প্রজেক্ট ম্যানেজার থেকে স্বপ্ন ব্যবস্থাপক: কেন এবং কীভাবে?

একটি প্রজেক্টের ম্যানেজার হতে পারা অপরিমেয় অভিজ্ঞতা প্রাপ্তির সুযোগ এনে দেয়। একটি প্রজেক্ট যেন একটি স্বপ্নের মতো; সঠিকভাবে শেষ হলে স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুখ পাওয়া যায়। কিন্তু কিছু কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ছাড়া আমাদের কর্মসমাজে ‘প্রজেক্ট’ এবং ‘ম্যানেজার’ ধারণাগুলো সুষ্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় না। অনেক প্রজেক্ট সৃষ্টি হয়, কেবল মাঝপথে থেমে যাবার জন্য। অনেক প্রজেক্ট শুরুই হয় না। অনেক প্রজেক্ট শুরু হয়, কিন্তু শেষ হয় না। অনেক প্রজেক্ট শেষ হয়, তবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।  কিছু প্রজেক্ট সফলভাবেই শেষ হয়, তবে যে গন্তব্যকে লক্ষ্য করে সেগুলোর সূচনা, তা শেষ পর্যন্ত ঠিক থাকে না।  কিছু প্রজেক্ট সফলভাবে শেষ হয়ে ‘সঠিক গন্তব্যেই’ পৌঁছায়, কিন্তু খরচ ও সময়মাত্রা বেড়ে যায় অসহনীয়ভাবে ।

বেসরকারি সংস্থায় অনেক প্রজেক্ট প্রপোজাল হয় এবং তাতে কিছু প্রকল্পে দাতাগোষ্ঠি অনুমোদন দিয়ে অর্থযোগান দেন। এসব প্রকল্প যেভাবেই শেষ হোক, দেশের নিপীড়িত জনগোষ্ঠির কিছু উন্নয়ন হয়। এসব উন্নয়ন সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক এবং সুদূরপ্রসারী। কিন্তু পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে পেশাদারিত্বের অভাবে উদ্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হয় না, অথবা কিছু ক্ষেত্রে হলেও তা প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয় না। সেখানে পেশাদারিত্ব একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয়।

 

পেশাদারিত্ব কার বেশি দরকার, দাতার নাকি বাস্তবায়নকারী সংস্থার?  এটি স্তর বিশেষে ভিন্ন হয়। যারা প্রকল্পের পরিকল্পনা করেন, এবং যারা বাস্তবায়ন করেন, তাদের উভয় পক্ষেরই পেশাদারিত্ব থাকতে হয়। তবে সেটি আপেক্ষিক; বাস্তবায়নকারীর পেশাদারিত্ব আর অর্থদাতা প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্বকে একই মাত্রায় দেখা যায় না। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বা তৃতীয়পক্ষের দ্বারা প্রকল্প পরিকল্পনা করালে, যথাযথ সমন্বয় না থাকলে প্রকল্প বাস্তবায়কদের সাথে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।  তাতে সফলভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কমে যায়।

কর্পোরেট হোক বেসরকারি সংস্থা হোক, প্রকল্পকে ‘প্রকল্প’ হিসেবে গ্রহণ না করলে তাতে সফলতার আশা করা যায় না।  প্রকল্পের স্বভাবটি হলো এই যে, এটি নির্দিষ্ট সময়ান্তে শেষ হবে; এর উপকরণ ও পদ্ধতি হবে ফলাফল-কেন্দ্রিক।  প্রকল্পের কর্মীদের লক্ষ্য থাকবে একটিই: নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে প্রকল্পটি সঠিকভাবে শেষ করা এবং প্রতিবেদন করা।

আমাদের দেশে কিছু নির্মাণ প্রকল্পের দিকে দৃষ্টি দিলেই বুঝতে পারি, একটি প্রকল্পকে ‘প্রকল্প’ হিসেবে না নিলে কী বিপদ হতে পারে। দেশে ব্যক্তি ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ইমারত, বৃহৎ সেতু, ফ্লাইওভার ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা একটি বিশেষায়িত জ্ঞান। একজন আমজনতার দৃষ্টিতেও যদি তাকাই, তবে অনেক সীমাবদ্ধতা ও অনিয়মের চিত্র আমাদের সামনে ফুটে ওঠে।

 

দাতাগোষ্ঠিকে প্রকল্পের স্বপ্ন দেখিয়ে অনেক অনুদান আসে বাংলাদেশে। লক্ষ্য থাকে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠিকে নির্দিষ্ট সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উন্নয়ন দেখাবার। দাতা অথবা বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্বের অভাবেই হোক, অথবা অসততার কারণেই হোক, সব প্রকল্প ‘ফলাফলমুখী প্রচেষ্টা’ দেখাতে পারে না, যতটা তাদের প্রতিবেদনে দেখা যায়।

এদেশে প্রকল্প অথবা ফলাফলমুখী উদ্যোগ বা উদ্যোক্তার যে কত অভাব, তা একটি সহজ পর্যবেক্ষণ (hypothetical observation) থেকে বুঝতে পারা যায়। তা হলো, দেশীয় প্রতিষ্ঠানে বিদেশী সিইও’র উপস্থিতি। এদেশেরই প্রতিষ্ঠান এদেশেরই মূলধন, ভোক্তাও এদেশেরই; কিন্তু প্রধান নির্বাহী আসেন সুদূর পশ্চিম দেশ থেকে; অথবা প্রতিবেশি কোন দেশ থেকে। সুনির্দিষ্ট দৃ্ষ্টান্ত এবং গবেষণা দিয়ে এটি প্রমাণ করা যায়, কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য।

 

দেশের প্রাতিষ্ঠানিক আচার-আচরণ এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক অবস্থান যদি ‘পাখির চোখেও’ একবার  দেখি, তবে চলমান স্থবিরতা (creeping pace) এবং অবহেলার চিত্রটি চোখে পড়ে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে বিশেষায়িত জ্ঞান বা দক্ষতা হিসেবে দেখা হচ্ছে না এখনও। সরকারি প্রকল্পগুলোতে পদাধিকার বলে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে এরকম বালখিল্যতার কারণেই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের মুখ দেখে না। একবছরের প্রকল্প শেষ হয় চতুর্থ বছরে; নষ্ট হয় সময়; অপচয় হয় জনগণের টাকা; প্রলম্বিত হয় জনদুর্ভোগ।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও এর ব্যতিক্রম নেই, যিনি প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ব্যক্তি, তিনিই প্রকল্পেরও অধিকর্তা। যিনি প্রকল্পের মৌলিক বিষয়গুলোই জানেন না, তাকে দেওয়া হয় ‘কর্মসূচি’ পরিচালনার দায়িত্ব। এখানে কর্মসূচিকে ‘প্রকল্প’ বলা হয়, প্রকল্পের তো কোন চিহ্নই থাকে না।  বছরের পর বছর চলে যায়, প্রকল্প শেষ হয় না। কারণ খুঁজলে দেখা যায়, সেখানে ‘শেষ’ বলে কোন বিষয় আদতেই ছিলো না। এতে প্রকৃতপক্ষে কাদের উন্নয়ন হয় আর কাদের ক্ষতি হয়, বুঝতে পারার জন্য গবেষণা করতে হয়।  প্রকল্পের ‘স্বাভাবিক পরণতি’ হিসেবে সুফল আসে না, সুফল দেখতে গবেষণার অপেক্ষা করতে হয়।

 

প্রকল্পকে বাস্তবায়নের পথে নিয়ে যাবার পরিক্রমায় কিছু অনন্য অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়।  একে শুধু ‘অভিজ্ঞতা’ বললে কমই বলা হয়। এই অভিজ্ঞতা এতই অমূল্য যে, এটি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ অথবা শুধুই অর্থের বিনিময়ে পাওয়া যায় না।  অনেক সময়, অধ্যবসায় এবং লক্ষ্যভিত্তিক প্রচেষ্টার পরিণতিতে আসে ‘প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা’।

কর্মজীবনের শুরুতে কয়েকটি ক্ষুদ্রাকৃতির প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ হয়েছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করার সময়ে, কয়েকটি ফলমুখী কর্মসূচি (result-focused program) বাস্তবায়ন করার অভিজ্ঞতা হয়েছে।  ২০০৪ থেকে ২০১১ পর্যন্ত, আট বছরে নিয়মিত কাজের পাশাপাশি, পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত তিনটি এসাইনমেন্টকে ‘প্রকল্প’ হিসেবে বাস্তবায়ন করার সুযোগ নিয়েছিলাম। এসবের পাশাপাশি, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা (project management) সংক্রান্ত কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছিলো। প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং প্রাসঙ্গিক প্রশিক্ষণের এই দীর্ঘ পরিক্রমায় কিছু উপলব্ধি সৃষ্টি হয়েছে, যা উপরোক্ত শিরোনামে তুলে ধরতে চাই, যেন দেশের অভিজ্ঞ প্রকল্প ব্যবস্থাপকদের মতামত পাওয়া যায়। তাতে যদি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে চলমান স্থীতাবস্থা থেকে এগিয়ে যাবার পথ সৃষ্টি হয়, সেটি হবে পরম আনন্দের বিষয়।

 

 

Capture

 

▶ প্রকল্প ব্যবস্থাপক থেকে ‘স্বপ্ন ব্যবস্থাপক’

উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে একযুগেরও বেশি সময় ধরে কাজ করতে গিয়ে শিখেছি যে, একটি প্রকল্প শুধু একটি স্বপ্ন নয়; স্বপ্নের চেয়ে একটু সহজ। কারণ, ভালোভাবে চিন্তা করতে পারলে এবং পরিকল্পনাগুলো সুর্নিদিষ্ট করতে পারলে, বাস্তবায়নের সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ। প্রকল্প এবং জীবনের পরিকল্পনা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা এবং এসংক্রান্ত একাডেমিক জ্ঞান ঝালাই করছি কিছুদিন যাবত। সহজভাবে একটু একটু করে লেখে যাবো সপ্তাহান্তে। শপথ নিয়েছি, বেশি চাপ নেবো না মাথায়, তাহলে শুরুই করা যাবে না। প্রকল্প নিয়ে লেখালেখিকেও ‘আরেকটি প্রকল্প’ হিসেবে নিয়েছি, কারণ ৫৫০জন (ফেইসবুকের ২৫০ এবং ওয়ার্ডপ্রেসের ৩০০) পাঠকের প্রতি আরও বেশি গুরুত্ব দিতে চাই।

  • শুরু: শনিবার ৩ সেপটেম্বর থেকে, শনিবার বিকাল ৩টায়
  • লেখার স্টাইল: যেভাবে মাথায় আসছে, সেভাবেই ব্লগে তুলে দিচ্ছি
  • লেখার মান: বিষয় এবং ভাষার প্রাঞ্জলতার প্রতিই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি
  • ভাষা: ইংরেজি এবং পারিভাষিক শব্দ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলছি

 

আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে মাইক্রো-প্রজেক্ট হিসেবে দেখতে পারি। তাতে কঠিন কাজগুলোতে আরও নির্দিষ্টভাবে মনোনিবেশ করা যায়।  ‘প্রকল্পের ধারণা’ কীভাবে প্রাত্যাহিক জীবনেও আমাদের প্রচেষ্টাকে ফলমুখী করে তোলে, সেটি পরবর্তি পোস্টে তুলে ধরবো। পাঠককে পরবর্তি পোস্টগুলো অনুসরণ করার অনুরোধ জানিয়ে প্রথম পর্বটি শেষ করছি।  (২৫ অগাস্ট ২০১৬)

 

 


সূত্র: ইনফোগ্রামটি audax.com.ng থেকে সংগৃহীত।

Advertisements

7 comments

  1. পিংব্যাকঃ যে ৫টি কারণে বাস্তব জীবনেও ‘প্রকল্প’ আমাদেরকে উপকৃত করে। পর্ব ২ | আওয়াজ দিয়ে যাই…
  2. পিংব্যাকঃ প্রকল্প সম্পর্কে ৯টি ধারণা এবং কিছু সহজ দৃষ্টান্ত। পর্ব ৩ | আওয়াজ দিয়ে যাই…
  3. পিংব্যাকঃ প্রজেক্ট ম্যানেজার: পেশাদারিত্ব কোথা থেকে আসে? প্রকল্পের পক্ষ/বিপক্ষ কারা? | আওয়াজ দিয়ে যাই…
  4. পিংব্যাকঃ ১৩ টি উপায়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে নিয়ে আসুন হাতের মুঠোয়! | আওয়াজ দিয়ে যাই…
  5. পিংব্যাকঃ এ দুই রকমের ম্যানেজার থেকে সাবধান থাকুন… | আওয়াজ দিয়ে যাই…
  6. পিংব্যাকঃ প্রজেক্ট ম্যানেজার: পেশাদারিত্বের ৭টি বিষয় | আওয়াজ দিয়ে যাই…
  7. পিংব্যাকঃ ম্যানেজার হিসেবে আপনি কতটুকু দক্ষ? | আওয়াজ দিয়ে যাই…

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s