দালাই লামার সুখতত্ত্ব: Philosophy of Happiness

কর্মজীবীদের মধ্যে যারা ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও পড়তে পারে না, আমি হলাম তাদের মধ্যে একজন।  সিলেক্টিভ রিডিং এবং স্পিড রিটিং আমার পাথেয়।  এটিও সবসময় করতে পারি না।  অথবা বলা যায় করি না, কারণ স্বার্থপর কাজের পর আর কোন নিঃস্বার্থ বিষয়ে মনযোগ দেবার সময় থাকে না।  এই অপরাধবোধে সবসময় আমি ভাসি।  কিন্তু কিছু বিষয় আছে, যা আপনাআপনি এসে দৃষ্টিসীমানায় পড়ে এবং পড়ার জন্য  স্বার্থপর পাঠককে আকৃষ্ট করে।  দালাই লামা এমনই একটি বিষয়, যাতে দৃষ্টি পড়ার পর একটি সীমা পর্যন্ত আমি পড়েই চলেছিলাম। যতই পড়েছি, ততই গভীরে গিয়েছি। এভাবে বেশ কিছু দিন দালাই লামার দর্শনবৃত্তে, বলা যায়, আটক ছিলাম।  ছাড়া পেয়ে কিছু অভিজ্ঞতা কলমবন্দি করে রাখলাম, যেন স্মৃতি রোমন্থন করতে পারি।

 

দালাই লামার ‘আত্মসুখ দর্শন’ যেকোন দর্শক বা পাঠককে মুগ্ধ করবে।  মানুষ সাধারণত সুখ প্রত্যাশী। তাই স্বার্থপরের মতো শুধু তার ‘সুখ দর্শনকেই’ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি। নিজের জন্য কিছু না থাকলে দর্শন দিয়ে মানুষ কী করবে!  দালাই লামার দর্শনে স্বার্থপরের মতো সুখের সন্ধান করতেই বলা হয়েছে। ব্লগের পাতায় লেখাটি যত দীর্ঘ দেখাক না কেন, বিস্তারিত বলতে পারি নি!

 

শুরুতেই একটুখানি কামিনী রায় চেখে নেই:

পরের কারণে স্বার্থে দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মত সুখ কোথাও কি আছে?
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
পরের কারণে মরণের সুখ ;
“সুখ” “সুখ” করি কেঁদো না আর,
যতই কাঁদিবে ততই ভাবিবে,
ততই বাড়িবে হৃদয়-ভার।

 

১) সুখ কী/ মানুষ কী চায়

মানুষ বাঁচে আশায় এবং আশাকে সংজ্ঞায়িত করলে এর অর্থ দাঁড়ায়, ভালো কিছু ঘটার প্রত্যাশা।  আমি মনে করি, ভবিষ্যৎ সুখের ওপরই আমাদের অস্তিত্ব নির্ভর করে আছে। -এই হলো দালাই লামার সুখ তত্ত্ব। তিনি মনে করেন, জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো সুখের সন্ধান করা। কিন্তু, সুখ শুধু সন্ধানেই আসে না।  অনেক সময় সুখের প্রত্যাশা যখন সর্বনিম্ন তখনই সেটি আসে।

 

এটি আসে একটি উষ্ণ হৃদয় থেকে। তিনি বলেন, সুখের চূড়ান্ত উৎস টাকাপয়সা এবং ক্ষমতা নয়, ঊষ্ণ হৃদয়। উষ্ণ হৃদয়ের পরিচয় হলো, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ এবং ইতিবাচক মনোভাব।

তার মতে, আমরা যে শান্তি ও সুখের (tranquility and happiness) সন্ধান করছি, সেটি লাভ করা যায় অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং অনুকূল মনোভাবের মধ্য দিয়ে।

দালাই লামা বলেন, অন্যের প্রতি আমাদের দয়া এবং ভালোবাসা থাকলে সেটি শুধু অন্যকেই উপকৃত করে না, কিন্তু আমাদের অন্তরে সৃষ্টি করে সুখ ও শান্তি। এরজন্য প্রয়োজন একটি উদার মন এবং উন্মুক্ত হৃদয়।

কিন্তু উদার মনের জন্য চাই উন্মুক্ত হৃদয়। মন হলো প্যারাশুটের মতো।  উন্মুক্ত থাকলেই সেটি বেশি কাজ করে। এটি দালাই লামার কথা।

অন্যকে সুখে রাখার প্রচেষ্টাতেই প্রকৃত সুখ।  এই অভিজ্ঞতা সকলেরই আছে।  কাউকে কিছু দিতে পারলে, কাউকে ক্ষমা করতে পারলে, অসম্ভব সুখানুভূতি হয় নিজের মাঝে। দালাই লামা বলেন, যদি অন্যকে সুখে রাখতে চান তবে দয়ার চর্চা করুন, যদি নিজে সুখি হতে চান তবু দয়ার  চর্চা করুন।

 

সুখ হলো, নিজের অনেক শুভাকাঙক্ষী থাকা। কিন্তু নিজেকে আগে রাখলে শুভাকাঙ্ক্ষী আসে না। দালাই লামা বলেন,  মনে রাখবেন, যখন পারস্পরিক ‘সম্পর্ক’  পারস্পরিক ‘চাহিদার’ চেয়েও ঊর্ধ্বে চলে যায়, সেটিই হলো উত্তম সম্পর্ক।

 

সুখ হলো, দয়ালু হতে পারা।  তিনি বলেন, দয়ালু হোন যখনই সম্ভব হয়।  এটি সবসময়ই সম্ভব। কিন্তু তিনি মনে করিয়ে দেন যে,  শুধু দয়ার্দ্র হলেই চলবে না, সেটি কাজে প্রকাশ করতে হবে।

 

সুখ হলো, ভালোবাসতে পারা।  তিনি বলেছেন, যাকে আপনি ভালোবাসুন তাকে ওড়ার মতো ডানা দিন; ফিরে আসার মতো আশ্রয় দিন; এবং সাথে থাকার মতো কারণ দিন।

 

 

২) সুখের সাথে মনের শান্তি এবং রাগ দমনের সম্পর্ক

মনে শান্তি না থাকলে, একে সুখ বলা যায় না।  কিন্তু দালাই লামা বলেন, আমাদের মনের শান্তির চরম শত্রু হলো রাগ।

এই রাগ খুবই কঠিন এক মানবিক বিচ্যুতি।  একে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই মনোভাবের পরিবর্তন।  এখানেই সহানুভূতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের প্রতি সত্যিকার মমত্ববোধ থাকলে অন্যদের প্রতিকূল আচরণ বা দুঃখ পেলেও সেটি পরিবর্তন হয় না।

রাগের সাথে অহংকারের একটি আজন্ম সম্পর্ক আছে। এর আরেকটি উপসর্গ হলো, ঘৃণা।

রাগ এবং ঘৃণা মাছশিকারীর বড়শির মতো ওৎ পেতে থাকে। আমাদের চেষ্টা থাকতে হবে যেন ওটাতে আটকে না পড়ি। এটি দালাই লামার পরামর্শ।  তিনি বলেন, যারা আপনার প্রতি ভুল করে এবং ক্ষতি করে, তাদেরকে ঘৃণা করা উচিত নয়। কিন্তু অনুকম্পার মাধ্যমেই আপনি তাদেরকে থামাতে পারেন, কারণ অন্যের ক্ষতি করে তারা নিজেদেরই ক্ষতি করছে।

রাগ করা মানেই হলো, অন্যের আচরণ দ্বারা আমি প্রভাবিত হচ্ছি।  এটি এক প্রকার পরাজয়।  দালাই লামা বলেন, অন্যের আচরণ দ্বারা আপনার প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত হতে দেবেন না।

 

নেতিবাচক বিষয়কে ভুলে যাবার ক্ষেত্রে তিনি শিশুদের দৃষ্টান্ত নিয়ে এসেছেন। শিশুদের কথা ভাবুন।  অবশ্যই এরা ঝগড়া করে। কিন্তু সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের মতো বেশি সময় তারা রাগ পুষে রাখে না। প্রাপ্তবয়স্কদের অনেকেই শিশুদের চেয়ে বেশি শিক্ষিত, কিন্তু বিশাল হাসির মধ্যে যদি ঘৃণা লুকিয়ে থাকে তবে শিক্ষার কী মানে আছে? শিশুদের মধ্যে এরকম ভনিতা নেই। কারও প্রতি রাগ থাকলে তারা সরাসরি প্রকাশ করে এবং ওখানেই তার সমাপ্তি হয়। পরেরদিনই সেই বন্ধুকে নিয়ে খেলতে পারে।

প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শান্ত থাকতে পারলে এবং বর্তমানকে মূল্যায়ন করতে পারলে আমরা মনের শান্তি রক্ষা করতে পারি।  এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে পরের অংশে।

 

 

৩) সুখ ও শান্ত মনোভাব: শান্ত থেকে বর্তমান সময়কে গুরুত্ব দেওয়া

শান্ত এবং নিজের কাজে মনসংযোগের জন্য অনেকে ব্যায়ামের কথা বলেন।  কেউ কেউ যোগ ব্যায়াম চর্চা করেন;  বিভিন্ন মেথডে ধ্যান করেন।  কিন্তু সবকিছুর জন্মস্থান হলো, মন এবং মনোভাব। দালাই লামা বলেন, আশাবাদী মনোভাবকে বেছে নিন, অপেক্ষাকৃত ভালো অনুভব হবে।

আমাদের মনোভাবকে দূষিত করে দেয় প্রতিপক্ষের আচরণ।  তিনি বলেন, আপনি সঠিক মনোভাব পোষণ করলে দেখবেন যে,  প্রতিপক্ষই আপনার সবচেয়ে ভালো শিক্ষক।  কারণ তাদের উপস্থিতি আপনাকে সহনশীল, ধৈর্য্যশীল এবং বোধ সম্পন্ন হবার সুযোগ করে দেয়।

সামর্থ্য থাকলে অন্যকে সাহায্য করুন। না পারলে করবেন না।  কমপক্ষে কারও ক্ষতির কারণ হবেন না। এটি দালাই লামার কথা।

আমরা সবসময় আগে থাকতে চাই, আগে সুযোগ পেতে চাই। রাস্তায় নামলে এটি বেশি দেখা যায়।  নিজেকে স্বার্থের সংকীর্ণতা থেকে বাইরে নিয়ে আসতে পারলে আমরা জীবনের তাৎপর্য, উদ্দেশ্য এবং সন্তুষ্টি লাভ করতে পারি।

কৃতজ্ঞতাবোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক গুণ।  অনেক সময় অন্যদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার কারণটি আমরা বের করতে পারি না, অথবা মনে রাখতে পারি না।  দালাই লামার মতে, কৃতজ্ঞতাবোধ থাকলে স্বাভাবিকভাবেই অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের সৃষ্টি হয়।

আরেকটি গুণ হলো, আত্মসন্তুষ্টি। তিনি বলেন,  অসন্তুষ্ট থাকলে আপনি শুধুই আরও চাইবেন।  আপনার চাওয়ার কোন শেষ থাকবে না।  কিন্তু যখন আপনি আত্মসন্তুষ্টির চর্চা করবেন, তখন উপলব্ধি করবেন যে, ইতোমধ্যেই আপনার প্রয়োজনীয় সব আছে।

মনে রাখবেন যে, প্রত্যাশামতো কিছু না পাওয়ার মানে হতে পারে সৌভাগ্যের বিস্ময়কর পরশ।  এটি দালাই লামার কথা।

নিজেকে ক্ষমা করা। বিষয়টির ব্যাখ্যা প্রয়োজন।  দালাই লামা বলেন, নিজেকে ভালো না বাসলে অন্যকে ভালো বাসা যায় না। অন্যকে ভালোবাসার সামর্থ্য থাকে না।  নিজের জন্য মমতা না থাকলে অন্যের প্রতি মমতা সৃষ্টি হয় না।

নিজের সাথে নিজের শান্তি না থাকলে আমরা কখনও বাইরের সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারি না।

 

শান্ত কীভাবে থাকবো, যদি প্রতিনিয়ত ভুল হয়?  নিজের সাথে নিজের শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রয়োজন ভুলকে সঠিকভাবে দেখতে পারা। দালাই লামা বলেন, ভুল যখন বুঝতে পারেন তখনই সংশোধনের ব্যবস্থা নিন। কোন সমস্যার সমাধান না করতে পারলে অহেতুক দুশ্চিন্তার মধ্যে কোন ফল নেই।

 

সময় নির্বিঘ্নে বয়ে চলে। আমরা যখন কোন ভুল করি, তখন সময়কে আটকে দিয়ে চেষ্টা করতে পারি না। আমরা যা করতে পারি তা হলো, বর্তমান সময়কে ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারি।

এটি মনে রাখা প্রয়োজন যে, মহৎ প্রেম এবং মহৎ অর্জনের সাথে বৃহৎ ঝুঁকি জড়িত।  ঝুঁকি আর বিপদ, জীবনের অংশ।

প্রতিটি দিনকে মূল্যায়ন করলে, ঝুঁকি আর বিপদগুলো তরল হয়ে যায়। দালাই লামা বলেন, চলুন আমরা প্রতিটি দিনের গুরুত্বকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করি।

 

 

৪)  ‘সুখের সাথে মুখের কথার’ সম্পর্ক

সুখের সাথে কথা বা আলাপচারিতার সম্পর্কটি নিবিড়।  কথা বলে আমরা সম্পর্ক তৈরি করতে পারি, আবার কথা বলেই অনেক দিনের গড়া সম্পর্ককে চিরতরে ছিন্ন করে দিতে পারি।  কথা বলে প্রেরণা দিতে পারি, কথা বলেই স্থায়িভাবে কাউকে থামিয়ে ‍দিতে পারি।

অনেক সময় উচিত কথাটি/ সমুচিত জবাবটি না দেওয়া পর্যন্ত আমরা স্বস্তি পাই না। বলার পরে তৃপ্তি পাই।  কিন্তু ওই তৃপ্তি খুবই সাময়িক।  উচিত কথাটি বলে দেবার একটু পরই অস্বস্তি শুরু হবে – অপরাধবোধ সৃষ্টি হবে। মনে হবে, না বললেই ভালো ছিল।  থুথু যেমন ফেরত নেওয়া যায় না, তেমনই বলা কথা ফিরিয়ে আনা যায় না।

কথা বলার একটি কর্মশালায় প্রধান স্লোগানটি এসেছিল প্রশ্নের আকারে:  আপনার কথা কি গড়ে তোলে, নাকি ধ্বংস করে?

উপযুক্ত সময়ে কথা বলা যেমন জরুরি, তেমনি উপযুক্ত সময়ে চুপ থাকা বা কথা না বলাটাও দরকারি। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘অনেক কথা যাও যে বলে, কোন কথা না বলি।’  না বললে অনেককিছু বুঝানো যায়, বললে শুধুই বলাটুকু।

দালাই লামা বলেন, মানুষ অনেক সময় কথা বলেই মুগ্ধতা সৃ্ষ্টি করে; অনেক সময় নিরব থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ মুগ্ধতা সৃষ্টি করা যায়। নীরবতা অনেক সময় সর্বোত্তম উত্তর হিসেবে গণ্য হয়।

কথা বলেই অন্যকে গড়ে তুলতে পারি।  এখানে ইতিবাচক মনোভাবের প্রয়োজন। অন্যের ইতিবাচক দিকটি উপলব্ধি করতে পারা একটি মূল্যাবান গুণ।  দালাই লামা বলেন, প্রশংসার ভূমিতে উৎপন্ন হয় সকল উত্তমের বীজ।

 

 

৫)  সুখ ও বৈষম্যহীনতা: সকল মানুষই সমান, সকলেরই চাহিদা এক

সব বর্ণের মানুষের মধ্যে সংহতি সৃষ্টি করার জন্য দালাই লামা চমৎকার যুক্তি দিয়েছেন।  একে খণ্ডন করা প্রায় অসম্ভব।  যা খণ্ডন করা যায় যা, তাকে এড়িয়েও যাওয়া যায় না।

মানুষে মানুষে প্রভেদ সৃষ্টির মধ্যেই রয়েছে যত হিংসার কারণ।  প্রাকৃতিক, ভৌগলিক, বৈজ্ঞানিক সকল দিকেই মানুষ এক। মানুষ যে এক তার প্রমাণ কী? তাদের সবার শারীরিক ও আবেগিক চাহিদা এক। তাদের লক্ষ্য এবং প্রত্যাশাও এক।

দালােই লামা বলেন: ধনী কিংবা দরিদ্র, শিক্ষিত বা নিরক্ষর, ধার্মিক অথবা অবিশ্বাসী, নারী অথবা পুরুষ, সাদা কালো অথবা তামাটে, আমরা সবাই এক। শারীরিক, আবেগিক এবং মানসিকভাবে আমরা সবাই সমান। খাদ্য, আশ্রয়, নিরাপত্তা এবং আবেগের মতো মৌলিক চাহিদাগুলো আমাদের সবারই এক। আমরা সবাই চাই সুখ এবং কষ্টকে এড়িয়ে চলি। আমাদের প্রত্যেকেরই আশা, উদ্বেগ, ভয় এবং স্বপ্ন আছে। প্রত্যেকেই চাই নিজের পরিবার এবং আপনজন ভালো থাকুক। কোনকিছু হারালে আমরা দুঃখ পাই এবং কোনকিছু অর্জন করতে পারলে আনন্দিত হই। এ জায়গাটাতে ধর্ম, নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, সংস্কৃতি এবং ভাষা আমাদের মধ্যে কোন পার্থক্য সৃষ্টি করে না।

সামাজিক বৈষম্যের কারণে আমাদের আচরণগুলো সবার জন্য একরকম হয় না। বয়স্ক রিক্শাওয়ালাকেও আপনি বলতে আমাদের বাধে, কিন্তু পরিশীলিত পোশাকের অল্পবয়সী যুবকটির প্রতি এমনিতেই ‘আপনি’ সম্বোধন চলে আসে। আমাদের ভালো আচরণ ওকথার সুমিষ্টতা যেন জমিয়ে রাখি বিশেষ দিনের বিশেষ ব্যক্তিদের জন্য। অতএব, সব মানুষকে সমানভাবে দেখতে পারার মধ্যে সুখের কারণ আছেই তো!

 

 

৬)  সুখ ও ধর্ম: ধর্মের সাথে নৈতিকতার সম্পর্ক

দালাই লামার মতে ধর্ম অথবা প্রতিষ্ঠান মানুষকে আলাদা করতে পারে না। এখানেও মানুষ এক।  সব মানুষই সুখ চায়।  তাই সবাইকেই সহানুভূতি এবং দয়ার চর্চা করতে হয়।  দয়াই ধর্ম।

তিনি বলেন, আমার ধর্ম খুবই সরল। এর জন্য ধর্মগৃহের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নেই জটিল কোন দর্শনের । আপনার মন এবং আপনার অন্তকরণই হলো ধর্মগৃহ। আপনার দর্শন হলো দয়া।

তার মতে, ধর্মীয় ঐতিহ্যগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য পথের পাশে ধর্মগৃহ প্রতিষ্ঠা করা নয়, কিন্তু আমাদের অন্তরের মধ্যে ভালো গুণ এবং ভালোবাসার (goodness and compassion) প্রতিষ্ঠা করা।

ধর্মের সামগ্রিক উদ্দেশ্যটি হলো ভালোবাসা ও অনুকম্পা, ধৈর্য, সহনশীলতা, নম্রতা এবং ক্ষমাশীলতাকে প্রতিষ্ঠিত করা।

তিনি বলেন, ধর্ম আর ধ্যান ছাড়া মানুষ বাঁচে, কিন্তু মানবিক গুণাবলী ছাড়া আমরা টিকতে পারি না।

অতএব, দয়া বা অনুকম্পা কোন ধর্মীয় বিষয় নয়, এটি মানবিক বৈশিষ্ট্য।  এটি কোন বিলাসিতা নয়, বরং আমাদের নিজের শান্তি ও মানসিক স্থিতিশীলতার জন্য আবশ্যক। এটি মানুষের অস্তিত্বের জন্য দরকারি।  এটি দালাই লামার কথা।

 

ধর্ম দিয়ে মানুষকে হেয় অথবা ভিন্ন ভাবা কতটুকু যুক্তিযুক্ত?  দালাই লামা বলেন, সুখ আর সফলতার উদ্দেশ্যে মানুষ বিভিন্ন পথে হাঁটে।  কেউ আপনার পথ দিয়ে হাঁটছে না মানেই এই নয় যে, সে ধ্বংস হয়ে গেছে।

তার মতে, ধর্ম আলাদা থাকতেই পারে।  অথবা ধর্ম নাও থাকতে পারে।  কিন্তু নৈতিকতা শুধুই ধর্মীয় গুণ নয়।  দালাই লামা বলেন, বর্তমান সমাজে আমি মনে করি যে, নৈতিকতা, অন্তর্নিহিত মূল্যবোধ, ব্যক্তিগত সততা অর্জনের জন্য একটি সার্বজনীন এবং টেকসই পথ বের করার প্রয়োজন। কারণ এসব গুণাবলী ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং নৃতাত্ত্বিক পার্থক্যের উর্ধ্বে।  আমি একে বলি ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিকতা।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, নৈতিকতার জন্য ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। বরং আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে,  মানবিকতা এবং মানুষের পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাভাবিক এবং যুক্তিসঙ্গতভাবেই নৈতিকতার বিষয়টি আসে।

 

 

৭)  সুখ ও শিক্ষা:  শিক্ষা থেকে যে প্রত্যাশা থাকা উচিত

আমাদের বর্তমান সমাজের সমস্যাটি হলো শিক্ষা সম্পর্কে তাদের প্রত্যাশা।  তারা মনে করে, শিক্ষা গ্রহণ করলেই তারা চতুর এবং বুদ্ধিমান হয়ে যাবে।  শিক্ষাকে আমাদের সমাজ সেভাবে না দেখলেও, শিক্ষা এবং জ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূ্র্ণ উদ্দেশ্য হলো, অধিকতর ভালো কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করা এবং মনের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের জ্ঞান ও বৃদ্ধির সঠিক প্রয়োগ হলো, উত্তম অন্তকরণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিজের অভ্যন্তরে পরিবর্তন।

আমি মনে করি, অজ্ঞতাই মানুষের কষ্টের কারণ।  স্বার্থপরের মতো নিজের সুখ এবং সন্তুষ্টির খুঁজেই মানুষ অন্যকে কষ্ট দেয়। অথচ প্রকৃত সুখ আসে অন্তরের সুখ এবং সন্তুষ্টিবোধ থেকে। এই সুখ আসে পরোপকার, ভালোবাসা এবং দয়া  থেকে। এটি আসে অজ্ঞতা, স্বার্থপরতা এবং লোভকে পরিত্যাগ করার ফল হিসেবে।

অজ্ঞতা কী? সুখের উৎস সম্পর্কে সঠিক নির্দেশনার অভাব। সুখের উৎস কী?  পরোপকতার, ভালোবাসা এবং দয়া।  পরোপকার, ভালোবাসা এবং দয়া কীভাবে সম্ভব?  জ্ঞানার্জন, নিঃস্বার্থ মন এবং নির্লোভ অন্তকরণের মাধ্যমে।

 

শিক্ষার ফল কী?  ভালো কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারা এবং উত্তম অন্তকরণ প্রতিষ্ঠা করতে পারার সামর্থ্য।

চামচ কখনও তার বহনকৃত খাদ্যের স্বাদ নিতে পারে না।  ঠিক সেভাবে সাধুর সঙ্গ পেলেও নির্বোধ সেটি বুঝতে পারে না। বলেছেন দালাই লামা।

 

 

 

 

▶ দালাই লামা: প্রাসঙ্গিক পরিচয়

সমস্ত আলোচনা চতুর্দশ দালাই লামা তেনজিন গেয়াতসুকে (১৯৩৫-) নিয়ে। পূর্বসুরী সকলের চেয়ে জনপ্রিয়তা এবং সার্বজনীনতা অর্জন করেছেন তেনজিন গেয়াতসু।  তার জীবন ও দর্শন থেকে শিক্ষা নেবার জন্য মানুষ লাইন ধরে টিকেট কাটে।  মহাত্মা, ম্যান্ডেলা এবং সর্বোপরি বুদ্ধের দর্শনকে একত্রিত করে একটি সর্বজনবোধ্য ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন, যার জন্য সারাবিশ্বে তিনি একজন জনপ্রিয় বক্তা। তার দর্শন এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠের বিষয়।

এর প্রথম কারণটি হলো, তিনি মানুষকে একটি অভিন্ন স্তরে নিয়ে আসতে পেরেছেন এবং নৈতিকতার সার্বজনীনতাকে তুলে ধরেছেন।  তার দর্শনের মূল কথা হলো, মানুষ এবং তার অভিন্ন মানবিক চাহিদা। ফলে মানুষ দালাই লামার শিক্ষায় নিজেকে আবিষ্কার করতে পেরেছে।

অন্য কারণটি হলো, বিভিন্ন ধর্মকে স্বীকৃতি দিয়ে এর মূল উদ্দেশ্যেকে তুলে ধরতে পারা, সেটি হলো: মানুষের সুখের সন্ধান।

 

বর্তমান লেখায় ধর্মীয় বা রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, সেক্যুলার দার্শনিক হিসেবে দালাই লামাকে দেখা হয়েছে। তার সুখদর্শন একটি শক্তিশালী যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠা পেয়েছে যাতে আছে আধ্যাত্মিক এবং জাগতিক চেতনার মিশ্রণ।  নিজের ধর্মীয় পরিচয় থাকলেও তিনি তার চিন্তাচেতনাকে এমন একটি নিরপেক্ষ অবস্থানে দাঁড় করিয়েছেন, যেখানে ধর্মীয় পার্থক্য অপ্রাসঙ্গিক।  দালাই লামার সুখতত্ত্ব বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী সবাইকেই মানুষ হিসেবে এক করে দিয়েছে।

চতুর্দশ দালাই লামা ব্যতিক্রম।  তিব্বতের শতবছরের ধর্মীয় ঐতিহ্য মোতাবেক দালাই লামা তাদের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক নেতা হয়ে আসলেও, চতুর্দশ দালাই লামা তিব্বতে গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করার পথ সুগম করে দেন (২০১১)।  নিজেকে শুধু আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে বিবেচনা করলেও তিনি অহিংস উপায়ে তিব্বতের মানুষের স্বাধীকারের জন্য লড়ে যাচ্ছেন।  সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন যে, আর কোন দালাই লামার প্রয়োজন নেই

 

 

 

▶প্রাসঙ্গিক প্রবন্ধগুলো:

১. Inner Peace অন্তরের শান্তি

২. সুখি মানুষের গল্প

৩.  আত্মউন্নয়ন: এই সময়টি আপনার

 

 


পরিশিষ্ট:

১.  Lama, 14th Dalai, Cutler, H.C. and His Holiness the Dalai Lama (1998) The art of happiness: A handbook for living. New York, NY: Riverhead Books.

২.  Lama, 14th Dalai, XIV, D.L. and His Holiness the Dalai Lama (2001) An open heart: Practising compassion in everyday life. United Kingdom: Hodder & Stoughton.

৩.  Lama, 14th Dalai and XIV, D.L. (2012) Beyond religion: Ethics for a whole world. United Kingdom: Rider, Ebury Publishing.

৪.   (no date) Available at: http://www.biography.com/people/dalai-lama-9264833 (Accessed: 27 March 2016).

৫.  The office of his Holiness the Dalai Lama (2016) Available at: http://www.dalailama.com/ (Accessed: 26 March 2016).

৬.   রাজুমইনুল (2012) অনেকের ভীড়ে একজন (পর্ব ৬: দালাই লামা). Available at: https://blog.mukto-mona.com/2011/08/15/18108/ (Accessed: 18 December 2015).

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s