ব্লগার/অনলাইন একটিভিস্ট হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের উপায়

ব্লগিং নিয়ে আমার কিছু প্যাচাল

ব্লগিং নিয়ে আমার কিছু প্যাচাল

ফ্রান্সিস বেইকনের ভাষায়, “কিছু লেখা চেখে দেখার জন্য, অন্যগুলো গিলে খাওয়ার জন্য আর সামান্য কিছু লেখা আছে যা চিবিয়ে খেয়ে হজম করতে হয়।” হজম করার মতো লেখা যারা দিতে পারেন, তাদের আর চিন্তার কিছু আছে? পশ্চিমা দেশগুলো ব্লগিং করে জীবিকা অর্জন করছে এরকম ব্লগারের সংখ্যা গুণা যায় না। এখানে পুরোপুরি হুমায়ূন বা খুশবন্ত শিং হবার প্রয়োজন নেই। বরং তা হতে চেষ্টা করলেই বিপথে যাবার সম্ভাবনা আছে, কাকের কোকিল হবার চেষ্টার মতো। দরকার শুধু ব্লগার হবার।

ব্লগিং ক্রেডিবিলিটি কী ও কেন

প্রতিদিন লেখা হচ্ছে মিলিয়ন মিলিয়ন ব্লগ, প্রকাশিত হচ্ছে আর আরকাইভ হচ্ছে; কিন্তু কেউ কি খেয়াল করেছেন, কতগুলোর কথা মানুষ মনে রেখেছে? অথবা আবার ফিরে গিয়ে পড়ে এসেছে, বা অন্য জায়গায় এর উল্লেখ করেছে, ব্যবহার করেছে? বাংলা ভাষায়ই হাজার হাজার ব্লগের সৃষ্টি হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে কিছু কিছু ব্লগার অন্যদের মনে স্থান করে নিয়েছে, দখল করে নিয়েছে হৃদয়ের একটুখানি জায়গা – এই অশরীরী পৃথিবীর মধ্যেই। পুরোটাই দৃশ্যমান বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল, স্পর্শ করে বা ‘লাইভ’ দেখে যাচাই করার কোন প্রয়োজন নেই।

একজন ব্লগার যখন পাঠকের মনোভাব ও তার দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাব সৃষ্টি করে, তখন অবচেতনে তার লেখার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তার লেখা এবং মন্তব্যে ফুটে ওঠে সৃজনশীলতা। অন্য দশজন ব্লগার বা অনলাইন একটিভিস্ট যেসব ভুল করেন, সেগুলো থেকে তিনি স্বভাবগতভাবেই মুক্ত। তখন বলা যায় তিনি ব্লগিং ক্রেডিবিলিটি (blogging credibility) অর্জন করেছেন। পেয়ে গেছেন লেখার জন্য একটি নিশ্চিত নিরাপদ বিষয়। পাঠক যে রকমের লেখার প্রতি বেশি আগ্রহী, সেবিষয়ে যার দক্ষতা আছে, তার তো আর কিছুরই প্রয়োজন নেই। আবার লেখার বিষয়, ধরণ ও গুণগত মান দিয়ে কোন ব্লগার পাঠক সৃষ্টি করে চলেছেন, ঠিক তার মতো করে। উভয়েরই ফলাফল অভিন্ন: ব্লগে নিরাপদ স্থান (niche)।

কীভাবে ব্লগিং ক্রেডিবিলিটি অর্জন করা যায়

কোন ব্লগারের লেখার ‘বিষয় ও ধরণের’ প্রতি সাধারণ পাঠকের আস্থাকে ব্লগিং ক্রেডিবিলিটি বলা যায়। কোন কোন ব্লগার পোস্ট দিলেই সেখানে পাঠক গিয়ে ঝাপিয়ে পড়েন, অথবা তিনি কিছু নির্দিষ্ট পাঠক সকল ব্লগ পোস্টেই পেয়ে থাকেন। এরকম অবস্থাকে সাধারণভাবে ব্লগিং ক্রেডিবিলিটি বলা যায়। কথা হলো, কীভাবে ব্লগিং ক্রেডিবিলিটি অর্জন করা যায়? এবিষয়ে কোন ওয়ান-স্টপ সমাধান নেই। নানা জনের নানা কৌশল। সবচেয়ে বড় কৌশল হলো ভালো কিছু লেখা, নিশ্চিত হয়ে লেখা এবং সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা কথাটিকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা। অন্যভাবে বলা যায়, পাঠককে উচ্চতর স্থানে রাখা এবং তাকে হেয় জ্ঞান না করা।
.

.
বিষয়টি নিয়ে পাঠকের কৌতূহল নিবৃতির জন্য ব্লগিং ক্রেডিবিলিটি অর্জনের দু’একটি জনপ্রিয় এবং পরীক্ষীত পদ্ধতি উল্লেখ করছি। আমি একে কৌশল বলছি না, কারণ কৌশলের সাথে কেন যেন ধূর্ত শট প্রতারক ইত্যাদি এট্রিবিউট চলে আসে। আস্থা অর্জনকারী ব্লগারদের মধ্যে এগুলোর স্থান খুব একটা নেই।

ক) প্রতিদিন হাবিজাবি পোস্ট না দিয়ে মানসম্মত লেখা দিন:
নিজের সাথে একটি গোপন চুক্তিতে আসুন। তা হলো, আপনি যে বিষয়ে লিখবেন, শপথ নিন যে তাতে ষোলআনা জেনে শুনেই লিখবেন। অথবা যা জানেন মানেন এবং বুঝেন সেগুলো দিয়েই লিখতে শুরু করবেন। প্রতিদিন পোস্ট দেবার বালখিল্য তাগিদে হাবিজাবি পোস্ট দেবেন না। অন্যের ব্লগ পড়া এবং মন্তব্যদানের ক্ষেত্রেও সাশ্রয়ী হোন। দেখে শুনে বুঝে মন্তব্য দিন। অযাচিত পরামর্শ দেবেন না বা কারও মনোভাবকে আঘাত করে মন্তব্য দেবেন না। এরকম আরও কিছু বিষয়, কমন সেন্স দিয়ে ভাবলেই বুঝা যায়। ওই ধরণের বিষয়গুলো নিয়ে নিজেকে সংযত রাখুন।

খ) আসল ‘আপনাকে’ তুলে ধরুন: 
লেখায় আসল আপনাকে তুলে ধরুন। ব্যক্তিগত হোন। নিক আপনার যা-ই হোক, মানুষ এখনও বিশ্বাস করে যে, রোবটেরা ব্লগিং শুরু করে নি। ‘ভেতরের মানুষটি’ প্রত্যেকেরই অনেক ভালো, গুডি বয় অথবা গার্ল! সামাজিক ও বাহ্যিক কারণেই ইগো তৈরি হয়। অন্যকে অনুকরণ করার প্রয়োজন নেই। আপনার নামেই ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করুন। আপনার ‘আপনাকে’ তুলে ধরুন। ব্লগিং ছাড়া অন্য কোন এজেন্ডা না থাকলে, প্রোফাইলে যতটুকু সম্ভব আপনাকে জানতে এবং বুঝতে দিন। লেখা ও মন্তব্যে নিজস্ব বিশ্লেষণ তুলে ধরুন।

গ) সাংগঠনিক আস্থা অর্জন করুন এবং সামাজিক মাধ্যমগুলোতে সরব থাকুন:
একই ধরণের লেখা লেখেন, একই রকমের ভাবেন – এমন ব্লগারদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করুন। মদনের লেখা চন্দনের পছন্দ। এদিকে চন্দনের বন্ধু হওয়ার সুবাদে সুমনও একদিন মদনের লেখায় ক্লিক করতে শুরু করলো। এভাবে একদিন সুমনের বন্ধু রোমনের চোখে পড়লো মদনের লেখা। ভালো ব্লগার হবার জন্য সেলিব্রিটি হবার প্রয়োজন নেই, তবে লেখার মাধ্যমে অন্যের সাথে ভাবের বিনিময় করুন। আন্তরিকতা, যদি থাকে, তবে প্রকাশ করুন নির্দ্বিধায়।

ঘ) কন্ট্রোল ইয়োর আঙ্গুল – আঙ্গুল দিয়ে বিষ ছড়াবেন না! 
বাস্তবিক জীবনে সবাই যেখানে মেজাজ দমন নিয়ে চিন্তিত, সেখানে শুধু আঙ্গুল দমন করেই আপনি কিন্তু মহাত্মা ব্লগারে রূপান্তরিত হতে পারেন। চোখের দেখা হয় না বলে অনেকেই চশমখোর হতে পারেন, শুনিয়ে দিতে পারেন দু’টি শক্ত কথা। আপনার মেজাজটাও খিটমিট করবে, লিখে দিতে তার যথাযথ উত্তর। কিন্তু থামুন, যা লেখবেন তা-ই রয়ে যাবে – বয়ে যাবে আপনার বদমেজাজের সাক্ষ্য। যা ভাবছেন, তা যদি নেতিবাচক হয়, তবে যত সঠিকই হোক না কেন সেটিকে ওল্টে প্রকাশ করুন আপনার কম্পিউটারের স্ক্রীনে। শুধু দু’টো আঙ্গুলকে সংযত হয়ে ব্যবহার করলেই দেখুন কী চমৎকার ফল!

ঙ) লিখিত বক্তব্য চড়ে বসে – থিংক বিফোর ইউ ক্লিক!
Verba volant, scripta manent. এটি একটি ল্যাটিন প্রবাদ যার অর্থ হলো অনেকটা এরকম “মৌখিক বক্তব্য ওড়ে যায় – লিখিত বক্তব্য চড়ে বসে।” লিখিত বক্তব্য সাজিয়ে লিখুন, পলিশ করুন। মুখের কথা অনেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, কিন্তু লেখা শুদ্ধ করা যায়, মুছে দেওয়া যায় এবং সম্পাদনা করা যায়। লেখা পোস্ট দেবার সময় শেষ ক্লিকটি করার পূর্বে দেখে নিন, আপনার লেখায় মানবতা সত্য সৃজন সুন্দর আর ভালোবাসা আছে কিনা। শুভ ব্লগিং!

.

.

ব্লগার হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতা বা গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করা একটি সময় সাপেক্ষ এবং ধৈর্যের বিষয়। ভালো লেখা এবং ভালো মন্তব্য দিতে পারলে, স্বল্পতম সময়ে েএকটি পরিচিতি প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। সাইবার বিশ্বে নিজের নামে একটি ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে পারলে, এটি আপনার জীবিকা অর্জনের মাধ্যম হতে কতোক্ষণ!

_______________________________________________________________________________________

*প্রথম আলো ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া

 

এবিষয়ে প্রাসঙ্গিক লেখাগুলো

১)) নেটিকেট বা ইন্টারনেটের আচার-ব্যবহার

২)) অন্যের পোস্টে সৃজনশীল মন্তব্য দেবার ১০ উপায়

৩)) অনলাইন পোস্টে কীভাবে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করবেন?

Advertisements

One comment

  1. পিংব্যাকঃ Netiquette বা ‘সাইবার জগতের আচার-ব্যবহার’ কেমন হওয়া উচিত? | আওয়াজ দিয়ে যাই...

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s