Category: গল্প প্রচেষ্টা

ঊনগল্প: ‘প্রেক্ষাগৃহের পথে’

file (1)

প্রেক্ষাগৃহ-মুখী পান্থপথে অবধারিতভাবে দেখা মিললো জীর্ণ বস্ত্রের শীর্ণ দেহের এক বৃদ্ধার সাথে। যন্ত্রণায় কাতর, প্রসারিত হাত, অর্ধমুদিত চোখ। বিভিন্ন মূল্যের কাগুজে ও ধাতব মুদ্রা ছড়িয়ে আছে চারপাশে।

পথচারি উৎসাহিত হতেই পারেন তুচ্ছ বিবেচনা করে আরও কয়েকটি মুদ্রা ফেলে দিতে। খুবই মামুলি বিষয়, অনেকেই তো তাই করে। হয়তো বৃদ্ধাও তাই চাইতো। কিন্তু এবারই একটু ব্যতিক্রম করলো: পথচারির সাথে দৃষ্টির সাক্ষাতে দুর্বল হাতে বারণ করে দেয় বৃদ্ধা।

বিনোদন-পিয়াসী পথচারির অত সময় কোথায়! ঘাড়ের ঝাঁকুনিতে দ্বিধা কাটিয়ে অতঃপর প্রেক্ষাগৃহে প্রবেশ। আলো-আঁধারি বিনোদনকক্ষটিতে আবার এসে হানা দেয় সেই বৃদ্ধা। কেন সে সাহায্য নিতে চায় নি? এত বড় নিশ্চয়তা কোথায় পেল সে? কিন্তু তীব্র আলোর আচমকা উপস্থিতিতে মন ফিরে আসে বিনোদনচিত্রে।

বিনোদন শেষ। আরেকটি মর্মন্তুদ নাটক অপেক্ষা করেছিলো সেদিন পান্থপথে: বৃদ্ধা এবার নিথর দেহে শায়িত। হাত দু’টি প্রসারিত হলেও মুঠোবদ্ধ হয়ে আছে। বিদায়ের বার্তা কি আগেই জেনেছিল সে? কমলা রঙের আলোতে মানুষগুলোর ছুটে চলায় ফুটে ওঠে প্রহসন নাটকের দৃশ্য।

 

 


সামহোয়্যারইন ব্লগে পাঠকের প্রতিক্রিয়া

 

আলি আহমদ: কর্মজীবনে পাওয়া একজন মেনটর

ছাত্রজীবনের এক কঠিন বাঁকে এসে একটি খণ্ডকালীণ চাকরির যখন খুবই দরকার ছিলো, তখন এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক স্বর্গদূতের মতো এসে আমাকে উদ্ধার করলেন। ইন্টারভিউর আগের দিনও তিনি আমাকে চিনতেন না। আমাকে দেখেই কী ভেবে বোর্ডের অন্যান্য সদস্যদের বিব্রত মুখের সামনে বলে দিলেন, এই ছেলেটিকে নিন। সকলকে স্তম্ভিত করে দিয়ে আমার সামনেই তিনি রায় দিয়ে দিলেন। পরবর্তি দু’টি বছর ছিলো আমার জীবনের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তখনও আমার স্নানকোত্তর শেষ হয় নি। মজার ব্যাপারটি হলো এই চাকরিটি প্রথমে খণ্ডকালীণ ছিলো না। এই ভদ্রলোকের সহায়তায় তিনমাসের আমার চুক্তিটিকে পূর্ণকালীণ থেকে খণ্ডকালীণে পরিবর্তন করতে সমর্থ হই।

চাকরি জীবনের প্রাথমিক দিনগুলোতে এই জৈষ্ঠ সহকর্মীকে পেয়েছিলাম, যিনি কখনও তার জৈষ্ঠতার কথা মনে করাতেন না। সকলের সাথে মিশতেন এবং প্রায় সকল কথাই বলতেও দিতেন। ফলে অন্যরা যেমন বেশি আশকারা পেতো, তেমনি তিনিও তাদের সহযোগিতা পেতেন সবচেয়ে বেশি। এজন্য অন্যান্য জৈষ্ঠরা তাকে খুব হিংসা করতেন, কিন্তু বিপদের সময়ে তারই নম্বরে ইন্টারকমের কলটি যেতো। এর মূলে ছিলো, অনেক মানুষের সঙ্গে তার মিশার ক্ষমতা এবং দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য অলৌকিক কিছু কারিশমা।

বলছি আলি আহমদ সাহেবের কথা। এক দিলখোলা মানুষ। এর আগে এরকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করে অবসর জীবনে এসে বর্তমান কাজটি করছেন। তার নেতৃত্ব এবং প্রতিনিধিত্ব করার গুণাবলী দিয়ে সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠানটিকে তিনিই ধরে রেখেছেন বলা যায়। তিনি সহকর্মীদেরকে এতই উৎফুল্ল রাখতেন যে, তিনি কোন কারণে ছুটিতে থাকলে সেদিন অফিস থাকতো অন্ধকার। দেরিতে আসলেও অফিসের সকলে তার অনুপস্থিতি সবাই টের পেতো। বেশি টের পেতো সবুজ। অফিসের পিওন। সে একটু পরপর বলতে থাকতো, ‘আহমদ স্যারের আজ অইলো কী?’

আহমদ সাহেব ছিলেন অফুরন্ত প্রেরণার উৎস। দেখা গেলো, অফিসের কর্মীরা কোন বিশেষ ডেডলাইনের পেছনে কাজ করছে। কিন্তু রাতদিন কাজ করেও যখন ডেডলাইনের মধ্যে কাজ শেষ হচ্ছে না, তখন উদ্ধারকারী হিসেবে তিনিই পথ বাতলে দিতেন। তিনি বলতেন, ‘আসুন…এক কাপ চা খান। আরে ভাই… শুনুন ডেডলাইন হলো দু প্রকার: একটিকে বলে ডেডলাইন; আরেকটিকে বলে ‘আসল’ ডেডলাইন। ডেডলাইনেরও একটি ডেডলাইন আছে। অতএব, চা খেয়ে পূর্ণোদ্দমে আবার লেগে যান। যতক্ষণ কাজে থাকবেন, ততক্ষণ ডেডলাইন আপনার জন্য লাইফলাইন।’

সবসময় বলতেন, ‘কাজ করবেন আনন্দ নিয়ে, তাই বলে জীবন দিয়ে দেবেন না। জীবন একটাই।’ আড্ডা দিতেন সুযোগ পেলেই। পান খাবার কারণে মুখে বিষণ্নতা দেখা যেতো না, থাকলেও। পান খেয়ে ঠোঁট তো লাল করতেনই, হাতও লাল করে রাখতেন। অফিসের পিয়নের সাথে ছিলো তার আলাদা ভাব। ইশারা করলেই পান হাজির।

আড্ডার সুযোগে জুনিয়ররা মাঝে মাঝে দু’একটা অভিযোগের কথা শুনিয়ে দিতেন। অভিযোগগুলো অধিকাংশই বড় বসকে নিয়ে। অথবা অন্য কোন জৈষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে। তিনি শুধু হাসতেন, কিছুই বলতেন না। শেষে শুধু বলতেন, ‘শুনুন, বসকে নিয়ে এতো ঘ্যানর করবেন না। তাকে নিয়ে এতো ধ্যানের কী আছে? কাজ নিয়ে ধ্যান করুন। বস একদিন আপনাকে নিয়ে ধ্যান করবেন।’ অথবা বলতেন, ‘বসের কথা শুনবেন, কিন্তু শুনবেন না।’ সময় থাকলে তার রহস্যময় কথাগুলো ভাঙিয়ে বলতেন। বসের আদেশের বাইরেও নিজের কমন সেন্স ব্যবহার করতে হবে। খালি শুনলেই চলবে না, মাঝে মাঝে না শুনেও অফিসের উপকার করা যায়।

তার অনেক উক্তির মধ্যে মনে রাখার মতো উক্তিটি হলো, ‘অত বেশি চিন্তা করবেন না। চিন্তা করলে কার্যক্ষমতা কমে যায়।’

একবার হলো কী, তার প্রাণপ্রিয় অফিসের পিওন সবুজ মিয়ার মুখের হাসি বন্ধ হয়ে গেলো। সাধারণত সবুজ থাকতো হাসির আগে আর খাবারের পরে। অর্থাৎ হাসির কোন বিষয় হলে, সবুজের উচ্চস্বরে হাসি থেকেই তা বুঝা যেতো; কিন্তু অফিসের খাবারের আয়োজনে পদাধিকারের বলেই সবুজ থাকতো সবার পেছনে! তো, সবুজ হঠাৎ হাসি বন্ধ করে দিয়েছে। আমরাও চিন্তিত। কী ব্যাপার, সবুজ? কোন উত্তর নেই। আলি আহমদ সাহেব দু’দিন ধরেই বিষয়টি খেয়াল করলেও, তিনি সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করছেন না । কিন্তু তৃতীয় দিনে আমাদেরকে চমকে দিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করে বসলেন:

-তোর কী হয়েছে রে? অফিসের পরিবেশ গোমট করে রেখেছিস কেন?
-স্যার, আমার অনেক বড় সমস্যা।
-কী সমস্যা, বলবি তো? কী এমন হয়েছে যে তোর হাসি বন্ধ?
-স্যার, ঋণের কিস্তি দিতে ভুলে গেছি।
-তাতে কী হয়েছে? জরিমানাসহ পরের মাসে দিয়ে দিবি?
-স্যার, এর আগেও ভুলে গিয়েছিলাম। এখন আমার অনেক সমস্যা।
-আরে এতে তোর সমস্যা হবে কেন?
-(সবুজ হা করে দাঁড়িয়ে আছে।)
-তুই টাকা দিতে না পারলে তোর সমস্যা হতে যাবে কেন? ওটি তো ব্যাংকের সমস্যা।

আমরা যারা তাদের এই কথোপকথনের শ্রোতা ছিলাম, স্মিত হেসে কাজে মনযোগ দেই। কত সহজেই না তিনি পরিস্থিতিকে হালকা করতে পারেন। আমাদের হাসি থামলে পর তিনি এই বলে শেষ করলেন, ‘ওদের টাকা। ওরাই তোকে পথ বাতলে দেবে। এখন এক দৌড়ে গিয়ে একটি পান নিয়ে আয় তো!’

বাস্তব অভিজ্ঞতার জীবন্ত ভাণ্ডার ছিলেন, আলি আহমদ সাহেব। মাঝে মাঝে অফিসে যখন মন খারাপ হয় অথবা কোথাও কোন স্বস্তি খুঁজে পাই না, তখন তাকে খুবই মিস করি। আমি জানি না তিনি কোথায় আছেন, অথবা আদৌ বেঁচে আছেন কি না। শহর ছেড়েছিলাম আমরা ১২/১৩ বছর আগে। তারও ২/৩ বছর আগে ওই চাকরিটি ছেড়েছিলাম। মোবাইলের তত প্রচলন না থাকায় এক সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু তার সাথে চেতনার যোগাযোগটি কখনও আলাদা হতে পারে নি।

প্রডিজি বয় আরভিনের কথা



[১৯২০ সালের আরভিন: জন্ম ১৯০৩ বুদাপেস্ট/হাঙ্গেরি – ‍মৃত্যু ১৯৮৭ লসএন্জেলেস/যুক্তরাষ্ট্র]

‘আরভিন’ তার নাম হলেও বালকের পুরো নাম বিকট আকৃতির। বয়স ২ বছর হতেই খেলনা পিয়ানো পেয়েছিলো হাতে। তাতেই সে পেয়ে যায় পিয়ানো শেখার হাতেখড়ি। হাঙ্গেরিতে জন্ম আর যুক্তরাষ্ট্রে বড় হওয়া এই বিস্ময় বালকের ঘটনাটি ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে পড়েছি একটি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত পুস্তকে। গল্পটি খুব বড় নয় কিন্তু গভীর তাৎপর্যে মুগ্ধ হয়েছিলাম। মানুষের জীবন-যাত্রায় সাথে আরভিনের জীবনের অনেক মিল আছে। আরভিনের করুণ কাহিনী ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিলো সেদিন।


ফিরে যাচ্ছি প্রডিজি বয় আরভিনের কথায়। তৃতীয় বছরে এ বালক তার খেলনা পিয়ানোতে সুর তুলে মা-বাবাসহ প্রতিবেশিকে একদিন মুগ্ধ করে দেয়। চতুর্থ বছরে সে তার সুরগুলো সঙ্গীতের সংকেতে লিখতে শুরু করে দেয়। চার বছরের বালকের জন্য এরকম দক্ষতার কথা শুধু নিকটবর্তীরাই বিশ্বাস করবে। 


জার্মানের ‘বার্লিন সিম্ফোনিতে’ আরভিন যখন পিয়ানো বাজানোর গৌরব অর্জন করে, তখন তার বয়স মাত্র ১২। এবছরে তার সঙ্গীতজ্ঞ পিতা মৃত্যুবরণ করেন। যা হোক, ১৫ বছর বয়সে নরওয়ের মহামান্য রাজা ও রানির সামনে আরভিন পিয়ানো পরিবেশন করেন। আরভিনের সঙ্গীত প্রতিভা তখন প্রায় বিশ্বে প্রচারিত। তার সুখ্যাতি ইউরোপ ছাড়িয়ে আমেরিকায় গিয়ে পৌঁছায়। বছর দুই পরে নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত কার্নেগি হলে আরভিন পিয়ানো পরিবেশন করে মার্কিনিদের তাক লাগিয়ে দেন। সঙ্গীতের তাত্ত্বিকরা ততদিনে মারভিনকে তুলনা করতে শুরু করেন কিংবদন্তী মোসার্টের (Mozart) সাথে। পুরো নাম আরভিন নিরেজিহাসা। বয়স মাত্র ১৭।  

 

কিন্তু পঁচিশ না হতেই অজানা কারণে আরভিন লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়। অবস্থা এমন হলো যে, আরভিন যেন পৃথিবীতেই নেই। থাকলেও সঙ্গীতের সাথে তার কখনও পরিচয় ঘটে নি। প্রায় ৭০০ কম্পোজিশনের শ্রষ্ঠা আরভিনকে মনে হলো, সে কোন দিন মঞ্চে ওঠে নি। সঙ্গীতের দোকানে নেই তার নাম। কারণ সেগুলো কখনও প্রকাশ পায় নি।


মানুষ কখনও বুঝতে পারলো না, বিশ্বকাঁপানো পিয়ানো-বিস্ময় কিশোর আরভিনের কী হলো! বিশ্বের সেরা পিয়ানো বাদকদের তালিকায় আরভিনকে পাওয়া যাবে না। খ্যাতিমান পিয়ানো বাদকেরা মারভিনকে চিনবেন না। প্রজন্মের পরিবর্তনে এক সময় আরভিনের কথা মানুষও ভুলে গেলো। বিষয়টি রহস্য হয়ে থাকলো অনেক বছর।


হঠাৎ একদিন সানফ্রান্সিসকো’র (ক্যালিফোর্নিয়া) এক জীর্ণ হোটেলের সামনে এক বৃদ্ধকে দেখা গেলো পিয়ানোতে পুরান সুর তুলতে। রাস্তার পাশে বিনামূল্যে পিয়ানো বাজিয়ে শুনাচ্ছেন ৭৫ বছর বয়সী আরভিন! অকাল-পক্ক খ্যাতি পাবার ৫৫ বছর পর যখন জীবনের সব চাওয়া-পাওয়া শেষ, আরভিন তখন নিজের মূল্য উপলব্ধি করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, পরবর্তি প্রজন্মের জন্য তার ৭০০ সুরের পিয়ানো কম্পোজিশনগুলো রেকর্ড করে রাখা চাই।


কী হয়েছিলো আরভিনের? সহজ এই প্রশ্নের সরল উত্তরটি হলো: আরভিন জীবনের ভার সহ্য করতে পারেন নি। অতি অল্প বয়সেই তিনি সব পেয়েছিলেন। ভক্তদের চাপ, অনাকাঙ্ক্ষিত প্রেম, জনতার প্রত্যাশা, সঙ্গীতের স্বভাবজাত আবেগের চাপ, খ্যাতির নিজস্ব কিছু যন্ত্রণা – ইত্যাদি বিষয় আরভিন ঠিকমতো সামাল দিতে পারছিলেন না। মানসিক, শারীরিক ও আবেগিক ধারায় নিজেকে ধরে রাখতে পারেন নি আরভিন। তিনি মনে করেছিলেন, সবকিছু তাকে কেবল তাকেই মোকাবেলা করতে হবে। নিষ্ঠুর একাকিত্ব পেয়ে বসেছিল আরভিনকে। 

এক রাতে ভূতের সাথে

এক রাতে ভূতের সাথে

এক রাতে ভূতের সাথে

১) অন্যান্য সচেতন মানুষের মতো আমিও ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করি নি। কিন্তু আমার সমস্ত বিশ্বাস ও চেতনাকে বদলে দিলো সেদিন রাতের ঘটনা। কখনও ভাবি নি আমি ভূত দেখতে পাবো, অথবা ভূতদের আবার পার্টি থাকতে পারে। কিন্তু ওই দিন, অর্থাৎ ওই রাতে, ঘটনাক্রমে না থাকলে হয়তো আমি আজও বলতাম যে, ভূত বলে কিছু নেই। আমি ঠিক বুঝতে পারি নি এটি যে ভূতের পার্টিতে পরিণত হবে। ঘটনাটি খুলে না বললে বিশ্বাস করাতে পারবো না যে, ভূত এখনও আছে।

খুবই স্বাভাবিক একটি দিন। বৃহস্পতিবার। সামনে শুক্র ও শনিবার। দু’দিন সাপ্তাহিক ছুটির আমেজ নিয়ে ফুরফুরে মেজাজে অফিসের একজিট বাটনে বামহাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রেস করলাম। যন্ত্রচালিত ‘ধন্যবাদ’ শুনতে শুনতে অফিসের মূল ফটক থেকে পা বের করার মুহূর্তেই মুঠোফোন বেজে ওঠলো। আরে, এ যে সুলতান! নিশ্চয়ই আলতাফ, অতীন, প্রিয়া আর হাসনাহেনাকে নিয়ে আড্ডার আয়োজন হচ্ছে। কয়েক দিন পর পর তারা একত্রিত হয়। সাভার, উত্তরা আর মোহাম্মদপুর থেকে মহাখালিতে একত্রিত হতে আর কতক্ষণ লাগে! উফ্ এমন একটি সময়ের অপেক্ষা করছিলাম আজ। ভাবতে ভাবতে রিঙগিঙ শেষ হলে লাইন কেটে গেলো। স্ক্রিনে লেখা ওঠলো ‘মিস্ড কল’।
আহা, বেচারা হতাশ হবে। যাক, গাড়িতে ওঠে আমিই ফোন দেবো।

সুলতান শিমুল আহমেদ। এককালের জমিদার সুলতান রেসালাত আহমেদের প্রপৌত্র। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ তাদের বাড়ি। আমরা কখনও তাকে জমিদারের বংশধর বলে আলাদা কোন কদর দিই নি। আচার-আচরণে একটি বনেদি ভাব থাকলেও আমাদের সাথে সে কখনও তার উচ্চবংশ নিয়ে উচ্চবাচ্য করে নি। সুলতান আর অতীন আমার কলেজ জীবনের সহপাঠি। হাইকোর্টের জৈষ্ঠ্য উকিল অতীন আচার্য্য – আমাদের হাইস্কুলের গণিত শিক্ষক যতীন স্যারের ছেলে। বাকিরা হয় বন্ধুর বন্ধু, অথবা বন্ধুর স্ত্রী। যেমন সুলতানের বন্ধু আলতাফ। আলতাফের স্ত্রী হাসনাহেনা এবং অতীনের স্ত্রী প্রিয়া। শিক্ষাজীবনে তত মিশুক না হলেও কর্মজীবনের যাতাকলে পড়ে আজকাল মনে হয় আমি অনেক সামাজিক হয়ে গেছি। ফলে বন্ধুর বন্ধু অথবা বন্ধুর স্ত্রী, তাদের সাথে ঘনিষ্টতা তৈরিতে বেশি চেষ্টা করতে হয় নি। আলতাফের সাথে আমার ঘনিষ্টতা সুলতানের চেয়েও বেশি। যা হোক, এসব বাদ দিয়ে আসল কথায় আসি।

গাড়িতে ওঠেই সুলতানকে ফোন দিলাম। ফোন ধরেই সুলতান বলে ওঠলো, “কীরে! এটা কি তুই, নাকি তোর ভূত?”
“কী যা-তা বলছিস, আমার ভূত আবার কোত্থেকে আসবে? আমি কি মরে গেছি নাকি, যে আমার ভূত কথা বলবে?” আমি বিস্মিত কণ্ঠে বললাম। কিসের মধ্যে কী!
“আরে মানুষ মরলে হয় প্রেতাত্মা, জীবিত থাকলে হয় ভূত। তুই কি সত্যিই জানিস না?” সুলতান হাসতে হাসতে বললো। যেন ভূতের আলাপ করার জন্যই আমি ওকে কলব্যাক করেছি। ভূত আর প্রেতের অদ্ভুত ব্যাখ্যা শুনেও আমি বিরক্ত হলাম।
“ফালতু আলাপ বাদ দিয়ে ওরা সবাই এসেছে কিনা সেটা বল আমাকে!” ফোনে আমি আর কথা বাড়াতে চাইলাম না।
“হুম, অনেক দিন পর আমার এক পুরাতন বন্ধুও এসেছে। তবে আজ আড্ডা হবে না রে। আজ এক জায়গায় জলসায় যোগ দেবো। এজন্যই তোকে ফোন করেছিলাম।” 
“তোরা, মানে তুই এবং ওরা সকলে, মহাখালিতেই আছিস তো এখন?” আমি কথা না বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
“হুম, তুই যোগ দিলে আমরা আরও আধাঘণ্টা অপেক্ষা করতে পারি।” সুলতান বললো।
“আমি এসে বলবো।” এই বলে আমি ফোন রেখে দিলাম।

মহাখালি বাজারের পেছনে ‘ছায়ানীড়’ নামের একটি ন’তলা ভবনের চতুর্থ তলায় সুলতানের নিজস্ব বাসা। বিশ্ববিদ্যালয় হল থেকে বের হবার পর তার বাবা তাকে কিনে দিয়েছে। দু’হাজার বর্গফুটের বাসাটি একজন অবিবাহিত এবং বেকার যুবকের জন্য একটু বেমানান হলেও ক্ষয়িষ্ণু জমিদারি টিকিয়ে রাখার জন্য সুলতানের বাবা একাজটি করে দিয়েছে। হয়তো একসময় পরিবারের সকলেই এসে মহাখালির এ বাসায় ওঠবে। আপাতত এটি আমাদের সাপ্তাহিক আড্ডার একমাত্র ঠিকানা। আসলে সাপ্তাহিক নয়, পাক্ষিক বলা যায়, কারণ প্রতি সপ্তাহেই আসা যায় না। মনে হচ্ছে মাসিক হলেই ভালো। সকলেই তো আর সুলতানের মতো বেকার নয়! হাইকোর্টের উকিল অতীন তো বলেই দিয়েছে মাসিক না হলে তার পক্ষে আর আসা সম্ভব নয়। মজার ব্যাপার হলো, সে তবু কোন আড্ডা বাদ দেয় নি আজ পর্যন্ত। আড্ডার আকর্ষণ কে সংবরণ করতে পারে।

 

এক রাতে ভূতের সাথে

২) সুলতানের বসার ঘরের দরজা খুলে দিলেন একজন অপরিচিত ভদ্রলোক। আমি তো আঁতকে ওঠলাম। ইনিই কি সুলতানের সেই পুরাতন বন্ধু? লোকটি আমার দিকে চেনা মানুষের মতোই তাকিয়ে হাসছে। আমি মনে মনে মেলানোর চেষ্টা করলাম। এক হাতে সিগারেটের প্যাকেট, আরেক হাতে এশট্রে এবং একটি জ্বলন্ত সিগারেট ঠোঁটে শক্ত করে চেপে ধরে সুলতান প্রবেশ করলো। সুলতান একজন স্বনামধন্য শেকল-ধূমপায়ী, মানে চেইন স্মোকার।

“পরিচিত করিয়ে দিচ্ছি, এ হলো আমার বন্ধু ধূমকেতু। এর বেশি কিছু জিজ্ঞেস করবে না!” তারপর আমাকে দেখিয়ে সুলতান বললো, “আর এ হলো আমার গুডিবয় বন্ধু আসলাম। শান্তশিষ্ট এবং লেজবিশিষ্ট।” ওর মন্তব্যে কান না দিয়ে আমি হাসিমুখে হাত বাড়ালাম ধূমকেতুর দিকে, কিন্তু খটকা লাগলো তার নামে। ‘ধূমকেতু’ আবার মানুষের নাম হয় কী করে! আবার কিছু জিজ্ঞেসও করা যাবে না! অন্য কক্ষ থেকে হইহই করতে করতে বের হয়ে এলো অতীন আর তার স্ত্রী প্রিয়া। বন্ধুসুলভ শুভেচ্ছা বিনিময় হয়ে গেলো, কিন্তু আলতাফ এবং তার স্ত্রীকে না দেখে বিস্মিত হলাম।

‘কিছু জিজ্ঞেস করা যাবে না’ এরকম কথার কারণে আমি আরও বেশি কৌতূহলী হয়ে ধূমকেতুকে লক্ষ্য করতে লাগলাম। অতীন, প্রিয়া আর সুলতানের সাথে আলাপচারিতা চলছে। লোকটির কথা বলার ঢঙ ঠিক আলতাফের মতো। হাসি শব্দচয়ন সবকিছু। তবে সবকিছুর মধ্যে একটি মেকি ভাব প্রকট। যেন নিজেকে আড়াল করতে চাচ্ছে। ভাবনায় ছেদ ঘটিয়ে সুলতান ঘোষণা দিলো আর দেরি নয়, বের হতে হবে। না হলে জলসা শুরুর মজা হারাতে হবে। আমার সাদামাটা গাড়িতে ওঠলো ধূমকেতু আর সুলতানের ঝকঝকে সিলভার রঙের প্রাদো গাড়িতে অতীন আর প্রিয়া। সুলতানের গাড়ি আগে যাবে আমাকে শুধু অনুসরণ করতে হবে। গন্তব্য অজানা!

ইচ্ছে করেই আমি ধূমকেতুকে পেছনের সিটে বসালাম যাতে রিয়ারভিউতে তাকে দেখতে পারি। পাশাপাশি বসলে ঘাড় ঘুরিয়ে মুখ দেখতে হয়, ড্রাইভিং করতে সমস্যা হয়। গাড়ি চলতে শুরু করার সাথে সাথে আমাদের আলাপ শুরু হলো। প্রথমে সৌজন্যতার খাতিরে, পরে এমনিতেই চলতে লাগলো আলাপ। দেশের রাজনীতি, ক্রিকেট, ভারতীয় সিনেমার আগ্রাসন ইত্যাদি নিয়ে। সে-ই সব কথা বলে যাচ্ছিলো। তারই প্রশ্ন তারই উত্তর। তার কিছু কিছু আগ্রাসী মন্তব্যে আমি বারবার থমকে ওঠলাম। কিছুটা ঘোরলাগা কণ্ঠে কথা বলে সে। গভীর রাতে বা নেশাগ্রস্ত হলে মানুষ যেভাবে কথা বলে, ঠিক রেকম। এদেশের রাজনীতি নাকি সমাজের শক্তিশালী কুচক্রিদের দ্বারা মানুষ শোষণের নীতি। ওখানে ভালো মানুষ কেউ নেই! তাছাড়া দেশের সরকার প্রধান ও বিরোধী দলের প্রধানকে নিয়ে এমন কিছু ব্যক্তিগত আক্রমণ করলো, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমার শুধু বারবার মনে হচ্ছিলো সে এদেশের কেউ নয়। কারণ দেশের মানুষের মতো তার মন্তব্যগুলো দায়িত্বশীল ছিলো না। আলাপের এক পর্যায়ে অতীনের কথা আসলে সে প্রিয়া ও অতীনকে জড়িয়ে একটি কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য দিলো। প্রিয়া ও সুলতানের মধ্যে একটি ধোঁয়াচ্ছন্ন সম্পর্ক আছে আমি আগেই আঁচ করেছিলাম। কিন্তু ধূমকেতু সেটা দিন তারিখ স্থানসহ বিস্তারিত আমাকে জানিয়ে দিলো। এবার মনে হলো সে আমাদেরই কেউ হয়ে থাকবে। তা না হলে এতো জানবে কী করে?

 

এক রাতে ভূতের সাথে

৩) সুলতানের গাড়ির নম্বর প্লেইট দেখে দেখে মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যেই আমরা গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। ধূমকেতুর সঙ্গে আলাপে এতোই মগ্ন ছিলাম যে, স্থানটি ঢাকা হলেও এর নাম বা অবস্থান ঠিক ঠাওর করতে পারি নি। একটি একতলা বাড়ির গেইট দিয়ে সুলতানের গাড়ি অনুসরণ করে আমিও প্রবেশ করলাম। ডান পাশে একটি অন্ধকার এলাকা, খুব সম্ভব আম বাগান, অতিক্রম করে ডানপাশেই গাড়ি থামালাম। সামনের গাড়ি থেকে সুলতান ও তার সহযাত্রীরা ততক্ষণে ভেতরে প্রবেশ করেছে। ভেতর থেকে মানুষের কলরব শোনা যাচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো প্রত্যেকেই কথা বলছে। সুলতান আমাকে তাদের সাথে পরিচিত করিয়ে দিচ্ছে। আরও অদ্ভূত নামের কিছু ব্যক্তির সাথে পরিচিত হলাম। যেমন, চন্দ্রনাথ, চাদের আলো, অশিক্ষিত, ভ-রাজ ইত্যাদি। এসব কি কারও নাম হতে পারে!

আমি হেঁচকা টানে সুলতানকে বারান্দায় বের করে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা এই ধূমকেতু চিড়িয়াটি কে রে?”
“আচ্ছা, তোর কোন ভূত নেই – মানে তুই কি একাই চলাফেরা করিস?” সুলতান পাল্টা প্রশ্ন করলো।
“মানে কী? ভূত কীভাবে থাকবে? মানুষের ভূত থাকে কী করে? কী হেয়ালি প্রশ্ন! আচ্ছা তোর কোন ভূত আছে?” রাগ করেই আমি জিজ্ঞেস করলাম। মনে হচ্ছে অনেক দিন পর সুলতানের সাথে আমার ঝগড়া হবে।
কোন রকমের প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সুলতান বলতে লাগলো, “অবশ্যই আমার ভূত আছে। তাও একটি না, কমপক্ষে সাতটি ভূত আছে আমার। তুই ভূত ছাড়া কীভাবে সমাজে জীবন-যাপন করিস, সেটাই আমি বুঝতে পারছি না! বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে। আচ্ছা কারও সাথে ঝগড়া বা মারামারি করতে হলে তুই কি নিজেই তাদের মুখোমুখি হস?”

আমি তার কথার কিছুই বুঝতে পারছি না, এটি সে বুঝতে পেরে বারান্দার চেয়ারগুলোর একটিতে গিয়ে বসলো এবং আমাকেও ইশারা করলো। এরপর সে আমাকে জানালো যে, অতীনেরও নাকি ঊনিশটি ভূত আছে। ভূতকে আলাদাভাবে দেখার কোন মানেই হয় না। খুবই স্বাভাবিক একটি সামাজিক প্রাণী এবং মানুষের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। সকল শ্রেণীর মানুষেরই ভূত আছে। এগুলোকে বলা যায় প্রতিনিধি ভূত: মানে তারা একজন মানুষের বিশ্বস্ত প্রতিনিধি হয়ে কাজ করে। মানুষ সবসময় নিজের পক্ষে কথা বলতে পারে না, নিজের পক্ষে শারীরিক সংঘর্ষেও লিপ্ত হতে পারে না। এতে তার ব্যক্তিত্ব এবং সামাজিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। ভূত ঠিক ওই কাজটি মানুষকে করে দেয়। এগুলো মানুষের অতিরিক্ত শক্তি বা দ্বিতীয় বা তৃতীয় বা ততোধিক সত্ত্বা হিসেবে কাজ করে। কিন্তু নিজের ব্যক্তিত্ব বা ক্ষমতা খাটো হয়ে যাবে বলে কেউই তা স্বীকার করে না। তারা বলে বেড়ায়, ‘পৃথিবীতে ভূত বলে কিছু নেই’
তবে যারা চালাক তারা বলে, ‘মানুষই ভূত, ভূতই মানুষ’। অথবা বলে ‘ভূতকে ঢালাওভাবে সমালোচনা বা ঘৃণা করা ঠিক নয়, কারণ প্রত্যেকটি ভূতের আড়ালে লুকিয়ে আছে একজন মানুষ।’ আসলেই তাই, ভূত খারাপ কাজ না করলে কেন তাদেরকে হেয় করতে হবে? খারাপ হলে তো মানুষও পরিত্যজ্য। ভূত হলে তো কোন কথাই নেই।

পেশাগত জীবনে ভূতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। যেমন অতীনের কয়েকটি ভূত কেবল আদালত প্রাঙ্গণে আর উকালতি কাজেই ব্যবহৃত হয়। তার ফৌজদারি মামলাগুলোতে সাক্ষী হিসেবে আছে দশজন প্রশিক্ষিত ভূত। মামলা শুনানির সময় দর্শক সারিতে থাকে কমপক্ষে তিনচারজন ভূত, তাদের কাজ হলো আকার-ইঙ্গিত, হাসি, কান্না, হাততালি ইত্যাদি দিয়ে মালিক উকিলের বক্তব্যকে সমর্থন করা। তবে সাক্ষি ভূতগুলো তার কর্মজীবনকে সহজ করে দিয়েছে। বাকিগুলো সামাজিক কাজে। তবে এসব নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করা ঠিক নয়।

 

এক রাতে ভূতের সাথে

৪) ভূত পুষলে সেটি গোপনে রাখারও কৌশল জানতে হয়। কথায় কথায় বলতে হয়, ‘আমি ভূতে বিশ্বাস করি না’। তখন বুঝতে হবে, ওই ব্যক্তির কমপক্ষে পঞ্চাশটি ভূত আছে। তাছাড়া যুক্তির ব্যবহার করতে হবে। ‘এ বিজ্ঞানের যুগে ভূত বলে কেউ নেই’ এটি একটি অতি প্রচলিত যুক্তি।

ভেতরে সবকিছু শান্ত। কোন হইহুল্লা আসছে না। মনে হয় অনুষ্ঠান শুরু হবে। সুলতানের মধ্যে একটি অস্থিরতা দেখতে পেলাম। তবু সে আমাকে তা বুঝতে না দিয়ে, হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসলো,
“আচ্ছা, মনে হচ্ছে তুই কিছুটা বুঝতে পেরেছিস। এবার বল তো, রাজনীতিবিদদের জন্য ভূতের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কখন?”
“নির্বাচনের দিন অথবা কোন নির্বাচনী সভায়।” আমি যেন বিশ্বাসই করে ফেলেছি যে ভূত আছে।
“এই তো ধরে ফেলেছিস! তবে প্রথম উত্তরটিই সঠিক। এবার চল ভূতের পার্টিতে। আরও বুঝতে পারবি।”

[ প্রথম আলো ব্লগে ]
——————————————–
*গল্প লেখার প্রথম অপচেষ্টা।
**সম্পূর্ণ কাল্পনিক। কেউ যেন ভূত বিশ্বাস করতে শুরু না করেন! 🙂