ইউটোপিয়া ডিসটোপিয়া: সুখের দেশ দুখের দেশ

ইউটোপিয়া আর ডিসটোপিয়া… সুখের দেশ দুখের দেশ


(থমাস মোরের ইউটোপিয়া)ইউটোপিয়া শব্দটি আজ কত প্রচলিত একটি ধারণা! কাল্পনিক বা প্রত্যাশিত সুখ শান্তি ও সুশাসনের দেশ বুঝাতে আমরা ‘ইউটোপিয়া’ শব্দটি ব্যবহার করি। শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন স্যার থমাস মোর তার ‘ইউটোপিয়া’ (১৫১৬) নামক গ্রন্থে। গ্রীক ও ল্যাটিন ইউটোপিয়া’র শাব্দিক অর্থ হলো নো হোয়ার যাকে বাংলায় ‘কোন জায়গা না’ বলা যায়। থমাস মোর একটি কাল্পনিক এবং নব আবিষ্কৃত দ্বীপ দেশের কল্পনা করেছেন। সেই দ্বীপ দেশের সমাজটি হবে আইন, সুশাসন ও পারস্পরিক সুসম্পর্কের প্রতীক। ইউটোপিয়ান এবং ইউরোপিয়ান শব্দাবলীর মধ্যে শুধু টি’ এবং আর’ এর ব্যবধান। মূলত ’ইউটোপিয়া’ রূপক সংলাপটিতে ইউরোপিয়ান তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার বিপরীতে ‘ইউটোপিয়ান’ সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে উপস্থাপন করা হয়। শ্রেণী বৈষম্য, দারিদ্রতা, ধর্মীয় হানাহানি, সম্পদের প্রতি অযাজিত লোভ, যুদ্ধ প্রবণতা – এসব বিষয় ইউটোপিয়াতে প্রায় অনুপস্থিত। বিপরীতে আছে পারস্পরিক সহনশীলতা, প্রচুর উৎপাদনশীলতা এবং যৌক্তিক চিন্তাচেতনার অবাধ ক্ষেত্র। চমৎকারিত্বের কষ্ঠিপাথরে তুলনা করে দেখা যায়, ইউরোপিয়ান সমাজ ও রাজনীতি কতটা বিশৃঙ্খল এবং নিম্নমানের।

 

গ্রন্থটি প্রকাশের একশ’ বছরের মধ্যে থমাস মুরের স্বপ্ন হয়ে গেলো সকলের স্বপ্ন। ইউটোপিয়া শব্দটি হয়ে গেলো ইংরেজি ভাষার অংশ। রূপক অর্থে সুসাশন ও সফল রাষ্ট্র বুঝাতে লেখকেরা স্মল লেটারেই (ইংরেজি লেখায়) ইউটোপিয়া লেখতে শুরু করেন।

ডিকশনারি ডট কমের সংজ্ঞায় ইউটোপিয়া মানে হলো: রাজনৈতিক ও সামাজিক উৎকৃষ্টতার রূপক অবস্থা।

‘ইউটোপিয়া’ গ্রন্থ থেকে স্যার থমাস মোরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা উদ্ধৃতি করছি:
সুন্দর মুখমণ্ডল কোন ব্যক্তিকে কাছে টানতে সমর্থ হলেও তাকে ধরে রাখার জন্য প্রয়োজন চরিত্র এবং ভালো স্বভাব।
কোন কিছুর মালিক না হয়েও ধনী হওয়া যায় – আনন্দ, মনের শান্তি এবং দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনের চেয়ে মূল্যবান সম্পদ আর কী আছে?
না, বর্তমান কাজটিতে মনযোগ দিয়ে একে সফল করে তুলুন। আরেকটি কাল্পনিক সফলতার বিষয়কে নিয়ে ভেবে বর্তমানটিকে নষ্ট করে দেবেন না।
যুদ্ধের বদৌলতে যে গৌরব আসে, এর চেয়ে ‘অগৌরবের’ আর কিছুই নেই।

ইউটোপিয়া নিয়ে অন্যদের চিন্তাচেতনা:
অন্যান্য জাতির জন্য ইউটোপিয়া হলো আশীর্বাদপুষ্ট এক অতীতের নাম; আমেরিকানদের কাছে দিগন্তের ওপারেই ইউটোপিয়া। (হেনরি কিসিন্জার)
আমাাদের জীবন ইউটোপিয়ার স্বপ্ন দেখে; মরণ অর্জন করে আদর্শ। (ভিক্টর হুগো)
নিজেকে জানা মানে হলো ইউটোপিয়াকে অবিশ্বাস কর। (মাইকেল নোভাক)
ইউটোপিয়াতে থাকবে প্রচুর সাইকেল লেইন। (হারবার্ট জর্জ ওয়েলস)

ইউটোপিয়া ধারণাটি প্রচলিত হবার তিনশ’ বছরের মধ্যেই বিপরীত অর্থ ধারণ করে ওঠে আসে ‘ডিসটোপিয়া/Dystopia‘ শব্দটি। কেউ বলেন এন্টি-ইউটোপিয়া, কেউ বা বলেন ক্যাকোটোপিয়া। ডিসটোপিয়া শব্দটি প্রথমে জেরেমি বেনথাম ব্যবহার করেন ১৮১৮ সালে। তিনি ইউটোপিয়ার বিপরীত অবস্থা বুঝাবার জন্য শব্দটির প্রয়োগ করেন।

২০০৫ সালের অক্সফোর্ড অভিধান অনুসারে, ডিসটোপিয়া হলো এমন এক পরিস্থিতি যেখানে সবকিছুই খারাপ এবং বিশৃঙ্খল।

.

.

.

.

.

 


(স্যার থমাস মোর)
.

.
.
———-
পরিশিষ্ট/ তথ্য সূত্র:
ক) ‘ইউটোপিয়া’ স্যার থমাস মোর (১৫১৬); লিংকে প্রেস করলে পিডিএফ কপি পাওয়া যাবে।
খ) ডিকশনারি ডট কম ও উইকিপিডিয়া।
গ) থমাস মোর (১৪৭৮-১৫৩৫): স্যার থমাস মোরকে সেন্ট থমাস মোরও বলা যায়। ইংল্যান্ডের ক্যাথোলিক চার্চ ১৯৩৫ সালে তাসে ‘সাধু’ হিসেবে ক্যানোনাইজ করে। থমাস মোর ছিলেন ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি’র গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। কিন্তু ইংল্যান্ডের চার্চের অভিভাবক হিসেবে রাজাকে মেনে নিতে রাজি হন নি থমাস মোর। এজন্য রাজদ্রোহীতার অভিযোগ দিয়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় (১৫৩৫)। ফলে ইংল্যান্ডের চার্চগুলোর কাছে তিনি একজন সংস্কারবাদী শহীদ। প্রধানত ‘ইউটোপিয়া’ গ্রন্থটির জন্য তিনি সর্বমহলে পরিচিত।

.

.
*ছোট্ট লেখাটি প্রথমে প্রথম আলো ব্লগে প্রকাশ পেয়েছিলো। ব্লগটি বন্ধ হবার পথে।
Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s