সুখি মানুষের গল্প

বছর সাতেক আগের কথা। তখন আমি গ্রামে কর্মরত। একটি জনসচেতনতামূলক নতুন কর্মসূচির অধীনে কিছু প্রশিক্ষক প্রয়োজন। বাছাই শেষ। এবার তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেবার পালা। সমস্যা হলো ভেন্যু নিয়ে, কারণ প্রশিক্ষণার্থীরা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছেন। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে তাদেরকে দূর-দূরান্ত থেকে ভ্রমণ করার ঝামেলা দিতে চাই না। দেখা যাবে যে, তারা অংশগ্রহণই করেন নি। গ্রামের মানুষকে নিয়ে সাংগঠনিক কাজের বহুত ঝক্কি থাকে। তাই, এমন একটি স্থান দরকার যেখানে প্রশিক্ষণার্থীরা অল্প ভ্রমণে আসতে পারবেন। খাবারটাও ভালো হতে হবে।

ময়মনসিংহের এক থানার প্রত্যন্ত গ্রামে আমার এক বন্ধু কৃষিতে পড়াশোনা করে উচ্চমানের চাকুরিতে না গিয়ে শুরু থেকেই কৃষিকাজ শুরু করেন। ডেইরি, গোমাংস, মাছ চাষের পুকুর, লেয়ার মুরগি নিয়ে তার মোটামুটি আকারের একটি খামার বাড়ি। পরিবার নিয়ে সেখানেই তার বাস। সবকিছু অর্গানিক পদ্ধতিতে করেন, কোন বিষাক্ত রাসায়নিক নেই। এটি তাদের নৈতিক অবস্থান। ঢাকার বিশেষ কয়েকটি সুপারশপের সাথে তাদের সম্বন্ধ! তবে ব্যক্তিগত ক্রেতাও আছেন, যারা মাসিক ফরমায়েসের ভিত্তিতে পণ্য কেনেন। ততদিনে ৮ বছর চলছে তাদের।

ময়মনসিংহের ওই থানার নির্দিষ্ট গ্রামটিকে আমাদের একদিনের কর্মশালাটি আয়োজনের জন্য উপযুক্ত মনে করলাম। জায়গাটি প্রধান রাস্তার কাছে এবং আমাদের অধিকাংশ প্রশিক্ষণার্থীর নাগালে। সমস্যা হলো বর্ষাকাল নিয়ে। বসার স্থান যা-ই হোক, মাথার ওপরে ছাউনিটুকু অন্তত থাকতে হবে। থাকতে হবে দুপুরের আহারের সুব্যবস্থা। আমার বন্ধুটিকে বিস্তারিত বলে তাকে অনুরোধ করলাম। তিনি সানন্দে গ্রহণ করে আমাকে স্বস্তি দিলেন। আমি তাকে জানিয়ে রাখলাম যে, খাবারসহ যাবতিয় খরচ আমার অফিস বহন করবে।

তবু আমি নিশ্চিত হতে পারলাম না, কারণ অতীত অভিজ্ঞতা ভালো ছিলো না। স্বেচ্ছায় রাজি হওয়া প্রশিক্ষণার্থীরা কতজন আসবেন, সময় মতো আসতে পারবেন কিনা, আবহাওয়া কেমন থাকবে… ইত্যাদি নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা থেকেই গেলো। আমার সহকর্মীদেরকে আমি নিয়মিত চাপের মধ্যে রাখলাম, যেন তারা প্রশিক্ষণার্থীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে আমাকে হালনাগাদ করে। বলা বাহুল্য, আমাদের অফিস কম্পাউন্ডে অথবা প্রকল্প এলাকার থানা সদরে এধরণের কর্মসূচি হলে আমাকে ভাবতেই হতো না।

দিন যত এগিয়ে আসলো, আমার উদ্বেগ ততই বাড়তে লাগলো। দুপুরের খাবার নিয়ে আরেক দুশ্চিন্তায় পড়লাম। গ্রাম এলাকায় ভালো খাবার হোটেল থাকে না। ওখানেও পাওয়া গেলো না। বড়জোড় তেলচিটচিটে টেবিলে নাস্তা খাবার ব্যবস্থা আছে। দুপুরের খাবার রান্না করে দিতে পারবে, সেরকম হোটেল নেই, বাবুর্চিও নেই। ময়মনসিংহ শহরও নিকটে নেই যে, প্যাকেট লান্চ নিয়ে আসা যায়।

কর্মশালার সপ্তাহখানেক আগে আমার বন্ধুটি ফোন দিয়ে জানতে চাইলেন, সবকিছু ঠিক আছে কিনা। আমি নিশ্চিত করে বললাম, আলবৎ ঠিক আছে। বরং আমি উল্টো জিজ্ঞেস করলাম, তার পক্ষ থেকে কোন সমস্যা আছে কিনা এবং উটকো ঝামেলার জন্য আগাম ক্ষমা চাইলাম। তিনি আমাকে আরেক ধাপ নিশ্চিত করে দিয়ে বললেন যে, প্রশিক্ষণার্থীদের দুপুরের খাবারের জন্য যেন আমি চিন্তা না করি। আমি যে খাবার নিয়ে মহাটেনশনে আছি, তিনি সেটা জানলেন কীভাবে! আমি বিস্মিত হলাম। তিনি বললেন যে, আমার অথিতি মানে তারই অথিতি। পঁচিশ-ত্রিশ জন অথিতিকে এক বেলা খাওয়ানোর জন্য তার খামারের পণ্যই যথেষ্ট। আমি ভাবলাম, তা হতে পারে। কিন্তু অফিসের খরচ তার ওপরে কেন দেবো! কর্মসূচি শেষে তার হাতে খরচের টাকা ধরিয়ে দেবার গোপন সিদ্ধান্ত নিয়ে তার প্রস্তাবে আমি রাজি হয়ে গেলাম।

অবশেষে আমাদের প্রশিক্ষণের দিনটি এলো। সেই সাথে এলো বিরতিহীন বৃষ্টি। তারপরও আমাদের প্রায় সকল প্রশিক্ষণার্থীকে গিয়ে উপস্থিত পেলাম। বিস্ময় আর আনন্দের সাথে দিনের প্রথম ভাগ শুরু হলো। বৃষ্টি চলতেই আছে। বৃষ্টির দিনে ক্ষুধা বেশি লাগে। নতুন জায়গায় গেলে আরেকটু বেশি লাগে। বেলা দু’টা অতিক্রম করলে আরও লাগে! কিন্তু আয়োজক হয়ে এসব নিয়ে ব্যস্ত হওয়া যায় না। একদিকে প্রচণ্ড ক্ষুধায় পেট চু চু করছে, অন্যদিকে রান্না-করা মাংস ও বিভিন্ন খাবারের গন্ধ এসে আমাদের নাকে দোলা দিচ্ছে। প্রথম ভাগ আধা ঘণ্টা দেরিতে শেষ হলো।

একটি ত্রিপাল টানিয়ে খোলা মাঠে খাবারের আয়োজন। মাঝখানে লম্বা টেবিলে দু’পাশে বেন্চ। ধোঁয়া ওঠছে মাছ মাংস ডাল ও ভাতের ডিশগুলো থেকে। ওখান থেকেই সম্মিলিত গন্ধ এসে আমাদের নাসারন্ধ্রে আক্রমণ চালিয়ে প্রশিক্ষণার্থীদেরকে অন্যমনস্ক করে দিয়েছিলো। সেই আক্রমণে উদরযুক্ত কেউ বাদ পড়লো না। আমরাও তার সমুচিত জবাব দিয়ে বসে পড়লাম বেন্চগুলোতে। খামার কর্তা, আমার বন্ধুটি, বিভিন্ন খাবারের বিবরণ দিয়ে যাচ্ছিলেন। কোন্ মাছ কোন পুকুর থেকে, মাংস কীভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে, সব খাবার কেন স্বাস্থ্যসম্মত এবং নিরাপদ… ইত্যাদি। এসব শুনে শুনে যখন খাচ্ছিলাম, তখন ক্ষুধাপেটে অমৃতের মতো লাগছিলো। আমার বন্ধুটিও তার অতিথিপরায়ন হবার সুযোগটিকে উপভোগ করেছিলেন।

আমাদের আহার গ্রহণের সময়ে তিনি জানালেন কীভাবে ব্যবসায়িক সততার কারণে তার ক্রেতা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। কোন এক মাসে তার বিক্রি দু’লাখ ছাড়ালো এবং সে আনন্দে সকল কর্মীকে বিশেষ বোনাস দিলেন। তার স্বপ্ন অন্তত ত্রিশ শতাংশ আয় এলাকার সার্বিক উন্নয়নে খরচ করা। প্রথমে তিনি শিশুদের জন্য একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল দিতে চান, কারণ গ্রামে ভালো বিদ্যালয় নেই।

প্রশিক্ষণ অত্যন্ত সফলভাবে শেষ হলো। আমাদের প্রশিক্ষণার্থীরা বনভোজনের অভিজ্ঞতা পেলেন এবং পুরোপুরি উপভোগ করলেন দিনটি। আমরাও কৃতীত্বের অনুভূতি সঙ্গে করে গন্তব্যে ফিরছিলাম। বলা বাহুল্য, আমার বন্ধুকে খাবারের জন্য কোন খরচ দিতে পারলাম না। তিনি সেটা গ্রহণ করলেন না, বরং আমাদেরকে ধন্যবাদ দিলেন। আমরা ভাবলাম, অফিসের নির্দিষ্ট বাজেট দিয়ে আমরা এমন উন্নতমানের খাবার যোগাতেও পারতাম না। এই আথিতিয়েতাকে টাকায় বিনিময় করা যায় না। আমার টিমসহ সকলেই অত্যন্ত সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন। আমাদের সচেতনতামূলক কর্মসূচিটিও সবচেয়ে সফল কর্মসূচি হিসেবে রের্ক্ড হয়েছিল।

সেই সুখস্মৃতির জন্য আমি আমার বন্ধুটির কাছে কৃতজ্ঞ রইলাম। মাঝেমাঝেই তার খবর নিতাম এবং খামারের সফলতার কথা শুনতাম। প্রেরণা দিতাম (আসলে প্রেরণা পেতাম!)। তার একটি স্বপ্ন আছে, যা তার কথা ও কাজে প্রকাশ পায়। নিজের পরিকল্পনার কথা বলার সময় তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে যায়। কতই উচ্ছ্বসিত সে তার কাজ নিয়ে! আমি তাকে হিংসা করলাম!

তারপর অনেকদিন কেটে গেলো। মাঝে একবার তার একটি খারাপ সংবাদে চিন্তিত হয়েছিলাম। ট্যাক্স অফিস নাকি তার ব্যবসায়ের প্রতি ঈর্ষাকাতর হয়ে অসম্ভব সব দাবি করছে। দশ লাখ টাকার মতো ট্যাক্সের জরিমানায় পড়েছিলো সে। মামলাও নাকি হয়েছে। আমি জানতাম, তিনি নিয়মিত কর পরিশোধ করতেন! সবমিলিয়ে বিগত কয়েক বছর তার সুখের ছিলো না। আমিও তাকে অপ্রস্তুত করার জন্য আর ফোন দিতে চাইতাম না।

আজ হঠাৎ তার ফোন। তার ব্যবসায়ের কথা জিজ্ঞেস করলাম। জানালো যে, আগের চেয়ে পাঁচগুণ বড় হয়েছে তার খামার ও ব্যবসায়। এখন মাসিক বিক্রি বিশ লাখের ওপরে। একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল দিয়েছেন, খামারের ভেতরেই। সেখানে শিশুরা সকালে একগ্লাস দুধসহ একবেলা খেতে পায়। ক্লিনিকও দিতে চেয়েছেন, কিন্তু সফল হন নি। সামনের বছর আবার নতুন উদ্যোমে শুরু করবেন ক্লিনিক। এখন তার লক্ষ্য হলো, নিজের আয়ের পঞ্চাশ শতাংশ এলাকার মানুষের সার্বিক উন্নয়নে খরচ করবেন। কর্মীদেরকে বেতনসহ লভ্যাংশ দিচ্ছেন।

ত্যাগেই সুখ, এসব তাত্ত্বিক বিষয় আমরা পড়ি এবং বিশ্বাসও করি। কিন্তু বাস্তবে কেমন, তা অনেকেই হয়তো জানি না। মানুষ যে ‘দিয়েও’ সুখি হতে পারে, তার ব্যবহারিক প্রমাণ আমার কৃষক বন্ধুটি।

ফোন করে তিনি পরিবারসহ ঢাকায় আসার সংবাদ জানালেন। আমাকে পরিবারসহ একবেলা খাওয়াতে চান! আগেই নিশ্চিত হয়েছেন যে, আমি ছুটিতে আছি। বলুন, কত খাওয়া যায়!

Advertisements

One comment

  1. পিংব্যাকঃ দালাই লামার সুখতত্ত্ব: Philosophy of Happiness | আওয়াজ দিয়ে যাই…

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s