খ্যাতিমান ও ক্ষমতাবানদের মৃত্যুকালীন শেষ বাক্য ও কিছু বিশ্লেষণ

life and death

এক) জীবন ও মৃত্যুর অজানা বন্ধন

“জীবন এবং মৃত্যু – এগুলো খুব সুন্দর এবং মধুর কোনও বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছে। তবে কীভাবে তা আমি জানি না।” কথাগুলো বলেছেন মার্কিন অভিনেত্রী ও গায়িকা গ্লোরিয়া সোয়ানসন। মৃত্যু নিয়ে মানুষ যেমন কৌতূহলী, তেমনই অনাগ্রহী। নিশ্চিত দুর্দশা নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকতে চায়, তবু অনিশ্চিত স্বর্গসুখের জন্য মৃত্যুকে বরণ করতে চায় না। যদিও বুদ্ধ বলেছেন, “বিচক্ষণতার সাথে জীবন যাপন করলে মৃত্যুকে ভয় পাবার কোনই কারণ নেই।” কঠিন শর্ত! কেমন বিচক্ষণতা তা তো পরিষ্কার কেউ জানে না।

মৃত্যু ও মৃত্যু-পরবর্তি জীবন নিয়ে মানবজাতির রয়েছে সুপ্রাচীন আগ্রহ। মৃত্যুর পরে কী হবে এবিষয়ে অনেক তাত্ত্বিক মত প্রচলিত থাকলেও মৃত্যুর সময় কেমন লাগে, এ নিয়ে মৃতের আত্মীয়স্বজনেরা অনেক আলোচনা পর্যালোচনা করে থাকেন। অনেকে সেগুলো নিয়ে বিগত জীবনের চিত্র খুঁজে পান। অনেকে তা ভুলে যান।

মৃত্যু-পূর্ব অভিজ্ঞতাকে মার্কিন বিজ্ঞানী *কেনেথ রিং পাঁচটি পর্বে ভাগ করেছেন ১) শান্তি ও সন্তুষ্টি, ২) দেহের বিচ্ছিন্নতা, ৩) অন্ধকারে প্রবেশ, ৪) আলোর আবির্ভাব, ৫) আলোতে প্রবেশ। তিনি বলেন, ৬০% মানুষ প্রথম পর্বের অভিজ্ঞতা উপলব্ধি করতে পারে এবং মাত্র ১০% মানুষ মৃত্যুকালে পঞ্চম পর্ব, অর্থাৎ আলোতে প্রবেশের অভিজ্ঞতা বুঝতে পারে। এসব হলো বিজ্ঞানের কথা।

মানুষ সাধারণত মৃত্যুবরণ করে তিন ভাবে: অসুস্থতা বা দুর্ঘটনায় (দৈবাৎ), আত্মহত্যায় এবং মৃত্যুদণ্ডে। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে একজন মৃত্যু পথযাত্রী কী করে এবং কী বলে, এবিষয়ে মানুষের কৌহূহলের শেষ নেই। এবিষয়ে প্রখ্যাত ব্যক্তিদের শেষ উক্তি নিয়ে একটি অনুসন্ধান চালিয়ে বেশ মজার তথ্য পেয়েছি।  কেবল তথ্য বললে ভুল হবে, সেখানে পেয়েছি জীবন ও মৃত্যু সম্পূর্কে কিছু দুর্লভ বিশ্লেষণ।

লেখক, রাজনীতিক এবং বিপ্লবী – একেক ব্যক্তিত্ব একেকভাবে মৃত্যুকে গ্রহণ করেছেন। শেষ বাক্যের মাধ্যমে মৃত্যু সম্পর্কে তাদের তাৎক্ষণিক অভিজ্ঞতা রেখে গেছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। মৃত্যু সম্পর্কে নিজেদের পূর্ব-প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে জীবন সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ দর্শন দিয়ে গেছেন তারা। এগুলো দার্শনিকদের চিন্তা থেকে আলাদা হলেও তা আকর্ষণীয় এবং চিন্তা-জাগানিয়া। সকল কথার শেষ কথা হলো, কে শুনে কার কথা! অথবা বলা যায় ….না শুনে ধর্মের কাহিনী!

 

ক্ষমতাবানদের পক্ষে মৃত্যুকে গ্রহণ করা সবচেয়ে কঠিন

ক্ষমতাবানদের পক্ষে মৃত্যুকে গ্রহণ করা সবচেয়ে কঠিন

দুই) পৃথিবীর ক্ষমতাবানদের জীবনের শেষ কথা!

 আজিকে হয়েছে শান্তি, জীবনের ভুলভ্রান্তি, সব গেছে চুকে।

রাত্রিদিন ধুক ধুক, তরঙ্গিত দুঃখসুখ, থামিয়াছে বুকে।

যত কিছু ভালোমন্দ, যত কিছু দ্বিধা দ্বন্দ্ব, কিছু আর নাই।

বলো শান্তি, বলো শান্তি, দেহ সাথে সব ক্লান্তি, হয়ে যাক ছাই।

(মৃত্যু পরে/ রবীন্দ্রনাথ)

বস্তুগত দুনিয়ায় মানুষের দু’টি শ্রেণী আছে: যাদের নেই এবং যাদের আছে। কথার বলে, নেংটার নেই ছিনতাইয়ের ভয়। পৃথিবীতের যার সম্পদ নেই, ক্ষমতা নেই, নাম-যশ কিছুই নেই, তার পক্ষে মৃত্যুবরণ করাটা একটু স্বস্তিরই। প্রতিবেশীরা বলে, বেটা মরে বেঁচে গেলো। বিষয়টি কত নিষ্ঠুর অথচ কত সত্য! অন্যদিকে যাদের উপরোক্ত সবকিছুই আছে তাদের মৃত্যুই যেন ‘সবকিছুর মৃত্যু’ ঘটায়। এ দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষগুলোর পক্ষেই মৃত্যুকে মেনে নেওয়া কঠিন। খ্যাতিমানদের মৃত্যু-মুহূর্তের শেষ কথাগুলো যেন একটি জানালা খুলে দেয় আমাদের জন্য। এ জানালা দিয়ে তাকালে তাদের কর্ম ও মনস্তত্বকে অবলোকন করার সুযোগ হয়।

মৃত্যুর পূর্বে মানুষ কী বলে, তা জানার আমার আজন্ম আগ্রহ। মনে হয়, অন্যদের চেয়ে একটু বেশিই। মৃত্যুপথযাত্রী যাবার বেলা কী বলে গেলো, কার সাথে তার সর্বশেষ কথা হয়েছিলো – এগুলো কে না জানতে চায়! অখ্যাত অনেকেরই কথা আমার স্মৃতিতে আছে। এবার সুযোগ নিলাম প্রখ্যাতদের সম্পর্কে জানার। বিষয়গুলো অনেকেরই চিন্তার দরজাকে খুলে দিয়ে ভাবনার সাগরে ফেলে দেবে। কবিরা কবিতা লেখবেন, গল্পকাররা পাবেন নতুন চরিত্র। নিচে কয়েকজন খ্যাতিমান ব্যক্তির জীবন সায়াহ্নের শেষ মুহূর্তের কথাগুলো নিয়ে আলোচনা করলাম। লেখার বিষয়ের মতো পাঠকের মন্তব্যও আমার কাছে অনেক আকাঙ্ক্ষিত!

আমার সকল সম্পদ একটি মুহূর্তের জন্য।  প্রথম এলিজাবেথ – মৃত্যু ১৬০৩, ইংল্যান্ডের রানী।

ইউরোপিয়ান সাহিত্যে এলিজাবেথান যুগের প্রবর্তনকারী কুমারি রানী এলিজাবেথ বিভিন্ন কারণেই ইতিহাসে বিখ্যাত। ব্রিটিশ রাজা অষ্টম হেনরি’র কন্যা। ব্রিটিশ রাজনীতিতে তিনিই প্রথম কাউন্সিল বা উপদেষ্টা প্রথার শুরু করেন। শাসন কার্যে একনায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হয়ে একদল উপদেষ্টা বা মন্ত্রীর পরামর্শে তিনি দেশ পরিচালনা করতেন। কুমারি ছিলেন, আমৃত্যু কুমারিই থেকে গেলেন রানী এলিজাবেথ। অনেকের ধারণা ছিলো টিউডর রাজবংশের শেষ উত্তরাধিকারী হিসেবে তিনি হয়তো বিয়ে করে উত্তরাধিকার রেখে যাবেন। তা তিনি করেন নি। সম্পদ বা ক্ষমতায় তা লোভ যে ছিলো না, তা তার শেষবাক্যে বুঝা যায়।

কেন কান্না করছো? তোমরা কি ভেবেছিলে আমি অমর?” চতুর্দশ লুই, মৃত্যু ১৭১৫, ফ্রান্সের রাজা।

বাহাত্তর বছর রাজক্ষমতায় থাকলে তো মানুষের এরকম ধারণা হবেই! তার ওপর তিনি বিশ্বাস করতেন যে, রাজারা ঈশ্বর কর্তৃক নিযুক্ত হন। ফরাসি রাজ চতুর্দশ লুই রাজক্ষমতায় ঐশ্বরিক বা স্বর্গীয় প্রভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। প্রতিবেশী ডাচ, স্প্যানিশ ইত্যাদি শক্তিধর প্রতিপক্ষের সাথে কঠিন অসম্ভব শক্তি দেখিয়ে বিজয় অর্জন করেন এবং ফরাসি বিপ্লবের পূর্ব পর্যন্ত প্রবল পরাক্রমে দেশ শাসন করেন। তখনকার বিশ্বেও চতুর্দশ লুইয়ের নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র ছিলো সুপরিচিত।

 আমার মৃত্যু কঠিন, কিন্তু আমি যেতে ভয় পাই না। জর্জ ওয়াশিংটন – মৃত্যু ১৭৯৯, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেজিডেন্ট।

উত্তর আমেরিকানদের জাতির পিতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেজিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন তার দীর্ঘদিনের বন্ধুকে কথাগুলো বলেছিলেন। স্ত্রীকে বললেন, “ড্রয়ার থেকে দু’টি কাগজ বের করে নিয়ে এবং একটি রেখে অন্যটি পুড়িয়ে দাও। ওগুলো আমার উইল। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পূর্বে আমার মৃতদেহ নিয়মমতো তিন দিন রাখো।” মৃত্যুকে একটি দৈনন্দিন বিদায়ের মুহূর্ত হিসেবে মেনে নিয়ে, পৃথিবীর সফলতম ব্যক্তিটি এভাবেই তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দু’টি মেয়াদে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় ছিলেন। পরবর্তিতে ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু রাষ্ট্রিয় দায়িত্বে থাকলেও প্রশাসনের গভীরে আর প্রবেশ করতে চান নি জর্জ ওয়াশিংটন।

আমি একজন রানী। কিন্তু নিজের হাতগুলোও নাড়াবার ক্ষমতা আমার নেই। রাণী লুই, মৃত্যু ১৮২০

প্রাশিয়ার রাজা ফার্দিনান্দ (১৭৩০-১৮১৩)এর স্ত্রী। প্রাশিয়া বর্তমানে জার্মানির সাথে যুক্ত।

 

আহা, কান্না করো না। ভালো মানুষ হও, দেখা হবে স্বর্গে। এন্ড্রু জ্যাকসন, মৃত্যু ১৮৪৫, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেজিডেন্ট।

 যুক্তরাষ্ট্র আমেরিকার ৭ম রাষ্ট্রপতি এন্ড্রু জ্যাকসন ব্যক্তি স্বাধীনতার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ইতিহাসে সমাদৃত। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ডেকোক্র্যাটিক পার্টির প্রতিষ্ঠাতা। “সাহসী মানুষ সংখ্যাগরিষ্টের সমর্থন পায়” উক্তির জন্য বিখ্যাত। প্রেজিডেন্ট এন্ড্রু জ্যাকসন যেমন প্রভাবশালী ছিলেন, তেমনি ছিলেন প্রবল আগ্রাসী ও বিতর্কিত। তার তিনজন দত্তক সন্তান ছিলো। অন্তিমকালে ভালো হবার চেতনা প্রবল হয়ে এসেছিলো এবং তা-ই বিতরণ করে গিয়েছেন জীবনের শেষ মুহূর্তে।

সঠিক কাজটি করতে আমি কঠিন চেষ্টা করেছি। গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড, মৃত্যু ১৯০৮, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেজিডেন্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের ২২ ও ২৪তম প্রেজিডেন্ট। ক্লিভল্যান্ড মরলেন ঠিক সেভাবে, যেভাবে তিনি বেঁচেছিলেন – আত্মনিয়ন্ত্রিত। থিওডর রুজভেল্ট তার শ্রদ্ধাঞ্জলিতে তাকে ‘সুখী যোদ্ধা’ বা হ্যাপি ওয়ারিয়র হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তিনি সম্মানজনভাবে দু’টি আলাদা মেয়াদে প্রেজিডেন্ট হবার বিরল মর্যাদা তিনি পেয়েছিলেন, কারণ তিনি জানতেন প্রেজিডেন্ট হওয়া মানে হলো ‘জনগণের আস্থা’।

মতাদর্শে ভিন্ন হলেও ক্লিভল্যান্ডের মৃত্যুর সময় ভেনিজুয়েলা তাদের জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রেখেছিলো। অন্যের মতামত দিয়ে যদি কাউকে বিচার করতে হয়, তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড সঠিক কাজটি করার চেষ্টা করেছেন।

“আমি প্রস্তুত। উডরো উইলসন – মৃত্যু ১৯২৪, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেজিডেন্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের ২৮তম প্রেজিডেন্ট হিসেবে টমাস উডরো উইলসন দু’টি মেয়াদ কাঠিয়েছেন, ১৯১৩ থেকে ১৯২১। “কোন কিছুতে সংস্কার এনে দেখুন কীভাবে শত্রু তৈরি হয়!” – তার বিখ্যাত উক্তি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় উত্তর আমেরিকাকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং লীগ অভ নেশনস গড়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যার বর্তমান রূপ জাতিসংঘ। সংবিধানে সংশোধনী এনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নারীদেরকে ভোটাধিকার প্রদান করেন। বিশ্ব শান্তি এবং নারী অধিকারের জন্য ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন যিনি, তিনি তো বলতেই পারেন, “আমি প্রস্তুত!”

আমার বুকে গুলি করো। মৃত্যুদণ্ড কার্যকারীদের প্রতি।বেনিটো মুসলিনি – মৃত্যু ১৯৪৫, ইটালির একনায়ক শাসক।

ভূমিকা নিষ্প্রয়োজন। ইটালির ২৭তম প্রধানমন্ত্রী এবং ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টির প্রধান বেনিটো মুসলিনি। কুদেতা বা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন ফ্রাসিস্ট ও উগ্র জাতিয়তাবাদী মুসলিনি। গুপ্তঘাতক দ্বারা অনেকবারই আক্রান্ত হয়েছেন – তারা নাক পর্যন্ত সফল হয়েছিলো! ব্যর্থতার শাস্তি হিসেবে তাদের কাউকে কাউকে একই স্থানে মরতে হয়েছে। তাই মৃত্যুদণ্ডের সময় বুকে গুলি করার পরামর্শ দেওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

আত্মসমর্পনের অপমান এড়ানোর জন্য আমি এবং আমার স্ত্রী মৃত্যুকে বেছে নিলাম। শেষকৃত্য সম্পর্কে আমাদের ইচ্ছা হলো, তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের মৃতদেহকে পুড়িয়ে ফেলা হোক সে স্থানে যেখানে আমি আমার বিগত বিশ বছরের জনসেবার গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলো কাটিয়েছি। আত্মহত্যাপূর্ব চিরকুট (সুইসাইড নোট)।

-এডলফ হিটলার, মৃত্যু ১৯৪৫, জার্মানির রাষ্ট্রনায়ক ও সামরিক প্রধান।

এপ্রিলের ২৯ তারিখে ইভা ব্রাউনের সাথে বিয়ে এবং ৩০ তারিখে আত্মহত্যা! হিটলার নিজ গুলিতে, ইভা সায়ানাইড ক্যাপসুলে। পরম মিত্র ইটালির একনায়ক মুসলিনির নিহত হবার একদিন পর হিটলার আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। হিটলারের জনপ্রিয়তা তার মৃত্যুর সাথে সাথে উদাও! শত্রু-আক্রান্ত জার্মানিতে সহযোদ্ধারা নিজ প্রাণ রক্ষাতেই ব্যস্ত – শোকাহত হবার সময় পায় নি। তবে জার্মানিরা তাকে যেভাবেই দেখুক, হিটলারের মৃত্যুর সাথে সাথে ইউরোপে জার্মান আধিপত্যের অবসান হয়।

 আল্লাহ ছাড়া মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ সা. আল্লাহর প্রেরিত রাসুল।” সাদ্দাম হুসেন, মৃত্যু ২০০৬, ইরাকের প্রেজিডেন্ট। মৃত্যুদণ্ডের পূর্বে।

পূর্ব এবং পশ্চিমের সব গণমাধ্যম প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিলো সাদ্দাম হুসেনকে দেওয়া পাশবিক মৃত্যুদণ্ডের এমেচার ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর। বিবিসি, টাইমস এবং দ্য হিন্দু এটিকে মধ্যযুগীয় মৃত্যুদণ্ড বলে আখ্যায়িত করেছিলো। তৈল-কেন্দ্রিক বিশ্ব রাজনীতির কথা না হয় বাদই দিলাম! পৃথিবীর ক্ষমতাবানদের হাতেই ধর্ম, এই বলে অনেক মেইভারিক লেখক মন্তব্য করে থাকেন। কিন্তু সাদ্দাম হুসেন যেভাবে একেশ্বরবাদকে ফাঁসির মঞ্চ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তাতে শুধু ধর্ম নিয়ে নয়, ঈশ্বরের পরাক্রম নিয়েও নতুন করে ভাবা উচিত। নিজেকে বিলীন করে দিয়েও নিজের বিশ্বাসকে অটুট রেখে সাদ্দাম শেষ মুহূর্তে সমালোচকদেরকে নিজের পক্ষে রেখে গেলেন!

 

 

কীর্তিমান ব্যক্তিরা মৃত্যুকে গৌরবান্বিত করেছেন

কীর্তিমান ব্যক্তিরা মৃত্যুকে গৌরবান্বিত করেছেন

তিন) মৃত্যুর ঠিক পূর্বে কী বলেছিলেন বিখ্যাত ব্যক্তিরা?

পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী আমার বাবা মারা যান আশির দশকের শেষে। প্রচণ্ড ধূমপান আর অনবরত চা পান করতেন তিনি খালি পেটেও। কিডনি সমস্যার সমাধান হবার পূর্বেই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান, অনেকটা অকালেই, কারণ তিনি কেবল ষাট অতিক্রম করেছিলেন তখন। চার ভাইয়ের মধ্যে শুধু একজন ভাই তখন উপার্জন সক্ষম। সবচেয়ে ছোটভাই তখনও ভালোমতো স্কুল শুরু করে নি। আমি হাইস্কুলে। এক ভাই লেখাপড়া ছাড়া আর চাকরি ধরা’র মাঝখানে অবস্থান করছিলেন। পরিস্থিতি যে কতটুকু ঘোরতর, তা আমরা কেউ টের পাই নি। সে বয়সেই ছিলাম না। কিন্তু বুঝেছিলেন আমার মুমূর্ষু বাবা, কারণ আমার দাদার সময় থেকেই স্বচ্চলতায় ভাটি পড়েছিলো। অবশিষ্ট ছিলো মাত্র কিছু নগণ্য জমি আর ভিটা বাড়ি। হয়তো মৃত্যুর পূর্বে প্রতিটি সেকেন্ড তার কেটেছে আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনের অনিশ্চয়তা নিয়ে। মৃত্যুর পূর্বে তিনি কী বলেছিলেন আমার ততটা খেয়াল নেই। শুধু মনে আছে, ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু বলার ভঙ্গি করে তিনি তার হাতের চারটি আঙ্গুল তুলে ধরেছিলেন আমার মায়ের দিকে। দুঃখিনী মায়ের অবশিষ্ট সম্বল বলতে ছিলাম কেবল আমরা চারটি ভাই! সৃষ্টিকর্তার কৃপায়, আমাদের মাঝেই মা আজ আছেন।

মানব জীবনের সর্বশেষ আত্মমূল্যায়নের উপলক্ষ হলো মৃত্যু। তবে এই মূল্যায়নের সুফল দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কিছু করার সুযোগ আর পান না – সেটি কেবলই পরবর্তি প্রজন্মের জন্য। মোনালিসা’র মতো অনবদ্য চিত্রকর্মের নির্মাতা লিওনার্দো দ্য ভিন্চির [১] মৃত্যু-সময়ের বক্তব্য থেকে বুঝা যায়, সকল মানুষের অন্তরে রোপিত আছে একটি অসন্তুষ্ট অন্তরাত্মা যা মানুষকে উৎকর্ষের দিকে নিয়ে যায়।

বিবর্তনবাদের প্রবর্তক ডারউইন [৫] তার মৃত্যুর পূর্বে ঘোষণা দিয়ে গেলেন যে তিনি মৃত্যুকে বিন্দুমাত্র ভয় পাচ্ছেন না। ‘লাইফ এন্ড লেটারস অভ চার্লস ডারউইন’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, জীবনের প্রতিটি ঘণ্টাকে তিনি কাজে লাগাবার চেষ্টা করেছেন। এক জায়গায় তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি একটি ঘণ্টাও নষ্ট করার সাহস পায়, সে জীবনের মূল্য খুঁজে পায় নি।”

বিপ্লব সফল করতে হলে প্রয়োজন আত্মবিসর্জন। এ কথা মাস্টারদা সূর্যসেন কত আগেই জানিয়ে গেছেন (১৯৩০)!

মৃত্যুর পূর্বে চে জানিয়ে গেলেন যে, মৃত্যু কেবল মানুষকে শেষ করে, বিপ্লবকে নয়। বিপ্লবীকে মারলেই যে বিপ্লব নিহত হয় না, এই স্বতঃসিদ্ধ সত্যটি জানিয়ে গেলেন কিংবদন্তী বিপ্লবী চে গুয়েভারা [১২]। চে’র জীবন আমাদেরকে অনেক কিছুই দিয়ে গেছে। তবে অমূল্য উপহারটি হলো এই যে, মানুষের জীবন কেবলই জীবনধারণের জন্য নয়, জীবন বিসর্জনের মধ্যেও জীবনের উদ্দেশ্য রোপিত থাকে।

মৃত্যুকে বাড়ি ফেরার সাথে তুলনা করেছেন উপন্যাসিক ও’ হেনরি [৯], যার আসল নাম সিডনি উইলিয়াম পোর্টার।

মৃত্যুর পূর্বে মার্কিন কবি এমিলি ডিকিনসন ‘ভেতরে’ যেতে চেয়েছেন, কারণ বাইরে ‘কুয়াশা’ পড়ছে [৭]। অর্থাৎ মৃত্যুর ওপারে তিনি আশ্রয় দেখতে পেয়েছেন।

বলা বাহুল্য, কবি রবার্ট ব্রাউনিং তার অধিকাংশ লেখায় মৃত্যু এবং এর পরবর্তি জীবনকে মানবজাতির অনিবার্য গন্তব্য তথা ‘পরিপূর্ণ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ’ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

‘কালো আলো’ – কী ভীষণ সত্য এক রূপক দিয়ে মৃত্যুকে বর্ণনা করলেন ফরাসি লেখক কবি ও নাট্যকার ভিকটর হুগো। কালো রঙ্গের আলো কি কেউ দেখেছেন কখনও? মৃত্যুর পূর্বে ভিকটর হুগো তা দেখে গেছেন। যা-হোক, তিনি তো একে আলো হিসেবে সাক্ষ্য দিয়ে গেলেন। তবে আর ভয় কিসের?

মৃত্যু কি জীবনের শেষ নাকি অর্ধেক?

খ্যাতিমানদের মৃত্যুকালীন শেষকথাগুলো এমনভাবে অন্তরে গেঁথে আছে, যার অনুভূতিতে ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। মৃত্যু জীবনের চেয়েও সত্য কিন্তু একে মেনে নিতে পারাটা অত্যন্ত কঠিন। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, মৃত্যুকে মেনে নেওয়া কি ‘ভালো মানুষ হওয়ার’ মতোই কঠিন, নাকি দু’টোই এক। মৃত্যু-ভয়ই কি মানুষের পরিপূর্ণতার পথে বাধা, নাকি ওটি একটি দরওয়াজা?  মৃত্যু ভয় কি আমাদেরকে ভালো হবার বা মহৎ হবার পথকে বাধাগ্রস্ত করে, নাকি উৎসাহিত করে? মৃত্যুর প্রতি অনীহা কি আমাদেরকে মানবিক উৎকর্ষতা সাধনের প্রচেষ্টাকে সংকুচিত করে? মৃত্যু কি জীবনের ফাঁদ, নাকি জীবনের পরিপূর্ণতা? প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত উত্তর কারও জানা থাকলে দয়া করে সহভাগিতা করবেন!

বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনের শেষ কথা

১) “ঈশ্বর ও মানবজাতিকে আমি হতাশ করেছি, কারণ আমার কাজগুলো যথাযথ মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারে নি।” লিওনার্দো দ্য ভিন্চি, ইটালিয়ান চিত্রশিল্পী। মৃত্যু ১৫১৯।

২)  “মৃত্যুকে নির্ভীকভাবে গ্রহণ করে যারা, তাদের জন্য পরকালে কী আছে আমি খুব জানতে চাই।” পাদ্রির প্রতি পিয়েট্রো পেরুগিনো, ইটালিয়ান চিত্রশিল্পী। মৃত্যু ১৫২৩।

৩) “আমি আমার সর্বশেষ ভ্রমণে যাচ্ছি – অন্ধকারে একটি বড় পদক্ষেপ।” থমাস হব্স, লেখক, মৃত্যু ১৬৭৯

৪) “আমি তোমায় ভালোবাসি, সারাহ। চিরদিনের জন্য, আমি তোমাকে ভালোবাসি।” স্ত্রীর প্রতি জেমস কে পোক, যুক্তরাষ্টের প্রেজিডেন্ট, মৃত্যু ১৮৪৯

৫) “মরতে আমি বিন্দুমাত্র ভয় পাচ্ছি না।” চার্লস ডারউইন, বিবর্তনবাদের প্রচলক, মৃত্যু ১৮৮২

৬) “কালো আলো দেখতে পাচ্ছি।” ভিকটর হুগো, লেখক, মৃত্যু ১৮৮৫

৭) “আমাকে ভেতরে যেতে হবে, কুয়াশা বেড়ে যাচ্ছে।” এমিলি ডিকিনসন, কবি, মৃত্যু ১৮৮৬

৮)  “হয় দেয়ালের ছবিটি যাবে, নতুবা আমি।” অসকার ওয়াইল্ড, লেখক, ১৯০০

৯) “আলোগুলো জ্বালিয়ে দাও। অন্ধকারে আমি বাড়ি ফিরতে চাই না।” ও’ হেনরি (উইলিয়াম সিডনি পোর্টার), লেখক, মৃত্যু ১৯১০

১০)  “ওখানে অনেক সুন্দর!” থমাস আলভা এডিসন, বিজ্ঞানী ও আবিষ্কারক, মৃত্যু ১৯৩১

১১)  “কিছুরই মূল্য নেই, কিছুরই মূল্য নেই।” লুইস বি মেয়ার, চলচ্চিত্র প্রযোজক, মৃত্যু ১৯৫৭

১২) “আমি জানি, তুই আমাকে মারতে এসেছিস। গুলি কর, কাপুরুষ! তুই তো শুধু একজন মানুষই পারবি।” গুপ্তঘাতকের প্রতি আরনেস্টো চে গুয়েভারা, মৃত্যু ১৯৬৭

১৩) “হায় ঈশ্বর! একি হলো!” ডায়ানা স্পেনসার, ওয়েলসের রাজকন্যা, মৃত্যু ১৯৯৭

8ffc871

৩টি পর্বে প্রথম আলো ব্লগে প্রকাশিত

পর্ব ১:  জীবন ও মৃত্যুর অজানা বন্ধন

পর্ব ২: পৃথিবীর ক্ষমতাবানদের জীবনের শেষ কথা

পর্ব ৩: মৃত্যু কি জীবনের শেষ নাকি শুরু।   শেষপর্বটি সামহোয়ানইন ব্লগে নির্বাচিত হয়।

 

> প্রাসঙ্গিক একটি পত্রিকার সংবাদ্: জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে অনুভূতি কেমন হয়। গবেষণা। দৈনিক প্রথম আলো।

 

——————————-
*কেনেথ রিং ১৯৮০, নিউইয়র্ক: “লাইফ এট ডেথ: আ সাইয়েন্টেফিক ইনভেস্টিগেশন অভ নিয়ার ডেথ এক্সপিরিয়েন্স” পৃষ্ঠা ৪০।

ছবি এবং অধিকাংশ তথ্য ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।

 

 

Advertisements

2 comments

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s