‘ব্লু চিপ’ কী – এত কেন আলোচনা?

 

1.

‘ব্লু চিপ’ জিনিসটা কী, এতো কেন আলোচনা?  কেন প্রতিটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ব্লু চিপ স্ট্যাটাস পেতে চায়।  কেন শেয়ার মার্কেটে একটি ব্লু চিপ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের এত কদর? ব্লু চিপ মানবসম্পদ ব্যবস্থানায় কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠান সকল কর্মীর জন্য একটি স্থিতিশীল সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করতে পারে? কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কেন ব্লু চিপ অর্জনের পেছনে সমস্ত অর্থসম্পদ এবং মানবসম্পদকে ঢেলি দিচ্ছে? ব্লু চিপ বিষয়টি আসলে কী। কেন এটি এত আরাধ্য, সকলের কাছে?

 

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠলো ব্লু চিপের নীল আভা। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য পরামর্শ পেতে চাইলেও চোখের সামনে ভেসে ওঠে ব্লু চিপ। সকলকিছুর উত্তম আদর্শ দিয়ে তৈরি ব্লু চিপ আমাকে আকৃষ্ট করতে থাকলো বিগত কয়েক মাস ধরে। তাতে আমি আকৃষ্ট হয়ে সবকিছু ভুলে ব্ল চিপের পেছনে ধাওয়া শুরু করলাম। ব্লু চিপ যেন এক মায়া হরিণ, যত আগাই ততই সে পিছিয়ে গিয়ে আমাকে আরও আকৃষ্ট করে। আমি আরও এগিয়ে যাই।

 

ব্লু চিপ যেন এক গুপ্ত ধন, যার পেছনে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান হুমড়ি খেয়ে লেগে আছে গোপনে! কিন্তু কেউ তা প্রকাশ করছে না।  কেউ বলছেও না কীভাবে কোন পথে তারা চেষ্টা করছে অথবা আদৌ চেষ্টা করছে কিনা। তবে প্রতিটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গোপন লক্ষ্য হলো একটি ব্লু চিপ।  পোকার খেলার নীল চাকার (ব্লু ডিস্ক) মতো এটি প্রয়োজনীয় এবং অজেয় হয়ে ওঠে সকল দুর্যোগে। দাবা খেলার মন্ত্রীর (কুইন) মতো এটি সকল পরিস্থিতিতে সক্ষম এবং নির্ভরযোগ্য। বিশ্বমন্দার আর রাজনৈতিক অস্থিরতার এই পৃথিবীতে কে না চায় একটি ‘ব্লু চিপ খচিত’ প্রতিষ্ঠান? এই পরিস্থিতিতে আমার কৌতূহল হলো, একটি ব্লগসাইট যখন ‘ব্লু চিপ স্ট্যাটাস’ লাভ করে, তখন সেটি কী কী সুবিধা পায়? প্রশ্নগুলো এভাবে বেড়েই চললো…

 

2.

এমন কি কখনও দেখেছেন যে, পণ্যের দাম যতই বাড়ে মানুষের চাহিদা ততই বেড়ে যায়?  অবশ্য যোগান কম থাকলে যে তার তুলনায় চাহিদা বেশি হবে, সেটি তো আমরা কবেই শিখেছি। এখানে বিশেষ কোন বিজ্ঞান নেই। অর্থাৎ সাপ্লাই নেই, চাহিদা দ্বিগুণ, মূল্য বেশি। এরকম পরিস্থিতির সাথে আমরা মোটামুটি পরিচিত। কিন্তু দাম বাড়লেও যে চাহিদা স্থিতিশীল থাকে অথবা বহুগুণে বাড়তে থাকে, সেরকম কোন পণ্যের নাম কি আপনার মনে পড়ে? হয়তো মনে পড়ে।

 

সেবা ও পণ্যের ‘গুণগত মান এবং দাম’ দিয়ে কোন প্রতিষ্ঠান এমন একটি ভোক্তা সমাজ গড়ে তুলেছে যে, তারা কোন অবস্থাতেই তাদের মত পাল্টাবে না। প্রয়োজনে অর্ডার দিয়ে দু’মাস অপেক্ষা করবে, তবু তার নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের জিনিসটিই চাই। আমাদের দেশে ‘বাটা’ জুতার সেরকম একটি মার্কেট গড়ে ওঠেছিল, এখনও তার কিছু চিহ্ন টিকে আছে।

 

‘…দ্য সেইম স্কয়্যার খোঅলিটি’ বলে একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান কলার ঝাঁকিয়ে বলে যে, পণ্যের গুণগত মান আগের মতোই আছে। অর্থাৎ তারা জানে যে, তাদের পণ্যের গুণ এবং বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে ইতিমধ্যেই ভোক্তারা অবগত এবং আস্থাশীল। এইরকম প্রতিষ্ঠানগুলোর না আছে স্টক মার্কেটে ধ্বংস হবার ভয়, না আছে রাজনৈতিক অস্থিরতার ভয়। বিধ্বংসী সুনামিতে তারা একটু টলতে পারে, কিন্তু পড়ে যাবার নয়।

 

এসবই হলো একটি ব্লু চিপ প্রতিষ্ঠানের গুণাগুণ।

 

সেই ১৯২৩ অথবা ১৯২৪ সালের কথা। জনৈক ওলিভার গিনগোল্ড চাকরি করতেন ডাউ জোনস নামের একটি মার্কিন প্রকাশনা ও আর্থিক তথ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানে। প্রতিষ্ঠানটি তখন একটি পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দীর্ঘস্থায়ি সুনামের অধিকারী। যা হোক, মেরিল লিন্চ নামের একটি স্টক এজেন্সিতে ওলিভার গিনগোল্ড বসে আছেন। তিনি দেখতে পেলেন যে, কোন কোন শেয়ার ২০০ অথবা ২৫০ ডলারেরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। অথচ দাম বেশি থাকলেও এর প্রতি ক্রেতাদের চাহিদা কমছে না। বিষয়টি দেখে তিনি যে বাণী দেন, সেটি থেকেই ব্লু চিপ শব্দটি ‘উৎপন্ন’ হয়। তিনি বললেন, “ডাউ জোনসে ফিরে গিয়ে আমি এই ‘ব্লু চিপ’ কোম্পানিগুলো’ নিয়ে লেখতে চাই”।

 

ব্লু চিপ শব্দটি কোথা থেকে আসলো?  পোকার খেলার প্রধান চাকাগুলো হলো সাদা, লাল এবং নীল। এদের মধ্যে নীল চাকার মূল্যমান সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ একটি হোয়াইট চিপের মূল্য যদি হয় ১ ডলার, তবে রেড চিপের মূল্য হবে ৫ ডলাল। সেখানে ব্লু চিপের মূল্য হবে ২৫ ডলার। ঠিক এই ব্লু চিপকে লক্ষ্য করে মিস্টার ওলিভার গিনগোল্ড দামি কোম্পানিগুলোর নাম নিয়েছিলেন।

 

ব্লু চিপ হল জাতীয়ভাবে স্বীকৃত, সুপ্রতিষ্ঠিত এবং আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান।  ব্লু চিপ প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত উচ্চমানের সেবা বা পণ্য উচ্চদামে বিক্রি করে, যা ব্যাপকভাবে জনসমাদৃত। এসব কোম্পানি সকল পরিস্থিতিতে টেকসই। একটি বৈরি আর্থিক পরিবেশেও তারা লাভজনকভাবে ব্যবসায় পরিচালনায় সক্ষম। এসবই তারা করতে পারে দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং ক্রেতাসমাজে আস্থাশীলতার কারণে।

 

একই অর্থ নিয়ে ব্লু চিপ শেয়ারকেও নিরাপদ শেয়ার মনে করা হয়। শেয়ার মার্কেট যতই ‘ডাউন’ থাকুক, এই শেয়ারের ধ্বংস নেই।  এর কারণ হলো, অর্থ বাজারে ব্লু চিপ স্ট্যাটাসযুক্ত প্রতিষ্ঠানের রয়েছে দীর্ঘস্থায়ি নির্ভরযোগ্যতা।  বিনিয়োগকারী ব্লু চিপ শেয়ার কিনে যেমন নিজেদের নামকে উচ্চে তুলতে পারে, তেমনি উচ্চে তুলতে পারে তাদের আর্থিক অবস্থান।

 

৩টি বিশ্ববিখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠান যাদেরকে ব্লু চিপ কোম্পানি বলে সমীহ করা হয়:

১.  ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম /BP

২.  হংকং সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন / HSBC

৩.  ব্রিটিশ অ্যামেরিকান টো্ব্যাকো

 

Advertisements

4 comments

  1. পিংব্যাকঃ ইন্টারনেট অফ থিংস: ‘বস্তুর সাথে ইন্টারনেটের সংযোগ’ কী এবং কেন? | আওয়াজ দিয়ে যাই...
  2. পিংব্যাকঃ ব্লগসাইট যেভাবে ‘ব্লু চিপ স্ট্যাটাস’ লাভ করতে পারে | আওয়াজ দিয়ে যাই...

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s