স্বশিক্ষিত ক্ষণজীবীরা: বলছিলাম সাউথ পোলারদের কথা…

স্বশিক্ষিত প্রতিভাবানরা

স্বশিক্ষিত প্রতিভাবানরা

 

মালয়েশিয়া নামের দেশটির অধিকাংশ মোবাইল গ্রাহকের তথ্য এখন হ্যাকারদের হাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষকোটি টাকা হ্যাকারদের দখল থেকে মুক্ত করা যায় নি। অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের টুইটার একাউন্ট হ্যাক হয়েছিল। রাশিয়ান হ্যাকাররা লক্ষ লক্ষ ইমেল একাউন্ট হ্যাক করেছে। বিশ্ববিখ্যাত হ্যাকারের নাম হলো জুলিয়ান অ্যাসান্জ, যিনি উইকিলক্স-এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের কূটনৈতিক দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করছেন। পানামা পেপার এবং এবারে প্যারাডাইজ পেপারস এর মতো গোপন প্রতিবেদন দিয়ে ফাঁস করে দেওয়া হয়েছে কীভাবে তথাকথিত জনপ্রিয় ব্যক্তিরা দেশের কর ফাঁকি দিয়ে বিদেশে ব্যবসা করছেন।

“প্রিয় হ্যাকার, দয়া করে একটু কি বলবেন, কীভাবে আমাদের ব্যাংকের তথ্যগুলো চুরি করলেন?” কোন হ্যাকার কি খুব সহজেই এ প্রশ্নের উত্তর দেবে? অথচ এরকম প্রশ্নের উত্তর জানতে চায় এমন ব্যক্তি বা সংস্থার সংখ্যা এখন আর গোনা যায় না। কিন্তু কেমন হয় যদি হ্যাকারসহ ‘সমাধানটিকে’ কব্জা করা যায়? চাকুরির বাজারে পেশাদার হ্যাকারদের চাহিদাটি এমনই ‘বিশেষ’ যে, একে সাধারণ বলা যায় না। অথচ দেখা যাবে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডিও পেরোতে পারে নি অনেকে। বিল গেটসের কথাই মনে করে দেখুন: “গণিতে আমি খুবই কাঁচা ছিলাম কিন্তু বন্ধুটি ছিলো খুবই দক্ষ। বর্তমানে সে একটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী আর আমি সেই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান।”

শুধু পাশ্চত্যে নয়, প্রাচ্যেও ‘অশিক্ষিত’ প্রকৌশলীদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। ‘অশিক্ষিত’ শব্দটি ব্যবহার করায় আমার আপত্তি আছে। শুধু সনাক্ত করার জন্য বললাম – আদতে তারা স্বশিক্ষিত এবং শৌখিন প্রকৌশলী।

“ধীরে ধীরে প্রচলিত শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় বা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়া গুগলকর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। গুগলের কিছু কিছু টিমে ১৪ শতাংশ কর্মীর প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ডিগ্রি নেই।” এটি একটি পত্রিকার খবর । অবশ্য গুগল জানিয়েছে যে, প্রাতিষ্ঠানিক সনদপ্রাপ্ত কোন প্রার্থীর যদি কোডিং এবং গাণিতিক বিষয়ে দক্ষতা থাকে, তবে তারাও অগ্রাধিকার পাবে।

.

আরও কিছু দৃষ্টান্ত

ছোটবেলায় ভিডিও গেম খেলতে খেলতে যে ছেলে/মেয়েটি সময় এবং অর্থ অপচয় করে মা-বাবার যন্ত্রণার কারণ হয়েছে, সে ছেলে/মেয়েটি চৌদ্দ বছর না পেরোতেই চাকরি পেয়ে গেলো একটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে। উচ্চ বেতনে এবং ভিআইপি মর্যাদায়। ভিআইপি মর্যাদার একটি চিহ্ন হলো, যে কোন সময় যে কোন জায়গায় অফিস করতে পারবেন। বাসায় থাকলেও চলবে। শুধু অন্য কোন সমগোত্রীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ রাখা যাবে না। বিশ্বাস করা কঠিন হলেও একটি ‘প্রতিযোগিতা-প্রবণ’ ভিডিও গেম তৈরির প্রতিষ্ঠানে বিষয়টি অসম্ভব নয়।

প্রতিভা এবং অধ্যাবসায়ের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গুরুত্বহীন। বিখ্যাত অ্যাপেল কম্পিউটারের জনক স্টিভ জবসও ছোটবেলায় তেমনই এক শিশু ছিলেন। মার্ক জাকারবার্গ বা বিল গেট্স-এর বেলায়ও কথাটি ঠিক, কারণ তারা প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা অর্জনের পূর্বেই নিজ নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠা পান।

.

স্বশিক্ষিত প্রতিভাবানরা, যারা কিছু দেশে ‘সাউথপোলার’ হিসেবে সমাদৃত

কারিগরি বিষয়ে সাউথ পোলারদের আধিপত্য বেশি হলেও সৃজনশীল সকল পেশায়ই তাদের আধিক্য আছে। লেখক উপন্যাসিক গল্পকার বা ব্লগার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, এমন অনেক ব্যক্তিই আমাদের সামনে আছেন, যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ভালোমত শুরু বা শেষ করতে পারেন নি।

‘যা পছন্দ তাতেই লেগে থাকার’ বিষয়টি আমাদের দেশের শিক্ষা পদ্ধতি বা সমাজ ব্যবস্থায় ততটা স্বীকৃতি পায় না। ক্রিকেটের অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান যখন খেলতে শুরু করেন, তখন তিনি মা-বাবার আনুকূল্য পান নি। দাদাজান বিনাচিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করার কারণে পিতার অখণ্ডনীয় নির্দেশ হলো ছেলে/মেয়েকে ডাক্তারই হতে হবে। খোঁজ নিয়ে দেখা যাবে, সে হয়তো সঙ্গীত বা ছবি আঁকাআঁকিতে ইতোমধ্যেই নিজ প্রতিষ্ঠানে খ্যাত অর্জন করেছে। ভারতীয় ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবিটির কাহিনী এরকম সমাজের কথাই বলে।

.

সাউথপোলারদের স্বভাব ও জীবনে সাধারণত যা থাকে:

*আগ্রহ: মাত্র দু’একটি বিষয়ে তাদের আগ্রহ থাকে কেন্দ্রীভূত;
*কৌতূহলী: বিষয়টিতে কৌতূহল নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করে মরিয়া হয়ে;
*বেদনাহত/ বিষাদাক্রান্ত: জীবনে থাকে এক বা একাধিক না-পাওয়ার বেদনা;
*প্রচলিত অর্থে অক্ষম: শারীরিক/মানসিক অক্ষমতা থাকতে পারে;
*বঞ্চিত: থাকতে পারে সামাজিক উপেক্ষা/বঞ্চনার বেদনা;

*মেইভারিক: সাধারণত প্রচলিত দৃষ্টান্তের বিপক্ষে তাদের অবস্থান, একটু বাউণ্ডুলে – একটু বিপ্লবী;
*একমুখী/একগুঁয়ে: অন্য কোন বিষয়, তা যতই কামনার বিষয় হোক, তারা সেগুলো উপেক্ষা করতে পারে;
*প্রেরণায় চালিত: তারা প্রেরণার কাঙ্গাল এবং কারও চোখে স্বার্থপরও;
*দৃষ্টান্ত:  কাজী নজরুল ইসলাম, ম্যাক্সিম গোর্কি, বেন্জামিন ফ্রাংকলিন, লিওনার্দো দ্য ভিন্চি, আরনেস্ট হেমিংওয়ে
*ক্ষণজন্মা: প্রেরণার খাবার দিতে গিয়ে শরীরের চাহিদাকে উপেক্ষা করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বীকৃতি পাবার পূর্বেই মৃত্যু!

.

অতএব, সাউথপোলার কারা?

যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেয়েও নিজের প্রতিভা এবং মজ্জাগত মেধার সফল প্রয়োগ করে কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করেছে, পশ্চিমা বিশ্বের ‘অলিখিত ভাষায়’ তারা ‘সাউথ পোলার’ হিসেবে পরিচিত। আমাদের দেশে ‘স্বশিক্ষিত’ অভিধায় আংশিতভাবে তারা পরিচিত। ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে তাদের সরব উপস্থিতি আমরাও টের পাবো। কর্মক্ষেত্রে সফলতার মূল মন্ত্র হলো: ‘যা ভালোবাসো তা-ই করো এবং যা করো তা-ই ভালোবাসো।’ প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার বিষয়টি এক সময় এসে ফাইলবন্দি হয়ে যায়। শুধু দক্ষতা আর যোগ্যতার বিষয়টিই তখন মুখ্য হয়ে ওঠে। আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে চাইলে ‘ভেতরের শক্তিকে’ কাজে লাগাতে হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রাকৃতিকভাবে অর্জিত নিজের অমূল্য শক্তির প্রয়োগ ঘটাতে হবে।

.

কেন এই নামকরণ?

সাউথ পোল বা দক্ষিণ মেরু এমন একটি জায়গা যেখানে ক্যামেরার দৃষ্টি যায় না।  খুব বেশি আলোচনা নেই দক্ষিণ মেরু নিয়ে। সকলেই উত্তর মেরু নিয়ে মুখর হয়ে থাকে, কারণ এটি অনুসন্ধানীদের জন্য সহজ এবং প্রচলিত উপায়ে ভ্রমণ করা যায়।  কিন্তু দক্ষিণ মেরু একটি অনাবিষ্কৃত অঞ্চল। দক্ষিণ মেরুকে বুঝার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়।আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা দিয়েই তথাকথিত মেধাবীদেরকে বের করে আনা যায়।  পরীক্ষার ফলাফল দিয়েই তাদেরকে নির্ধারণ করা হয়।  কিন্তু স্বশিক্ষিতদেরকে আবিষ্কার করতে হয় এবং তাতে চেষ্টা লাগে।  সমাজের প্রচলিত মাণদণ্ডে তারা অনেকাংশেই অনাবিষ্কৃত। তারা দক্ষিণমেরুর বাসিন্দা, তারা সাউথপোলার।
.

.

সাউথপোলারদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত?

পরিবার: পরিবারই মানুষের গড়ে ওঠার সূতিকাগার।  এখান থেকেই শিশু তার অভ্যাসগুলোকে বেছে নেয় এবং নিজেকে আবিষ্কার করে। মা-বাবার দায়িত্ব হবে, প্রথমত তাদের সন্তানের স্বাভাবিক প্রবণতাটি বুঝা।  যেহেতু সকলেই শিশুবিশেষজ্ঞ নন, তাদের উচিত হবে সন্তানের পছন্দ মতো তাদেরকে খেলতে এবং কিছু করতে দেওয়া।  গান, ছবি আঁকা, কিছু বানানো অথবা কিছু ভাঙ্গা… এসব বিষয় আপাত দৃষ্টিতে ক্ষতিকর হলেও সন্তানের ভবিষ্যতের এজন্য এসবের সুযোগ করে দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠান:  প্রতিষ্ঠান অবশ্য এককভাবে কিছু করতে পারে না, যদি না দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সমর্থন না থাকে। তবু অনেক শিক্ষক প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র হয়ে অনেক শিশুকে জীবনের পথ দেখিয়েছে।  তারা শুধুমাত্র একটি কাজ করেছেন, তা হলো শিক্ষার্থীদের যেকোন সৃষ্টিকে স্বীকৃতি বা প্রেরণা দেওয়া।  শিক্ষকের প্রশংসা মানেই হলো সামনে যাবার পাথেয়।  কবি নজরুলকে তার শিক্ষকরাই আবিষ্কার করেছিলেন। তাই শিক্ষকদের উচিত হবে, শিক্ষার্থীদের নিজস্বতাকে সম্মান করা এবং একইভাবে সকলকে পড়ালেখার জন্য চাপ না দেওয়া।

সমাজ:  ইতিহাস বলে যে, সমাজ সবসময়ই প্রতিভাবানদেরকে দেরিতে চিনেছে। সমাজ একটি বৃহত্তর পরিসর।  একে নির্দেশ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। মা-বাবাই সমাজের নিকটতম প্রতিনিধি।  তারা যদি নিজেদেরর সন্তানকে চিনতে না পারেন, তবে সমাজের কাছে শিশুরা আরও বেশি অচেনা হয়ে যায়।  প্রথম দায়িত্ব হলো, মা-বাবার।  বন্ধু এবং প্রতিবেশীর সামনে সন্তানদেরকে তিরষ্কার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।  তাহলেই বন্ধুবান্ধব এবং প্রতিবেশীরা সেই শিশুকে ভালোমতো মূল্যায়ন করতে পারবে।

.

.

[সর্বশেষ সম্পাদনা, ১৩ নভেম্বর ২০১৭। একটি ফেইসবুক স্ট্যাটাস বিস্তৃত হয়ে এই লেখার উদ্ভব।  প্রথম প্রকাশ প্রথম আলো ব্লগ; তারপর সামহোয়্যারইন ব্লগ/ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ ]

.

.


টীকা: প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিতদের মধ্যেও ‘সাউথপোলার সিনড্রোম’ থাকা অসম্ভব নয়!

উৎসর্গ: পৃথিবীর তাবৎ সাউথপোলারদেরকে।
উৎস: পর্যবেক্ষণ এবং ব্যক্তিগত প্রেরণা।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s