Category: জীবন দর্শন

মার্গারেট থ্যাচারকে কেন লৌহমানবী বলা হতো?

jiggasha

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় যে, মার্গারেট থ্যাচারের ‘লৌহ মানবী’ খেতাবটুকু তার কর্মের জন্য নয়, তার কঠোর বাগ্মীতার জন্যই দেওয়া হয়েছিল। সেটি ইতিবাচক অর্থে নয় নেতিবাচকভাবেই দেওয়া হয়েছিল। যা হোক, তাকে কখন কীভাবে কেন এবং কে এই খেতাব দিয়েছিল সেটি আজ আর অজানা থাকার বিষয় নয়। মোট কথা হলো, সোভিয়েত রাশিয়ার গণমাধ্যম থেকে তিনি এই খেতাব পেয়েছিলেন, যার কারণে পরবর্তিতে তিনি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছিলেন।

তো দেখি এবার, তিনি কী কথা বলতেন, যার কারণে লৌহ মানবী বা আইরন লেডি’র শব্দযুগল তার নামের সাথে যুক্ত হয়।

 

————-

আমি ভাগ্যবান ছিলাম না, ভাগ্যকে অর্জন করেছি।

আমি অস্বাভাবিক ধৈর্য্যশীল, এই শর্তে যে শেষ মুহূর্তে আমি নিজের সুযোগটি পাই।

জনতাকে অনুসরণ করবেন না, জনতাকে বরং আপনাকে অনুসরণ করতে দিন।

রাজনীতিতে যদি কাউকে দিয়ে কিছু বলাতে চান, তবে একজন পুরুষকে বলুন। যদি কিছু করাতে চান, তবে একজন নারীকে বলুন।

রাজনীতিতে একটি সপ্তাহ বিশাল সময়।

সাধারণত দশ সেকেন্ডের মধ্যেই আমি একজন মানুষ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেই এবং খুব কমই সেটি বদলাই।

অবশ্যই এটি পুরান কাহিনি। সত্য তো একই পুরান কাহিনি।

একটি যুদ্ধকে জয় করার জন্য আপনাকে একাধিকবার যুদ্ধ করতে হতে পারে।

কঠোর পরিশ্রম ছাড়া কেউ শীর্ষস্থানে পৌঁছেছে এমন কাউকে আমি জানি না। এটিই উপায়। পরিশ্রম আপনাকে সবসময় শীর্ষস্থানে না নিলেও অন্তত নিকটে গিয়ে পৌঁছাতে পারবেন।

আপনার কাজের পরিকল্পনা করুন, আজকের এবং প্রতিদিনের। তারপর পরিকল্পনাকে কাজে রূপ দিন।

প্রত্যেক নেতার মধ্যে কিছু পরিমান লোহা থাকা উচিত। তাই আমাকে যে ‘লৌহ মানবী’ বলা হয়, সেটি আলাদা কিছু নয়।

————-

 

‘আমি ভাগ্যবান ছিলাম না, ভাগ্যকে অর্জন করেছি।’ এই কথাটি যে কতটা সত্য ছিল, সেটি থ্যাচারের জীবন (১৩ অক্টোবর ১৯৩৫ – ৮ এপ্রিল ২০১৩) থেকে বুঝা যায়। তিনি ১১ বছরেরও বেশি সময় ব্রিটেনের শাসক ছিলেন। ছিলেন নন্দিত এবং নিন্দিতও। অনেকের প্রশ্ন, এত নিন্দিত থাকার পরও কীভাবে এত বছর তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থাকলেন। যোগাযোগ প্রযুক্তির এই যুগে, তার জীবন কাহিনি আজ সবার জন্য উন্মুক্ত। আমাদের জীবন থেকেও একই সত্যকে বুঝতে পারি। সত্য সবসময়ই পুরান এবং পরিবর্তনহীন। এটিও থ্যাচারের কথা। এটি সবারই কথা। তিনি সত্যই এক লৌহ মানবী ছিলেন।

 

 


উক্তিগুলো বিভিন্ন থেকে সংগৃহীত এবং লেখক কর্তৃক বাংলায় অনূদিত।

আমার প্রিয় রসাত্মক ধনাত্মক উক্তিগুলো। পর্ব ৩।

মানুষের কথায় তাকে চেনা যায়। তার প্রতিটি সচেতন উক্তিতে আছে দর্শন। রয়েছে ভাবনার বিষয়, চিন্তাকণা। এবারের পর্বটি একটু অম্লমধুর হবে। রস আছে। সে রসে আছে তীক্ষ্ণতা। সবগুলো কথাই চিন্তা খাবার যোগাবে, তাতে আমি নিশ্চিত। বলে রাখছি, এগুলো প্রথমত লেখকের নিজেরই জন্য। কিন্তু পাঠক মজা পেলে লেখক ধন্য।

 

————

কাউকে বিয়ে করার পূর্বে তাকে একটি ধীরগতির কম্পিউটার ব্যবহার করতে দিন। এবার দেখুন সে আসলে কেমন।  (উইল ফেরেল)

আমি যা কিছু করতে পছন্দ করি, সেগুলো হয় অনৈতিক, না হয় অবৈধ অথবা শরীর মোটা হয়ে যায় এমন কাজ। (আলেকজান্ডার উলকট)

আমি এমন একজনকে চিনি যে ধূমপান, মদ্যপান, নারীসঙ্গ এবং উচ্চমানের খাবার খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল। আত্মহত্যার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সে সুস্থ ছিল। (জনি কারসন)

সে নিজেই শুধু একঘেয়ে নয়, সে অন্যদের মধ্যেও একঘেয়েমির কারণ। (স্যামুয়েল জনসন, ১৮ শতকের লেখক)

ঈশ্বর যে আমাদের ভালোবাসেন তার একটি অকাট্য প্রমাণ হলো মদ। তিনি আমাদেরকে আনন্দে রাখতে পছন্দ করেন। (বেন্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম স্থপতি)

স্বাস্থ্য বিষয়ক বই পড়ার সময় সাবধান থাকবেন। ছাপার ভুলের কারণে আপনার মৃত্যু হতে পারে। (মার্ক টোয়েন)

ভালো মেয়েরা স্বর্গে যায়, খারাপ মেয়েরা সবখানে যায়।  (হেলেন গার্লি ব্রাউন)

রাগ নিয়ে ঘুমাতে যাবেন না। জেগে থাকুন, ঝগড়ায় লেগে থাকুন। (ফিলাস ডিলার)

রাজনীতিতে যদি কাউকে দিয়ে কিছু বলাতে চান, তবে একজন পুরুষকে বলুন। যদি কিছু করাতে চান, তবে একজন নারীকে বলুন। (মার্গারেট থ্যাচার, দ্য আইরন লেডি)

———–

 

এবারের পর্বটির জন্য রিডার্স ডাইজেস্ট-এর কাছে ঋণী। অনুবাদ লেখকের।


রসাত্মক ধনাত্মক উক্তির দ্বিতীয় পর্ব।

কর্মসংস্থান: পৃথিবী ভিতুদের জন্য নয়…নিয়ম ভাঙ্গুন, চাকরি ধরুন!

কর্মসংস্থান নিয়ে অনেক দিন কিছু লেখা হচ্ছে না। এদিকে অনেক কথা জমে আছে পেটে! চাকুরির বাজারটা ক্রমেই ‘ট্রিকি’ হয়ে আসছে। চাকুরি প্রত্যাশী এবং চাকুরি দাতা উভয়েই এখন মহাসংকটে! আস্থার সংকট তো আছেই, চিরাচরিত সংকট হিসেবে আছে একে অপরকে না বুঝার সংকট। এটি যেন আকারে-প্রকারে শুধুই বড় থেকে বিকটতর হচ্ছে। এরকম একটি কঠিন সময়ে আমি প্রশাসন থেকে বিযুক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠানের মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগে এসে ল্যান্ড করলাম। এ বিষয়টি এর আগে প্রশাসনেরই অংশ ছিল। নতুন বোতলে পুরাতন জুস আর কী! সবই কর্তার ইচ্ছা!

আস্থার সংকটটি বুঝতে পারা যায় যখন বিধি মোতাবেক সমস্ত শর্ত মেনে আবেদন করার পরও ইন্টারভিউ কলটি আসে না। অথবা ইন্টারভিউ পর্যন্ত মোটামুটি ভালো করেও যখন, পরবর্তিতে কোন খবর আসে না, তখনই বুঝা যায় উভয়ের মধ্যে আস্থার অভাব আছে। এসময়ের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হলো, রেফারেন্স ছাড়া চাকরি না হওয়া। অথবা প্রথম ব্যক্তিটিকে ডিঙ্গিয়ে দ্বিতীয় তৃতীয় বা চতুর্থ এমনকি দশম ব্যক্তিটিকে চাকরি দেওয়া।

একে অন্যকে না বুঝার ব্যাপারটি আরও স্বাভাবিক – তবে দুঃসহনীয়। দু’টি পক্ষ অত্যন্ত আনুষ্ঠানিক পরিবেশে প্রার্থী নির্বাচন বা ‘চাকরিটি পাইতেই হবে’ – এরকম চাপ নিয়ে রোবটিক আলোচনায় লিপ্ত হলে, এখানে ‌’আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ না হবারই কথা। প্রথাগতভাবে ‘না বুঝার পরিস্থিতিটি’ সৃষ্টি করেন নিয়োগকর্তা এবং এর কুফল ভোগ করেন উভয়ই। এরকম পরিস্থিতিতে চাকরি প্রার্থী আত্মবিশ্বাসী হলে, পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে নিয়ে আসতে পারেন।

 

একটি কেইস স্টোরি শেয়ার করছি। রাইসুল হাসান স্বভাবত উগ্র না। কিন্তু একটি সিনিয়র পদে চাকরির ইন্টারভিউতে সে বুঝতে পারে নিয়োগকর্তাদের কথায় কোন ফাঁক আছে। ইন্টারভিউয়ারদের সামনে বসেই সে রাগে ফুঁসতে থাকে। সে সমস্ত নির্দেশ অনুসরণ করেছে এবং প্রত্যাশিত যোগ্যতার প্রায় সবগুলোই তার শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার সাথে মিলে গেছে। টেস্টেও সে ভালো করেছে। তবু ইন্টারভিউয়ারদের একজন তাকে যা বললেন, তা হাসান মেনে নিতে পারছে না। ‘মি. হাসান, ফ্রাংকলি স্পিকিং… আপনার এভরিথিং ওকে। কিন্তু কিছু বিষয় আমাদেরকে প্রসিড করতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’ কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে হাসান করণীয় নির্ধারণ করে। হাসান জানে, চাকরিটা তার এমনিতেই হচ্ছে না। তাই রাগের মাথায় রাইসুল হাসান বেশকিছু প্রশ্ন করে বসলেন নিয়োগকর্তাদের নাক বরাবর! প্রশ্নগুলোর অধিকাংশই প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি, কাজের ধরণ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কিত প্রশ্নগুলো স্বভাবতই কিছুটা আক্রমণাত্মক এবং স্পর্শকাতর হয়ে যায়। আর তাতে ‘ডিফেন্স’ করতে এগিয়ে আসেন বোর্ডের নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকা ভদ্রলোকটি। হাসান ধারণা করেছে, তিনিই হবেন প্রতিষ্ঠানের সিইও, কারণ উত্তরগুলো খুবই জুতসই এবং দায়িত্বশীল হচ্ছে। আইসব্রেকিং পর্ব শেষ! আস্তে আস্তে ইন্টারভিউর গোমট পরিবেশ হালকা হয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থায় চলে আসে। অন্যান্য ইন্টারভিউয়াররা ক্রমে কক্ষ ছাড়তে থাকেন। সিইও তার দুপুরের খাবার পিছিয়ে দেন। প্রায় দু’ঘণ্টার আলাপচারিতার বিস্তারিত সকল তথ্য এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। প্রাসঙ্গিক হলো, নিয়মভঙ্গ করে হাসান সেদিন রোবটিক আলোচনাকে ‘মানবিক সমঝোতায়’ রূপ দেয়। প্রশ্ন-উত্তর আর প্রতিপক্ষ-মুখী জিজ্ঞাসাবাদকে সমঝোতামুখী সংলাপে পরিণত করে। হাসানকে সাহায্য করেন প্রতিষ্ঠানের সিইও নিজে। রাইসুল হাসানের সরল কিন্তু তীক্ষ্ণ ও প্রত্যক্ষ প্রশ্নগুলোকে কর্তৃপক্ষ সততা ও পেশাদারিত্বের চিহ্ন হিসেবে দেখেছে। সঙ্গতকারণেই এর ফলাফল হাসানের পক্ষে চলে যায়।

রাইসুল হাসানের ঘটনায় অনেক প্রতিষ্ঠিত কিছু প্রথার ব্যতিক্রম হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যে নিয়মটি হাসান লঙ্ঘন করেছে, তা হলো ইন্টারভিউ বোর্ডে বিতর্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা। চাকরির ইন্টারভিউতে একটি প্রতিষ্ঠিত নিয়ম হলো, নিয়োগকর্তাদের সাথে বিতর্ক সৃষ্ট হয় এমন কথা বলা বা এমন প্রশ্ন করা যাবে না। তাতে সব ভেস্তে যাবে। কিন্তু হাসানের ব্যক্তিত্বে এবং কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিলো, যার কারণে প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেও নিজের পক্ষে তা কাজে লাগাতে পেরেছে।

অফিস এবং আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেও নিজের স্বকীয়তা তুলে ধরার বিষয়টি অনেক প্রার্থী মনে রাখতে পারে না। নিজস্বতা তো নেই-ই, নিজের সর্বনিম্নটুকু তুলে ধরতে ব্যর্থ হয় অনেকে। এই সমস্যার গোড়া অনেক গভীরে। যেতে হবে আমাদের স্কুলজীবনে, যেখানে নিজস্ব কিছু করা মানেই শিক্ষকের বেত আর মায়ের বকুনি। ইংরেজি অথবা গণিতকে ছোটকাল থেকেই ‘কঠিন বিষয়’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষকের কাছে জিম্মি থেকে আমাদের শিক্ষা জীবন শেষ হয়। তাই ব্যতিক্রম আমরা প্রায় জানি না।

 

এরকম সমাজ ব্যবস্থায় টিকে থাকা এবং নিজেকে অতিক্রম করা খুবই কঠিন। তবু কয়েকটি নিয়ম লঙ্ঘনের দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি। পৃথিবীর যাবতীয় বিধান, নীতিমালা আর চুক্তিনামা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে – চাকরি প্রার্থীর পক্ষে কেবল একজনই থাকে। তাই চাকরি প্রার্থীর পক্ষ থেকে কয়েকটি ব্যতিক্রম তুলে ধরা চেষ্টা করলাম। এগুলোই সব নয় – কেবলই দৃষ্টান্ত:

১) প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ছকে আবেদনপত্র ব্যতিত আর কিছুই গ্রহণযোগ্য হবে না -এনিয়মটি মানতেই হবে এমন নয়। ঘোষিত পদ এবং দায়িত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট ট্রেনিং বা অভিজ্ঞতার সনদ থাকলে তা যুক্ত করা যায়। প্রথম দর্শনই সেরা দর্শন।

২) সিভিতে ‌’আমি’ শব্দটি একদমই ব্যবহার করা যাবে না, এটিও খোঁড়া যুক্তি। চাকরির আবেদন মানেই হলো নিজেকে নিয়ে মার্কেটিং করা। যেখানে ব্যক্তিগত যোগ্যতাই প্রধান নিয়ামক, সেখানে অন্তত ৪/৫বার ‌’আমি’ ব্যবহারে মহাভারত অশুদ্ধ হয় না। আমি ব্যবহার করলে আবেদনপত্রটিকে বরং একটু ‘মানবিক’ দেখাবে। মানবিক হওয়াটা জরুরি। মানুষ যা পছন্দ করে, তার সবই প্রকাশ করতে পারে না! নিয়োগকর্তারা সকলে জানেন না, তারা কিসে সন্তুষ্ট হবেন।

৩) ‘আপনার সমস্ত কাজের/চাকুরির বিবরণ দিন।’ কী দরকার আছে এত কিছু বলার? সমস্ত কর্মজীবনের ইতিহাস তাদেরকে জানিয়ে কী লাভ! তার পরিবর্তে এই কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা/ কর্মসংস্থানের বিবরণ তুলে ধরা যায়।

৪) ‘আগ্রহীদেরকে নিম্নের ঠিকানায় আবেদনপত্র পাঠাতে অনুরোধ করা হলো।’ এভাবে নিয়ম পালন করে অনেকেই তার সিভিখানি প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যক্তির হাতে পৌঁছাতে পারে নি। দোষ দিয়েছে ডাকবিভাগের অথবা নিজ কপালের। পরামর্শ হলো, তাদের নির্দেশিত ঠিকানা ছাড়া আরও কোন সরাসরি পথ আছে কিনা, তা খুঁজে বের করতে হবে। অনেকে নিয়োগকর্তার নামটি সংগ্রহ করে একদম তার নাম উল্লেখ করে আবেদনপত্র পাঠায়। ইন্টানেটের যুগে নাম বেরা করা খুব কঠিন নয়। নিয়োগকর্তা যদি সত্যিই উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে বের করতে চান, তবে বিশেষ মাধ্যমে পাঠানোর কারণে আপনার আবেদনপত্রটি বাতিল হবে না। বরং আলাদা গুরুত্ব পেতে পারে।

৫) ‘অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ প্রার্থীর অযোগ্যতা বলে বিবেচিত হবে।’ হতেই পারে। তবে পরিস্থিতি বুঝে এখানেও কিছু কৌশল খাটানো যায়। কোন রেফারেন্স না দিয়ে নিজের যোগ্যতার বিবরণ দিয়ে এবং কোন পদের উল্লেখ না করে – নিয়োগকর্তাকে একটি ইনফরমাল চিঠি পাঠানো যায়। গৃহীত হলেও চমৎকার, না হলেও প্রার্থীর ফাঁসী হবে না!

৬) ‘আপনার বেতনের ইতিহাস তুলে ধরুন।’ বললেই হলো? সংশ্লিষ্ট পদে তারা কী পরিমাণ বেতন দিয়েছেন, তা কি তারা কখনও জানাবেন? কখনও না। তবে কেন নিজের ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে নেগোশিয়েটিং স্ট্রেংথ কমানো? এসব ক্ষেত্রে মিথ্যা বিবরণ দিলে কিন্তু বুমেরাং হতে পারে। তবে সত্যটি গোপন করা যায়।

৭) ‘আমরা প্রশ্ন করবো, আর আপনি শুধু উত্তর দেবেন’ এরকম একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু নিয়োগকর্তাদেরকে এতো সুযোগ দিয়ে নিজেকে ‘ভেড়া’ বানাবেন না। একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে পরবর্তি প্রশ্নটির জন্য বোকা হয়ে বসে থাকবেন, সেটি না করলেও চলবে। উত্তর দিন, তবে সুযোগমতো প্রশ্নও করুন। অনেক সময় প্রশ্নকর্তাদের মধ্যেও বিরতি থাকে। বিনয়কে অস্ত্র হিসেবে ধারণ করে সেসব বিরতিতে নিজেকে প্রবেশ করাতে হবে। সাধারণত, প্রশ্ন যে করে, চালকের আসনে সে-ই থাকে।

 

ইন্টারভিউ বোর্ডে ‘সবই ঠিক আছে’ বা ‘আমি রাজি’ গায়ে পড়ে এমন মনোভাব দেখানোর চেয়ে নিজের সামর্থ্যটুকু দেখানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে মনে করেন, ইন্টারভিউ বোর্ডে প্রশ্ন বা কোন প্রকার জিজ্ঞাসা করলে তাতে কাজটির প্রতি প্রার্থীর অনীহা প্রকাশ পাবে। অথবা, নিয়োগকারী নাখোশ হতে পারেন। নিয়োগকারীকে খুশি করার চেষ্টা না করে, সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতে হবে। তারা আনন্দ পেতে বসেন নি, উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে পাবার জন্য বসেছেন।

কাজটি পেলেই করবো। নির্বাচিত হলেই ওই বিষয়ে পড়াশুনা শুরু করে দেবো। এরকম শর্তে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে, পছন্দের প্রতিষ্ঠান/কাজটিকে লক্ষ্য করে আগে থেকেই কিছু জেনে রাখাটা বুদ্ধিমানের কাজ। ‘আপনার কোন জিজ্ঞাসা আছে?’ এরকম সুযোগে তখন কার্যকর কিছু জিজ্ঞেস করা যাবে। তাতে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রার্থীর ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পায়। নিয়োগকর্তাদের মনে আস্থার সৃষ্টি হয়। প্রশ্নে ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। উত্তরের মধ্য নয়, প্রশ্নের মধ্য দিয়ে মানুষকে চেনা যায়।

একটি সফলতা পরেরটিকে এগিয়ে নিয়ে আসে। ইন্টারভিউ বোর্ডে বেয়াদবি করার দরকার নেই, সেটি যোগ্যতার অংশ নয়। নিয়োগকারীর প্রশ্ন আক্রমণাত্মক হলেও মনে করতে হবে, এর অন্য কোন অর্থ আছে। রেগে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ সৃষ্টি করলে, সেটি ভালো ফল নিয়ে আসবে না। বরং নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক অনুভূতির সৃষ্টি হবে, যা পরবর্তি প্রচেষ্টায় প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রশ্নের উত্তরে যথাযথ আচরণ করাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর জানতে হবে এমন কোন কথা নেই, সেক্ষেত্রেও নিজেকে ধরে রাখতে হবে। এখানে লজ্জার কিছু নেই। আবার অতি বিনয়কে তারা লাজুক বা অন্তর্মুখী স্বভাব হিসেবে ধরে নিতে পারেন। তাই বিনয়ের অবতার হয়ে জানা বিষয়টিকেও এড়িয়ে গেলে কোন ফল হবে না। একেকটি প্রশ্ন একেটি সুযোগ।

যেকোন প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে আত্মবিশ্বাস একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বায়বীয় বিষয়। মনস্তাত্ত্বিকদের কাছে আত্মবিশ্বাস হলো বিশ্বাসের মধ্যে। আপনি ততটুকুই আত্মবিশ্বাসী যতটুকু আপনি মনে করেন। আরেকটি নিয়ম হলো, আত্মবিশ্বাস কেউ দিয়ে দেয় না, নিজে থেকেই অর্জন করতে হয়।

সমাজে প্রকৃত নেতার খুবই অভাব। কিন্তু আত্মবিশ্বাস নেতৃত্বদানের জন্য প্রধান নিয়ামক। চাকরি প্রার্থীকে মনে রাখতে হবে যে, ইন্টারভিউ বোর্ডে আত্মবিশ্বাস তার যোগ্যতারই অংশ। ওটি না দেখাতে পারলে, উত্তর সঠিক হলেও তা পালে বাতাস পাবে না।

চাকুরির বাজার যেন একটি গ্ল্যাডিয়েটরস থিয়েটার! যোগ্যতা দেখিয়ে চাকরি পাওয়া একটি নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া, তাতে সন্দেহ নেই। বর্তমান চাকরির বাজারটি আরও অমানবিক হয়ে যাচ্ছে। প্রার্থীর প্রচেষ্টা থাকবে মানবিক হবার এবং যতটুকু সম্ভব ঘরোয়া পরিবেশ ফিরিয়ে আনার।

এসব ক্ষেত্রে যেসব বিধি-বিধান বা নিয়ম-নীতি আছে, তার প্রায় সবই নিয়োগকারীর অনুকূলে। বুদ্ধিমান প্রার্থীরা দু’টি কাজ করেন: ১) নিজের মতো করে সেগুলো অনুসরণ করেন অথবা/এবং ২) সুযোগমতো এড়িয়ে চলেন। ভুলে গেছি, ব্যস্ততার কারণে সার্কুলারটি ভালোভাবে পড়ার সুযোগ হয়ি নি অথবা আমি তো কেবল আজই জানলাম – সাথে সাথে আবেদন করলাম। এসব বলেও কিছু বিধান এড়িয়ে যেতে সক্ষম হন অনেক প্রার্থী। প্রার্থীকে শুধু মানবিক হবার চেষ্টা করলেই, অনেক নিয়মকে তিনি এড়িয়ে যেতে পারেন।

 

শেষ কথা: বিষয়টিতে আরও আলোচনার প্রয়োজন আছে। কর্মসংস্থানের মৌলিক সমস্যাগুলো এই পোস্টে পর্যাপ্ত আলোচিত হয় নি। কর্মসংস্থান বা চাকুরি পাবার সাথে জড়িত প্রধান বিষয়গুলো হলো: দক্ষতা, যোগ্যতা এবং ব্যক্তিত্ব। সম্পূর্ণ বেকারত্বের চাপ নিয়ে ভালো চাকুরির জন্য নেগোশিয়েশন করা যায় না। তাই নতুনদের কাছে পরামর্শ হলো, প্রারম্ভিক কোন কাজে যুক্ত হয়ে প্রাথমিক কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা। আত্মবিশ্বাস এবং সংশ্লিষ্ট চাকরিটি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা থাকলে প্রার্থী যেকোন ব্যতিক্রম করতে পারেন। ব্যতিক্রমের লক্ষ্য হতে হবে: মানবিক এবং নৈকট্য সৃষ্টি করা। নিয়মের ব্যতিক্রম করাই যেন একমাত্র লক্ষ্য না হয়।

 

৩ সেপটেম্বর ২০১৪। পাবলিক ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া

আমার প্রিয় রসাত্মক ধনাত্মক উক্তিগুলো। পর্ব ২।

বিখ্যাত হোক, অথবা কুখ্যাত হোক, মানুষের কথায় অনেক কিছু শেখার বা ভাবার থাকে। মানুষের মনের মূল্যবান কথাগুলোকেই বানী বা উক্তির মর্যাদা দেওয়া হয়। সেটি মজারও হতে পারে, আবার চিন্তার খোরাকও হতে পারে। পছন্দের হতে পারে, আবার প্রত্যাখ্যানের অনুভূতি সৃষ্টি হতে পারে। সবকিছুর একটি উদ্দেশ্য থাকে। ঘৃণার সৃষ্টি হলেও সেখানে পাঠকের চিন্তা বা সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

 

১)  আমি নিজের সাথে কথা বলি, কারণ মাঝেমাঝে বিশেষজ্ঞের অভিমত নেবার দরকার হয়।

২)  চিপস-এর প্যাকেট কেনার আগে আমি ভাবতাম বাতাস বিনামূল্যে পাওয়া যায়।

৩) জীবন একটি বাঁশ বাগান। শুধু বাঁশ আর বাঁশ!

৪) হ্যাঁ ম্যাডাম আমি মাতাল।  কিন্তু সকালে যখন আমি শান্ত থাকবো, আপনি তখনও কুৎসিতই থাকবেন।  (চার্চিল)

৫) মানুষ বলে তুমি প্রেম ছাড়া বাঁচবে না। আমি মনে করি অক্সিজেন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৬) বেঁচে থাকার জন্য আমাদের কী করা উচিত? নিঃশ্বাস গ্রহণ এবং নিঃশ্বাস ছাড়া উচিত।

৭) জীবনে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, সে কাজটি করা যা মানুষ বলে আপনি করতে পারবেন না। (ওয়াল্টার বেইজহট)

৮)  চাকরিটাকে আমার তখনই ভালো লাগে, যখন আমি ছুটিতে থাকি।

৯)  কিছু মানুষ মেঘের মতো। তারা সরে পড়লেই স্পষ্ট নীলাকাশ।

১০) তোমার জন্য আমার পরামর্শ হলো, বিয়েটা করো। ভালো স্ত্রী পেলে তো সুখে থাকবে। কিন্তু যদি তা না হয়, তবে তুমি একজন দার্শনিক হবে। (সক্রেটিস)

 

কিছু কথার মালিক খুঁজে পেলাম না। কিন্তু তাই বলে তো ফেলে দিতে পারি না। তবে এটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি, কথাগুলো আমার নয়।


রসাত্বক ধনাত্মক উক্তির প্রথম পর্ব

 

আমার প্রিয় রসাত্মক ধনাত্মক উক্তিগুলো। পর্ব ১।

সেটা গতবছরের সেপটেম্বরের কথা। প্রতিবেশী দেশের একজন প্রসিদ্ধ আধ্যাত্মিক-কাম-রাজনৈতিক নেতার বিপক্ষে কিছু ক্রেইজি পিপল ক্ষেপে আছে। তাকে তারা আর ‘সেই সম্মান’ দিতে চান না, কারণ তিনি নাকি সেই সম্মানের উপযুক্ত ছিলেন না।

একজন উক্তি বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি আমার কাছে বহুল পরিচিত। ‘উক্তি বিশেষজ্ঞ’ বলছি কারণ, জীবদ্দশায় তিনি কেমন ছিলেন, সে সম্পর্কে তেমন ধারণা পাবার সুযোগ পাই নি। আমার বিশ্বাস তিনি অন্তত প্রকাশ্যে ভালোই হয়ে থাকবেন, অন্যথায় কিছু বইয়ে ব্যতিক্রম থাকতো।

তার উক্তিগুলো খুবই কোমল এবং শ্রুতিমধুর। স্বর্গদূতেরাও এমন পুতপবিত্র উক্তি দিতে পারতেন কিনা, আমার সন্দেহ আছে। সন্দেহের কারণ একটিই, স্বর্গদূতদের উক্তিগুলো তেমন পড়ার সুযোগ পাই নি!

এদিকে উক্তিতে উদ্ধৃতিতে জ্ঞানালয় (মানে টেক্সটবুক, ফেইসবুক ইত্যাদি) পূর্ণ। আজকাল ফেইসবুকাররাও দৈনিক উক্তি ছাড়ে। জ্ঞানসাধকদের কাজই তো উদ্ধৃতি বিবৃতি ইত্যাদি দেওয়া। কিউরিয়াস মাইন্ড জানবার চায়, তাদের জীবন কেমন ছিলো?

যা হোক, তাদের মধ্যে কেউ কেউ একটু চালাক কিছিমের ছিলেন বলে আমার ধারণা হয়। বলে কিনা: “আমি যা করি তাতে মনোযোগ দিও না, যা বলি তা মেনে চলো!” মেনে চলি বা না চলি, এই উক্তিকে আমি সততার দৃষ্টান্ত বলে মনে করি, যদিও সেটি সর্বনিম্ন পর্যায়ের।

যা হোক, চলে যাই উক্তি পরিবেশনে। আগেই বলে নিচ্ছি, সেগুলো রসাত্মক হলেও জ্ঞানাত্মক হবে না হয়তো। বরং কিছুটা পীড়াত্মক (পীড়াদায়ক) হতে পারে।

 

১)

উন্নত করো শির, শক্তি করো জড়ো; 

অভিনীত হাসি নিয়ে আগে তুমি বাড়ো।

Head up, stay strong.  Fake a smile, move on.

 

২)

শোনো, হাসো এবং একমত হও। তারপর তুমি যা করতে চেয়েছিলে সেটিই করো।

Listen, smile, agree. And then do whatever the fuck you were gonna do anyway.

 

৩)

যেখানে আছো সেখানে যদি ভালো না লাগে, তবে সরে যাও। তুমি তো আর গাছ না!

If you don’t like where you are, move.  You are not a tree.

 

৪)

মাঝেমাঝে আফসোস করি, যদি আরেকটু কোমল স্বভাবের হতে পারতাম!

তারপর একটু হাসি। তারপর দিনের কাজ শুরু করি।

Sometimes I wish I were a nicer person, but then I laugh and continue my day.

 

৫)

স্বপ্ন কখনও ছাড়বেন না। ঘুম থেকে ওঠবেন না।

Don’t give up on your dreams.  Keep sleeping.

 

৬)

মাঝেমাঝে আমার কাঁধের শয়তানটিও (আমাকে দেখে বিস্মিত হয়) কাঁধে হাত দিয়ে বলে, ‘কীসব কচু করছো তুমি?’

Sometimes even the devil on my shoulder asks, ‘what the hell are you doing?’

 

৭)

পাঁচ মিনিট ধরে ওয়াইফাই নেই। ফলে বাবামা’র সাথে কিছুক্ষণ কথা বলতে হলো। তারা দেখলাম খুবই ভালো মানুষ। 

Wi-Fi went down for five minutes, so I had to talk to my family. They seem like nice people.

 

৮)

আমি শুধু তোমাকে জানাতে চাই যে, কেউ একজন তোমার কথা ভাবে। আমি নই, কিন্তু কেউ একজন।

I want you to know that someone cares.  Not me, but someone.

 

 

funny_quote


পাঠক হয়তো একমত হবেন যে, ওপরের কিছু উদ্ধৃতি বাংলার চেয়ে ইংরেজিই বেশি মজার! কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এসব মহান উক্তিগুলোর দাতাকে পাই নি। নিজেকে গ্রহীতা হিসেবে গর্বিত মনে হচ্ছে। আপনিও কি গর্বিত নন?!

 

‘পর্ব ১’ লেখেছি। মানে আরও কিছু সংগ্রহ করার জন্য প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। কিন্তু কখন, সেটি বলা যাবে না!

জন আব্রাহামকে কেন আমাদের অনুসরণ করা উচিত?

johnabraham_fitness

 

জন আব্রাহামকে কেন আমাদের অনুসরণ করা উচিত?


 

ভারতীয় সিনেমা স্টার জন অব্রাহামের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ আগে আমার ছিলো না। চলচ্চিত্রাভিনেতা হিসেবে এখনও নেই। জন ছাড়া ভারতীয় চলচ্চিত্রে আরও অনেকেই আছেন যাদেরকে চলচ্চিত্রাভিনেতা হিসেবে আমার পছন্দ। জন অনেকেরই হয়তো প্রিয় অভিনেতা নন। কিন্তু প্রেরণাদায়ক ফিটনেস কোচ এবং সুস্বাস্থ্যের প্রতীক হিসেবে জন অব্রাহাম অন্যদের চেয়ে আলাদা।

 

 

কথাগুলো একটু পড়ুন:

ফিট থাকুন, ফিট অবস্থায় মৃত্যুবরণ করুন। পরিশ্রম অস্থায়ি, গৌরব চিরস্থায়ি। ব্যায়াম আমার নেশা!

প্রতি রাতে আমি পার্টি করি না, অপচয় করি না, আমি বোতলের কর্ক খুলি না। আমি ব্যায়াম করি: দেহের ভারসাম্য ঠিক রেখে আমি নিজেকে সামনে ঠেলি, তারপর আরও কঠিনভাবে ধাক্কা দেই এই দেহকে, মিউজিক ছেড়ে দেই, ঘাম ঝড়াই, দেহকে কষ্ট দেই; ব্যথা আমার পছন্দ কিন্তু শুকনো দেহ অপছন্দ।

আমি বিরক্তির কারণ হই না, আমার সমালোচনা করবেন না: আপনারা ক্লাবে যেতে পারেন, জীবনকে চকচকে করে তুলতে পারেন; জিমের অন্ধকারই আমার ভালো লাগে, সারাদিন, প্রতিদিন।

 শুধু সুস্থরাই (ফিট) বেশিদিন বেঁচে থাকবে।

 

যখন জানলাম কথাগুলো ভারতীয় চলচ্চিত্রাভিনেতা জন অব্রাহামের, তখনই অবহেলায় আমার মন ভরে গেলো। ‘ও আচ্ছা’ ভুতের মুখে রাম নাম!  আমার দৃষ্টি চলে গেলো তার অভিনীত সিনেমাগুলোতে। বিভিন্ন মুভিতে তার সৌষ্ঠব দেহ এবং স্থিরচিত্রে তার উজ্জ্বল সুস্থতার চিত্র আমার কল্পনায় ভেসে ওঠলো।

সুস্থ দেহ কে না প্রত্যাশা করে? একটি নিরোগ দেহ কে না চায়? সুস্থতার ওপরে আর কী সুখের বিষয় থাকতে পারে?

 

 

আরও কিছু কথা:

“আমি অনেকটাই অজ্ঞেয়বাদী, দেহই আমার ধর্ম। দেহের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে কিছুই নেই, তাই আমি ব্যায়াম করি। আমার উদ্দেশ্যে হলো সিক্স-প্যাক নিয়ে বাঁচা এবং সিক্স-প্যাক নিয়েই মৃত্যুবরণ করা।”

“আমার ফিটনেস মন্ত্রটি তিনমুখী: ভালো খাবার, ভালো ঘুম এবং পরিমিত ব্যায়াম।”

ফিট দেহ আর সুস্থ মনই তার দিবারাতের উপাসনা- ফিটনেসই জন অব্রাহামের ধর্ম। ব্যাপারটি পুরোপুরি অনুকরণীয় না হলেও তার কিছু বিষয়কে এড়িয়ে যাবার সুযোগ নেই!

 

ভালো কথা, আমি (এই পোস্টের লেখক) কোন ফিটনেস এক্সপার্ট  নই! তবে ‘আনফিটনেস অাবাটার’ বলতে পারেন! তবে একটি সুস্থ দেহ খুবই চাই।

 

 

যারা আরও জানতে যান:

ফিটনেস টিপস এবং জন অব্রাহামের আত্মসাক্ষ্য।

জন অব্রাহামের ফিটনেস/ ডায়েট চার্ট

‘আমি একজন মাছ-খাওয়া সব্জিভোজী’!

 

সূত্র: বিভিন্ন সংবাদ ও গুজবের মাধ্যম। ছটি গ্র্যাবহাউজ ডট কম থেকে নেওয়া।

 

 


The ideology that John Abraham tries to promote:

  1. Live fit… die fit
  2. Pain is temporary… pride is forever
  3. WORKING OUT IS MY DRUG
  4. I don’t party every night, I don’t get wasted, I don’t pop bottles 
  5. I WORK OUT… I push my body to its limit, then I push harder, 
  6. I blast my music, I sweat, I ache, I love pain and I hate skinny.
  7. I don’t bother you, DON’T JUDGET ME, you can have the clubs and and the flashy life
  8. I’ll take the darkness of the gym, all day, everyday… 
  9. Only the fit survive 

 

ম্যানেজার হিসেবে আপনি কতটুকু দক্ষ?

banner9

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে ড্রিম ম্যানেজার, পর্ব ৯।  ব্যবস্থাপনা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নয় যে, পাশ করার পর আর উন্নয়নের প্রয়োজন নেই।  আইনজীবী চিকিৎসক ইত্যাদি পেশার মতো এখানেও নিরন্তর অধ্যাবসায় প্রয়োজন। পেশাদারিত্ব একটি ব্যক্তিগত দায়। প্রতিটি পদক্ষেপ প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি সম্পর্ককে পর্যালোচনা করতে হয়। এমন একটি পর্যালোচনার জন্য আজকের পর্বটি।

 

নিচের কুইজটি মাত্র দশ মিনিটে ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে একটি চমৎকার মানসিক অবস্থান তৈরি করে দেবে। ম্যানেজারের দক্ষতা সম্পর্কে এই উচ্চতর মূল্যায়নটি একটি ইংরেজি ম্যাগাজিন থেকে পাওয়া। বিষয়গুলো এতোই চিন্তা-জাগানিয়া যে, সহকর্মীদের সাথে শেয়ার না করে পারলাম না।

১. ভালো ব্যবস্থাপক… ক) সিদ্ধান্ত নিতে পারে; খ) সহকর্মীদের সাথে সামাজিক অনুষ্ঠানে সময় দেয়; গ) নিজের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করার জন্য আলোচনা করে।

২. ভালো ব্যবস্থাপক দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করে… ক) কর্মীদের একক কাজের মূল্যায়নে; খ) উর্ধতন কর্মকর্তার প্রত্যাশা পূরণে; গ) সহকর্মীদেরকে প্রশিক্ষণদানে।

৩. একজন ব্যবস্থাপকের প্রাথমিক দায়িত্ব হলো… ক) প্রত্যাশারও বেশি কাজ করা; খ) বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন; গ) সহকর্মীর মাধ্যমে কাজের বাস্তবায়ন।

৪. একজন ব্যবস্থাপকের পক্ষ থেকে যা গ্রহণযোগ্য নয়, তা হলো… ক) সহকর্মীকে সহানুভূতি দেখানো; খ) মেজাজ বিগড়ে যাওয়া; গ) কর্মীদের জন্য ব্যক্তিগত প্রশংসাপত্র তৈরি।

৫. কর্মীদের দায়বদ্ধতা মুহূর্তেই কমে যায় যখন ব্যবস্থাপকেরা… ক) একই মেজাজে থাকেন না; খ) নির্ধারিত সময়ের আগে অফিস ত্যাগ করেন; গ) অফিসের দরজা বন্ধ রাখেন।

৬. নতুন ব্যবস্থাপক হিসেবে প্রথমেই যা করতে হয়, তা হলো… ক) আপনার প্রকল্প থেকে প্রেরণযোগ্য প্রতিটি প্রতিবেদন মনযোগ দিয়ে দেখা; খ) সহকর্মীকে কাজের নির্দেশ (ডেলিগেট) দিতে শেখা; গ) সহকর্মীদের সাথে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারের আয়োজন করা।

৭. আপনার প্রকল্পটি যখন কর্তৃপক্ষের রোষাণলে পড়ে, তখন… ক) ব্যবস্থাপক সকল অভিযোগের ধারক হবেন; খ) সমস্যাটি বের করে সমাধান খুঁজবেন; গ) শান্ত থাকবেন।

৮. ব্যবস্থাপককে অবশ্যই বুঝতে হবে যে... ক) কর্মীরা প্রশংসা এবং স্বীকৃতি পেলে বেশি কাজ করে; খ) কাজ না থাকলে কর্মীদের আগ্রহ কমে যায়; গ) অর্থনৈতিক সুবিধা থাকলে প্রত্যাশার বেশি কাজ করে।

৯. যখন কোন কিছু শেখাতে হয়… ক) অফিসের বাইরে আয়োজন করুন; খ) কর্মীদের চেষ্টা ও শেখার আগ্রহকে পুরস্কৃত করুন; গ) একাধিক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিন।

১০. সহকর্মীরা যখন ভিন্ন একটি উপায়ে কাজটি করতে পারে, তখন… ক) সেটি গ্রহণ করা উচিত, কারণ সহকর্মীদের থেকেও শেখার সুযোগ হয়; খ) এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, কারণ তারা ভুল করতে পারে; গ) পরিস্থিতি অনুযায়ি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

 

skill_test_dreammanager
নম্বর মূল্যায়ন: প্রতিটি সঠিক উত্তরের জন্য ১০ বিবেচনা করুন
৮০-১০০: আপনি একজন দক্ষ এবং অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপক।
৬০-৭০: যেসব ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হয়েছে সেগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করুন।
৬০ এর নিচে: বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবুন, হয়তো ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আপনার উন্নয়ন জরুরি!

ব্যবস্থাপনা একটি সহজ কাজ একথা কেউ কখনও বলে নি। কাজের উন্নয়নের জন্য আমাদেরকে কর্মীর চাহিদা নিয়ে আরও ভাবতে হবে। প্রত্যেক ব্যবস্থাপক তার অধীনস্থ কর্মীর অভিভাবক। তাদেরকে গেঁথে তোলার মধ্যেই রয়েছে তার প্রকল্পের উন্নয়নের সম্ভাবনা।

 

 


আপনার ব্যবস্থাপকীয় দক্ষতা কতটুকু?
[ উত্তর ও পর্যালোচনা ]

১/ক ] সিদ্ধান্ত নিতে হলে সাহসের প্রয়োজন। সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারার জন্য পর্যাপ্ত তথ্য হয়তো আপনার নেই। তাই ভুল হতেই পারে। ভীতু বা দায়িত্ব-এড়িয়ে-চলা নেতাকে কোন কর্মীই পছন্দ বা শ্রদ্ধা করে না।

২/গ ] কর্মীর উন্নয়ন করা ব্যবস্থাপকের প্রধান দায়িত্ব। বাস্তবে দেখা যায়, প্রশিক্ষণের সময় পাওয়া কঠিন। তবু কৌশলে সময় বের করে নিতে হবে, কারণ এটি কর্মীর এমন এক চাহিদা যা পূরণ হলে প্রতিষ্ঠান এগিয়ে যায়।

৩/গ ] কর্তৃপক্ষ চায়, ব্যবস্থাপকের নেতৃত্বে প্রকল্প/দলটি দক্ষতা এবং গতিশীলতার সাথে কাজ করুক। কর্মীকে কাজে সম্পৃক্ত করা মানে হলো দলের সবাই কর্মতৎপর হওয়া। ব্যবস্থাপক যত নিজের কাজে ব্যস্ত, তদারকি ততই দুর্বল এবং দলের কার্যকারীতা ততই কম।

৪/খ ] হতাশ হওয়া খুবই স্বাভাবিক এবং মানবিক। এমন পরিস্থিতির জন্যই ব্যবস্থাপক, কিন্তু মেজাজ বিগড়ে যাওয়া মানসিক অপরিপক্কতার লক্ষণ। আবেগ দমনে রাখতে পারা একটি বড় গুণ এবং কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণের পরিচয়।

৫/ক ] ব্যবস্থাপক যখন একদিন থাকেন খোশমেজাজে, অন্যদিন চরমভাবে ক্ষিপ্ত – এটি কর্মীর মনেও খারাপ ধারণার সৃষ্টি করে। ব্যবস্থাপকের সংযত এবং অভিন্ন আচরণ কর্মীর মনে প্রেরণা যোগায়।

৬/খ ] সুদক্ষ ব্যবস্থাপক নিজেই যখন কাজটি করেন, সেটি হয় সঠিক এবং দ্রুত। সুদক্ষ ব্যবস্থাপকেরা যখন অভিজ্ঞতার অভাবে থাকেন, তখন তারা কর্মীকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করতে পারেন না। নতুন ব্যবস্থাপকের প্রথম কাজ হলো, কর্মীকে কাজের নির্দেশনা দিতে শেখা এবং একই সাথে তাদেরকে শেখানো। এতে তার জন্য ব্যবস্থাপনার কাজটি সহজ হয়।

৭/ক ] পরিস্থিতি খারাপ হয়ে গেলে কাঁধ শক্ত করে দলের দায়িত্ব নিন। সমস্ত তপ্ত বাক্য আপনিই গ্রহণ করুন, এটিই ব্যবস্থাপকের দায়। অধিনস্ত কর্মীকে চাপমুক্ত রাখুন, যেন তারা স্বাভাবিক কাজ চালিয়ে যেতে পারে। ব্যবস্থাপক যখন দায় এড়িয়ে কর্মীর ওপর তুলে দেয়, কর্মীরা তার প্রতি আস্থা, শ্রদ্ধা ও আনুগত্য সবই হারায়।

৮/ক ] প্রশংসা পেতে এবং নিজেদেরকে ‘আলাদা’ ভাবতে সকল কর্মীই পছন্দ করে। কর্মীর কর্মদক্ষতার সর্বোচ্চ সুফল পেতে এরকম পরিস্থিতির খুবই প্রয়োজন। কর্মমুখর পরিবেশ সৃষ্টিতে অবদান রাখা ব্যবস্থাপকের প্রধান কাজ।

৯/গ ] নতুন ধারণা রপ্ত করানোর জন্য প্রশিক্ষণার্থীর বিভিন্ন ইন্দ্রিয়গুলোর ব্যবহার করুন। আপনার বিষয়টিতে তাদেরকে শুনতে দিন, বুঝতে দিন, দেখতে দিন করতেও দিন। সবাই একভাবে শেখে না।

১০/ক ] নতুন কিছু শেখার জন্য মানুষের কোন নির্ধারিত বয়স-সীমা নেই। সহকর্মীর বিশেষ গুণ থেকে শিখলে ব্যবস্থাপকের মান ক্ষুণ্ন হয় না, বরং বাড়ে। একই সাথে কর্মীরও সংশ্লিষ্ট ভালো দিকটি থেকে প্রতিষ্ঠান উপকৃত হয়।

 

লেখাটি প্রজেক্ট ম্যানেজারের পেশাদারিত্বের উন্নয়নে শুধু একটি অধ্যয়ন/অনুসন্ধানের জন্য। কোন উত্তরই অকাট্য/অখণ্ডনীয় হিসেবে বিবেচনার করার জন্য নয়।

 


প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ম্যানেজার/ পূর্বের পর্বগুলো:

▶ পর্ব ৮: পেশাদারিত্বের ৭টি বিষয়

▶ পর্ব ৭: এ দুই রকমের ম্যানেজার থেকে সাবধান থাকুন

▶ পর্ব ৬: ১৩ উপায়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে রাখুন হাতের মুঠোয়!

▶ পর্ব ৫:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনা: পেশাদারিত্ব কার দায়?

▶ পর্ব ৪:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া: পেশাদারিত্বের শুরু

▶ পর্ব ৩:  ৯টি তত্ত্বে প্রকল্পের সংজ্ঞা এবং সহজ কিছু দৃষ্টান্ত

▶ পর্ব ২:  যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনে প্রকল্প আমাদেরকে উপকৃত করে

▶ পর্ব ১:  প্রকল্প ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে

প্রজেক্ট ম্যানেজার: পেশাদারিত্বের ৭টি বিষয়

professionalism-mmmainul

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক, পর্ব ৮। ব্যাকগ্রাউন্ড যা-ই হোক, প্রজেক্ট ম্যানেজারকে পেশাদারিত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে কাজ করতে হয়। প্রজেক্ট ম্যানেজারের পেশাদারিত্ব কীভাবে গড়ে ওঠে এবিষয়ে পঞ্চম পর্বে আলোচনা করা হয়েছে। প্রজেক্ট ম্যানেজার পদ একটি নেতৃত্ব প্রয়োগের স্থান। এখানে ব্যক্তিকে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করতে হয়। পারিবারিক বা ব্যক্তিগত কারণে কর্মপরিবেশকে প্রভাবিত করা যায় না। কর্মীদের সামনে নিজেকে আদর্শ হিসেবে দেখাতে হয়। তাকে হতে হয় পেশাদার। এপর্বে ‘পেশাদারিত্ব’ বিষয়টিতে আলাদাভাবে আলোকপাত করা হবে।

 

পেশাদারিত্ব মানে হলো:

১) এমন কিছু করতে পারা, যা শুধু বেতনে/অর্থে পরিশোধ করা যায় না

পেশাদাররা অর্থের বিনিময়ে মানসম্পন্ন পণ্য বা সেবা দান করেন। কিন্তু এর মানে অর্থ উপার্জনই তাদের উদ্দেশ্য নয়, অর্থের সর্বোচ্চ মূল্য প্রদান করা। পেশাদারিত্ব মানে শুধু ভালো একটি চাকরি/ব্যবসায় করা নয়। পেশাদারিত্ব মানে এমন কিছু যা শুধু বেতনে বা অর্থে পরিশোধ করা যায় না। পেশাদারিত্ব মানে ভালো/মজার কাজ করা নয়, পেশাদারিত্ব হলো কাজ থেকে ভালো/মজাকে খুঁজে পাওয়া।

 

২) আত্ম অনুসন্ধান ও প্রত্যাশার চেয়ে বেশি করার সামর্থ্য

পেশাদরিত্ব যেন ‘অন্ধের হাতি দেখার মতো’ অস্পষ্ট একটি বিষয়। প্রফেশনালিজম/পেশাদারিত্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণাগুলো খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত। পুরো বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা আমরা রাখি না, অথচ নিজ নিজ সুবিধামতো একে ব্যবহার করি। ফলে প্রকৃত পেশাদারিত্ব অনেকের কাছে অধরা থেকে যায়। এবিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পেতে হলে, নিজেদের পূর্বধারণাকে ভালোমতো যাচাই করে নেওয়া দরকার। দরকার আত্ম অনুসন্ধান এবং নিজের পেশায় প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দিতে পারার সামর্থ্য।

 

৩) নিজের পেশার প্রতি শ্রদ্ধা ও একনিষ্ঠতা

পরিশ্রম করলে এমনিতেই সবাই তা দেখতে পায়। তখন স্বীকৃতি আপনাআপনিই চলে আসে। আমরা নিজেদেরকে পেশাদার হিসেবে পরিচিত করতে পারি না, কারণ এটি এমন গুণ যা অন্যেরা আমাদের মধ্যে দেখতে পাবে বলে আশা করি। পেশাদারিত্ব আসে নিজ পেশার প্রতি শ্রদ্ধা ও একাগ্রতা থেকে। কোন কারণে নিজ পেশা বা কাজের প্রতি আগ্রহ/মনোযোগ কম থাকলে, সে কাজে আমরা পেশাদারিত্ব অর্জন করতে পারি না।

 

৪) দক্ষতার সাথে আবেগ ও ব্যক্তিত্বের মিশ্রণ

পেশাদারিত্বকে অনেকে ‘দক্ষতার’ সাথে ‘আবেগ’ ও ‘ব্যক্তিত্বের’ মিশ্রণ বলে মনে করেন। দক্ষতা চেষ্টা করলেই অর্জন করা যায়, কিন্তু পেশাদারিত্ব পেতে হলে সেই দক্ষতাকে নিজের আবেগ ও চেতনার সাথে সংমিশ্রণ ঘটাতে হয়। তখন কাজকে আর ‘শ্রম’ বলে মনে হয় না, কাজ হয়ে যায় আত্মসিদ্ধির মাধ্যম। পেশাদারিত্ব এমন একটি বিষয়।

 

৫) ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা ও নির্ভরযোগ্যতা

বড় কাজে কেউ আমাদের ওপর আস্থা করলে আমরা সম্মানিত বোধ করি। এজন্য দরকার দায়িত্বশীলতা। শুধু কাজ করলে তাতে মজা পাওয়া যায় না, যদি তাতে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা ও আবেগের যোগসূত্র না থাকে। তখন কেবলই মায়না বা মুজুরির সাথে ওজন করার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। এই প্রবণতা পেশাদারিত্ব অর্জনের বড় বাধা। যারা কাজ শেখান এবং যারা কর্মগুরু (মেন্টর), তারা শিষ্যকে অর্থের আকর্ষণ থেকে দূরে থাকার দীক্ষা দেন। পেশাদাররা নিজ কাজে জীবনের সার্থকতা খুঁজে পায়। তারা কখনও নিজের পবিত্র সময় ও শ্রমকে অর্থের পাল্লায় মাপে না।

 

৬) নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠা এবং জীবনের উদ্দেশ্যকে খুঁজে পাওয়া

পেশায় আত্মতৃপ্তি পাওয়া একটি সৌভাগ্যের বিষয়। কিন্তু সৌভাগ্য নাকি পরিশ্রমীদের জন্যই বরাদ্দ। জীবনের জন্য অর্থসম্পদ একটি দরকারি উপকরণ। ব্যক্তি জীবনের মৌলিক চাহিদা মেটাবার জন্য অর্থ খুবই প্রয়োজন। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন, ব্যক্তির পেশাদারিত্ব এবং নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠা। পেশাদারিত্ব হলো, কাজের মধ্যে জীবনের উদ্দেশ্যকে খুঁজে পাওয়া। পেশাদাররা অর্থকে অবহেলা করেন না, কারণ কাজ উত্তম হলে অর্থ আসে স্বাভাবিকভাবেই।

 

৭) আত্মসম্মান দ্বারা অনুপ্রাণিত জীবন

পেশাদারিত্ব হলো আত্মসম্মান দ্বারা অনুপ্রাণিত কর্মজীবন। যাদের আত্মসম্মানবোধ আছে, তাদের লক্ষ্য থাক সবসময় নিজের সেরাটুকু প্রয়োগ করা। এজন্য তারা অন্যের সহযোগিতা নিতে অথবা অন্যের মতামত নিতেও দ্বিধা করে না। মানুষ সম্মান ও সুনাম পেতে চায়। এটি খুবই স্বাভাবিক একটি চাওয়া। এই আকাঙক্ষাটি যাদের তীব্র, তারা নিজ নিজ কাজকে একাগ্রতার সাথে সম্পাদন করতে চায়। তারা চায় সকলে তাদের কাজের প্রশংসা করুক যা তাকে আরও উন্নততর কাজ পাবার সুযোগ করে দেবে। যার আত্মসম্মান আছে, সে জীবন ও কর্মজীবকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে।

professionalism_mmmainul2

পেশাদারিত্বের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা চলতে থাকবে।

 


পূর্বের পর্বগুলো:

▶ পর্ব ৭: এ দুই রকমের ম্যানেজার থেকে সাবধান থাকুন

▶ পর্ব ৬: ১৩ উপায়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে রাখুন হাতের মুঠোয়!

▶ পর্ব ৫:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনা: পেশাদারিত্ব কার দায়?

▶ পর্ব ৪:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া: পেশাদারিত্বের শুরু

▶ পর্ব ৩:  ৯টি তত্ত্বে প্রকল্পের সংজ্ঞা এবং সহজ কিছু দৃষ্টান্ত

▶ পর্ব ২:  যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনে প্রকল্প আমাদেরকে উপকৃত করে

▶ পর্ব ১:  প্রকল্প ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে

ফেলানী রোডের সেই দূতাবাসটিতে একদিন…

হরতাল আর অবরোধের দিনেও বিশাল লম্বা লাইন। এতো মানুষ ভারতে গিয়ে কী করবে? কেউ বলে ফরম নেওয়া শুরু করেছে, কেউ বলে, এখনও দেরি আছে। অথচ ঘড়িতে প্রায় দশটা! একজন মহিলা এসে দালালি করার সুযোগ চাচ্ছিলেন বার বার। “আসুন আমার সাথে, একদম প্রথমে জমা পড়বে আপনার আবেদন।” অন্যান্য কর্মসংস্থানের মতো দালালিতেও নারীদের অংশগ্রহণ দেখে উৎসাহিত হবো নাকি হতাশ হবো, ভাবছি। আমি প্রথমে না শুনার ভান করলাম। অফিস থেকে এসেছি – একটু তাড়া তো ছিলোই। তবু মনের সাথে যুদ্ধ করে অন্য সকল প্রার্থীদের মতো দাঁড়িয়ে থাকলাম লাইনে। খুব ‘সিরিয়াস প্রার্থী’ হলে হয়তো তাই করতাম। আধা ঘণ্টার পার না হতেই আমার পেছনে অনেক দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হলো। হঠাৎ একজন হিন্দু বৃদ্ধ এসে আমার সামনে দাঁড়ালেন। “বাবা, আপনার সাথে আমাকে নিন। বুড়ো মানুষ বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না।” একবার পেছনে তাকিয়ে অন্যদের প্রতিক্রিয়া দেখে নিলাম। অতএব শান্ত হয়ে মেনে নিলাম প্রাচীনকে।

 

 

এশিয়ার অনেক দেশ ঘুরেছি অথচ কলকাতাকে দেখা হয় নি আজও। অবিভক্ত বাংলার প্রাচীন শহর কলকাতাকে দেখার সখ সেই ছোট কাল থেকে। ছেচল্লিশ, সাতচল্লিশ আর একাত্তরের বাংলাদেশের সাথে কত গভীরভাবে জড়িয়ে আছে স্মৃতির শহর কলকাতা! বিগত দশকগুলোতে সুনীল বাবুর ‘পূর্ব-পশ্চিম’, এম আর আখতার মুকুলের ‘আমি বিজয় দেখেছি’ এবং ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের Era of Sheikh Mujibur Rahman পড়ার পর কলকাতাকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে ছিলাম। একসময় চিটাগং যাবার মতোই কলকাতায় যেতো এদেশের মানুষ। চিকিৎসা, বিয়ের বাজার বা শিক্ষার জন্য দক্ষিণবঙ্গের মানুষগুলো তো ঢাকায় না এসে কলকাতায় যাওয়াকেই সহজ মনে করতো। ‘হাত মে বিড়ি মু মে পান- লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ করতে করতে আমরাই এক সময় পাকিস্তানকে নিয়ে আসি। বাঙালি মুসলমানের সমর্থন না থাকলে পাকিস্তান হতে পারতো না। সে পাকিস্তান খরগ হয়ে আমাদের ওপরে চড়ে বসলো। আবার সেই আমরাই ‘জয় বাংলা’ বলে স্বাধীন করলাম বাংলাকে – পেলাম একান্ত নিজের বাংলাদেশকে। এতো দীর্ঘ ইতিহাস দু’বাক্যে বলে শেষ করা যায় না।

 

 

নাহ্ ভেবেছিলাম লাইন শেষ হলেই বুঝি ‘তাদের’ দেখা পাবো। প্রবেশ মুখেই সিকিউরিটি ডোর: সেটি পার হবার পর দেওয়া হলো ৫৯৯ নম্বর সিরিয়াল নম্বর। ভেতরের কক্ষে আমার মতো সিরিয়াল নম্বর নিয়ে অনেককে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে দেখলাম। অনিশ্চয়তা কমলো না। সাড়ে ন’টায় যদি আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হলো, তবে এতো মানুষের ভীড় কেন? সকলেই কি সাড়ে ন’টার প্রার্থী? নাহ্, তা তো হবার কথা নয়। খুঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, যার এপয়েন্টমেন্ট বারোটায় তিনিও সকালেই এসে উপস্থিত। ফেলানী রোডের কতৃপক্ষ কাউকেই নাখোশ করছেন না। তবে বসিয়ে রেখেছেন অনিশ্চিত অপেক্ষায়।

 

 

প্রায় আধাঘণ্টা অপেক্ষার পর আমার নম্বর ডাকা হলো। ভেবেছিলাম, এবার বুঝি পাবো ‘তাহার’ দেখা; মানে, যারা আমার কাগজপত্র গ্রহণ করে ভিসা দেবার প্রতিশ্রুতি দেবেন। কিন্তু এবারও হবে না। যুক্ত হলো আরেকটি সিরিয়াল ১৪২ নম্বর। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে আদিষ্ট হয়ে তৃতীয় তলায় গিয়ে দেখি, এলাহী কাণ্ড। এতো মানুষ কখন এসেছে? আরেকটি আবদ্ধ কক্ষ। শীতের দিনের গরমে কারও অনুকম্পা পাওয়া যায় না। এসি তো বন্ধই, ফ্যানও বন্ধ! উঁচু সিলিং ও দরজায় ভিনদেশী কারুকার্য। মানুষগুলোর ভাষা ও বসনে ‘ভারত-ভারত’ ভাব! ভিসা-প্রার্থীদের প্রস্তুতি ও আবেদনপত্রের সাথে সংযুক্ত কাগজপত্রের বহর দেখে আমি ভড়কে গেলাম। কেউ কেউ বগলেও একটি ফাইল নিয়ে এসেছেন, যেন ভারত যাওয়াই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। অথচ আমি যে মাসখানেক আগে আবেদন করেছিলাম সেটিই প্রায় ভুলে গিয়েছিলাম! গরম আর অনিশ্চয়তায় সবকিছু ঝাপসা লাগছে।

 

 

আরও প্রায় এক ঘণ্টা বসে থাকার পর আমার ডাক আসলো। সব কাগজের মধ্যে বিদ্যুতের বিলই হলো তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণপত্র। ঠিকানা নিশ্চিত না হয়ে ভিসার আবেদন গ্রহণ করবে না। যা হোক, সব দাবি মেটানোর পর গৃহীত হলো আমার আবেদন ও পাসপোর্ট। খুব সম্ভব সামনের সপ্তাহের শুরুতেই পেয়ে যাবো কলকাতা যাবার ছাড়পত্র। ফেলানীসহ অগণিত সীমান্ত হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ভারতকে হয়তো কখনও ক্ষমা করতে পারবো না। তবু ‘পরদেশে আত্মীয়ের’ মতো কলকাতাকে একবার দেখে আসতে চাই। চোখের দেখা! কলকাতায় ‘থাকা ও ভ্রমণ’ সম্পর্কে অভিজ্ঞ সহব্লগারদের পরামর্শ চাই।

 

আরও পড়ুন:  একদিন কলকাতায়


 

[প্রথম প্রকাশ ও পাঠক প্রতিক্রিয়া/ ২৯ নভে ২০১৩: সামহোয়্যারইন ব্লগ]

এ দুই রকমের ম্যানেজার থেকে সাবধান থাকুন…

banner7-crop

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে ড্রিম ম্যানেজার, পর্ব ৭। প্রকল্প ব্যবস্থাপককে সফল হতে হলে শুধু ভালো পরিকল্পনা আর পরিশ্রম করলেই চলবে না, প্রতিষ্ঠানের পরিবেশের সাথে মানানসই হতে হয়। তাকে জানতে হয় প্রতিষ্ঠানের স্বভাব সংস্কৃতি ও আন্ত:বিভাগীয় যোগাযোগ। জানতে হয় বিষক্রিয়াশীল জৈষ্ঠ্য ব্যবস্থাপকদের ক্ষতিকারক প্রবণতা, যা প্রকল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এসব জানতে হয় শেখার জন্য নয়, কিন্তু নিজেকে ও প্রকল্পকে রক্ষা করার জন্য। ভয়ানক কিছু ব্যবস্থাপক বা পরিচালক আছেন, যারা মিড-লেভেল ম্যানেজারদের মনে প্রভাব ফেলে ‘মন্দকে ভালো’ বলে প্রতিষ্ঠিত করেন। তারা উচ্চ পর্যায়ে কিছুই করতে পারেন না বা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, কিন্তু নিম্নপর্যায়ের কর্মীদের অন্দরমহল পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে চান। অধীনস্ত কর্মীর জন্য একটাকা বেতন বাড়াতে পারেন না, কিন্তু পান থেকে চুন কষলে শো’কজ লেটার দিয়ে জীবন নরক করে তোলেন। কাজ শেখাবার বেলায় কিছুই করতে পারেন না, কিন্তু কাজে ভুল হলে দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন অধীনস্ত কর্মীর ওপরে। এসব হিপোক্রিটদের দৌড় বেশি দূর যায় না! এপর্বে আলোচনা করবো ওসব বিষক্রিয়াশীল কর্মকর্তাদের স্বভাব ও প্রভাব নিয়ে। উভয়পক্ষই সচেতন থেকে যেন নিজেদেরকে উৎপাদনমুখী আচরণে উন্নয়ন করতে পারেন, এ উদ্দেশ্যেই লেখাটি।

প্রতিষ্ঠানের জৈষ্ট্য ব্যবস্থাপকরা অভিজ্ঞ; তারা সিনিয়র এবং তারা জানেন অনেক বেশি। প্রতিষ্ঠানের সব পর্যায়ের কর্মীর সাথে তাদের যোগাযোগ থাকে। একারণে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা বা গ্রহণযোগ্যতাও বেশি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা-বিধির অপপ্রয়োগ করে অথবা ঊর্ধ্বতর কর্তৃপক্ষের অজ্ঞতা/শৈথিল্য/অযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীল পরিবেশকে খারাপ করে তোলেন। শুরু হয় আন্ত:বিভাগীয় ক্ষমতার রাজনীতি, যা ‘খালি চোখে’ দেখা যায় না, কিন্তু নিরবে কর্মীদের মনে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতিকে ব্যহত করে।

একই ভাবে এবং একই উদ্দেশ্যে, মাঝারি পর্যায়ের ম্যানেজাররাও একই পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারেন তাদের প্রকল্প কার্যালয়ে। দলাদলি, তোষামোদি, স্বজনপ্রীতি এবং হিংসাহিংসি যখন প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতিতে গেঁথে যায়, সেটি সকলকে প্রভাবিত করে। এখানে অপেক্ষাকৃত ভালো যারা, তারা হয় পরিবর্তিত হয়, অথবা সকলের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, নয় তো প্রতিষ্ঠান ছেড়ে পালায়।

 

toxic_managers

আজ দু’প্রকার ম্যানেজার নিয়ে আলোচনা করা যাক:

১) দ্য ফ্রেন্ডলি ডেন্জারাস বস্: অসম্ভব বন্ধুত্ব দিয়ে তিনি কর্মীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেন

এধরণের ম্যানেজারদের সম্পর্কে ফোর্বস ডট কমের নিয়মিত লেখক ট্রাভিস ব্র্যাডবেরি বলেছেন, “এরা অসম্ভব রকমের বন্ধুত্বের ভাণ করেন, যা মজার নয় গঠনমূলকও নয়। কাজের সময় নষ্ট করে অফিস আড্ডায় মেতে ওঠেন এবং নিজের প্রভাব খাটিয়ে সবাইকে আটকে রাখেন। তিনি তার প্রিয়ভাজনদেরকে বিভিন্ন কাজে বেছে নেন এবং কর্মীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেন। তিনি প্রয়োজনের সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।” অন্যের দুর্বলতা নিয়ে দুর্বোধ্য ভাষায় মজা করা, অথবা প্রতিপক্ষের কোন ঘটনা নিয়ে খুশখুশ হাসিতে মেতে ওঠা অথবা অসংখ্যবার বলা হয়েছে এমন কিছু কৌতুক বলা, এসব কখনও কর্মীকে গড়ে তুলতে পারে না।

এধরণের অসম বন্ধুত্ব কখনও ভালো ফল দেয় না। চায়ের টেবিলের আড্ডা দিয়ে এসব ম্যানেজার বুঝাতে চান যে, তার সাথে সময় কাটালে সেটি সময়ের অপচয় নয়, কারণ তিনিই তো সব নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনিই প্রতিষ্ঠানের সব এবং কর্মীর বিপদের কাণ্ডারি, এরকম কিছু মিথ্যা প্রত্যাশার সৃষ্টি করেন কর্মীর মনে। ম্যানেজার যা করেন, যা বলেন, কর্মী সবই গলাধকরণ করেন। একসময় নিজের কাজে মনসংযোগ না করে, কেবল খোসামোদিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। তাতে কাজ ও সম্পর্কের মধ্যে অপেশাদারি মনোভাব সৃষ্টি হয়। প্রতিষ্ঠানের গতিশীলতায় সৃষ্টি হয় ‘এক মধুর প্রতিবন্ধকতা’ যা শুরুতে বুঝতে পারা যায় না।

তারা এমন ভাণ করবেন যে, আপনার জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত। অফিসের টাকায় উদারতা দেখাবে, খাওয়াবে। সিদ্ধান্ত অথবা দিকনির্দেশনা দেবার ক্ষেত্রে তারা প্রধানত দুর্বল, কারণ মৌলিক জ্ঞানের ঘাটতিই এসব ম্যানেজারদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। কিন্তু তারা সেটি আপনাকে বুঝতে দেবেন না, কারণ ‘আপনি যা করেন, সেটিই উত্তম হবে বলে তার বিশ্বাস’। এর পরিণতি খুবই খারাপ। কাজের ফল যদি ভালো হয়, তবে ম্যানেজার তার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে একাই কৃতীত্ব নেবেন। যদি ফলাফল খারাপ হয়, তবুও তার কোন দায় নেই; এবং আপনিও তাকে দায় দিতে পারবেন না। তিনিও তার বসকে বলবেন যে, এটি আপনিই একা করেছেন, তার সুযোগ হয়নি চেক করে দেখার। সবাই এসব মারপেঁচ বুঝে না, বরং ‘কাজের স্বাধীনতার জন্য’ মনে মনে ওই ম্যানেজারের প্রতি কৃতজ্ঞ হয়।

কমপ্লেক্স ম্যাট্রিক্স-এর প্রতিষ্ঠানে, যেখানে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, ক্রয়, প্রশাসন ইত্যাদি বিষয়ের ভিন্ন ভিন্ন বিভাগ রয়েছে, এধরণের দলীয়পনা খুবই ক্ষতিকারক। কারণ এসবের উদ্দেশ্য হলো, ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে কর্মীকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার করা।

এখানে আশঙ্কার বিষয়টি হলো প্রতিষ্ঠানের নতুন কর্মীদের নিয়ে, যারা প্রতিষ্ঠানের কালচারের সাথে পরিচিত হন নি অথবা এধরণের জৈষ্ঠ্য কর্মকর্তাদের মতিগতি সম্পর্কে অবগত নন। তারা এধরণের ম্যানেজারদের দেবতা-জ্ঞান করেন এবং নিজের মনের সব কথা বলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন।

 

এদের থেকে বাঁচার উপায়?

  • এবিষয়ে ট্রাভিস ব্র্যাডবেরি বলেছেন, প্রথম কাজ হলো ওই ধরণের কর্মকর্তাদের সাথে সম্পর্কের সীমানা নির্ধারণ। চেষ্টা করতে হবে, যেন ম্যানেজার/পরিচালক তার পজিশন দিয়ে আপনাকে আতঙ্কিত না করতে পারেন।
  • বস তো বসই, নিজে বিপদে পড়লে কখনও তিনি আপনাকে অস্বীকার করতে দ্বিধা করবেন না। অতএব নিজের দায়িত্বের প্রতি অবহেলা নয়। সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি যখন ‘না’ বলার সময় আসে তখন বিনয়ের সাথে সেটি প্রকাশ করা উচিত।
  • প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকতা কখনও ষোলআনা বন্ধু হবেন না, হতে পারেন না। বন্ধুত্ব হয় সমান্তরালে। একজন উঁচু আরেকজন অনেক নিচু অবস্থানে থাকলে সম্পর্কের খারাপ পরিণতি জুনিয়রকেই বহন করতে হয়।
  • পেশাদারিত্ব হলো সবাইকে উপযুক্তভাবে মূল্যায়ন করা। অন্যের অনুপস্থিতিতে তার সমালোচনা করা অথবা তাকে নিকে মজা করা, কোন পেশাদারিত্বের পর্যায়ে পড়ে না।
  • যত দ্রুত সম্ভব নিজের প্রতিষ্ঠানের অতীত ব্যাকগ্রাউন্ড জেনে নেওয়া একটি  উত্তম দক্ষতা। জৈষ্ট্য কর্মকর্তাদের আচরণ ও মনোভাবকে বুঝার জন্য এর চেয়ে ভালো কোন পন্থা নেই।

 

 

২) দ্য মাইক্রোম্যানেজার: এরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে ‘প্রতিষ্ঠানের মুসোলিনি’ হতে চায়

নিজের পদ নিয়ে সদা সন্ত্রস্ত এসব ব্যবস্থাপক সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চান: অফিসের স্ন্যাকস আইটেম থেকে শুরু করে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সবকিছুতে তাদের অনুমতি নিতে হয়, অবগতিতে রাখতে হয়। সবাইকে মনে করেন তার প্রতিপক্ষ। ক্ষুদ্রকে ধরে রাখেন, বৃহৎ থাকে অধরা। কাজের ‘উদ্দেশ্য’ নয়, কাজের ‘প্রক্রিয়া’ নিয়ে তার মাথাব্যথা। উৎপাদন যা-ই হোক, তিনি চান ‘তার নির্দেশের সফল প্রয়োগ’।

তিনি ফল যদি না-ও চান, প্রতিবেদন থাকতে হবে পাকা। তিনি অর্জনের তথ্য চান না, তিনি চান তার প্রতিবেদন ছকের পরিপূর্ণ ব্যবহার। তারা বৃহৎ আকৃতিতে বিষয়টুকু দেখতে পারেন না, পারেন না ভবিষ্যত সম্পর্কে পরিকল্পনা করতে।

তিনি কাজকে কখনও সহজ করতে পারেন না, অথবা চান না। প্রতিবেদন ছক সৃষ্টি করা, নতুন নির্দেশ জারি করা এবং এসব করে প্রতিষ্ঠানের কর্মচঞ্চলতাকে তার দিকে ‘নিবিষ্ট রাখা’ তার দৈনন্দিন কাজ। তাতে তার স্বাক্ষর দেবার সুযোগ বেড়ে যায়, বেড়ে যায় প্রভাব খাটানোর সুযোগ।

প্রতিষ্ঠানের কাজ যা-ই হোক, এদের কাজ হলো কর্মী ব্যবস্থাপনা। সেটি নিশ্চয়ই ভালো পথে নয়, ধ্বংসাত্মক পথে। সব পর্যায়ের কর্মীকে তার ভয়ে ভীত রেখে এসব ম্যানেজার আনন্দ লাভ করেন।

মাইক্রোম্যানেজাররা কর্মীর জন্য সমান সুযোগে বিশ্বাসী নন। তারা জানেন না, অথবা জানতে চান না যে, সুযোগ আর স্বাধীনতা পেলে সবাই তার সর্বোচ্চটুকু দেবার চেষ্টা করে।

তারা ক্ষমা করতে পারেন না, কারণ সেই নৈতিক জোর নেই। কর্মীর ক্ষুদ্র বিচ্ছুতিটুকু তারা মনে ধরে রাখেন এবং প্রতিশোধপরায়ন হয়ে ওঠেন। তারা মানেন না, এটি কর্মক্ষেত্র। কর্মীর প্রতি ইতিবাচক থাকলে সে সংশোধন করে এগিয়ে যাবেই। এখানে কর্মই সবকিছু নির্ধারণ করে। কিন্তু মাইক্রোম্যানেজার চান তোষামোদ আর অন্ধ ভক্তি। কর্মী নয়, তিনি চান ভক্ত।

তারা চেইন-অভ্ কমান্ড ভাঙার ওস্তাদ, যদি সেটি হয় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা সুযোগ। ছলে-বলে-কৌশলে অন্যের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা তার সখ। প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ, অথবা প্রতিপক্ষের প্রতিপক্ষ তৈরিতে তার জুরি নেই। সব কাজ বাদ দিয়ে, কাগজপত্র তৈরি বা ফাইলদস্তাবেজ সংরক্ষণে এসব কর্মকর্তারা দিনভর শ্রম দেন অথবা অধিনস্ত কর্মীকে চাপের ওপর রাখেন।

 

এদের থেকে বাঁচার উপায়?

  • একজন পেশাদার প্রকল্প ব্যবস্থাপকের জন্য এসব কোন সমস্যা নয় – এমনিতেই সবকিছু অনুকূলে চলে আসে। বসের ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে কীভাবে নিজেরটুকু পুরোপুরি প্রয়োগ করতে হয়, পেশাদাররা সেটি জানেন।
  • মাঝারি পর্যায়ের কর্মকর্তার জন্য বলছি, ভুলেও এদের কোন কথার প্রতিবাদ করে ‘প্রকাশ্য প্রতিপক্ষ’ হতে যাবেন না; আপনার কর্মজীবনকে ধ্বংস করে দেবে। আবার পক্ষেও যাবেন না, কারণ সকলেই এদের মন্দ দিক সম্পর্কে অবগত এবং যথা সম্ভব দূরত্ব বজায় রাখে। আপনিও তা-ই করুন।
  • নিজেকে ভিকটিম হতে দেবেন না। পরিস্থিতি কতটুকু খারাপ হবে তা নির্ভর করে আপনি কীভাবে/কতটুকু প্রতিক্রিয়া করেন। অতএব ভাবাবেগ থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
  • মাইক্রোম্যানেজাররা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অযোগ্য/অদক্ষ হয়ে থাকে। ফলে তাদের প্রধান ভয় হলো নিজের পদ ও মর্যাদা নিয়ে – প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি নিয়ে নয়। তাই নিজের প্রতিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে তাদের আস্থা অর্জন করতে পারলে ফলাফল আপনার পক্ষে থাকবে।
  • সবাইকে খুশি করার অসম্ভব চেষ্টা থেকে দূরে থাকুন। দেখুন আপনি কিসে খুশি। নিজের মূল্য বুঝুন এবং কাজের মধ্যে সেটি ধরে রাখার চেষ্টা করুন।
  • নিজের সততার জন্য কারও কাছে দুঃখিত হতে যাবেন না এবং অসম্ভব লক্ষ্যমাত্রার পেছনে দৌড়াতে যাবেন না। দেখে নিন আপনার প্রজেক্টকে প্রভাবিত করে এমন কিছু বাদ পড়ছে কিনা। বিনয় ধরে রাখুন, কিন্তু ‘না’ বলতে শিখুন।

 

 

প্রজেক্ট মানে হলো একটি মিশন, যারা বাস্তবায়নের জন্য শ্রম, মূলধন ও যন্ত্রপাতির সুব্যবস্থাপনা করতে হয়। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রকল্পের পক্ষ/বিপক্ষকে সনাক্ত করতে পারা। প্রকল্পের অগ্রগতিতে কার প্রভাব ইতিবাচক বা নেতিবাচক, এটি জানতে পারলে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পঞ্চাশ শতাংশ সহজ হয়ে যায়। তাই অন্য যেকোন কাজের চেয়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় বেশি দায়িত্বশীলতার প্রয়োজন হয়।

বিষক্রিয়াশীল ম্যানেজারদের নিয়ে আরও দু’একটি পর্ব লেখার ইচ্ছে আছে।

 

 


পূর্বের পর্বগুলো:

▶ পর্ব ৬: ১৩ উপায়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে রাখুন হাতের মুঠোয়!

▶ পর্ব ৫:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনা: পেশাদারিত্ব কার দায়?

▶ পর্ব ৪:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া: পেশাদারিত্বের শুরু

▶ পর্ব ৩:  ৯টি তত্ত্বে প্রকল্পের সংজ্ঞা এবং সহজ কিছু দৃষ্টান্ত

▶ পর্ব ২:  যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনে প্রকল্প আমাদেরকে উপকৃত করে

▶ পর্ব ১:  প্রকল্প ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে