২১ রকমের ব্লগার: আপনি কেন ব্লগিং করেন?

ব্লগিং নিয়ে আমার কিছু প্যাচাল

ব্লগিং নিয়ে আমার কিছু প্যাচাল

একজন জৈষ্ঠ ব্লগারের কেইস স্টোরি তুলে ধরছি যিনি একসময় বাংলা ব্লগোস্ফিয়ারকে মাতিয়েছিলেন তার ‘চতুর্মাত্রিক ব্লগিং উপস্থিতি’ দিয়ে। তার মন্তব্যগুলো বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায়, তিনি অগণিত মন্তব্য করতেন প্রতিদিন এবং প্রায় প্রতিটি ব্লগপোস্টে। ২০০৮-২০০৯ সালে তিনি চরম হিট একজন ব্লগার ছিলেন এবং তিনি পোস্ট দিলেই মন্তব্যে ইমোতে ভরে যেতো। পোস্ট ৯২০, মন্তব্য পেয়েছেন ৯০৩৫, মন্তব্য করেছেন ১১২১০, তিনি ব্লগিং করছেন ৪বছর ৩মাস ধরে। একটি ব্লগে তার শেষ দু’বছরের পরিসংখ্যান এরকম: ২০১১ তে ৮১ পোস্ট এবং ২০১২ তে ১৩ পোস্ট। তিনি গত ৮মাস ধরে কোন পোস্ট দিচ্ছেন না। মন্তব্যও করছেন না। তিনি ব্লগের ইহজগতে আর নেই! আসার সম্ভাবনাও খুব একটা দেখছি না। আমি খুব কৌতূহলী হয়ে দেখলাম বড়ভাইয়ের বিদায়ের কারণটি কী? দয়া করে কেউ তার নাম জিজ্ঞেস করবেন না।

তার ব্লগধাম ত্যাগ করার প্রধান কারণ হিসেবে আমি যা দেখেছি তা হলো, নিজস্ব কোন বিষয় ছিলো না তার লেখার। তিনি স্বভাবগতভাবে লেখক বা কবি নন। প্রবাসীও নন যে দেশের মানুষের সাথে ভাব-বিনিময়ের কোন আলাদা আকুতি থাকবে। হরেক রকমের লেখা নিয়ে তিনি হাজির হতেন এবং প্রায় প্রতিটি পোস্টেই প্রচুর হিট পড়তো, শুধু হিট পড়তো না তার মনে, কারণ ব্লগিং করার কোন উদ্দেশ্য বা প্রতিশ্রুতি ছিলো না তার। মূলত তিনি ফেইসবুকের স্ট্যাটাস দিতেন ব্লগপোস্টের মাধ্যমে। তিনি একজন উন্নতমানের ফেইসবুকার, যিনি ফেইসবুকের স্ট্যাটাস লিখতেন বাংলায় এবং বিস্তৃতভাবে। মজার মজার ছবি যুক্ত করে তিনি সহব্লগারদেরকে বিনোদিত করতেন। ব্লগোজগৎ ত্যাগ করার পেছনে হয়তো তার সাংসারিক বা জাগতিক ব্যস্ততা থাকতে পারে। তবে তার প্রোফাইল অনুসন্ধান করে এরকম একটি উপসংহারে আসা যায় যে, ব্লগিং-এর জন্য আলাদা কোন উদ্দেশ্য তার ছিলো না একান্তই বিনোদন ছাড়া। (এখন আমি আমারে নিয়া চিন্তাইতেছি! আমিও কি তবে কয়েকদিন পরে ‘নো মোর’ হয়ে যাবো?)

লক্ষ্য ছাড়া লেখা বেশিদিন এগোয় না। উদ্দেশ্যবিহীন যাত্রা গন্তব্যে পৌঁছানোর তাগিদ থাকে না – পৌঁছালেও বুঝতে পারা যায় না। উদ্দেশ্যবিহীন ব্লগিং করলে একসময় দেখা যাবে এটি আর ভালো লাগছে না। কবি-সাহিত্যিকদের কথা আলাদা – তারা তো নিজের অভ্যন্তর থেকেই অনুপ্রাণিত লেখক। লেখার বিষয় এবং পাঠক যদি আপনার নির্দিষ্ট করা থাকে, তবে কে আপনার লেখনীকে বন্ধ করতে পারে? পরবর্তি অনুচ্ছেদগুলোতে ব্লগারের উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করা হলো। এবিষয়ে সহব্লগারদের মতামতের খুব দরকার।

ব্লগিংয়ের উদ্দেশ্য

ব্লগিং এখন আর দিনপঞ্জিতে সীমাবদ্ধ নয় সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ২০১২ সালের ব্লগ ডে’তে বলা হয়েছে: ব্লগিং হলো আগামি দিনের গণমাধ্যম – আগামি দিনের নয় সেটা আজই হয়ে গেছে। ব্লগাররা আজকাল উন্নত লেখা ও লেখার মান দিয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করছেন এবং তাদের বিষয়ে জনমত সৃষ্টি করে চলেছেন।

একজন পেশাদার ব্লগার নিয়মিত লিখে যাচ্ছেন সমাজ সংসার দৈনন্দিন জীবন রাজনীতি অর্থনীতি পরিবেশ অধিকার আর প্রকৃতি নিয়ে। ব্লগ পোস্ট দিয়ে তারা অবগত করছেন, অনুপ্রাণিত করছেন, উজ্জীবিত করছেন, সচেতন করছেন, সঞ্জীবিত করছেন এবং জাগিয়ে তুলছেন পাঠককে। লেখার আবেদন দিয়ে তারা একত্রিত করছেন, সংগঠিত করছেন আর সমাজ পরিবর্তনের আহ্বান জানাচ্ছেন। তাদের ব্লগসাইটকে অগণিত পাঠক বুকমার্ক করছেন, পড়ছেন, মন্তব্য দিচ্ছেন, প্রিন্ট করছেন আর অন্যত্র রেফার করছেন। একজন পেশাদার ব্লগার নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠছেন। পত্রিকা তার অনুমোদন হারাচ্ছে বা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ব্লগার টিকে আছেন সগৌরবে! আমরা কি ‘সেইরহোম’ একজন ব্লগার হয়ে ওঠতে পারি না?
ব্লগারদের উদ্দেশ্যভিত্তিক শ্রেণীবিভাগ

নিচে প্রচলিত কিছু ব্লগারের একটি ‘বানানো শ্রেণীভেদ’ উপস্থাপন করা হলো। এতালিকার উদ্দেশ্য হলো পারপাস-ড্রিভেন ব্লগারদেরকে খুঁজে বের করতে সাহায্য করা। পাঠকের কাছেই থাকলো এ দায়িত্বটি। সকলেরই একটি উদ্দেশ্য আছে, কারও উদ্দেশ্য ক্ষণস্থায়ী আবার কারও উদ্দেশ্য সুদূরপ্রসারী।

ব্লগারদের প্রকারভেদ: ফেব্রুয়ারি ২০১৩ পর্যন্ত হালনাগাদ!

ব্লগারদের প্রকারভেদ: ফেব্রুয়ারি ২০১৩ পর্যন্ত হালনাগাদ!

১) রাজনৈতিক ব্লগার: তারা একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করেন অথবা নিরপেক্ষভাবে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেন।
২) পরিব্রাজক ব্লগার: ভ্রমণপিপাসু ব্লগার, যিনি জীবনের অধিকাংশ সময় ভ্রমণে কাটাতে চান।
৩) ফটোগ্রাফার ব্লগার: পেশাদার/অপেশাদার আলোকচিত্রী, তিনি প্রকৃতি ও জীবনকে তুলে ধরেন পাঠকের জন্য।
৪) দিনলিপি ব্লগার: দৈনন্দিন জীবনের ঘটনা প্রবাহ নিয়ে ব্লগিং করেন এবং নিজের অন্তঃদৃষ্টি দিয়ে অন্যকেও আলোকিত করেন।
৫) পারিবারিক ব্লগার: পারিবারিক জীবন নিয়ে তিনি লিখতে শুরু করেন, টিকে থাকতে পারলে এখান থেকেই লেখক!
৬) বিপ্লবী ব্লগার: একটি রাজনৈতিক বা সামাজিক মতাদর্শ নিয়ে জ্বালাময়ী লেখা দিয়ে পাঠকের মনে বিপ্লব সৃষ্টিতে সচেষ্ট।
৭) আইটি ব্লগার: প্রযুক্তির সর্বশেষ আপডেট দিয়ে তিনি পাঠককে হালনাগাদ করেন।
৮) দার্শনিক ব্লগার: ধর্ম বিশ্বাস অবিশ্বাস নিয়ে তারা লেখেন, যদিও সকল ব্লগে তাদের স্থান হয় না।
৯) সাংবাদিক ব্লগার: নিত্য-নতুন সংবাদ নিয়ে আসেন পাঠকের কাছে, যার অনেক সংবাদ প্রচলিত মাধ্যমে পাওয়া যায় না।
১০) সংবাদ-বিশ্লেষক ব্লগার: চাঞ্চল্যকর বা চলমান ঘটনাবলীর নিজস্ব বিশ্লেষণ দিয়ে পাঠককে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন।
১১) নিউ আইডিয়া ব্লগার: প্রযুক্তি বা সামাজিক সমস্যা সমাধানে নতুন ধারণা বা নতুন আবিষ্কার নিয়ে লেখেন তিনি।
১২) প্রবাসী ব্লগার: প্রবাসী জীবন নিয়ে মূলত লেখেন, তবে তাদের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে স্বদেশের মানুষগুলোর সাথে ভাব বিনিময়।
১৩) লেখক ব্লগার: স্বভাবগতভাবে কবি গল্পকার প্রবন্ধকার ছড়াকার গীতিকার অথবা ঔপন্যাসিক, যিনি ব্লগিংকে পাঠকসৃষ্টি বা পাঠযোগ্যতা যাচাইয়ের উপায় হিসেবে দেখেন।
১৪) অধিকার-কর্মী ব্লগার: শিশু নারী ও মানুষের মৌলিক অধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বিগ্ন, যার লেখায় পাঠক সচেতন হন নিজের অধিকার সম্পর্কে।
১৫) নারীবাদী ব্লগার: অধিকারকর্মী থেকে তারা একটু ব্যতিক্রম এজন্য যে তারা একটু বেশি আগ্রাসী, একটু বেশি প্রতিক্রিয়াশীল।
১৬) পুরুষবাদী ব্লগার: লেখায় কৌতুকে দৃষ্টান্তে ফুটে ওঠে নারীর প্রতি অবজ্ঞা, নারীর অস্তিত্বে অসম্মান, তাদের পোস্টে বেশি হিট পড়ে।
১৭) সাংগঠনিক ব্লগার: এরা স্বভাবগতভাবে সাংগঠিনক মানসিকতাসম্পন্ন। একটি সমস্যার সমাধানে মানুষ জড়ো করতে তারা ওস্তাদ।
১৮) ফেইসবুক ব্লগার: এরা প্রচলিত অর্থে ব্লগপোস্ট দেন না, স্ট্যাটাস দেন একটু বিস্তারিতভাবে। সেখানে ছবিও থাকে। মূলত ফেইসবুকিং তাদের উদ্দেশ্য।
১৯) ছাত্র ব্লগার: শিক্ষার্থী ব্লগার, হয়তো এখনও ছাত্র – বন্ধুদের দেখাদেখি ব্লগিং শুরু করেছেন, ছাত্রজীবন শেষে হয়তো ব্লগিং শেষ হবে নয়তো ব্লগিং-এর রকম বদলাবে।
২০) বন্ধু-সন্ধানী ব্লগার: তাদের বন্ধুর খুবই অভাব, ব্যক্তিগত জীবনে বড্ড একাকী! ব্লগপোস্ট দেবার চেয়ে একজন ‘মনের মানুষ’ অনুসন্ধান করা তাদের মূল উদ্দেশ্য। বন্ধু লাভ করার পর ব্লগিং একটি ঐতিহাসিক বিষয় হিসেবে সংরক্ষিত হয়।
২১) আজাইরা ব্লগার: কোন কারণ নেই ব্লগিং করার: কীভাবে-কীভাবে এখানে এসে পড়েছেন তারা নিজেরাই জানেন না। অথবা জানেন কিন্তু মানেন না। তাদের পোস্টের সংখ্যা সন্দেহজনকভাবে কম। “আমি লেখতে জানি না পড়তে জানি” অথবা “ব্লগে আমি নতুন” এরকম টাইপের একটি পোস্ট দিয়ে তারা হাওয়া হয়ে যান, অথবা ক্যাচালের জন্য থেকে যান। কোন কোন অতি-অভিজ্ঞ ব্লগার এরকম একটি ‘আজাইরা নিক’ রেখে দেন দুর্দিনের জন্য!

*সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপিত উপরোক্ত শ্রেণীভেদ নিয়ে ইচ্ছেমতো পর্যালোচনার করার আমন্ত্রণ থাকলো। আরও কিছু প্রকার যুক্ত করারও সুযোগ থাকলো।

শেষ কথা

ব্লগিং নিয়ে বিগত কয়েকটি লেখায় পাঠকের প্রশ্ন দ্বারা দারুণভাবে আক্রান্ত ও চিন্তিত হয়েছি। সহব্লগারদের মন্তব্য এবং টিপ্পনি উভয়ই আমাকে আরও দায়িত্বশীল হতে সাহায্য করেছে। সকল মন্তব্যকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। বিগত কয়েকটি পোস্টে চেষ্টা করেছি গুণগতমান সম্পর্কে সহব্লগারের মনে অন্তত একটি বেদনা সৃষ্টি করতে। ব্লগিংএ ‘সচেতন জনগণের’ অংশগ্রহণ থাকলে সত্যিকারভাবেই দেশে একটি গণমুখী শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে এবং জবাবদিহি হবে রাষ্ট্রযন্ত্রগুলো। এজন্য ব্লগারদেরকে তাদের দায়িত্ব ক্ষমতা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া অতি জরুরি। প্রতিদিন ব্লগে নতুন নতুন নিক নিবন্ধিত হচ্ছে। তাদেরকে যেমন পেশাদারিত্ব অর্জন করতে হবে, টিকে থাকাও তেমনি জরুরি। টিকে থাকার জন্য দরকার নিজের একটি উদ্দেশ্য ও একটি প্রতিশ্রুতি!

.

.

এবিষয়ে প্রাসঙ্গিক লেখাগুলো:

১)) ব্লগার/ অনলাইন লেখক হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের উপায়

২)) সাইবার জগতে কীভাবে করবেন আচার-ব্যবহার?

৩)) ভারচুয়াল সমাজে কীভাবে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করবেন?

৪)) সৃজনশীল মন্তব্যের ১০ উপায়

 

** প্রথম আলো ব্লগে পাঠক প্রতিক্রিয়া **

cropped-11111-crop

Advertisements

6 comments

  1. পিংব্যাকঃ Netiquette বা ‘সাইবার জগতের আচার-ব্যবহার’ কেমন হওয়া উচিত? | আওয়াজ দিয়ে যাই...
  2. পিংব্যাকঃ উত্তম ব্লগ পোস্ট তৈরিতে ৫টি প্রশ্ন | আওয়াজ দিয়ে যাই...

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s