এসডিজি কেন? কী বিশেষত্ব এতে আছে? এমডিজি’র সাথে এর কী সম্পর্ক/পার্থক্য?

sdg photo

এমডিজি ছিলো বিশ্বনেতাদের প্রণীত সার্বজনীন উন্নয়ন পরিকল্পনা। এমডিজি’র মাধ্যমে বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানরা উন্নয়নের ৮টি বিষয়ে একমত হয়ে স্ব স্ব দেশের উন্নয়নের চেষ্টা করেছেন বিগত ১৫ বছরে। কিছু লক্ষ্য পূরণ হয়েছে, কিছু বাকি থেকেছে। এমডিজি’র মাধ্যমে উন্নয়ন সম্পর্কে বিশ্বনেতাদের মধ্যে ঐকমত্য সৃষ্টি হলেও, এতে দারিদ্রের মূল কারণে (root cause) দৃষ্টিপাত করা যায় নি। জেন্ডার বৈষম্যে গুরুত্ব দেওয়া যায় নি এবং সার্বিক উন্নয়নের বিষয়গুলো থেকেছে অবহেলিত। এমডিজি’র মেয়াদ শেষ হলেও ১০০ কোটি মানুষ এখনও দরিদ্র সীমার নিচে, অর্থাৎ তাদের দৈনিক আয় ১.২৫ ডলারের নিচে।

এমডিজিতে মানবাধিকার বিষয়ে কোন উল্লেখ ছিল না এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টিও ছিল অস্পষ্ট। তাত্ত্বিকভাবে সকল দেশে প্রযোজ্য হলেও শুধুমাত্র দরিদ্র দেশগুলোতে এটি প্রয়োগ করা হয়েছে। অর্থ দিয়েছে তথাকথিত ধনী দেশগুলো।

এভাবেই ২০১৫ সালে এমডিজি’র নির্ধারিত ১৫ বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এসডিজি হলো গত ১৫ বছরে প্রচলিত এমডিজি’র সম্প্রসারিত ও হালনাগাদ রূপ। এতে টেকসই উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ধনী এবং গরীব সকল দেশকেই যথাযথভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সংক্ষেপে এসডিজি: ১. দারিদ্র্য বিমোচন; ২. ক্ষুধামুক্তি; ৩. সুস্বাস্থ্য; ৪. মানসম্মত শিক্ষা; ৫. জেন্ডার সমতা; ৬. বিশুদ্ধ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন; ৭. ব্যয়সাধ্য ও টেকসই জ্বালানি; ৮. সবার জন্য ভালো কর্মসংস্থান; ৯. উদ্ভাবন ও উন্নত অবকাঠামো; ১০. বৈষম্য হ্রাসকরণ; ১১. টেকসই শহর ও সম্প্রদায়; ১২. (সম্পদের) দায়িত্বশীল ব্যবহার; ১৩. জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধ; ১৪. সমুদ্রের সুরক্ষা; ১৫. ভূমির সুরক্ষা; ১৬. শান্তি ও ন্যায়বিচার; ১৭. লক্ষ্য অর্জনের জন্য অংশিদারিত্ব। ১৭টি লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করার জন্য বিশ্বের প্রায় সকল দেশ একমত হয়েছে জাতিসক্সেঘর অতিসাম্প্রতিক এক সাধারণ সভায়। আমাদের সরকার প্রধানও সেখানে ছিলেন।

এসডিজি’র বিশেষ দিকগুলো:

১) সম্পূর্ণতা/ Zero – Total Achievement: ২০১৫ সাল পর্যন্ত এমডিজি’র উদ্দেশ্য ছিল ক্ষুধা ও অভাবমুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে অন্তত ‘অর্ধেক পথ’ আগানো। এসডিজি’র লক্ষ্য হলো কাজটি সম্পূর্ণ শেষ করা, অর্থাৎ ২০৩০ নাগাদ কোন ক্ষুধা বা খাদ্যাভাব থাকবে না – জেরো হাংগার ও zero poverty। সম্পূর্ণ অর্জনের জন্য শতভাগ মনযোগ, শতভাগ অংশগ্রহণ এবং শতভাগ ক্ষমতায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

২) সার্বজনীনতা/ Universal: ধনী দেশগুলো গরীব দেশগুলোকে সাহায্য করবে, এই ছিল এমডিজি’র বাস্তবতা। এরপর অনেক পরিবর্তন এসেছে বিশ্ব সমাজে। ODA-র পরিমাণ নামতে নামতে শূন্যে চলে এসেছে। সমস্যাটি দেশ বা জাতিভিত্তিক নয়। সমস্যা হলো, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং ধনী গরীবের পার্থক্য, যা সকল দেশেই আছে। ইউরোপের মতো ধনী মহাদেশে তিনকোটি বস্তিবাসী আছে। তাই এসডিজিতে সকল দেশকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

৩) সর্বব্যাপী/ Comprehensive: এমডিজিতে ৮টি লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এসডিজি’র জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি প্রথমে ১২টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু দারিদ্রতার মূলোৎপাটন, মানবাধিকার, বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতা, এবং সুশাসনকে বিবেচনায় এনে ওপেন ওয়ার্কিং গ্রæপ মোট ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরে। এটিই চূড়ান্ত। টেকসই উন্নয়নের জটিল বিষয়গুলো এমডিজিতে সেভাবে স্থান পায় নি, যা এসডিজিতে গুরুত্ব পেয়েছে।

৪) ক্ষুধামুক্তির শর্তাবলী/ Hunger Issues: ‘ক্ষুধামুক্তির তিনটি স্তম্ভকে’ (নারীর ক্ষমতায়ন, সকলকে সম্পৃক্তকরণ এবং স্থানীয় সরকারের সাথে অংশিদারিত্ব) এমডিজিতে তেমন গুরুত্ব দেওয়া যায় নি। জেন্ডার, ক্ষমতায়ন, এবং সকল পর্যায়ে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ইত্যাদি জটিল বিষয়গুলোকে এসডিজিতে আরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

৫) অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা/ Inclusive Goal-setting: এমডিজি নির্ধারিত হয়েছিল টপ-ডাউন প্রক্রিয়ায়, অর্থাৎ উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ ও বিশ্বনেতাদের অংশগ্রহণে। কিন্তু এসডিজি নির্ধারণে সকল পর্যায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে, যা বিশ্বে এর আগে কখনও হয় নি। প্রায় ১০০ দেশের সাথে মুখোমুখি সভা হয়েছে এবং কোটি মানুষের মতামত সংগ্রহ করা হয়েছে বিভিন্ন জরিপের মাধ্যমে।

৬) দারিদ্রতা থেকে ক্ষুধাকে আলাদাকরণ/ Distinguishing Hunger and Poverty: এমডিজিতে ক্ষুধা ও দারিদ্রকে একসাথে MDG1-এ রাখা হয়েছিল। মনে করা হয়েছিল একটি সমাধান হলেই আরেকটির সুরাহা হয়ে যাবে। কিন্তু এসডিজিতে খাদ্য এবং পুষ্টি নিরাপত্তাকে ‘দারিদ্রতা’ থেকে আলাদাভাবে দেখা হয়েছে।

৭) অর্থায়ন/ Funding: এমডিজিতে মনে করা হয়েছিল যে, ধনী দেশগুলো থেকে সহায়তা নিয়ে দারিদ্রতা দূর করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে সেটি সফলতা পায় নি। এসডিজিতে টেকসই এবং সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রধান কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাতে সংশ্লিষ্ট দেশের রাজস্ব বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

৮) শান্তি প্রতিষ্ঠা/ Peace Building: বিগত ১৫ বছরে দেখা গেছে যে শান্তিপূর্ণ এবং সুশাসনভুক্ত দেশগুলো অগ্রগতি লাভ করেছে। ১৫ বছর পর এখন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধুমাত্র বিরোধপূর্ণ দেশগুলোতেই ‘তীব্র দারিদ্রতা’ থেকে যাবে। ক্ষুধা ও দারিদ্রতাকে দূর করার জন্য তাই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। কিন্তু এটি এমডিজিতে গুরুত্ব পায় নি, এসডিজিতে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

৯) মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতা/ M&E and Accountability: পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতা সম্পর্কে এমডিজিতে কিছুই বলা নেই। এসডিজিতে ২০২০ সালের মধ্যে তথ্য বিপ্লব ঘটানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। তাতে জাতীয় পর্যায়ে মানুষের আয়, বয়স, জেন্ডার, নৃতাত্বিক তথ্য, অভিবাসন পরিস্থিতি, ভৌগলিক অবস্থান এবং অন্যান্য তথ্য সম্পর্কে মানসম্মত, সময়নিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য বিবরণ তৈরি করা হবে।

১০) মানসম্মত শিক্ষা/ Quality Education: এমডিজিতে কেবল সংখ্যার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেমন: ভর্তির সর্বোচ্চ হার, পাশের হার ইত্যাদি। তাতে সংখ্যা বাড়লেও গুণগত মান গিয়ে তলায় ঠেকেছে। কিন্তু এসডিজিতে মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে একটি ‘মানবিক বিশ্ব’ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

একনজরে এসডিজি বা বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা

১. দারিদ্র্য বিমোচন [No Poverty]: সর্বত্র এবং সবধরণের দারিদ্র্যতা দূর করা;
২. ক্ষুধামুক্তি [Zero Hunger]: ক্ষুধা দূর করা, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টি অর্জন, এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থা চালু করা;
৩. সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ [Good Health & Well being]: স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন নিশ্চিত করা এবং সব বয়সের সকলের জন্য কল্যাণ বৃদ্ধি;
৪. মানসম্মত শিক্ষা [Quality Education]: অন্তর্ভূক্তিমূলক, সমতাপূর্ণ ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষা সুযোগ সৃষ্টি;
৫. জেন্ডার সমতা [Gender Equality]: জেন্ডার সমতা অর্জন করা এবং সব নারী ও তরুণীর ক্ষমতায়ন;
৬. বিশুদ্ধ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন [Clean Water & Sanitation]: সবার জন্য পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের সুযোগ এবং এর টেকসই ব্যবস্থাপনা;
৭. ব্যয়সাধ্য ও টেকসই জ্বালানি [Affordable & Sustainable Energy]: সবার জন্য ব্যয়সাধ্য, নির্ভরযোগ্য, টেকসই এবং আধুনিক জ্বালানির সুযোগ নিশ্চিতকরণ;
৮. সবার জন্য ভালো কাজ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি [Decent Work & Economic Growth]: সবার জন্য টেকসই, অন্তর্ভূক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পূর্ণকালীন ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং ভালো কাজ নিশ্চিতকরণ;
৯. শিল্প, উদ্ভাবন ও উন্নত অবকাঠামো [Industry, Innovation & Infrastructure]: দীর্ঘস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা, অন্তর্ভূক্তিমূলক এবং টেকসই শিল্পায়ন এবং উদ্ভাবনকে প্রেরণা দেওয়া;
১০. বৈষম্য হ্রাসকরণ [Reduced Inequalities]: দেশের ভেতরে এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যকার বৈষম্য দূর করা;
১১. টেকসই শহর ও সম্প্রদায় [Sustainable Cities and Communities]: শহর এবং মানুষের বাসস্থানকে অন্তর্ভূক্তিমূলক, নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী এবং টেকসই করে তোলা;
১২. (সম্পদের) দায়িত্বশীল ব্যবহার [Responsible Consumption & Production]: টেকসই ভোগ ও উৎপাদন রীতি নিশ্চিত করা;
১৩. জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধ [Climate Action]: জলবায়ূর পরিবর্তন ও প্রভাব মোকাবেলায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ;
১৪. সমুদ্রের সুরক্ষা [Life below Water]: টেকসই উন্নয়নের জন্য মহাসাগর, সাগর এবং সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার;
১৫. ভূমির সুরক্ষা [Life on Land]: ভূমির উপরিস্থ পরিবেশ-ব্যবস্থার সুরক্ষা, পুনঃস্থাপন এবং টেকসই ব্যবহার; টেকসই বন ব্যবস্থাপনা; মরুকরণ রোধ ও বন্ধ করা; ভূমিক্ষয় রোধ করা এবং জীববৈচিত্রের ক্ষতি বন্ধ করা;
১৬. শান্তি ও ন্যায়বিচার [Peace, Justice & Strong Institutions]: টেকসই উন্নয়নের জন্য শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভূক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা; সকলের জন্য ন্যায়বিচারের সুযোগ সৃষ্টি; এবং সর্বস্তরে কার্যকর, জবাবদিহি এবং অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা;
১৭. লক্ষ্য অর্জনের জন্য অংশিদারিত্ব [Partnerships for the Goals]: বাস্তবায়নের উপায়গুলো শক্তিশালী করা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক অংশিদারিত্ব পুনর্জীবিত করা।


যেভাবে নির্ধারণ করা হয় এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা:

এমডিজি’র মতো জাতিসঙ্ঘের চারদেয়ালের ভেতরে বসে এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় নি। ২০১৫ সাল পরবর্তি সময়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় ২০১২ সালের রিয়ো প্লাস টুয়েন্টি (রিয়ো ডি জেনিরো, ব্রাজিল) শীর্ষ সম্মেলনে। সম্মেলনের ফলশ্রুতিতে ‘দ্য ফিউচার উই ওঅন্ট’ শীর্ষক ঐতিহাসিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যাকে বলা যায় এসডিজি’র রূপরেখা। তারা (১৯৩ সদস্য রাষ্ট্র) একটি ওপেন ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করে খসড়া লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করার জন্য তাদেরকে ক্ষমতায়ন করেন।

ওপেন ওয়ার্কিং গ্রুপ ৭০টি দেশের প্রতিনিধি নিয়ে এবং ১০০ দেশের সাথে মুখোমুখি সভার মধ্য দিয়ে (ওপরে বলা হয়েছে) চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা প্রণয়ন করে (২০১৫/অগাস্ট)। তাছাড়াও জাতিসঙ্ঘ ‘বৈশ্বিক কথোপকথন’, পরিবার জরিপ এবং ‘মাই ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক জরিপের আয়োজন করে। সব তথ্য ও উপাত্ত ওপেন ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রতিবেদনে যুক্ত হয়।

১৭টি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান:

সংখ্যাগরিষ্ট রাষ্ট্র এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রাগুলো নিয়ে সন্তুষ্ট (এমডিজি’র ক্ষেত্রে এটি ছিল না)। তবে ইংল্যান্ড ও জাপানসহ হাতেগুণা কয়েকটি রাষ্ট্র মৃদু দ্বিমত প্রদর্শন করেছে। কোন কোন দেশ ১৭টি লক্ষ্যমাত্রাকে খুব বেশি এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না বলে মত দিয়েছে। ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জনসমক্ষেই বলেছেন যে, তিনি ১২টিতে একমত, ১০টি হলে ভালো। তবে কোন্ লক্ষ্যমাত্রাগুলোতে তারা ‘একমত’ তা তিনি স্পষ্ট করেন নি।

জাতিসঙ্ঘের বিশেষ উপদেষ্টা (আমিনা মোহাম্মেদ) বলেছেন যে, লক্ষ্যমাত্রাগুলোকে ১৭ পর্যন্ত নামিয়ে আনতে তাদের অনেক কষ্ট হয়েছে। আরও কমানো হলে তা প্রবল বিরোধীতার মুখে পড়বে এবং নারীর ক্ষমতায়ন, সুশাসন, শান্তি ও নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়গুলো বাদ পড়তে পারে।

MDG-2015-infographic-Latif_0
[২০১২ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রোগ্রেস]
শেষকথা: আরেক ফর্দ লক্ষ্যমাত্রার কী দরকার ছিল?এমডিজি’র লক্ষ্য ও অর্জন নিয়ে যত সমালোচনাই হোক না কেন, এর মধ্য দিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে উন্নয়ন বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উন্নয়ন ইস্যুতে একতাবদ্ধ থাকার কারণে স্নায়ুযুদ্ধ (রাশা বনাম যুক্তরাষ্ট্র) স্নায়ুতেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। অর্থাৎ ২০০০ সালে এমডিজি’র পাশাপাশি শুরু হয়েছে উন্নয়নের বিশ্ব রাজনীতি। আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা। তাতে যতই রাজনীতি থাকুক না কেন দরিদ্র দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি, বরং নানাভাবে উপকৃত হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি, দ্বিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক সংস্থা গড়ে ওঠেছে যেন এমডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অপেক্ষাকৃত পিছিয়েপড়া দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়া যায়। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা এবং পুষ্টির মতো মৌলিক ইস্যুতে বিগত দেড় দশকে গরিব দেশগুলো পেয়েছে প্রচুর সহযোগিতা। এর অধিকাংশই সম্ভব হয়েছে এমডিজি নামক একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উন্নয়ন এজেন্ডা থাকার কারণে।

২০১৫ সালে শেষ হয়ে গেলো এমডিজি’র যুগ। এবার কেমন হবে? কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন, আর্থিক মন্দা, কর্মসংস্থান, মুক্তবাজার বাণিজ্য, খাদ্যাভাব, মারাত্মক রোগ ইত্যাদি ইস্যুতে বিশ্ববাসীকে আবার এক করা যায়? কীভাবে চালিয়ে যাওয়া যায় উন্নয়নের রাজনীতি? এ নিয়ে গত তিন বছর ধরে (২০১২ থেকে) হয়েছে নানা পর্যায়ের গবেষণা। বলা যায়, এমডিজি বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নিয়েছে এর সর্বাধুনিক ও সময়োপযোগী রূপ, এসডিজি। ‘এস’ মানে সাসটেইনেবল, টেকসই, স্বয়ংসম্পূর্ণ। এসডিজিকে বলা যায় বিশ্বের সার্বিক উন্নয়নে বিশ্বনেতাদের প্রতিশ্রুতিমালা, যা প্রণীত হয়েছে সকলের অংশগ্রহণে। বিগত কয়েক দশকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন কিছু হয়েছে – এবার দরকার উন্নয়নকে স্থায়ীকরণ, প্রবৃদ্ধিতে ধরে রাখা। সর্বোপরি, উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব থেকে বিশ্ববাসীকে মুক্তি দেওয়া এবং বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যাকে (নারী) অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা। দেখা যাক আগামি ১৫ বছর (২০১৬-২০৩০) কেমন যায়!

ক. পরিশিষ্ট:

*ODA: Official Development Assistance উন্নত দেশগুলো থেকে ‘সরকারি সাহায্য’, যা DACএর মাধ্যমে বিতরণ হয়। DAC/ Development Assistance Committee হলো জাতিসঙ্ঘের OECD-এর অধীন একটি সংস্থা (OECD= Organization for Economic Cooperation and Development)। ODA সহায়তা বিতরণের নির্দেশক হিসেবে বহুল ব্যবহৃত।

*MDG/এমডিজি: Millennium Development Goal বা সহস্রাব্দি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (২০০০-২০১৫)। চরম দারিদ্র্য দূরীকরণ; সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা; জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণ ও নারীর ক্ষমতায়ন; শিশুমৃত্যুর হার কমানো; মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন; এইডস ও ম্যালেরিয়াসহ মারাত্মক রোগগুলোর প্রতিরোধ; পরিবেশের ভারসাম্যতা নিশ্চিতকরণ এবং উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক অংশিদারিত্ব – এই ৮টি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এমডিজি প্রণীত হয়েছিল।

*উন্নয়নকর্মী হিসেবে এমডিজি/এসডিজি নিয়ে কিছু-না-কিছু নাড়াচাড়া করতে হয় প্রতিনিয়তই। সেখান থেকে কিছু ‘মৌলিক বিশ্লেষণ’ সহব্লগারদের পাঠের উপযোগী করে এবং পারিভাষিক শব্দ যথাসম্ভব পরিহার করে উপস্থাপন করা হলো। বাকি বিষয় খবরের কাগজে পাওয়া যাবে।

*প্রথম প্রকাশ: ০৭ ই অক্টোবর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:৩৫। সামহোয়্যারইন ব্লগ

————————————————————————–

খ. তথ্যসূত্র:

a. sustainabledevelopment.un.org [accessed on 3/Oct/2015]
b. theguardian.com/global-development [accessed on 28/Sep/2015]
c. United Nations, The Future We Want, 2012

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s