প্রজেক্ট ম্যানেজার: পেশাদারিত্ব কোথা থেকে আসে? প্রকল্পের পক্ষ/বিপক্ষ কারা?

banner2-crop

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক, পর্ব ৫। প্রজেক্ট ম্যানেজারের পেশাদারিত্ব। এপর্বের শুরুতেই একটি বেরসিক প্রশ্ন করতে চাই আমাদের ‘পেশাদারিত্ব’ নিয়ে। আমাদের পেশাদারিত্ব কেন এবং কীভাবে গড়ে ওঠে? এটি কি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যের কারণে আসে, নাকি নিজের কাজের প্রতি একাগ্রতার ফল হিসেবে আসে?  কোন কোন সময় আমাদেরকে একটিকেই অগ্রাধিকার দিতে হয়। তাই বিষয়টি সম্পর্কে একচেটিয়া মনোভাব থাকা দরকার। পেশাদারিত্ব কি ব্যক্তির, নাকি প্রতিষ্ঠানের?  ব্যক্তি ছাড়া তো প্রতিষ্ঠান হতে পারে না, কারণ প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিরই সমষ্ঠি। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের সুনাম এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে কর্মীদের জন্য পেশাদারিত্ব অর্জনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অতএব নিরপেক্ষ উত্তর বলতে কিছু নেই। দিনশেষে প্রতিষ্ঠান অথবা ব্যক্তি, যেকোন একটিকে বেছে নিতে হবেই।

 

▶কীভাবে আসে পেশাদারিত্ব?

উপরোক্ত প্রশ্নে মোটাদাগে তিনটি পক্ষ আছে। প্রথম পক্ষটি বলবেন, আনুগত্য এবং ব্যক্তিগত উন্নয়ন বিষয়গুলো আপেক্ষিক। পরিস্থিতি মোতাবেক যেকোন একটি আগে বা পরে আসতে পারে। প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্যের ফলে কাজের সুযোগ আসে এবং কাজের সুযোগগুলোকে একাগ্রতার সাথে কাজে লাগালে পেশাদারিত্ব আসে। যাদের অভিজ্ঞতা আছে, তারা  নিজের কাজে স্বাধীনভাবে প্রচেষ্টা দিতে পারেন। কিন্তু যাদের দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা নেই, তাদেরকে আনুগত্য দেখিয়ে কাজটুকু বুঝে নিয়ে হয়। সেক্ষেত্রে কিছু অতিরিক্ত কাজ তো করতেই হবে! অতএব, সোজা উত্তর নেই।

দ্বিতীয় পক্ষটি হয়তো একটি সোজা উত্তরকে বেছে নেবে। তারা বলবেন, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য ছাড়া পেশাদারিত্ব আসে না, কারণ প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া ব্যক্তির দক্ষতার কোনই মূল্য নেই।

তৃতীয় পক্ষটি আরও সোজা। তারা বলবেন, ব্যক্তির অংশগ্রহণ ছাড়া প্রতিষ্ঠান অচল। অতএব ব্যক্তির উন্নয়নই প্রথম। প্রতিষ্ঠান চাকরি দিলেও কোন ব্যক্তি যদি নিজ দায়িত্ব ভালোভাবে পালন না করে, তবে তো চাকরিই থাকে না। পেশাদারিত্ব আসবে কোত্থেকে!  অতএব, পেশাদারিত্ব আসে নিজের কাজের প্রতি একাগ্রতার ফলে।

 

▶ বর্তমান কাজে একাগ্রতাই কি পেশাদারিত্ব অর্জনের প্রথম পথ?

চলুন আলোচনার স্বার্থে তৃতীয় পক্ষটিকে সামনে নিয়ে আসি।  মনে করি, প্রথমত ব্যক্তির ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলেই পেশাদারিত্ব আসে, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যের কারণে নয়। প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য বিষয়টিও আপেক্ষিক। প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ যদি চাটুকারিতায় অভ্যস্থ না হয়, তবে তারা হয়তো বলবে, ‘প্রকল্পের কাজে অগ্রগতি না হলে আনুগত্য দিয়ে আমরা কী করবো?’  অতএব সাধারণ দৃষ্টিতে, নিজের কাজের প্রতি মনোযোগী হওয়াটাই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য।

একজন প্রকল্প ব্যবস্থাপককে স্বার্থপরের মতো নিজের প্রকল্পের কাজেই মনসংযোগ করতে হয়। এটিই কর্তৃপক্ষের দেওয়া এসাইনমেন্ট।  এটিই তার পেশাদারিত্ব প্রদর্শন ও অর্জনের জায়গা।

এখানে বলে রাখি, উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবে শুধু ‘উন্নয়ন প্রকল্পতেই’ আলোকপাত করার চেষ্টা করছি। কীভাবে একজন সফল প্রকল্প ব্যবস্থাপক বিবর্তিত হয়ে ‘স্বপ্ন ব্যবস্থাপকে’ রূপ নিতে পারেন, সেটি তার বর্তমান প্রকল্পের অগ্রগতি থেকে বুঝতে পারা যায়।

 

▶প্রজেক্ট ম্যানেজারকে কি প্রতিষ্ঠানের অন্যসব বিষয় থেকে দূরে থাকা উচিত?

কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে ডিসট্রাকশন সৃষ্টি করতে পারে, সেটি স্বাভাবিক। তাদেরকে হয়তো একসাথে অনেকগুলো প্রকল্পের যোগান দিতে হয়। অনেক বিষয়ে মনোযোগ দিতে হয়। যেকোন সময় যেকোন প্রকল্প ব্যবস্থাপককে তারা বাড়তি কাজ দিতেই পারেন। প্রকল্প পরিচালকের নৈশভোজে যোগ দিতে হতেই পারে। এসব কাজের কোন্ গুলোতে প্রকল্প ব্যবস্থাপক যাবেন, কোন্ গুলোতে যাবেন না, সেটি বুঝার জন্য কেবল একটি প্রশ্ন নিজেকে করতে হয়। তা হলো, ‘তাতে কি আমার বর্তমান প্রকল্পটি উপকৃত হবে?’ উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে আরেকটি প্রশ্ন: কীভাবে কতটুকু/ কখন? উত্তর যদি ‘না’ হয়, তবে যেকোন ভাবে কর্তৃপক্ষের অযাচিত আহ্বান থেকে নিজেকে দূরে রাখা উচিত। তবে পরিস্থিতিই বলে দেবে, কোনটি করণীয়।

 

▶প্রকল্পের সাথে জড়িত ভেতর/বাইরের পক্ষগুলোর গুরুত্ব কতটুকু?

প্রকল্পের উন্নয়নের সাথে যাদের স্বার্থ জড়িয়ে আছে, তারা হলো একেকটি পক্ষ। আবার প্রকল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যাদের প্রভাব থাকতে পারে তারাও একটি পক্ষ। অন্যদিকে প্রকল্পকে সহায়তা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্যও একটি প্রভাবশালী পক্ষ আছে। এই ইতিবাচক ও নেতিবাচক সব পক্ষ নিয়েই একটি প্রকল্প এগিয়ে চলে। এদেরকে ছেড়ে প্রকল্পের অগ্রগতি ভাবা যায় না। তবে এসব পক্ষকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত বা বিচ্ছিন্ন করতে না পারলে প্রকল্পের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি হয়।

প্রকল্প ব্যবস্থাপককে তাই বুঝে নিতে হয়, কাদেরকে তিনি গুরুত্বের সাথে সম্পৃক্ত করবেন এবং কাদেরকে তিনি গুরুত্বের সাথে প্রকল্পের কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন রাখবেন। আরেকটি পক্ষ আছে, যাদেরকে সম্পৃক্ত বা বিচ্ছিন্ন উভয়ই বিপদজনক। তাদের জন্য একটি মাঝামাঝি অবস্থান আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখতে হয়।

একটি আদর্শ প্রজেক্ট প্রপোজালে এসব পক্ষ আগে থেকেই সনাক্ত করা থাকে। তাদের কার কী প্রভাব, নেতিবাচক নাকি ইতিবাচক এবং তাদেরকে কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে, সবকিছু প্রকল্প প্রস্তাবনায় বর্ণিত থাকে। কিন্তু প্রকল্প ব্যবস্থাপককে বাস্তব পরিবেশে কাজ করতে হয় বলে তিনি এসব নিয়ে আলাদাভাবে ভাবতে পারেন না, যদি না সেটি আগে থেকেই সুনির্দিষ্ট থাকে। ফলে, প্রকল্প পরিকল্পনার সময়ই এর পক্ষ-বিপক্ষ নির্ধারণ করতে হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কেবল, সংযোজন-বিয়োজন করা যায়।

 

▶ প্রাসঙ্গিক কয়েকটি টিপস:

১) আপনার প্রজেক্টের সাথে জড়িত ফেরারেন্স দলিলপত্র (প্রজেক্ট চার্টার, প্রজেক্ট প্রপোজাল, বেইসলাইন সার্ভে, সংশ্লিষ্ট ইমেল ইত্যাদি) সবসময় হাতের কাছে রাখুন। সংক্ষিপ্ত সংস্করণে টেবিলে কিছু রেখে দিন, যেন অল্প সময়ে আপনি বুঝে নিতে পারেন।

২) প্রকল্পের সাথে বিভিন্ন অংশীজন (স্টেইকহোল্ডার) কারা, তাদের কতটুকু প্রভাব এসম্পর্কে নিয়মিত বিশ্লেষণ করুন। যথাযথ উপায়ে তাদের সাথে যোগাযোগ ও সম্পর্ক জোরদার করুন।

৩) প্রকল্পের কর্মীদের সাথে নিয়মিত বসুন, আনুষ্ঠানিক অথবা অনানুষ্ঠানিক ভাবে। তাদের মনোভাব দেখুন, তাদের সামর্থ্য বুঝার চেষ্টা করুন। নিয়মিত মিটিংয়ে অনেক ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়।

৪) প্রকল্পের কর্মীদের নিয়ে ছোট ছোট কর্মশালার আয়োজন করুন, তাতে বিভিন্ন ইস্যুতে কর্মীদের ধারণা স্পষ্ট হবে। বাড়তি উপকারিতা হলো, তাতে আত্মবিশ্বাস এবং সম্পর্কের উন্নয়ন হয়।।

৫) সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারের সাথে প্রয়োজনীয় সম্পর্ক সৃষ্টি করুন। প্রয়োজনে তাদেরকে প্রকল্পের উদ্দেশ্য/অগ্রগতি সম্পর্কে হালনাগাদ করুন। গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে তাদেরকে প্রকল্পের ঘটনার সাথে যুক্ত করুন। তাতে কোন আনুষ্ঠানিকতা বা অফিশাল প্রক্রিয়া ছাড়াই আপনার প্রকল্পটির অনুসন্ধান/তদারকি হয়ে যাবে – ভবিষ্যতের লালফিতার দৌরাত্ম্য কমে আসবে।

৬) সমধর্মী অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করুন। এসোসিয়েশনের সভাগুলোতে নিয়মিত অংশ নিন। সুযোগমতো দায়িত্বও নিন। এটি শুধু আপনার প্রকল্পের জন্য নয়, আপনার পেশাগত নেটওয়ার্কিংয়ের জন্যও দরকার। তবে প্রকল্পের সরাসরি উপকৃত করবে।

৭) নিয়মিত জার্নাল (সম্পন্ন/পরিকল্পিত কাজের তালিকা) রাখুন। এটি ভবিষ্যতের যেকোন প্রতিবেদন, জরিপ বা তদন্তের সময় বিশেষভাবে আপনার (প্রজেক্ট ম্যানেজার) উপকারে আসবে। কর্মীদের বা একক কাজের তদারকি করতেও সহায়ক হবে।

৮) একই স্বভাবের প্রকল্প/কর্মসূচি যারা পরিচালনা দিচ্ছে, তাদের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করুন। তাতে নিজ প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ কাজে আসবে। প্রাক্তন ম্যানেজারদের অভিজ্ঞতা (লেসন লার্ন্ট)গুলোর ওপর সুযোগ পেলেই দৃষ্টি দিন।

৯) কর্মসূচি/প্রোগ্রাম ব্যবস্থাপকের সাথে সাথে যথাযথ যোগাযোগ রক্ষা করুন। শুধু সাহায্যের জন্য যোগাযোগ করবেন না, সেটি হবে স্বার্থপর সম্পর্ক। তার সহযোগিতার কারণে কোথায়/কীভাবে আপনার প্রকল্প উত্তরোত্তর এগিয়ে চলেছে, এসব সুখবর দিতে ভুলবেন না।

১০)  শুধু সাম্প্রতিক নয় এবং পরবর্তি কাজগুলোর দিকেও নিয়মিত দৃষ্টি রাখুন। তাতে নিকট ভবিষ্যতের সমস্যাগুলো আগে থেকেই আঁচ করতে পারবেন। প্রকল্পের কর্মীরা কাজের মানুষ – তারা নির্দেশ শুনে কাজ করতে অভ্যস্ত। তাদের ওপর পরিকল্পনার দায় চাপাবেন না (যদি না বিশেষভাবে অভিজ্ঞ হয়), তাতে কাজের অগ্রগতি ব্যহত হবে।

 

আলোচনাগুলো যথাসম্ভব সহজ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেন সংশ্লিষ্ট না হলেও বুঝতে পারা যায়। প্রজেক্ট ম্যানেজার-কেন্দ্রিক এই আলোচনা ক্রমেই ‘প্রজেক্ট প্লানিং’ এবং প্রজেক্ট বাস্তবায়নের দিকে ধাবিত হবে । (চলবে)

 

▶ পর্ব ৪:  প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ৫টি প্রক্রিয়া: পেশাদারিত্বের শুরু

▶ পর্ব ৩:  ৯টি তত্ত্বে প্রকল্পের সংজ্ঞা এবং সহজ কিছু দৃষ্টান্ত

▶ পর্ব ২:  যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনে প্রকল্প আমাদেরকে উপকৃত করে

▶ পর্ব ১:  প্রকল্প ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে

 


Sources consulted:

1. European Commission, EuropeAid Cooperation Office (2004) Aid Delivery Delivery Methods: Project Cycle Management Guidelines. Brussels, Belgium.

2. Institute, P.M. and Project, M.I. (2013) A guide to the project management body of knowledge (PMBOK guide). Fifth Edition. United States: Project Management Institute.

 

Advertisements

4 comments

  1. পিংব্যাকঃ ১৩ টি উপায়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে নিয়ে আসুন হাতের মুঠোয়! | আওয়াজ দিয়ে যাই…
  2. পিংব্যাকঃ এ দুই রকমের ম্যানেজার থেকে সাবধান থাকুন… | আওয়াজ দিয়ে যাই…
  3. পিংব্যাকঃ প্রজেক্ট ম্যানেজার: পেশাদারিত্বের ৭টি বিষয় | আওয়াজ দিয়ে যাই…
  4. পিংব্যাকঃ ম্যানেজার হিসেবে আপনি কতটুকু দক্ষ? | আওয়াজ দিয়ে যাই…

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s