কর্মস্থলে অপ্রত্যাশিত প্রতিবন্ধকতা ও গঠনমূলক সমালোচনা

 

কয়েক বছর আগে আমার এক বন্ধু তার কোম্পানির কিছু সিনিয়র কর্মকর্তার ব্যাপারে আমার কাছে অভিযোগ করছিলেন।  কোম্পানীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার পর তাদের পদগুলোতে নতুন লোক নেওয়া হয়েছে। “সবগুলো ছিল একেকটি অপদার্থ” আমার বন্ধুটি বলতে লাগলেন।  “এরা কেউই আমার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে নি।”

আমি জানতাম আমার এই বন্ধুটি একজন পারফেক্শনিস্ট, অর্থাৎ খুঁতখুঁতে – সবকিছুই নিখুঁতভাবে করার জন্য তিনি সবসময়ই চেষ্টা করেন। তার পদচ্যুত কর্মকর্তাদের অযোগ্যতার বিবরণ শুনার পর আমার মনে হলো, সেই কর্মকর্তাদের মধ্যে খুব সমস্যা নেই, বরং তাদেরকে যিনি নিয়োগ দিয়েছেন তার মধ্যেই সমস্যা।

আমার বন্ধুটি যখন তার সাবেক কর্মীদের সম্পর্কে তার নেতিবাচক মূল্যায়ন শেষ করলেন, আমি যথাসম্ভব বিচারকের ভূমিকায় না যাবার চেষ্টা করলাম। সরাসরি সমালোচনা না করে আমি বললাম, “কর্মীদের ব্যর্থতার পেছনে আমি শুধু একটি কারণই প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখতে পাচ্ছি।” আমি যে তাকেই ইশারা করছি, আমার বন্ধুটি তৎক্ষণাৎ তা বুঝে নিলেন। তিনি আমার মন্তব্যটি ইতিবাচকভাবেই নিলেন এবং কর্মীর প্রতি তার ব্যক্তিগত চাহিদাগুলো পুনর্বিবেচনা করলেন।  আমার এই মৃদু ভর্ৎসনার জন্য আমার এই বন্ধুটি একদিন আমাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন।

হয়ত সেদিন আমি চুপ করে থাকতে পারতাম। কোন কথা না বলে তার অভিযোগগুলো আমি শুধু শুনেই যেতে পারতাম।  কিন্তু আমি মনে করলাম সমস্যাটি একটি নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করার জন্য তাকে সাহায্য করা উচিত। যদিও কাউকে দুঃখ না দিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করা কঠিন, কিন্তু বন্ধু বন্ধুর কাছ থেকে আন্তরিক সমালোচনা পেতে পারে।

জ্ঞান সাধকেরা বলে থাকেন: যে লোক খোসামুদে কথা বলে তার চেয়ে যে সংশোধনের কথা বলে, সে শেষে বেশি সম্মান পায়।

এধরণের পরিস্থিতির আরেকটি দিক হলো, অন্য ব্যক্তিটি কীভাবে পরামর্শটি গ্রহণ করলো এবং কীভাবে তা কাজে প্রয়োগ করলো।  কর্মীদের অযোগ্যতাকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে আমার বন্ধুটি হয়ত মনে মনে আমার মতামতটি প্রত্যাখ্যান করতে পারতেন। হয়তো তিনি বিনয়ের সাথে আমার মন্তব্যটি গ্রহণ করে গোপনে সংশোধন হতে পারতেন। এবিষয়ে নিচে আরও কিছু দিক তুলে ধরা হলো।

সংশোধনের কথা গ্রহণের মনোভাব সফলতা নিয়ে আসে। একটি আন্তরিক সমালোচনা শৃঙ্খলার পূর্বশর্ত। কারণ সমালোচক তার সংশোধনমূলক কথা দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে সহায়তা দিতে পারেন। তাতে সংশ্লিষ্ট সকলেই উপকৃত হন।  প্রবাদে বলা হয়েছে: যে শাসন মানে সে জীবনের পথে চলে, কিন্তু যে সংশোধনের কথা অগ্রাহ্য করে সে বিপথে যায়। প্রবাদে আরও আছে: যে লোক শাসন অগ্রাহ্য করে সে অভাবে পড়ে ও লজ্জা পায়, কিন্তু যে লোক সংশোধনের কথায় কান দেয় সে সম্মানিত হয়।

ইতিবাচক সমালোচনা গ্রহণ না করা বোকামী।  কর্মক্ষেত্রে প্রায়ই আমরা সমস্যার এত নিকটে অবস্থান করি যে সঠিক সমাধান খুঁজে পাই না। আস্থাভাজন বন্ধু বা সহকর্মীর চিন্তা থেকে এমন তথ্য বের হয়ে আসে যা সরাসরি উপেক্ষা বা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। “যে লোক শাসন ভালবাসে যে জ্ঞান ভালবাসে, কিন্তু যে লোক সংশোধনের কথা ঘৃণা করে সে পশুর সমান।” (প্রবাদ)।

একটি সময়োচিত বিরোধিতা ধ্বংসাত্মক পরিণতি থেকে রক্ষা করে। আপনি যদি অপরিচিত রাস্তায় চলে কোন বিপদের মুখে পড়েন, তখন আপনি এমন ব্যক্তির সহযোগিতা চাইবেন যিনি ওই রাস্তায় হেঁটেছেন। একই কাজ করবেন আপনি কোন বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নেবার পূর্বেও। “জ্ঞানী লোকের দেওয়া শিক্ষা জীবনের ঝর্ণার মত; তা মানুষকে মৃত্যুর ফাঁদ থেকে দূরে রাখে।” (প্রবাদ)।

 

আলোচনা এবং আত্মমূল্যায়নের জন্য কিছু বিষয়:

১)      সংশোধন বা সমালোচনার কথায় আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া করেন? আপনি কি আত্মরক্ষামূলক আচরণ করেন? আপনি প্রত্যাখ্যানমূলক আচরণ করেন, নাকি গ্রহণমূলক মনোভাব দেখান? আপনার উত্তরের পক্ষে ব্যাখ্যা দিন।

২)       অন্য দিক দিয়ে বিবেচনা করলে, আপনি যখন দেখেন কেউ কোন ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেক্ষেত্রে তার বিরোধিতা করা কতটুকু সহজ বা কঠিন বলে আপনার মনে হয়? সম্ভব হলে দৃষ্টান্ত দিন।

৩)      প্রবাদের কথামতো তোষামোদকারী নয় অবশেষে সমালোচনাকারীই পুরস্কৃত হন। এবিষয়ে আপনার মতামত কী? আপনার মতামতের পক্ষে যুক্তি দিন।

৪)      প্রবাদের কোন্ কথাগুলো আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য বলে মনে হয়?

 

(ফটো সংগৃহীত)

 

 


[মূল ধারণা: রিক বক্স – বিশ্বব্যাপী পেশাজীবীদের পথপ্রদর্শক।  লেখাটি পাঠক প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রকাশিত। ১০ সেপটেম্বর ২০১৪]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s