Category: প্রিয় স্বদেশ

ঢাকা ‘পৃথিবীর সেই বিরল শহরে’ রূপ নিচ্ছে যেখানে গাড়ির প্রয়োজন থাকবে না!

ঢাকা ‘পৃথিবীর সেই বিরল শহরে’ রূপ নিচ্ছে যেখানে মানুষ গাড়ির চেয়েও বেশি গতিতে চলতে পারে। ট্রাফিক জ্যাম, জলাবদ্ধতা, বারোমাসি খোঁড়াখুঁড়ি, ত্রুটিপূর্ণ/সরু রাস্তা, আগের আমলের ট্রাফিক সিস্টেম, বাইপাস বিহীন সড়ক, মাঝ রাস্তায় পার্কিং ইত্যাদি ‘সুবিধা’ ধরে রাখার কারণে ঢাকা পৃথিবীর একমাত্র আদিম শহরে ‘উন্নীত’ হতে যাচ্ছে।

গতির শহর ঢাকা/ দুর্গতির শহর ঢাকায় প্রতি ঘণ্টায় গাড়ির গতি:
৭ কিলোমিটার (২০১৭/ বর্তমানে)
২৪ কিলোমিটার (২০০৪)
৪ কিলোমিটার (২০২৫/ বিশেষজ্ঞদের ধারণা)
৫ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায় মানুষের হাঁটার গতি!
 [তথ্য প্রথম আলো – অগাস্ট/২০১৭]

 

সবাই বলে, ঢাকা শহরের কোন পরিকল্পনা নেই। উন্নয়নের বাজেট নেই। সরকারের উদ্যোগ নেই। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন এবং আরও বেশি খারাপ! আরও ‘অনেক কিছু’ নেই!

ঢাকা শহর পরিকল্পনাহীনভাবে গড়ে ওঠছে তা নয় – বরং এখানে আছে অগণিত পরিকল্পনা। রাজউক, সিটি কর্পোরেশন, পূর্ত মন্ত্রণালয়, হাউজিং কোম্পানি… এদের প্রত্যেকের রযেছে ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনা। কৌশলগত সড়ক পরিকল্পনা, পানি পয়নিষ্কাশনের ব্যবস্থাপনা, গৃহায়ন পরিকল্পনা, ডিটেইল এরিয়া প্লান আরও কত কী! সবাই নিজ নিজ পরিকল্পনা এশহরের মানুষগুলোর ওপর দেদারছে ঢালছে।

পরিকল্পনার আধিক্য আর সমন্বয়হীনতাই ঢাকা একটি ব্যর্থ শহরে পরিণত হয়েছে। শুধু যানজটেই বছরে ২০,০০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে এদেশের মানুষ। [ডেইলি স্টার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬]

 

উদ্যোগেরও অভাব নেই। উদ্যোক্তাদের কেউ নদী ভরাট করে বাড়ি বানায়, আবার কেউ বাড়ি কেটে খাল বানায়। নদী শেষ তাকে নিয়ে কারও ভ্রুক্ষেপ নেই, নতুন খাল খননে লেগেছে একটি কর্তৃপক্ষ। কেউ উচ্ছেদ করছে, কেউবা পুনর্বাসন করছে; কেউ সংস্কারের কর্মসূচি নিচ্ছে, কেউবা তার বিপক্ষে ধর্মঘট দিচ্ছে। একই সরকারের অধীনে। আরেকটি পক্ষ আছে যারা বর্ষা এলেই লেগে যায় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িতে। বলে ‘উন্নয়নের কাজ চলিতেছে’। ‘সাময়িক সমস্যার জন্য দুঃখিত – কর্তৃপক্ষ’। বারোমাসের কাজকে বলা হয় ‘সাময়িক’। তাছাড়া ওই কর্তৃপক্ষটা যে আসলে কে বা কারা, সেটিও বিরাট প্রশ্ন।

বাজেটের কথা বলছেন? বাংলাদেশে সেক্ষেত্রে পৃথিবীর ধনী দেশের একটি, কারণ এখানে প্রতি কিলোমিটারে নির্মাণ খরচ সর্বোচ্চ। এবং মাত্র ছ’মাস পর সেই একই রাস্তার সংস্কারের জন্য আরেকটি টেন্ডার আসে।

বাংলাদেশ প্রতি কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের খরচ
৫৬ কোটি টাকা: উদাহরণ – ঢাকা সিলেট মহাসড়ক
৯৫ কোটি টাকা: উদাহরণ – ঢাকা মাওয়া সড়ক

ভারত: ১০ কোটি
চিন: ১২ কোটি
জমি অধিগ্রহণের খরচসহ। [খরচের তথ্য বিডিনিউস২৪ ডটকম – জুন/২০১৭]

 

কুড়িল বিশ্বরোড থেকে পূর্বাচলের রাস্তা দিয়ে ২/৩ কিলোমিটার এগুলেই একটি সুন্দর ব্রিজ চোখে পড়বে। নাম তার বোয়ালিয়া ব্রিজ। নদীর নাম বোয়ালিয়া। নদীতে পানি নেই – বোয়াল তো দূরের কথা! সেই নদীকে সীলগালা করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাস্তার পাশের দোকানপাট, বাড়িঘর সব ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। সেখানে খাল হবে! ঢাকার প্রাকৃতিক খালগুলোর একটিরও অস্তিত্ব নেই – এখানে ভিটে উচ্ছেদ করে নতুন খাল হবে!

এভাবে এগিয়ে চলছে উল্টো রথে প্রাচীন পথে ঢাকার ‘অগ্রযাত্রা’। নাকি পশ্চাৎযাত্রা! অগত্যা আমরাও আছি এর অংশ হয়ে। আপনিও আছেন সহযাত্রী হয়ে! গাড়িতে চলার খরচ বেঁচে যাবে আপনার। ক্রেডিট গউস টু হু?

 

 

*পাবলিক ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া: ২৫ অগাস্ট ২০১৭

—–
ফেইসবুক স্ট্যাটাসটি শেষে এত দীর্ঘ হলো যে, ব্লগে পোস্ট করতে হলো!

Advertisements

বিদেশী সাংবাদিকের ঢাকা ভ্রমণ ও যানজট বৃত্তান্ত: তৃতীয় নয়নে প্রাণের শহর ঢাকা!

বিদেশীদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের পরিস্থিতি জানার কৌতূহল সবারই থাকে। তাদের অভিমতকে একটু অন্যদৃষ্টিতে দেখতে হয়, কারণ তাদের কোন রক্তচক্ষুর ভয় নেই এবং তাই নিরপেক্ষ থাকতেও বাধা নেই। তৃতীয় নয়নে বাংলাদেশকে দেখতে তাই বরাবরই আমাদেরকে বিদেশীদের মতামতকে বিবেচনায় নিতে হয়। ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম নিয়ে লেখার জন্য নিউইয়র্ক টাইমস এর এক সাংবাদিক ঢাকায় এসেছেন, থেকেছেন এবং ঢাকার যানবাহনে ভ্রমণ করেছেন। একটি উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। ঢাকার যানজট কী মাত্রায় পৌঁছুলে সেটি বিদেশীদের গবেষণার বিষয় হয়, সেটি বুঝার জন্যই আমি আর্টিকেলটি আদ্যোপান্ত পড়ি। এমন পড়েছি অনেক, কিন্তু এবারই লেখার ইচ্ছে হলো। কেন হলো পাঠক পড়লেই বুঝতে পারবেন। শুরু।

 

সৌজন্যে: নিউ ইয়র্ক টাইমস

সেসব অব্যবস্থাপনা বিশ্বের বৃহৎ শহরগুলোতে বিপর্যয় ঘটায়, হয়তো এর মধ্যে কোনটিই ট্রাফিক জ্যামের মতো ক্ষতিকর না। এখনও ঢাকায় বসে আছি যেখানে অপর্যাপ্ত পরিকল্পনা মহাকাব্যিক পরিণতিতে পৌঁছেছে।

আমি ঢাকায় ছিলাম, বলা যায়, ঢাকার ট্রাফিক জ্যামে আটকে ছিলাম। কথাটি হয়তো অন্যভাবে বললে আরও সঠিক হবে: আমি যানজটে আটকে ছিলাম, তাই ঢাকায় ছিলাম। আপনি যদি বাংলাদেশের রাজধানীতে কিছু সময় কাটান, তবে ‘যান চলাচল’ ধারণাটিকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করবেন, এবং আপনার সংজ্ঞাটি উল্টে যাবে। অন্যান্য শহরের রাস্তাগুলোতে যানবাহন এবং পথচারি থাকে; মাঝেমাঝে রাস্তাগুলো ব্যস্ত হয়ে যায় এবং যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হয়। ঢাকার পরিস্থিতি আলাদা। ঢাকার যানজট হলো যান চলাচলের চরম পর্যায়; বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতি এত ব্যাপক এবং দীর্ঘস্থায়ী যে, এটি শহরের সাংগঠনিক নীতিতে রূপ নিয়েছে। এটি যেন শহরের আবহাওয়া, এমন এক ঝড় যা কখনও থামে না।

ঢাকার লোকেরা আপনাকে বলবে, পৃথিবীর বাকি মানুষগুলো যান চলাচল বুঝে না, কারণ মুম্বাই অথবা কায়রো অথবা লসএন্জেলেসের যানজট ঢাকার ড্রাইভারের কাছে সৌভাগ্যের মতো। বিশেষজ্ঞরা তাতে একমত। ২০১৬ সালের বিশ্বের বাসযোগ্যতা জরিপে, অর্থাৎ ইকোনোমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিট কর্তৃক প্রকাশিত জীবনের মান বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে ১৪০ শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৭, শুধু নাইজেরিয়ার লাগোস, লিবিয়ার ত্রিপলি এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার দামেস্ক শহরের ওপরে অবস্থান করছে। জরিপে ঢাকার অবকাঠামোর মান যেকোন শহরের চেয়ে নিম্ন স্তরে দেখানো হয়েছে। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মেগাসিটির মতো ঢাকা একটি ব্যস্ত শহর এবং সমাধিস্থান, যেখানে আছে বলিষ্ঠ আবাসন বাজার, ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণী এবং প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ। অভাব, দূষণ, রোগ, রাজনৈতিক দুর্নীতি, চরমপন্থীদের নাশকতা ্এবং সন্ত্রাসী হামলার কারণে জীবন এখানে নিয়ন্ত্রণহীন দুষ্পাপ্যতায় বাধাগ্রস্ত।  কিন্তু পণ্ডিত এবং উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের কাছে যানজটই ঢাকার খ্যাতিকে চিহ্নিত করেছে একবিংশ শতাব্দির পৌর অব্যবস্থানার ভয়ংকর প্রতীক, বিশ্বের সবচেয়ে বিধ্বস্ত শহর হিসেবে। এটি ঢাকাকে এক পরাবাস্তব শহরে পরিণত করেছে যা একই সাথে কর্মচঞ্চল এবং অচল; এবং এটি এক কোটি পঁচাত্তর লাখের অধিক বসবাসকারীর জীবনের ছন্দকে বদলে দিয়েছে। বেশিদিন আগে নয়, ঢাকার ডেইলিস্টার ‘যানজটে পড়লে ৫টি করণীয়’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। তাতে যেসব সুপারিশ এসেছে তা হলো “বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ”, পড়া এবং ডায়েরি লেখা।

 

যেভাবে ঢাকায় প্রবেশ এবং প্রথম অভিজ্ঞতা

আমার ঢাকার রোজনামচার প্রথম পর্বটি শুরু হয় গতবছরের মার্চে একটি রাজপথে, যা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শহরের মধ্যস্থলে গিয়ে পৌঁছেছে। আপনি যদি এই রাস্তাটি নিয়ে ইন্টারনেটে অনুসন্ধান চালান, তাহলে একটি ফেইসবুক পেইজ ওঠে আসবে যার শিরোনাম “রাজপথ থেকে নরকে, এয়ারপোর্ট রোড”। অনলাইনে দেওয়া ফটোগুলো থেকে নরকের চিত্র ফুটে ওঠে: ওপর থেকে তোলা রাস্তার আটটি লেইন জুড়ে বিপুল সংখ্যক মটরযানের এলোপাথাড়ি চলাফেরার ছবি। মনে হয়, সদ্য হাঁটতে শিখেছে এরকম কোন ক্ষুব্ধ শিশু একটি দিয়াশলাইয়ের বাক্সকে ছড়িয়ে দিয়েছে: সকালের অফিসযাত্রা শুরু হয় মহাজাগতিক এক ক্রুদ্ধ মেজাজ নিয়ে।

ছবিগুলো আমাকে চরম খারাপের জন্য মানসিক প্রস্তুতি দেয়। তারপরও ঢাকা যাবার সময় আমাকে জানানো হলো যে, শহরের যানচলাচল হবে অস্বাভাবিকভাবে হালকা। কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ বন্দি ছিল হরতালে, দেশব্যাপী সাধারণ হরতাল এবং “পরিবহন অবরোধ”। এই হরতাল আহ্বান করা হয়েছিল বিরোধীদল বিএনপি’র পক্ষ থেকে। তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নতুন নির্বাচনের জন্য চাপ দিতে চেষ্টা করছে। হরতাল, রাস্তার মিছিল এবং বিচ্ছিন্ন সহিংসতা রাজধানীর দৈনন্দিন জীবনকে স্তব্ধ করে দিয়েছে এবং শহরের লোকদের স্বাভাবিক জীবনকে সংক্ষিপ্ত করে দিয়েছে। এতে দৃশ্যত অসাধ্য সাধন হয়েছে, ঢাকার রাস্তাগুলো থেকে দীর্ঘ গাড়ির লাইন বিচ্ছিন্ন। আমার বিমান পথে একজন বাংলাদেশি এই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছিলেন “ঢাকায় হয়তো আপনি ভয়ানক যানজট পাবেন, নয়তো সত্যিই ভয়ানক যানজট পাবেন। কিন্তু হরতাল থাকলে সেখানে প্রায় কোন যানজট থাকবে না। যান চলাচল থাকবে স্বাভাবিক।”

ভয়ানক যানজট, সত্যিই ভয়ানক যানজট, কোন যানজট থাকবে না, যান চলাচল স্বাভাবিক – ঢাকায় থাকলে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই বুঝতে পারা যায় যে, ওগুলো কোন তাত্ত্বিক পরিভাষা নয়। বিমান থেকে অবতরণের পর আমি একটি ট্যাক্সি নিলাম। ট্যাক্সিটি বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই একটি গোলচক্করে পড়লো; তারপর কুখ্যাত সেই রাজপথে। সেখানে নির্ভুলভাবে যানজট ছিল: যতদূর চোখ যায় গাড়ি আর ট্রাক, এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে, রাস্তার কালোরঙের ওপর লেইন মার্কিঙয়ের কোন সম্পর্কই উদ্ধার করা গেলো না। আমার গাড়িটি সারিবদ্ধ গাড়ির ফাঁকে নাক ঢুকিয়ে রাখলো। শুরু হলো হামাগুড়ি।

বিশ সেকেন্ডের মতো গাড়িগুলো দক্ষিণ দিকে চললো। তারপর থেমে গেলো। আমার গাড়ি কয়েক মিনিট একদম নড়াচড়া করলো না। তারপর অজানা কারণে গাড়িটি আবার সামনের দিকে হামাগুড়ি দিলো। মাঝেমাঝে গাড়িগুলো বাধাহীনভাবে কয়েকমিনিট চলে, ঘণ্টায় সম্ভবত ১৫ মাইল গতিতে। কিন্তু শিঘ্রই আমরা আবার থেমে গেলাম। আমেরিকার ইন্টারস্টেইট ভ্রমণের ‘থামো-এবং-চলো’র অভিজ্ঞতা পাচ্ছিলাম, রেডিওতে ট্রাফিক প্রতিবেদকরা যেমন হেলিকপ্টারের পাখার আওয়াজের সাথে দীর্ঘ ট্রাক্টর ট্রলির কথা চিৎকার করে ‘বাম্পার-থেকে-বাম্পার’ পরিস্থিতির কথা বলে, অনেকটা সেরকম।  কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিটি কোন দুর্ঘটনার কারণে নয়। কারণ হলো, এটি ঢাকা শহর।

অনেক গরম পড়েছিল আর আমি ছিলাম জেটল্যাগগস্ত। ঘুমিয়ে পড়লাম। যখন হঠাৎ ওঠলাম, প্রায় এক ঘণ্টা হয়ে গেলো। গাড়ির গাদাগাদি আরও ঘণিভূত হলো এবং এক প্রকার উন্মাদনায় রূপ নিলো। ততক্ষণে আমরা শহরের কেন্দ্রস্থলে। প্রশস্ত রাস্তাটিতে পথচারি আর শত শত গাড়ি নিজেদের জায়গার জন্য প্রতিযোগিতা করছে। রাস্তার নাম কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ।  বাসগুলো এমন আঁটসাটভাবে যাত্রী দিয়ে ঠাসা যে, অনেক যাত্রী বাইরের দিকে ঝুলে আছে। কেউ কেউ বাসের ছাদের সিঁড়িতে ঝুলে আছে। সেখানে ছিল মালবাহী ত্রিচক্রযান, স্থানীয়ভাবে ভ্যান নামে পরিচিত। বাঁশ, তরমুজ, ধাতব পাইপ, ডিম, জীবন্ত পশুপাখি নিয়ে সেগুলো বাজারের দিকে যাচ্ছে। এবং অবশ্যই সেখানে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী যাত্রীবাহী পরিবহন রিকশা-সাইকেল ছিল। কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউর মতো বড় রাস্তায় রিকশা চলাচল আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ হলেও, নিজ নিজ উদ্দেশ্য নিয়ে রিকশাগুলো সেখানে ছিল।  রিকশার বেল ট্রাফিকজ্যামের গর্জনকে বাড়িয়ে দিলো।

ঘটনাক্রমে আরেকটি গোলচক্করে পৌঁছালাম আমরা। এবার বাঁ দিকে মোড় নিয়ে পেলাম আরেকটি সংযোগ সড়ক, পান্থপথ তেজগাঁও লিংকরোড। এখানে আমার ট্যাক্সিচালক ইউটার্ন নিলেন এবং কিছু কৌশলী হস্তচালনার মাধ্যমে আমার নির্ধারিত হোটেলের প্রবেশপথে ঢুকার সুযোগ নিলেন। একশ’ গজের প্রবেশপথটি খালি এবং প্রথমবারের মতো একটু উন্মুক্ত স্থান দেখতে পেলাম। বিমানবন্দর থেকে হোটেলের দূরত্ব সাড়ে আট কিলোমিটার। আড়াই ঘণ্টা লাগলো এটি অতিক্রম করতে। হোটেলের প্রবেশপথটি শেষ করে আমার টাক্সিচালক তার অনুভূতি প্রকাশ করলেন। “সামান্য একটু যানজট ছিল” তিনি বললেন, “ততটা খারাপ ছিল না।”

“বাংলাদেশের পরিস্থিতি দুর্যোগে আক্রান্ত জাতির মতো নয়” ২০০০ সালে লেখেছিলেন সাংবাদিক উইলিয়াম ল্যাংগউইশে। কথাটি অতিরঞ্জিত মনে হয়, কিন্তু পরিবহনে-ঠাসা ঢাকার রাস্তাকে দেখার মানে হলো দুর্যোগকে সচল অবস্থায় দেখা, অথবা বলা যায় অচল।  রাজধানী শহরের আটকে-পড়া পরিবহনগুলো এই জাতির জন্য মহাদুর্যোগের প্রতীক হয়ে আছে। বিশেষ করে বলা যায়, জনসংখ্যার বৃদ্ধি। উন্নয়নশীল দেশের মাপকাঠিতে এটি মানানসই, কিন্তু বাংলাদেশের আয়তনের তুলনায় এটি বিপর্যয়কর।

 

সৌজন্যে: নিউইয়র্ক টাইমস

ঢাকার যানজট অন্যান্য শহরের চেয়েও খারাপ হবার কারণ কী?

মূলত যানজট একটি ঘনবসতির বিষয়।  এমনটা হয়, যখন অতিরিক্ত সংখ্যক মানুষ অতি সংকীর্ণ কোন স্থানে জায়গা নিতে চায়। বাংলাদেশ হলো পৃথিবীর চরম ঘনবসতিপূর্ণ জাতির মধ্যে দ্বাদশ। কিন্তু ষোল কোটি জনসংখ্যার কারণে সেটি সবচেয়ে জনাকীর্ণ এবং তালিকার মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র দেশ। বিষয়টি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করছি: বাংলাদেশের স্থলভূমি রাশিয়ার ১১৮ ভাগের এক ভাগ, কিন্তু এর জনসংখ্যা রাশিয়া থেকে আড়াই কোটি বেশি।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা সমস্যাটি ঢাকা শহরেই প্রতিফলিত হয়েছে, কারণ বলতে গেলে ঢাকাই বাংলাদেশ। দেশের প্রায় সকল সরকারি, ব্যবসায়িক, স্বাস্থ্য বিষয়ক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এবং শ্রমবাজারের বিরাট একটি অংশ ঢাকায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে।  প্রতি বছর ৪ লাখ নতুন অধিবাসী রাজধানীতে যুক্ত হয়। এই গণ অভিবাসন ঢাকাকে করেছে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ মেগাসিটি এবং সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীলও।

যেসব মৌলিক অবকাঠামো এবং আইনের শাসন বড় শহরগুলোকে বাসযোগ্য করে, এই শহরের কোটি অধিবাসী সেসব একদমই পাচ্ছে না। ঢাকায় মাত্র ৬০টি ট্রাফিক লাইট আছে, যা কেবলই আলংকারিক; খুব কম গাড়িচালক সেগুলোকে গুরুত্ব দেয়। ঢাকার রাস্তায় অরাজকতার বড় কারণ হলো, রাস্তার অপর্যাপ্ততা।  ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন মতে, ঢাকা শহরের মাত্র ৭ শতাংশের জন্য রাস্তা আছে। (উনিশ শতাব্দির পৌর পরিকল্পনায় নির্মিত প্যারিস এবং বার্সেলোনা শহরে এই অনুপাত ৩০ শতাংশ।)  ফুটপাথগুলোতেও সমস্যা। কিছু রাস্তায় ফুটপাথ আছে এবং যা আছে তা প্রায় চলাচলে অযোগ্য  – দোকানদার এবং গৃহহীন মানুষের আবাস।

ঢাকার মতো শহরগুলোর যানজটের জন্য সাধারণ সমাধান হলো, রাস্তার ওপরে চলাচলের পরিবর্তে রাস্তার নিচে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা।  কিন্তু ঢাকায় কোন ভূগর্ভস্থ রাস্তা নেই এবং নির্মাণেরও কোন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেই।  এ সমস্যাটি আরও তীব্র হয়েছে মর্যাদার প্রতীক হিসেবে প্রদর্শিত ব্যক্তিগত গাড়িগুলোর কারণে, যা শহরের মধ্যবিত্তদের প্রচলিত মাধ্যম। এতে প্রতি বছর হাজার হাজার গাড়ি ঢাকার রাস্তায় যুক্ত হচ্ছে।

সরকারের নিজস্ব হিসেব মতে, ঢাকার যানজটের কারণে প্রতি দিন ৩২ লাখ শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং এটি দেশের অর্থনৈতিক আয় থেকে কোটি কোটি টাকা লোকসান যাচ্ছে। এই যানজট আরেক প্রকার ক্ষতি নিয়ে আসছে ঢাকাবাসীর জীবনে ও মননে।  বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নগর এবং অঞ্চল পরিকল্পনা’ বিষয়ক অধ্যাপক সারওয়ার জাহান বলেন, “শহরটি জটিল হয়ে যাচ্ছে। যাতায়াতের সমস্যার কারণে মানুষ কারও সাথে সাক্ষাৎ করতে পারে না। শুধু প্রয়োজন হলেই বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া হয়। তাতে অনেক সময় চলে যায়।”

ঢাকার যানজটকে ‘অসুবিধা’ বলা এক প্রকার ভুল; এমনকি ‘দুর্যোগ’ বললেও সহজ হয়ে যায়।  যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্থাপত্য ও পরিকল্পনা’ বিষয়ক অধ্যাপক আদনান মোরশেদের মতে, ঢাকার যানজট হলো ‘একটি বিশাল পৌর ব্যাধি’ যা ‘মৃত্যু ঘটিয়েই চলেছে’।  বাংলাদেশের পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির জন্য বিরাট প্রাপ্তি। কিন্তু বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন  এই বলে যে, রাজধানী যানজট এবং অবকাঠামো সমস্যার সমাধান না হলে ওসব অর্জন হারিয়ে যাবে – সেই অগ্রগতি নিজে থেকেই স্তবির হয়ে যাবে। যানবাহনে ঠাসা রাস্তাগুলো ঢাকা শহরের দুঃখের এক অমানবিক চিত্র। বলা যায়, দুঃখের একমাত্র কারণ।

 

যে কারণে ঢাকার গাড়িচালকদেরকে শ্রেষ্ঠ ড্রাইভার বলতে হয়…

ঢাকার অত্যধিক পরিবহণ সর্বগ্রাসী অনুভূতি। আপনি এর গন্ধ পাবেন, স্বাদ পাবেন।  গাড়ির ধোঁয়া আপনার নাসারন্ধ্রে আপনার জামায় আপনার মুখে আঘাত করবে।  আপনার জিহ্বায় তীব্র স্বাদ রেখে যাবে। পাশের গাড়ি অথবা পথচারিদের মধ্যে নিজের হাতকে নিরাপত্তার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে  আপনি হয়তো, হয়তো নয় অবশ্যই, যানজটকে ধরতে পারবেন, ছুঁতেও পারবেন।

কিন্তু যানজট আপনার শ্রবনেন্দ্রিয়কে সবচে’ বেশি আক্রান্ত করে। ইতিহাসবিদদের মতো, শহরের নামকরণ হয়েছে ঢাক থেকে, অর্থাৎ ঠনঠন-শব্দ-করা এক বড় ঢোল। ঐতিহাসিক সত্য যা-ই হোক, শহরের ভয়ানক শোরগোল আপনার শ্রবনেন্দ্রিয়কে যে আচ্ছন্ন করে, তাতে কোন ভুল নেই। ঢাকার গাড়ির বধির-করা একক সঙ্গিত, চালকদের চিৎকার, এন্জিনের গর্জন, অন্তহীন হুইসেল থেকে আসা কণ্ঠ, তাল এবং তালহীন করতাল এবং সবমিলে এক বেসুরো থিম সং।

সেই একটানা উচ্চশব্দ চরম আগ্রাসী। ঢাকার চালকেরা হয়তো ‍পৃথিবীর সবচেয়ে পাশবিক আর নির্দয়। আপনি যদি ঢাকার মতো শহরে আইন লঙ্ঘন এবং দুঃসাহসকে চালকের দক্ষতা বলে মনে করেন, তবে তাদেরকে শ্রেষ্ঠ চালক বলতে হয়।

 

সৌজন্যে: চ্যানেল আই অনলাইন

সিএনজি: “তিন চাকার ওপর চলা ছোট টিনের বক্সটি দু’টি কক্ষে বিভক্ত”

এক বিকালে শের-এ-বাংলা ক্রিকেট স্ট্যাডিয়াম থেকে একটি অটোরিকশা নিয়ে ঢাকার সবচেয়ে যানজট প্রবণ রাস্তা দিয়ে দীর্ঘ ভ্রমণের ব্যবস্থা করলাম।  ঢাকার লোকেরা অটোরিকশাকে ‘সিএনজি’ বলে, কারণ সেটি সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাসে চলে।  তিন চাকার ওপর চলা ছোট টিনের বক্সটি দু’টি কক্ষে বিভক্ত, একটি চালকের জন্য, অন্যটি যাত্রীর জন্য। যাত্রীর কক্ষটি একটু বড় হলেও বেশ চিপা। এটি আপনি এশিয়ান শহরগুলোতে দেখতে পাবেন। ঢাকায় এগুলো সবুজ রঙে আচ্ছাদিত এবং প্রায় সবগুলোই নোংরা এবং জির্ণশির্ণ। এগুলো অনেক শব্দ করে অসহ্য ধ্বনিতে রাস্তাকে মাতিয়ে রাখে। যত্নহীন নিম্নমানের ছোট্ট যন্ত্রটিকে গোল্ফকার্টের দস্যু চাচাতো ভাই বলা যায়।

আমার সিএনজির পাইলট হলেন একজন হাসিহীন মানুষ যার বয়স হয়তো ত্রিশের নিচে। রাস্তায় তিনি বেধড়ক। রাস্তার ভিড় ঠেলে প্রতিটি সেন্টিমিটারের জন্য তিনি যুদ্ধ করেছেন এবং একটু ফাঁক পেলেই সর্বোচ্চ গতিতে গাড়ি চালিয়েছেন। এবার আমরা নগরের ব্যস্ততম রাস্তায়, বীরউত্তম রফিকুল ইসলাম এভিনিউ। রাস্তার দু’পাশে বড় বড় শপিং মল এবং ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর।  একটি শপিং মল প্রায় রাস্তার ওপরেই গজিয়ে ওঠেছে। ঢাকার রাস্তায় যানজট অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক: গাড়ির চারপাশ ঘিরে পানির বোতল, খোসা ছাড়ানো শশা, বই বিক্রি করছে ফেরিওয়ালারা। অবশ্য অপরাধেরও সম্ভাবনা আছে। একসময় সিএনজিতে দরজা ছিল না, কিন্তু এখন গ্রিল দিয়ে ঢাকা। দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে ওঁত পেতে থাকা ছিনতাইকারীদের হাত থেকে এটি সুরক্ষা দেয়। কথিত আছে যে, দুঃসাহসী চোরেরা সিএনজির ছাদ কেটে যাত্রীর ওপর চড়াও হয়। তাদের পছন্দের অস্ত্র হলো ‘টাইগার বাম’, ঝাঁঝালো এক প্রকার মলম, যা তারা নিরস্ত্র করার জন্য শিকারের চোখে মেখে দেয়।

আমার চালকের একটিমাত্র কৌশল হলো, সব অবস্থায় গাড়ির গতি ধরে রাখা, পরিস্থিতি যা-ই হোক, এমনকি চিপা গলিতেও। সোজা যেতে না পারলে ডানেবামে, গাড়ির নাক দিয়ে অন্যের লেইন অতিক্রম করে, গাড়ির ফাঁক দিয়ে, অন্য চালকদেরকে রাস্তা ছাড়তে বাধ্য করে, এমন কি দু’এক ইঞ্চি সংঘর্ষকে এড়িয়ে। একটি কথা দিয়ে তিনি অন্য গাড়ি গুলোকে হুংকার দিয়ে যাচ্ছিলেন। ‘আস্তে’। চিৎকারে করে বলে যাচ্ছিলেন, ‘আস্তে! আস্তে! আস্তে!’। পরে আমার এক ইংরেজি-জানা বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম ‘আস্তে’ মানে কি। জানা গেলো, ‘আস্তে’ মানে হলো ‘ধিরে, সাবধানে’।

 

রিকশা পেইন্টিং: গুগল সার্চ

রিকশা:  চলন্ত যাদুঘর

ঢাকার একটি যানবাহনকে নিরীহ মনে করা যেতে পারে, অন্তত শহরের নিম্নতম মানদণ্ডে। সেটি হলো, সাইকেল রিকশা। ঢাকার রাস্তার প্রাচীন এবং সর্বত্র বিরাজমান যানবাহন। রিকশার সঠিক সংখ্যা কেউ জানে না। (এগুলোর মধ্যে মাত্র একটি অংশ আনু্ষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত।)  অনেকে মনে করেন, ঢাকার রিকশার সংখ্যা ২ লাখ হবে; অন্যরা ধারণা করছেন এই সংখ্যা কমপক্ষে কয়েক গুণ বেশি।

ঢাকার রাস্তায় রিকশা ভাড়া নিয়ে দরদাম করা গাড়িতে চড়ার মতোই এক সেরা বিনোদন। এসব ত্রিচক্রযানকে নিষিদ্ধ করার জন্য অনেক প্রস্তাব এসেছে, কিন্তু প্রতিবারই সেগুলো ব্যর্থ হয়েছে।  কেউ কেউ মনে করেন, ঢাকার যানজটে রিকশাই উপযুক্ত বাহন এবং সবচেয়ে পরিবেশ-বান্ধব। কিন্তু অন্যরা বলেন, ওগুলো কোন কাজের না কারণ মাত্র আটজন যাত্রী নিয়ে চারটি রিকশা একসাথে চললে একটি বাসের জায়গা দখল করে ফেলে।

একটি বিষয়ে সবাই একমত যে, ঢাকার রিকশা দেখতে বেশ সুন্দর।  এদেরকে বলা হয় ‘চলন্ত যাদুঘর’।  এগুলো রঙ-বেরঙের উপাদানে সজ্জিত; ফ্রেমগুলোতে আঁকা থাকে ফুল; পেছনে সিনেমার তারকা এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বের ছবি অথবা গ্রামের বা শহরের দৃশ্য আঁকা থাকে।  রিকশার পেছনে শহরের পেইন্টিংগুলো পর্যালোচনা করলে পরিস্থিতির নিগূঢ় তত্ব খুঁজে পাবেন। কোন বৈচিত্র ছাড়া সেসব ছবিতে এক শান্ত শহরের স্বপ্ন আঁকা থাকে, যেখানে আছে উড়ন্ত পাখি এবং উচু মিনারের পেছনে অস্তায়মান সূর্য।  পেইন্টিংগুলোতে রাস্তাকে দেখতে পাবেন পরিচ্ছন্ন, শান্ত এবং সুস্থির যানজটমুক্ত।

 

ঢাকার নগর বিশেষজ্ঞরা কি সমস্যাকে আরও জট পাকাচ্ছে?

ঢাকার ভেতরে আমরা যে রিকশা পেইন্টিংগুলো দেখতে পাই, সেগুলো সুশৃঙ্খল রাস্তার চিত্র যা অনুমানযোগ্য ভবিষ্যতকে তুলে ধরে। শহরের সমস্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত চাওয়া হলে তারা কিছু পরিচিত ছড়া আবৃত্তি করেন।  ট্রাফিক লাইট, সুনির্দিষ্ট রিকশা লেইন, বাধাহীন রাস্তা, সড়ক রেল ইত্যাদির সুপারিশ করেন তারা। তারা বলেন বিকেন্দ্রীকরণের কথা; চট্টগ্রাম এবং খুলনাকে দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেন। এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে একটি ১২মাইল দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে, যা ২০১৫ সালের অগাস্টে শুরু হয়েছে। কিন্তু ঢাকায় এধরণের প্রকল্প সম্পর্কে গভীর অবিশ্বাস রয়েছে, কারণ সরকারের অদক্ষতা এবং দুর্নীতির কারণে নির্মাণের অগ্রগতি প্রায়ই বাধাগ্রস্ত হয়।

ইতোমধ্যে রাজধানীর রাস্তাগুলোতে ভিড় উপচে পড়ছে। ঢাকার জলবায়ুর সাথে অভ্যস্ত হতে এবং এর দুর্ভেদ্য রাস্তাগুলোর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করতে মাত্র কিছুদিন লাগে। একজন নবীনের কাছে বিদেশি শহরের যানবাহন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। জমাটবাধা যানবাহনগুলো যেভাবে সবদিক থেকে দৃষ্টিসীমানাকে বদলে দিয়েছিল; শূন্যতা এবং দৃষ্টিকোণকে বিধ্বস্ত করে দিয়ে ঢাকার দৃশ্যকে রঙের ছটায় কিউবিস্ট মৃৎশিল্পে পরিণত করেছে, তা দেখে আমি মুগ্ধ হতে শুরু করেছিলাম। দেয়ালে রঙের ছটা; ট্রাকের রিয়ারভিউতে দাড়িওয়ালা চালকের ক্ষণিক প্রতিবিম্ব; ঢেউটিনের বেড়া অতিপ্রাকৃতিকভাবে কয়েক ফিট ওপরে হাওয়ায় ওড়েছিল; আর দেখেছিলাম একটি অদেখা মালবাহী রিকশাভ্যানকে।

অবশ্য আমি উপলব্ধি করেছি যে, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী শহর থেকে যাওয়া একজন অতিথির পক্ষে দরিদ্রতম একটি দেশের অব্যবস্থাপনা আর ‍বিশৃঙ্খলা নিয়ে সৌন্দর্য আলোচনা করা মানানসই না।  ঢাকার যানজটকে বিড়ম্বনা বললে ভুল হবে।  একে বলতে হয় দারিদ্রতা, বলতে হয় এটি অবিচার, এটি দুর্ভোগ।

 

“এই শহর আপনার মনকে দার্শনিক বানিয়ে দেয়”

আমি যাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের প্রায় সবাই যানজটকে অগ্নি পরীক্ষা, সাহসের পরীক্ষা এবং ভয়ের বিষয় হিসেবে দেখে। সেটি আবার বিকৃত অহংকারেরও উৎস।  একজন ভদ্র মহিলা যিনি সারাজীবন ধরে ঢাকায় বাস করছেন, তিনি আমাকে বললেন যে, বিদেশে থাকার সময় তিনি নাকি ঢাকার যানজটকে মিস করেছেন।  ইউরোপ এবং আমেরিকার শহরগুলোতে যানজটের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হওয়াতে সেটি তার উৎসাহকে কমিয়ে দিয়েছে। দিনের বেলায় ঢাকায় বের হয়ে যদি জটপাকানো রাস্তার মোড়গুলোকে আপনি অতিক্রম করতে পারেন, তখন বলা যায় সমস্ত প্রতিবন্ধকতা আপনি জয় করেছেন এবং জয় করেছেন দেবতার মন। এই শহর আপনার মনকে দার্শনিক বানিয়ে দেয়।  ঢাকা আপনাকে জানিয়ে দেবে যে, ভ্রমণ মানে নরক, কিন্তু এটি ভ্রমণের প্রাচীন বিস্ময়কেও মনে করিয়ে দেয়।  দৈনন্দিন যাতায়াত, সেটি যত নৈমিত্তিকই হোক না কেন, সময়কে নিয়ন্ত্রণ করে মিরপুর রোডের মতো ভয়ানক যানজটকে অতিক্রম করার মানে হলো মহাশূন্য জয় করা।

 

ঢাকার রাস্তায় চলতে হলে যে নিয়মটি মনে রাখতে হবে

নিউইয়র্কে ফেরার সময় হলো। ঢাকায় থেকে আমি যাতায়াতের গোল্ডেন রুলটি শিখে নিয়েছি, তা হলো: আগে বের হও।  তাই হোটেলকে আমি ভোর ৪:৪৫টায় ডেকে দিতে বললাম। বিমানে ওঠার পাঁচ ঘণ্টারও বেশি আগে আমার জন্য অপেক্ষমান ট্যাক্সিটিতে নিজেকে গলিয়ে দিলাম।  ট্যাক্সিচালক আমাকে অভয় দিয়ে বললেন যে, এ সময়ে রাস্তার অবস্থা তত খারাপ হবে না।

দেখলাম যে, চালকের কথা ঠিক।  সূর্য তখনও ওঠে নি। আমাদের ট্যাক্সি ঢাকা শহরের মাঝে কালো রাস্তা বেধ করে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল।  কোন যানজট ছিল না – একদমই না। আমরা এয়ারপোর্ট রোডের দখল পেলাম এবং একই গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। গতিপরিমাপক যন্ত্রের দিকে আমি তাকাচ্ছিলাম আর গাড়ির জানালা নামাচ্ছিলাম। ট্যাক্সি ঘণ্টায় ৫০ মাইল বেগে চলছিল – মনে হচ্ছিল যেন আমরা ওড়ছি।

তারপর, আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাবার আনুমানিক এক মাইল আগে কিছু গাড়ি, ট্রাক এবং সিএনজি’র সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিপক্ষ আমাদের পথ আগলে ধরলো। আমাদের ট্যাক্সির গতি থেমে গেলো এবং হঠাৎ আবার ঢাকা বাংলাদেশের যানজটপূর্ণ রাস্তায় আমরা আটকে গেলাম। আমরা থেমে গেলাম, আবার স্টার্ট দিলাম, আবারও থেমে গেলাম। এই ভিড়ের কারণ অস্পষ্ট, কিন্তু এটি স্পষ্ট যে, বিমান ধরতে আর তত সমস্যা হবে না।  অতএব, আমি স্বস্তিতে থাকলাম: শেষবারের মতো ঢাকার উন্মাদনাকে উপভোগ করছিলাম। একসময় আমাদের গতিপরিমাপকে ঘণ্টায় পাঁচ মাইল দেখাচ্ছিল এবং আমরা আবারও সামনের দিকে হামাগুড়ি শুরু করলাম। একটি চিন্তা আমার মাথায় আসলো: ঢাকা শেষ পর্যন্ত আমার কাছে তার পরিচয় ধরে রেখেছে।  এটাকে আপনারা যানজট বলবেন? থামুন। এটি যানজট নয়।

 

 


নিউইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনের নিবন্ধ অবলম্বনে। মূল লেখা “ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম, যা কখনও শেষ হয় না” জডি রোসেন/ ২৩ সেপটেম্বর ২০১৬।

প্রজেক্ট ম্যানেজার: পেশাদারিত্ব কোথা থেকে আসে? প্রকল্পের পক্ষ/বিপক্ষ কারা?

banner2-crop

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক, পর্ব ৫। প্রজেক্ট ম্যানেজারের পেশাদারিত্ব। এপর্বের শুরুতেই একটি বেরসিক প্রশ্ন করতে চাই আমাদের ‘পেশাদারিত্ব’ নিয়ে। আমাদের পেশাদারিত্ব কেন এবং কীভাবে গড়ে ওঠে? এটি কি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যের কারণে আসে, নাকি নিজের কাজের প্রতি একাগ্রতার ফল হিসেবে আসে?  কোন কোন সময় আমাদেরকে একটিকেই অগ্রাধিকার দিতে হয়। তাই বিষয়টি সম্পর্কে একচেটিয়া মনোভাব থাকা দরকার। পেশাদারিত্ব কি ব্যক্তির, নাকি প্রতিষ্ঠানের?  ব্যক্তি ছাড়া তো প্রতিষ্ঠান হতে পারে না, কারণ প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিরই সমষ্ঠি। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের সুনাম এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে কর্মীদের জন্য পেশাদারিত্ব অর্জনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অতএব নিরপেক্ষ উত্তর বলতে কিছু নেই। দিনশেষে প্রতিষ্ঠান অথবা ব্যক্তি, যেকোন একটিকে বেছে নিতে হবেই।

 

▶কীভাবে আসে পেশাদারিত্ব?

উপরোক্ত প্রশ্নে মোটাদাগে তিনটি পক্ষ আছে। প্রথম পক্ষটি বলবেন, আনুগত্য এবং ব্যক্তিগত উন্নয়ন বিষয়গুলো আপেক্ষিক। পরিস্থিতি মোতাবেক যেকোন একটি আগে বা পরে আসতে পারে। প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্যের ফলে কাজের সুযোগ আসে এবং কাজের সুযোগগুলোকে একাগ্রতার সাথে কাজে লাগালে পেশাদারিত্ব আসে। যাদের অভিজ্ঞতা আছে, তারা  নিজের কাজে স্বাধীনভাবে প্রচেষ্টা দিতে পারেন। কিন্তু যাদের দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা নেই, তাদেরকে আনুগত্য দেখিয়ে কাজটুকু বুঝে নিয়ে হয়। সেক্ষেত্রে কিছু অতিরিক্ত কাজ তো করতেই হবে! অতএব, সোজা উত্তর নেই।

দ্বিতীয় পক্ষটি হয়তো একটি সোজা উত্তরকে বেছে নেবে। তারা বলবেন, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য ছাড়া পেশাদারিত্ব আসে না, কারণ প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া ব্যক্তির দক্ষতার কোনই মূল্য নেই।

তৃতীয় পক্ষটি আরও সোজা। তারা বলবেন, ব্যক্তির অংশগ্রহণ ছাড়া প্রতিষ্ঠান অচল। অতএব ব্যক্তির উন্নয়নই প্রথম। প্রতিষ্ঠান চাকরি দিলেও কোন ব্যক্তি যদি নিজ দায়িত্ব ভালোভাবে পালন না করে, তবে তো চাকরিই থাকে না। পেশাদারিত্ব আসবে কোত্থেকে!  অতএব, পেশাদারিত্ব আসে নিজের কাজের প্রতি একাগ্রতার ফলে।

 

▶ বর্তমান কাজে একাগ্রতাই কি পেশাদারিত্ব অর্জনের প্রথম পথ?

চলুন আলোচনার স্বার্থে তৃতীয় পক্ষটিকে সামনে নিয়ে আসি।  মনে করি, প্রথমত ব্যক্তির ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলেই পেশাদারিত্ব আসে, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যের কারণে নয়। প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য বিষয়টিও আপেক্ষিক। প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ যদি চাটুকারিতায় অভ্যস্থ না হয়, তবে তারা হয়তো বলবে, ‘প্রকল্পের কাজে অগ্রগতি না হলে আনুগত্য দিয়ে আমরা কী করবো?’  অতএব সাধারণ দৃষ্টিতে, নিজের কাজের প্রতি মনোযোগী হওয়াটাই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য।

একজন প্রকল্প ব্যবস্থাপককে স্বার্থপরের মতো নিজের প্রকল্পের কাজেই মনসংযোগ করতে হয়। এটিই কর্তৃপক্ষের দেওয়া এসাইনমেন্ট।  এটিই তার পেশাদারিত্ব প্রদর্শন ও অর্জনের জায়গা।

এখানে বলে রাখি, উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবে শুধু ‘উন্নয়ন প্রকল্পতেই’ আলোকপাত করার চেষ্টা করছি। কীভাবে একজন সফল প্রকল্প ব্যবস্থাপক বিবর্তিত হয়ে ‘স্বপ্ন ব্যবস্থাপকে’ রূপ নিতে পারেন, সেটি তার বর্তমান প্রকল্পের অগ্রগতি থেকে বুঝতে পারা যায়।

 

▶প্রজেক্ট ম্যানেজারকে কি প্রতিষ্ঠানের অন্যসব বিষয় থেকে দূরে থাকা উচিত?

কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে ডিসট্রাকশন সৃষ্টি করতে পারে, সেটি স্বাভাবিক। তাদেরকে হয়তো একসাথে অনেকগুলো প্রকল্পের যোগান দিতে হয়। অনেক বিষয়ে মনোযোগ দিতে হয়। যেকোন সময় যেকোন প্রকল্প ব্যবস্থাপককে তারা বাড়তি কাজ দিতেই পারেন। প্রকল্প পরিচালকের নৈশভোজে যোগ দিতে হতেই পারে। এসব কাজের কোন্ গুলোতে প্রকল্প ব্যবস্থাপক যাবেন, কোন্ গুলোতে যাবেন না, সেটি বুঝার জন্য কেবল একটি প্রশ্ন নিজেকে করতে হয়। তা হলো, ‘তাতে কি আমার বর্তমান প্রকল্পটি উপকৃত হবে?’ উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে আরেকটি প্রশ্ন: কীভাবে কতটুকু/ কখন? উত্তর যদি ‘না’ হয়, তবে যেকোন ভাবে কর্তৃপক্ষের অযাচিত আহ্বান থেকে নিজেকে দূরে রাখা উচিত। তবে পরিস্থিতিই বলে দেবে, কোনটি করণীয়।

 

▶প্রকল্পের সাথে জড়িত ভেতর/বাইরের পক্ষগুলোর গুরুত্ব কতটুকু?

প্রকল্পের উন্নয়নের সাথে যাদের স্বার্থ জড়িয়ে আছে, তারা হলো একেকটি পক্ষ। আবার প্রকল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যাদের প্রভাব থাকতে পারে তারাও একটি পক্ষ। অন্যদিকে প্রকল্পকে সহায়তা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্যও একটি প্রভাবশালী পক্ষ আছে। এই ইতিবাচক ও নেতিবাচক সব পক্ষ নিয়েই একটি প্রকল্প এগিয়ে চলে। এদেরকে ছেড়ে প্রকল্পের অগ্রগতি ভাবা যায় না। তবে এসব পক্ষকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত বা বিচ্ছিন্ন করতে না পারলে প্রকল্পের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি হয়।

প্রকল্প ব্যবস্থাপককে তাই বুঝে নিতে হয়, কাদেরকে তিনি গুরুত্বের সাথে সম্পৃক্ত করবেন এবং কাদেরকে তিনি গুরুত্বের সাথে প্রকল্পের কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন রাখবেন। আরেকটি পক্ষ আছে, যাদেরকে সম্পৃক্ত বা বিচ্ছিন্ন উভয়ই বিপদজনক। তাদের জন্য একটি মাঝামাঝি অবস্থান আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখতে হয়।

একটি আদর্শ প্রজেক্ট প্রপোজালে এসব পক্ষ আগে থেকেই সনাক্ত করা থাকে। তাদের কার কী প্রভাব, নেতিবাচক নাকি ইতিবাচক এবং তাদেরকে কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে, সবকিছু প্রকল্প প্রস্তাবনায় বর্ণিত থাকে। কিন্তু প্রকল্প ব্যবস্থাপককে বাস্তব পরিবেশে কাজ করতে হয় বলে তিনি এসব নিয়ে আলাদাভাবে ভাবতে পারেন না, যদি না সেটি আগে থেকেই সুনির্দিষ্ট থাকে। ফলে, প্রকল্প পরিকল্পনার সময়ই এর পক্ষ-বিপক্ষ নির্ধারণ করতে হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কেবল, সংযোজন-বিয়োজন করা যায়।

 

▶ প্রাসঙ্গিক কয়েকটি টিপস:

১) আপনার প্রজেক্টের সাথে জড়িত ফেরারেন্স দলিলপত্র (প্রজেক্ট চার্টার, প্রজেক্ট প্রপোজাল, বেইসলাইন সার্ভে, সংশ্লিষ্ট ইমেল ইত্যাদি) সবসময় হাতের কাছে রাখুন। সংক্ষিপ্ত সংস্করণে টেবিলে কিছু রেখে দিন, যেন অল্প সময়ে আপনি বুঝে নিতে পারেন।

২) প্রকল্পের সাথে বিভিন্ন অংশীজন (স্টেইকহোল্ডার) কারা, তাদের কতটুকু প্রভাব এসম্পর্কে নিয়মিত বিশ্লেষণ করুন। যথাযথ উপায়ে তাদের সাথে যোগাযোগ ও সম্পর্ক জোরদার করুন।

৩) প্রকল্পের কর্মীদের সাথে নিয়মিত বসুন, আনুষ্ঠানিক অথবা অনানুষ্ঠানিক ভাবে। তাদের মনোভাব দেখুন, তাদের সামর্থ্য বুঝার চেষ্টা করুন। নিয়মিত মিটিংয়ে অনেক ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়।

৪) প্রকল্পের কর্মীদের নিয়ে ছোট ছোট কর্মশালার আয়োজন করুন, তাতে বিভিন্ন ইস্যুতে কর্মীদের ধারণা স্পষ্ট হবে। বাড়তি উপকারিতা হলো, তাতে আত্মবিশ্বাস এবং সম্পর্কের উন্নয়ন হয়।।

৫) সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারের সাথে প্রয়োজনীয় সম্পর্ক সৃষ্টি করুন। প্রয়োজনে তাদেরকে প্রকল্পের উদ্দেশ্য/অগ্রগতি সম্পর্কে হালনাগাদ করুন। গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে তাদেরকে প্রকল্পের ঘটনার সাথে যুক্ত করুন। তাতে কোন আনুষ্ঠানিকতা বা অফিশাল প্রক্রিয়া ছাড়াই আপনার প্রকল্পটির অনুসন্ধান/তদারকি হয়ে যাবে – ভবিষ্যতের লালফিতার দৌরাত্ম্য কমে আসবে।

৬) সমধর্মী অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করুন। এসোসিয়েশনের সভাগুলোতে নিয়মিত অংশ নিন। সুযোগমতো দায়িত্বও নিন। এটি শুধু আপনার প্রকল্পের জন্য নয়, আপনার পেশাগত নেটওয়ার্কিংয়ের জন্যও দরকার। তবে প্রকল্পের সরাসরি উপকৃত করবে।

৭) নিয়মিত জার্নাল (সম্পন্ন/পরিকল্পিত কাজের তালিকা) রাখুন। এটি ভবিষ্যতের যেকোন প্রতিবেদন, জরিপ বা তদন্তের সময় বিশেষভাবে আপনার (প্রজেক্ট ম্যানেজার) উপকারে আসবে। কর্মীদের বা একক কাজের তদারকি করতেও সহায়ক হবে।

৮) একই স্বভাবের প্রকল্প/কর্মসূচি যারা পরিচালনা দিচ্ছে, তাদের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করুন। তাতে নিজ প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ কাজে আসবে। প্রাক্তন ম্যানেজারদের অভিজ্ঞতা (লেসন লার্ন্ট)গুলোর ওপর সুযোগ পেলেই দৃষ্টি দিন।

৯) কর্মসূচি/প্রোগ্রাম ব্যবস্থাপকের সাথে সাথে যথাযথ যোগাযোগ রক্ষা করুন। শুধু সাহায্যের জন্য যোগাযোগ করবেন না, সেটি হবে স্বার্থপর সম্পর্ক। তার সহযোগিতার কারণে কোথায়/কীভাবে আপনার প্রকল্প উত্তরোত্তর এগিয়ে চলেছে, এসব সুখবর দিতে ভুলবেন না।

১০)  শুধু সাম্প্রতিক নয় এবং পরবর্তি কাজগুলোর দিকেও নিয়মিত দৃষ্টি রাখুন। তাতে নিকট ভবিষ্যতের সমস্যাগুলো আগে থেকেই আঁচ করতে পারবেন। প্রকল্পের কর্মীরা কাজের মানুষ – তারা নির্দেশ শুনে কাজ করতে অভ্যস্ত। তাদের ওপর পরিকল্পনার দায় চাপাবেন না (যদি না বিশেষভাবে অভিজ্ঞ হয়), তাতে কাজের অগ্রগতি ব্যহত হবে।

 

আলোচনাগুলো যথাসম্ভব সহজ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেন সংশ্লিষ্ট না হলেও বুঝতে পারা যায়। প্রজেক্ট ম্যানেজার-কেন্দ্রিক এই আলোচনা ক্রমেই ‘প্রজেক্ট প্লানিং’ এবং প্রজেক্ট বাস্তবায়নের দিকে ধাবিত হবে । (চলবে)

 

▶ পর্ব ৪:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া: পেশাদারিত্বের শুরু

▶ পর্ব ৩:  ৯টি তত্ত্বে প্রকল্পের সংজ্ঞা এবং সহজ কিছু দৃষ্টান্ত

▶ পর্ব ২:  যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনে প্রকল্প আমাদেরকে উপকৃত করে

▶ পর্ব ১:  প্রকল্প ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে

 


Sources consulted:

1. European Commission, EuropeAid Cooperation Office (2004) Aid Delivery Delivery Methods: Project Cycle Management Guidelines. Brussels, Belgium.

2. Institute, P.M. and Project, M.I. (2013) A guide to the project management body of knowledge (PMBOK guide). Fifth Edition. United States: Project Management Institute.

 

গীতিকার গোবিন্দ হালদার: A Tribute

180115.pptx-crop

 

মুক্তিযুদ্ধের একটি সময়ে এরকম নিয়ম হলো যে, বিদেশী লেখক বা শিল্পীর গান স্বাধীনবাংলা বেতরকেন্দ্রে পরিবেশন করা হবে না। ঠিক এভাবেই নিভৃতাচারি গোবিন্দ হালদারের নামটি আরও নিভৃতে হারিয়ে যায়। তার পূর্বে বেশ কিছুদিন তার রক্ত-গরম-করা গানগুলো স্বাধীনবাংলা বেতরকেন্দ্রে পরিবেশিত হয়েছেল। ওই নীতিমালা গ্রহণের পর তার নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। এমনকি বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরও মুক্তিযুদ্ধে অবদানকারীদের তালিকায় তার নামটি থাকে নি। গোবিন্দ হালদারকে বাঙালী কেন তেমনভাবে জানে না, এই হলো দ্য ডেইলি স্টার থেকে প্রাপ্ত তথ্য।

 

এরপরের সরকারগুলো আর গোবিন্দ হালদারকে তেমনভাবে স্মরণ না করলেও, স্বাধীন বাংলাদেশের বেতার তার সাথে পরবর্তিতে একটি চুক্তি করে। কিন্তু চুক্তিমতো তিনি নিয়মিত গীতিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তার গানগুলো গাওয়া হলেও এর রয়্যালটি তিনি পুরোপুরি পান নি। “তারা আমাকে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত খরচের ভাউচার পাঠিয়েছে, আমি সইও করেছি।  তথাপি আমার ন্যায্য পাওনা থেকে আমি বঞ্চিত হয়েছি।” ১৯৮৫ সালের তারকালোকে প্রকাশিত তার নিবন্ধ থেকে উদ্ধৃত।

 

তিনি সেই গোবিন্দ হালদার, যিনি লেখেছিলেন- ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলো যারা’ ‘পূর্বদিগন্তে সূর্য ওঠেছে রক্ত লাল রক্ত লাল’ ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’ ইত্যাদি জনপ্রিয় দেশের গানগুলো, যা শক্তি দিয়েছিল দেশপ্রেমিক বাঙালিকে, সাহস দিয়েছিল মুক্তিকামী যোদ্ধাদেরকে। দেশ স্বাধীন হবার পরপরই তার লেখা ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ গানটি যেন বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের আত্মার ধ্বনি হয়ে ওঠে। বীর শহীদদেরকে আপাময় বাঙালি শ্রদ্ধা জানাবার ভাষা খুঁজে পায় তার এই গানে। একাত্তর সালের যুদ্ধাবস্থায়ও গোবিন্দ হালদার তার নতুন প্রেরণদায়ক গানগুলো নিয়ে বিশেষ ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, যুদ্ধরত ও যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। মুক্তিকামী বাঙালির কাছে।

 

হালদার ১৯৩০ সালে ভারতের বনগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। বনগাঁওয়ে স্কুলজীবন শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তিতে তিনি ভারতের আয়কর বিভাগে চাকরি নেন এবং ১৯৮৮ সালে সেখান থেকে অবসর গ্রহণ করেন। প্রায় ৩,৫০০ সেমি-ক্লাসিক, বাউল, গণসঙ্গীত, আধুনিক গান এবং কীর্তন তিনি লেখেছেন। মেয়ে গোপা হালদারের মতে, প্রায় ৩,০০০ গান তার আজও অপ্রকাশিত। অনেক কবিতাও তার অপ্রকাশিত। অর ইন্ডিয়া রেডিও এবং দূরদর্শন তার কিছু গান প্রকাশ করেছে। ‘দূর দিগন্তে’ (১৯৮৯) নামে তার একটি কাব্য সংকলন বের হয়ে ছিল এবং ৫০০ কপির প্রায় সবগুলোই বিক্রি হয়েছিল। জানা যায়, অর্থাভাবে আর পুনর্মুদ্রন করতে পারেন নি।

 

কিডনি সমস্যা নিয়ে গত ২০১৫ সালের ১৩ ডিসেম্বরে  কলকাতার জিতেন্দ্র নারায়ণ রয় পলিক্লিনিকে ভর্তি হন ৮৪ বছরের স্বদেশপ্রেমী গীতিকার গোবিন্দ হালদার। একমাসেরও বেশি সময় সেখানে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত বছর (২০১৫ এর ১৭ জানুয়ারি) মৃত্যুবরণ করেন বাংলাদেশের এই অকৃত্রিম বন্ধু।

 

গত ডিসেম্বরে ভারত সফরের সময় আমাদের রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। আমাদের রাষ্ট্রপতি তাকে এই বলে সম্মান প্রদর্শন করেন: “তিনি আমাদেরই একজন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন সাহসী যোদ্ধা ছিলেন।” অসুস্থতার খবর শুনে আমাদের প্রধানমন্ত্রীও তাকে ফোন করেছিলেন এবং তার চিকিৎসার যাবতিয় দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন মতাদর্শের সরকারগুলো তাকে যথাযথ মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হলেও, ২০১২ সালে স্ট্যান্ডিং ওভেশন সহকারে তাকে স্বাধীনতা-উত্তর সনদ প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার। ফ্রেন্ডস অভ লিবারেশন ওয়্যার এওয়ার্ড নিতে অবশ্য তিনি আসতে পারেন নি, শারীরিক কারণে। তার কন্যা গোপা হালদার এসেছিলেন।

 

অনেক সাধারণ জীবনযাপন ছিল গোবিন্দ হালদারের। অসাধারণেরা আমজনতার কাছে এমনই ‘সাধারণ’ ছিলেন চিরকাল। এজন্যই হয়তো তার নামটি তত বিস্তৃতি পায়নি এই স্বাধীন বাংলাদেশে। কিন্তু তার অমর গানগুলো যতবার উচ্চারিত হবে দিগন্তে, ততবার মনে পড়বে সুরকার ও গীতিকার গোবিন্দ হালদারের কথা। শ্রদ্ধাঞ্জলি!

 

[“তিনি ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি কলকাতায় মারা যান।” দেখতে দেখতে একটি বছর হয়ে গেলো!]

————————–

তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্টারসহ বিভিন্ন বাংলা পত্রিকা।

অ্যামনেস্টি কী লেখেছে তা কি অ্যামনেষ্টি জানে!

একাত্তরের মার্চ থেকে সংঘটিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনির সুপরিকল্পিত হত্যাকে গণহত্যা বলতে রাজি ছিল না কিছু পশ্চিমা দেশের জনপ্রতিনিধি। যদিও তাদের দেশের মানুষগুলো ছিল বাঙালির পক্ষে, তারা নিজ দেশের জনগণের মনকে বুঝতে পারে নি। গণহত্যাকে সচেতনভাবেই অস্বীকার করা হয়েছে, কারণ গণহত্যাকে স্বীকার করার মানে হলো বাংলাদেশকে স্বীকার করা। কাজেই এটি ছিল তাদের রাজনৈতিক অবস্থান। অপরদিকে এটি ছিল বাঙালির অস্তিত্বের বিষয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে আজ চুয়াল্লিশ বছর। ‘কারও সাথে শত্রুতা নয় – সকলের সাথে বন্ধুত্ব’ নীতি প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ একটি শত্রুতামুক্ত বৈশ্বিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছে। একই প্রক্রিয়ায় যোদ্ধাপরাধের বিচার সম্পন্ন করে বাংলাদেশ যখন ভবিষ্যতমুখী হবার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই সেই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী একে প্রতিহত করার জন্য মাঠে নেমেছে। পরাজিত পক্ষ এবং তাদের বিদেশী মিত্ররা এমন কিছু বাদ নেই, যা তারা করছে না।

 

মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে অ্যামনেস্টির অবস্থান সকলের কাছেই বোধগম্য, যদিও সকলক্ষেত্রে তারা একইভাবে সরব হতে পারে নি। কিন্তু বাংলাদেশ সম্পর্কে অ্যামনেস্টির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নিজেদের বস্তুনিষ্ঠতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে মনে হয়েছে, এটি তাদের সচেতন বক্তব্য নয়। একাত্তরের গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে তারা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।  তারা ভুলে গেছে নুরেমবার্গ অথবা টোকিওতে সংঘটিত যোদ্ধাপরাধ বিষয়ক ট্রাইবুনালের কথা। যেমন তারা ভুলে যায় ফিলিস্তিন, ইরাক এবং আফগানিস্তানের গণহত্যার কথা। এভাবে তারা তাদের মানবাধিকারের স্লোগানকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেছে।

 

‘আন্তর্জাতিক মান’ নিয়ে একটি আপ্তবাক্য বারবার তুলে ধরা হচ্ছে, কোন ব্যাখ্যা বা যুক্তি ছাড়াই। ‘আন্তর্জাতিক মান কী’ তা আজও কেউ বলতে পারে নি। মজার ব্যাপার হলো অ্যামনেস্টিও একইভাবে কোন দিকনির্দেশনা ছাড়াই বিচারের ‘আন্তর্জাতিক মান’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দেখা গেছে যে, প্রতিবেদনটি তাদের হলেও এর ভাষা ও ভোকাবুলারি ছিল পরিচিত, যা পরাজিত শক্তিরা আগেই ব্যবহার করে গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক মানের কথা বললে, বিশ্বের অন্যান্য স্থানে সংঘটিত যোদ্ধাপরাধের বিচারের সাথে তুলনা করতে হবে।  সেক্ষেত্রে সামনে আসে নুরেমবার্গ এবং টোকিওর বিচার কার্য। সেই তুলনায় বাংলাদেশের যোদ্ধাপরাধের বিচারকার্যে পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়েছে আসামীপক্ষকে। তারা যেন প্রস্তুতি নিয়ে নিজেদের পক্ষে সাক্ষ্যপ্রমাণ ও যুক্তি দাঁড় করাতে পারে, এর সুযোগ তারা পেয়েছেন। শেষ মুহূর্তে এসে ভুয়া সার্টিফিকেটও দাখিল করার সুযোগ তারা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই যোদ্ধাপরাধের বিচার কাজকে অসহযোগিতা করে এসেছে। সেখানকার জনৈক রাষ্ট্রদূত স্টিফেন র‌্যাপ যোদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়াকে কাছে থেকে যাচাই করেছেন। তার মতে, উভয় পক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ পেয়েছে এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে তিনি পুরোপুরি সমর্থন করে গেছেন।

 

যোদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদেরকে ‘বিরোধী দলীয় নেতা’ হিসেবে পরিচিত করানোকে একটি অপকৌশল বলা যায়। এর উদ্দেশ্য হলো, বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতি সম্পর্কে অবগত নয়, এমন পাঠককে বিভ্রান্ত করা। অথবা, এটি নিতান্তই তাদের অজ্ঞতার পরিচয়। একটি দেশের অভ্যন্তরীন ইতিহাস, সংবিধান, আইন ইত্যাদি পর্যালোচনা না করেই তারা একটি নিবন্ধ লেখে ফেলে।

 

যোদ্ধাপরাধের বিচার একটি জুডিশিয়াল প্রক্রিয়ার বিষয়। এখানে আবশ্যিকভাবেই বাদী-বিবাদীর দ্বন্দ্ব আছে। এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ মতামত থাকবেই। একাধিক আন্তর্জাতিক সংগঠন বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক বিচার সম্পর্কে তাদের উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেছে। অধিকাংশই বস্তুনিষ্ঠতার দাবি রাখে। কিন্তু অ্যামনেস্টির মতো একপাক্ষিক প্রতিবেদন আগে কেউ লেখে নি।

 

স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিরও অপরাধ আছে, একথা বলে অ্যামনেস্টি বুঝাতে চাচ্ছে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শুধু নাৎসি বাহিনি নয়, প্রতিপক্ষ জোটেরও বিচার হওয়া চাই! এ কথা বলে তারা শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের মহান অবদানকেই ছোট করে নি, স্বাধীনতা সংগ্রামকেও অস্বীকার করেছে। প্রশ্ন হলো, এ অভিযোগটি কি তারা সচেতনভাবেই দিয়েছে?

 

এটি ভুলে গেলে চলবে না যে, যোদ্ধাপরাধীর বিচার হয় বিজয়ী শক্তির মাধ্যমে। এখানে যখন স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকেও বিচারের দাবী করা হয়, তখন বলতে হয় যে, অ্যামনেস্টি কী বলছে তারা তা বুঝতে পারছে না। মুক্তিযোদ্ধাদের বিপক্ষে সুস্পষ্টভাবে অভিযোগ দিয়ে অ্যামনেস্টি একটি রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছে, যা কোন মানবাধিকার সংগঠনের জন্য অনাঙ্ক্ষিত।

 

প্রশ্ন হলো, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কীভাবে এত আত্মবিশ্বাস পায়। কীভাবে তারা একটি সার্বভৌম দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারে? কীভাবে তারা একটি দেশের জনগণের অনুভূতিকে আঘাত করে প্রতিবেদন লেখতে পারে? কোথায় তাদের ভিত? তার আগে প্রশ্ন করতে হবে, দেশের মৌলিক ইস্যুতে আমাদের রাজনীতিবিদেরা কি কখনও ঐকবদ্ধ হতে পেরেছেন? এসব প্রশ্নের সদোত্তর মিলবে না, কারণ এদেশের রাজনীতিতে এমন পক্ষও আছে যারা যেকোন মূল্যে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চায়। জনগণের জন্য রাজনীতি যেন শুধুই বক্তৃতার বিষয়। যোদ্ধাপরাধের বিচারের আয়োজন যারা করছেন, তারাও কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য/উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাদের নেই? তা যদি না হতো, তবে অ্যামনেস্টির মতো ভিনদেশি এই প্রতিষ্ঠান আজ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন লেখতে পারতো না।

গীতিকার গোবিন্দ হালদার: A Tribute

180115.pptx-crop

মুক্তিযুদ্ধের একটি সময়ে এরকম নিয়ম হলো যে, বিদেশী লেখক বা শিল্পীর গান স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রে পরিবেশন করা হবে না। ঠিক এভাবেই নিভৃতাচারি গোবিন্দ হালদারের নামটি আরও নিভৃতে হারিয়ে যায়। তার পূর্বে বেশ কিছুদিন তার রক্ত-গরম-করা গানগুলো স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রে পরিবেশিত হয়েছিল। ওই নীতিমালা গ্রহণের পর তার নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। এমনকি বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরও মুক্তিযুদ্ধে অবদানকারীদের তালিকায় তার নামটি থাকে নি। গোবিন্দ হালদারকে বাঙালী কেন তেমনভাবে জানে না, এই হলো দ্য ডেইলি স্টার থেকে প্রাপ্ত তথ্য।

এরপরের সরকারগুলো আর গোবিন্দ হালদারকে তেমনভাবে স্মরণ না করলেও, স্বাধীন বাংলাদেশের বেতার তার সাথে পরবর্তিতে একটি চুক্তি করে। কিন্তু চুক্তিমতো তিনি নিয়মিত গীতিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তার গানগুলো গাওয়া হলেও এর রয়্যালটি তিনি পুরোপুরি পান নি। “তারা আমাকে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত খরচের ভাউচার পাঠিয়েছে, আমি সইও করেছি।  তথাপি আমার ন্যায্য পাওনা থেকে আমি বঞ্চিত হয়েছি।” ১৯৮৫ সালের তারকালোকে প্রকাশিত তার নিবন্ধ থেকে উদ্ধৃত।

তিনি সেই গোবিন্দ হালদার, যিনি লেখেছিলেন- ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলো যারা’ ‘পূর্বদিগন্তে সূর্য ওঠেছে রক্ত লাল রক্ত লাল’ ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’ ইত্যাদি জনপ্রিয় দেশের গানগুলো, যা শক্তি দিয়েছিল দেশপ্রেমিক বাঙালিকে, সাহস দিয়েছিল মুক্তিকামী যোদ্ধাদেরকে। দেশ স্বাধীন হবার পরপরই তার লেখা ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ গানটি যেন বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের আত্মার ধ্বনি হয়ে ওঠে। বীর শহীদদেরকে আপাময় বাঙালি শ্রদ্ধা জানাবার ভাষা খুঁজে পায় তার এই গানে। একাত্তর সালের যুদ্ধাবস্থায়ও গোবিন্দ হালদার তার নতুন প্রেরণদায়ক গানগুলো নিয়ে বিশেষ ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, যুদ্ধরত ও যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। মুক্তিকামী বাঙালির কাছে।

হালদার ১৯৩০ সালে ভারতের বনগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। বনগাঁওয়ে স্কুলজীবন শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তিতে তিনি ভারতের আয়কর বিভাগে চাকরি নেন এবং ১৯৮৮ সালে সেখান থেকে অবসর গ্রহণ করেন। প্রায় ৩,৫০০ সেমি-ক্লাসিক, বাউল, গণসঙ্গীত, আধুনিক গান এবং কীর্তন তিনি লেখেছেন। মেয়ে গোপা হালদারের মতে, প্রায় ৩,০০০ গান তার আজও অপ্রকাশিত। অনেক কবিতাও তার অপ্রকাশিত। অল ইন্ডিয়া রেডিও এবং দূরদর্শন তার কিছু গান প্রচার করেছে। ‘দূর দিগন্তে’ (১৯৮৯) নামে তার একটি কাব্য সংকলন বের হয়ে ছিল এবং ৫০০ কপির প্রায় সবগুলোই বিক্রি হয়েছিল। জানা যায়, অর্থাভাবে আর পুনর্মুদ্রণ করতে পারেন নি।

কিডনি সমস্যা নিয়ে গত ১৩ ডিসেম্বরে  কলকাতার জিতেন্দ্র নারায়ণ রয় পলিক্লিনিকে ভর্তি হন ৮৪ বছরের স্বদেশপ্রেমী গীতিকার গোবিন্দ হালদার। একমাসেরও বেশি সময় সেখানে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত ১৭ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন বাংলাদেশের এই অকৃত্রিম বন্ধু।

গত ডিসেম্বরে ভারত সফরের সময় আমাদের রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। আমাদের রাষ্ট্রপতি তাকে এই বলে সম্মান প্রদর্শন করেন: “তিনি আমাদেরই একজন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন সাহসী যোদ্ধা ছিলেন।” অসুস্থতার খবর শুনে আমাদের প্রধানমন্ত্রীও তাকে ফোন করেছিলেন এবং তার চিকিৎসার যাবতিয় দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন মতাদর্শের সরকারগুলো তাকে যথাযথ মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হলেও, ২০১২ সালে স্ট্যান্ডিং ওভেশন সহকারে তাকে স্বাধীনতা-উত্তর সনদ প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার। ফ্রেন্ডস অভ লিবারেশন ওয়্যার এওয়ার্ড নিতে অবশ্য তিনি আসতে পারেন নি, শারীরিক কারণে। তার কন্যা গোপা হালদার এসেছিলেন।

অনেক সাধারণ জীবনযাপন ছিল গোবিন্দ হালদারের। অসাধারণেরা আমজনতার কাছে এমনই ‘সাধারণ’ ছিলেন চিরকাল। এজন্যই হয়তো তার নামটি তত বিস্তৃতি পায়নি এই স্বাধীন বাংলাদেশে। কিন্তু তার অমর গানগুলো যতবার উচ্চারিত হবে দিগন্তে, ততবার মনে পড়বে সুরকার ও গীতিকার গোবিন্দ হালদারের কথা। শ্রদ্ধাঞ্জলি!

————————–

তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্টারসহ বিভিন্ন বাংলা পত্রিকা।

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

https://d19tqk5t6qcjac.cloudfront.net/i/412.html

সংখ্যা লঘু সমাচার

সংখ্যা লঘু সংখ্যা লঘু
শুনবো কত আর
সংখ্যা গুরু আছেন যারা
করছেন কিছু তার?

ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে
সকলেরে ভালোবেসে
ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাতেই
শান্তি আসে দেশে।

ধর্মের নামে বিভাজনে
স্বার্থ আছে যাদের
চলুন সবাই সোচ্চার হই
থামিয়ে দিই তাদের।

 

 

শব্দনীড়ে পাঠক প্রতিক্রিয়া ================================

১৬ টি মন্তব্য (লেখকের ৮টি) | ৭ জন মন্তব্যকারী

  1. চারুমান্নান : ০৬-০৩-২০১৩ | ১৬:১৭ |

    দারুন ছড়া কবি ভাই,,,,,,,,,,,,,,,,
    সময়োপযোগী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

    • মাঈনউদ্দিন মইনুল : ১৬-০৩-২০১৩ | ৮:২৭ |

      হাহাহা! অনেক ধন্যবাদ প্রিয় কবি চারুমান্নান ভাই।

      এখানে একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে আমার — এটি ড্রাফ্ট হিসেবে সংরক্ষণ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরে দেখলাম প্রকাশ হয়ে গেছে। আরও শিখতে হবে শব্দতরীর নিয়মকানুনগুলো।

      তবু অনুপ্রেরণার জন্য কৃতজ্ঞতা!

  2. মোঃ খালিদ উমর : ০৬-০৩-২০১৩ | ১৬:৫৪ |

    দারুণ লিখেছেন দাদা!

  3. শাহেদ শফিক : ০৬-০৩-২০১৩ | ১৭:০৮ |

    ‘চলুন সবাই সোচ্চার হই
    থামিয়ে দিই তাদের।’
    খুব ভালো লাগলো।

    • মাঈনউদ্দিন মইনুল : ১৬-০৩-২০১৩ | ৮:২৮ |

      ভাই শাহেদ শফিককে অনেক ধন্যবাদ সুন্দর মন্তব্যের জন্য।

  4. তীর্যক নীল : ০৬-০৩-২০১৩ | ১৭:২০ |

    “ধর্মের নামে বিভাজনে
    স্বার্থ আছে যাদের
    চলুন সবাই সোচ্চার হই
    থামিয়ে দিই তাদের।”

    ভুলে যায় তারা ক্ষমতায় এসে
    আমরা কেন চোখের জলে ভাসি,
    ক্ষমতার মসনদে বসে
    তারা হাসেন তৃপ্তির হাসি।

    …………………………………
    তাদের থামাতে যদি হই সোচ্চার
    একটাই ট্যাগ আমরা রাজাকার।

    • মাঈনউদ্দিন মইনুল : ১৬-০৩-২০১৩ | ৮:৩১ |

      “ভুলে যায় তারা ক্ষমতায় এসে
      আমরা কেন চোখের জলে ভাসি,
      ক্ষমতার মসনদে বসে
      তারা হাসেন তৃপ্তির হাসি।”

      শতভাগ একমত। এদের কাছে রাজনীতি প্রথমে, জনগণ দ্বিতীয়।

  5. সাঈদ মোহাম্মদ ভাই : ০৬-০৩-২০১৩ | ১৮:৩৫ |

    এ যে নতুন মইনুল ভাইকে চিনলাম।

    ধর্মের নামে বিভাজনে
    স্বার্থ আছে যাদের
    চলুন সবাই সোচ্চার হই
    থামিয়ে দিই তাদের।

    এই থামিয়ে দেয়ার থিউরিটাই একেক জনের কাছে একেক রকম। মাঠের খেলা দেখে আমার কাছে তাই মনে হচ্ছে।

    • মাঈনউদ্দিন মইনুল : ১৬-০৩-২০১৩ | ৮:৩৩ |

      “এই থামিয়ে দেয়ার থিউরিটাই একেক জনের কাছে একেক রকম। মাঠের খেলা দেখে আমার কাছে তাই মনে হচ্ছে।”

      হাহাহা, কথা সইত্য। আমার মনে হয়, সকলেই থামিয়ে দিতে চায় না।

      ছড়াটি ড্রাফট হিসেবে রেখেছি বলে বিশ্বাস করেছিলাম — পরে দেখি প্রকাশ হয়ে গেছে।

      অনুপ্রেরণার জন্য কৃতজ্ঞতা, প্রিয় সাঈদ মোহাম্মদ ভাই!

  6. মুরুব্বী : ০৬-০৩-২০১৩ | ১৮:৫২ |

    পূর্ণ সহমত স্যার।

    • মাঈনউদ্দিন মইনুল : ১৬-০৩-২০১৩ | ৮:৩৪ |

      ‘পূর্ণ সহমতের’ জন্য ধন্যবাদ প্রিয় মুরুব্বী।
      শুভ কামনা রইলো আপনার জন্য!

  7. ইব্রাহীম রাসেল : ০৬-০৩-২০১৩ | ১৯:০১ |

    –একমত আপনার কবিতার সাথে। ভালো লেগেছে।–

  8. শাহেদ শফিক : ০৮-০৩-২০১৩ | ১৯:৩৮ |

    ‘ধর্মের নামে বিভাজনে
    স্বার্থ আছে যাদের
    চলুন সবাই সোচ্চার হই
    থামিয়ে দিই তাদের।’

    এ সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।

    • মাঈনউদ্দিন মইনুল : ১৬-০৩-২০১৩ | ৮:৩৬ |

      “এ সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।”

      দ্বিতীয় মন্তব্যটির জন্য আবারও ধন্যবাদ। এটি সময়ের দাবি।
      শুভেচ্ছা রইলো!

জেমস বার্ক এবং ১৯৫৪ সালের বাংলাদেশ

১৯৫৪ সালের এক ঈদের দিনে ঢাকার রাস্তা।

১৯৫৪ সালের এক ঈদের দিনে ঢাকার রাস্তা।

এক) কাল্পনিক টাইম মেশিনে দেড়’শো বছর পূর্বের বঙ্গদেশ দেখার সুযোগ পেলে কী করবেন? প্রায় এরকমই একটি অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। বাংলাদেশের সুদূর অতীত এবং গোড়ার ইতিহাস আছে ব্রিটিশদের সাথে যুক্ত থাকার কারণে কিছু সুবিধা আমরা পাচ্ছি। ওই সময়টিতে যেসব ব্রিটিশ পর্যটক বা সাংবাদিক এদেশ ভ্রমণ করেছে, তাদের পুরাতন এলবামগুলো পেলে কেমন হয়? ঠিক এমনটাই হয়েছে। প্রায় দু’শো বছরের বাঙালির ইতিহাস নিয়ে সাদাকালো আলোকচিত্রের সন্ধান মিলেছে। অতীত-বিলাসী আমি যেন খনির সন্ধান পেলাম! পাঠকের জন্য শুধু ১৯৫৪ সালের কয়েকটি ছবি নিচে উল্লেখ করলাম। ব্রিটিশ সাংবাদিক জেমস বার্কের তোলা ছবিগুলো চুয়ান্ন সালের ঈদের ছবি। যারা ইতোমধ্যেই তাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিয়েছেন, তারা জানেনই। বাকিটুকু নিচের উল্লেখিত সূত্র ধরে যে কেউ খুঁজে নিতে পারেন।

১৯৫৪ সালের বাংলাদেশ, অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান, ছিলো ভাষা আন্দোলন এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে তখন সোচ্চার। একটি রাজনৈতিক অস্থিরতার বছর। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে গঠিত যুক্ত ফ্রন্ট প্রাদেশিক নির্বাচন বিজয়ী হয়। যদিও গভর্নর গোলাম মোহাম্মদ যুক্তফ্রন্টের শাসনকে বেশি দিন স্থায়ি দেন নি, তবু সময়টি ছিলো তাৎপর্যপূর্ণ।

.

১৯৫৪ সালের বাংলাদেশ (পূর্ব পাকিস্তান): 

রিকশায় সন্তানসহ এক দম্পতি।

রিকশায় সন্তানসহ এক দম্পতি।

চুয়ান্ন (১৯৫৪) সালের ঢাকার রাস্তা

চুয়ান্ন (১৯৫৪) সালের ঢাকার রাস্তা

 

 

ঢাকায় চায়ের দোকান

ঢাকায় চায়ের দোকান

 

ঈদের দিনের রাস্তা।

ঈদের দিনের রাস্তা।

 

ফটোগ্রাফার ও ব্রিটিশ সাংবাদিক জেমস বার্ক ঈদের মাঠে কুলাকুলি করছেন, ঢাকা।

ফটোগ্রাফার ও ব্রিটিশ সাংবাদিক জেমস বার্ক ঈদের মাঠে কুলাকুলি করছেন, ঢাকা।

.

.

.

দুই) জেমস বার্ক (২২ ডিসেম্বর ১৯৩৬) একজন বিজ্ঞান-বিষযক ইতিহাসবিদ এবং টেলিভিশন প্রযোজক। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে রম্য প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করে তিনি সুনাম কুড়িয়েছেন। ১৯৫৩ সালে নেপাল এবং ১৯৫৪ সালে বাংলাদেশে অবস্থান করে জেমস বার্ক এভারেস্ট জয়ের তথ্য এবং তৎকালীন বাংলাদেশ-এর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির আলোকচিত্র সংগ্রহ করে উপমহাদেশের ইতিহাস সংরক্ষণে বিশেষ অবদান রাখেন।

.

জেমস বার্কের সাম্প্রতিক ছবি।

জেমস বার্কের সাম্প্রতিক ছবি।

তিনি বিবিসি’র একজন প্রতিবেদক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন এবং টুমরো’র ওয়ার্ল্ড নামে একটি বিজ্ঞান বিষয়ক ধারাবাহিক পরিচালনা করেন। বিবিসি’র পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক চাঁদে অবতরণের ঘটনার (১৯৬৯) প্রধান সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জেমস বার্ক। ১৯৮৫ সালে বিবিসিতে ‘যেদিন বিশ্ব বদলে গেলো’ শিরোনামে ডকুমেন্টারি সিরিজ পরিচালনা করেন। ‘কানেকশনস’ তার বেস্টসেলিং গ্রন্থ। জেমস বার্ক নর্দান আয়ারল্যান্ডের লন্ডনডেরিতে (যুক্তরাজ্য) জন্মগ্রহণ করেন এবং বর্তমানে লন্ডনে বাস করছেন।

.

জেমস বার্কের ক্যামেরায় এভারেস্ট বিজয়ী এডমান্ড হিলারি এবং টেনজিং মরগে (১৯৫৩)।

জেমস বার্কের ক্যামেরায় এভারেস্ট বিজয়ী এডমান্ড হিলারি এবং টেনজিং মরগে (১৯৫৩)।

.

.

তথ্যসূত্র:

১) টাইমস হিস্টরি:  http://life.time.com/history/

২) বাংলাদেশ প্রাচীন আলোকচিত্র সংগ্রহশালা: https://www.facebook.com/bd.old.photo.archive

৩) জেমস বার্কের সংক্ষিপ্ত জীবনী: কেমার্কমিডিয়া ডট কম

৪) জেমস বার্কের ডকুমেন্টারি দেখতে চাইলে: http://topdocumentaryfilms.com/james-burke-connections/

অবশেষে রাজনৈতিক পক্ষ নিলেন ডক্টর ইউনূস!

Capture31

দারিদ্র্যকে যাদুঘরে পাঠাবার মতো দৃঢ় মনোবল এবং ইতিবাচক মানসিকতা থাকা সত্ত্বেও বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ যে দারিদ্র্য-বিমোচনে ঈর্ষনীয় সাফল্য অর্জন করেছে, তাতে এই অর্থনীতিবিদের বিশেষ কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় নি। এ বিষয়ে তিনি খুশি বা অখুশি, তাও বুঝা যায় নি। প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীর বিচার ইত্যাদি ইস্যুতে তিনি রহস্যজনকভাবে নিশ্চুপ ছিলেন। এটি নিয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সমালোচনার ঝড় ওঠেছিলো। কিন্তু রাজনৈতিক ইস্যুতে তার একটি নিরপেক্ষ ইমেজ থাকার কারণে এক সময় কেউ আর উচ্চবাচ্য করে নি। যদিও যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাওয়া ও কোন দলীয় বিষয় নয়। গ্রামীণ ব্যাংক ইস্যুতে সরকারের তীব্র সমালোচনা করলে, কেউ তা রাজনৈতিকভাবে বিশ্লেষণ করেন নি। গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে সরকারের মারমুখী আচরণে দেশের অধিকাংশ মানুষ বরং সরকারের সমালোচনাই করেছে, আজও করছে। এর প্রধান কারণ হলো, জনগণ তাকে একজন নির্দলীয় এবং দেশের আপাময় জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই দেখতো।

এখন ভিন্ন পরিস্থিতি। বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অবশেষে রাজনৈতিক পক্ষ গ্রহণ করলেন। বস্তুত তার আর নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ ছিলো না, কেউ বিশ্বাসও করতো না। গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে সরকারের সাথে চলমান টানাহেঁচড়ায় তাকে প্রতিশোধপরায়ন করে তুলেছে এবং এতে কারও দোষ দেওয়ারও সুযোগ নেই।

আড়ালে আবডালে একটি মতাদর্শে দুর্বলতা থাকলেও এবার অনেকটা আকষ্মিকভাবেই তিনি রাজনৈতিক বিষয়ে তার নিরবতা ভেঙ্গেছেন। একসাথে দু’টি বোমা তিনি ফাটিয়েছেন চরম পক্ষপাতদুষ্ট মন্তব্য দিয়ে। সরকারি দলটি নিজেই অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরেছে বিগত সাড়ে চার বছরে। কিন্তু ডক্টর ইউনূসের যুক্তিটি বেশ হাস্যকর: ‘গ্রামীণ ব্যাংককে যারা ধ্বংস করেছে তাদের হাতে দেশের দায়িত্ব দেওয়া যায় না।’ অর্থাৎ, গ্রামীণ ব্যাংক চালাতে ব্যর্থ যে, সে দেশ চালাতেও ব্যর্থ। একথা দিয়ে তিনি রাজনৈতিকভাবে সরকারি দলের বিপক্ষে অবস্থান নেন।

তার দ্বিতীয় বক্তব্যটি হলো, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া দেশের গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে না। এ বিবৃতিটি তিনি গতকাল দিয়েছেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সাথে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে। একই দাবিতে বিরোধী দল দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। হয়তো, সরাসরি বিএনপি বা জামাতের পক্ষাবলম্বন করা শোভন নয় বলে তিনি অপেক্ষাকৃত মাঝামাঝি পর্যায়ের একটি দলকে বেছে নিলেন। ফলে এর মধ্য দিয়ে বিরোধী দলের আন্দোলনকে তিনি সমর্থন জানালেন।

প্রথম বক্তব্য দিয়ে ডক্টর ইউনূস একটি রাজনৈতিক অবস্থান সৃষ্টি করলেন, যা সরাসরি সরকারি দলের বিপক্ষে। দ্বিতীয় বক্তব্যটি দিয়ে সুস্পষ্টভাবে তিনি বিরোধী দলের পক্ষ গ্রহণ করলেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী এবং গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা এখন থেকে রাজনৈতিকভাবে একটি দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেন, যা আগামি দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে। নতুন পরিচয়টি তার পূর্বের পরিচয়ের চেয়ে অনেক সংকীর্ণ হলেও এর তাৎপর্য আছে। এখন সময়ই বলে দেবে, এই অবস্থান নিয়ে তিনি কতটুকু মাইলেজ পাবেন তার নিজের এবং তার প্রতিষ্ঠানের জন্য।

.

.

[প্রিয় ডট কমে প্রথম প্রকাশ: ২৩ অগাস্ট ২০১৩]

অভিনন্দন জানাবার মতো মানসিক স্বস্তি পাচ্ছি না আজ। বন্ধুগণ ক্ষমা করো!

Capture28

অভিনন্দন জানাবার মতো মানসিক স্বস্তি পাচ্ছি না আজ। যখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সনদটি তিনি পেয়েছিলেন, তখন সমগ্র জাতির সাথে খুশিতে আত্মহারা হয়েছি। এরপর অনেক পুরস্কার অনেক সনদ। যখন তিনি এনজিও পরিচালনার কায়দায় রাজনীতির মাঠ গরম করতে চাইলেন, তখনও ভেবেছি তিনি সফল হবেন। এবং স্বাগত জানিয়েছি। নোংরা রাজনীতির শিকার হয়ে যখন নিজের গড়া প্রতিষ্ঠানকে বিতাড়িত হলেন, তখন সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছি। তার প্রতিটি কথায় শক্তি পেয়েছি – উদ্ধৃতি করেছি বিভিন্ন জায়গায়। তার কোন কিছুতেই নেতিবাচক কিছু দেখি নি। কিন্তু গণজাগরণ ও তরুন বিপ্লব, অতঃপর বাঙালির অস্তিত্ব নিয়ে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ। প্রবল ভূমিকম্পে যেমন ভূগর্ভস্থ প্রাণীসকল বের হয়ে যায়, তেমনি দেশের শত্রু-মিত্র-দালাল-মোসাহেব বের হয়ে গেলো নিমিষে! সমীকরণ বদলে গেলো! এবার যখন একই ব্যক্তির নামে আরেকটি সেরা পুরস্কারের খবর ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে-বাতাসে, ঠিক উচ্ছ্বসিত হবার মতো জোর পাচ্ছি না মনে। বোধ হয়, স্বদেশ প্রেমে ঘাটতি আছে আমার। বন্ধুগণ, ক্ষমা করো!

 

২০ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে প্রিয় ডট কমে প্রকাশিত: