প্রকল্প সম্পর্কে ৯টি ধারণা এবং কিছু সহজ দৃষ্টান্ত। পর্ব ৩

 

Capture3

 

প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক, পর্ব ৩। এবারের বিষয় প্রকল্পের ধারণা। প্রকল্প সম্পর্কে একদমই ধারণা নেই, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু ভাষা বদলের পাশাপাশি প্রকল্পের ধারণাও বিস্তৃতি পেয়েছে। এখন আর প্রজেক্ট কোন নির্দিষ্ট কাজের সাথে আবদ্ধ নেই। প্রকল্প একটি সার্বজনীন ধারণায় রূপ নিয়েছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এখন যেকোন কাজের সাথে যুক্ত করা যায়। তবু কিছু মৌলিক বিষয় প্রায় একই আছে। একটি বিষয় এখনও বদলায় নি, তা হলো, প্রকল্পে থাকতে হবে সুর্নিদিষ্ট উদ্দেশ্য। একটি প্রকল্পে এক বা একাধিক উদ্দেশ্য থাকবে, যা নির্দিষ্ট সময়ে অর্জিত হবে।

প্রকল্প সম্পর্কে লেখালেখি শুরু করার প্রথম উদ্দেশ্য ছিলো, বাংলা ভাষায় প্রকল্পের জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা, যেন প্রজেক্ট-এর মৌলিক ধারণাগুলো পাঠকের মস্তিষ্ক এবং মননে স্পর্শ করতে পারে। এপর্বে উদাহরণসহ প্রকল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচিত হলো।

 

▶ প্রকল্প সম্পর্কে ৯টি টুকরো ধারণা

১)  প্রকল্প একটি ‘সাময়িক উদ্যোগ’ যার উদ্দেশ্য হলো: একটি নির্দিষ্ট পণ্য, সেবা অথবা ফলাফল সৃষ্টি করা। এই অস্থায়ি স্বভাবের কারণেই প্রকল্পের নির্দিষ্ট শুরু এবং শেষ আছে।

২)  সাময়িক/ অস্থায়ি মানে এই নয় যে, প্রকল্পটি স্বল্পমেয়াদি। স্বল্পমেয়াদি বা দীর্ঘমেয়াদি যেকোন একটি হতে পারে। মূল বিষয়টি হলো, এটি চিরকালীন বা অনির্দিষ্ট নয়। এবং এর কর্মকাণ্ড ও মেয়াদ সুনির্দিষ্ট। প্রতিষ্ঠান এবং ‘কর্মসূচির’ সাথে তুলনা করলেই এর পার্থক্য স্পষ্ট দেখা যায়।

৩) প্রকল্পকে বলা যায় একটি সিঁড়ি বা পথপরিক্রমা, যার মাধ্যমে আমরা একটি উচ্চতায় পৌঁছাই। ‘গন্তব্যে যাওয়াকে’ মনে করি প্রকল্পের উদ্দীষ্ট ফল। এই গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত যত প্রচেষ্টা বা আয়োজন, সেটির নাম হতে পারে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা। যিনি সেটি পরিচালনা করেন, তিনি হতে পারেন প্রকল্প ব্যবস্থাপক। করপোরেট পর্যায়ে একটি প্রোডাক্ট বা পণ্যের পরিকল্পনা, বাজার গবেষণা, পণ্যের উৎপাদন এবং বিস্তৃত বাজারে সেটি পৌঁছানো পর্যন্ত কর্মকাণ্ডকে প্রজেক্ট হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে।

৪)  কয়েকটি ‘অবধারিত কারণে’ প্রকল্পের পরিসমাপ্তি ঘটে। যেমন: ক. প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হলে; খ. প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে; গ. পরিস্থিতির কারণে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পেলে/ না থাকলে; অথবা ঘ. প্রকল্পের মালিক বা পৃষ্ঠপোষক সেটি আর চালাতে না চাইলে।

৫) প্রকল্প সাময়িক, কিন্তু এর ফলাফল সাময়িক নয়।  একটি ‘প্রকল্পের পরিণতি’ যুগ যুগ ধরে প্রজন্মান্তরে টিকে থাকতে পারে। যেমন: সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ অথবা যমুনার নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু। ক্যানসার নিরাময়ের কারণ অনুসন্ধানের সাথে জড়িত ‘বিশেষায়িত গবেষণাকে’ একটি প্রকল্প বিবেচনা করলে, বুঝতে পারা যায় প্রকল্পের ফল কত ব্যাপক। অতএব, প্রকল্পের ফল মূর্ত এবং বিমূর্ত (বস্তুগত এবং ধারণাগত) উভয়ই হতে পারে।

৬) ‘অনন্যতা’ বা তুলনাহীনতাকে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়। একটি প্রকল্পের উদ্দেশ্য বা ফলাফল অন্যটির সাথে মিল থাকতে পারে না। তাহলে সেটি প্রকল্প নয়, কর্মসূচি। কর্মসূচি হলো প্রতিষ্ঠানের চলমান এবং পৌনপৌনিক কাজ। কিন্তু প্রকল্পের থাকে নিজস্ব কিছু উদ্দেশ্য, কলাকৌশল এবং সুবিধাভোগী। একই ডিজাইনের বিল্ডিং হলেও, ভৌগলিক অবস্থান এবং বিভিন্ন ক্রেতার কারণে একেকটি বিল্ডিং নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অনন্য।

৭)  প্রজেক্ট দৈনন্দিন কার্যক্রম (অপারেশনস) থেকে আলাদা। প্রজেক্ট সাময়িক, কিন্তু অপারেশনস চলমান। প্রজেক্ট নির্দিষ্ট মেয়াদে শেষ হয়ে যায়, অপারেশনস পৌনপুনিক। উদ্দেশ্য, কাজ এবং কৌশলের দিক দিয়ে প্রাত্যাহিক কাজের সাথে প্রজেক্টকে মেলানো যায় না।  কিছু বিশেষ উদ্দেশ্য, সমস্যা বা ফলাফলকে লক্ষ্য করে প্রকল্প ‘বাস্তবায়িত’ হয়।  প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য কার্যক্রম ‘পরিচালিত’ হয়। নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এবং অংশীজনকে (stakeholder) কেন্দ্র করে প্রকল্প পরিকল্পিত হয় বলে এর বাস্তবায়নের জন্য বিশেষায়িত জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কাজের লক্ষ্য হলো ‘কাজটি সঠিকভাবে করা বা চালিয়ে যাওয়া’, কিন্তু প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো দ্বিমুখী, ‘কাজটি সঠিকভাবে শুরু করা’: সঠিক এবং শুরু। প্রকল্প ও কার্যক্রমে (অপরাশেনস) সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ভূমিকাগুলো আলাদাভাবে বিবেচনা করলে এসব পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

৮)  প্রকল্পকে আরও বুঝতে পারার জন্য কয়েকটি সহজ দৃষ্টান্ত হতে পারে এরকম: ক. কোন একটি পণ্যের উদ্ভাবন করা, যা হতে পারে সম্পূর্ণ নতুন অথবা পূর্বের কোন পণ্যের বর্ধিত রূপ; খ. প্রতিষ্ঠানের পণ্য উৎপাদন/বিপণনে নতুন সক্ষমতা সৃষ্টিকারী কোন পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ার উদ্ভাবন; গ. বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনের সমন্বয়ে একটি সফল সম্মেলনের আয়োজন করা; ঘ. একটি নির্দিষ্ট এলাকার অধিবাসীদের সামাজিক, আর্থিক, আচরণগত বা স্বাস্থ্যগত সমস্যার সমাধানে বিশেষ সুফল দেখাতে পারা; ঙ. একটি নির্দিষ্ট এলাকায় শতকরা হিসেবে সাক্ষরতার হার বাড়াতে পারা; চ. প্রতিষ্ঠানের চলমান কার্যক্রমে নতুন একটি কৌশলের উদ্ভাবন এবং/বা সফল প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারা; ছ. একটি সফল গবেষণা সম্পন্ন করতে পারা যা থেকে পরীক্ষীত ফলাফল/প্রমাণাদি পরিবর্তিতে ব্যবহার করা যায় ইত্যাদি।

৯) গান্ট চার্টের (বিশেষ প্রকার মূল্যায়ন ছক) প্রণেতা হেনরি লরেন্স গান্টকে (১৮৬১-১৯১৯) প্রকল্প ব্যবস্থাপনার জনক বলা হয়। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন যান্ত্রিক প্রকৌশলী ছিলেন। প্রকল্প পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং নিয়ন্ত্রণের কিছু জনপ্রিয় কৌশল আবিষ্কার করেন মিস্টার গান্ট। উনবিংশ শতাব্দির প্রথম দশকে তিনি গান্ট চার্টের প্রবর্তন করে ব্যবস্থাপনার কাজকে সকলের জন্য সহজতর করে দেন। তবে এউদ্দেশ্যে প্রথম চার্টটি আবিষ্কৃত হয় ১৮৯০ সালে পোলিশ প্রকৌশলী ও অর্থনীতিবিদ ক্যারল অ্যাডামেকি’র মাধ্যমে। বর্তমানে আমরা অনেক অগ্রসর সময়ে বাস করছি এবং আরও ব্যাপক গবেষণার ফল হিসেবে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় এসেছে আমূল পরিবর্তন।

 

প্রকল্প পরিকল্পনার সহজ কিছু ধাপ/পর্যায়

  • সমস্যা চিহ্নিতকরণ অথবা প্রকল্প হিসেবে নেবার প্রয়োজন আছে কিনা যাচাই করা।
  • সম্ভাব্য সমাধানের উপায় নির্ধারণ করা, যা পরবর্তিতে আরও সুষ্পষ্ট হবে।
  • প্রত্যাশিত সুফল বা গন্তব্য নির্ধারণ করা।
  • কী কী প্রচেষ্টা/উপকরণ দিতে হবে সেটি স্পষ্ট করা।
  • কোন্ কোন্ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে কী প্রকার যোগাযোগ করতে হবে সেটি নির্ধারণ করা।
  • কাজকে সামর্থ্য মোতাবেক ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করে নেওয়া।
  • সম্ভাব্য বিপদ/ প্রতিবন্ধকতা/ ব্যর্থতাগুলো চিহ্নিত করা।
  • সময়ছক নির্ধারণ করা: কোন্ সময়ান্তে কোন্ কাজটি শেষ হবে সেটি নির্ধারণ করা।
  • সময়ছক অনুসারে প্রজেক্ট বাস্তবায়নে মনোনিবেশ করা: শেষ না হওয়া পর্যন্ত একটি কাজে মনযোগ ধরে রাখা।
  • সম্পন্ন কাজগুলো ভালোভাবে চিহ্নিত করে রাখা এবং সেটি সবসময় দৃষ্টির সামনে রাখা।
  • দিন/সপ্তাহ/মাস শেষে সম্পন্নকৃত কাজের অবস্থা/অগ্রগতি/ফলাফল দেখা।
  • লক্ষ্যে পৌঁছাবার স্বার্থে সম্ভব হলে প্রক্রিয়া/পদ্ধতি/সময়ছককে পরিবর্তন/শিথিল/সহজ করা।
  • প্রয়োজনে কর্মপরিকল্পনায় পরিবর্তন/সংশোধন আনা।
একটি আউটলাইন: পরিকল্পনার কাজটি সহজ শর্তে শুরু হওয়া উচিত

>একটি আউটলাইন: পরিকল্পনার কাজটি সহজ শর্তে শুরু হওয়া উচিত

 

▶ যেসব কারণে প্রকল্প আমাদের জীবনকে সহজ করে দেয়

  • প্রকল্প মানে হলো, কোন কাজে বিশেষভাবে মনোনিবেশ করার সুযোগ সৃষ্টি।
  • প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হলে, কাজকে যুক্তিসঙ্গতভাবে (ভালোমন্দ পক্ষপাতহীনভাবে বিবেচনা করা যায়) পরিকল্পনা করা যায়।
  • প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে তাৎপর্যপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।
  • ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং পেশাগত কাজগুলো গঠনমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ হয়।
  • যে কাজটি জটিল এবং সময়সাপেক্ষ, সেটিকে প্রকল্প হিসেবে নিতে পারি।
  • একটি ক্ষুদ্র প্রকল্প সম্পন্ন করতে পারলে নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।
  • একটি নতুন ভাষা/দক্ষতা শেখার কাজকে প্রকল্প হিসেবে নিতে পারি।
  • বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি/ সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুতির কাজকে প্রজেক্ট হিসেবে নিতে পারি।
  • নিজের দেহের অস্বাভাবিক ওজন/অসুস্থতাকে ধারাবাহিক উপায়ে কমাবার জন্য প্রকল্প হিসেবে নিতে পারি।

 

 

▶ পর্ব ২:  যে ৫টি কারণে দৈনন্দিন জীবনে প্রকল্প আমাদেরকে উপকৃত করে

▶ পর্ব ১:  প্রকল্প ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে


Sources consulted:

1. Profile of Henry Gantt & the history of the Gantt chart (2012) Available at: https://www.siliconbeachtraining.co.uk/blog/profile-of-henry-gantt-history-of-gantt-chart (Accessed: 2 September 2016).

2. History.com (no date) Karol Adamiecki 1896. Available at: http://projectmanagementhistory.com/The_Harmonogram.html (Accessed: 2 September 2016).

3. Gantt (2016) What is a Gantt chart? Gantt chart information, history and software. Available at: http://www.gantt.com/ (Accessed: 2 September 2016).

4. Institute, P.M. and Project, M.I. (2013) A guide to the project management body of knowledge (PMBOK guide). Fifth Edition. United States: Project Management Institute.

Advertisements

5 comments

  1. পিংব্যাকঃ প্রজেক্ট ম্যানেজার: পেশাদারিত্ব কোথা থেকে আসে? প্রকল্পের পক্ষ/বিপক্ষ কারা? | আওয়াজ দিয়ে যাই…
  2. পিংব্যাকঃ ১৩ টি উপায়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে নিয়ে আসুন হাতের মুঠোয়! | আওয়াজ দিয়ে যাই…
  3. পিংব্যাকঃ এ দুই রকমের ম্যানেজার থেকে সাবধান থাকুন… | আওয়াজ দিয়ে যাই…
  4. পিংব্যাকঃ প্রজেক্ট ম্যানেজার: পেশাদারিত্বের ৭টি বিষয় | আওয়াজ দিয়ে যাই…
  5. পিংব্যাকঃ ম্যানেজার হিসেবে আপনি কতটুকু দক্ষ? | আওয়াজ দিয়ে যাই…

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s