প্রশংসা যেভাবে সম্পর্কের জাল বিস্তার করে

 

11061602

সম্প্রতি একটি কর্মশালায় এমন একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে ফেসিলিটেটর হিসেবে পেলাম, যার অভিনব উপস্থাপনা নতুন একটি বিষয়ে আমাকে আগ্রহী করে তোলেছে।  বিষয়টি হলো: ‘গণ স্বাস্থ্য’, পাবলিক হেলথ।  দেশের সরকার গ্রাম পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক দিয়েও দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছে না।  প্রথমত চিকিৎসকরা গ্রামে থাকতে রাজি নন; দ্বিতীয়ত প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার কারণে।  দেশের মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত সকলেই বিদেশমুখী। মধ্যবিত্তরা যাচ্ছে ভারতে, উচ্চবিত্তরা সিঙ্গাপুর থাইল্যান্ড অথবা অস্ট্রেলিয়ায়। প্রফেসর ডক্টর কিমের প্রশ্নোত্তর-ভিত্তিক প্রশিক্ষণের সময় বারবারই আমি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার দিকে দৃষ্টি দিচ্ছিলাম।  তার বর্ণনায় নিজ দেশের পরিস্থিতি আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠলো, অথচ তিনি বাংলাদেশ নিয়ে কিছুই বলেন নি।  ভেবে দেখলাম যে, গরীব দেশের জন্য পাবলিক হেলথই একমাত্র ভরসা, কারণ সকলেই তো ভারতে বা সিংগাপুরে যেতে পারে না।

মনে মনে প্রফেসর কিমের প্রতি কৃতজ্ঞ হলাম।  সুযোগ পেয়ে তাকে বললাম, আপনি গণস্বাস্থ্যের প্রফেসর নন, এটি আপনার জন্য খুবই ছোট একটি নাম।  আপনি গণস্বাস্থ্যের প্রফেট (প্রবক্তা) এবং আমি দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছি।  খুশিতে তিনি উজ্জ্বল হয়ে ওঠলেন। এসুযোগে আমি গণস্বাস্থ্য সম্পর্কে বেশ কিছু প্রাসঙ্গিক সমস্যা তার সামনে তুলে ধরলাম এবং তার সহায়তা প্রার্থনা করলাম। এবং পেলামও। বাকি সময়ে বিভিন্ন সুযোগে তিনি আমাকে গণস্বাস্থ্য সম্পর্কে এমন পরামর্শ দিলেন, যাকে আমি অতিরিক্ত প্রাপ্তি বলে মনে করি।  কর্মশালার অন্য কোন প্রশিক্ষণার্থী এত সুযোগ পায় নি।

তারপর আমাদের মধ্যে পরিচয় বিনিময় হলো। সম্প্রতি আমার কর্মস্থলে গণস্বাস্থ্য নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু করার জন্য আমার ওপর দায়িত্ব পড়েছে।  বিষয়টি নিয়ে আমি খুবই চিন্তিত।  কিন্তু প্রফেসরের সাথে কথা বলার পর আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, ভবিষ্যতে যে কোন সময়ে তার কাছ থেকে সবরকমের সহযোগিতা পাবো অথবা তার মাধ্যমে উপায় বের করতে পারবো।

অন্যের কাছে সহায়তার অনুরোধ সম্পর্ক সৃষ্টির উত্তম পন্থা হিসেবে কাজ করে।  সেখানে প্রাসঙ্গিক প্রশংসা থাকলে, সেটি বিশেষ গ্লু হিসেবে কাজে আসে। একটি প্রাসঙ্গিক মূল্যায়ন এবং একটি প্রশংসা এভাবেই একটি মূল্যবান সম্পর্ক সৃষ্টিতে সাহায্য করে।

 

জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের জন্য কত কিছুই না আমরা করি। কিন্তু  কিছু পথ অনেকের কাছে অধরাই থেকে যায়। কারণ, অত্যন্ত আত্মকেন্দ্রিকভাবে নিজেদেরকে সজ্জিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। মানবিক উপায়গুলো নিয়ে ভাবার সময় পাই না। দক্ষতা আর অভিজ্ঞতার জন্য অনেক শ্রম ও সময় দিচ্ছি আমরা।  স্বাভাবিকভাবেই সেটি আমাদেরকে সম্মানিত এবং গর্বিত করে।  হয়তো প্রথমত এভাবেই চেষ্টা করতে হয়।  কিন্তু কখনও কি মনে হয় নি যে, সেগুলো অপর্যাপ্ত?

মাঝেমাঝে কি এমন মনে হয় না যে, আমাদের ‘সামর্থ্যের দম্ভ’ সম্পর্ক সৃষ্টিতে বাধা তৈরি করে? অজান্তেই অন্যের কাছে অহংকারী করে তোলে?  অথচ দেখুন,  অফিসের নতুন কর্মীটি খুব সহজেই বড়কর্তার আপন হয়ে যায়।  সে কিছুই শিখেনি, মাত্রই সেদিন যোগ দিয়েছে! আমরা কিন্তু বিস্মিত হই! মাঝেমাঝে মনে হয় না যে, ব্যক্তিগত দুর্বলতাই মানুষকে অন্যের কাছে আপন করে তোলে?

কর্মস্থলে যারা দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন, তাদেরই উদ্দেশ্যে মনস্তাত্ত্বিকরা বলেন, প্রথমে চাই আন্তরিকতা, তারপর দক্ষতা।  প্রথমে আন্তরিকতা দেখিয়ে মানুষকে আপন করতে হয়, তারপর আসে দক্ষতা বা সামর্থ্য প্রদর্শনের বিষয়।  এই পরম্পরাটি সম্পর্ক সৃষ্টি ক্ষেত্রে অবশ্য পালনীয়।

মানুষ মাত্রই ভুল।  মানুষ মাত্রই অসম্পূর্ণতা। অসম্পূর্ণতা স্বাভাবিক এবং মানবিক। আমরা অতিমানব দেখে খুব একটা অভ্যস্ত নই।  হঠাৎ কাউকে এমন পেলে, তাদেরকে শ্রদ্ধা জানাই এবং অনুপ্রাণিত হই। কিন্তু সম্পর্ক সৃষ্টির জন্য চাই কিছু অসম্পূর্ণতা।

আমাদের দুর্বলতা এবং ছোট ছোট ভুল অন্যের কাছে নিজেদেরকে পরিচিত করে তোলে।  তারা আপন ভাবতে শুরু করে তখনই, যখন তাদের দুর্বলতাগুলো অামাদের মধ্যেও দেখতে পায়।  বিষয়টি এতই গভীর এবং বিশ্লেষণসাপেক্ষ যে, এক লেখায় শেষ করা যায় না। তবে গভীরভাবে ভাবলে সহজ হয়ে আসে।

নিজের দুর্বলতায় অন্যের সাহায্য চাওয়া এবং অন্যের মধ্যে ইতিবাচক বিষয় দেখতে পাওয়া দু’টি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক গুণ।  সুন্দর মন অন্যের মধ্যে সুন্দরকে দেখতে পায়।  ইতিবাচক মনোভাবই ইতিবাচক অভিজ্ঞতা পেতে সাহায্য করে।

 

110616

“যে ব্যক্তি প্রশংসা পায়, সে সবসময়ই প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কিছু করে।”

 

একটি আন্তরিক এবং সত্যিকার প্রশংসা যেভাবে সম্পর্ক সৃষ্টি করে:

  • ইতিবাচকতা বৃদ্ধি পায়, নেতিবাচকতা (থাকলেও) দৃষ্টির বাইরে চলে যায়
  • ইতিবাচক বিষয়ে অন্য ব্যক্তিটি অনুপ্রাণিত হয়
  • মন্তব্যকারী গভীর চিন্তাশীল ও বিচক্ষণ ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়
  • অন্য ব্যক্তিটি ভিন্নভাবে নিজেকে আবিষ্কার করতে পারে এবং মন্তব্যকারীর কথা মনে রাখে
  • অন্য ব্যক্তিটির ইতিবাচকতা বৃদ্ধি পায় এবং এজন্য সে মন্তব্যকারীর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে…ইত্যাদি

 

প্রসংশা করতে পারা মানে হলো, একটি কঠিন মানবিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। মানুষের ইতিবাচক দিকগুলো দেখতে পাওয়া এবং স্বীকৃতি দেওয়ার কাজটি একটু কঠিন, কারণ আত্ম অহমিকা। আত্ম অহমিকা আমাদেরকে আত্মপ্রকাশে বাধা সৃষ্টি করে। অন্যের ভালো দিক দেখা এবং স্বীকৃতি দেবার মধ্য দিয়ে সে গুণগুলো নিজের মধ্যেও গ্রহণ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

নিজের মূল্যায়ন করলে দেখতে পাই যে, খুব বেশি প্রশংসা আমি করি না। বরং মানুষের অসম্পূর্ণতাই বেশি চোখে পড়ে। কারও মধ্যে ইতিবাচক কিছু দেখতে পাই না।  শুরুতেই তার নেতিবাচক এবং দুর্বলতার প্রতি দৃষ্টি আটকে যায়। সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হলো, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং স্বার্থপরতার কারণে অন্যের বিষয় নিয়ে বেশি ভাবি না। ফলে, তার ভালো দিকটি আড়ালে পড়ে যায় এবং তার সঙ্গে সম্পর্ক আগায় না। এভাবে তো কর্মজীবন চলতে পারে না!

 

 

 

 


টীকা: লেখাটি প্রশংসা, সম্পর্ক সৃষ্টি এবং কর্মস্থলে নেটওয়ার্কিং বিষয়ক। অন্যের ভালো দিকের প্রতি মনযোগী হওয়া সম্পর্কে উৎসাহ দেবার জন্য লেখাটি প্রস্তুত করা হয়েছে। তোষামোদি বা অসৎ স্তুতিবাদের সাথে একে মেশানো যায় না।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s