর্বের বঙ্গদেশ দেখার সুযোগ পেলে কী করবেন? প্রায় এরকমই একটি অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। বাংলাদেশের সুদূর অতীত এবং গোড়ার ইতিহাস আছে ব্রিটিশদের সাথে যুক্ত থাকার কারণে কিছু সুবিধা আমরা পাচ্ছি। ওই সময়টিতে যেসব ব্রিটিশ পর্যটক বা সাংবাদিক এদেশ ভ্রমণ করেছে, তাদের পুরাতন এলবামগুলো পেলে কেমন হয়? ঠিক এমনটাই হয়েছে। প্রায় দু’শো বছরের বাঙালির ইতিহাস নিয়ে সাদাকালো আলোকচিত্রের সন্ধান মিলেছে। অতীত-বিলাসী আমি যেন খনির সন্ধান পেলাম! পাঠকের জন্য শুধু ১৯৫৪ সালের কয়েকটি ছবি নিচে উল্লেখ করলাম। ব্রিটিশ সাংবাদিক জেমস বার্কের তোলা ছবিগুলো চুয়ান্ন সালের ঈদের ছবি। যারা ইতোমধ্যেই তাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিয়েছেন, তারা জানেনই। বাকিটুকু নিচের উল্লেখিত সূত্র ধরে যে কেউ খুঁজে নিতে পারেন।

১৯৫৪ সালের বাংলাদেশ, অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান, ছিলো ভাষা আন্দোলন এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে তখন সোচ্চার। একটি রাজনৈতিক অস্থিরতার বছর। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে গঠিত যুক্ত ফ্রন্ট প্রাদেশিক নির্বাচন বিজয়ী হয়। যদিও গভর্নর গোলাম মোহাম্মদ যুক্তফ্রন্টের শাসনকে বেশি দিন স্থায়ি দেন নি, তবু সময়টি ছিলো তাৎপর্যপূর্ণ।

.

১৯৫৪ সালের বাংলাদেশ (পূর্ব পাকিস্তান): 

রিকশায় সন্তানসহ এক দম্পতি।

রিকশায় সন্তানসহ এক দম্পতি।

চুয়ান্ন (১৯৫৪) সালের ঢাকার রাস্তা

চুয়ান্ন (১৯৫৪) সালের ঢাকার রাস্তা

 

 

ঢাকায় চায়ের দোকান

ঢাকায় চায়ের দোকান

 

ঈদের দিনের রাস্তা।

ঈদের দিনের রাস্তা।

 

ফটোগ্রাফার ও ব্রিটিশ সাংবাদিক জেমস বার্ক ঈদের মাঠে কুলাকুলি করছেন, ঢাকা।

ফটোগ্রাফার ও ব্রিটিশ সাংবাদিক জেমস বার্ক ঈদের মাঠে কুলাকুলি করছেন, ঢাকা।

.

.

.

দুই) জেমস বার্ক (২২ ডিসেম্বর ১৯৩৬) একজন বিজ্ঞান-বিষযক ইতিহাসবিদ এবং টেলিভিশন প্রযোজক। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে রম্য প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করে তিনি সুনাম কুড়িয়েছেন। ১৯৫৩ সালে নেপাল এবং ১৯৫৪ সালে বাংলাদেশে অবস্থান করে জেমস বার্ক এভারেস্ট জয়ের তথ্য এবং তৎকালীন বাংলাদেশ-এর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির আলোকচিত্র সংগ্রহ করে উপমহাদেশের ইতিহাস সংরক্ষণে বিশেষ অবদান রাখেন।

.

জেমস বার্কের সাম্প্রতিক ছবি।

জেমস বার্কের সাম্প্রতিক ছবি।

তিনি বিবিসি’র একজন প্রতিবেদক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন এবং টুমরো’র ওয়ার্ল্ড নামে একটি বিজ্ঞান বিষয়ক ধারাবাহিক পরিচালনা করেন। বিবিসি’র পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক চাঁদে অবতরণের ঘটনার (১৯৬৯) প্রধান সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জেমস বার্ক। ১৯৮৫ সালে বিবিসিতে ‘যেদিন বিশ্ব বদলে গেলো’ শিরোনামে ডকুমেন্টারি সিরিজ পরিচালনা করেন। ‘কানেকশনস’ তার বেস্টসেলিং গ্রন্থ। জেমস বার্ক নর্দান আয়ারল্যান্ডের লন্ডনডেরিতে (যুক্তরাজ্য) জন্মগ্রহণ করেন এবং বর্তমানে লন্ডনে বাস করছেন।

.

জেমস বার্কের ক্যামেরায় এভারেস্ট বিজয়ী এডমান্ড হিলারি এবং টেনজিং মরগে (১৯৫৩)।

জেমস বার্কের ক্যামেরায় এভারেস্ট বিজয়ী এডমান্ড হিলারি এবং টেনজিং মরগে (১৯৫৩)।

.

.

তথ্যসূত্র:

১) টাইমস হিস্টরি:  http://life.time.com/history/

২) বাংলাদেশ প্রাচীন আলোকচিত্র সংগ্রহশালা: https://www.facebook.com/bd.old.photo.archive

৩) জেমস বার্কের সংক্ষিপ্ত জীবনী: কেমার্কমিডিয়া ডট কম

৪) জেমস বার্কের ডকুমেন্টারি দেখতে চাইলে: http://topdocumentaryfilms.com/james-burke-connections/

অবশেষে রাজনৈতিক পক্ষ নিলেন ডক্টর ইউনূস!

Capture31

দারিদ্র্যকে যাদুঘরে পাঠাবার মতো দৃঢ় মনোবল এবং ইতিবাচক মানসিকতা থাকা সত্ত্বেও বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ যে দারিদ্র্য-বিমোচনে ঈর্ষনীয় সাফল্য অর্জন করেছে, তাতে এই অর্থনীতিবিদের বিশেষ কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় নি। এ বিষয়ে তিনি খুশি বা অখুশি, তাও বুঝা যায় নি। প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীর বিচার ইত্যাদি ইস্যুতে তিনি রহস্যজনকভাবে নিশ্চুপ ছিলেন। এটি নিয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সমালোচনার ঝড় ওঠেছিলো। কিন্তু রাজনৈতিক ইস্যুতে তার একটি নিরপেক্ষ ইমেজ থাকার কারণে এক সময় কেউ আর উচ্চবাচ্য করে নি। যদিও যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাওয়া ও কোন দলীয় বিষয় নয়। গ্রামীণ ব্যাংক ইস্যুতে সরকারের তীব্র সমালোচনা করলে, কেউ তা রাজনৈতিকভাবে বিশ্লেষণ করেন নি। গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে সরকারের মারমুখী আচরণে দেশের অধিকাংশ মানুষ বরং সরকারের সমালোচনাই করেছে, আজও করছে। এর প্রধান কারণ হলো, জনগণ তাকে একজন নির্দলীয় এবং দেশের আপাময় জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই দেখতো।

এখন ভিন্ন পরিস্থিতি। বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অবশেষে রাজনৈতিক পক্ষ গ্রহণ করলেন। বস্তুত তার আর নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ ছিলো না, কেউ বিশ্বাসও করতো না। গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে সরকারের সাথে চলমান টানাহেঁচড়ায় তাকে প্রতিশোধপরায়ন করে তুলেছে এবং এতে কারও দোষ দেওয়ারও সুযোগ নেই।

আড়ালে আবডালে একটি মতাদর্শে দুর্বলতা থাকলেও এবার অনেকটা আকষ্মিকভাবেই তিনি রাজনৈতিক বিষয়ে তার নিরবতা ভেঙ্গেছেন। একসাথে দু’টি বোমা তিনি ফাটিয়েছেন চরম পক্ষপাতদুষ্ট মন্তব্য দিয়ে। সরকারি দলটি নিজেই অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরেছে বিগত সাড়ে চার বছরে। কিন্তু ডক্টর ইউনূসের যুক্তিটি বেশ হাস্যকর: ‘গ্রামীণ ব্যাংককে যারা ধ্বংস করেছে তাদের হাতে দেশের দায়িত্ব দেওয়া যায় না।’ অর্থাৎ, গ্রামীণ ব্যাংক চালাতে ব্যর্থ যে, সে দেশ চালাতেও ব্যর্থ। একথা দিয়ে তিনি রাজনৈতিকভাবে সরকারি দলের বিপক্ষে অবস্থান নেন।

তার দ্বিতীয় বক্তব্যটি হলো, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া দেশের গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে না। এ বিবৃতিটি তিনি গতকাল দিয়েছেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সাথে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে। একই দাবিতে বিরোধী দল দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। হয়তো, সরাসরি বিএনপি বা জামাতের পক্ষাবলম্বন করা শোভন নয় বলে তিনি অপেক্ষাকৃত মাঝামাঝি পর্যায়ের একটি দলকে বেছে নিলেন। ফলে এর মধ্য দিয়ে বিরোধী দলের আন্দোলনকে তিনি সমর্থন জানালেন।

প্রথম বক্তব্য দিয়ে ডক্টর ইউনূস একটি রাজনৈতিক অবস্থান সৃষ্টি করলেন, যা সরাসরি সরকারি দলের বিপক্ষে। দ্বিতীয় বক্তব্যটি দিয়ে সুস্পষ্টভাবে তিনি বিরোধী দলের পক্ষ গ্রহণ করলেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী এবং গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা এখন থেকে রাজনৈতিকভাবে একটি দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেন, যা আগামি দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে। নতুন পরিচয়টি তার পূর্বের পরিচয়ের চেয়ে অনেক সংকীর্ণ হলেও এর তাৎপর্য আছে। এখন সময়ই বলে দেবে, এই অবস্থান নিয়ে তিনি কতটুকু মাইলেজ পাবেন তার নিজের এবং তার প্রতিষ্ঠানের জন্য।

.

.

[প্রিয় ডট কমে প্রথম প্রকাশ: ২৩ অগাস্ট ২০১৩]

অভিনন্দন জানাবার মতো মানসিক স্বস্তি পাচ্ছি না আজ। বন্ধুগণ ক্ষমা করো!

Capture28

অভিনন্দন জানাবার মতো মানসিক স্বস্তি পাচ্ছি না আজ। যখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সনদটি তিনি পেয়েছিলেন, তখন সমগ্র জাতির সাথে খুশিতে আত্মহারা হয়েছি। এরপর অনেক পুরস্কার অনেক সনদ। যখন তিনি এনজিও পরিচালনার কায়দায় রাজনীতির মাঠ গরম করতে চাইলেন, তখনও ভেবেছি তিনি সফল হবেন। এবং স্বাগত জানিয়েছি। নোংরা রাজনীতির শিকার হয়ে যখন নিজের গড়া প্রতিষ্ঠানকে বিতাড়িত হলেন, তখন সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছি। তার প্রতিটি কথায় শক্তি পেয়েছি – উদ্ধৃতি করেছি বিভিন্ন জায়গায়। তার কোন কিছুতেই নেতিবাচক কিছু দেখি নি। কিন্তু গণজাগরণ ও তরুন বিপ্লব, অতঃপর বাঙালির অস্তিত্ব নিয়ে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ। প্রবল ভূমিকম্পে যেমন ভূগর্ভস্থ প্রাণীসকল বের হয়ে যায়, তেমনি দেশের শত্রু-মিত্র-দালাল-মোসাহেব বের হয়ে গেলো নিমিষে! সমীকরণ বদলে গেলো! এবার যখন একই ব্যক্তির নামে আরেকটি সেরা পুরস্কারের খবর ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে-বাতাসে, ঠিক উচ্ছ্বসিত হবার মতো জোর পাচ্ছি না মনে। বোধ হয়, স্বদেশ প্রেমে ঘাটতি আছে আমার। বন্ধুগণ, ক্ষমা করো!

 

২০ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে প্রিয় ডট কমে প্রকাশিত:

 

লোকসঙ্গীত সম্রাট আব্দুর রহমান বয়াতির ‘দেহঘড়ির’ অবসান

Presentation1-crop

‘মন আমার দেহ ঘড়ি সন্ধান করি কোন মিস্তরি বানাইয়াছে’ গানটির অন্যতম পৃষ্ঠপোষক এবং বাংলা লোকসঙ্গীতের অন্যতম পুরোধা আব্দুর রহমান বয়াতির (৭৬) ‘দেহ ঘড়িটি’ বন্ধ হলো গতকাল (১৯ অগাস্ট) সকাল সাড়ে সাতটায়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাযা, চীন, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানসহ বিশ্বের প্রায় ৩২টি দেশে ভ্রমণ করে বাংলার লোকসঙ্গীতকে অবাঙালি বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত করিয়েছিলেন এই লোকসঙ্গীত শিল্পী। তার সঙ্গীত জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো: জর্জ বুশের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউজে লোকসঙ্গীত পরিবেশ করা। এছাড়া তিনি দেশের লোকসঙ্গীত শিল্পীদল নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

‘গাড়ি চলে না চলে না’ বলে বিদায় নিয়েছিলেন বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম এবার ছিলো ‘দেহ ঘড়ির’ পালা! ‘আরও বাঁচতে চাই’ বলে বিদায় নিয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ এবং হুমায়ুন আজাদ। মৃত্যুকে চ্যা্লেন্জ করলেই যে মৃত্যু এতো শিঘ্র চলে আসবে, তা কি তারা জানতেন? জানতেন না লোকসঙ্গীত সম্রাট আব্দুল রহমান বয়াতিও। মাসের পর মাস হাসপাতালে শুয়েও আবার ফিরে আসার স্বপ্ন দেখেছিলেন। বলেছিলেন, আরও গান গাইবার চাই! দেহতত্ত্ব আর ভাবতত্ত্ব দিয়ে যিনি জীবনের মানে খুঁজেছেন তার গানে আর দরাজ কণ্ঠে, সেই কণ্ঠ আর কারও জীবনতত্ত্বকে চ্যালেন্জ করবে না। ‘মানুষটা ছিলো খুবই উদাস’ – শিল্পী মমতাজের কথা। উদাস তো হবেনই, নিজের চাওয়া-পাওয়া সম্পর্কে সচেতন থেকে আরও যা-ই হোক শিল্পচর্চা হয় না।

.

আব্দুর রহমান বয়াতি সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

পুরো নাম:  আব্দুর রহমান বয়াতি

পারিবারিক ডাকনাম: বয়াতি

পারিবারিক তথ্য: স্ত্রী, ৩ পুত্র ও ৩ কন্যা

পিতা ও মাতা: মরহুম তোতা মিয়া ও মরিয়ম বেগম

জন্ম ও মৃত্যু:  ১৯৩৯ (দয়াগঞ্জ, সূত্রাপুর, ঢাকা) – ১৯ অগাস্ট ২০১৩ (ঢাকা, জাপান বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল)

গায়ক জীবনের শুরু: ১৯৫৬

দলের নাম: আব্দুর রহমান বয়াতি দল (১৯৮২)

সঙ্গীতের প্রেরণা: প্রকৃতি ও মা

সঙ্গীত গুরু: কবি আলাউদ্দিন বয়াতি (কবি আলাউদ্দিন)। তিনিই ‘দেহঘড়ি’ গানটির গীতিকার।

অডিও এলবামের সংখ্যা: ৫০০

পুরস্কার: রাষ্ট্রপতি পুরস্কারসহ ৬টি জাতীয় পুরুস্কার

উল্লেখযোগ্য ঘটনা: যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউজে গান গাওয়া

বিশেষ এলবাম: ফিডব্যাক-এর ‘দেহঘড়ি’ (১৯৯৫) এলবামে তার দেহঘড়ির গানটি ফিউশন হয়

উল্লেখযোগ্য গানগুলো: ‘মন আমার দেহ ঘড়ি সন্ধান করি কোন মিস্তরি বানাইয়াছে’, ‘এই পৃথিবী যেমন আছে, তেমনি পড়ে রবে, সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে’, ‘দিন গেলে আর দিন পাবি না’

সঙ্গীত প্রচারের মাধ্যম: প্রধানত তিনি মঞ্চ শিল্পী। তাছাড়া বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং প্রাইভেট টিভি চ্যানেলে তিনি সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। ‘অসতী’ (১৯৮৯) নামে হাফিজুদ্দিন পরিচালিত একটি সিনেমাতেও তিনি গান গেয়েছেন।

.

শেষ জীবনে আব্দুর রহমান বয়াতি

এতো সুনামের অধিকারী হয়েও এবং দেশের লোকসঙ্গীত শিল্পকে এমনভাবে সমৃদ্ধ করেও এই মহান শিল্পী শেষ জীবনে চিকিৎসার জন্য অন্যের কাছে হাত পাততে হয়েছে। শেষ জীবনে দৈনিক ১৫০০ টাকায় গান গেয়েও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিলো তার। ফুসফুস, কিডনি এবং স্নায়ু সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে কয়েক মাস পূর্বেই তিনি জাপান বাংলাদেশ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় নি। মৃত্যুর পুর্ব পর্যন্ত জাপান বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল তার ঔষধ ও চিকিৎসার খরচ বহন করে। ‘আমি আবার ভালো হইবার চাই, আমি আবারও গান গাইবার চাই’ বলে তিনি আকুতি প্রকাশ করেছিলেন উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে।

বাঙালি জাতি সঙ্গীতপ্রিয় জাতি, সঙ্গীত তাদের রক্তে। ভারতেও যারা সঙ্গীতে শত বছরের খ্যাতি ধারণ করে আছেন, তাদের অধিকাংশই বাঙালি! আব্দুল আলিম, আলাউদ্দিন, শাহ আব্দুল করিম বা আব্দুর রহমান বয়াতিদের গানে আমরা পাই শেখরের সন্ধান। জাতীয় পরিচয় পাই যে গানে, নিজেদের অস্তিত্বের সন্ধান পাই যাদের গানে, তারা একে একে চলে যাচ্ছেন আমাদের ছেড়ে। ক্রমেই যেন শেখড়-ছাড়া হয়ে যাচ্ছি আমরা!

.

কীভাবে শ্রদ্ধা জানাই!

শোকবার্তা বা একটি পোস্ট দিলেই শ্রদ্ধাপ্রদর্শন শেষ হয়ে যায় না। আমাদের উচিত তার সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। পাইয়ারেটেড বা ইন্টারনেট থেকে গান ডাউনলোড না করে কম করে হলেও দোকান থেকে গানের এলবাম কেনা হতে পারে সর্বশ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা প্রদর্শন। সরকারের নির্দিষ্ট বিভাগের উচিত, অবিলম্বে আব্দুর রহমান বয়াতির সৃষ্টিকর্মের তত্ত্বাবধান করা। আগামির প্রজন্মের জন্য তার প্রতিটি সৃষ্টি, তার জীবনী ইত্যাদি সংরক্ষণ করা উচিত এখনই। যতই দেরি হবে, ততই কমতে থাকবে তার সৃষ্টকর্মের সংখ্যা ও পরিমাণ।

দেশের অস্তিত্ত্ব বহনকারী লোকসঙ্গীত শিল্পী আব্দুর রহমান বয়াতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি !

1111

_____________________________________________________________

তথ্যসূত্র:

ক. দৈনিক ইত্তেফাক ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম খ. স্বপ্নীল ডট কম  গ. প্রিয় নিউজ ডট কম ঘ. ছবি ইন্টারনেট থেকে।

.

.

পরিশিষ্ট: পাঠকের জন্য অতিরিক্ত কিছু তথ্য

১) ইউটিউবে: মাটির একখান ঘর বানাইয়া মেশিন দিছে তার ভিতর…. মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি

২) বিখ্যাত গানটির লিরিক: শিরোনামঃ মন আমার দেড় ঘড়ি, আব্দুর রহমান বয়াতী

একটি চাবি মাইরা দিলা ছাইড়া
জনম ভরি চলিতেছে।
মন আমার দেহ ঘড়ি সন্ধান করি
কোন মিস্ত্ররী বানাইয়াছে।

থাকের একটা কেস বানাইয়া মেশিন দিলো তার ভিতর
ওরে রং বেরংয়ের বার্নিশ করা দেখতে ঘড়ি কি সুন্দর।

ঘড়ির তিন পাটে তে গড়ন সারা
এই বয়লারের মেশিনের গড়া।
তিনশ ষাটটি ইশকুররম মারা ষোলজন পাহারা আছে।

ঘড়ি হেয়ার স্প্রিং ফ্যাপসা কেচিং লিভার হইলো কলিজায়
আর ছয়টি বলে
আজব কলে দিবানিশি প্রেম খেলায়।

ঘড়ি তিন কাটা বার জুয়েলে মিনিট কাটা হইলো দিলে
ঘন্টার কাটা হয় আক্কেলে
মনটারে সেকেন্ডে দিসে।

ঘড়ির কেসটা বত্রিশ চাকের, কলে কব্জা বেসুমার
দুইশো ছয়টা হাড়ের জোড়া, বাহাত্তর হাজারও তার।

ও মন, দেহঘড়ি চৌদ্দতলা, তার ভিতরে দশটি নালা,
একটা বন্ধ নয়টা খোলা গোপনে এক তালা আছে।

ঘড়ি দেখতে যদি হয় বাসনা
চলে যান ঘড়ির কাছে,
যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে ঘড়ির ভিতর লুকাইছে,
ঘড়ির ভিতর লুকাইছে।

পর্দারও সত্তর হাজারে
তার ভিতলে লড়ে চড়ে
জ্ঞান নয়ন ফুটলে পরে দেখতে পারবেন চোখের কাছে।

ওস্তাদ আলাউদ্দিনে ভেবে বলছেন,
ওরে আমার মনবোকা,
বাউল রহমান মিয়ার কর্মদোষে হইল না ঘড়ির দেখা।

আমি যদি ঘড়ি চিনতে পারতাম,
ঘড়ির জুয়েল বদলাইতাম,
ঘড়ির জুয়েল বদলাইবো
কেমন যাই মিস্ত্ররীর কাছে?

মন আমার দেহঘড়ি
সন্ধান করি, কোন মিস্ত্রী বানাইছে।
মন আমার দেহঘড়ি
একটি চাবি মাইরা দিলা ছাইড়া
জনম ভরি চলিতেছে।
মন আমার দেহ ঘড়ি সন্ধান করি
কোন মিস্ত্ররী বানাইয়াছে।

৩) প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী ইতোমধ্যেই শ্রদ্ধাসহ শোকবার্তা পাঠিয়েছেন। দেশের সঙ্গীত ও শিল্পাঙ্গনের অনেকেই গিয়ে হাজির হয়েছেন জাপান-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে!

৪) আরও জানতে ভিজিট করুন:

http://www.gulf-times.com/bangladesh/245/details/363188/top-bangladeshi-folk-singer-dead

www.shopnil.com/home/meet-bangladesh/biography/302-abdur-rahman-boyati

www.news.priyo.com/entertainment/2011/07/01/folk-maestro-fights-life-appea-30397.html

http://www.thedailystar.net/beta2/news/abdur-rahman-boyati-no-more/

“দেহঘড়ি চলবে না আর” – মমতাজ

.

৫) দেশের এই স্বনামধন্য লোকসঙ্গীত সম্রাটকে কীভাবে শ্রদ্ধা জানাবো? আমি ভেবেছি ইন্টারনেট থেকে তার গানগুলো ডাউনলোড করার পরিবর্তে বাজারে গিয়ে তার কয়েকটি এলবাম কিনবো। পাঠকও ভেবে দেখতে পারেন!

 

___________________________________________________________________

**সামহোয়ারইন ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া

Capture1

বিপুল ভট্টাচার্য – একজন সৈনিকের পতন: শ্রদ্ধার্ঘ্য

মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্যচিত্র দিয়ে তৈরি তারেক-ক্যাথরিনের ‘মুক্তির গান’ দেখার জন্য যে কী সংগ্রাম করেছিলাম সেদিন পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে! তখনও ছাত্র। সিনেমাহলে তখনও ছাড়া হয় নি। গায়ের লোম সব দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধকালীন স্লোগান শুনে আর বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাঙালির গেরিলা অপারেশনের চিত্র দেখে; আর একজন মরমী শিল্পীর গান শুনে। একটি গানের দল ট্রাকে করে মুক্তাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে গান গেয়ে প্রাণে শক্তি যুগিয়েছিলো মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার পরিবার, শরণার্থী কেন্দ্রের বেদনাহত মানুষগুলোকে। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গান শুনতো স্বদেশের জন্য গৃহহারা মানুষগুলো, যেন গানেই তারা খাবার আর শক্তি পাচ্ছে! কেউ নিরবে চোখের পানি ফেলতো, কেউবা গানে দিতো কণ্ঠ। সেই গানের দলের প্রাণ ছিলেন একজন ষোল বছরের যুবক। তার চোখে ছিলো বিষণ্নতা; ঠোঁট-মুখ শুকনো; দেহে খুব মাংস নেই – কিন্তু কণ্ঠে ছিলো প্রাণ-জুড়ানো সুর আর শক্তি।

তিনি বিপুল ভট্টাচার্য, যাকে আমি পড়ে চিনেছিলাম। তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদ তাকে ‘মুক্তির গানের প্রাণ’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। বিপুল না থাকলে কোন মুক্তির গান হতো না। স্বদেশের অন্তরবিদীর্ণ-করা গানগুলোকে প্রাণ দিয়েছিলেন বিপুল তার যাদুকরি কণ্ঠ দিয়ে।

গতকাল টিভিতে সংবাদটি শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। বিশ্বাস করা কঠিন ছিলো। আজ ডেইলি স্টারে ‘ফল অভ্ এ সোলজার’ শিরোনামের খবরটি পড়ে নিশ্চিত হলাম: একাত্তরে শব্দসৈনিক এবং ‘মুক্তি সংগ্রাম শিল্পী সংস্থার’ অন্যতম প্রধান শিল্পী বিপুল ভট্টাচার্য আর নেই। ফুসফুস ক্যানসারের সাথে ২০১০ থেকেই যুদ্ধ করছিলেন বিপুল। গানও বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো আর আগে থেকেই।

ডালিয়া নওশিন, গানের দলের সহশিল্পী, জানালেন, বিপুল তখন খুবই তরুণ। খুবই উদ্যমী এবং আনন্দোচ্ছ্বল ছিলেন। দেশের দুর্যোগ পরিস্থিতি নিজের দরদি কণ্ঠ দিয়ে বিপুল বড় শিল্পী হিসেবে আভির্ভূত হন। আরেকজন সহশিল্পী শাহিন সামাদ বললেন, বিপুল শুধু তার বন্ধু ছিলো না, ছিলো তার শিক্ষকের মতো। স্বাধীন বাংলা বেতারের অন্যতম শব্দসৈনিক তিমির নন্দী ছিলেন বিপুলের বাল্যবন্ধু। তার মতে, বিপুলের ঈশ্বরপ্রদত্ত কণ্ঠ দিয়ে বাঙালির শেখরের গানগুলোকে জনপ্রিয় করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সাথে ওপপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন এই মহান শিল্পী, যিনি শেষ জীবনে গান না গাইতে পেরে আফসোস করে গেছেন। যতটুকু গেয়েছেন, তারই বা কতটুকু প্রতিদান তিনি পেয়েছিলেন, তিনিই তা বলতে পারবেন। ছাত্রজীবনে আমার তরুন হৃদয় দগ্ধ হয়েছিলো এই মরমী শিল্পীর দরদি গানে। দেশের প্রতি কতটুকু মায়া আর ভালোবাসা থাকলে এমন প্রাণ-জুড়ানো গান গাওয়া যায়! মুক্তির গানেই আসল বিপুলকে আমি দেখেছিলাম। কেউ যদি ‘মুক্তির গান’ না দেখে থাকেন, তবে বিপুলকে চেনা যাবে না, তার মূল্যও বুঝা যাবে না। আজ তার মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত এবং বেদনাহত। গভীর শ্রদ্ধা জানাই মহান শিল্পীকে!

———————————————-

*আজকের জাতীয় দৈনিকে বিপুল ভট্টাচার্য:
দ্য ডেইলি স্টার
দৈনিক প্রথম আলো
ঢাকা ট্রিবিউন

**মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার লেখাগুলো
১) মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান
২) দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ
৩) কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি
৪) চরমপত্রের চরম লেখক


[‘মুক্তির গান’ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য: বাঁ থেকে চতুর্থজন বিপুল ভট্টাচার্য্য]

লেখাটি সঞ্চালক কর্তৃক নির্বাচিত হয়েছিলো।

লেখাটি সঞ্চালক কর্তৃক নির্বাচিত হয়েছিলো।