আস্তিকের পক্ষে দু’কলম: নাস্তিকতা একটি রোগ

মহান দার্শনিক প্লেটো

মহান দার্শনিক প্লেটো

মহান দার্শনিক প্লেটোকে শ্রদ্ধা জানিয়ে উপস্থাপন করছি আস্তিকের পক্ষে বিজ্ঞ ব্যক্তিদের কিছু চিন্তা-জাগানিয়া বক্তব্য। লেখাটিকে একটি সংকলনও মনে করা যায়। ব্যক্তিগতভাবে নাস্তিকের প্রতি আমার কোন তীব্র অনুভূতি নেই। তাদের প্রশ্ন থেকে অনেক উত্তর আমি পাই। কিন্তু প্লেটো বলেছেন, নাস্তিকতা হলো একটি আত্মিক রোগ যা জগৎ ও প্রকৃতিকে ভুলভাবে উপলব্ধি করার কারণে সৃষ্ট হয় [1]।
ঈশ্বরে অবিশ্বাস মানুষকে ভাল হবার, সত্যবাদি হবার বা আদর্শবান হবার চেষ্টা থেকে সরিয়ে আনে। এর প্রধান কারণ হলো, জীবনের উদ্দেশ্যহীনতা। মরণেই জীবন শেষ, এই চিন্তায় মানুষ আটকে যায় – তার আর মহৎ হবার কোন উদ্দেশ্য থাকে না। কবি রবার্ট ব্রাউনিং-এর মতে, এ জীবন হলো পরবর্তি জীবনের প্রস্তুতি। তাই পরবর্তি জীবনে আস্থা না থাকা মানে হলো এজীবনেই সব কিছু শেষ করে ফেলা। এর তাৎক্ষণিক লক্ষণগুলো হতে পারে, নৈতিক অবক্ষয় আর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা। তবে নগণ্য কিছু ব্যতিক্রম আছে, যাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে মেনে নেওয়া কঠিন।

ঈশ্বর সম্পর্কে যাচ্ছে-তাই বলা, তার অস্তিত্ব সম্পর্কে তাচ্ছিল্য করা আজ যেন আধুনিকতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাস্তিকতা এখন উন্নত মননশীলতা, উন্নত দর্শন ও যুগোপযোগিতার পরিচায়ক। ঈশ্বরের উপাসনা, সে যে ধর্মেরই হোক না কেন, এখন একটি সেকেলে ব্যাপার। বেইকন বলেছেন, দর্শনে অগভীর বিচরণের ফলই হলো ঈশ্বরে অবিশ্বাস [2]।

সাধারণভাবে কিং ডেভিড বা রাজা দাউদ বলে পরিচিত দাউদ (আ.) বলেছিলেন – “ঈশ্বরে ভয়ই হলো জ্ঞানের আরম্ভ।” পৃথিবীর অনেক সৃষ্টি আজও রহস্যময়; অনেক প্রাকৃতিক কীর্তি আজও বিজ্ঞানের যুক্তি দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় নি। কম্পিউটার আবিষ্কার করে মানুষ সাপের পাঁচ পা দেখতে শুরু করেছে, কিন্তু জীবন-মৃত্যুর রহস্য আজও বের করতে পারে নি; বারমুডা ট্রায়াংগেলের সূত্র আজও বের হয় নি। নিজের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ডাক্তার বলেন, “এবার আল্লা আল্লা করুন গিয়ে।” এদেশের একজন বিখ্যাত কবির জীবন হুইল চেয়ারে স্থির হবার পর বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে, প্রার্থনায় উপকার হয় [3]।
কিং ডেভিডের বাণীর সমর্থনে বলছি, শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা না থাকলে যেমন তাঁর কাছ থেকে কিছু শেখা যায় না, তেমনি ঈশ্বরে বিশ্বাস না থাকলে ঈশ্বরের সৃষ্টি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা কঠিন। ঈশ্বরের সৃষ্টির প্রতি মানুষের বিস্ময় সেই সৃষ্টিকে জানার আগ্রহ তৈরি করে।

ব্রিটিশ নাট্যসমালোচক জেরেমি কোলিয়ার বলেছেন, ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবজ্ঞার মূলে রয়েছে অজ্ঞতা, নিজের সম্পর্কে উচ্চজ্ঞান, সুপারফিশিয়াল বা ভাসাভাসা ধারণা [4]।
এর পরিণতি হলো জীবন সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব, হতাশা আর সবকিছু-ভেঙ্গে-পড়ে জাতীয় জীবনাচরণ।

ঈশ্বরে বিশ্বাস সম্পর্কে আলোচনা করা একটি দুরূহ কাজ, তা আমার পক্ষে শেষ করা সম্ভব নয়। এবিষয়ে আলোচনা চলতে পারে। কোন ধর্মকে উদ্দেশ্য না করেও ‘বিশ্বাস/অবিশ্বাস’ নিয়ে কথা চলতে পারে। প্রশ্ন মনের ভেতর রেখে দিলে তা নেতিবাচক উত্তর সৃষ্টি করে। অনেক নাস্তিক মনে করেন যে, ঈশ্বর প্রশ্ন বা সন্দেহ পছন্দ করেন না [5]।
এরকমের মনোভাব কেবল অগভীর ধারণা থেকে আসে। অনেকে এরকম বলে থাকেন, “আমি অমুকের প্রেমে এতই মগ্ন হয়েছিলাম যে, ঐরকমভাবে কামনা করলে আমি ঈশ্বরই পেয়ে যেতাম।” তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, কেন আমরা মৃত্যুভয় আসার পূর্বেই ঈশ্বরকে নিয়ে মগ্ন হই না? যখন আমার আর খারাপ কাজ করার সামর্থ্যই থাকবে না, তখন বিশ্বাস নিয়ে মানুষ কী করে? কিছু সময় বাকি থাকতে কি ভালো হওয়া উত্তম নয়? যাক, এসক কঠিন প্রশ্ন, ‘বুমেরাং’ হয়ে যায়।

নাস্তিকতা মানে হলো মানব জীবন একটি দুর্ঘটনা [6]।
পৃথিবী একটি বিগ ব্যাং এর ফল। মানুষ বিবর্তিত হমো সেপিয়েন্স (Homo Sapiens)। এসবই ঠিক থাকার পরও কি ঈশ্বর বলে একজন থাকতে পারেন না? একটি ব্যাঙের জীবনের যদি উদ্দেশ্য থাকে, তবে কি মানব জনম শুধুই একটি বিবর্তনের ফল, শুধুই একটি দুর্ঘটনা?

 

 

উদ্ধৃতিসমূহ নিচে একসাথে উল্লেখ করা হলো:

1) নাস্তিকতা হলো উপলব্ধির ভুলের কারণে আত্মায় সৃষ্ট রোগ। -প্লেটো
2) একটুখানি দর্শন মানুষের মনকে নাস্তিকতায় ধাবিত করে, কিন্তু দর্শনের গভীরতা মানুষের মনকে ধর্মের দিকে নিয়ে আসে। -স্যার ফ্রান্সিস বেইকন
3) হুমায়ূন! আমি নাস্তিক মানুষ। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে প্রার্থনায় বিশ্বাস করা শুরু করেছি। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আমেরিকার সব হাসপাতালে রোগীদের জন্য প্রার্থনার ব্যবস্থা আছে। স্ট্যাটিসটিকসে দেখা গেছে, যাদের জন্য প্রার্থনা করা হয়, তারা দ্রুত আরোগ্য লাভ করে। আমি আমার স্ত্রীকে আপনার জন্য প্রার্থনা করতে বলেছি। – কবি শহীদ কাদরী
4) নাস্তিকতা হলো অজ্ঞতা আর অহংকার, তীব্র অনুভূতি আর দুর্বল যুক্তি, এবং ভাল খাবার ও খারাপ জীবনযাপনের সম্মিলিত ফল। এটি হলো সমাজের অবক্ষয়, স্বভাবের দূষণ এবং প্রতিভার অবমূল্যায়ন। -জেরেমি কোলিয়ার
5) সন্দেহ করা পাপ নয়; কিন্তু ঈশ্বর সম্পর্কে অসংখ্য অকাট্য প্রমাণ পাবার পরও সে সন্দেহে বসবাস করা হলো পাপ। -ইরউইন এইচ লিন্টন
6) নাস্তিক হলো সে ব্যক্তি যে তার জন্মকে একটি দুর্ঘটনা মনে করে। – ফ্রান্সিস থমসন
7) কীভাবে একজন নাস্তিককে ফাঁদে ফেলানো যায়: চমৎকারভাবে খাবার পরিবেশন করার পর জিজ্ঞেস করুন তিনি রাধুনীতে বিশ্বাস করেন কিনা। -বেনামী

——————————————————-
পুনশ্চ: পুরোনো কিছু নোট থেকে এ লেখাটি কোন ধর্মের প্রতি নয়, আমার মতো অতি সাধারণ পাঠকের প্রতি 🙂

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s