ভিয়েতনামি কন্যার গ্রাজুয়েট হয়ে ওঠার কাহিনি

তাইতি নুয়েন। বয়স বিশ। ভিয়েতনামের মেকং ডেল্টা এলাকার এক হতদরিদ্র পরিবারের নয় সন্তানের অষ্টম সন্তান। দরিদ্রতা এবং নিজ পরিবারের সাথে এক প্রকার যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত গ্রাজুয়েট ডিগ্রি অর্জন করেন এই অসাধারণ নারী। ভূষিত হন নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর ‘গ্রাজুয়েট অভ্ দ্য ইয়ার’ খেতাবে। তাইতি তার গ্রামেরও প্রথম গ্রাজুয়েট।

একাধিকবার বই পুড়িয়েও পড়াশুনা থেকে মন ফেরাতে পারেন নি তাইতি’র মা। তাই স্নাতক সনদ অর্জনের কাজটি খুব সহজ ছিল না তার জন্য। প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ হবার পরই পড়াশুনা বন্ধ করে দিয়ে হো-চি-মিন শহরে গিয়ে কাজের মেয়ের কাজ নিতে হয় তাইতিকে।

অষ্টম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় তাইতি’র মা তার সব বই পুড়িয়ে দেন। উদ্দেশ্য, তাইতিকে পড়াশুনা থেকে মন সরিয়ে কাজে পাঠানো। অভাবি মাকে দোষারোপ করে নি তাইতি। বরং তার তার বাধাকে প্রেষণা হিসেবে নিয়েছে। অন্যদের থেকে ধার করে পড়েও তাইতি পরীক্ষায় ভাল ফলাফল ধরে রাখে।

দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ার সময় আবারও বই পুড়িয়ে দেন তার বাবা-মা। এখানেও তারা বাধা হতে পারেন নি। দ্বাদশ শ্রেণী পাশ করে তাইতি গোপনে কলেজে ভর্তির জন্য পড়তে থাকে। কিন্তু মা-বাবা ভেবেছিলেন, হয়তো এপর্বে এসে তাইতি সংসারের হাল ধরবে। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় একদিন মা’র চোখে ধরা পড়ে যায়। তাতেই মা তাকে রাগ করে বলেন, “দেখিস তুই পরীক্ষায় ফেইল করবি!”

কলেজে ভর্তি পরীক্ষার দিন যেখানে অন্য সকল ভর্তিচ্ছু ছেলেমেয়ের মা-বাবা এসেছেন সাহস দেবার জন্য, তাইতি’র মা তাকে পাঠিয়েছেন নির্মম এক অভিশাপ দিয়ে! কিন্তু মায়ের অভিশাপ আশির্বাদ হিসেবে কাজে এসেছিল তাইতি’র জন্য। কলেজে পড়াশুনার সুযোগ সে পেয়েছিল।

এত কিছুর পরও পরিবারের সহায়তা ছাড়া তাইতি’র কলেজে পড়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু ছাত্রজীবনের অর্থ সংগ্রহের একটি সুযোগও হাতছাড়া করে নি । কাজ করেছে বিভিন্ন কারখানায়। সাপ্তাহিক ছুটি, নববর্ষের ছুটি অন্য সকল শিক্ষার্থীর জন্য আনন্দের বিষয় হলেও, তাইতি সেটিকে কাজ করে অর্থ উপার্জনের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছে। হাঁসের সুপের দোকানে কাজ করেছে রাত দু’টা অবধি। ভিয়েতনাজের নববর্ষ উদযাপনের রাতে সকলে যখন আনন্দ উৎসব আর আতশবাজি ফুটানোয় ব্যস্ত, তখন কর্মব্যস্ত তাইতি শুধু দূর থেকে একবার তাকানোর সুযোগ পেতো।

কলেজ পর্যায়ে তাইতি চরম কৃচ্ছ্রতা আর মিতব্যয়ীতায় জীবন অতিবাহিত করেছে। বাংলাদেশি পাঁচশো টাকায় তার সপ্তাহের থাকা-খাওয়া চলতো। অপুষ্টিতে ভোগেছে এবং ক্লাসে একাধিকবার জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাবার ঘটনাও তার আছে। সহপাঠি এবং শিক্ষকেরা টের পেলেন যে, তাইতি না খেয়ে থাকে এবং তার খরচের টাকা নেই! এটি তার আত্মসম্মানকে আঘাত করলেও পরবর্তিতে তার ক্লাসমেট এবং শিক্ষকেরা তাকে অনেক সাহায্য করেছে।

একটি ছোট কক্ষে আরও দু’জন শিক্ষার্থীর সাথে তাইতি থাকতো। টেবিল ল্যাম্প লাগিয়ে কাউকে বিরক্ত না করে অর্ধরাত পর্যন্ত পড়াশুনা করতো সে। একটি সমাজকল্যান সংস্থা তার সাহায্যে এগিয়ে আসায় তাকে পরবর্তিতে না খেয়ে মারা যেতে হয় নি। তারা তাকে একটি সাইকেলও দিয়েছিলো – তাতে তার যাতায়াত খরচ বাঁচতো।

‘একটি ছেলেকে শিক্ষিত করলে একজন মানুষ শিক্ষিত হয়, কিন্তু একজন মেয়েকে শিক্ষিত করলে একটি গ্রাম শিক্ষিত হয়।’ নারীর শিক্ষা একজনের মধ্যে শেষ হয় না – একথাটি তাইতি’র ক্ষেত্রে আরও সত্য। সে পরবর্তিতে তার ছোট ভাইবোনদেরকেও তাদের আগ্রহ ও অবস্থানমতো পড়াশুনা করে ভালো কাজের সন্ধান দিয়েছে। তার জেলে ভাইকে কলেজে ভর্তি করিয়েছে।

তাইতি’র স্বপ্ন ইংরেজি শিক্ষক হওয়া। মা-বাবা যখন দেখতে পেলেন যে, তাইতি খুব শিঘ্রই একটি ভালো-বেতনের চাকরি পেতে যাচ্ছে, তারা তখন তাকে বুঝতে শুরু করেছেন। এরপর থেকে তার ইচ্ছাকেও মূল্য দিতে শুরু করলেন।

বর্তমানে তাইতি তার নিজ গ্রামের শিশুদের শিক্ষার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। সে শিক্ষার পক্ষে জনমত তৈরি করতে চায়। ‘আমি মানুষের ধারণা বদলে দিতে চাই’ এ হলো তার কথা। ‘এভাবেই আমি আমার সমাজকে প্রতিদান দিতে চাই।’ আমাদের সমাজেও এরকম ঘটনা অনেক হয়তো আছে। কত রকমের সামাজিক এবং পারিবারিক বাধাকে জয় করে একটি মেয়েকে জিপিএ-ফাইভ পাচ্ছে, হয়তো সকলে তার খবর রাখি না। তাইতি তাদের সকলের জন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে।

.

.

[প্রথম প্রকাশ এবং পাঠক প্রতিক্রিয়া]

———————-
*নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে। নিবন্ধটি পড়েই বুকমার্ক করে রেখেছিলাম। জানি না বাংলাদেশি কোন পত্রিকায় খবরটি এসেছে কিনা। এশিয়ার দেশগুলো নারীর ওঠে আসার সংগ্রাম প্রায় একই।

নারী অধিকার সংশ্লিষ্ট অন্যান্য লেখাগুলো:
Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s