“তোমার রূপ সম্পর্কে অনেক গুজব শুনিয়াছি…”

হোমারের ‘দি ইলিয়াড’

হোমারের ‘দি ইলিয়াড’

রাজপুত্রদ্বয় প্যারিস ও হেক্টর গ্রিস হইতে ফিরিয়া আসিয়াছেন একজন নারীকে নিয়া। সমস্ত ট্রয় নগরিতে সাড়া পড়িয়া গেলো। মানুষের কলরবে গমগম আওয়াজ! রাজপুত্র প্যারিস এ কী করিলো! শেষে এক বিবাহিতা মহিলাকে গ্রহণ করিলো! আর বড়ভাই হেক্টর তাহা মানিয়া নিলো? এইবার গ্রিকদের রোষাণলে পড়িয়া ট্রয় ধ্বংস হইবার পথে! রাজা প্রাইয়াম এইবার কী বলিবেন তাহার প্রতিক্রিয়া জানিবার জন্য সকলেই উদগ্রীব হইয়া আছে। কী বলিলেন রাজা প্রাইয়াম?

দৃশ্য – ট্রয় রাজের দরবারের প্রধান ফটক। সকলকে নিয়া প্রস্তুত হইয়া আছেন রাজপুত্রদেরকে অভ্যর্থনা জানাইবার জন্য। প্যারিস এবং হেক্টরকে গ্রহণ করিলেন সহাস্যে। হেলেনকে দেখিয়া রাজাসুলভ গাম্ভির্য্যে প্রাইয়াম বলিলেন:

“তোমার রূপ সম্পর্কে অনেক গুজব আমি ইতিপূর্বে শুনিয়াছি। গুজব যে সত্য হয় এই প্রথম দেখিলাম।” এই বলিয়া তিনি রাজা মেনেলাউসের স্ত্রী হেলেনকে নিজের পুত্রের ভবিষ্যৎ স্ত্রী রূপে গ্রহণ করিলেন। হেলেন যে কত সুন্দর আর কোথাও কোন উল্লেখ নাই, ‘দি ইলিয়াড’ উপন্যাসে!

নারীর রূপ বর্ণনা করিতে গিয়া কবি-সাহিত্যিকদের গলদঘর্ম হয়। কীভাবে বলিলে তাহা সত্য ও বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য হইবে? কীভাবে বলিলে তাহা জীবনানন্দের ‘বনলতা সেনের’ মতো কাব্যিক হইবে? কীভাবে বলিলে তাহা অভিনব হইবে, স্বরচিত রবীন্দ্র সঙ্গীত হইবে না? ইত্যাদি নানা দ্বন্দ্বে আধুনিক কবিরা প্রমাদ গুণেন। এইবার বুঝি ধরা পড়িয়া যাই!

সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী হেলেনের সৌন্দর্য্য কেমন ছিল, যাহার জন্য রাজপুত্র প্যারিস লাজ-শরমের মাথা খাইয়া অতিথিপরায়ন গৃহস্বামীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিলেন? কী সৌন্দর্যে মুগ্ধ হইয়া নীতিবান হেক্টরও ছোটভাই প্যারিসকে মানিয়া নিলেন, অতঃপর গ্রিসের বিপক্ষে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেন? শুধুই হেলেনের মুক্তির জন্য গ্রিসের সমস্ত নগররাজ্য এক হইয়া ট্রয় ধ্বংস করিতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিলেন! মৃত্যু হইলো হাজারের সাথে বীর হেক্টরের? কী সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হইয়া প্যারিসের পিতা রাজা প্রাইয়াম একজন বিবাহিতাকে মানিয়া নিলেন তাহার পুত্রবধু হিসাবে?

ছাত্রজীবনে খুবই কৌতূহল নিয়া পড়িয়াছিলাম ‘দি ইলিয়াড’।
সুন্দরী হেলেনের রূপের কোন বর্ণনা পাওয়া যায় নাই হোমারের সেই উপন্যাসে! কী বিস্ময়ের ব্যাপার! শুধুই রূপের আগুন জ্বালাইয়া দিলেন, রূপের কথা ‍বলিলেন না। রূপের আগুনে জ্বলিয়া পুড়িলো ট্রয়! কিন্তু হোমার কি নির্দয় ব্যবহার করিলেন হেলেনের সাথে! তাহার সৌন্দর্য নিয়া প্রায় কিছুই বলিলেন না। এ কি তার কৌশল?!

অতঃপর বুঝিলাম, হোমার ইচ্ছাকৃতভাবেই কিছু বলেন নাই। শুধু আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করিয়াছেন পাঠকের মনে। রূপের প্রভাব দেখাইয়াছেন, রূপ সম্পর্কে কিছুই না বলিয়া। শুধু একটি স্থানে রাজা প্রাইয়ামের মুখ দিয়া যাহা বলিলেন, তাহা আজ প্রবাদ। হেলেনের দেহিক সৌন্দর্য্য শুধু একটি বাক্যে বলিয়া দিলেন, অন্ধ কবি হোমার!

গ্রিক কবি হোমার (৮০০-৭০১ খ্রি.পূ.)

গ্রিক কবি হোমার (৮০০-৭০১ খ্রি.পূ.)

তথ্যসূত্র:  হোমারের ‘দি ইলিয়াড’  – রবার্ট ফ্যাগলস কর্তৃক অনূদিত পেংগুইন ক্লাসিক্স। ছবি ইন্টারনেট থেকে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s