Category: কর্মজীবন

কর্মসংস্থান: পৃথিবী ভিতুদের জন্য নয়…নিয়ম ভাঙ্গুন, চাকরি ধরুন!

কর্মসংস্থান নিয়ে অনেক দিন কিছু লেখা হচ্ছে না। এদিকে অনেক কথা জমে আছে পেটে! চাকুরির বাজারটা ক্রমেই ‘ট্রিকি’ হয়ে আসছে। চাকুরি প্রত্যাশী এবং চাকুরি দাতা উভয়েই এখন মহাসংকটে! আস্থার সংকট তো আছেই, চিরাচরিত সংকট হিসেবে আছে একে অপরকে না বুঝার সংকট। এটি যেন আকারে-প্রকারে শুধুই বড় থেকে বিকটতর হচ্ছে। এরকম একটি কঠিন সময়ে আমি প্রশাসন থেকে বিযুক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠানের মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগে এসে ল্যান্ড করলাম। এ বিষয়টি এর আগে প্রশাসনেরই অংশ ছিল। নতুন বোতলে পুরাতন জুস আর কী! সবই কর্তার ইচ্ছা!

আস্থার সংকটটি বুঝতে পারা যায় যখন বিধি মোতাবেক সমস্ত শর্ত মেনে আবেদন করার পরও ইন্টারভিউ কলটি আসে না। অথবা ইন্টারভিউ পর্যন্ত মোটামুটি ভালো করেও যখন, পরবর্তিতে কোন খবর আসে না, তখনই বুঝা যায় উভয়ের মধ্যে আস্থার অভাব আছে। এসময়ের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হলো, রেফারেন্স ছাড়া চাকরি না হওয়া। অথবা প্রথম ব্যক্তিটিকে ডিঙ্গিয়ে দ্বিতীয় তৃতীয় বা চতুর্থ এমনকি দশম ব্যক্তিটিকে চাকরি দেওয়া।

একে অন্যকে না বুঝার ব্যাপারটি আরও স্বাভাবিক – তবে দুঃসহনীয়। দু’টি পক্ষ অত্যন্ত আনুষ্ঠানিক পরিবেশে প্রার্থী নির্বাচন বা ‘চাকরিটি পাইতেই হবে’ – এরকম চাপ নিয়ে রোবটিক আলোচনায় লিপ্ত হলে, এখানে ‌’আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ না হবারই কথা। প্রথাগতভাবে ‘না বুঝার পরিস্থিতিটি’ সৃষ্টি করেন নিয়োগকর্তা এবং এর কুফল ভোগ করেন উভয়ই। এরকম পরিস্থিতিতে চাকরি প্রার্থী আত্মবিশ্বাসী হলে, পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে নিয়ে আসতে পারেন।

 

একটি কেইস স্টোরি শেয়ার করছি। রাইসুল হাসান স্বভাবত উগ্র না। কিন্তু একটি সিনিয়র পদে চাকরির ইন্টারভিউতে সে বুঝতে পারে নিয়োগকর্তাদের কথায় কোন ফাঁক আছে। ইন্টারভিউয়ারদের সামনে বসেই সে রাগে ফুঁসতে থাকে। সে সমস্ত নির্দেশ অনুসরণ করেছে এবং প্রত্যাশিত যোগ্যতার প্রায় সবগুলোই তার শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার সাথে মিলে গেছে। টেস্টেও সে ভালো করেছে। তবু ইন্টারভিউয়ারদের একজন তাকে যা বললেন, তা হাসান মেনে নিতে পারছে না। ‘মি. হাসান, ফ্রাংকলি স্পিকিং… আপনার এভরিথিং ওকে। কিন্তু কিছু বিষয় আমাদেরকে প্রসিড করতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’ কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে হাসান করণীয় নির্ধারণ করে। হাসান জানে, চাকরিটা তার এমনিতেই হচ্ছে না। তাই রাগের মাথায় রাইসুল হাসান বেশকিছু প্রশ্ন করে বসলেন নিয়োগকর্তাদের নাক বরাবর! প্রশ্নগুলোর অধিকাংশই প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি, কাজের ধরণ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কিত প্রশ্নগুলো স্বভাবতই কিছুটা আক্রমণাত্মক এবং স্পর্শকাতর হয়ে যায়। আর তাতে ‘ডিফেন্স’ করতে এগিয়ে আসেন বোর্ডের নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকা ভদ্রলোকটি। হাসান ধারণা করেছে, তিনিই হবেন প্রতিষ্ঠানের সিইও, কারণ উত্তরগুলো খুবই জুতসই এবং দায়িত্বশীল হচ্ছে। আইসব্রেকিং পর্ব শেষ! আস্তে আস্তে ইন্টারভিউর গোমট পরিবেশ হালকা হয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থায় চলে আসে। অন্যান্য ইন্টারভিউয়াররা ক্রমে কক্ষ ছাড়তে থাকেন। সিইও তার দুপুরের খাবার পিছিয়ে দেন। প্রায় দু’ঘণ্টার আলাপচারিতার বিস্তারিত সকল তথ্য এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। প্রাসঙ্গিক হলো, নিয়মভঙ্গ করে হাসান সেদিন রোবটিক আলোচনাকে ‘মানবিক সমঝোতায়’ রূপ দেয়। প্রশ্ন-উত্তর আর প্রতিপক্ষ-মুখী জিজ্ঞাসাবাদকে সমঝোতামুখী সংলাপে পরিণত করে। হাসানকে সাহায্য করেন প্রতিষ্ঠানের সিইও নিজে। রাইসুল হাসানের সরল কিন্তু তীক্ষ্ণ ও প্রত্যক্ষ প্রশ্নগুলোকে কর্তৃপক্ষ সততা ও পেশাদারিত্বের চিহ্ন হিসেবে দেখেছে। সঙ্গতকারণেই এর ফলাফল হাসানের পক্ষে চলে যায়।

রাইসুল হাসানের ঘটনায় অনেক প্রতিষ্ঠিত কিছু প্রথার ব্যতিক্রম হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যে নিয়মটি হাসান লঙ্ঘন করেছে, তা হলো ইন্টারভিউ বোর্ডে বিতর্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা। চাকরির ইন্টারভিউতে একটি প্রতিষ্ঠিত নিয়ম হলো, নিয়োগকর্তাদের সাথে বিতর্ক সৃষ্ট হয় এমন কথা বলা বা এমন প্রশ্ন করা যাবে না। তাতে সব ভেস্তে যাবে। কিন্তু হাসানের ব্যক্তিত্বে এবং কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিলো, যার কারণে প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেও নিজের পক্ষে তা কাজে লাগাতে পেরেছে।

অফিস এবং আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেও নিজের স্বকীয়তা তুলে ধরার বিষয়টি অনেক প্রার্থী মনে রাখতে পারে না। নিজস্বতা তো নেই-ই, নিজের সর্বনিম্নটুকু তুলে ধরতে ব্যর্থ হয় অনেকে। এই সমস্যার গোড়া অনেক গভীরে। যেতে হবে আমাদের স্কুলজীবনে, যেখানে নিজস্ব কিছু করা মানেই শিক্ষকের বেত আর মায়ের বকুনি। ইংরেজি অথবা গণিতকে ছোটকাল থেকেই ‘কঠিন বিষয়’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষকের কাছে জিম্মি থেকে আমাদের শিক্ষা জীবন শেষ হয়। তাই ব্যতিক্রম আমরা প্রায় জানি না।

 

এরকম সমাজ ব্যবস্থায় টিকে থাকা এবং নিজেকে অতিক্রম করা খুবই কঠিন। তবু কয়েকটি নিয়ম লঙ্ঘনের দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি। পৃথিবীর যাবতীয় বিধান, নীতিমালা আর চুক্তিনামা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে – চাকরি প্রার্থীর পক্ষে কেবল একজনই থাকে। তাই চাকরি প্রার্থীর পক্ষ থেকে কয়েকটি ব্যতিক্রম তুলে ধরা চেষ্টা করলাম। এগুলোই সব নয় – কেবলই দৃষ্টান্ত:

১) প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ছকে আবেদনপত্র ব্যতিত আর কিছুই গ্রহণযোগ্য হবে না -এনিয়মটি মানতেই হবে এমন নয়। ঘোষিত পদ এবং দায়িত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট ট্রেনিং বা অভিজ্ঞতার সনদ থাকলে তা যুক্ত করা যায়। প্রথম দর্শনই সেরা দর্শন।

২) সিভিতে ‌’আমি’ শব্দটি একদমই ব্যবহার করা যাবে না, এটিও খোঁড়া যুক্তি। চাকরির আবেদন মানেই হলো নিজেকে নিয়ে মার্কেটিং করা। যেখানে ব্যক্তিগত যোগ্যতাই প্রধান নিয়ামক, সেখানে অন্তত ৪/৫বার ‌’আমি’ ব্যবহারে মহাভারত অশুদ্ধ হয় না। আমি ব্যবহার করলে আবেদনপত্রটিকে বরং একটু ‘মানবিক’ দেখাবে। মানবিক হওয়াটা জরুরি। মানুষ যা পছন্দ করে, তার সবই প্রকাশ করতে পারে না! নিয়োগকর্তারা সকলে জানেন না, তারা কিসে সন্তুষ্ট হবেন।

৩) ‘আপনার সমস্ত কাজের/চাকুরির বিবরণ দিন।’ কী দরকার আছে এত কিছু বলার? সমস্ত কর্মজীবনের ইতিহাস তাদেরকে জানিয়ে কী লাভ! তার পরিবর্তে এই কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা/ কর্মসংস্থানের বিবরণ তুলে ধরা যায়।

৪) ‘আগ্রহীদেরকে নিম্নের ঠিকানায় আবেদনপত্র পাঠাতে অনুরোধ করা হলো।’ এভাবে নিয়ম পালন করে অনেকেই তার সিভিখানি প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যক্তির হাতে পৌঁছাতে পারে নি। দোষ দিয়েছে ডাকবিভাগের অথবা নিজ কপালের। পরামর্শ হলো, তাদের নির্দেশিত ঠিকানা ছাড়া আরও কোন সরাসরি পথ আছে কিনা, তা খুঁজে বের করতে হবে। অনেকে নিয়োগকর্তার নামটি সংগ্রহ করে একদম তার নাম উল্লেখ করে আবেদনপত্র পাঠায়। ইন্টানেটের যুগে নাম বেরা করা খুব কঠিন নয়। নিয়োগকর্তা যদি সত্যিই উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে বের করতে চান, তবে বিশেষ মাধ্যমে পাঠানোর কারণে আপনার আবেদনপত্রটি বাতিল হবে না। বরং আলাদা গুরুত্ব পেতে পারে।

৫) ‘অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ প্রার্থীর অযোগ্যতা বলে বিবেচিত হবে।’ হতেই পারে। তবে পরিস্থিতি বুঝে এখানেও কিছু কৌশল খাটানো যায়। কোন রেফারেন্স না দিয়ে নিজের যোগ্যতার বিবরণ দিয়ে এবং কোন পদের উল্লেখ না করে – নিয়োগকর্তাকে একটি ইনফরমাল চিঠি পাঠানো যায়। গৃহীত হলেও চমৎকার, না হলেও প্রার্থীর ফাঁসী হবে না!

৬) ‘আপনার বেতনের ইতিহাস তুলে ধরুন।’ বললেই হলো? সংশ্লিষ্ট পদে তারা কী পরিমাণ বেতন দিয়েছেন, তা কি তারা কখনও জানাবেন? কখনও না। তবে কেন নিজের ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে নেগোশিয়েটিং স্ট্রেংথ কমানো? এসব ক্ষেত্রে মিথ্যা বিবরণ দিলে কিন্তু বুমেরাং হতে পারে। তবে সত্যটি গোপন করা যায়।

৭) ‘আমরা প্রশ্ন করবো, আর আপনি শুধু উত্তর দেবেন’ এরকম একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু নিয়োগকর্তাদেরকে এতো সুযোগ দিয়ে নিজেকে ‘ভেড়া’ বানাবেন না। একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে পরবর্তি প্রশ্নটির জন্য বোকা হয়ে বসে থাকবেন, সেটি না করলেও চলবে। উত্তর দিন, তবে সুযোগমতো প্রশ্নও করুন। অনেক সময় প্রশ্নকর্তাদের মধ্যেও বিরতি থাকে। বিনয়কে অস্ত্র হিসেবে ধারণ করে সেসব বিরতিতে নিজেকে প্রবেশ করাতে হবে। সাধারণত, প্রশ্ন যে করে, চালকের আসনে সে-ই থাকে।

 

ইন্টারভিউ বোর্ডে ‘সবই ঠিক আছে’ বা ‘আমি রাজি’ গায়ে পড়ে এমন মনোভাব দেখানোর চেয়ে নিজের সামর্থ্যটুকু দেখানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে মনে করেন, ইন্টারভিউ বোর্ডে প্রশ্ন বা কোন প্রকার জিজ্ঞাসা করলে তাতে কাজটির প্রতি প্রার্থীর অনীহা প্রকাশ পাবে। অথবা, নিয়োগকারী নাখোশ হতে পারেন। নিয়োগকারীকে খুশি করার চেষ্টা না করে, সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতে হবে। তারা আনন্দ পেতে বসেন নি, উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে পাবার জন্য বসেছেন।

কাজটি পেলেই করবো। নির্বাচিত হলেই ওই বিষয়ে পড়াশুনা শুরু করে দেবো। এরকম শর্তে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে, পছন্দের প্রতিষ্ঠান/কাজটিকে লক্ষ্য করে আগে থেকেই কিছু জেনে রাখাটা বুদ্ধিমানের কাজ। ‘আপনার কোন জিজ্ঞাসা আছে?’ এরকম সুযোগে তখন কার্যকর কিছু জিজ্ঞেস করা যাবে। তাতে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রার্থীর ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পায়। নিয়োগকর্তাদের মনে আস্থার সৃষ্টি হয়। প্রশ্নে ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। উত্তরের মধ্য নয়, প্রশ্নের মধ্য দিয়ে মানুষকে চেনা যায়।

একটি সফলতা পরেরটিকে এগিয়ে নিয়ে আসে। ইন্টারভিউ বোর্ডে বেয়াদবি করার দরকার নেই, সেটি যোগ্যতার অংশ নয়। নিয়োগকারীর প্রশ্ন আক্রমণাত্মক হলেও মনে করতে হবে, এর অন্য কোন অর্থ আছে। রেগে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ সৃষ্টি করলে, সেটি ভালো ফল নিয়ে আসবে না। বরং নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক অনুভূতির সৃষ্টি হবে, যা পরবর্তি প্রচেষ্টায় প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রশ্নের উত্তরে যথাযথ আচরণ করাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর জানতে হবে এমন কোন কথা নেই, সেক্ষেত্রেও নিজেকে ধরে রাখতে হবে। এখানে লজ্জার কিছু নেই। আবার অতি বিনয়কে তারা লাজুক বা অন্তর্মুখী স্বভাব হিসেবে ধরে নিতে পারেন। তাই বিনয়ের অবতার হয়ে জানা বিষয়টিকেও এড়িয়ে গেলে কোন ফল হবে না। একেকটি প্রশ্ন একেটি সুযোগ।

যেকোন প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে আত্মবিশ্বাস একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বায়বীয় বিষয়। মনস্তাত্ত্বিকদের কাছে আত্মবিশ্বাস হলো বিশ্বাসের মধ্যে। আপনি ততটুকুই আত্মবিশ্বাসী যতটুকু আপনি মনে করেন। আরেকটি নিয়ম হলো, আত্মবিশ্বাস কেউ দিয়ে দেয় না, নিজে থেকেই অর্জন করতে হয়।

সমাজে প্রকৃত নেতার খুবই অভাব। কিন্তু আত্মবিশ্বাস নেতৃত্বদানের জন্য প্রধান নিয়ামক। চাকরি প্রার্থীকে মনে রাখতে হবে যে, ইন্টারভিউ বোর্ডে আত্মবিশ্বাস তার যোগ্যতারই অংশ। ওটি না দেখাতে পারলে, উত্তর সঠিক হলেও তা পালে বাতাস পাবে না।

চাকুরির বাজার যেন একটি গ্ল্যাডিয়েটরস থিয়েটার! যোগ্যতা দেখিয়ে চাকরি পাওয়া একটি নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া, তাতে সন্দেহ নেই। বর্তমান চাকরির বাজারটি আরও অমানবিক হয়ে যাচ্ছে। প্রার্থীর প্রচেষ্টা থাকবে মানবিক হবার এবং যতটুকু সম্ভব ঘরোয়া পরিবেশ ফিরিয়ে আনার।

এসব ক্ষেত্রে যেসব বিধি-বিধান বা নিয়ম-নীতি আছে, তার প্রায় সবই নিয়োগকারীর অনুকূলে। বুদ্ধিমান প্রার্থীরা দু’টি কাজ করেন: ১) নিজের মতো করে সেগুলো অনুসরণ করেন অথবা/এবং ২) সুযোগমতো এড়িয়ে চলেন। ভুলে গেছি, ব্যস্ততার কারণে সার্কুলারটি ভালোভাবে পড়ার সুযোগ হয়ি নি অথবা আমি তো কেবল আজই জানলাম – সাথে সাথে আবেদন করলাম। এসব বলেও কিছু বিধান এড়িয়ে যেতে সক্ষম হন অনেক প্রার্থী। প্রার্থীকে শুধু মানবিক হবার চেষ্টা করলেই, অনেক নিয়মকে তিনি এড়িয়ে যেতে পারেন।

 

শেষ কথা: বিষয়টিতে আরও আলোচনার প্রয়োজন আছে। কর্মসংস্থানের মৌলিক সমস্যাগুলো এই পোস্টে পর্যাপ্ত আলোচিত হয় নি। কর্মসংস্থান বা চাকুরি পাবার সাথে জড়িত প্রধান বিষয়গুলো হলো: দক্ষতা, যোগ্যতা এবং ব্যক্তিত্ব। সম্পূর্ণ বেকারত্বের চাপ নিয়ে ভালো চাকুরির জন্য নেগোশিয়েশন করা যায় না। তাই নতুনদের কাছে পরামর্শ হলো, প্রারম্ভিক কোন কাজে যুক্ত হয়ে প্রাথমিক কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা। আত্মবিশ্বাস এবং সংশ্লিষ্ট চাকরিটি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা থাকলে প্রার্থী যেকোন ব্যতিক্রম করতে পারেন। ব্যতিক্রমের লক্ষ্য হতে হবে: মানবিক এবং নৈকট্য সৃষ্টি করা। নিয়মের ব্যতিক্রম করাই যেন একমাত্র লক্ষ্য না হয়।

 

৩ সেপটেম্বর ২০১৪। পাবলিক ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া

Advertisements

ম্যানেজার হিসেবে আপনি কতটুকু দক্ষ?

banner9

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে ড্রিম ম্যানেজার, পর্ব ৯।  ব্যবস্থাপনা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নয় যে, পাশ করার পর আর উন্নয়নের প্রয়োজন নেই।  আইনজীবী চিকিৎসক ইত্যাদি পেশার মতো এখানেও নিরন্তর অধ্যাবসায় প্রয়োজন। পেশাদারিত্ব একটি ব্যক্তিগত দায়। প্রতিটি পদক্ষেপ প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি সম্পর্ককে পর্যালোচনা করতে হয়। এমন একটি পর্যালোচনার জন্য আজকের পর্বটি।

 

নিচের কুইজটি মাত্র দশ মিনিটে ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে একটি চমৎকার মানসিক অবস্থান তৈরি করে দেবে। ম্যানেজারের দক্ষতা সম্পর্কে এই উচ্চতর মূল্যায়নটি একটি ইংরেজি ম্যাগাজিন থেকে পাওয়া। বিষয়গুলো এতোই চিন্তা-জাগানিয়া যে, সহকর্মীদের সাথে শেয়ার না করে পারলাম না।

১. ভালো ব্যবস্থাপক… ক) সিদ্ধান্ত নিতে পারে; খ) সহকর্মীদের সাথে সামাজিক অনুষ্ঠানে সময় দেয়; গ) নিজের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করার জন্য আলোচনা করে।

২. ভালো ব্যবস্থাপক দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করে… ক) কর্মীদের একক কাজের মূল্যায়নে; খ) উর্ধতন কর্মকর্তার প্রত্যাশা পূরণে; গ) সহকর্মীদেরকে প্রশিক্ষণদানে।

৩. একজন ব্যবস্থাপকের প্রাথমিক দায়িত্ব হলো… ক) প্রত্যাশারও বেশি কাজ করা; খ) বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন; গ) সহকর্মীর মাধ্যমে কাজের বাস্তবায়ন।

৪. একজন ব্যবস্থাপকের পক্ষ থেকে যা গ্রহণযোগ্য নয়, তা হলো… ক) সহকর্মীকে সহানুভূতি দেখানো; খ) মেজাজ বিগড়ে যাওয়া; গ) কর্মীদের জন্য ব্যক্তিগত প্রশংসাপত্র তৈরি।

৫. কর্মীদের দায়বদ্ধতা মুহূর্তেই কমে যায় যখন ব্যবস্থাপকেরা… ক) একই মেজাজে থাকেন না; খ) নির্ধারিত সময়ের আগে অফিস ত্যাগ করেন; গ) অফিসের দরজা বন্ধ রাখেন।

৬. নতুন ব্যবস্থাপক হিসেবে প্রথমেই যা করতে হয়, তা হলো… ক) আপনার প্রকল্প থেকে প্রেরণযোগ্য প্রতিটি প্রতিবেদন মনযোগ দিয়ে দেখা; খ) সহকর্মীকে কাজের নির্দেশ (ডেলিগেট) দিতে শেখা; গ) সহকর্মীদের সাথে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারের আয়োজন করা।

৭. আপনার প্রকল্পটি যখন কর্তৃপক্ষের রোষাণলে পড়ে, তখন… ক) ব্যবস্থাপক সকল অভিযোগের ধারক হবেন; খ) সমস্যাটি বের করে সমাধান খুঁজবেন; গ) শান্ত থাকবেন।

৮. ব্যবস্থাপককে অবশ্যই বুঝতে হবে যে... ক) কর্মীরা প্রশংসা এবং স্বীকৃতি পেলে বেশি কাজ করে; খ) কাজ না থাকলে কর্মীদের আগ্রহ কমে যায়; গ) অর্থনৈতিক সুবিধা থাকলে প্রত্যাশার বেশি কাজ করে।

৯. যখন কোন কিছু শেখাতে হয়… ক) অফিসের বাইরে আয়োজন করুন; খ) কর্মীদের চেষ্টা ও শেখার আগ্রহকে পুরস্কৃত করুন; গ) একাধিক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিন।

১০. সহকর্মীরা যখন ভিন্ন একটি উপায়ে কাজটি করতে পারে, তখন… ক) সেটি গ্রহণ করা উচিত, কারণ সহকর্মীদের থেকেও শেখার সুযোগ হয়; খ) এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, কারণ তারা ভুল করতে পারে; গ) পরিস্থিতি অনুযায়ি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

 

skill_test_dreammanager
নম্বর মূল্যায়ন: প্রতিটি সঠিক উত্তরের জন্য ১০ বিবেচনা করুন
৮০-১০০: আপনি একজন দক্ষ এবং অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপক।
৬০-৭০: যেসব ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হয়েছে সেগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করুন।
৬০ এর নিচে: বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবুন, হয়তো ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আপনার উন্নয়ন জরুরি!

ব্যবস্থাপনা একটি সহজ কাজ একথা কেউ কখনও বলে নি। কাজের উন্নয়নের জন্য আমাদেরকে কর্মীর চাহিদা নিয়ে আরও ভাবতে হবে। প্রত্যেক ব্যবস্থাপক তার অধীনস্থ কর্মীর অভিভাবক। তাদেরকে গেঁথে তোলার মধ্যেই রয়েছে তার প্রকল্পের উন্নয়নের সম্ভাবনা।

 

 


আপনার ব্যবস্থাপকীয় দক্ষতা কতটুকু?
[ উত্তর ও পর্যালোচনা ]

১/ক ] সিদ্ধান্ত নিতে হলে সাহসের প্রয়োজন। সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারার জন্য পর্যাপ্ত তথ্য হয়তো আপনার নেই। তাই ভুল হতেই পারে। ভীতু বা দায়িত্ব-এড়িয়ে-চলা নেতাকে কোন কর্মীই পছন্দ বা শ্রদ্ধা করে না।

২/গ ] কর্মীর উন্নয়ন করা ব্যবস্থাপকের প্রধান দায়িত্ব। বাস্তবে দেখা যায়, প্রশিক্ষণের সময় পাওয়া কঠিন। তবু কৌশলে সময় বের করে নিতে হবে, কারণ এটি কর্মীর এমন এক চাহিদা যা পূরণ হলে প্রতিষ্ঠান এগিয়ে যায়।

৩/গ ] কর্তৃপক্ষ চায়, ব্যবস্থাপকের নেতৃত্বে প্রকল্প/দলটি দক্ষতা এবং গতিশীলতার সাথে কাজ করুক। কর্মীকে কাজে সম্পৃক্ত করা মানে হলো দলের সবাই কর্মতৎপর হওয়া। ব্যবস্থাপক যত নিজের কাজে ব্যস্ত, তদারকি ততই দুর্বল এবং দলের কার্যকারীতা ততই কম।

৪/খ ] হতাশ হওয়া খুবই স্বাভাবিক এবং মানবিক। এমন পরিস্থিতির জন্যই ব্যবস্থাপক, কিন্তু মেজাজ বিগড়ে যাওয়া মানসিক অপরিপক্কতার লক্ষণ। আবেগ দমনে রাখতে পারা একটি বড় গুণ এবং কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণের পরিচয়।

৫/ক ] ব্যবস্থাপক যখন একদিন থাকেন খোশমেজাজে, অন্যদিন চরমভাবে ক্ষিপ্ত – এটি কর্মীর মনেও খারাপ ধারণার সৃষ্টি করে। ব্যবস্থাপকের সংযত এবং অভিন্ন আচরণ কর্মীর মনে প্রেরণা যোগায়।

৬/খ ] সুদক্ষ ব্যবস্থাপক নিজেই যখন কাজটি করেন, সেটি হয় সঠিক এবং দ্রুত। সুদক্ষ ব্যবস্থাপকেরা যখন অভিজ্ঞতার অভাবে থাকেন, তখন তারা কর্মীকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করতে পারেন না। নতুন ব্যবস্থাপকের প্রথম কাজ হলো, কর্মীকে কাজের নির্দেশনা দিতে শেখা এবং একই সাথে তাদেরকে শেখানো। এতে তার জন্য ব্যবস্থাপনার কাজটি সহজ হয়।

৭/ক ] পরিস্থিতি খারাপ হয়ে গেলে কাঁধ শক্ত করে দলের দায়িত্ব নিন। সমস্ত তপ্ত বাক্য আপনিই গ্রহণ করুন, এটিই ব্যবস্থাপকের দায়। অধিনস্ত কর্মীকে চাপমুক্ত রাখুন, যেন তারা স্বাভাবিক কাজ চালিয়ে যেতে পারে। ব্যবস্থাপক যখন দায় এড়িয়ে কর্মীর ওপর তুলে দেয়, কর্মীরা তার প্রতি আস্থা, শ্রদ্ধা ও আনুগত্য সবই হারায়।

৮/ক ] প্রশংসা পেতে এবং নিজেদেরকে ‘আলাদা’ ভাবতে সকল কর্মীই পছন্দ করে। কর্মীর কর্মদক্ষতার সর্বোচ্চ সুফল পেতে এরকম পরিস্থিতির খুবই প্রয়োজন। কর্মমুখর পরিবেশ সৃষ্টিতে অবদান রাখা ব্যবস্থাপকের প্রধান কাজ।

৯/গ ] নতুন ধারণা রপ্ত করানোর জন্য প্রশিক্ষণার্থীর বিভিন্ন ইন্দ্রিয়গুলোর ব্যবহার করুন। আপনার বিষয়টিতে তাদেরকে শুনতে দিন, বুঝতে দিন, দেখতে দিন করতেও দিন। সবাই একভাবে শেখে না।

১০/ক ] নতুন কিছু শেখার জন্য মানুষের কোন নির্ধারিত বয়স-সীমা নেই। সহকর্মীর বিশেষ গুণ থেকে শিখলে ব্যবস্থাপকের মান ক্ষুণ্ন হয় না, বরং বাড়ে। একই সাথে কর্মীরও সংশ্লিষ্ট ভালো দিকটি থেকে প্রতিষ্ঠান উপকৃত হয়।

 

লেখাটি প্রজেক্ট ম্যানেজারের পেশাদারিত্বের উন্নয়নে শুধু একটি অধ্যয়ন/অনুসন্ধানের জন্য। কোন উত্তরই অকাট্য/অখণ্ডনীয় হিসেবে বিবেচনার করার জন্য নয়।

 


প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ম্যানেজার/ পূর্বের পর্বগুলো:

▶ পর্ব ৮: পেশাদারিত্বের ৭টি বিষয়

▶ পর্ব ৭: এ দুই রকমের ম্যানেজার থেকে সাবধান থাকুন

▶ পর্ব ৬: ১৩ উপায়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে রাখুন হাতের মুঠোয়!

▶ পর্ব ৫:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনা: পেশাদারিত্ব কার দায়?

▶ পর্ব ৪:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া: পেশাদারিত্বের শুরু

▶ পর্ব ৩:  ৯টি তত্ত্বে প্রকল্পের সংজ্ঞা এবং সহজ কিছু দৃষ্টান্ত

▶ পর্ব ২:  যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনে প্রকল্প আমাদেরকে উপকৃত করে

▶ পর্ব ১:  প্রকল্প ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে

প্রজেক্ট ম্যানেজার: পেশাদারিত্বের ৭টি বিষয়

professionalism-mmmainul

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক, পর্ব ৮। ব্যাকগ্রাউন্ড যা-ই হোক, প্রজেক্ট ম্যানেজারকে পেশাদারিত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে কাজ করতে হয়। প্রজেক্ট ম্যানেজারের পেশাদারিত্ব কীভাবে গড়ে ওঠে এবিষয়ে পঞ্চম পর্বে আলোচনা করা হয়েছে। প্রজেক্ট ম্যানেজার পদ একটি নেতৃত্ব প্রয়োগের স্থান। এখানে ব্যক্তিকে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করতে হয়। পারিবারিক বা ব্যক্তিগত কারণে কর্মপরিবেশকে প্রভাবিত করা যায় না। কর্মীদের সামনে নিজেকে আদর্শ হিসেবে দেখাতে হয়। তাকে হতে হয় পেশাদার। এপর্বে ‘পেশাদারিত্ব’ বিষয়টিতে আলাদাভাবে আলোকপাত করা হবে।

 

পেশাদারিত্ব মানে হলো:

১) এমন কিছু করতে পারা, যা শুধু বেতনে/অর্থে পরিশোধ করা যায় না

পেশাদাররা অর্থের বিনিময়ে মানসম্পন্ন পণ্য বা সেবা দান করেন। কিন্তু এর মানে অর্থ উপার্জনই তাদের উদ্দেশ্য নয়, অর্থের সর্বোচ্চ মূল্য প্রদান করা। পেশাদারিত্ব মানে শুধু ভালো একটি চাকরি/ব্যবসায় করা নয়। পেশাদারিত্ব মানে এমন কিছু যা শুধু বেতনে বা অর্থে পরিশোধ করা যায় না। পেশাদারিত্ব মানে ভালো/মজার কাজ করা নয়, পেশাদারিত্ব হলো কাজ থেকে ভালো/মজাকে খুঁজে পাওয়া।

 

২) আত্ম অনুসন্ধান ও প্রত্যাশার চেয়ে বেশি করার সামর্থ্য

পেশাদরিত্ব যেন ‘অন্ধের হাতি দেখার মতো’ অস্পষ্ট একটি বিষয়। প্রফেশনালিজম/পেশাদারিত্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণাগুলো খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত। পুরো বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা আমরা রাখি না, অথচ নিজ নিজ সুবিধামতো একে ব্যবহার করি। ফলে প্রকৃত পেশাদারিত্ব অনেকের কাছে অধরা থেকে যায়। এবিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পেতে হলে, নিজেদের পূর্বধারণাকে ভালোমতো যাচাই করে নেওয়া দরকার। দরকার আত্ম অনুসন্ধান এবং নিজের পেশায় প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দিতে পারার সামর্থ্য।

 

৩) নিজের পেশার প্রতি শ্রদ্ধা ও একনিষ্ঠতা

পরিশ্রম করলে এমনিতেই সবাই তা দেখতে পায়। তখন স্বীকৃতি আপনাআপনিই চলে আসে। আমরা নিজেদেরকে পেশাদার হিসেবে পরিচিত করতে পারি না, কারণ এটি এমন গুণ যা অন্যেরা আমাদের মধ্যে দেখতে পাবে বলে আশা করি। পেশাদারিত্ব আসে নিজ পেশার প্রতি শ্রদ্ধা ও একাগ্রতা থেকে। কোন কারণে নিজ পেশা বা কাজের প্রতি আগ্রহ/মনোযোগ কম থাকলে, সে কাজে আমরা পেশাদারিত্ব অর্জন করতে পারি না।

 

৪) দক্ষতার সাথে আবেগ ও ব্যক্তিত্বের মিশ্রণ

পেশাদারিত্বকে অনেকে ‘দক্ষতার’ সাথে ‘আবেগ’ ও ‘ব্যক্তিত্বের’ মিশ্রণ বলে মনে করেন। দক্ষতা চেষ্টা করলেই অর্জন করা যায়, কিন্তু পেশাদারিত্ব পেতে হলে সেই দক্ষতাকে নিজের আবেগ ও চেতনার সাথে সংমিশ্রণ ঘটাতে হয়। তখন কাজকে আর ‘শ্রম’ বলে মনে হয় না, কাজ হয়ে যায় আত্মসিদ্ধির মাধ্যম। পেশাদারিত্ব এমন একটি বিষয়।

 

৫) ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা ও নির্ভরযোগ্যতা

বড় কাজে কেউ আমাদের ওপর আস্থা করলে আমরা সম্মানিত বোধ করি। এজন্য দরকার দায়িত্বশীলতা। শুধু কাজ করলে তাতে মজা পাওয়া যায় না, যদি তাতে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা ও আবেগের যোগসূত্র না থাকে। তখন কেবলই মায়না বা মুজুরির সাথে ওজন করার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। এই প্রবণতা পেশাদারিত্ব অর্জনের বড় বাধা। যারা কাজ শেখান এবং যারা কর্মগুরু (মেন্টর), তারা শিষ্যকে অর্থের আকর্ষণ থেকে দূরে থাকার দীক্ষা দেন। পেশাদাররা নিজ কাজে জীবনের সার্থকতা খুঁজে পায়। তারা কখনও নিজের পবিত্র সময় ও শ্রমকে অর্থের পাল্লায় মাপে না।

 

৬) নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠা এবং জীবনের উদ্দেশ্যকে খুঁজে পাওয়া

পেশায় আত্মতৃপ্তি পাওয়া একটি সৌভাগ্যের বিষয়। কিন্তু সৌভাগ্য নাকি পরিশ্রমীদের জন্যই বরাদ্দ। জীবনের জন্য অর্থসম্পদ একটি দরকারি উপকরণ। ব্যক্তি জীবনের মৌলিক চাহিদা মেটাবার জন্য অর্থ খুবই প্রয়োজন। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন, ব্যক্তির পেশাদারিত্ব এবং নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠা। পেশাদারিত্ব হলো, কাজের মধ্যে জীবনের উদ্দেশ্যকে খুঁজে পাওয়া। পেশাদাররা অর্থকে অবহেলা করেন না, কারণ কাজ উত্তম হলে অর্থ আসে স্বাভাবিকভাবেই।

 

৭) আত্মসম্মান দ্বারা অনুপ্রাণিত জীবন

পেশাদারিত্ব হলো আত্মসম্মান দ্বারা অনুপ্রাণিত কর্মজীবন। যাদের আত্মসম্মানবোধ আছে, তাদের লক্ষ্য থাক সবসময় নিজের সেরাটুকু প্রয়োগ করা। এজন্য তারা অন্যের সহযোগিতা নিতে অথবা অন্যের মতামত নিতেও দ্বিধা করে না। মানুষ সম্মান ও সুনাম পেতে চায়। এটি খুবই স্বাভাবিক একটি চাওয়া। এই আকাঙক্ষাটি যাদের তীব্র, তারা নিজ নিজ কাজকে একাগ্রতার সাথে সম্পাদন করতে চায়। তারা চায় সকলে তাদের কাজের প্রশংসা করুক যা তাকে আরও উন্নততর কাজ পাবার সুযোগ করে দেবে। যার আত্মসম্মান আছে, সে জীবন ও কর্মজীবকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে।

professionalism_mmmainul2

পেশাদারিত্বের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা চলতে থাকবে।

 


পূর্বের পর্বগুলো:

▶ পর্ব ৭: এ দুই রকমের ম্যানেজার থেকে সাবধান থাকুন

▶ পর্ব ৬: ১৩ উপায়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে রাখুন হাতের মুঠোয়!

▶ পর্ব ৫:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনা: পেশাদারিত্ব কার দায়?

▶ পর্ব ৪:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া: পেশাদারিত্বের শুরু

▶ পর্ব ৩:  ৯টি তত্ত্বে প্রকল্পের সংজ্ঞা এবং সহজ কিছু দৃষ্টান্ত

▶ পর্ব ২:  যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনে প্রকল্প আমাদেরকে উপকৃত করে

▶ পর্ব ১:  প্রকল্প ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে

এ দুই রকমের ম্যানেজার থেকে সাবধান থাকুন…

banner7-crop

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে ড্রিম ম্যানেজার, পর্ব ৭। প্রকল্প ব্যবস্থাপককে সফল হতে হলে শুধু ভালো পরিকল্পনা আর পরিশ্রম করলেই চলবে না, প্রতিষ্ঠানের পরিবেশের সাথে মানানসই হতে হয়। তাকে জানতে হয় প্রতিষ্ঠানের স্বভাব সংস্কৃতি ও আন্ত:বিভাগীয় যোগাযোগ। জানতে হয় বিষক্রিয়াশীল জৈষ্ঠ্য ব্যবস্থাপকদের ক্ষতিকারক প্রবণতা, যা প্রকল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এসব জানতে হয় শেখার জন্য নয়, কিন্তু নিজেকে ও প্রকল্পকে রক্ষা করার জন্য। ভয়ানক কিছু ব্যবস্থাপক বা পরিচালক আছেন, যারা মিড-লেভেল ম্যানেজারদের মনে প্রভাব ফেলে ‘মন্দকে ভালো’ বলে প্রতিষ্ঠিত করেন। তারা উচ্চ পর্যায়ে কিছুই করতে পারেন না বা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, কিন্তু নিম্নপর্যায়ের কর্মীদের অন্দরমহল পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে চান। অধীনস্ত কর্মীর জন্য একটাকা বেতন বাড়াতে পারেন না, কিন্তু পান থেকে চুন কষলে শো’কজ লেটার দিয়ে জীবন নরক করে তোলেন। কাজ শেখাবার বেলায় কিছুই করতে পারেন না, কিন্তু কাজে ভুল হলে দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন অধীনস্ত কর্মীর ওপরে। এসব হিপোক্রিটদের দৌড় বেশি দূর যায় না! এপর্বে আলোচনা করবো ওসব বিষক্রিয়াশীল কর্মকর্তাদের স্বভাব ও প্রভাব নিয়ে। উভয়পক্ষই সচেতন থেকে যেন নিজেদেরকে উৎপাদনমুখী আচরণে উন্নয়ন করতে পারেন, এ উদ্দেশ্যেই লেখাটি।

প্রতিষ্ঠানের জৈষ্ট্য ব্যবস্থাপকরা অভিজ্ঞ; তারা সিনিয়র এবং তারা জানেন অনেক বেশি। প্রতিষ্ঠানের সব পর্যায়ের কর্মীর সাথে তাদের যোগাযোগ থাকে। একারণে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা বা গ্রহণযোগ্যতাও বেশি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা-বিধির অপপ্রয়োগ করে অথবা ঊর্ধ্বতর কর্তৃপক্ষের অজ্ঞতা/শৈথিল্য/অযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীল পরিবেশকে খারাপ করে তোলেন। শুরু হয় আন্ত:বিভাগীয় ক্ষমতার রাজনীতি, যা ‘খালি চোখে’ দেখা যায় না, কিন্তু নিরবে কর্মীদের মনে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতিকে ব্যহত করে।

একই ভাবে এবং একই উদ্দেশ্যে, মাঝারি পর্যায়ের ম্যানেজাররাও একই পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারেন তাদের প্রকল্প কার্যালয়ে। দলাদলি, তোষামোদি, স্বজনপ্রীতি এবং হিংসাহিংসি যখন প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতিতে গেঁথে যায়, সেটি সকলকে প্রভাবিত করে। এখানে অপেক্ষাকৃত ভালো যারা, তারা হয় পরিবর্তিত হয়, অথবা সকলের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, নয় তো প্রতিষ্ঠান ছেড়ে পালায়।

 

toxic_managers

আজ দু’প্রকার ম্যানেজার নিয়ে আলোচনা করা যাক:

১) দ্য ফ্রেন্ডলি ডেন্জারাস বস্: অসম্ভব বন্ধুত্ব দিয়ে তিনি কর্মীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেন

এধরণের ম্যানেজারদের সম্পর্কে ফোর্বস ডট কমের নিয়মিত লেখক ট্রাভিস ব্র্যাডবেরি বলেছেন, “এরা অসম্ভব রকমের বন্ধুত্বের ভাণ করেন, যা মজার নয় গঠনমূলকও নয়। কাজের সময় নষ্ট করে অফিস আড্ডায় মেতে ওঠেন এবং নিজের প্রভাব খাটিয়ে সবাইকে আটকে রাখেন। তিনি তার প্রিয়ভাজনদেরকে বিভিন্ন কাজে বেছে নেন এবং কর্মীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেন। তিনি প্রয়োজনের সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।” অন্যের দুর্বলতা নিয়ে দুর্বোধ্য ভাষায় মজা করা, অথবা প্রতিপক্ষের কোন ঘটনা নিয়ে খুশখুশ হাসিতে মেতে ওঠা অথবা অসংখ্যবার বলা হয়েছে এমন কিছু কৌতুক বলা, এসব কখনও কর্মীকে গড়ে তুলতে পারে না।

এধরণের অসম বন্ধুত্ব কখনও ভালো ফল দেয় না। চায়ের টেবিলের আড্ডা দিয়ে এসব ম্যানেজার বুঝাতে চান যে, তার সাথে সময় কাটালে সেটি সময়ের অপচয় নয়, কারণ তিনিই তো সব নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনিই প্রতিষ্ঠানের সব এবং কর্মীর বিপদের কাণ্ডারি, এরকম কিছু মিথ্যা প্রত্যাশার সৃষ্টি করেন কর্মীর মনে। ম্যানেজার যা করেন, যা বলেন, কর্মী সবই গলাধকরণ করেন। একসময় নিজের কাজে মনসংযোগ না করে, কেবল খোসামোদিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। তাতে কাজ ও সম্পর্কের মধ্যে অপেশাদারি মনোভাব সৃষ্টি হয়। প্রতিষ্ঠানের গতিশীলতায় সৃষ্টি হয় ‘এক মধুর প্রতিবন্ধকতা’ যা শুরুতে বুঝতে পারা যায় না।

তারা এমন ভাণ করবেন যে, আপনার জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত। অফিসের টাকায় উদারতা দেখাবে, খাওয়াবে। সিদ্ধান্ত অথবা দিকনির্দেশনা দেবার ক্ষেত্রে তারা প্রধানত দুর্বল, কারণ মৌলিক জ্ঞানের ঘাটতিই এসব ম্যানেজারদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। কিন্তু তারা সেটি আপনাকে বুঝতে দেবেন না, কারণ ‘আপনি যা করেন, সেটিই উত্তম হবে বলে তার বিশ্বাস’। এর পরিণতি খুবই খারাপ। কাজের ফল যদি ভালো হয়, তবে ম্যানেজার তার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে একাই কৃতীত্ব নেবেন। যদি ফলাফল খারাপ হয়, তবুও তার কোন দায় নেই; এবং আপনিও তাকে দায় দিতে পারবেন না। তিনিও তার বসকে বলবেন যে, এটি আপনিই একা করেছেন, তার সুযোগ হয়নি চেক করে দেখার। সবাই এসব মারপেঁচ বুঝে না, বরং ‘কাজের স্বাধীনতার জন্য’ মনে মনে ওই ম্যানেজারের প্রতি কৃতজ্ঞ হয়।

কমপ্লেক্স ম্যাট্রিক্স-এর প্রতিষ্ঠানে, যেখানে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, ক্রয়, প্রশাসন ইত্যাদি বিষয়ের ভিন্ন ভিন্ন বিভাগ রয়েছে, এধরণের দলীয়পনা খুবই ক্ষতিকারক। কারণ এসবের উদ্দেশ্য হলো, ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে কর্মীকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার করা।

এখানে আশঙ্কার বিষয়টি হলো প্রতিষ্ঠানের নতুন কর্মীদের নিয়ে, যারা প্রতিষ্ঠানের কালচারের সাথে পরিচিত হন নি অথবা এধরণের জৈষ্ঠ্য কর্মকর্তাদের মতিগতি সম্পর্কে অবগত নন। তারা এধরণের ম্যানেজারদের দেবতা-জ্ঞান করেন এবং নিজের মনের সব কথা বলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন।

 

এদের থেকে বাঁচার উপায়?

  • এবিষয়ে ট্রাভিস ব্র্যাডবেরি বলেছেন, প্রথম কাজ হলো ওই ধরণের কর্মকর্তাদের সাথে সম্পর্কের সীমানা নির্ধারণ। চেষ্টা করতে হবে, যেন ম্যানেজার/পরিচালক তার পজিশন দিয়ে আপনাকে আতঙ্কিত না করতে পারেন।
  • বস তো বসই, নিজে বিপদে পড়লে কখনও তিনি আপনাকে অস্বীকার করতে দ্বিধা করবেন না। অতএব নিজের দায়িত্বের প্রতি অবহেলা নয়। সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি যখন ‘না’ বলার সময় আসে তখন বিনয়ের সাথে সেটি প্রকাশ করা উচিত।
  • প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকতা কখনও ষোলআনা বন্ধু হবেন না, হতে পারেন না। বন্ধুত্ব হয় সমান্তরালে। একজন উঁচু আরেকজন অনেক নিচু অবস্থানে থাকলে সম্পর্কের খারাপ পরিণতি জুনিয়রকেই বহন করতে হয়।
  • পেশাদারিত্ব হলো সবাইকে উপযুক্তভাবে মূল্যায়ন করা। অন্যের অনুপস্থিতিতে তার সমালোচনা করা অথবা তাকে নিকে মজা করা, কোন পেশাদারিত্বের পর্যায়ে পড়ে না।
  • যত দ্রুত সম্ভব নিজের প্রতিষ্ঠানের অতীত ব্যাকগ্রাউন্ড জেনে নেওয়া একটি  উত্তম দক্ষতা। জৈষ্ট্য কর্মকর্তাদের আচরণ ও মনোভাবকে বুঝার জন্য এর চেয়ে ভালো কোন পন্থা নেই।

 

 

২) দ্য মাইক্রোম্যানেজার: এরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে ‘প্রতিষ্ঠানের মুসোলিনি’ হতে চায়

নিজের পদ নিয়ে সদা সন্ত্রস্ত এসব ব্যবস্থাপক সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চান: অফিসের স্ন্যাকস আইটেম থেকে শুরু করে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সবকিছুতে তাদের অনুমতি নিতে হয়, অবগতিতে রাখতে হয়। সবাইকে মনে করেন তার প্রতিপক্ষ। ক্ষুদ্রকে ধরে রাখেন, বৃহৎ থাকে অধরা। কাজের ‘উদ্দেশ্য’ নয়, কাজের ‘প্রক্রিয়া’ নিয়ে তার মাথাব্যথা। উৎপাদন যা-ই হোক, তিনি চান ‘তার নির্দেশের সফল প্রয়োগ’।

তিনি ফল যদি না-ও চান, প্রতিবেদন থাকতে হবে পাকা। তিনি অর্জনের তথ্য চান না, তিনি চান তার প্রতিবেদন ছকের পরিপূর্ণ ব্যবহার। তারা বৃহৎ আকৃতিতে বিষয়টুকু দেখতে পারেন না, পারেন না ভবিষ্যত সম্পর্কে পরিকল্পনা করতে।

তিনি কাজকে কখনও সহজ করতে পারেন না, অথবা চান না। প্রতিবেদন ছক সৃষ্টি করা, নতুন নির্দেশ জারি করা এবং এসব করে প্রতিষ্ঠানের কর্মচঞ্চলতাকে তার দিকে ‘নিবিষ্ট রাখা’ তার দৈনন্দিন কাজ। তাতে তার স্বাক্ষর দেবার সুযোগ বেড়ে যায়, বেড়ে যায় প্রভাব খাটানোর সুযোগ।

প্রতিষ্ঠানের কাজ যা-ই হোক, এদের কাজ হলো কর্মী ব্যবস্থাপনা। সেটি নিশ্চয়ই ভালো পথে নয়, ধ্বংসাত্মক পথে। সব পর্যায়ের কর্মীকে তার ভয়ে ভীত রেখে এসব ম্যানেজার আনন্দ লাভ করেন।

মাইক্রোম্যানেজাররা কর্মীর জন্য সমান সুযোগে বিশ্বাসী নন। তারা জানেন না, অথবা জানতে চান না যে, সুযোগ আর স্বাধীনতা পেলে সবাই তার সর্বোচ্চটুকু দেবার চেষ্টা করে।

তারা ক্ষমা করতে পারেন না, কারণ সেই নৈতিক জোর নেই। কর্মীর ক্ষুদ্র বিচ্ছুতিটুকু তারা মনে ধরে রাখেন এবং প্রতিশোধপরায়ন হয়ে ওঠেন। তারা মানেন না, এটি কর্মক্ষেত্র। কর্মীর প্রতি ইতিবাচক থাকলে সে সংশোধন করে এগিয়ে যাবেই। এখানে কর্মই সবকিছু নির্ধারণ করে। কিন্তু মাইক্রোম্যানেজার চান তোষামোদ আর অন্ধ ভক্তি। কর্মী নয়, তিনি চান ভক্ত।

তারা চেইন-অভ্ কমান্ড ভাঙার ওস্তাদ, যদি সেটি হয় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা সুযোগ। ছলে-বলে-কৌশলে অন্যের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা তার সখ। প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ, অথবা প্রতিপক্ষের প্রতিপক্ষ তৈরিতে তার জুরি নেই। সব কাজ বাদ দিয়ে, কাগজপত্র তৈরি বা ফাইলদস্তাবেজ সংরক্ষণে এসব কর্মকর্তারা দিনভর শ্রম দেন অথবা অধিনস্ত কর্মীকে চাপের ওপর রাখেন।

 

এদের থেকে বাঁচার উপায়?

  • একজন পেশাদার প্রকল্প ব্যবস্থাপকের জন্য এসব কোন সমস্যা নয় – এমনিতেই সবকিছু অনুকূলে চলে আসে। বসের ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে কীভাবে নিজেরটুকু পুরোপুরি প্রয়োগ করতে হয়, পেশাদাররা সেটি জানেন।
  • মাঝারি পর্যায়ের কর্মকর্তার জন্য বলছি, ভুলেও এদের কোন কথার প্রতিবাদ করে ‘প্রকাশ্য প্রতিপক্ষ’ হতে যাবেন না; আপনার কর্মজীবনকে ধ্বংস করে দেবে। আবার পক্ষেও যাবেন না, কারণ সকলেই এদের মন্দ দিক সম্পর্কে অবগত এবং যথা সম্ভব দূরত্ব বজায় রাখে। আপনিও তা-ই করুন।
  • নিজেকে ভিকটিম হতে দেবেন না। পরিস্থিতি কতটুকু খারাপ হবে তা নির্ভর করে আপনি কীভাবে/কতটুকু প্রতিক্রিয়া করেন। অতএব ভাবাবেগ থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
  • মাইক্রোম্যানেজাররা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অযোগ্য/অদক্ষ হয়ে থাকে। ফলে তাদের প্রধান ভয় হলো নিজের পদ ও মর্যাদা নিয়ে – প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি নিয়ে নয়। তাই নিজের প্রতিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে তাদের আস্থা অর্জন করতে পারলে ফলাফল আপনার পক্ষে থাকবে।
  • সবাইকে খুশি করার অসম্ভব চেষ্টা থেকে দূরে থাকুন। দেখুন আপনি কিসে খুশি। নিজের মূল্য বুঝুন এবং কাজের মধ্যে সেটি ধরে রাখার চেষ্টা করুন।
  • নিজের সততার জন্য কারও কাছে দুঃখিত হতে যাবেন না এবং অসম্ভব লক্ষ্যমাত্রার পেছনে দৌড়াতে যাবেন না। দেখে নিন আপনার প্রজেক্টকে প্রভাবিত করে এমন কিছু বাদ পড়ছে কিনা। বিনয় ধরে রাখুন, কিন্তু ‘না’ বলতে শিখুন।

 

 

প্রজেক্ট মানে হলো একটি মিশন, যারা বাস্তবায়নের জন্য শ্রম, মূলধন ও যন্ত্রপাতির সুব্যবস্থাপনা করতে হয়। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রকল্পের পক্ষ/বিপক্ষকে সনাক্ত করতে পারা। প্রকল্পের অগ্রগতিতে কার প্রভাব ইতিবাচক বা নেতিবাচক, এটি জানতে পারলে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পঞ্চাশ শতাংশ সহজ হয়ে যায়। তাই অন্য যেকোন কাজের চেয়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় বেশি দায়িত্বশীলতার প্রয়োজন হয়।

বিষক্রিয়াশীল ম্যানেজারদের নিয়ে আরও দু’একটি পর্ব লেখার ইচ্ছে আছে।

 

 


পূর্বের পর্বগুলো:

▶ পর্ব ৬: ১৩ উপায়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে রাখুন হাতের মুঠোয়!

▶ পর্ব ৫:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনা: পেশাদারিত্ব কার দায়?

▶ পর্ব ৪:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া: পেশাদারিত্বের শুরু

▶ পর্ব ৩:  ৯টি তত্ত্বে প্রকল্পের সংজ্ঞা এবং সহজ কিছু দৃষ্টান্ত

▶ পর্ব ২:  যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনে প্রকল্প আমাদেরকে উপকৃত করে

▶ পর্ব ১:  প্রকল্প ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে

নিজেই নিজের লেখার প্রকাশক: কেন হবেন, কেন হবেন না

নিজের অখাদ্য লেখাগুলো কেউ নিজ খরচে বই বানিয়ে প্রকাশ করে দেবেন এবং সেটি বাজারজাত করবেন, এটি ভাবতেই পুরাতন গল্পটি মনে পড়ে যায়। গল্পটি সবারই জানা। প্রকাশকের দৌরাত্ম্য এবং লেখকের সৃষ্টির প্রতি অবহেলার সেই মর্মন্তুদ কাহিনি। লেখা প্রকাশ তো দূরে থাক, লেখা পড়েই দেখেন না অহংকারী প্রকাশক। লেখক অপেক্ষার প্রহর গুণেন। কাজহীনতায় এক দুঃসহ জীবনে পতিত হন লেখক। অপেক্ষার জীবন কঠিন। প্রেমিকাও অবিশ্বাস করতে শুরু করে। অবশেষে হয়তো আসলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। লেখা প্রকাশ পেলো। সেই লেখা পাঠকপ্রিয়তাও পেলো।  শুধু পাঠকপ্রিয়তা নয়, বলা যায়, রাতারাতি প্রসিদ্ধ লেখকে পরিণত হলেন সেই নবীন কবি। কিন্তু হায়, এতদিন নিজের সৃষ্টির প্রতি অপমান আর অপ্রকাশিত থাকার বেদনা সইতে না পেরে হতভাগা লেখক কিছুদিন আগেই পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। আত্মহত্যা নাকি স্বাভাবিক মৃত্যু সেই বিতর্ক থাকুক। কী হলো সেই কবির জীবনে? মরণোত্তর পুরস্কার!

 

বর্তমান বাজারে লেখার ‘শতভাগ’ প্রকাশক পাওয়া প্রায় অসম্ভব একটি বিষয়। এজন্য অনেকেই প্রকাশক বা সম্পাদকের পথে পা মাড়াতে চান না। নিজেই নিজের লেখার মুগ্ধ পাঠক!  বই বানিয়ে মলাট দেখতে চান, গন্ধ নিতে চান নিজের বইয়ের, পেতে চান অটোগ্রাফ দেবার আনন্দ। লেখক হিসেবে একটি অতি স্বাভাবিক একটি চাওয়া। ভার্চুয়াল জগতের বন্ধুপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ হয়তোবা ছাপার খরচ যুগিয়ে নিয়েছেন। কেউ অপেক্ষা করছেন সময়ের। কিন্তু এটি কি সবার ক্ষেত্রে ভালো ফল দিয়েছে? প্রশ্ন থাকলো পাঠকের কাছে।

 

প্রকাশকেরা প্রথমেই যা দেখতে চান, তা হলো বিক্রয়যোগ্যতা বা বইটি বিক্রি হবার সম্ভাবনা। কোন কারণে বইয়ের লেখক আগে থেকেই বিখ্যাত হলে প্রকাশকদের সেই আশঙ্কা অনেকটাই কেটে যায়। এসব ছাড়াও বইয়ের প্রকাশক পাওয়া যায়, যদি লেখার মান থাকে প্রশ্নাতীতভাবে ভালো। ভালো একজন জামিনদার থাকলেও বইয়ের প্রকাশক পাওয়া যায়।  কোন বেস্টসেলার বইয়ের লেখক যদি একটি রিভিউ লেখে দেন অথবা একটি সুপারিশপত্র, সেটিও প্রকাশকের মনকে বিগলিত করে।

 

self_publishing

প্রশ্নটি হলো, নবীন লেখক কোন পথে যাবেন। নিজের লেখা নিজেই প্রকাশ করবেন, নাকি প্রকাশকের দ্বারস্থ হবেন?  দু’টি পথেরই ভালোমন্দ দিক আছে। প্রথার বিপরীতে যেতে হলে প্রথাটি প্রথমত জানতে হয়। অর্থাৎ যারা প্রকাশকের মাধ্যমে বই প্রকাশ করেছেন, তারা কেন করেছেন কীভাবে করেছেন, সেটি মূল্যায়ন করে দেখা উচিত।

 

প্রকাশকের মাধ্যমে বই প্রকাশ

প্রকাশকের মাধ্যমে বই প্রকাশ করা একটি প্রচলিত এবং স্বাভাবিক উপায়, কারণ একই সাথে কন্যা এবং বরের বাবা হওয়া যায় না। বিখ্যাত বইয়ের লেখক হওয়া আর বইয়ের বাজারজাত করা এক নয়। ভালো লেখক আর ভালো বিক্রেতা দু’টি ভিন্ন বিষয়। প্রকাশক পাওয়া মানে লেখার প্রথম স্বীকৃতি পাওয়া। তাই প্রসিদ্ধ প্রকাশকের দায়িত্বে বই প্রকাশ করতে পারা একটি সৌভাগ্যের বিষয়।

কিন্তু সৌভাগ্য তাদেরই, যারা পরিশ্রম করতে এবং ধৈর্য্য ধরতে পারেন। প্রত্যাখ্যাত হবার বেদনাকে মেনে নিতে হয়, হতাশাকে হজম করতে হয়। বিখ্যাত কিশোর সাহিত্যিক এবং হ্যারি পটার সিরিজের লেখক জেকে রলিং কমপক্ষে বারোটি প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। শেষে কোন এক প্রকাশকের কন্যার সাহায্যে তিনি সুদৃষ্টি পেয়েছিলেন। তার পরের সবই ইতিহাস। লর্ড অভ্ ফ্লাইস-এর লেখক উইলিয়াম গোল্ডিংও একুশ বার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। গোল্ডিং-এর দৃষ্টান্ত থেকে বুঝা যায় যে, সাহিত্যে নোবেল পাওয়া লেখকেরাও প্রকাশক কর্তৃক নিগৃহীত হতে পারেন। বাংলা ভাষার অনেক কবি-লেখক আছেন, যাদের প্রতিভা প্রথম দৃষ্টিতে প্রকাশকের আনুকূল্যতা পায় নি। কিন্তু প্রকাশকের অবহেলা প্রকৃত লেখককে থামাতে পারে না, বরং প্রেরণাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।

প্রত্যাখ্যান ‘লেখক চরিত্রকে’ গড়ে তোলে, কারণ এটি লেখককে নিজ লেখায় পুনরায় দৃষ্টি দিতে বাধ্য করে। প্রতিটি অস্বীকৃতি লেখককে সমালোচকের স্তরে নামিয়ে দেয়, যা লেখার উন্নয়নে সহায়তা করে।  কারাজীবন যেমন রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরীক্ষা, তেমনই প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে লেখকের ‘লেখক সত্ত্বার’ পরীক্ষা হয়। কিন্তু প্রত্যাখ্যাত বা উপেক্ষিত হবার ভয় লেখকের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। লেখককে প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হয়।

 

প্রকাশক পাবার পরও লেখকের পরীক্ষা শেষ হয় না। সকল পরীক্ষাকে অতিক্রম করার পর শুরু হয় নতুন পরীক্ষা । সেটি হলো, প্রকাশকের মতের সাথে এবং তার শেডিউলের সাথে তাল মেলাতে পারা।  লেখকের কাছে তার লেখা অমূল্য এবং প্রশ্নাতীত, কিন্তু প্রকাশকের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ পাঠকমুখী। এই দ্বন্দ্বকে মেনে নিয়ে ডেডলাইন মোতাবেক লেখাটি শেষ করতে পারাও লেখকের জন্য বড় পরীক্ষা।

প্রকাশকের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকক্ষেত্রেই লেখার পাঠকপ্রিয়তাকে বাড়িয়ে দেয়। তার অভিজ্ঞ সম্পাদনায় একটি কাঁচা লেখা পাঠকের চোখে পরিচ্ছন্ন এবং দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে।

ভাষাগত শুদ্ধতার বিষয়টি একজনের পক্ষে নিশ্চিত করা কঠিন। সম্পাদকের পক্ষপাতহীন কাটাছেঁড়ায় একটি লেখা পায় ভাষাগত শুদ্ধতা।  লেখক লেখেন আবেগ আর অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে, কিন্তু সম্পাদক পড়েন সহস্র পাঠকের দৃষ্টিতে।

এখানে বইয়ের দান্দনিক বিষয়টির জন্যও প্রকাশকের দরকার। প্রকাশক জানেন কীভাবে প্রচ্ছদ, ছবি, অক্ষরবিন্যাস এবং পৃষ্ঠাবিন্যাসের সমন্বয়ে একটি বই মানসম্মত ও পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আইনি মারপ্যাঁচ। লেখকের সব লেখাই যে সৃজনশীল, গঠনমূলক এবং সামাজিকভাবে অনুকূল হবে তা নয়। লেখকের চোখে বিষয়গুলো অধরা থেকে যেতে পারে। অভিজ্ঞ প্রকাশক নিশ্চিত করেন যে, লেখকের সৃষ্টি পাঠক-উপযোগী।

প্রকাশক নৈতিকভাবেই লেখকের গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক এবং তার গ্রন্থস্বত্ত্বের রক্ষক।  তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি আর্থিক দায়দায়িত্বের অংশীদার। বই বাজার না পেলে সাধারণত প্রকাশক দায় নেন।

 

বাস্তবতার সাথে যুদ্ধ করে এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা নিয়ে একেক প্রকাশনা সংস্থা একেকটি বিক্রয়যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। তাদের আছে পুস্তক ব্যবসায়ীদের সাথে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, পরীক্ষীত সম্পর্ক। আছে অভিজ্ঞ কর্মীবাহিনি। লেখক-সুলভ আত্মগরিমা তাদের নেই।  বিপরীতে আছে বই বিক্রি করে ব্যবসায় টিকে থাকার তাড়না।

আমরা দেখতে পাই যে, প্রকাশকের পৃষ্ঠপোষকতা লেখককে প্রেরণা দেয় আরও লেখার জন্য। ব্যবসায়িক লাভের কারণেই লেখার মান বৃদ্ধি পায়। অতএব বই লেখে বৃহত্তর পাঠক সমাজে পরিচিতি পেতে চাইলে প্রকাশকের বিকল্প নেই।

 

 

নিজেই নিজের লেখার প্রকাশক

এখানে বিবেচ্য বিষয়টি হলো লেখকের স্বাধীনতা। লেখক স্বভাবতই স্বাধীনচেতা এবং সমাজের পথপ্রদর্শক। পরাধীন আত্মা কখনও ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক হতে পারে না।  তাহলে সক্রেটিস আর গ্যালিলিওরা আজ অচেনাই থেকে যেতেন।  কোন কালজয়ী লেখক তার প্রকাশকের পছন্দমতো গড়ে ওঠেছে এরকম নজির আমরা পাই না।

লেখকই প্রকাশক নির্বাচন করেন, প্রকাশক লেখককে নয়। সুলেখক মানে হলো, নির্ধারকের ভূমিকায় তারাই থাকবেন। পথিকই পথের সৃষ্টি করেছে।

লেখক বৃহত্তর পরিসরে তার গ্রন্থের ভবিষ্যতকে দেখতে পান। প্রকাশকের মুনাফামুখী দৃষ্টি কেবল বর্তমানকেই দেখতে পায়। দূর ভবিষ্যত তাদের কাছে তত গুরুত্বপূর্ণ নয়। দেশের স্বশিক্ষিত দার্শনিক আরজআলী মাতুব্বরের লেখা জনসমক্ষে এসেছে তার মৃত্যুরও পর।  প্রকাশক কোথায় ছিলেন!

লেখকই উত্তম প্রকাশক হতে পারেন, কারণ প্রকাশকেরা একদেশদর্শী।  শুধুই পাঠকের পছন্দের কথা তারা ভাবেন।  পাঠকের মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়নের বিষয় তাদের কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। অপমান করে লেখককে তাড়িয়ে দেবার মুহূর্তকাল পরেই তারা একই লেখকের পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেছেন, এরকম দৃষ্টান্ত আছে।

তাই, যদি নিজের পছন্দের লেখা প্রকাশ করতে হয় এবং যদি তাতে প্রকাশকের সমর্থন পাবার সম্ভাবনা না থাকে, তবে নিজের লেখার প্রকাশক নিজে হওয়াই উত্তম।

 

অন্যদিকে, রয়্যালটি বা লেখকের আর্থিক প্রাপ্তিটুকুও আজকাল কমে গেছে। যেমন: শিক্ষকদের মানোন্নয়নের জন্য একটি বইয়ের রয়্যালটি দশ শতাংশের বেশি নয়! লেখক যখন নিজেই পাঠক, বিক্রয়ের টাকাও সবটুকুই তার। অবশ্য লোকসানের দায়ও লেখকেরই!

এক্ষেত্রে লেখকের সিদ্ধান্তে বাধা দেবার কেউ নেই। নিজের বইয়ের প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে এর মূল্য নির্ধারণ পর্যন্ত সবটুকু প্রক্রিয়ায় লেখকই সর্বেসর্বা। বইয়ের বিষয় নিয়েও মাতব্বরি করার মতো তার ওপরে কেউ নেই। অবশ্য লেখার বিষয় যদি বিতর্কিত হয়, তবে নিজে এর প্রকাশক হওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্পও নেই।

 

কিছু বিষয়ে নিজের প্রকাশক হওয়া ছাড়া তেমন কোন পথ থাকে না। নতুন কোন আবিষ্কার অথবা অনুসন্ধান/গবেষণার প্রেক্ষিতে কোন বই লেখলে, তাতে প্রকাশক ঝুঁকি নিতে চাইবেন না। এক্ষেত্রে লেখকের প্রকাশক হওয়া ছাড়া গত্যান্তর নেই।

যারা ‘টিউন/হাউ টু’ টাইপের লেখক (যথা: ঘরে বসে আয় করুন; নিজেই এসইও শিখুন; ই-মার্কেটিংয়ের ৭টি পদ্ধতি; ধনী হবার ১০টি সহজ উপায় ইত্যাদি) তারা নিশ্চিন্তে বই বের করতে পারেন। নিজেই।

 

 

উভয়দিকেই একটি মিল আছে।  তা হলো লেখার মান এবং পাঠকের গ্রহণযোগ্যতা।  লেখার বিষয় মৌলিক হলে, কনটেন্ট ভালো থাকলে এবং পুস্তক ব্যবসায়ীদের সাথে সামান্যতম যোগাযোগ থাকলে নিজেই প্রকাশক হওয়া যায়। আর্থিক সঙ্গতি থাকলে আর্থিক সাফল্যও লেখক একাই ভোগ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে ‘প্রকাশকের কর্তব্য’ সম্পর্কে লেখককে সজাগ থাকতে হবে।  তখন নিজেকে শুধু লেখক ভেবে ঘরে বসে থাকলে চলবে না। লেখকরা স্বাধারণত অন্তর্মুখী স্বভাবের হয়ে থাকেন; তারা কতটুকু প্রকাশক হয়ে ওঠতে পারবেন, নিজেরাই বুঝতে পারবেন।  অন্তর্মুখী লেখকদের জন্য প্রকাশকই উদ্ধারকর্তা।  লেখার মান ভালো থাকলে এবং পেশাদারী রীতিতে নিজেকে প্রকাশ করতে চাইলে, প্রকাশকের বিকল্প নেই। তবে জুতসই প্রকাশক পেতে হবে।  প্রসিদ্ধ প্রকাশকের আস্থা অর্জনের জন্য প্রয়োজনে এক যুগ অপেক্ষায় থাকা যায়।  আজকাল তো অপেক্ষায় থাকতে হয় না, অনলাইন এবং অগণিত দৈনিক বা সাপ্তাহিক পত্রিকায় অথবা লিটল ম্যাগাজিনে লেখা প্রকাশ চলতেই পারে।  পরে সেগুলোকে স্মারক হিসেবে নিয়ে প্রকাশকের আস্থা অর্জনে ব্যবহার করা যায়। (১ মে ২০১৬)

 

 

[সামহোয়্যারইন ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া: ৪ মে ২০১৬]


টীকা:
১) লেখক প্রকাশকের পার্থক্যটি আজকাল ঠিক আগের মতো আছে কিনা যাচাই করা যেতে পারে।  কিছু প্রকাশক আছেন, যারা নবীন লেখকদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা দেবার মহৎ উদ্দেশ্যে লেখকের খরচেই বই প্রকাশ করেন। এসব ঊন-প্রকাশকের নাম যথাস্থানে যথাগুরুত্বেই থাকে। বইয়ের লাভ হলেও সেখানে সিংহভাগ তারাই নেন, কারণ তারা নবীন লেখককে পরিচিত করিয়ে বিশাল মহৎ কার্য সাধন করেছেন।  কিছু লেখকও লেখক থাকেন না, বনে যান প্রকাশক।  এটি ভালো নাকি মন্দ, সেটি অবশ্য অন্য বিতর্ক।

২) শুরুতে দু’একবার প্রত্যাখ্যাত হওয়া যেন বিরহ প্রেমের স্মৃতি। এটি না হলে যেন প্রেম থাকে অপূর্ণ! প্রেমিক হওয়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়। অনেক লেখক একে উপভোগ করেছেন। সেসব দুঃসময় নিয়ে সৃষ্টি করেছেন নতুন লেখা।

৩)  কিছু সাইট আছে, যারা এসব বিরহকে গেঁথে তুলছে নতুন লেখকদের প্রেরণার জন্য। প্রত্যাখ্যাত লেখকদের অভিমতও তারা প্রকাশ করে। এরকম একটি সাইট: প্রত্যাখ্যাত সাহিত্য যা পরবর্তিতে বেস্টসেলার হয়।

 


twl-flow-chart-featured

নিজেই প্রকাশ করবেন, নাকি প্রকাশকের দ্বারস্ত হবেন, এবিষয়ে

সিদ্ধান্ত নেবার জন্য চমৎকার একটি মন-পরীক্ষা আছে।

পাঁচ মিনিটের আত্মপর্যালোচনা: এখনই দেখে নিন!

১৩ টি উপায়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে নিয়ে আসুন হাতের মুঠোয়!

banner6-crop

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক, পর্ব ৬। প্রকল্প ব্যবস্থাপককে সফল হতে হলে, অর্থাৎ একটি একটি করে প্রকল্পগুলোকে বাস্তবায়ন করে নিজের প্রোফাইলকে সমৃদ্ধ করতে চাইলে, বিষয়টিকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিণত করতে হবে। এটি আর প্রাতিষ্ঠানিক এসাইনমেন্ট হয়ে থাকতে পারবে না। তবেই তিনি আত্মসিদ্ধির উপলব্ধি পাবেন, পারবেন আরও বৃহত্তর প্রকল্পের ব্যবস্থাপক হতে। তিনি তখন নিজেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক হিসেবে নিজেকে দেখতে পাবেন। এপর্বে আলোচনা করা হবে কীভাবে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার খুঁটিনাটি বিষয়কে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসা যায়, তার ১৩টি উপায়।

 

প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় কোন বায়বীয় বা এবস্ট্রাক্ট বিষয় নেই, সবকিছু দৃশ্যমান এবং সরাসরি। পরিকল্পনা, ডেডলাইন, বাজেট, সঠিক কর্মী – এর সবকিছু যুক্তিনির্ভর এবং পরিমাপযোগ্য। পথও আপাত দৃষ্টিতে সরল। এই সরল পথই জটিল আকার ধারণ করে উপযুক্ত পরিকল্পনা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবে। সৃষ্টি হয় অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিবন্ধকতা ও সম্পর্কের অবনতি। তবে প্রকল্প ব্যবস্থাপককে লক্ষ্যচ্যুত হলে হবে না। তার রাস্তা সরলই রাখতে হবে যেকোন মূল্যে। তার মন ভেঙ্গে পড়লে চলবে না; তার মেজাজ খারাপ হলে চলবে না, পাছে কোন পক্ষ পরিণত হয় বিপক্ষে। তাকে হাল ধরে রাখতে হয়। তবেই প্রকল্প উদ্দীষ্ট লক্ষ্যে গিয়ে পৌঁছায়।

 

১) সঠিক প্রকল্প হাতে নিন:

খরচের সাথে ফলাফলের তুলনা করুন; বেইসলাইনের সাথে উদ্দীষ্ট সুফল নিয়ে ভাবুন। ভাবুন প্রকল্পের মেয়াদ ও চৌহদ্দি নিয়ে। প্রকল্পের কাজ নিয়েও ভাবুন, সমজাতীয় প্রকল্প কি আরও কেউ করেছে? তাদের কী ফল হয়েছিল? এর ফলাফল কি প্রমাণ করা যাবে? ভাবুন, প্রকল্পটি কার ইচ্ছায়/ কার পৃষ্ঠপোষকতায় গৃহীত হয়েছে। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় নিয়ে ভাবুন, এটি কি বাস্তবসম্মত? কোন্ কোন্ খাতে খরচ ও ঝুঁকি প্রাক্কলনের উর্ধ্বে চলে যেতে পারে?  সঠিক প্রকল্পটি যে কোন কারণে আপনার হাতে আসে নি এবং সাংগঠনিক কারণে এ থেকে বের হওয়াও সম্ভব নয়। তবে এর ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করুন, প্রাক্কলন করুন এর অপ্রত্যাশিত সমস্যা/ব্যয়সমূহ। পুনর্বার পরিকল্পনা করুন। প্রস্তুতি/ব্যবস্থা নিন প্রকল্প শুরুর মুহূর্তেই।

 

২) প্রকল্পটি পুনর্বার পরিকল্পনা করুন:

প্রকল্পটি সঠিকভাবে পরিকল্পিত হয়েছে এবং এর সবকিছু অত্যন্ত সুচারুরূপে চিহ্নিত করা হয়েছে, এ বিশ্বাস নিয়ে শুরু করে নিজের বিপদ ডেকে আনবেন না। পুনর্বার পরিকল্পনায় নামুন, অনুসন্ধান করুন এর ভেতর বাহির। প্রকল্পের কাজ, খরচ ও আর্থিক পরিকল্পনা, গুণগত মান, সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি, কর্মী পরিকল্পনা, সংশ্লিষ্ট ক্রয়, প্রকল্পের পক্ষ-বিপক্ষ  এবং সমন্বয়ের বিষয়গুলো সমালোচকের দৃষ্টিতে দেখুন, কারণ এখন থেকে এর সমস্ত বা অধিকাংশ দায় আপনার ওপর আরোপিত হবে। পুনঃপরিকল্পনায় সংশ্লিষ্ট কর্মীদেরকে যুক্ত করুন সক্রিয় দায়িত্ব দিয়ে। পুনর্বার পরিকল্পনা করে নিজের ভাষায় প্রকল্প প্রস্তাবনাটি আবার লেখুন। এঁকে রাখুন এর গুরুত্বপূর্ণ মাইনস্টোনগুলো। চোখের সামনে বা দৃশ্যমান স্থানে ঝুলিয়ে রাখুন এর মনিটরিং চার্ট ও সময়ছক।

 

৩) কর্মীদেরকে প্রকল্পের প্রত্যাশা ও মাইলস্টোন নির্ধারণে উপযুক্তভাবে সম্পৃক্ত করুন

প্রকল্পের কর্মী আপনার মূল কর্মশক্তি, যাকে মূলধন বা যন্ত্রাংশের মতো ব্যবহার করা চলে না। তাদেরকে শুরু থেকে পরিকল্পনা ও লক্ষ্য নির্ধারণে কাজে লাগান। এপ্রক্রিয়ায় দেখুন কার কত সামর্থ্য। দেখুন কার কোন্ কাজে আত্মবিশ্বাস বেশি। প্রকল্পের পক্ষ-বিপক্ষ এবং সুবিধাভোগীদেরকেও যথাযথভাবে অংশ নিতে দিন। তারা সবাই চেতনে-অবচেতনে আপনাকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেবে, যা প্রকল্পের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো, একটি শক্তিশালী এবং পেশাদার কর্মী দল। প্রথমত, প্রকল্পের কর্মীদের সামর্থ্যের মান দেখে নিন। যাদের ঘাটতি আছে, তাদেরকে প্রকল্পের কাজের আলোকে গড়ে তুলুন। দ্বিতীয়ত, যারা প্রস্তুত তাদেরকে দায়িত্ব দিন, চ্যালেন্জ দিন।

 

৪) প্রকল্পের কাজের মানদণ্ড ও সময়ছক নির্ধারণ করুন

কর্মী ও সংশিষ্ট পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে প্রকল্পের মানদণ্ড বা গুণগতমানের স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করুন। এক্ষেত্রে অন্য কোন সমজাতীয় কোন প্রতিষ্ঠান/প্রকল্প থেকে বেন্চমার্ক নির্ধারণ করতে পারেন। প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করে এর উদ্দীষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যেতে হলে কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে আপস করা চলবে না, সেটি নির্ধারণ করুন। কোথায় কতটুকু ব্যতিক্রম সহনীয় সেটিও ঠিক করুন। নির্ধারণ করুন গুরুত্বপূর্ণ পর্বগুলো ঠিক কখন শেষ হওয়া চাই।

 

৫) প্রকল্প বাস্তবায়নের অভ্যন্তরীণ ও বহিস্থ ঝুঁকিসমূহ সুপারিশসহ চিহ্নিত করুন

প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে ভেতরে বাইরে, সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে, আঞ্চলিক বা সামাজিকভাবে কী কী ঝুঁকি বা প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে, সেটি প্রকল্পের কর্মী ও পক্ষ-বিপক্ষদের নিয়ে নির্ধারণ করুন। সবাইকে একই টেবিলে হয়তো নিয়ে আসা যাবে না। বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে হলেও প্রকল্পের  ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো নিরসনের পরিকল্পনা লিবিবদ্ধ করুন। স্পর্শকাতর কিছু ঝুঁকি যা ‍শুধু প্রকল্প ব্যবস্থাপককেই মুখোমুখি হতে হয়, সেগুলো উপযুক্তভাবে লিপিবদ্ধ করুন। কিছু অভ্যন্তরীন ঝুঁকি যা কর্মী এবং পৃষ্ঠপোষক সংস্থার সম্পর্কের সাথে জড়িত, সেগুলো যথাযথভাবে চিহ্নিত করুন। ঝুঁকি এবং এই সংশ্লিষ্ট প্রতিবন্ধকতাগুলো যথাসময়ে যথানিয়মে নিরসন করুন।

 

৬) মনিটরিং ও মূল্যায়নের বিষয় এবং সময় নির্ধারণ করুন

প্রকল্পের প্রস্তাবনা মোতাবেক মনিটরিং ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করুন। প্রকল্পের অগ্রগতি সমন্বয় সভা কখন কীভাবে হবে, সেটি পূর্বেই সংশিষ্টদের নিয়ে পরিকল্পনা করুন অথবা অবগত করুন। অগ্রগতি সমন্বয় সভাগুলো নিয়মিত আয়োজন করুন, তবে যথাসম্ভব সহজ, স্বল্পদৈর্ঘ ও সংক্ষিপ্ত রাখুন। এসব সভায় যেন অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ করে আগেই সবকিছু চূড়ান্ত করে রাখুন। সম্ভাব্য ব্যর্থতা বা দুর্বলতাগুলো সম্পর্কে আগেই তথ্য সংগ্রহ করে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকুন। অগ্রগতি সমন্বয় সভাগুলো মানসিক চাপমুক্ত এবং প্রাণচঞ্চল রাখুন এবং কর্মীদেরকে সামর্থ্য মোতাবেক পরিচালনার দায়িত্ব দিন।

 

৭) কর্মীকে তার কাজের বিপরীতে যথাযথ ফিডব্যাক দিন

কর্মীদেরকে যথাসময়ে তাদের কাজের বিপরীতে আপনার মনোভাব জানিয়ে দিন। নেতিবাচক হলে ব্যক্তিগতভাবে, ইতিবাচক হলে সমন্বয় সভায়। ইতিবাচক বলার সময় আন্তরিক এবং উদার হোন, নেতিবাচক বলার সময় নিজের ভাবাবেগকে নিয়ন্ত্রণ করুন। ব্যক্তিগত সাক্ষাতে নেতিবাচক ফিডব্যাক দেবার সময়, অবশ্যই কর্মীর ইতিবাচক দিকটিকে প্রথমত জানিয়ে দিন। নেতিবাচক সংবাদটিকে যথাসম্ভব কম কথায় এবং সরাসরি জানিয়ে দিন। সে সাথে জানিয়ে দিন কর্মীর প্রতি আপনার ইতিবাচক এবং আশাবাদী মনোভাবটুকু। নেতিবাচক ফিডব্যাগ যেন কোন পক্ষেই হতাশার সৃষ্টি না করে, সেদিকটি খেয়াল রাখতে হবে।

 

৮) প্রকল্প ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তির সুযোগ নিন

প্রকল্প ব্যবস্থাপনার যে অ্যাপলিকেশন আছে, সেটি প্রাসঙ্গিকতা সাপেক্ষে ব্যবহার করুন। পরিকল্পনা গ্রহণ, অগ্রগতির সমন্বয়, চেকলিস্ট রাখা, যোগাযোগ ইত্যাদি কাজে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করুন। ইমেলের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ, বিস্তৃত এবং স্পর্শকাতর বিষয়গুলো আলোচনা করে ফায়সালা করে নিতে পারেন। অনেকেই অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ মাধ্যম টেক্সট মেসেজের সুবিধা নিয়ে থাকেন। তাতে কাজের পরিস্থিতি হালকা থাকে, সৃষ্টি হয় মানবিক যোগাযোগ।

 

৯)  প্রকল্পের অগ্রগতিকে সবার কাছে দৃশ্যমান রাখুন

অগ্রগতি সমন্বয় সভার পর প্রকল্পের অগ্রগতি এবং আসন্ন কর্মসূচিকে সবার সামনে দৃশ্যমান রাখুন। কেউ কেউ একটি ভালো অবস্থানে না পৌঁছানো পর্যন্ত অগ্রগতির চিত্র প্রকাশ করেন না। আবার কেউ কেউ নেতিবাচক পরিস্থিতি না হওয়া পর্যন্ত তা কর্মীদের সামনে আনতে চান না। কর্মীদের মনস্তাত্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নিন। তবে স্ট্যান্ডার্ড হলো, প্রকল্পের অগ্রগতি সবার সামনে রাখা, সেটি ইতিবাচক বা নেতিবাচক যা-ই হোক। প্রকল্পের অগ্রগতির স্বার্থেই এর সঠিক চিত্র কর্মী এবং স্টেইকহোল্ডার জানা উচিত। প্রকল্পের ভৌগলিক চিত্রটিও শুরু থেকেই সবার সামনে রাখুন, এটি ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি করে।

 

১০)  প্রকল্পের সফলতার জন্য আপনার ব্যক্তিগত আগ্রহ দেখান

প্রকল্প একটি প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় হলেও কর্মীদের ব্যক্তিগত আবেগের প্রয়োগ না হলে প্রকল্পটি সঠিক মানদণ্ড নিয়ে সফল হবে না। কোন যান্ত্রিক অথবা আমলাতান্ত্রিক উপায়ে কর্মীদের ব্যক্তিগত আবেগের প্রয়োগ করা যায় না। একটিই উপায়, সেটি হলো প্রকল্প ব্যবস্থাপককে ব্যক্তিগতভাবে কাজটিকে নিতে হবে। প্রকল্পের সফলতার সাথে নিজেকে জড়িত রেখে এর পেছনে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে সময় ও শ্রম দিতে হবে। প্রকল্প প্রধান পরিশ্রমী ও আন্তরিক না হলে, কর্মীদের কাছ থেকে সেটি আশা করা যায় না। পরিশ্রমী এবং নিবেদিতপ্রাণ কর্মীকে যথাযথভাবে পুরস্কৃত করুন।

 

১১)  পৃষ্ঠপোষক সংস্থার সাথে যথাযথ সম্পর্ক রক্ষা করুন

পৃষ্টপোষক সংস্থা বা প্রধান অফিসকে কাজের অগ্রগতি ও চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট এবং ইতিবাচক তথ্য প্রদান করুন। প্রকল্পের কাজে ও বাজেটে কোন পরিবর্তন আনতে হলে উপযুক্ত কারণ ও প্রমাণ প্রদর্শন করুন। যত আগে সম্ভব, ততই মঙ্গল। প্রকল্প ব্যবস্থাপক তার আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্ব দিয়ে উপস্থাপনা করলে এসব বিষয় খুব সহজেই নিরসন হয়। কোন বিষয়ে সহযোগিতা বা অংশগ্রহণের প্রয়োজন হলে সেটি যথাসময়ে প্রধান অফিসকে অবগত করুন। আপনার এখতিয়ারের বাইরে কোন কাজ করে, পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের অনাস্থার শিকার হবেন না, সেটি আপনার প্রকল্পের সফলতার জন্য মঙ্গলজনক হবে না।

 

১২)  প্রকল্পের পক্ষ-বিপক্ষ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে উপযুক্ত যোগাযোগ রক্ষা করুন

নির্দিষ্ট ছক ও নির্দেশনা অনুযায়ি যারা প্রকল্পের পক্ষ বা বিপক্ষ তাদেরকে উপযুক্তভাবে প্রকল্পের কাজে সম্পৃক্ত করুন। এক্ষেত্রে প্রকল্প ব্যবস্থাপকের যোগাযোগ দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা ও উপস্থিত জ্ঞান অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে। সাধারণত বিপক্ষ শক্তিই প্রকল্প বাস্তবায়নের ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দেয়। প্রকল্প ব্যবস্থাপককে মনে রাখতে হবে যে, তার পক্ষ শক্তিই বেশি প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাবান। এবিষয়টি কাজে লাগাতে পারলে, প্রকল্পের প্রতিপক্ষ কোন ক্ষতি করতে পারে না। উপযুক্ত কর্মী ব্যবস্থাপনা অনেক ঝুঁকিকে দৃশ্যমান হবার আগেই কমিয়ে আনতে পারে।

 

১৩) গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সংরক্ষণ করুন

কর্মীসহ নির্দিষ্ট পক্ষ-বিপক্ষের সাথে সংঘটিত সব বিষয়ের যথাযথ নথিভুক্তি নিশ্চিত করুন। নিশ্চিত করুন যে, সব আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র প্রকল্পের মূল লক্ষ্যের সাথে সমানুপাতিক। আলোচনায় অনেক কিছুই আসে, অনেক অনানুষ্ঠানিক বা বিস্তারিত বিষয় চলে আসে। নথিভুক্তিতে শুধুমাত্র প্রাসঙ্গিক এবং ‘প্রকল্পের মূল দলিলের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি’ অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে সংশ্লিষ্ট খুটিনাটি কাগজপত্র, সমর্থনসূচক ছোটখাট নোট  ইত্যাদি অত্যন্ত তুচ্ছ হলেও প্রকল্পের প্রতিবেদন তৈরিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দলিলে পরিণত হয়। প্রকল্প শেষ হলে এর সফলতা ও ‘অর্জিত অভিজ্ঞতা’ নিয়ে প্রবন্ধ লিখুন এবং প্রকাশ করুন। এটি খুব দরকার।

 

13-steps-topm-crop

প্রকল্পকে বাস্তবায়নের পথে নিয়ে যেতে হলে অনেক কৌশলগত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যা প্রকল্প ব্যবস্থাপক তার প্রকল্পের পরিক্রমায় জানতে পারেন। কিছু বিষয় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই মোকাবেলা করতে হয়, শিখিয়ে দেওয়া যায় না। তবে সেই অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য যে মৌলিক যোগ্যতা প্রকল্প ব্যবস্থাপকের প্রয়োজন, সেটিই উপরে তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো।  পাঠকের মন্তব্য থেকে আরও কিছু শেখার আশা করছি।

 

পরবর্তি পর্বে নিয়ে আসবো প্রকল্পের ব্যর্থতা বিষয়ক আলোচনা।

 

 

পূর্বের পর্বগুলো:

▶ পর্ব ৫:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনা: পেশাদারিত্ব কার দায়?

▶ পর্ব ৪:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া: পেশাদারিত্বের শুরু

▶ পর্ব ৩:  ৯টি তত্ত্বে প্রকল্পের সংজ্ঞা এবং সহজ কিছু দৃষ্টান্ত

▶ পর্ব ২:  যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনে প্রকল্প আমাদেরকে উপকৃত করে

▶ পর্ব ১:  প্রকল্প ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে

 


Sources consulted:

1. European Commission, EuropeAid Cooperation Office (2004) Aid Delivery Delivery Methods: Project Cycle Management Guidelines. Brussels, Belgium.

2. Institute, P.M. and Project, M.I. (2013) A guide to the project management body of knowledge (PMBOK guide). Fifth Edition. United States: Project Management Institute.

প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া। পর্ব ৪

banner-crop

প্রকল্প ব্যবস্থাপক থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক, পর্ব ৪। আলোচ্য বিষয়, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার পাঁচটি প্রক্রিয়া নিয়ে সহজ কিছু কথা। উন্নয়ন প্রকল্পে ‘বেইসলাইন’ বলে একটি বিষয় থাকে। বেইসলাইন হলো যেখান থেকে প্রকল্পের অগ্রগতি হিসেব করা যায়। পর্বতারোহীরা একেকটি ‘বেইস’ অতিক্রম করে পর্বতশৃঙ্গের দিকে এগিয়ে যায়।  একেকটি ‘বেইস’ থেকে পরিমাপ করা যায় কতটুকু উচ্চতায় আরোহীরা ওঠতে পেরেছে।  অতএব বেইসলাইনকে ‘প্রকল্প শুরুর পূর্বের  অবস্থা’ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বেইসলাইন সঠিক এবং গ্রহণযোগ্য হতে হয়, কারণ এর ওপর ভিত্তি করে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা বিবেচিত হয়। এটি প্রকল্পের প্রাথমিক পরিধি নির্ণয় করার জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রকল্পের সফলতা প্রমাণ করার জন্যও অত্যাবশ্যক। কিন্তু বেইসলাইনের পাশাপাশি একটি প্রকল্পে কী কী কাজ কীভাবে করতে হয়, সেসম্পর্কে পরিচ্ছন্ন দিকনির্দেশনা না থাকলে, শুদ্ধ বেইসলাইন থাকলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে না। এপর্বে প্রকল্পের বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এবং উন্নয়ন প্রকল্পের কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা হবে।

প্রকল্পের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে হলে এবিষয়গুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি:

  • প্রকল্পের শুরু কোথা থেকে হয়? কোন্ অবস্থায় গেলে বলা যায়, প্রকল্পটি শুরু হলো?
  • প্রকল্পের শেষ কোথায়? কোন্ অবস্থানে পৌঁছালে বলা যায়, প্রকল্পটি শেষ হলো?
  • উন্নয়ন প্রকল্পে কী কী বিষয় থাকতে হয়?
  • সাধারণত প্রকল্পে কী কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়?

 

 

▶ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কর্তৃক গৃহীত প্রকল্পের সংজ্ঞা ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা চক্র

ইউরোপিয়ান কমিশন (ইইউ’র উদ্যোগ) উন্নয়ন প্রকল্পের সংখ্যা দিয়েছে এভাবে: প্রকল্প হলো কতগুলো ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডের সমষ্টি যার উদ্দেশ্য হলো নির্দিষ্ট মেয়াদে এবং নির্দিষ্ট খরচে কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের বাস্তবায়ন।

তাদের মতে প্রকল্পের থাকতে হবে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য:

>সুনির্দিষ্ট অংশীজন/স্টেইকহোল্ডার, বা প্রকল্পের সাথে জড়িত বিভিন্ন পক্ষসমূহ। তারা প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রত্যক্ষ/পরোক্ষভাবে এবং ইতিবাচক/নেতিবাচকভাবে প্রভাব বিস্তার করে।

কাজের সমন্বয়, কাজের ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক বিষয়াদির সুস্পষ্ট বর্ণনা।

>একটি তত্ত্বাবধান এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি নিশ্চিত হবে।

>আর্থিক এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ, যাতে মনে হবে যে আর্থিক খরচের চেয়েও প্রকল্পের উপকারিতা অধিক।

 

pcm_ec1

ইউরোপিয়ান কমিশন প্রকল্প ব্যবস্থাপনার জন্য ‘প্রকল্প ব্যবস্থাপনা চক্র’ নামে কিছু পারম্পরিক কার্যাবলীকে তুলে ধরেছে, যা উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য আদর্শ। এই চক্র মানে হলো ‘একটির পর আরেকটি’ কাজের বিন্যাস। একটির ‘আগে’ আরেকটি করা চলবে না।

১.  কর্মসূচি/প্রোগ্রাম:  কোন দেশের উন্নয়নের জন্য ইউরোপিয়ান কমিশনের কৌশলগত অবস্থান। এপর্বে পৃষ্ঠপোষক/দাতা কোন্ দিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সেটি বাস্তবায়নের নিরীখে বিবেচিত হয়। কর্মসূচি হলো প্রকল্পের বৃহৎ রূপ।

২.  প্রকল্প চিহ্নিতকরণ: প্রকল্প গ্রহণের উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করে নির্দিষ্ট উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

৩.  প্রকল্প পরিকল্পনা:  কাজ ও আর্থিক বিষয়গুলো উদ্দেশ্যের সাথে সমন্বয় রেখে বিস্তারিতভাবে লেখা হয়। এপর্যায়ে আর্থিক সহযোগিতা নিশ্চিত হয়।

৪.  বাস্তবায়ন:  উদ্দেশ্যের সাথে সমন্বয় রেখে প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের বাস্তবায়ন ও তত্ত্বাবধান করা হয়।

৫.  মূল্যায়ন:  প্রকল্পের অর্জনকে নির্দিষ্ট মাপকাঠিতে পরিমাপ করা হয় এবং অর্জিত অভিজ্ঞতা নথিভুক্ত করা হয়।

 

▶ ব্যবস্থাপনা চক্র এবং ব্যবস্থাপনা ‘প্রক্রিয়া’ এক নয়

ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রকল্প ব্যবস্থাপনা চক্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের স্তর বিন্যাস করা হয়েছে। তাদের প্রকল্প ব্যবস্থাপনা চক্রে প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অত্যাবশ্যক বিষয়গুলো ওঠে এসেছে।  তাতে ‘প্রকল্প ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়াগুলো’ আলোচনা সহজ হবে।

একটি প্রকল্প শুরু হয় সুনির্দিষ্ট কিছু উদ্দেশ্য ও সীমিত মেয়াদ নিয়ে। এর সাথে থাকে সুনির্দিষ্ট কিছু পক্ষ। প্রকল্পের কার্যাবলীতে অপ্রাসঙ্গিক কোন বিষয় বা কাজ থাকা মানেই হলো, প্রাসঙ্গিক এবং দরকারি কাজের অনুপস্থিতি। অনির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার মানেই হলো, সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে সময় দিতে না পারা। প্রকল্পকে সফল সমাপ্তির দিকে পরিচালনা দিতে হলে দরকার কিছু সুনির্দিষ্ট দক্ষতা, জ্ঞান ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা। পেশাদারী রীতিতে প্রকল্পের কর্মকাণ্ডকে পরিচালনা দিয়ে একে বাস্তবায়ন করে সমাপ্তির দিকে নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজন কিছু সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া। এই লেখায় সেই সার্বজনীন প্রক্রিয়াগুলোকে পরিচিত করানো হবে।

 

▶ প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া

একটি প্রকল্পের চিন্তা সংশ্লিষ্টদের মাথায় আসার সাথে সাথেই বলা যায়, প্রকল্পের ‘আরম্ভের শুরু’। তাই ‘আরম্ভকে’ প্রকল্প পরিকল্পনায় একটি পর্যায় বা প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এপর্যায়ে যত তথ্য-উপাত্ত সংগৃহীত হবে, এসবই প্রকল্পের ‘পরিকল্পনার’ জন্য আবশ্যক।  ফলে ‘পরিকল্পনাকে’ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরিকল্পনার পর স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে ‘বাস্তবায়নের’ কথা। বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সাথে ‘তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ’ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।  সঠিকভাবে তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করার ফলশ্রুতিতে আসে একটি প্রকল্পের সফল ‘সমাপ্তি’।

সাধারণভাবে ৫টি প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা সীমাবদ্ধ: ১) আরম্ভ ২) পরিকল্পনা্ ৩) বাস্তবায়ন ৪) তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ এবং ৫) সমাপ্তি। একটি প্রকল্পকে আরম্ভ থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত নিয়ে যাবার পথে প্রক্রিয়াগুলো ‘পাশাপাশি’ কাজ করে।

পাঁচটি প্রক্রিয়া স্বাধীন, অর্থাৎ প্রকল্পের সফলতার জন্য আলাদভাবে প্রতিটি প্রক্রিয়ার সমাপ্তি হওয়া প্রয়োজন। তবে স্বাধীন হলেও প্রক্রিয়াগুলো পৌনপুনিক এবং পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। একটি আরেকটির সাথে জড়িত। আরম্ভ না হলে পরিকল্পনা বা বাস্তবায়নের চিন্তা করা যায় না। তেমনিভাবে তত্ত্বাবধান না করলে প্রকল্পের কাজগুলো সঠিকভাবে নির্ধারিত সময়ে শেষ হবে না। ফলে প্রকল্পটি ‘সমাপ্তির’ দিকে যেতে পারবে না।

‘পৌনপুনিক’ বলতে বুঝানো হচ্ছে যে, একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে ‘আরম্ভ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন তত্ত্বাবধান এবং সমাপ্তি’ থাকতে হয়। নতুবা কাজগুলো প্রকল্পের শর্ত পূরণ করে শেষ হতে পারবে না। যেমন: পরিকল্পনার সাথে বাস্তবায়ন এবং বাস্তবায়নের পরিকল্পনার বিষয়গুলো পৌনপুনিক। বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পরিস্থিতি বিবেচনায় কোন পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করতে চাইলে, পরিকল্পনায় সংশোধন আনতে হবে। তবে এসব পরিবর্তনের জন্য সুনির্দিষ্ট যুক্তি এবং প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। কারও খামখেয়ালিমতো কোন প্রতিষ্ঠিত পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা যায় না।

 

processgroup-best

 

১) আরম্ভ:

  • প্রকল্পের প্রাথমিক পরিধি/সীমানা/কার্যাবলী নির্ধারণ
  • আর্থিক উৎস নির্ধারণ
  • প্রকল্পের পৃষ্ঠপোষক ও কর্মীসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনকে চিহ্নিতকরণ
  • তথ্য সংগ্রহ

 

২) পরিকল্পনা:

  • প্রকল্পের লক্ষ্য কাজ ও খরচের সীমানা নির্ধারণ
  • পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্টানের সাথে কৌশল ও পদ্ধতিগত সম্পর্ক সুস্পষ্ট করা
  • পরিকল্পনা বিষয়ক কাগজপত্র: যেমন, প্রকল্প প্রস্তাবনা বা প্রকল্প ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা

 

৩) বাস্তবায়ন:

  • কর্মী ও উপকরণের ব্যবস্থাপনা
  • পৃষ্ঠপোষক ও সংশ্লিষ্ঠ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশা মোতাবেক কাজের অগ্রগতি
  • পরিকল্পনা মোতাবেক কাজের বাস্তবায়ন ও সম্ভাব্য সমন্বয় সাধন

 

৪) তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ:

  • পরিকল্পনার সাথে অগ্রগতির তদারকি
  • বর্তমান সমস্যার সমাধান এবং ভবিষ্যত প্রতিবন্ধকতার পূর্বাভাস প্রদান
  • সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর (প্রকল্পের মালিক, দাতা, সুবিধাভোগী, ক্রেতা) মধ্যে সমন্বয় সাধন

 

৫) সমাপ্তি:

  • কাজ ও চুক্তির সমাপ্তি নিশ্চিতকরণ
  • কাজের মূল্যায়ন ও অনুমোদন: শেষ না হলেও ‘শেষ’ বলে বিবেচনা করতে হতে পারে
  • তথ্য ও ফলাফল (প্রতিবেদন, অভিজ্ঞতার বিবরণ) সংগ্রহ করা
  • সমাপনী আনুষ্ঠানিকতাগুলো পরিকল্পনামতো শেষ করা

 

প্রকল্পের পাঁচটি অত্যাবশ্যক প্রক্রিয়া সম্পর্কে ‘প্রাথমিক ধারণা’ দেবার জন্য যথাসাধ্য সংক্ষেপ করা হলো। প্রাসঙ্গিক আলোচনার সময় আরও দৃষ্টান্ত এবং বিস্তৃত আলোচনা করা হবে।

 


Sources consulted:

1. European Commission, EuropeAid Cooperation Office (2004) Aid Delivery Delivery Methods: Project Cycle Management Guidelines. Brussels, Belgium.

2. Institute, P.M. and Project, M.I. (2013) A guide to the project management body of knowledge (PMBOK guide). Fifth Edition. United States: Project Management Institute.

প্রকল্প সম্পর্কে ৯টি ধারণা এবং কিছু সহজ দৃষ্টান্ত। পর্ব ৩

 

Capture3

 

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক, পর্ব ৩। এবারের বিষয় প্রকল্পের ধারণা। প্রকল্প সম্পর্কে একদমই ধারণা নেই, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু ভাষা বদলের পাশাপাশি প্রকল্পের ধারণাও বিস্তৃতি পেয়েছে। এখন আর প্রজেক্ট কোন নির্দিষ্ট কাজের সাথে আবদ্ধ নেই। প্রকল্প একটি সার্বজনীন ধারণায় রূপ নিয়েছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এখন যেকোন কাজের সাথে যুক্ত করা যায়। তবু কিছু মৌলিক বিষয় প্রায় একই আছে। একটি বিষয় এখনও বদলায় নি, তা হলো, প্রকল্পে থাকতে হবে সুর্নিদিষ্ট উদ্দেশ্য। একটি প্রকল্পে এক বা একাধিক উদ্দেশ্য থাকবে, যা নির্দিষ্ট সময়ে অর্জিত হবে।

প্রকল্প সম্পর্কে লেখালেখি শুরু করার প্রথম উদ্দেশ্য ছিলো, বাংলা ভাষায় প্রকল্পের জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা, যেন প্রজেক্ট-এর মৌলিক ধারণাগুলো পাঠকের মস্তিষ্ক এবং মননে স্পর্শ করতে পারে। এপর্বে উদাহরণসহ প্রকল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচিত হলো।

 

▶ প্রকল্প সম্পর্কে ৯টি টুকরো ধারণা

১)  প্রকল্প একটি ‘সাময়িক উদ্যোগ’ যার উদ্দেশ্য হলো: একটি নির্দিষ্ট পণ্য, সেবা অথবা ফলাফল সৃষ্টি করা। এই অস্থায়ি স্বভাবের কারণেই প্রকল্পের নির্দিষ্ট শুরু এবং শেষ আছে।

২)  সাময়িক/ অস্থায়ি মানে এই নয় যে, প্রকল্পটি স্বল্পমেয়াদি। স্বল্পমেয়াদি বা দীর্ঘমেয়াদি যেকোন একটি হতে পারে। মূল বিষয়টি হলো, এটি চিরকালীন বা অনির্দিষ্ট নয়। এবং এর কর্মকাণ্ড ও মেয়াদ সুনির্দিষ্ট। প্রতিষ্ঠান এবং ‘কর্মসূচির’ সাথে তুলনা করলেই এর পার্থক্য স্পষ্ট দেখা যায়।

৩) প্রকল্পকে বলা যায় একটি সিঁড়ি বা পথপরিক্রমা, যার মাধ্যমে আমরা একটি উচ্চতায় পৌঁছাই। ‘গন্তব্যে যাওয়াকে’ মনে করি প্রকল্পের উদ্দীষ্ট ফল। এই গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত যত প্রচেষ্টা বা আয়োজন, সেটির নাম হতে পারে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা। যিনি সেটি পরিচালনা করেন, তিনি হতে পারেন প্রকল্প ব্যবস্থাপক। করপোরেট পর্যায়ে একটি প্রোডাক্ট বা পণ্যের পরিকল্পনা, বাজার গবেষণা, পণ্যের উৎপাদন এবং বিস্তৃত বাজারে সেটি পৌঁছানো পর্যন্ত কর্মকাণ্ডকে প্রজেক্ট হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে।

৪)  কয়েকটি ‘অবধারিত কারণে’ প্রকল্পের পরিসমাপ্তি ঘটে। যেমন: ক. প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হলে; খ. প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে; গ. পরিস্থিতির কারণে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পেলে/ না থাকলে; অথবা ঘ. প্রকল্পের মালিক বা পৃষ্ঠপোষক সেটি আর চালাতে না চাইলে।

৫) প্রকল্প সাময়িক, কিন্তু এর ফলাফল সাময়িক নয়।  একটি ‘প্রকল্পের পরিণতি’ যুগ যুগ ধরে প্রজন্মান্তরে টিকে থাকতে পারে। যেমন: সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ অথবা যমুনার নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু। ক্যানসার নিরাময়ের কারণ অনুসন্ধানের সাথে জড়িত ‘বিশেষায়িত গবেষণাকে’ একটি প্রকল্প বিবেচনা করলে, বুঝতে পারা যায় প্রকল্পের ফল কত ব্যাপক। অতএব, প্রকল্পের ফল মূর্ত এবং বিমূর্ত (বস্তুগত এবং ধারণাগত) উভয়ই হতে পারে।

৬) ‘অনন্যতা’ বা তুলনাহীনতাকে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়। একটি প্রকল্পের উদ্দেশ্য বা ফলাফল অন্যটির সাথে মিল থাকতে পারে না। তাহলে সেটি প্রকল্প নয়, কর্মসূচি। কর্মসূচি হলো প্রতিষ্ঠানের চলমান এবং পৌনপৌনিক কাজ। কিন্তু প্রকল্পের থাকে নিজস্ব কিছু উদ্দেশ্য, কলাকৌশল এবং সুবিধাভোগী। একই ডিজাইনের বিল্ডিং হলেও, ভৌগলিক অবস্থান এবং বিভিন্ন ক্রেতার কারণে একেকটি বিল্ডিং নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অনন্য।

৭)  প্রজেক্ট দৈনন্দিন কার্যক্রম (অপারেশনস) থেকে আলাদা। প্রজেক্ট সাময়িক, কিন্তু অপারেশনস চলমান। প্রজেক্ট নির্দিষ্ট মেয়াদে শেষ হয়ে যায়, অপারেশনস পৌনপুনিক। উদ্দেশ্য, কাজ এবং কৌশলের দিক দিয়ে প্রাত্যাহিক কাজের সাথে প্রজেক্টকে মেলানো যায় না।  কিছু বিশেষ উদ্দেশ্য, সমস্যা বা ফলাফলকে লক্ষ্য করে প্রকল্প ‘বাস্তবায়িত’ হয়।  প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য কার্যক্রম ‘পরিচালিত’ হয়। নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এবং অংশীজনকে (stakeholder) কেন্দ্র করে প্রকল্প পরিকল্পিত হয় বলে এর বাস্তবায়নের জন্য বিশেষায়িত জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কাজের লক্ষ্য হলো ‘কাজটি সঠিকভাবে করা বা চালিয়ে যাওয়া’, কিন্তু প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো দ্বিমুখী, ‘কাজটি সঠিকভাবে শুরু করা’: সঠিক এবং শুরু। প্রকল্প ও কার্যক্রমে (অপরাশেনস) সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ভূমিকাগুলো আলাদাভাবে বিবেচনা করলে এসব পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

৮)  প্রকল্পকে আরও বুঝতে পারার জন্য কয়েকটি সহজ দৃষ্টান্ত হতে পারে এরকম: ক. কোন একটি পণ্যের উদ্ভাবন করা, যা হতে পারে সম্পূর্ণ নতুন অথবা পূর্বের কোন পণ্যের বর্ধিত রূপ; খ. প্রতিষ্ঠানের পণ্য উৎপাদন/বিপণনে নতুন সক্ষমতা সৃষ্টিকারী কোন পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ার উদ্ভাবন; গ. বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনের সমন্বয়ে একটি সফল সম্মেলনের আয়োজন করা; ঘ. একটি নির্দিষ্ট এলাকার অধিবাসীদের সামাজিক, আর্থিক, আচরণগত বা স্বাস্থ্যগত সমস্যার সমাধানে বিশেষ সুফল দেখাতে পারা; ঙ. একটি নির্দিষ্ট এলাকায় শতকরা হিসেবে সাক্ষরতার হার বাড়াতে পারা; চ. প্রতিষ্ঠানের চলমান কার্যক্রমে নতুন একটি কৌশলের উদ্ভাবন এবং/বা সফল প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারা; ছ. একটি সফল গবেষণা সম্পন্ন করতে পারা যা থেকে পরীক্ষীত ফলাফল/প্রমাণাদি পরিবর্তিতে ব্যবহার করা যায় ইত্যাদি।

৯) গান্ট চার্টের (বিশেষ প্রকার মূল্যায়ন ছক) প্রণেতা হেনরি লরেন্স গান্টকে (১৮৬১-১৯১৯) প্রকল্প ব্যবস্থাপনার জনক বলা হয়। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন যান্ত্রিক প্রকৌশলী ছিলেন। প্রকল্প পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং নিয়ন্ত্রণের কিছু জনপ্রিয় কৌশল আবিষ্কার করেন মিস্টার গান্ট। উনবিংশ শতাব্দির প্রথম দশকে তিনি গান্ট চার্টের প্রবর্তন করে ব্যবস্থাপনার কাজকে সকলের জন্য সহজতর করে দেন। তবে এউদ্দেশ্যে প্রথম চার্টটি আবিষ্কৃত হয় ১৮৯০ সালে পোলিশ প্রকৌশলী ও অর্থনীতিবিদ ক্যারল অ্যাডামেকি’র মাধ্যমে। বর্তমানে আমরা অনেক অগ্রসর সময়ে বাস করছি এবং আরও ব্যাপক গবেষণার ফল হিসেবে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় এসেছে আমূল পরিবর্তন।

 

প্রকল্প পরিকল্পনার সহজ কিছু ধাপ/পর্যায়

  • সমস্যা চিহ্নিতকরণ অথবা প্রকল্প হিসেবে নেবার প্রয়োজন আছে কিনা যাচাই করা।
  • সম্ভাব্য সমাধানের উপায় নির্ধারণ করা, যা পরবর্তিতে আরও সুষ্পষ্ট হবে।
  • প্রত্যাশিত সুফল বা গন্তব্য নির্ধারণ করা।
  • কী কী প্রচেষ্টা/উপকরণ দিতে হবে সেটি স্পষ্ট করা।
  • কোন্ কোন্ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে কী প্রকার যোগাযোগ করতে হবে সেটি নির্ধারণ করা।
  • কাজকে সামর্থ্য মোতাবেক ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করে নেওয়া।
  • সম্ভাব্য বিপদ/ প্রতিবন্ধকতা/ ব্যর্থতাগুলো চিহ্নিত করা।
  • সময়ছক নির্ধারণ করা: কোন্ সময়ান্তে কোন্ কাজটি শেষ হবে সেটি নির্ধারণ করা।
  • সময়ছক অনুসারে প্রজেক্ট বাস্তবায়নে মনোনিবেশ করা: শেষ না হওয়া পর্যন্ত একটি কাজে মনযোগ ধরে রাখা।
  • সম্পন্ন কাজগুলো ভালোভাবে চিহ্নিত করে রাখা এবং সেটি সবসময় দৃষ্টির সামনে রাখা।
  • দিন/সপ্তাহ/মাস শেষে সম্পন্নকৃত কাজের অবস্থা/অগ্রগতি/ফলাফল দেখা।
  • লক্ষ্যে পৌঁছাবার স্বার্থে সম্ভব হলে প্রক্রিয়া/পদ্ধতি/সময়ছককে পরিবর্তন/শিথিল/সহজ করা।
  • প্রয়োজনে কর্মপরিকল্পনায় পরিবর্তন/সংশোধন আনা।
একটি আউটলাইন: পরিকল্পনার কাজটি সহজ শর্তে শুরু হওয়া উচিত

>একটি আউটলাইন: পরিকল্পনার কাজটি সহজ শর্তে শুরু হওয়া উচিত

 

▶ যেসব কারণে প্রকল্প আমাদের জীবনকে সহজ করে দেয়

  • প্রকল্প মানে হলো, কোন কাজে বিশেষভাবে মনোনিবেশ করার সুযোগ সৃষ্টি।
  • প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হলে, কাজকে যুক্তিসঙ্গতভাবে (ভালোমন্দ পক্ষপাতহীনভাবে বিবেচনা করা যায়) পরিকল্পনা করা যায়।
  • প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে তাৎপর্যপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।
  • ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং পেশাগত কাজগুলো গঠনমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ হয়।
  • যে কাজটি জটিল এবং সময়সাপেক্ষ, সেটিকে প্রকল্প হিসেবে নিতে পারি।
  • একটি ক্ষুদ্র প্রকল্প সম্পন্ন করতে পারলে নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।
  • একটি নতুন ভাষা/দক্ষতা শেখার কাজকে প্রকল্প হিসেবে নিতে পারি।
  • বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি/ সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুতির কাজকে প্রজেক্ট হিসেবে নিতে পারি।
  • নিজের দেহের অস্বাভাবিক ওজন/অসুস্থতাকে ধারাবাহিক উপায়ে কমাবার জন্য প্রকল্প হিসেবে নিতে পারি।

 

 

▶ পর্ব ২:  যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনে প্রকল্প আমাদেরকে উপকৃত করে

▶ পর্ব ১:  প্রকল্প ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে


Sources consulted:

1. Profile of Henry Gantt & the history of the Gantt chart (2012) Available at: https://www.siliconbeachtraining.co.uk/blog/profile-of-henry-gantt-history-of-gantt-chart (Accessed: 2 September 2016).

2. History.com (no date) Karol Adamiecki 1896. Available at: http://projectmanagementhistory.com/The_Harmonogram.html (Accessed: 2 September 2016).

3. Gantt (2016) What is a Gantt chart? Gantt chart information, history and software. Available at: http://www.gantt.com/ (Accessed: 2 September 2016).

4. Institute, P.M. and Project, M.I. (2013) A guide to the project management body of knowledge (PMBOK guide). Fifth Edition. United States: Project Management Institute.

যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনেও ‘প্রকল্প’ আমাদেরকে উপকৃত করে। পর্ব ২

capture2

 

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক, পর্ব ২। এপর্বের উদ্দেশ্য হলো আমাদের দৈনন্দিন কাজের সাথে কীভাবে ‘প্রজেক্ট ধারণাটি’ জড়িয়ে আছে, সেটি তুলে ধরা।

কাজই জীবন। আর জীবন হলো কাজমুখী আচরণের সমষ্টি। দৈনন্দিন জীবনে আমরা অনেক কাজ করে থাকি, যার উদ্দেশ্য থাকে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ও ঠিক করা থাকে। এসব কাজের কিছু লক্ষ্য আছে স্বল্পমেয়াদি; কিছু দীর্ঘমেয়াদি।

আমরা কাজ করি এবং তাতে প্রয়োজনীয় সময় ও প্রচেষ্টা প্রয়োগ করি। পরিশেষে কিছু সুফল প্রত্যাশা করি, যার কিছু পরিমাপ করা যায়, কিছু সুফলকে গাণিতিকভাবে পরিমাপ করা যায় না। পরিমাপ করতে পারি অথবা না পারি, কাজ শেষে একটি ফল বা পরিণতি তো অবশ্যই থাকে।

এসব কাজের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে থাকে অনেক পক্ষ। তারা ব্যক্তি অথবা সংস্থা উভয়ই হতে পারে। এসব ব্যক্তি বা সংস্থা আমাদেরকে উপকরণ অথবা পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করে। অন্যরা হয়তো সাহায্য করে না, তবে অংশগ্রহণ দিয়ে একটি কাজকে সফল এবং/বা তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।  এসবই হলো একটি প্রকল্পের কিছু আনুষঙ্গিক উপাদান।

প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে আমরা যখন এসব বিষয়কে দেখি, তখন আরও পেশাদারভাবে তা মূল্যায়ন করতে পারি এবং অধিকতর সুফল নিশ্চিত করে পারি। একটি প্রকল্পে যারা সুবিধাভোগী, তারা স্বাভাবিকভাবেই এর বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে। কিন্তু যারা ওই প্রকল্পের কারণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তারা কোনভাবেই ওটাতে সাহায্য দেবে না, বরং বাধাগ্রস্ত করতে চাইবে। একটি দৃষ্টান্ত দেই। গ্রামীন জনপদে একটি পায়ে-চলার রাস্তা নির্মাণ করতে গেলে, আমরা প্রথমেই জমিদাতার বিরোধীতার শিকার হয়েছিলাম।

‘প্রকল্প তত্ত্বে’ মজার বিষয়টি হলো, প্রকল্প বাস্তবায়নে যারা প্রতিপক্ষ অথবা বৈরিতা সৃষ্টি করে, তারাও প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত হয়। তাতে প্রকল্প প্রধান ওসব প্রতিপক্ষ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ইতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ পান। এভাবে প্রতিপক্ষকেও যথাযোগ্য গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পের সুফল নিশ্চিত করা হয়।।

 

কীভাবে প্রজেক্ট বা প্রকল্পের ধারণা আমাদের দৈনন্দিন কাজগুলোকে ফলদায়ক এবং উদ্দেশ্যমুখী করে তোলে?  কীভাবে প্রকল্প তত্ত্ব দিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত এবং পেশাগত কাজকে আরও সফল করে তুলতে পারি? আমরা দেখতে পাবো যে, কাজকে ‘প্রকল্প’ হিসেবে গ্রহণ করলে, কাজে মনসংযোগ বেড়ে যায় এবং সংশ্লিষ্ট মানুষগুলোর সাথে ভবিষ্যতমুখী সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।

প্রকল্পভিত্তিক কাজ আমাদেরকে নিম্নোক্ত সুবিধা এনে দেয়:

১)  কাজ শুরু এবং শেষ করার ‘সময়’ নির্দিষ্ট থাকে। তাতে কাজে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনিবেশ করা যায়, যেন নির্দিষ্ট দিনে কাজটি শেষ হয়। শুরু এবং শেষ করার ‘সময়’ নির্ধারণ করা থাকলে অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট হয় না, অথবা অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে মনযোগ যায় না। নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করার জন্য বাকি সব উপাদান উদ্দেশ্যমাফিক প্রয়োগ করা হয়। এভাবে কাজটি যখন নির্দিষ্ট মেয়াদশেষে পরিণতির দিকে যায়, তখন আমাদের মনে আসে ‘অর্জনের তৃপ্তি’, যা পরবর্তি কোন উদ্যোগে প্রেরণা দেয়।

) কাজ হয় ফলাফলমুখী। জীবনে অনেক কাজ করি, যার কোন সুষ্পষ্ট ফল নির্ধারিত থাকে না। কাজ না করলে অন্যরা অলস বলবে অথবা অসামাজিক বলবে, এজন্য হয়তো করি। কেন করছি তাও জানি না, অথবা হয়তো মজা পাচ্ছি এজন্যই করে যাচ্ছি। আমাদের জীবনে এমন অনেক কাজ আছে, যা আমাদের পূর্বপূরুষরা করছেন বলেই করে যাচ্ছি। অথচ জানি না, কেন তা করছি। প্রতিষ্ঠাতা প্রেজিডেন্টের মৃত্যুর পর তার সন্তানের মালিকানায় কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান যখন ধ্বংস অথবা অধঃপতনে যায়, তখন নিশ্চিত বলা যায় যে, উভয়েরই লক্ষ্য এবং প্রচেষ্টা এক ছিল না। কিন্তু কাজকে প্রকল্প হিসেবে নিলে, তার ফলাফল সুর্দিষ্ট থাকে।

৩) প্রচেষ্টার সাথে এর ফলাফলকে ‘সংযোগ’ করা যায়। প্রতিটি কাজের সাথে এর প্রত্যাশিত ফলাফলগুলো সংযুক্ত করা থাকে। আমরা সকলেই কাজ করছি এবং সার্বিকভাবে সুফলও কিছু আসছে। তাতে প্রতিষ্ঠানের প্রধান ভাবছেন যে, সবকিছু ঠিক আছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়শেষে দেখা যাচ্ছে যে, প্রতিষ্ঠান লাভবান হচ্ছে না, অথবা উৎপাদন খরচ কমছে না। এর কারণ হলো, কোন্ কাজের কারণে কোন্ সুফল আসছে, কোন্ কাজের ফলে কোন্ সুফল আসছে না, সেটি আলাদাভাবে বের করা যাচ্ছে না। আমাদের ‘কিছু কিছু প্রচেষ্টায়’ যখন প্রত্যাশিত সুফল আসে না, তখন বিশ্লেষণ করে দেখতে পারি কেন তাতে সুফল আসছে না, যদি প্রকল্প হিসেবে কাজটিকে গ্রহণ করি।

৪) কাজের সাথে জড়িত মানুষগুলোকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা যায়। একটি কাজ সফল করে তোলার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে আমাদের সম্পর্ক রাখতে হয়। তাদের সাথে যথাযথ সম্পর্কের ওপর নির্ভর করছে কাজের সফলতা। নির্মাণ প্রকল্প হলে, নির্মাণ সামগ্রীর (রড, সিমেন্ট, বালি, ইট ইত্যাদি) সরবরাহকারীদের সাথে যথাযথ সম্পর্ক থাকতে হয়। অন্যদিকে সম্পর্ক থাকতে হয় সেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে, যারা নির্মাণ কাজের অনুমোদন দেয় অথবা কাজের গুণগত মান নির্ধারণ করে। প্রকল্প তত্ত্বে প্রতিটি কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকাভুক্ত থাকে, সে সাথে নির্ধারিত থাকে তাদের সাথে আন্তঃযোগাযোগের উপায়। মানুষের আচরণ কখন কেমন হয়, সেটি পূর্বেই বলা যায় না। কাজেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে আন্তঃযোগাযোগের বিষয়গুলো নির্ধারিত থাকলে, প্রকল্প কর্মীরা ব্যক্তিগত ভাবাবেগের ঊর্ধ্বে থেকে তাদের সাথে সঠিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।

৫) একটি প্রকল্পে প্রতিপক্ষ বা বৈরিতা সৃষ্টিকারীকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয় না। বরং দেখা হয় সম্ভাব্য অংশীজন (potential stakeholder) হিসেবে। এসব প্রথাগত প্রতিপক্ষকে পরিকল্পিত উপায়ে মোকাবেলা করে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পকে বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে যায় প্রকল্প কর্মীরা। নেতৃত্বে থাকেন প্রকল্প ব্যবস্থাপক। প্রতিপক্ষকে প্রকল্পের প্রভাবক হিসেবে দেখা হয়।  আবেগ বা সংবেদনশীলতা দিয়ে যাচাই করা হয় না, কিন্তু প্রকল্পের ব্যর্থতার কারণ হিসেবে তাদেরকে দেখা হয়। প্রকল্প ব্যবস্থাপকের ইতিবাচক মনোভাবের কারণে অনেক সময় সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ ‘সম্ভাব্য সহায়কে’ পরিণত হয়।

 

শুধু গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি যুক্তি তুলে ধরা হলো। তাতে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, প্রকল্প আমাদের জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে। আমাদের জীবন যেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রকল্পেরই একটি সমষ্টি, যাকে পারিভাষিকভাবে কর্মসূচি (program) বলা চলে। হয়তো একদিন পোর্টফোলিও হিসেবেও উপস্থাপন করতে পারবো। এভাবে ক্রমান্বয়ে প্রকল্পের মৌলিক বিষয়ের কাছে এগিয়ে যাবো। তখন প্রকল্প তত্ত্বকে জীবন থেকে কর্মজীবনে প্রয়োগ করার প্রেরণা পাবো।

 

এপর্বের মূল উদ্দেশ্য ছিলো, জীবন-ঘনিষ্ট দৃষ্টান্ত দিয়ে প্রকল্পের কয়েকটি মৌলিক বৈশিষ্ট আলোচনা করা।  পরবর্তি লেখায় বাস্তবভিত্তিক ব্যাখ্যা দিয়ে ‘প্রকল্পকে’ আরও স্পষ্ট করার ইচ্ছা আছে। (১ সেপ্টেম্বর ২০১৬)

 

 

 


▶পর্ব ১: প্রকল্প ব্যবস্থাপক থেকে ‘স্বপ্ন ব্যবস্থাপক’

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে?

একটি প্রজেক্টের ম্যানেজার হতে পারা অপরিমেয় অভিজ্ঞতা প্রাপ্তির সুযোগ এনে দেয়। একটি প্রজেক্ট যেন একটি স্বপ্নের মতো; সঠিকভাবে শেষ হলে স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুখ পাওয়া যায়। কিন্তু কিছু কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ছাড়া আমাদের কর্মসমাজে ‘প্রজেক্ট’ এবং ‘ম্যানেজার’ ধারণাগুলো সুষ্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় না। অনেক প্রজেক্ট সৃষ্টি হয়, কেবল মাঝপথে থেমে যাবার জন্য। অনেক প্রজেক্ট শুরুই হয় না। অনেক প্রজেক্ট শুরু হয়, কিন্তু শেষ হয় না। অনেক প্রজেক্ট শেষ হয়, তবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।  কিছু প্রজেক্ট সফলভাবেই শেষ হয়, তবে যে গন্তব্যকে লক্ষ্য করে সেগুলোর সূচনা, তা শেষ পর্যন্ত ঠিক থাকে না।  কিছু প্রজেক্ট সফলভাবে শেষ হয়ে ‘সঠিক গন্তব্যেই’ পৌঁছায়, কিন্তু খরচ ও সময়মাত্রা বেড়ে যায় অসহনীয়ভাবে ।

বেসরকারি সংস্থায় অনেক প্রজেক্ট প্রপোজাল হয় এবং তাতে কিছু প্রকল্পে দাতাগোষ্ঠি অনুমোদন দিয়ে অর্থযোগান দেন। এসব প্রকল্প যেভাবেই শেষ হোক, দেশের নিপীড়িত জনগোষ্ঠির কিছু উন্নয়ন হয়। এসব উন্নয়ন সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক এবং সুদূরপ্রসারী। কিন্তু পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে পেশাদারিত্বের অভাবে উদ্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হয় না, অথবা কিছু ক্ষেত্রে হলেও তা প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয় না। সেখানে পেশাদারিত্ব একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয়।

 

পেশাদারিত্ব কার বেশি দরকার, দাতার নাকি বাস্তবায়নকারী সংস্থার?  এটি স্তর বিশেষে ভিন্ন হয়। যারা প্রকল্পের পরিকল্পনা করেন, এবং যারা বাস্তবায়ন করেন, তাদের উভয় পক্ষেরই পেশাদারিত্ব থাকতে হয়। তবে সেটি আপেক্ষিক; বাস্তবায়নকারীর পেশাদারিত্ব আর অর্থদাতা প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্বকে একই মাত্রায় দেখা যায় না। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বা তৃতীয়পক্ষের দ্বারা প্রকল্প পরিকল্পনা করালে, যথাযথ সমন্বয় না থাকলে প্রকল্প বাস্তবায়কদের সাথে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।  তাতে সফলভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কমে যায়।

কর্পোরেট হোক বেসরকারি সংস্থা হোক, প্রকল্পকে ‘প্রকল্প’ হিসেবে গ্রহণ না করলে তাতে সফলতার আশা করা যায় না।  প্রকল্পের স্বভাবটি হলো এই যে, এটি নির্দিষ্ট সময়ান্তে শেষ হবে; এর উপকরণ ও পদ্ধতি হবে ফলাফল-কেন্দ্রিক।  প্রকল্পের কর্মীদের লক্ষ্য থাকবে একটিই: নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে প্রকল্পটি সঠিকভাবে শেষ করা এবং প্রতিবেদন করা।

আমাদের দেশে কিছু নির্মাণ প্রকল্পের দিকে দৃষ্টি দিলেই বুঝতে পারি, একটি প্রকল্পকে ‘প্রকল্প’ হিসেবে না নিলে কী বিপদ হতে পারে। দেশে ব্যক্তি ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ইমারত, বৃহৎ সেতু, ফ্লাইওভার ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা একটি বিশেষায়িত জ্ঞান। একজন আমজনতার দৃষ্টিতেও যদি তাকাই, তবে অনেক সীমাবদ্ধতা ও অনিয়মের চিত্র আমাদের সামনে ফুটে ওঠে।

 

দাতাগোষ্ঠিকে প্রকল্পের স্বপ্ন দেখিয়ে অনেক অনুদান আসে বাংলাদেশে। লক্ষ্য থাকে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠিকে নির্দিষ্ট সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উন্নয়ন দেখাবার। দাতা অথবা বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্বের অভাবেই হোক, অথবা অসততার কারণেই হোক, সব প্রকল্প ‘ফলাফলমুখী প্রচেষ্টা’ দেখাতে পারে না, যতটা তাদের প্রতিবেদনে দেখা যায়।

এদেশে প্রকল্প অথবা ফলাফলমুখী উদ্যোগ বা উদ্যোক্তার যে কত অভাব, তা একটি সহজ পর্যবেক্ষণ (hypothetical observation) থেকে বুঝতে পারা যায়। তা হলো, দেশীয় প্রতিষ্ঠানে বিদেশী সিইও’র উপস্থিতি। এদেশেরই প্রতিষ্ঠান এদেশেরই মূলধন, ভোক্তাও এদেশেরই; কিন্তু প্রধান নির্বাহী আসেন সুদূর পশ্চিম দেশ থেকে; অথবা প্রতিবেশি কোন দেশ থেকে। সুনির্দিষ্ট দৃ্ষ্টান্ত এবং গবেষণা দিয়ে এটি প্রমাণ করা যায়, কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য।

 

দেশের প্রাতিষ্ঠানিক আচার-আচরণ এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক অবস্থান যদি ‘পাখির চোখেও’ একবার  দেখি, তবে চলমান স্থবিরতা (creeping pace) এবং অবহেলার চিত্রটি চোখে পড়ে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে বিশেষায়িত জ্ঞান বা দক্ষতা হিসেবে দেখা হচ্ছে না এখনও। সরকারি প্রকল্পগুলোতে পদাধিকার বলে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে এরকম বালখিল্যতার কারণেই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের মুখ দেখে না। একবছরের প্রকল্প শেষ হয় চতুর্থ বছরে; নষ্ট হয় সময়; অপচয় হয় জনগণের টাকা; প্রলম্বিত হয় জনদুর্ভোগ।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও এর ব্যতিক্রম নেই, যিনি প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ব্যক্তি, তিনিই প্রকল্পেরও অধিকর্তা। যিনি প্রকল্পের মৌলিক বিষয়গুলোই জানেন না, তাকে দেওয়া হয় ‘কর্মসূচি’ পরিচালনার দায়িত্ব। এখানে কর্মসূচিকে ‘প্রকল্প’ বলা হয়, প্রকল্পের তো কোন চিহ্নই থাকে না।  বছরের পর বছর চলে যায়, প্রকল্প শেষ হয় না। কারণ খুঁজলে দেখা যায়, সেখানে ‘শেষ’ বলে কোন বিষয় আদতেই ছিলো না। এতে প্রকৃতপক্ষে কাদের উন্নয়ন হয় আর কাদের ক্ষতি হয়, বুঝতে পারার জন্য গবেষণা করতে হয়।  প্রকল্পের ‘স্বাভাবিক পরণতি’ হিসেবে সুফল আসে না, সুফল দেখতে গবেষণার অপেক্ষা করতে হয়।

 

প্রকল্পকে বাস্তবায়নের পথে নিয়ে যাবার পরিক্রমায় কিছু অনন্য অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়।  একে শুধু ‘অভিজ্ঞতা’ বললে কমই বলা হয়। এই অভিজ্ঞতা এতই অমূল্য যে, এটি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ অথবা শুধুই অর্থের বিনিময়ে পাওয়া যায় না।  অনেক সময়, অধ্যবসায় এবং লক্ষ্যভিত্তিক প্রচেষ্টার পরিণতিতে আসে ‘প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা’।

কর্মজীবনের শুরুতে কয়েকটি ক্ষুদ্রাকৃতির প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ হয়েছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করার সময়ে, কয়েকটি ফলমুখী কর্মসূচি (result-focused program) বাস্তবায়ন করার অভিজ্ঞতা হয়েছে।  ২০০৪ থেকে ২০১১ পর্যন্ত, আট বছরে নিয়মিত কাজের পাশাপাশি, পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত তিনটি এসাইনমেন্টকে ‘প্রকল্প’ হিসেবে বাস্তবায়ন করার সুযোগ নিয়েছিলাম। এসবের পাশাপাশি, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা (project management) সংক্রান্ত কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছিলো। প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং প্রাসঙ্গিক প্রশিক্ষণের এই দীর্ঘ পরিক্রমায় কিছু উপলব্ধি সৃষ্টি হয়েছে, যা উপরোক্ত শিরোনামে তুলে ধরতে চাই, যেন দেশের অভিজ্ঞ প্রকল্প ব্যবস্থাপকদের মতামত পাওয়া যায়। তাতে যদি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে চলমান স্থীতাবস্থা থেকে এগিয়ে যাবার পথ সৃষ্টি হয়, সেটি হবে পরম আনন্দের বিষয়।

 

 

Capture

 

▶ প্রকল্প ব্যবস্থাপক থেকে ‘স্বপ্ন ব্যবস্থাপক’

উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে একযুগেরও বেশি সময় ধরে কাজ করতে গিয়ে শিখেছি যে, একটি প্রকল্প শুধু একটি স্বপ্ন নয়; স্বপ্নের চেয়ে একটু সহজ। কারণ, ভালোভাবে চিন্তা করতে পারলে এবং পরিকল্পনাগুলো সুর্নিদিষ্ট করতে পারলে, বাস্তবায়নের সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ। প্রকল্প এবং জীবনের পরিকল্পনা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা এবং এসংক্রান্ত একাডেমিক জ্ঞান ঝালাই করছি কিছুদিন যাবত। সহজভাবে একটু একটু করে লেখে যাবো সপ্তাহান্তে। শপথ নিয়েছি, বেশি চাপ নেবো না মাথায়, তাহলে শুরুই করা যাবে না। প্রকল্প নিয়ে লেখালেখিকেও ‘আরেকটি প্রকল্প’ হিসেবে নিয়েছি, কারণ ৫৫০জন (ফেইসবুকের ২৫০ এবং ওয়ার্ডপ্রেসের ৩০০) পাঠকের প্রতি আরও বেশি গুরুত্ব দিতে চাই।

  • শুরু: শনিবার ৩ সেপটেম্বর থেকে, শনিবার বিকাল ৩টায়
  • লেখার স্টাইল: যেভাবে মাথায় আসছে, সেভাবেই ব্লগে তুলে দিচ্ছি
  • লেখার মান: বিষয় এবং ভাষার প্রাঞ্জলতার প্রতিই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি
  • ভাষা: ইংরেজি এবং পারিভাষিক শব্দ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলছি

 

আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে মাইক্রো-প্রজেক্ট হিসেবে দেখতে পারি। তাতে কঠিন কাজগুলোতে আরও নির্দিষ্টভাবে মনোনিবেশ করা যায়।  ‘প্রকল্পের ধারণা’ কীভাবে প্রাত্যাহিক জীবনেও আমাদের প্রচেষ্টাকে ফলমুখী করে তোলে, সেটি পরবর্তি পোস্টে তুলে ধরবো। পাঠককে পরবর্তি পোস্টগুলো অনুসরণ করার অনুরোধ জানিয়ে প্রথম পর্বটি শেষ করছি।  (২৫ অগাস্ট ২০১৬)

 

 


সূত্র: ইনফোগ্রামটি audax.com.ng থেকে সংগৃহীত।